রথযাত্রা উপলক্ষ্যে এই বিখ্যাত এবং বহু-প্রশংসিত বইটি পড়ার সৌভাগ্য হল। বইটি আদতে পত্রিকায় ধারাবাহিক আকারে প্রকাশিত বেশ কিছু লেখার সংকলন। এই লেখাগুলোর উপজীব্য ছিল জগন্নাথ বিগ্রহের আকার, তাঁর মন্দির ও পূজা প্রচলনের সঙ্গে জড়িত নানা কিংবদন্তি। সম্পূর্ণ লেখাটিকে যে-সব অধ্যায়ে বিন্যস্ত করা হয়েছে তারা হল~ ১. নীলমাধবের সন্ধানে ২. বিদ্যাপতির প্রতীক্ষা ৩. বিদ্যাপতি ও ললিতা ৪. ললিতার পাণিপ্রার্থনা ৫. বিদ্যাপতি ও ললিতার বিবাহ ৬. ললিতার প্রার্থনা ৭. নীলমাধব দর্শন ৮. বিদ্যাপতির বিদায় ৯. ইন্দ্রদ্যুম্নের শবরপল্লী আক্রমণ ১০. ব্রহ্মার মর্ত্যে আগমন ১১. দারুব্রহ্ম আনয়ন ১২. দারুব্রহ্মে শ্রীজগন্নাথ ত্রিমূর্তিতে প্রকাশিত হলেন বইটি পড়ে, অকপটে এবং শ্রদ্ধেয় লেখকের উদ্দেশে ক্ষমাপ্রার্থনা করেই বলি, মনটা ভেঙে গেল। কেন? প্রথমত, রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের তরফে নীলমাধব রূপে বিষ্ণুর সন্ধানের কাহিনিটি অত্যন্ত ফেনায়িত আকারে এখানে পরিবেশিত হয়েছে। বিদ্যাপতি ও ললিতার প্রণয়ের প্রসঙ্গ তথা বিবরণ যে পরিমাণ গুরুত্ব পেয়েছে তাতে এ-কথা স্পষ্ট যে লেখক সুবোধ ঘোষের লেজেন্ডারি ও আইকনিক 'ভারত প্রেমকথা'-র মতো কিছু লেখার লক্ষ্যে এগোচ্ছিলেন। তাই, এই কিংবদন্তির আড়ালে চাপা পড়া, অরণ্যচারী জনগোষ্ঠীর পূজ্য টোটেম রাজন্যবর্গের দ্বারা অপহৃত হওয়ার ইতিহাসটি তিনি সচেতনভাবে উপেক্ষা করেছেন। দ্বিতীয়ত, লেখার চার-পঞ্চমাংশ এই ফেনায়িত অতিকথনে ব্যয় করার পর লেখকের মনে পড়েছে, তাঁকে আদতে বারোটি পর্বে কাহিনি শেষ করতে বলা হয়েছিল। অতঃপর মন্দির প্রতিষ্ঠার অংশটি হুড়মুড়িয়ে বলে বইটি শেষ করা হয়েছে। সেই পর্বে একদিকে যেমন এসেছে অকারণ অলৌকিকতা, অন্যদিকে কূর্মের সাক্ষ্য দেওয়ার আখ্যান তথা ত্রিমূর্তির ধারণায় সুপ্ত বৌদ্ধ প্রভাবের সামান্যতম উল্লেখ করা হয়নি। না, এই বই আদৌ জগন্নাথ বা রথযাত্রার ইতিহাস বলে না। এ আসলে একটি কফি-টেবিল বুক, যার প্রকৃত সম্পদ হল সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়ের অলংকরণ ও প্রচ্ছদ। ওই শিল্পীর ফোলিও হিসেবেই এই বইটি সংগ্রহযোগ্য। জগন্নাথ কাহিনি ও ইতিহাস জানতে গেলে, এমনকি এই পূজন ও আচারের সঙ্গে জড়িত কিংবদন্তি ও ধার্মিক ধারণাগুলোর পরিচয় পেতে গেলেও এর চেয়ে ঢের-ঢের ভালো বই হল সুশীল মুখোপাধ্যায়ের 'রহস্যে ঘেরা পুরীর জগন্নাথ' (নিউ বেংগল প্রেস)। এটা... বুকশেলফের শোভাবর্ধক হিসেবেই ঠিক আছে।