Jump to ratings and reviews
Rate this book

নারাচ #1

নারাচ

Rate this book
১৮৮৭ সালের ২৫ শে মে হাওড়ার চাঁদপাল ঘাট থেকে স্যার জন লরেন্স নামক এক প্রকাণ্ড জাহাজ মহাসমারোহে রওনা দিয়েছিল পুরীর উদ্দেশ্যে। সমুদ্রপথে বালেশ্বর হয়ে কটক। সেখান থেকে পদব্রজে পুরী। এইভাবেই তখন যাত্রা করতে হত নীলাচলধামে।

কিন্তু বঙ্গোপসাগরে প্রবল ঘূর্ণিঝড় এবং সামর্থ্যের তুলনায় অতিরিক্ত যাত্রীগ্রহণে জাহাজটির সলিল সমাধি ঘটে। মৃত্যু হয় সাড়ে সাতশোজন মানুষের, যাদের অধিকাংশই মহিলা। নেটিভ বলেই হয়ত সেভাবে আলোড়ন পড়েনি সমাজে।

ধীরে ধীরে ইতিহাসের পাতায় চাপা পড়ে যায় টাইটানিক জাহাজডুবির প্রায় পঁচিশ বছর আগের সেই হৃদয়বিদারক ঘটনা। হাওড়ার জগন্নাথঘাটের বিবর্ণ এক স্মৃতিফলক এখনো জানান দেয় সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার। বস্তুত এর পরেই পুরী পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে উদ্যোগী হয় ব্রিটিশ সরকার।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন সমাজের তুলনামূলক স্বল্প আলোচিত নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে এক বহুস্তরীয় উপন্যাস নারাচ। এতে রয়েছে ইন্ডেনচারড লেবার হিসেবে সেইসময়ে হাজার হাজার ভারতীয়কে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলিতে চালান দেওয়ার কথা, লক্ষনৌয়ের নির্বাসিত নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ্‌র কলকাতায় এসে মেটিয়াবুরুজে এক টুকরো লক্ষনৌ গড়ে তোলার কথা, ডঃ কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়ের সংগ্রাম এবং বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে আসা সহবাস সম্মতি আইনের পক্ষে ও বিপক্ষে নানা সংগ্রামের আলেখ্য ও আরো নানা দিক।

নবজাগরণের উন্মেষকাল উনবিংশ শতক নিয়ে বাংলায় কাজ হয়েছে প্রচুর। প্রতিটি কাজই অসামান্য গবেষণা ও সাহিত্যগুণে সমৃদ্ধ হলেও যেন বিশেষ কিছু বিষয়েই সীমাবদ্ধ। নবজাগরণ, সমাজ সংস্কার এইসব আলোকিত দিক ছাড়াও সেই যুগে অবধারিত ভাবেই ছিল কিছু প্রান্তিক মানুষ। যারা বিস্মৃতপ্রায়।

লখনৌয়ের নির্বাসিত নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ্‌ কলকাতার মেটিয়াবুরুজে গড়ে তুলেছেন একটুকরো লক্ষনৌ। তার সেই আনন্দনগরী যেন কলকাতা শহরে বড় ব্রাত্য। সমান্তরালে রমরমিয়ে চলছে অষ্টমবর্ষে গৌরীদানের সেই নিয়ম। প্রতিবছর নীরবে অকালকুসুমের মত ঝরে যাচ্ছে অপরিণত নাবালিকারা, স্বামীর ধর্ষণে। রক্ষণশীল সমাজ তা নিয়ে নিরুত্তর। সহবাস সম্মতি আইন তাঁরা কিছুতেই পাশ হতে দেবেন না। হিন্দু শাস্ত্রে বিবাহ বা সহবাসে মেয়েদের সম্প্রদান করেন তাদের পিতা, তাই সহবাসে অধিকার অপ্রয়োজনীয়।

‘নারাচ’ সেই ব্যতিক্রমী প্রান্তজনদের অব্যক্ত সংগ্রাম তুলে ধরার একটি প্রয়াস। চুক্তিবদ্ধ ইন্ডেনচারড শ্রমিকরাই হোক বা অষ্টমবর্ষে গৌরীদান হওয়া মেয়েরা, যারা শত বাধাবিপত্তিতেও বারবার উঠে দাঁড়িয়েছে, ফিরে আসতে চেয়েছে মূল স্রোতে, বঞ্চিত ও শোষিত সেই মানুষদের জীবনগাথার প্রবাহপথে কৃষ্ণসুন্দর, ভুবনমণি ও আরো কয়েকজন প্রান্তিক মানুষের লড়াই এই উপন্যাসের উপজীব্য ।

305 pages, Hardcover

First published July 1, 2020

34 people are currently reading
650 people want to read

About the author

Debarati Mukhopadhyay

52 books351 followers
Debarati Mukhopadhyay is presently one of the most popular and celebrated authors of Bengali Literature and a TED Speaker having millions of readers worldwide.

A young Government Officer by profession and awarded with several accolades like Indian Express Devi Award 2022, Tagore Samman, 2022, Literary Star of Bengal etc, she has written 25+ bestselling novels in West Bengal from leading publishing houses. Global publishers like Harper Collins, Rupa Publication have published her English works worldwide.

A no. of novels are already made up into movies starting Nusrat Jahan, Mithun Chakraborty, Dev etc by big production houses like SVF, Eskay etc. Her stories are immensely popular in Sunday Suspense, Storytel etc.

Her Novel ‘Dasgupta Travels’, has been shortlisted for ‘Sahitya Akademi Yuva Pursakar, 2021’.

Her Novel ‘Shikhandi’ created a history when it was acquired for film by SVF within 24 hours of it’s publication. Beside this, she contributes in Bengal’s prominent literary magazines and journals regularly.

She has been selected as Country's only Bengali Literature Faculty for the esteemed Himalayan Writing Retreat.

An excellent orator, Debarati motivates people through her way of positive thinking, voluntarily guides aspirants for Government job preparation in leisure.

She’s a regular speaker in eminent institutions like Ramakrishna Mission and other educational seminars and often considered as youth icon of Bengal. She’s extremely popular in Bengal and having more than 5,00,000+ followers in Social media.

For more details, please visit: www.authordebarati.com

Her famous novels: Narach, Dakatraja, Shikhandi, Aghore Ghumiye Shib, Narak Sanket, Ishwar Jakhan Bandi, Diotima, Dashgupta Travels, Hariye Jaoa Khunira, Babu O Barbanita etc.

Significant Awards: Indian Express Devi Award, 2022, Tagore Samman, Most Inspirational Lady 2022, Sera Kathak Samman etc.

For more details, visit official website: http://www.authordebarati.com

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
171 (47%)
4 stars
123 (34%)
3 stars
44 (12%)
2 stars
9 (2%)
1 star
13 (3%)
Displaying 1 - 30 of 120 reviews
Profile Image for Injamamul  Haque  Joy.
100 reviews115 followers
June 14, 2021
দ্বারকানাথ চশমার ফাঁক দিয়ে তাকালেন, "বল তো, নারাচ মানে কী?"
ভুবনমণি ঠোঁট উলটে বললো, "কে না জানে। রাজী না হওয়াই হলো নারাজ।"
"সেই তো। তোমার মত গর্দভরাই এটা বলবে। নারাজ নয়, নারাজ নয়, এটা নারাচ। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ব্যাবহৃত লোহার অস্ত্র। নর'কে গ্রাস করে তাই নারাচ।"

কলকাতার আরোও একটা ক্লাসিক ব্লাস্ট। কিন্তু এই বইয়ের রেটিং সংখ্যা দেখে কিছুটা আপসেটও হয়েছি। মাত্র ৬৪টা। যার বই প্রকাশের এক সপ্রাহের মাথায় হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায় তার বইয়ে এই অবস্থা? অবশ্য হওয়ারই কথা, রুদ্র-প্রিয়ম সিরিজের নামে লেখিকা যা খাইয়েছে আমাদের, তাতে এমন হওয়াটা স্বাভাবিকই বটে। কিন্তু এই বইটায় আমি এক অন্যরকম দেবরতি মুখোপাধ্যায়কে পেয়েছি। এক ধারালো, সেনসিটিভ, প্রথা বিরোধী দেবরতি মুখোপাধ্যায়। বইয়ে তিনটা গল্পের নেক্সাস ঘটেছে :

১. যবন আর কন্যাদায়গ্রস্ত এক ব্রাহ্মণ পন্ডিত কৃষ্ণসুন্দর আর তার স্ত্রী ব্রহ্মময়ীর দূর্ভাগ্যের গল্প।
২. দ্বারকানাথ, কাদম্বিনী, রবী ঠাকুর, সৌরেন্দ্র আর ভুবনমণীর গল্প। এখানকার আখ্যানের মূল মোটিভ হচ্ছে বাংলার নারী জাগরণ। কাদম্বিনীর সব প্রতিকূলতা জয় করে ডাক্তার হওয়া, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভুবনমণীর বীরকন্যা হয়ে ওঠা ব্যাক্ত করা হয়েছে এখানে। তার পাশাপাশি উঠে এসেছে বাংলার নারী গনজাগরণের সময়টা।
৩. এটা অযোধ্যার নির্বাসিত নবাব ওয়াজেদ আলী, চন্দ্রনাথ, মোতি আর শুক্লসুন্দরের দুনিয়া। যেখানে নেই কোনো হিন্দু-মুসলমান, শুদ্র-বাহ্মণ, ধনী-গরীবের ভেদাভেদ। যেখানে সবাই স্বাধীন।

এই বইটা সেই সময় নিয়ে লেখা, যদি সময়ে নারীরা ছিলো পুরুষের সম্পত্তি হিসেবে। যে সময়ে নারীদের ছিলো না কোনো সামাজিক মর্যাদা, কোনো ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার, ছিলো স্বামীর আজ্ঞাধীন। যে সময়ে কৃষ্ণসুন্দরের মত কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাদের পরিবার নিয়ে হতে হত একঘরে। যে সময়ে কাদম্বিনী, দ্বারকানাথ, বিদ্যাসাগররা এই নারীবিদ্বেষী সমাজে বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ছিলো, রক্ষণশীল সমাজের তোপের মুখে পড়েও প্রতিষ্ঠা করে গেছে, বিধবাবিবাহ, বাল্যবিবাহ, সহবাস আইন। তার পাশাপাশি ব্যাক্ত হয়েছে ইংরেজদের ইনডেনচার আইনের নামে, গ্রাম বাংলার গরীব মানুষকে ঠকিয়ে লাটিন আমেরিকায় নিয়ে যাওয়ার এক নৃশংস দাসত্বের কথা। দেবরতি মুখোপাধ্যায়ের লেখা নিয়ে আমার কোনো কালেই অভিযোগ ছিলো না, অভিযোগ ছিলো ওনার প্লট অরগানাইজেশান নিয়ে। কিন্তু এ বইয়ে কী সুন্দর ভাবে সব কিছু অরগানাইজ করেছেন। বইয়ে কৃষ্ণসুন্দর একটা কথা বারবার বলছিলো, "অশুভশক্তির বিরুদ্ধে কোনো না কোনো সময় শুভ শক্তির জয় হবেই।" আর সেটাই হয়েছে শেষে। কিন্তু তা হয়েছে মর্মান্তিক ভাবে। আর একটা সামাজিক বইয়ে এত টুইস্ট দেওয়া যায় তা এই বই পড়ার আগে কল্পনাতীত ছিলো। সর্বোপরি অসাধারণ, অসাধারণ এবং অসাধারণ ট্র‍্যাজেডি উপন্যাস। আমার এই বছরে পড়া অন্যতম সেরা বই।

আর স্যার জন লরেন্স জাহাজ ডুবির ঘটনাটা আরোও একবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে, পৃথিবী আদি থেকে অন্ত, সব সময়ই চলে এসেছে পুঁজির ওপর ভর করে— যাকে বলে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা। অনেকদিন মনে থাকবে বইটা। নারাচের দ্বিতীয় কিস্তির অপেক্ষায় আছি।।
Profile Image for Supratim.
309 reviews459 followers
March 20, 2022
A very poignant read.

The novel deals with many issues including the system of slavery carried out in India by the British. I had read about the British "employed" defenseless Indians as indentured labourers and then sold them off as slaves in the Caribbean Islands and Africa. This is the first novel I have read which focuses on this practice.

