ভারতের গণিতচর্চার ইতিহাস নিয়ে আমার আগ্রহের সূত্রপাত হয়েছিল প্রীতম বসু'র লেখা 'পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল' পড়তে গিয়ে। তার আগে কেশব চন্দ্র নাগের বইয়ে জ্যামিতি আর ত্রিকোণমিতির নানা অধ্যায়ে খুব ছোট্ট করে ব্রহ্মগুপ্ত বা ভাস্করাচার্যের সম্বন্ধে কিছু কথা পড়েছিলাম বটে৷ কিন্তু কোণের মাপ থেকে ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল জানা আর নববিন্দু বৃত্ত আঁকা নিয়ে এতই হিমসিম খেয়েছি যে সেইসব মানুষদের কাজ নিয়ে ভাবার অবকাশ পাইনি। উপরোক্ত উপন্যাসটি পড়ার পর এই নিয়ে যৎসামান্য পড়াশোনা করি। ক্রমে জি.জি. জোসেফের লেখা 'দ্য ক্রেস্ট অফ দ্য পিকক'-এর একটি অধ্যায়ও পড়ার সুযোগ হয়। বুঝতে পারি, হাজার বছরেরও বেশি আগে এই দেশের কয়েকজন মানুষ দৃষ্টি আর মস্তিষ্কের ব্যবহার করে সাংঘাতিক কিছু পেয়েছিলেন। কী পেয়েছিলেন তাঁরা? সেই বিবরণ, সহজতম ভাষায় এবং স্রেফ গল্প বলার ভঙ্গিতে পড়লাম এই বইয়ে! একটি অতি সংক্ষিপ্ত ভূমিকা-র পর বইটি ভারতে গণিতচর্চার ইতিহাস তুলে ধরেছে মোট সতেরোটি অধ্যায়ে। তারা হল~ ১. গুণতে শেখার ম্যাজিক ২. সিন্ধু উপত্যকার গণিত ৩. আর্যযুগের গণিত ৪. অ্যান অ্যাডভেঞ্চার ইন ইন্ডিয়া ৫. শূল্বসূত্র নিয়ে আরও কথা ৬. পাণিনি ও কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ৭. জৈন গণিতবিদ্যা ৮. বাকশালির পুথি ৯. ব্রাহ্মী সংখ্যা: স্থানীয় মান আর শূন্য ১০. ভারতে অঙ্কের স্বর্ণযুগ (৫০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে) ১১. আর্যভটের হামানদিস্তা ১২. পাই কাহিনি ১৩. অঙ্কের ইন্ডিয়ান আইডলরা ১৪. ফিবোনাচি সংখ্যা: কাব্য থেকে অঙ্ক ১৫. কলনবিদ্যার (ক্যালকুলাস) জন্ম ১৬. অঙ্ক চলল দক্ষিণে ১৭. অঙ্কের বিদেশযাত্রা নীরস ইতিহাস নয়, নয় সংখ্যা ও চিহ্নের সমাহার। এই বই গল্প বলে আমাদের। কীসের গল্প? যুগ-যুগ ধরে ভারতবর্ষের কয়েকজন মানুষ আকাশের এ-প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সরে যাওয়া নানা বস্তুর অবস্থান কতটা নির্ভুলভাবে মাপতে চেয়েছেন— তার গল্প। সেই সূত্রেই আবিষ্কৃত হয়েছে গণিতের একের পর এক সূত্র। ইউরোপ যখন কুসংস্কারে ডুবে আছে, সেই সময় ভারতের বিভিন্ন গ্রামে, শিক্ষালয়ে বা দেবালয়ের ছায়ায় মাটির বুকে আঁচড় কেটে আঁকা হয়েছে নানা সূত্র। সেই গণিত মেনে ধেয়ে চলে গ্রহ-নক্ষত্র। প্রকৃতির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রকাশেও ঘটে সেই সূত্রের উদ্ভাস। আর তারপর নামে অন্ধকার! এই অতুল সম্পদ হারিয়ে ফেলেছিলাম আমরা। লুণ্ঠন, শোষণ, পরাধীনতায় দীর্ণ এই দেশ আজও জনসংখ্যা আর অজস্র সমস্যায় ক্লিষ্ট। এতই দুর্গত আমরা, যে ঠিক কী হারিয়েছি— সেই বোধটুকুও আমাদের আজ নেই। কিন্তু এই পুথি আমাদের বুঝিয়ে দেয়, এখনও আছে সময়, যদি বিপদে আমরা না করি ভয়। অতীতের তীর থেকে ভেসে আসা দীর্ঘশ্বাসের বদলে এই বই আমাদের মনে করিয়ে দেয় পথের দেবতার অনন্ত আহ্বান~ "চলো, এগিয়ে যাই।" যদি আপনার পরিচিত এমন কেউ থাকে যার প্রাণে আগুনের পরশমণি ছোঁয়ানো প্রয়োজন, যাতে সে এদেশকে ভালোবেসে বড়ো হয় আর মুক্তচিন্তার পথিক হয়, তাহলে এই বই আপনার এবং তার জন্যই লেখা। পড়ুন, পড়ান, জানান। চলুন, এগিয়ে যাই।