Full review to come!
Profile Image for The Bookish Elf.
2,858 reviews443 followers
August 7, 2022
Chronicles of the Lost Daughters, which was originally written in Bengali as "Narach" and has since become a best-selling book, vividly depicts the magnificence and depravity of Bengal during the late nineteenth century under British colonial rule. In the narrative of this novel, many historical figures, including Nawab Wajid Ali Shah, Kadombini Gangopadhyay, and Rabindranath Tagore, make appearances. The plot opens in the year 1885 in Calcutta with Bhubonmoni, a young woman who recently lost her husband. Bhubonmoni decides to leave the village with her brother Krishnoshundor and his family after she is sexually assaulted by two men and becomes a target for other predators in the village. The story follows Bhubonmoni's journey to a new life in the city of Calcutta.

Bhubonmoni's brother, Krishnoshundor Chattopadhyay, is a knowledgeable yet modest and somewhat naïve brahmin who trusts in the principles of the vedas. Unfortunately, when his sister is raped, he and his family, including his sister Bhubonmoni, are compelled to flee the village and find themselves in the hands of Nobokishore Datta, a wealthy, powerful, but crooked trader who would stop at nothing to get his hands on more money. During his visit to their village, Nobokishore approached Krishnosundar with a job opportunity that included a generous salary and made empty promises.

Soon, they find themselves at a depot close to a port, where they will eventually be crammed onto a ship bound for Surinam. Once they get to Surinam, they're going to be sold as slave labour to work on sugarcane plantations there. Bhubonmoni is saved from the depot in the last moments before the ship sails by a relative who also happens to be the spouse of Kadombini Gangopadhyay, the first Indian female doctor. The two daughters of Krishnoshundor do not have such good luck.

The slave trader Nobokishore Dutta has three wives and two mistresses, but he hasn't been able to father a son. A charlatan convinces him that marrying a 10-year-old high-caste girl is the only way out of his predicament. Because Nobokishore belongs to a low caste, he abducts both of Krishnoshundor's little daughters. As a result, Krishnoshundor is forced to make the perilous journey across the ocean with just his wife and their young boy.

The plot then shifts to Chondronath, a young musician in an entirely new neighbourhood of Calcutta. He has travelled all the way to Metiabruz in the pursuit of creating his fortune in this affluent and pleasure-oriented region. The Metiabruz was founded by Nawab Wajid Ali Shah, who had been forced to flee Lucknow because of the British. During this time, Chondronath develops feelings for Moti, a gorgeous singer. Despite the fact that Moti is the Nawab's daughter by one of his mistresses, she is not provided for financial help and is forced to engage in prostitution in order to make ends meet. Chondronath has made it his mission to rescue her, despite the fact that she is the mistress of Nobokishore.

Finally, we see Bhubonmoni thrive in the compassionate home of the Gangopadhyays. Their residence serves as a safe haven for thinkers, social justice warriors, and activists, such as Shourendro, a politically active student. The principles of the Brahmo Samaj have a strong influence on the youthful revolutionary Shourendro. We follow their incredible journeys over a long period as each of them struggles for a life of their own, radically affecting each other's destiny and establishing a complicated connection defined by regret, rebellion, and estrangement.

As the narratives build up to an exciting climax, a few of the characters will suffer loss and sadness, and it is through these trials that they will discover the strength to keep going and a deeper understanding of who they are. Debarati Mukhopadhyay, writing at the peak of her storytelling and creative powers, has crafted a masterpiece that explores themes of hope, courage, the struggle for liberty, and the need to have a voice in the world. Another recurring theme is the metaphorical wings that Bhubonmoni develops as she navigates the ups and downs of life and matures as a result of her encounters with adversity and grief. As she grows into the powerful lady, she was confronted with significant emotional challenges, including the death of her spouse and her dreams, as well as a terrible hatred from society.

The Chronicles of the Lost Daughters is a tale that is both well-written and really enjoyable to read. It has a large number of memorable characters and the atmospheric pull of page-turners, yet it does not compromise depth in favour of overdramatizing the terrifying events that befall upon the protagonists of the story. This is the kind of book that will keep you engaged from the outset and completely absorbed by the time you reach the final page.

The author did a wonderful job featuring powerful women who take the lead in the story and whose struggles for liberation, empowerment, and expression will leave readers feeling moved. This gorgeously written book is a feat of narrative that looks with unblinking eyes at a catastrophic wound in history. The excellent way this story was written commemorates this part of history in such a way that many new generations of readers will get to learn about it.
Profile Image for Khushbu Patel.
156 reviews23 followers
August 19, 2022
Chronicles of the Lost Daughters was an evocative tale that was set at a tumultuous period in history, and Debarati Mukhopadhyay did an outstanding effort of bringing it to life via her narration. Beginning from Bhubonmoni's early life, Chronicles of the Lost Daughters shows how she struggled to come to terms with a system that she couldn't accept and to somehow find her own place in the world, going against all convention and expectations for women in 19th century India. Her story was poignant yet full of life and perseverance.

The main characters were engrossing but the secondary characters were also complex and compelling. The characters, including Bhubonmoni, go on a whirlwind adventure that leads them to greater heights of courage and strength towards the finale. The story was a glimpse of what life was like for a slave, their hopes, dreams, and many hardships.

By mixing fiction with real historical figures like Nawab Wajid Ali Shah, Kadombini Gangopadhyay, and Rabindranath Tagore, the author has created a moving story about women's struggles for liberation, empowerment, and expression. The book is exceptionally well-written with vibrant characters that walk off the pages. I would highly recommend this book to anyone who enjoys historical fiction.
Profile Image for Riju Ganguly.
Author 37 books1,867 followers
April 18, 2021
বাংলার ইতিহাসে ঊনবিংশ শতাব্দী এক চিরন্তন আকর্ষণীয় সময়। এই পোস্ট-মডার্ন সময়ে আমাদের মনে হয়, আলো আর অন্ধক��র, ভালো আর খারাপ— এমন নানা বর্গে খুব সহজেই বিন্যস্ত করা সম্ভব ওই সময় আর তার মানুষদের। বাস্তবে আদৌ তেমনটা ঘটে না, ঘটতে পারে না।
ধর্ম, শ্রেণি, আচার, রাজনীতি, লিঙ্গভেদ— এমন নানা জিনিসের ব্যবহারে সেই সমাজ ও সময়ও দপদপ করে নানা ছবি দেখায়। অজস্র অশ্রুজল আর অভিশাপের সেই জটিল সংকেতের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়, ভেঙে যায়, আবার তৈরি হয় ধাবমান কালের একটা ছবি।
নারাচ সেইরকম একটা ছবিকে স্পষ্ট করে তুলতে চেয়েছে। সেজন্য সে ব্যবহার করেছে কয়েকটি পরস্পর বিযুক্ত চরিত্রকে। তাদের কারও নাম ইতিহাসে আছে, আবার কেউ একেবারেই কাল্পনিক। কিন্তু তাদের কক্ষপথ বারবার মিলেছে কয়েকটি বিন্দুতে, আবার দূরে সরে গেছে।
বোঝাই যায় যে লেখক সচেতনভাবে 'সেই সময়' এবং 'প্রথম আলো'-র মাঝের সময়টিকে জুড়তে চেয়েছিলেন তাঁর মতো করে। সেজন্য তিনি কাহিনিটিকে আন্তর্জাতিক বিস্তৃতি দিয়েও সিক্ত রেখেছেন ক'টি বাঙালি নারীর অশ্রু ও রক্তে— যাতে মুহূর্তের জন্যও আমরা না ভুলি যে এই কাহিনির লক্ষ্য হল পুরুষতন্ত্র।
সেজন্যই এর নাম নারাচ!

বইটি সুলিখিত ও সুমুদ্রিত। তবে এর তিনটি বিশেষত্ব আমার কাছে কিঞ্চিৎ হতাশাজনক ঠেকল।
প্রথমত, কেন্দ্রীয় পরিবারটির বিপর্যয়ের কথা লিখতে গিয়ে লেখক নিজেকে নিরাসক্ত রাখতে পারেননি। বড়ো উপন্যাসে চরিত্রদের ক্ষেত্রে নির্মোহ এবং কিছুটা নির্লিপ্ত ভাব না রাখতে পারলে মুশকিল হয়।
দ্বিতীয়ত, মেটিয়াবুরুজের অংশটা মূল কাহিনির সঙ্গে যুক্ত হয়নি৷ একেবারে আলাদাই থেকে যাওয়ার ফলে ওটার ভূমিকা নিয়ে সংশয় ও অতৃপ্তি থেকে গেছে।
তৃতীয়ত, কাহিনি শেষ হয়নি। একটি অবভিয়াস সিকুয়েলের রাস্তা তৈরি করেই থেমেছে নারাচ। এটা ধারাবাহিক উপন্যাসের ক্ষেত্রে, আর থ্রিলারের ব্যাপারে, আমরা দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু এই উপন্যাস তো সচেতনভাবেই একটা সামূহিক ছবি তুলে ধরতে চেয়েছিল। সেই জায়গায় এই সিকুয়েলের হুক অপ্রাপ্তির কারণ ঘটায়।
ইতিহাসের পাঠক হয়তো বইটির মধ্যে কিছু তথ্যগত ভ্রান্তি পাবেন৷ মূল কাহিনির রসাস্বাদনে বাধা না ঘটালেও সেই চ্যুতিগুলো লেখকের নজরে আনলে পরবর্তীকালে সেগুলো শুদ্ধ করে নেওয়ার সুযোগ হয়। তাই তাঁদের উদ্দেশে সেই অনুরোধ রাখব।
লেখকের উদ্দেশে শুভেচ্ছা জানাই। ইতিমধ্যে, যদি ঊনবিংশ শতাব্দীর কলকাতা তথা বাংলা নিয়ে আগ্রহী হন, তাহলে এই বইটি অবশ্যই পড়ে দেখতে পারেন।
Profile Image for Dipalee Joshi.
111 reviews
August 19, 2022
Taking a fragment of history and basing a narrative on it has been increasingly popular over the past few decades. This is a concept that appeals to me, particularly when it is executed skillfully. Debarati Mukhopadhyay has demonstrated her prowess as an author with her work in Chronicles of the Lost Daughters. Her novel is powerful, intense, profound and amazing in every way.

Chronicles of the Lost Daughters takes place in the 1800's and the story starts in Calcutta, India. The story centres on Bhubonmoni, a young woman who has just recently been widowed, as well as the people in her life and the community. During her amazing journey over the following few years, she strives for a life of her own, influencing the fates of both herself and the people around her, and developing a complicated relationship that is distinguished by guilt, resistance, and the ultimate tremendous act of courage.

Author Debarati Mukhopadhyay has created very in depth characters and well researched and documented events. Debarati’s accomplishments here are myriad, but a few of the primary ones are the creation of vibrant perspectives, the seamless interweaving of historical figures and events into a fictional narrative, and a careful rendering of the passage of time. I highly recommend this novel!
Profile Image for Khushi Gadhiya.
115 reviews10 followers
August 19, 2022
This inspiring historical novel provides a story filled with emotion that can serve as a reminder that others have gone before us who worked for equality and justice. Perhaps it can give us the strength to continue with the work remaining.

The protagonist of this tale is a young woman named Bhubonmoni who, following the incidence of an unimaginable tragedy that affects the entire family, is compelled to leave her hometown together with her brother Krishnoshundor and his family. The author, Debarati, did an excellent job bringing this tale to life. It covered a wide range of subjects and events spread out over a long period of time, and I felt that it made for really interesting reading!

The author, Debarati Mukhopadhyay, has crafted an incredible tale based on the lives of several remarkable women. Even though none of the brutality or unfairness depicted in the novel shocked or startled me in any way, I was still filled with outrage and anger about it. I was completely submerged in the lives of these remarkable women. I cannot speak highly enough of this book. You will find that you have been transported to the 19th century, and you will get completely immersed in the stories of a number of absolutely incredible women.
Profile Image for Shotabdi.
819 reviews199 followers
December 12, 2020
টাইটানিকডুবির সিকি শতাব্দী কাছাকাছি সময়ে কলকাতা থেকে পুরীগামী একটি জাহাজ ঝড়ের কবলে পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং মারা যান প্রায় ৭০০ যাত্রী। ঘটনাটি জানতে পেরে বিস্মিত লেখিকা এই মর্মান্তিক বিষয়টিকে উপজীব্য করে একটি উপন্যাস লেখার কথা ভাবেন৷ ফলশ্রুতিতে রচিত হয় লৌহ নির্মিত বাণ- নারাচ।
যখন সেই সময়-প্রথম আলো- পূর্ব পশ্চিম পড়ি, কোনদিকে তাকাতাম না। লাগাতার পড়ে যেতাম, হাত থেকে রাখার উপক্রম হয়নি। এই বইটি সেই ট্রিলজির সমান না হলেও, কিছুটা ওই সময়কে মনে করিয়ে দিতে পেরেছে, লেখিকার স্বকীয়তা সম্পূর্ণ বজায় রেখে। উপন্যাসটির অন্যতম সার্থকতা এখানে৷ অনেকদিন পর সম্পূর্ণ ডুবে গিয়ে কোন একটা উপন্যাস শেষ করলাম।
কী আছে নারাচে? লেখিকা যেহেতু নারী, তাই তিনি নারীদের অবস্থানটা সেই যুগসন্ধিক্ষণে কেমন ছিল তা যেমন ভালো অনুধাবন করেছেন, তেমনি সাবলীল কলমের দাগে ফুটিয়েও তুলেছেন৷
রামমোহন-বিদ্যাসাগর এর পর দ্বারকানাথ গাঙ্গুলি অদম্য চেষ্টা করছেন নারীদের অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে, কিন্তু রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের তরফ থেকে আসছে বাধা। ঘরের স্ত্রী এবং দাসের মধ্যে কোন তফাৎ নেই, নারীদের উচ্চশিক্ষা নিষিদ্ধ বা বেদ পাঠ নিষিদ্ধ এমন কুসংস্কার তখন সকল রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারে জাঁকিয়ে আছে৷ ব্রাহ্মরা চাইছেন একটি পরিবর্তন ঘটাতে, বাধা আসলেও দমে যাচ্ছেন না। সহবাসের বয়সসীমা কেবল ১০! তা থেকে বাড়িয়ে ১২-১৪ করার জন্য আন্দোলন চলছে।
উপন্যাসের শুরুতেই কৃষ্ণসুন্দর নামে এক ব্রাহ্মণ একঘরে হয়ে পড়েন কারণ, খবর পাওয়া যায় যে তাঁর দাদা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন৷ এদিকে তাঁর বিধবা ছোট বোন ভুবনমণিকে ভিনদেশী দুর্বৃত্তরা করে বলাৎকার। এর প্রতিকার হিসেবে পুরোহিত সমাজের নিদান আসে কোন এক সদব্রাহ্মণ দ্বারা এক মাস ভোগ্যা হলেই, তার দোষ কাটবে! এহেন পরিস্থিতিতে তেজস্বী স্ত্রী ব্রহ্মময়ী, ছেলে দিব্যসুন্দর, দুই মেধাবী মেয়ে অপালা আর লোপামুদ্রাকে নিয়ে দেশান্তরী হন কৃষ্ণসুন্দর। কিন্তু, বিধিবাম! পড়েন মজুরব্যবসায়ীদের হাতে, ফলশ্রুতিতে অকথ্য অত্যাচার আর সুদূর সুরিনামে গিয়ে আখ ক্ষেতে শ্রমিকের কাজের সাথে সাথে চাবুক জুটে কপালে। এর মধ্যেই পঞ্চাশোর্ধ বেনে নবকিশোর দত্তের কুচক্রে হারান দুই মেয়ে আর বোনকে।
বোন ভুবনমণি আশ্রয় পান তাঁদের দূরসম্পর্কের দাদা দ্বারকানাথ গাঙ্গুলির বাড়িতে, আর অপালা আর লোপামুদ্রার স্থান হয় নবকিশোর দত্তের বাড়িতে, ওই মজুরব্যবসার অন্যতম মালিক । অপালা চতুর্থ স্ত্রী হতে বাধ্য হয় নবকিশোরের।
এদিকে মেটিয়াবুরুজ আলো করে রেখেছেন লখনৌ এর শেষ নবাব, ওয়াজিদ আলী শাহ, যিনি গান গাইতেন পাখির মতো। ছিল বিখ্যাত এক চিড়িয়াখানাও তাঁর। সেখানেই চন্দ্রনাথ বলে এক সঙ্গীতপিপাসু এসে কাহিনীর মোড় ঘুরিয়ে দেয় অন্যদিকে। কাফি খাঁ, বুলবুল মিয়া কিংবা মোতির জীবনকাহিনী উন্মোচিত করে একের পর এক রহস্য।
প্রধানত এই দুই ধারায় বয়ে চলা উপন্যাসটিতে অনেক খানি জায়গা জুড়ে রয়েছেন বাংলার প্রথম প্রাকটিসিং নারী চিকিৎসক কাদম্বিনী গাঙ্গুলি, তাঁর দৃঢ়তা এবং সাংসারিক জীবনের একটা সুন্দর ছবি পাওয়া গেছে। এসেছেন রবীন্দ্রনাথ, উপেন্দ্রকিশোর, স্বল্প ব্যপ্তিতে৷
কাহিনীটা কাল্পনিক হলেও এতে তৎকালীন সমাজব্যবস্থা, ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক অবস্থার পরিচয় ফুটে উঠেছে।
কালে কালে পরিবর্তন এসেছে, নারীরা হয়েছেন সাহসী। ভুবনমণি, দয়াময়ী কিংবা সৌরেন্দ্রর মতো অনেক অজানা নাবিক নিশ্চয় ছিলেন সেই দুর্গম সাগরানুসন্ধান্ব।
তবুও স��ম্প্রদায়িকতা, নারীদের অবমাননা বা বিবাহপরবর্তী জোরপূর্বক সহবাসের মতো কয়েকটি বিষয় তো আজও প্রাসঙ্গিক। আজো নারীরা সম্পূর্ণভাবে মানুষ হিসেবে যোগ্য সম্মান পান না। মনুসংহিতার অসার বাণী আজো কত মানুষের মগজে কিলবিল করছে!
মাত্র ৩০ বছর বয়স লেখিকার, উপন্যাসটি লেখার সময় আরো বছর চারেক কম ছিল বয়স। ঘটনাপ্রবাহ এমনভাবে এগিয়েছে যে মাঝে মাঝে থ্রিলার উপন্যাসের মতো রুদ্ধশ্বাসে পরবর্তী কাহিনী জানার জন্য উদগ্রীব হয়েছি। কয়েকটি ঘটনার শেষ হয়েছে আনন্দে ভাসিয়ে আর কয়েকটি ঘটনা এমন বেদনাতুর করেছে, যেন সত্যিই আমি ওই সময়ে উপস্থিত হয়ে অবলোকন করছি ব্যথাটা।
লেখার কৌশলটা তার নিজস্বতা বজায় রেখেছে, এই চর্চিত সময় নিয়ে লিখিত অন্যান্য উপন্যাসের অনুকরণ মনে হয়নি মোটেও।
এই সময়ে দাঁড়িয়ে দেবারতির কাজ তাই আশা জাগায়। ভবিষ্যতে আরো অনেক ভালো কিছু পাবার আশা।
Profile Image for   Shrabani Paul.
395 reviews23 followers
April 27, 2023
⛵🌼বইয়ের নাম - নারাচ🌼⛵
✍🏻লেখিকা - দেবারতি মুখোপাধ্যায়
🖨️প্রকাশক - পত্রভারতী
📔প্রচ্ছদ - রঞ্জন দত্ত
📖পৃষ্ঠা সংখ্যা - 304
💰মূল্য - 385₹

🛒🛍️ Book Buy Amazon Link 🔗 https://amzn.to/41KCDxw

🙋👩‍🦰 Follow My Instgram Page👇
https://instagram.com/bookreader_shra...

🙋👩‍🦰Follow My Goodreads Page 👇
http://WWW.goodreads.com/book_reader_...


🎋🍁সদ্য পড়ে শেষ করলাম লেখিকা দেবারতি মুখোপাধ্যায় এর লেখা “নারাচ”! লেখিকার লেখা আগেও পড়েছি “ডাকাত রাজা” পড়ে আমার দারুন লেগেছিলো। এই বই এর প্রচ্ছদটি ভীষণ সুন্দর। এই বইয়ের Page Quality বেশ ভালো। লেখিকার লেখা যতোই পড়ছি আরো আরো পড়তে ইচ্ছে করছে। এক দুর্দান্ত উপন্যাস। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে রচিত এই উপন্যাস।শুরু করলে শেষ না করে ওঠা যাবে না,
পাঠকদের উদ্দেশে বলব অবশ্যই উপন্যাস টি পড়ুন।
এবার আসি উপন্যাস এর কথায় -
উপন্যাসে কৃষ্ণসুন্দর নামের এক গ্রাম্য পন্ডিত ব্রাহ্মণ ও তার পরিবারকে ঘিরে এই উপন্যাস।
এই সেই উনবিংশ শতক, যখন নবজাগরণের আলোয় উদ্ভাসিত হচ্ছে বঙ্গদেশ। আবির্ভূত হচ্ছেন জ্যোতিষ্করা। কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় মেয়েদের অধিকারের জন্য লড়াই করছেন...নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ্ মেটিয়াবুরুজে একটুকরো লক্ষ্ণৌ গড়ে তুলছেন! আবার এই সময়েই হাজার হাজার অসহায় প্রান্তিক মানুষ চালান হয়ে যাচ্ছে ল্যাটিন আমেরিকার নানা দেশে , ক্রীতদাস রূপে কাজকর্ম করার জন্য। সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এই কাজ চলছে, এই সময় কৃষ্ণসুন্দর ও তার পরিবার এই পরিস্থিতির শিকার হয় ।
পরিবারে রয়েছে কৃষ্ণসুন্দর কৃষ্ণসুন্দরের স্ত্রী এবং তার একমাত্র বিধবা বোন এবং তার দুই মেয়ে। গ্রামের এক আড়কাঠির কথায় কাজের সন্ধানে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। কিন্তু সেই সময় তিনি জানতেও পারেন না যে , এক অপরাধ মূলক কাজের তিনি স্বীকার হতে চলেছেন। এই বই এর দ্বিতীয় পার্ট আসবে, অপেক্ষায় রইলাম। লেখিকাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এতো সুন্দর একটা উপন্যাস পাঠকদের উপহার দেওয়ার জন্য।🍁🎋


🌼 কাছের মানুষ কাছে থাকলে তার অভাব বোঝা যায় না। বোঝা যায় তার অনুপস্থিতিতে।
Profile Image for Syeda Banu.
99 reviews51 followers
September 22, 2020
'নারী নরকের দ্বার'।

যে বাক্য এই যুগেও এখানে সেখানে শুনি, সেটা সেই উনিশ শতকে আরো ভয়ংকরভাবে যে চেপে ছিল সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, তা বলাই বাহুল্য। বিদ্যাসাগর বালিকাদের স্কুলের গাড়িতে লিখে দিয়েছিলেন মহামন্ত্র - 'কন্যাপ্যেবং পালনীয়া শিক্ষণীয়াতিযত্নতঃ, কন্যাকেও পুত্রের মতো যত্নের সাথে শিক্ষা দাও, পালন করো।

কিন্তু বাস্তব? একেবারেই ভিন্ন। স্ত্রীশিক্ষা স্বামীর মৃত্যুর কারণ, শিক্ষিত নারীর পুত্রসন্তান লাভের সৌভাগ্য হয় না, পুরুষের সেবাই তার কর্তব্য। আদিযুগের ঐতিহ্য ভুলে, শাস্ত্রকে বিকৃত করে এমন সব ধারণা চাপিয়ে দিতেন পুরুতঠাকুররা, বিশ্বাস করতেন নারীরাও।

তারমধ্যেও কৃষ্ণসুন্দর চট্টোপাধ্যায়ের মতো শিক্ষিত ব্রাহ্মণ ছিলেন। যিনি গাঁয়ে থেকেও দুই কন্যা অপালা- লোপা ও বিধবা বোন ভুবণমণিকে শিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখতেন। সমাজের চাপের কাছে তাঁর সেই স্বপ্ন অতি ক্ষুদ্র। বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আইন পাশের ত্রিশ বছর হয়ে গেছে, তাও ভুবনমণিকে বিয়ে দেওয়ার চিন্তা কেউ মাথায়ও আনেনি।