ভারতীয় গণিতের প্রতি যদি আগ্রহী হন তাহলে এই বইটি দিয়েই শুরু করতে পারেন। ১৫১ পাতার মধ্যে লেখক প্রাচীন ভারতীয় গণিতের নানা ব্যাবহার দেখিয়েছেন এবং গল্পচ্ছলে আলোচনা করেছেন ভারতীয় গণিতজ্ঞদের আবিষ্কৃত বিভিন্ন সূত্র,উপপাদ্য, পদ্ধতি। পড়তে এতটুকু বিরক্ত হওয়ার জায়গা নেই। একটাই সমস্যা আমার মনে হয়েছে, লেখক অজানা সংখ্যা ধরতে ক/খ এর কিছু ব্যবহার করেছেন আবার A/B এরও ব্যবহার করেছেন, যেকোনো একটি করলেই সুবিধা হত। আর কিছু জায়গায় A এর স্কয়ার বদলে A2 লেখা হয়েছে, সেটা মুদ্রণ প্রমাদ হিসেবেই ধরলাম। কিন্তু যেহেতু এটি গণিতের বই সেটা হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়।
অঙ্ক - শব্দটা আমাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কেউ ভয় পেয়ে পালাই, আবার কেউ ভালোবেসে আপন করে নিই। আসলে কথায় আছে কোনো বিষয়কে ভালোবাসলে সেও পাল্টা সোহাগ ফিরিয়ে দেয়। তবে বিষয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জন্মানোর কাজটা অনেক সময় সহজ করে দেন শিক্ষকরা। ব্যক্তিগতভাবে এমন একজন প্রণম্য শিক্ষকের সংস্পর্শে এসে আমি অঙ্ককে ভালোবাসতে শুরু করেছিলাম, ঘুচে গিয়েছিল আমার বহুদিনের অঙ্কভীতি। আসলে তিনি জটিল সমীকরণ আর উপপাদ্যকে গল্পের আকারে বোঝাতে জানতেন। টেরই পেতাম না কখন খেলার ছলে কঠিন সব অঙ্কের সমাধান করতে শিখে গেছি। ম্যাথ একটা অ্যাডভেঞ্চারই বটে। এও তো এক আশ্চর্য ভাষাশিক্ষা, যার নাম গণিত। আজ থেকে চার হাজার বছর আগে ভারতে শুরু হয়েছিল সেই রোমাঞ্চকর ম্যাথভেঞ্চার। সুলেখক ও গবেষক শ্রী দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের হাত ধরে সেই ঐতিহাসিক সফর করে এলাম 'আর্যভটের পুথি'-তে চেপে।
সহজ সরল শব্দের বুননে লেখক এখানে শিখিয়েছেন গুণতে শেখার ম্যাজিক। সিন্ধু উপত্যকা ও আর্যযুগের গণিতের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়েছেন। উঠে এসেছে শূল্বসূত্রের কথা, পাণিনি ও কম্পিউটার প্রোগ্রামিংকে একাত্ম করে দিয়েছেন, এসেছে জৈন গণিতবিদ্যার প্রসঙ্গ, বাকশালির পুথির উল্লেখ, ভারতে অঙ্কের স্বর্ণযুগ, পাই কাহিনী, ফিবোনাচির অদ্ভুত জগৎ, কলনবিদ্যার জন্ম, এবং পরিশেষে অঙ্কের বিদেশযাত্রা।
মনোরম এই যাত্রাপথে লেখক বিভিন্ন বয়সের ছাত্রদের অঙ্ক শিখিয়েছেন, তবে নানা ছবি ও উপমার আশ্রয়ে তা হয়ে উঠেছে মনোগ্রাহী। শুধুমাত্র আর্যভট নয়, অঙ্কের প্রায় সকল ইন্ডিয়ান আইডলের সঙ্গে আলাপ করিয়েছেন তিনি। তাঁদের যুগান্তকারী চিন্তা ও আবিষ্কারের কথা জেনেছি। সব মিলিয়ে দুর্দান্ত এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হলে বইটির জুড়ি মেলা ভার। ইচ্ছুক পাঠকদের জন্য আরো কিছু বইয়ের নাম রয়েছে শেষের দিকে যার মাধ্যমে এই বিষয়ে জ্ঞানার্জন চালু রাখা যাবে।
ছিমছাম হার্ডকভার আর ছোটখাট সাইজের বইয়ের প্রতি আমার বরাবরের লোভ। সঙ্গে এমন সুন্দর বিষয় থাকলে তো আর কথাই নেই। অঙ্কের সূত্র বর্ণনায় ক,খ,গ-এর উল্লেখ কিছুটা অসুবিধা সৃষ্টি করেছিল অবশ্য। A,B,C,X,Y,Z এ অভ্যস্ত বাঙালিকে এইটুকু মানিয়ে নিতে হবে।
লেখককে অশেষ ধন্যবাদ জানাই বইটির জন্য। বিজ্ঞানবিষয়ক এমন আরো কাজ আসুক বাঙলা সাহিত্যে।
বই ~ আর্যভটের পুথি - ভারতের ম্যাথভেঞ্চার লেখক ~ দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য প্রচ্ছদ ~ জয়ঢাক গ্রাফিক্স ফর্ম্যাট ~ হার্ডকভার প্রকাশক ~ জয়ঢাক প্রকাশন প্রথম প্রকাশ ~ এপ্রিল ২০২০ মুদ্রিত মূল্য ~ ২৫০ টাকা