যেদিন ভুবনমণির সম্ভ্রমহানি ঘটালো দুই ভীনদেশী যুবক, পন্ডিত ব্রাহ্মণ পাঁচকড়ি মুখুজ্জে শাস্ত্র ঘেঁটে নিদান দিলেন - সদ্বংশজাত ব্রাহ্মণের পরম সেবায় নিয়োজিত হলেই ভুবনের দূষিত দেহ শুদ্ধ হবে। ধর্ষিতা বোনকে কামলোলুপ বৃদ্ধের অঙ্কশায়িনী হওয়া থেকে বাঁচাতে পারতেন না হয়তো কৃষ্ণসুন্দর। বিপন্ন মানুষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরে। সরকারী চাকরীর আশ্বাস আর বোনের বিপদের তাগিদে পরিবার নিয়ে আড়কাঠি হরিহরের সাথে গ্রাম ছাড়লেন কৃষ্ণসুন্দর। মশাট গ্রাম থেকে পৌঁছে গেলেন নবদত্তের ডিপোতে। জানলেন আগুনে ঝাঁপ দিয়েছেন। নামেমাত্র শ্রমিক, আদতে ইংরেজ সরকারের দাস হয়ে পাড়ি দিতে হবে দক্ষিণ আমেরিকায়। কন্যাদের তুলে নিয়ে গেল দত্তবাড়িতে, সৌভাগ্যক্রমে ভুবনমণির ঠাঁই হলো দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের আশ্রয়ে কলকাতায়।

কলকাতার তখন বহুরূপ, কোথাও মেটেবুরুজে লক্ষ্ণৌয়ের নবাব ওয়াজেদ আলী সাজিয়েছেন আনন্দনগরী। কোথাও রয়েছে নবকিশোর দত্তের বাড়ির মতো অন্ধকার অন্দরমহল। সেই অন্দরে স্ত্রীরা আলোর মুখ দেখে না, কেবল পুত্রসন্তান প্রসবের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার চেষ্টা করে যায়। এরমধ্যেই জেগে উঠছে কলকাতা, দ্বারকানাথ, দুর্গামোহনদের মতো মুক্তমনারা লড়ে যাচ্ছেন নারীমুক্তির জন্য। কাদম্বিনী বসুর মতো আলোকবর্তিকা নারী ডাক্তার হিসেবে নিজের যোগ্য সম্মান পাবার জন্য যুদ্ধ করছেন। অন্যদিকে ধনঞ্জয় বাক্যবাগীশ ও অন্যান্য শাস্ত্রজ্ঞরা গৌরিদান না হওয়া নারী মাত্রই যে ভ্রষ্টা তা প্রমাণ করছেন মনুসংহিতা ঘেঁটে।

উনিশ শতকের কলকাতার ও বাঙ্গালীজাতির অজানা নানাদিক উঠে এলো 'নারাচ' উপন্যাসে। মেটিয়াবুরুজের একটুকরো লখনৌয়ের এতো জীবন্ত বর্ণনা, গিরমিটওয়ালা শ্রমিকরূপী দাসদের করুণকাহিনী একেবারেই জানা ছিল না। দাস বলতে আমরা কেবল আফ্রিকার আদিবাসীদের কথাই জানি। এই ভারতবর্ষ থেকে মিথ্যে বলে, ঠকিয়ে, চুক্তিনামায় টিপসই নিয়ে হাজার হাজার গাঁয়ের লোককে নিয়ে যাওয়া হতো দক্ষিণ আমেরিকায় আখচাষ করতে, তাদের কথা দেবারতিই বললেন। জানলাম স্যার লরেন্স জাহাজের সম্পর্কে - সাড়ে সাতশো মানুষ জলের গর্ভে হারিয়ে গেল, ইতিহাস যাদের ভুলে গেল স্রেফ 'নেটিভ' বলে।

'নারাচ' নারীজাগরণের গল্প, তার অন্যতম মূল চরিত্র ভুবনমণি। গ্রাম থেকে আসা বিবধার মাত্র ছ'মাসে লেখাপড়ার এতো উন্নতি যদিও একটু রঙ চড়ানো ছিল। তবে নারীমুক্তি আন্দোলনের রূপক 'নারাচ' অস্ত্র সে-ই, যার মধ্য দিয়ে দৃঢ়তা, সংকল্প, আশা ফুটে ওঠে। নারাচ-রূপী কাদম্বিনীও, যাঁর যোগ্যতাকে বারবার অস্বীকার করা হয়েছে 'নারী' হওয়ার দোষে, যে চরম অবিচারের জন্য তিনি তার সন্তান হারিয়েছেন। তবু দমে যাননি। চন্দ্রনাথ, বুলবুল মিয়া, সৌরেন্দ্র, দয়াময়ীর মতো শক্তিশালী চরিত্র তো বটেই, বাদলের মা'র ছোট্ট চরিত্রের উপস্থিতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। লখনৌয়ের শেষ নবাবকে অকর্মণ্য-অযোগ্যই জানতাম, 'আখতার পিয়া' তাঁর চরিত্রের এক ভিন্ন রূপ দেখালেন নারাচে।

দাসপ্রথার গা শিউরানো দৃশ্যায়ন দিয়ে যেভাবে উপন্যাসটি শুরু হয়েছে, প্রথম থেকেই বইটির সাথে আটকে যাওয়া ছাড়া আর উপায় ছিল না। ডিপোর নির্মম অত্যাচার, চন্দ্রনাথের প্রেম, অপালার পরিণতি, ভুবনমণির জীবনের গল্পগুলোর সাথেই বাস করছিলাম দুদিন। চরিত্র পরিচয়ের 'ক্লু'গুলো ও টানটান ক্লাইম্যাক্সকে মুন্সিয়ানার সাথে সাজিয়েছেন লেখিকা

পটভূমিতে তো বটেই, বিভিন্ন উল্লেখ, বর্ণনা ও ভ��ষায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'প্রথম আলো'র সাথে দেবারতি মুখোপাধ্যায়ের 'নারাচ'র তুলনা চলেই আসে। সুনীল তার প্রথম আলোতে যেমন বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে সম্পর্ক ঘটাতেন, নারাচেও তেমনি দূরদেশে কোনো স্থানে দেখা হয় আমাদের গল্পে পূর্বচেনা কোনো চরিত্রের সাথে। এইসব তুলনা আসলে কোনো দূর্বলতা নয়, বরং এক বয়সে যেমন নেশাগ্রস্তের মতো প্রথম আলো পড়েছিলাম, সেই আবেশ নতুন করে রোমন্থন করলাম নারাচের ম��ধ্যমে। সত্যি বলতে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যে ব্যাপ্তি নিয়ে নবজাগরণের কলকাতাকে তুলে ধরেছেন 'সেই সময়- প্রথম আলো'তে, তাঁর সৃষ্টি যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, তা থেকে কোনো লেখকের বা পাঠকের বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব। না চাইতেও তাই এই উল্লেখটা এসেই যায়। তবে দেবারতি রবীন্দ্রনাথ, কাদম্বিনী, দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো বাস্তব চরিত্রগুলোকে নিয়ে খুব বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করার ঝুঁকি নেননি। তাঁদের ইতিহাস-ভিত্তিক হিরোইজমটাই তুলে ধরেছেন কেবল। তথ্যবহুল হওয়া সত্বেও গল্পের গতি কমেনি, কিছু ক্ষেত্রে মনে হয়েছে সরাসরি ইতিহাস থেকে ন্যারেট না করে গল্পে ছায়া ফেলা যেত তথ্যগুলোর৷

'নারাচ' এর ঘোর কাটতে আমার সময় লাগবে৷ বুক চেরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে শেষ করলাম বইটি, আর পথ চেয়ে রইলাম এর দ্বিতীয় পর্বের জন্য।

বই: নারাচ
লেখক: দেবারতি মুখোপাধ্যায়
প্রকাশনায়: পত্রভারতী
প্রকাশকাল: অগাস্ট ২০২০
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: রঞ্জন দত্ত
মুদ্রিত মূল্য: ৩৮৫ রূপী
Profile Image for Rizal Kabir.
Author 2 books45 followers
January 30, 2021
ঐতিহাসিক উপন্যাস বরাবরের মতই আমার একটা দুর্বলতা। তাই বিষয়বস্তু নিয়ে সামান্য ঘাটাঘাটি করে আর সুন্দর প্রচ্ছদ দেখেই কিনে ফেললাম ‘নারাচ’। দেবারতি মুখোপাধ্যায়ের লেখা আগে পড়ি নি, তবে নারাচ পড়ে মুগ্ধ হলাম। ইতিহাস নিয়ে নাড়াচাড়া করে বই লিখতে যে পরিমাণ গবেষণা করতে হয় তা তিনি করেছেন নিষ্ঠার সাথে – লেখা পড়েই বোঝা গেছে সেটা।

বেশ কিছু জায়গায় সময় ও কালভিত্তিক আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার হয়েছে আবহকে জোরদার করতে। হিন্দি অংশগুলো বুঝতে পারি নি অনেক জায়গায়, এটা আমার জন্য একমাত্র নেগেটিভ অংশ এই বইয়ের। তাছাড়া শাস্ত্রীয় সংস্কৃতি, শ্লোকের রেফারেন্স ছিল প্রচুর। আরেকটু কম হলেও বোধ হয় ক্ষতি ছিল না। আর সমাজের প্রাচীন রীতির বিরুদ্ধে বিদ্যাসাগর, তর্কাতঙ্কার, মনোমোহন ঘোষদের সংগ্রামের পটভূমিগুলো খুবই ভাল লেগেছে।

একাধিক গল্প সমান্তরালে চলেছে এই উপন্যাসে। বুদ্ধিদীপ্ত এবং চমকপ্রদ যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে কাহিনীগুলোর। লেখার ধরণ এবং কাহিনীর বুনন – কোথাও একঘেয়ে মনে হয় নি একবারো। গৃহ্যসূত্র কিংবা মনুসংহিতার কদর্য রীতি এবং সমাজপতিদের লালসার সামনে সমাজের প্রতিটি স্তরে মেয়েদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের চিত্র উঠে এসেছে এই উপন্যাসে বারবার। ‘অষ্টবর্ষা ভবেদ গৌরী’র নামে শৈশবেই বিয়ের শৃঙ্খলে মেয়েদের জীবনে নেমে আসা দুর্ভোগ, নির্যাতনে একচোখা সমাজে সংঘটিত হতে থাকা অমানবিকতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয়েছে। হতাভাগী অপালাকে বুকে জড়িয়ে নবকিশোরের স্ত্রী’ দয়াময়ীর কান্নাজড়িত সেই কথায় আমিও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম ক্ষণকালের জন্য -
মরেচিস তো সেদিন যেদিন মেয়েমানুষ হয়ে জন্মেচিলি মুখপুড়ি! আবার নতুন করে কী মরবি!

ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের দুইশ’ বছরের শোষণ নিঃসন্দেহে আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আরেকটা ব্যাপার হলো, সনাতন বাঙালীসমাজ নিজেরাও নিজেদের অধঃপতনের জন্য কম দায়ী নয়। যুগ যুগ ধরে যার মূল হাতিয়ার ধর্ম, মৌলবাদ, অশিক্ষা –
এবং যা নানাভাবে রূপ বদলে টিকে আছে আজকের দিন পর্যন্ত। কলোনীর শাসক হয়েও ইংরেজরা সেটি অনুভব করেছিল।
কিন্তু ব্রিটিশ সরকার দ্বিধাগ্রস্থ। যারা নিজেরাই নিজেদের ভালো চায় না, আলোকপথে হাঁটতে চায় না, বিদেশি শাসক হিসাবে তাদের কী দায় পড়েছে তেমন সমাজের সংস্কার করার?

চরিত্রের সংখ্যা একদম কম না হলেও, সবাইকেই বেশ যত্ন করে গড়ে তুলেছেন লেখক। এজন্যই পড়তে গিয়ে ভালবাসা এবং ঘৃণা দুটোই অনুভব করতে পেরেছি। ইনডেনচার এর নামে ভারতীয় নেটিভদের ওপর শাসকদের নির্যাতন, স্যার জন লরেন্সের মর্মান্তিক পরিণতি – সবকিছুকে একসূত্রে বাঁধা হয়েছে।

মেটিয়াবুরুজ ছিল কলকাতার বুকে একখণ্ড আনন্দনগরী – অযোধ্যার নবাব ওয়াজেদ আলী শাহকে কেন্দ্র করে এখানেও বিস্তৃত হয়েছে উপন্যাসের গল্প। নামেমাত্র নবাবী হলেও - রসিক, প্রেমিক এবং আবেগী এক সম্রাটের প্রভাবে উন্মুক্ত বাধাহীন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে সেখানে। অপরদিকে দ্বারকানাথ এবং তার স্ত্রী কাদম্বরীর অসামান্য সংগ্রাম এবং উপমহাদেশে ব্রাহ্ম সমাজের আবির্ভাবে উপমহাদেশে চলতে থাকে এক বিপ্লব। দ্বারকানাথের ছত্রছায়ায় আলোয় উদ্ভাসিত হতে থাকে বেশ কিছু চরিত্র। উপন্যাসে এর মাঝেই হুটহাট দেখা মেলে তরুণ রবীন্দ্রনাথ, উপেন্দ্রকিশোর কিংবা জগদীশচন্দ্রের।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগের রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় চিন্তাচেতনা, সামাজিক বিধি-বিধান এই উপন্যাসের পরতে পরতে থাকলেও, দিনশেষে সবচেয়ে বড় হয়ে প্রতীয়মান হয়েছে মানবিকতা। যার আলো কলকাতা থেকে পৌঁছেছে দক্ষিণ আমেরিকার কলোনী সুরিনামেও। তীব্র শ্রেণীবৈষম্যের সমাজেও কখনো কখনো মানবিকতার স্পর্শে গৌণ হয়ে পড়েছে জাতবিভেদ।

সার্থক ঐতিহাসিক উপন্যাসে যা যা প্রয়োজন প্রায় সবকিছুই রয়েছে ‘নারাচ’এ। দুয়েক জায়গায় সুনীলের ছাপও পেয়েছি। দেবারতি মুখোপাধ্যায় একেবারেই সমসাময়িক লেখক হলেও লেখার ধরণ যথেষ্ট পরিপক্ক মনে হয়েছে। কম্পিউটার সায়েন্সে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েও কাঠখোট্টা বাইনারী-অ্যালগরিদম থেকে বেরিয়েছেন তো বটেই, নারাচ-এর মত বইও লিখে ফেলেছেন। ইতিহাসকেন্দ্রিক গল্প বলার পাশাপাশি আকর্ষীর মত পাঠককে টেনে ধরে রাখার যথেষ্ট উপাদান আছে এই বইয়ে। শুরু করার পর তাই বিস্তৃত কাহিনীর বইটি শেষ করতে সময় লাগে নি আমার –

এবং নিঃসন্দেহে, চমৎকার সময় কেটেছে।
Profile Image for Aparna Thaker.
102 reviews10 followers
September 13, 2022
In Chronicles of the Lost Daughters, Debarati Mukhopadhyay takes a piece of history from 19th-century India and weaves a story. I have read a few stories about this time in our history, but with each new book, I learn something new. The story follows Bhubonmoni's early life, her struggles after the death of her husband, and subsequent relocation to the city of Calcutta, where she starts a new life.

This is a story of strong and real women who have doubts, desires, and dreams and who have never given up, even in the worst circumstances of their lives. The characters are so real, and the writing is just wonderful. I felt the entire rainbow of emotions while reading this. And for a book that tackles topics like slavery and torture, it won't make you miserable.

Debarati Mukhopadhyay has a fascinating way of weaving a tale, one about people and their place in the world, how they connect with one another, and how they contribute to change. Everyone who has a better sense of justice and freedom in their hearts should read this narrative since it is a clear manifest addressed to them. This is an absolute must-read, a slice of history blended with fiction that brings back these largely forgotten yet famous in their day women who quite literally changed the world for the better.
Profile Image for Paromita Ghosh.
33 reviews23 followers
April 13, 2023
প্রথমেই নারাচের পরিচয় দেয়া যাক। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ব্যবহৃত লোহার অস্ত্র, অর্থাৎ নরকে গ্রাস করে যে, তাই নারাচ। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে এই নারাচ ব্যবহৃত হয়েছিল শতাধিক দুষ্কৃতি কারীর প্রান নাশের জন্য।

নারাচ উপন্যাসটি রচিত হয়েছে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থ্যার সাম্রাজ্য এবং ব্রাহ্মণদের দুরাচার কে ঘিরে। ব্রিটিশদের নির্মম দাস প্রথা, প্রতারনা, নারীদের প্রতি ব্রাহ্মণদের ও সমাজের অবিচার, লোলুপতা, ঋতু্চক্রে পদার্পনের পূর্বেই স্বামীর সহবাস, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, ধর্ষিত নারীকে তার পাপ খন্ডনের জন্য একাধিক কাল ব্রাহ্মণ কতৃক ধর্ষণের শিকার হতে বাধ্য করা -এই সব বিষয় সকলের সামনে তুলে ধরেছেন লিখিকা দেবারতি মুখোপাধ্যায়। উপন্যাসে আরো ছিল ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম মহিলা ডক্টর কাদম্বীনির কথা, কিঞ্চিৎ বিদ্যাসাগর আর রবির কথা।

সমাজের সকল নরপিশাচ আর দুষ্কৃতিকারীকে রুখতে দরকার একেক্টা 'নারাচ' অস্ত্র।আর তার জন্য সমাজের প্রত্যেকের একেকটি নারাচে পরিনত হতে হবে যা লিখিকা এখানে মুক্তির পথ হিসেবে নির্দেশ করেছেন।
Profile Image for Ayshika Karmakar.
10 reviews4 followers
May 27, 2022
ভালো উপন্যাস পড়ার পর অনেকদিন তার প্রভাব থেকে যা���় জীবনে। ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারি না। 'নারাচ' হলো এমনই একটি উপন্যাস। মুগ্ধতা কাটবে না। নারী হিসাবে এই জেনে মুগ্ধ হই, আজ যে মাটিতে আমি দাঁড়িয়ে আছি, যে তথাকথিত 'স্বাধীন নারী' হিসাবে দাঁড়িয়ে আছি তার তলদেশে লুকিয়ে আছে অগণিত ইতিহাস, কতো লড়াই, কতো সংগ্রাম। সেই ইতিহাস বেশি পুরোনো নয়-১৮৮৭ সাল। শিহরিত হই! অতীতের সেই 'নারাচ'-এর মতো মানুষদের প্রণাম জানাই। 'নারাচ' উপন্যাসটি একটি রিসার্চড ওয়ার্ক, যেটি ফিকশনাল মাধ্যমে উপস্থাপিত করেছেন লেখিকা দেবারতি মুখোপাধ্যায়। লেখিকাকে আমার বিনম্র শ্রদ্ধা আর 'নারাচ'-এর দ্বিতীয় খণ্ড দ্রুত প্রকাশের অনুরোধ রইলো।
Profile Image for Deepta Sen.
76 reviews1 follower
May 27, 2023
"নারাচ বরিষে কর অতি খরসান,
অর্ধচন্দ্র ক্ষুরপাদি আর নানা বাণ"

সময়টা ১৮৮৫ এর আশেপাশেই। সময়ের হিসেব করলে মনে হতে পারে রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগরের ছোঁয়ায় উদিত বেঙ্গল রেনেসাঁসের সূর্য বুঝি দিকচক্রবাল ছেড়ে মাঝআকাশে, কিন্তু বাস্তবতা হলো অন্দরমহলের অসূর্যম্পশ্যা কক্ষগুলোতে তখনো রেনেসাঁসের আলো ঢোকে নি। অশিক্ষা, কুসংস্কারের চোরাবালিতেই আটকে ছিল নবজাগরণের স্রোত। সময়টা ঝড়োমেঘের। সিপাহি বিপ্লবের ব্যর্থতা ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তিমূল জোরালো করেছে, পাশ্চাত্য শিক্ষা জাঁকিয়ে বসছে, সচেতন সিভিলিয়ানরা গড়ে তুলেছে কংগ্রেস। সমাজে রক্ষণশীলদের সাথে ঝুঝছে প্রগতিশীলরা, সংস্কার পাঞ্জা লড়ছে কুসংস্কারের সাথে। এহেন সময়ে তিনটে অসমান্তরাল ঘটনা ঘিরে নারাচের পথচলা। আমার চোখে দিন, ছায়াবৃত্ত, রাত । এর এক অংশে কৃষ্ণসুন্দর ও তার ভাগ্য বিপর্যয় (রাত), আরেক অংশে দ্বারকানাথ ও তাঁর স্ত্রী কাদম্বিনী (দিন), অন্যাংশে মেটিয়াবুরুজের নবাব ওয়াজেদ আলী, চন্দ্রনাথের গল্প (ছায়াবৃত্ত)। আর তিনটে গল্পকে যুক্ত করেছে গল্পের ভিলেন নবকুমার দত্ত।

"মানবসভ্যতার একেবারে আদিযুগ থেকে না হলেও দাসব্যবস্থার নিদর্শন পাওয়া যায় দশহাজার বছরেরও বেশি আগে, সেই নব্যপ্রস্তরযুগে, যখন মানুষ সবে কৃষিকাজ শিখছে। যিশুখ্রিষ্টের জন্মের প্রায় দেড়হাজার বছর আগে ব্যাবিলনীয় সভ্যতার হামুরাবি আইনেও ক্রীতদাসকে পলায়নে সহায়তার শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের উল্লেখ রয়েছে।"
১৮৩৪ সাল নাগাদ সারা পৃথিবীতে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হয়। কিন্তু ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ব্রিটিশ উপনিবেশের ফুলবাগান গুলোতে বাড়ছিল শ্রমিকের চাহিদা। ইংরেজ সরকার নতুন বোতলে পুরানো মদ বিক্রির উপায় বের করলো গিরমিট নামক এক চুক্তিপত্রের মাধ্যমে। সরকারের তরফ থেকে নিযুক্ত এজেন্টরা তার সাব-এজেন্টদের মাধ্যমে ধরে আনতো অশিক্ষিত, ভগ্নপ্রায় মানুষদের ধরে আনতো অর্থের লোভ দেখিয়ে। যতই আইন থাকুক, বাগানমালিকেরা ঠিক দাসের দৃষ্টিতে দেখতেন এসব শ্রমিকদের। নবকুমার দত্ত এই কাজে সরকারী লাইসেন্সধারী এজেন্ট, সেই সাথে অযোধ্যার নির্বাসিত নবাব ওয়াজেদ আলী শাহের চিড়িয়াখানায় পাচার করা বন্যপ্রাণী সরবরাহ করার কাঁচা পয়সা তার হাতে। বেঙ্গল রেনেসাঁস সমাজের একটা শ্রেণীকে আলোকিত না করলেও, কাঁচা টাকার সন্ধান দিয়েছে। টাকা দিয়েই এরা মান-সম্মান, প্রতিপত্তি কিনতে চায়। নবকুমার সেই সমাজের প্রতিভূ। বিকৃত কাম এই মাঝবয়সী চরিত্রে ভালো কোন দিক নেই, এই উপন্যাসের প্রধান খল চরিত্র।

"অষ্টবর্ষা ভবেদ গৌরী, নববর্ষা তু রোহিণী
দশবর্ষা ভবেৎ কন্যা ঊর্ধং রজঃস্বলা। "

আটবছরে মেয়েকে বিয়ে দেয়ার রীতিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে নিজের মেয়েদের বৈদিক যুগের আদর্শ নারী হিসেবে গড়তে চান কৃষ্ণসুন্দর। কিন্তু মশাট নামক তার গ্রামটি আধুনিকতা থেকে হাজার বছর পিছিয়ে। ফলতঃ তার ওপর অসন্তুষ্ট মানুষের সংখ্যা কম নয়। তার উপর ভাই ধর্মান্তরিত হওয়া ও বোন ধর্ষিত হওয়ার অপরাধে যখন তাঁর একঘরে হয়ে যাওয়া সময়ের ব্যাপার তখনই তিনি পরিবারসহ পড়েন নবকুমারের জালে।

"দারও দিয়াও পার হজরত সে নজর করতে হ্যায়
খুশ রহো আহিলে ওয়াতন হাম তো সফর করতে হ্যায়।"

১৮৫৭ সাল নাগাদ নবাব ওয়াজেদ আলী শাহের রাজ্য কেড়ে নেয় ব্রিটিশরা। তাঁর ঠাঁই মেলে কলকাতার কাছেই মেটিয়াবুরুজে। ওয়াজেদ আলী শাহ শাসক হিসেবে কতটা যোগ্য ছিলেন তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। তার মুতা বিয়ের সংখ্যা ছিল অসংখ্য। তবে নবাব প্রকৃত অর্থেই ছিলেন শিল্প ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক, আখতার পিয়া ছদ্মনামে নিজেই লিখতেন কবিতা। মেটিয়াবুরুজ হয়ে ওঠে একখন্ড অযোধ্যা। যেখানে শিল্প আর কদর্যতা হাত ধরাধরি করে চলে। ঠিক যেন ছায়াবৃত্ত। ১৮৮৭ সালে নবাবের মৃত্যুর সাথে সাথেই মেটিয়াবুরুজ থেকে ভোজবাজির মতোই মিলিয়ে যায় অযোধ্যার শেষ ছায়াটুকু।

সেই সময়কার সমাজে নারীদের প্রধানতম কাজ ছিল সন্তানধারণ। না ছিল শিক্ষার অধিকার, না ছিল ঘরের বাইরে যাওয়ার। গার্হস্থ্য সংহিসতা ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিল তাও নাই। সমাজের একটা অংশ ধীরে ধীরে উদ্ভাসিত হচ্ছিল দিনের আলোয়। নগর কলকাতাবাসী পাচ্ছিল সেই সূর্যের ওম। বাধা পেরিয়ে উপমহাদেশের আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে শিক্ষিত নারী চিকিৎসক হলেন কাদম্বিনী, তাঁর স্বামী দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়, অবলাবান্ধব পত্রিকায় লেখনীর মাধ্যমে কাঁপিয়ে দিচ্ছিলেন রক্ষণশীল সমাজের ভিত। উপস্থিত হয়েছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, তরুণ বয়সী রবীন্দ্রনাথ।

নারাচ এক পৌরাণিক অস্ত্র। মহাভারতে ভীষ্ম এই অস্ত্র ব্যবহার করে শত-সহস্র নর বধ করতেন বলেই এর নাম নারাচ। সমাজের অন্ধকূপে পিষ্ট মানুষের হঠাৎ নারাচের মতো ধারালো হয়ে ওঠার গল্প 'নারাচ'। গল্পের ঐতিহাসিক ঘটনা ও চরিত্রের আনাগোনা থাকলেও অনৈতিহাসিক চরিত্রগুলোই প্রাধান্য পেয়েছে। ঐতিহাসিক ও অনৈতিহাসিক চরিত্রগুলো লেখক মিলিয়েছেন ভালোভাবেই। পুরো উপন্যাস জুড়েই মানবতার বার্তা দিতে চেয়েছেন। সু আর কু এর দ্বন্দ্বে সু কে জয়ী দেখানোর প্রয়াস পেয়েছেন। গুডরিডসে 'নারাচ' এর রেটিং ও খুব ভালো, ৪.১৭। সব মিলিয়ে একটা হাই এক্সপেক্টেশন নিয়েই বইটা পড়ছিলাম। তবে অসমান্তরাল তিনটে ঘটনাকে মেলানোর ব্যাপারটা ক্ষেত্রবিশেষে আরোপিত মনে হচ্ছিল। অন্তত তিনটে জায়গাতে প্লট বেশ প্রেডিক্টেবল লেগেছে। দুই-একটা চরিত্র মনে হলো না থাকলেও ক্ষতি ছিল না, এই যেমন চন্দ্রনাথের চরিত্রটা আসলে কি ভূমিকা রেখেছে তা বোধগম্য হয় নি। ১৮৮৭ সালের এক জাহাজডুবির ঘটনা দিয়ে লেখিকা উপন্যাসের পর্দা নামিয়েছেন। এই জাহাজডুবির প্রভাবটা বোঝার জন্য পাঠকদের অপেক্ষা করিয়ে রেখেছেন দ্বিতীয় পর্বের জন্য। 'নারচ' ভালোই, তবে নারাচের মতোই শাণিত কি??
1 review
November 6, 2024
#নারাচ
#দেবারতি_মুখোপাধ্যায়
#পাঠপ্রতিক্রিয়া #_ও #_কিছু_তথ্য


১৮৮৭ সালের ২৫ শে মে হাওড়ার চাঁদপাল ঘাট থেকে যাত্রা শুরু করল এক দানবাকৃতি বাষ্পীয়পোত। ‘ম্যাকলিন অ্যান্ড কোম্পানি'র গর্ব ‘স্যার জন লরেন্স' জাহাজ । গন্তব্য বালেশ্বর হয়ে কটক।বিলাস ব্যসনে পরিপূর্ণ এই জাহাজ সেদিন সামর্থের চেয়ে অধিক পরিমাণে যাত্রী গ্রহণ করেছিল। প্রায় সাড়ে সাতশো'র মতো। যাদের মধ্যে অধিকাংশই ভারতের অভিজাত পরিবারের পুণ্যলোভাতুর মহিলা।
পত্রিকাগুলিতে সতর্ক করে দেওয়া হল মেদিনীপুর ও কটকের মাঝামাঝি আছড়ে পড়তে পারে এক ভয়ঙ্কর ঘূর্ণাবর্ত।সে সমস্ত আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে স���রেফ উপেক্ষা করে রাত্রের দিকে যাত্রা শুরু করল ‘স্যার জন লরেন্স'।
এর ফল হল মারাত্মক ।বঙ্গোপসাগরে হঠাৎ পূঞ্জিভূত হওয়া প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের দাপটে এতজন যাত্রী নিয়ে চিরকালের জন্য বঙ্গোপসাগরের গর্ভে বিলীন হল ‘স্যার জন লরেন্স' ।আলোড়িত হলো সমগ্র কলকাতা।
কিন্তু কি আশ্চর্য!!!এতগুলো প্রাণের সলিলসমাধির পর‌ও অদ্ভুত ভাবে নীরব থাকল তৎকালীন সংবাদমাধ্যম । টাইটানিক জাহাজডুবির মাত্র সিকি শত���ব্দী পূর্বে বঙ্গোপসাগরের বক্ষে ঘটে যাওয়া এহেন ঘটনাকে সরকারের তৎপরতায় ধামাচাপা দেওয়া হল অচিরেই।কেন এরকম উপেক্ষা? হয়তো সেদিন সে জাহাজের অধিকাংশ যাত্রীই ‘নেটিভ' ছিল বলেই ...
আজ থেকে প্রায় ১৩৪ বৎসর পূর্বে ঘটে যাওয়া সেই জাহাজডুবির ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ‘নারাচ' উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে।
এই উপন্যাসে একাধিক কাহিনি সমান্তরালে চলেছে। কখনও দেখা গেছে হাজার হাজার ভারতীয়কে ইনডেনচারড শ্রমিক হিসেবে সাগরপারের দূর কোন‌ও দেশে চালান করে দিতে। কখন‌ও বা আবার শোনা গেছে লখন‌উ-এর নির্বাসিত নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ'র স্বহস্তে কলকাতার বুকে গড়ে তোলা ‘এক টুকরো লখন‌উ' তথা আনন্দনগরী মেটিয়াবুরুজে রাঢ়বঙ্গ হতে আগত হরেন্দ্রপুত্র চন্দ্রনাথের জীবনের বিচিত্র উপাখ্যান।।
মশাটগ্রাম নিবাসী কৃষ্ণসুন্দর ও তাঁর পরিবারের দুর্দশা অথবা তাঁর জ্যেষ্ঠা কন্যা অপালার মৃত্যু যেমন আমাদের চোখে জল এনেছে; তেমন‌ই কাদম্বিনী আর দ্বারকানাথের সাহচর্যে কৃষ্ণসুন্দরের ভগিনী ভুবনমণির উত্থান তথা ‘বীরনারী' হয়ে ওঠার কাহিনি আমাদের করেছে বিস্ময়াবিষ্ট।

এ উপন্যাসে অসাধারনভাবে বর্ণিত হয়েছে সে সময়কার কথা যখন কুসংস্কারের অচলায়তনে বাঙালি সমাজ সম্পূর্ণরূপে আবদ্ধ। অশাস্ত্র, কুশিক্ষা অশিক্ষার পঙ্কিল আবিল গর্তে নিমজ্জিত মানুষ যখন অক্ষম তার মনুষ্যত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। আর তার মধ্যেই শাস্ত্রীয় নিয়মের দোহাই দিয়ে জনাইয়ের পাঁচকড়ি মুখুজ্জে কিংবা রামচন্দ্র ন্যায়তীর্থ অথবা ধনঞ্জয় বাক্যবাগীশের মত কিছু তথাকথিত সমাজপতিরা তখন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা।
গল্পের প্রয়োজনে এসেছেন বাংলার প্রথম মহিলা ডাক্তার কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় ও তাঁর যোগ্য সহধর্মী প্রখ্যাত ব্রাহ্মনেতা দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়।
রয়েছেন তরুণ কবি রবীন্দ্রনাথ,সদ্য বিবাহিত উপেন্দ্রকিশোর এবং বিধুমুখী---এরকমই বেশ কিছু ঐতিহাসিক চরিত্র।
এমনই ঐতিহাসিক এবং কাল্পনিক চরিত্রদের নিয়ে এই জাহাজডুবির মর্মান্তিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন সমাজের তুলনামূলক স্বল্প আলোচিত এরকমই বেশ কিছু বিষয়কে কেন্দ্র করে লেখা এই বহুস্তরীয় উপন্যাস ‘নারাচ' পড়তে মন্দ লাগে না। তবে উপন্যাসখানি পড়তে পড়তে বেশ কিছু স্থানে হতাশ হয়েছি ,সে কথা বলাই বাহুল্য। দৃষ্টিগোচর হয়েছে বেশ কিছু তথ্যগত ভ্রান্তি।হতে পারে আমার বোঝার ভুল,সেকথা আলোচনা করবার পূর্বে বলে রাখি এই উপন্যাসের দ্বিতীয় খন্ড‌ও প্রকাশিত হবে, অন্তত তেমনটাই জানিয়েছেন লেখিকা এ ব‌ইতে তাঁর ‘লেখকের কথা' অংশে।

যাইহোক এ বইয়ের বেশ কিছু তথ্য যা আমার ভুল বলে মনে হয়েছে ,সে সম্পর্কে এবার আলোচনা করা যাক....
১)এই উপন্যাসের সময়কাল উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ,সেকথা লেখিকা প্রথমেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তাঁর কথায়,“সময়টা ১৮৮৫-র আশেপাশে" এবং বইয়ের একেবারে শেষে অর্থাৎ ‘লেখকের কথা' অংশে লেখিকা এ কথাও বলেছেন যে উপন্যাসটি শেষ হয়ে গিয়েছে ১৮৮৭ সালে।
এই সময়পটের মধ্যে লেখিকা হ্যাজাক বাতির কথা উল্লেখ করেছেন। অথচ এই হ্যাজাক বাতি যার পোশাকি নাম পেট্রোম্যাক্স (Petromax), তা আবিষ্কৃত হয় ১৯১০ সালে জার্মান দেশে। আবিষ্কারক Max Graetz । সুতরাং যে সময়পটে এই উপন্যাসটি রচিত সেসময়ে হ্যাজাক বাতির অস্তিত্বই তো ছিল না।

২)লেখিকা একস্থানে লিখেছেন বেথুন স্কুল প্রতিষ্ঠা হওয়ার উনিশ বছর পর সেখানে ছাত্রী সংখ্যা ছিল মাত্র তিরিশজন।‘Bethune School & College Centenary Volume 1849 _ 1849 (Editor: Kalidas Naga) নামক জার্নালে শ্রীযোগেশচন্দ্র বাগল কর্তৃক রচিত ‘বেথুন স্কুল ও কলেজের কথা' (‘Bethune School & College Centenary Volume 1849 _ 1849;পৃ.২১৬-২১৭) শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে জানতে পারি ১৮৬৩-৬৪ সালে বেথুন স্কুলের ছাত্রী সংখ্যা ছিল ৯২ জন এবং ১৮৭৩-৭৪ সালে ছাত্রী সংখ্যা ছিল ৭২ জন।

৩) ইতিহাস বলছে কাদম্বিনী ও দ্বারকানাথের কন্যা হিমানী গঙ্গোপাধ্যায় মাত্র তিন মাস বয়সেই মারা যান। অথচ লেখিকা এখানে অকাল*মৃ*তা হিমানীকে জ্যেষ্ঠা হিসেবে দেখিয়েছেন।যদিও লেখিকা ‘লেখকের কথা' অংশে স্বীকার করেছেন যে কেবলমাত্র গল্পের প্রয়োজনে তিনি হিমানীকে এই উপন্যাসে জ্যেষ্ঠা হিসেবে দেখিয়েছেন।তবে এহেন ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য পরিবেশনের বিষয়টা আমার ব্যক্তিগতভাবে ভারী অপছন্দ হয়েছে।

৪) উপন্যাসটি যে শুরু হচ্ছে ১৮৮৫ সাল থেকে, সে বিষয়ে কোন‌ও সন্দেহের অবকাশ থাকে না। কেননা যে পরিচ্ছেদে ভুবনমণিকে প্রথমবার কাদম্বিনীদের ঘরে দেখতে পাওয়া যায়; সেই পরিচ্ছেদের এক স্থানে বলা হয়েছে উপেন্দ্রকিশোর আর বিধুমুখী সদ্য বিবাহিত। উপেন্দ্রকিশোর আর বিধুমুখীর বিবাহ হয় ১৮৮৫ সালে। এ প্রসঙ্গে লীলা মজুমদার বলছেন, “সম্ভবত ১৮৮৫ সালে দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম পক্ষের কন্যা বিধুমুখীর সঙ্গে উপেন্দ্রকিশোরের বিয়ে হয়(জাতীয় জীবনী গ্রন্থমালা; উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী: লীলা মজুমদার; অনুবাদ-সৈয়দ ক‌ওসর জামাল; ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট; দ্র. পৃ:১৭)।
ও হ্যাঁ, এই পরিচ্ছেদেই ‘বিধুমুখী বলে,“মা যে আর এক বছর পরেই ডাক্তার হয়ে যাবে।"(দ্র.চিত্র-৪--২)'অর্থাৎ কাদম্বিনী তখনও ডাক্তারি পাশ করেননি। তিনি ডাক্তারি পাশ করেন ১৮৮৬ সালে(এ প্রসঙ্গে কিছু পরে বিস্তারিত আলোচনা করেছি)। অর্থাৎ ‘এক বছর পরেই ডাক্তার হয়ে যাবে' এর অর্থ এটা ১৮৮৫ সাল।
সুতরাং কাহিনি যে এখন‌ও ১৮৮৫ সালের মধ্যেই আবর্তিত হচ্ছে তা উপরিউক্ত প্রমাণ দুটি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। অথচ এই একই পরিচ্ছেদে(আমি এই মুহূর্তে পৃষ্ঠা সংখ্যা উল্লেখ করতে পারছি না, সে জন্য ক্ষমাপ্রার্থী; বইটি আসলে বর্তমানে আমার হাতের কাছে নেই, বইটা আমি লাইব্রেরি থেকে নিয়ে পড়েছিলাম।তখনই বইটা পড়তে পড়তে যে সমস্ত অসংগতিগুলো চোখে পড়েছিল তা নোট করে নিয়েছিলাম ডায়েরিতে।কিন্তু তার পাশে পাশে পৃষ্ঠা সংখ্যা গুলো লিখে রাখতে বিস্মৃত হয়েছি। যারা বইটি পড়েছেন তাদের আশা করি বুঝতে অসুবিধা হবে না যে আমি কোন পরিচ্ছেদটির কথা বলছি বা পরবর্তীতে বলব।)আমরা দেখতে পাই চা-বাগানের কুলিদের দুর্দশা মোচনের জন্য দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় তখন আসামে অবস্থান করছেন।যতদূর জানি দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় চা-বাগানের কুলিদের অবস্থা অনুসন্ধানের জন্য আসাম যাত্রা করেন ১৮৮৬ সালের জুলাই মাসে (অনন্যা কাদম্বিনী : সুবীর কুমার চট্টোপাধ্যায় ;বাঙলার মুখ; পৃষ্ঠা 119)
এই পরিচ্ছেদে এতক্ষণ যা যা ঘটেছিল তা ১৮৮৫ সালের ঘটনা; অথচ হঠাৎ করেই তারপর দেখা গেল দ্বারকানাথের আসাম যাত্রার কথা যা আসলে ১৮৮৬ সালের ঘটনা। এটা কীভাবে সম্ভব?



৫)এতক্ষণ যে পরিচ্ছেদের কথা বললাম ঠিক তার আগের পরিচ্ছেদেই আমরা দেখতে পাই স্বামী নবকিশোর দত্তের অত্যাচারে অপালা অসুস্থ হয়ে যায় এবং তারপর শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে এবং মাত্র ছয়দিনের মধ্যেই মারা যায় কৃষ্ণসুন্দরের জ্যেষ্ঠা কন্যা।
কিন্তু আমাদের এখন মূল আলোচ্য বিষয় অন্য একটি পরিচ্ছেদ নিয়ে;যে পরিচ্ছেদে আমরা প্রশান্ত বসু নামের মোক্তার ছোকরাটিকে প্রথমবারের জন্য নব দত্তের মথুর সেন গার্ডেন লেনের গদিতে দেখি নবকিশোর দত্তকে সদ্যগঠিত কংগ্রেসে প্রবেশ করার পরামর্শ দিতে (তখন‌ও অপালা শয্যাশায়ী) সেই পরিচ্ছেদেও স্পষ্ট উল্লে�� পাওয়া যায় যে কাহিনি এখন‌ও ১৮৮৫ এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কীভাবে?
প্রশান্ত বসুকে বলতে দেখা যায়,“.... এই তো ডিসেম্বরে ওদের প্রথম অধিবেশন বোম্বাই শহরে।" আমরা সকলেই জানি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় ১৮৮৫ সালের ২৮-৩১ ডিসেম্বর। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে এটা ১৮৮৫।
এ প্রসঙ্গে আরও একটা প্রমাণ নেওয়া যাক।যে পরিচ্ছেদে এই উপন্যাসের অন্যতম প্রধান কাল্পনিক চরিত্র সৌরেন্দ্র এর প্রথমবার আগমন হয় দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের গৃহে ,সেই পরিচ্ছেদে‌র শেষের দিকে আবার উল্লেখ পাওয়া যায় কাদম্বিনীর এক বছর পর ডাক্তারি পাশ হওয়ার কথা।‘সামনের বছর পাশ করলে তিনিই হবেন প্রথম বাঙালি মহিলা চিকিৎসক।'
এর ঠিক পরের পরিচ্ছেদেই অর্থাৎ যখন সৌরেন্দ্র এর সঙ্গে তরুণ কবি রবীন্দ্রনাথের আলাপ হয়, দ্বারকানাথের ১৩, কর্ণ‌ওআলিস স্ট্রিটের বাড়িতে, সেখানে দেখা গেল রবীন্দ্রনাথকে তাঁর সদ্য লেখা একটি কবিতা উপেন্দ্রকিশোর,সৌরেন্দ্র সহ কক্ষে উপস্থিত বাকিদের শোনাতে। কবিতাটি---
“খাঁচার পাখি ছিল সোনার খাঁচাটিতে, বনের পাখি ছিল বনে।
একদা কী করিয়া মিলন হল দোঁহে, কী ছিল বিধাতার মনে।"
সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের সেই বিখ্যাত কবিতা ‘দুই পাখি' যা ১২৯৯ বঙ্গাব্দের(১৮৯২ খ্রিস্টাব্দ)১৫ আষাঢ় শাহাজদপুরে বসে লিখেছিলেন কবি।।কিন্তু এ তো ১৮৮৫ সাল ।এ কবিতা তো আর‌ও সাত বছর পর লেখা এবং তা দ্বারকানাথের ১৩,কর্ণ‌ওআলিস স্ট্রিটের বাড়িতে বসে নয় বরং শাহাজাদপুরে লেখা।

৬)এরপর আসি সেই পরিচ্ছেদের কথায় যে পরিচ্ছেদে ভুবনমণি দ্বারকানাথের কাছে একটি নতুন কলম পাওয়ার আবদার করে।
এরপর দ্বারকানাথের আদেশে ভুবনমণিকে সামনে পড়ে থাকা খবরের কাগজ থেকে একটা খবর পাঠ করতে শোনা যায়। সংবাদটি ছিল--

‘ শ্রীমতী কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় এবার কলিকাতা মেডিকেল কলেজের বি . এ . এম.বি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে পারিলেন না । মিরর বলেন , স্ত্রীলােকদিগের জন্য পরীক্ষা কিছু সহজ হওয়া আবশ্যক । কিন্তু নিম্ন পরীক্ষাগুলিতে স্ত্রীলােকগণকে অধিক অনুগ্রহ করা হয় বলিয়া উচ্চ পরীক্ষাতেও সেইরূপ করিতে হইবে , তাহার কোনাে কথা নাই । বাস্তবিক ডাক্তারির মতাে উচ্চশিক্ষায় স্ত্রীলােকদিগের উপর এত অধিক অনুগ্রহ দেখাইলে সুশিক্ষিতা স্ত্রীলােক অল্পই মিলিবে ।'

এ খবর প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৮৬ সালের ১৯ এপ্রিল সোমপ্রকাশ পত্রিকার পাতায় (অনন্যা কাদম্বিনী: সুবীর কুমার চট্টোপাধ্যায় ; পৃ.৩৬)। সংবাদটি দেখে বোঝাই যাচ্ছে এটা ১৮৮৬ সালের সেই ঘটনা যেবার কাদম্বিনী তিন বছর পাঠক্রমের পর প্রথমবার এম বি এ পরীক্ষা দিলেন কিন্তু এই পরীক্ষায় কাদম্বিনী ফেল করেন যে দুটো বিষয়ে তা হল মেটেরিয়া মেডিকা ও Comparative Anatomy (দ্র. অনন্যা কাদম্বিনী ; আনন্দবাজার পত্রিকা ২৩.৮.১৮৮৬ ও ভারতবাসী ২৮.৮.১৮৮৬ সালের সংবাদ দুটি ; পৃ.৩৬)।অথচ লেখিকা এখানে সে দুটি বিষয়ের কথা কোথাও উল্লেখ করেননি বরং বলেছেন,“আর আশ্চর্যভাবে অন্যান্য সমস্ত পেপারে কাদম্বিনী ভালাে মার্কস পেলেও মেডিসিনের প্র্যাকটিকাল পরীক্ষায় মাত্র এক নম্বরের জন্য উত্তীর্ণ হতে পারলেন না । যে পেপারের পরীক্ষক ছিলেন স্বয়ং ডঃ চন্দ্র ।"
এটা তো ১৮৮৮ সালের ঘটনা। দু'বছর এল.এম.এস পড়ার পর ১৮৮৮ সালের মার্চ মাসে মেডিকেল কলেজের সর্বশেষ পরীক্ষা দেন কাদম্বিনী।অন্য সব বিষয়ে পাশ করলেও চিকিৎসক রাজেন্দ্র চন্দ্র এর মেডিসিন বিষয়ে তিনি ফেল করেন।বলা ভাল রাজেন্দ্র চন্দ্র তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে ফেল করিয়ে দেন। ডি .পি .আই রিপোর্টে তাঁর পরীক্ষায় অসাফল্যের খবর পাওয়া যায় (মহিলা ডাক্তার ভিনগ্রহের বাসিন্দা : চিত্রা দেব ; পৃ.৯৪)যাই হোক তারপর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ কোটস সাহেব তাঁকে G.M.C.B উপাধি প্রদান করেন।
অথচ এই পরিচ্ছেদে তো ১৮৮৬ সালের কথা বর্ণিত হয়েছে। এই উপন্যাসে স্পষ্ট বলা আছে 'তিন বছর আগে কাদম্বিনী আইনের ফাঁক গলে ডাক্তারিতে ভর্তি হন'; এ কথা আমরা সবাই জানি যে ১৮৮৩ সালের জুন মাসে তিনি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। অর্থাৎ স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে এই পরিচ্ছেদে ১৮৮৬ সালের কথাই বলা হয়েছে।) আর তাছাড়াও লেখিকা তো বইয়ের একেবারে শেষে অর্থাৎ ‘লেখকের কথা' অংশে এ কথাও বলেছেন যে উপন্যাসটি শেষ হয়ে গিয়েছে ১৮৮৭ সালে।
এছাড়াও এই পরিচ্ছেদেই দেখা যায় কাদম্বিনী ডাফরিন মহিলা হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন।এ ঘটনাও ১৮৮৮ সালের । এ প্রসঙ্গে বামাবোধিনী পত্রিকা (আগষ্ট, ১৮৮৮) কী বলছে দেখা যাক---
‘স্ত্রী ডাক্তার — আমরা শুনিয়া অতিশয় আনন্দিত হইলাম শ্রীমতী কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় ৩০০ টাকা বেতনে লেডী ডাফরিণের স্ত্রী হাসপাতালে চিকিৎসক নিযুক্ত হইয়াছেন । বাঙ্গালী স্ত্রীলােকদিগের মধ্যে ডাক্তারী কাজ ইতিপূৰ্ব্বে আর কেহ পান নাই।'(দ্র. অনন্যা কাদম্বিনী;পৃ.৩৬)

৭)এছাড়াও আর‌ও দু এক স্থানে বেশ কিছু ছোটখাটো তথ্যগত ভ্রান্তি পরিলক্ষিত হয়েছে যার উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। তবে সব শেষে দেখি লেখিকা এখানে কাদম্বিনী দ্বারকানাথের চতুর্থ পুত্র হিসেবে নাম উল্লেখ করেছেন প্রফুল্লচন্দ্র গাঙ্গুলী (ডাকনাম-মংলু)এর কথা। কিন্তু পুণ্যলতা চক্রবর্তী প্রণীত ‘ছেলেবেলার দিনগুলি'(নিউস্ক্রিপ্ট ;পৃ.১৪৩) নামক স্মৃতিকথায় দ্বারকানাথ-কাদম্বিনীর চতুর্থ পুত্র হিসেবে নাম পাই সুলেখক ও সুবক্তা প্রভাতচন্দ্র গাঙ্গুলীর(ডাকনাম-জংলু)।
Profile Image for Adite.
Author 11 books345 followers
December 15, 2022
Gitanjali Shree's Tomb of Sand has taken the literary world by storm. The book which is a translation of her Hindi novel Ret Samadhi is only a window into the diverse world of Indian literature.

Recently I came across author Debarati Mukhopadhyay's best-selling Bengali novel Narach which has been beautifully translated into English by @ArunavaSinha. Chronicles of the Lost Daughters is a fast paced historical novel that is set in Renaissance Bengal. The author blends fact with fiction and creates a masterpiece that is rich in drama, human emotion and visual grandeur.

Interestingly, she ropes in historical personalities including Wajid Ali Shah, Dr Kadambini Ganguly (Bengal's first woman doctor) and Rabindranath Tagore. The narrative takes the reader on a roller coaster ride from the villages of Bengal to Surinam and 19th century Calcutta. Along the way we find out about the plight of pre-pubescent girls who were married off to older Kulin Brahmin men and the efforts of brave young men and women to abolish the heinous social practice. The thriller like narrative is fast-paced and the twists and turns keep the reader engrossed till the very last page.

Mukhopadhyay is an exciting young author whose work deserves to be read by all Indians.

However, if there is one thing that spoils the reading experience, it is the shoddy proofing job done by the publisher. It's a shame that a book produced by one of the top publishing houses in India is riddled with proofing errors.
Profile Image for Ritwika Chakraborty.
41 reviews14 followers
April 3, 2021
(স্পয়লার ফ্রী রিভিউ)


গুছিয়ে মনের ভাষা ব্যক্ত করতে পারবো না। ছন্নছাড়াভাবেই বলি। এখনও পর্যন্ত লেখিকা দেবারতি মুখোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস এটি, আমার মতে।
ওনার প্রথম দিককার উপন্যাস থেকে শুরু করে এই সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস অব্দি চলা যাত্রাপথে স্পষ্টতই দৃশ্যমান লেখনীর ক্রমবিবর্তন।
একেবারে মেদহীন ঝরঝরে উপন্যাস। 'নারাচ' এর মতোই শাণিত ওনার কাহিনী পরিবেশন।


বইটিতে ডুব দিলে একনিঃশ্বাসে কাহিনীর গতির সাথে এগিয়ে চলা ছাড়া উপায় থাকবে না। সিনেমার দৃশ্যের মতো চোখের সামনে 'ঘটে যাবে' পুরো বইটি। হয়তো এই কারণেই বইয়ের এক তৃতীয়াংশে গিয়ে পড়া থামিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। বুক ধড়ফড় করছিল। যন্ত্রণায় ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছিল। তারপর আবার অতিকষ্টে সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে চললাম 'দৃশ্যগুলো দেখার' জন্য। কাহিনীতে ততক্ষণে আবির্ভাব হয়েছে কাদম্বিনী দেবীর। আশার সঞ্চার পেলাম যেন। চরিত্রটির হাত ধরে আবার এগিয়ে চললাম সামনে। কানে তখনও আর্তনাদ ভেসে আসছে "আমি মরতে চাই না"। কোথাও গিয়ে সেই আর্তনাদ মিশে যায় দিল্লীর নির্ভয়ার যন্ত্রণাকাতর আকুতিতে.. "ম্যায় জিনা চাহতা হুঁ"। যুগের পর যুগ কোটি কোটি নির্ভয়ার বাঁচতে চাওয়ার আকুতি নীরবে বা সরবে মিশে গেছে বাতাসে, সময়ের ধুলোয় মলীন হয়েছে স্মৃতি, কিছু বিস্মৃত হয়েছে।


বইটি জাতপাত, লিঙ্গ ধর্ম সমস্ত ভেদাভেদের উর্ধ্বে গিয়ে মানবতার কথা বলে। চিরন্তন সত্য এই মানবধর্মের বাস্তবে জয়লাভ হয় কি? হয়না। চিরকাল হয়তো শুভ অশুভের লড়াই লেগেই থাকবে। কেউই হয়তো জয়ী হবে না। কারণ "পরিবর্তনই সংসারের নিয়ম"। জীবনটা সিনেমার প্লট নয়। জীবনে হ্যাপি এন্ডিং বলে কিছু হয়না। 'এন্ডিং' সেদিনই আসবে যেদিন মানবসমাজের বিলুপ্তি ঘটবে।


এই লড়াই-ই জারী থাকুক। সমাজে 'নারাচ' আসুক বারবার। কিংবা আমি আপনিই হয়ে উঠি নারাচ।
লেখিকাকে কৃতজ্ঞতা জানাই উপন্যাসটি লেখার জন্য। অপেক্ষায় রইলাম দ্বিতীয় পর্বের।
Profile Image for Niloy Gourh.
73 reviews2 followers
November 20, 2020
অবান্তর একটি ঘটনাকে জোর করে টেনে নিয়ে গিয়ে কাদম্বিনী দ্বারকানাথের সাথে জুড়ে দেওয়া।
সঙ্গে ওয়াজিদ আলি শাহ!!
তিনটি আলাদা বড় গল্প লিখলে ভালো হত।
আর কাদম্বিনী দ্বারকানাথ কাহিনী সেই প্রথম আলো বা রাজা ভট্টাচার্য রসবই থেকে কপি করা বলে মনে হবে।
এই উপন্যাসে না আছে সাহিত্য না আছে নতুন ঘটনা।
৬৮ টি কাগজ\বই পড়ে এরকম উপন্যাস তৈরী করা সম্পূর্ণ অর্থহীন।
আমিও ইতিহাসিক লিখতে পারি প্রমাণ করার মরিয়া ব্যর্থ প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।
Profile Image for Moumita.
55 reviews36 followers
August 5, 2022
•• কোথা থেকে শুরু করবো বুঝতে পারছি না, ঐতিহাসিক পটভূমিকার কথা দিয়ে না কি নারীবাদের ক্রমপর্যায়েযের দিকটা...
ঊনবিংশ শতক, নবজাগরণে উদ্ভাসিত ভারত তথা বঙ্গদেশ.
আর সেই সময়ের পটভূমিকায় রচিত নাড়াচ গল্পটি... গল্প?? না গল্প নয়... এটি হলো আয়না, যে আয়নায় আমরা অতীতের সে সময় কে উপলব্ধি করি , যখন দ্বারকানাথ, কাদম্বিনী, উপেন্দ্রকিশোর এর মতো মানুষেরা লড়াই করছেন সমাজ এর কিছু নোংরা, কুসঙ্গস্কারে জর্জরিত প্রথার বিরুধ্যে, সমাজের নিন্মস্তরের মানুষের জন্য, সর্বোপরি নারীদের সম অধিকারের জন্য...

এটা সেই সময় যখন একদিকে

নাস্তি স্ত্রীণাং ক্রিয়া মন্ত্রৈরিতি ধর্মে ব্যাবসিতিঃ|
নিরিন্দ্রিয়া হ্যামন্ত্রশ্চ স্ত্ৰীয়োহনৃতমিতি সিতিঃ ||

মনুসংহিতার এই শ্লোকের উদাহরণ দিয়ে মেয়েদের শিক্ষা থেকে ব্রাত্য করে  রাখার অদম্য চেষ্টা তথাকথিত ব্রাহ্মণ সমাজের কিছু মানুষের..
আর এক দিকে দাসত্ব প্রথা নিষিদ্ধ হওয়ার পরেও এক নতুন আইন, "Indenture-চুক্তি" মোড়কে চলছে মানুষ পাচার ভিন্ন দেশে শ্রমিকের জোগান দেওয়ার জন্য..

১৮৮৭ সাল মে মাস, হাওড়া থেকে পুড়ি রওনা হয়েছিল Sir John Lawrence নামক একটি জাহাজ প্রায় ৭৫০ যাত্রী, পুণ্যার্থী নিয়ে.. তারপর ঘটে যায় এক ঐতিহাসিক ঘটনা, যে ঘটনা রোমহর্ষরক এবং হৃদয়বিদারক, আমি নিশ্চিত ৯৫% মানুষ অবগত নন এই ঘটনার ব্যাপারে... কি সেই ঘটনা ?? যার একমাত্র সাক্ষী এখন হাওড়া এর জগন্নাথ ঘাটের একটি স্মৃতিফলক ??

সত্যি ঘটনার ঘনঘটা, কিছু কালজয়ীই প্রেরণাদায়ক ঐতিহিহাসিক চরিত্রের সাথে কিছু কাল্পনিক চরিত্র, রহস্য, রোমাঞ্চ, সংগ্রাম আর অনেক প্রশ্ন ..
নাড়াচ হলো এই সবকিছুর সংমিশ্রণ,  ইতিহাস আর কল্পনা যে  এত সুন্দর ভাবে মিলিত হতে পারে, নারাচ না পড়লে আমি হয়তো কোনোদিন সেটা উপলব্ধি করতে পারতাম না .. কিছু অসম্পূর্ণতা থেকে যেতো পাঠক হিসাবে সব সময়ের জন্য..

দেবারতি অত্যন্ত নিপুণতার সাথে যত্নসহরে নারাচ উপন্যাসটি বুনেছেন.

নারাচ শুধু আমার জ্ঞানের পরিধি বাড়ায়নি,  আমাকে সম্মৃদ্ধ করেছে সাহিত্যের দিক থেকেও.

An outstanding, enriched with literature and enlightening story, Narach

Highly recommend to all.


#bookreview #aleafunturned #Narach
Profile Image for Saheli Roy.
32 reviews
September 24, 2025
এই উপন্যাসের চারটি গল্পই লড়াই এর। কেউ মানুষের অধিকার এর লড়াই করছে, কেউবা জাতপাত ভুলে শিল্পকে শীর্ষে তোলার লড়াই করছে, আবার কেউবা নিজের কাছের মানুষ কে বাঁচিয়ে রাখা যায় তার লড়াই করছে আর কেউ স্রেফ নিজে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছে। কিন্তু লড়াই এর ময়দানে শেষ বাজিমাত করে এক নির্মম ভবিতব্য এর পরিহাস যাকে ঠেকানোর ক্ষমতা কারোর ই হয় না । এই গল্প ই লেখিকার সুপটু লেখনী এর মাধ্যমে আমরা 'নারাচ' রূপে পাই।

As always নতুন লেখক দের লেখা পড়তে গিয়ে যেরকম ভয় পাই এই বই টা পড়তে গিয়েও ততটাই ভয় পেয়েছি। কিন্তু অনেক ভালো বই পড়ুয়া দের কথায় শুরু করি আমার এই উপহার পাওয়া বইটি পড়া। আর সত্যি বলতে অনেকদিন পর নতুন কারো লেখা পড়ে অত্যন্ত আপ্লুত অনুভব করছি।

নারাচ শব্দের অর্থ কাহিনী তে যে এইভাবে লেখিকা তার লেখার আঙ্গিকে ফুটিয়ে তুলবেন এটা সত্যি ভাবতে পারিনি। এবং চারটে আংশিক কাল্পনিক গল্প যে এই ভাবে এক সত্যি ঘটে যাওয়া ঘটনার আসে পাশে ঘুরে একটি Circle এ ফিরে আসবে এটাও ভাবা যায় না। গল্পের ভৌগলিক পরিধি ও vast ছিল সেটা ও খুব পারদর্শীতা এর সাথে ই লেখিকা maintain করেছেন।লেখিকা যে প্রতিটা বিষয়ে কতটা পড়াশুনা করে এই লেখায় হাত দিয়েছেন তা আপনি উপন্যাস পড়তে পড়তে তার ভাষা প্রয়োগের কৌশলে ই বুঝতে পারবেন। ইতিহাস ভিত্তিক উপন্যাস এর মূল সমস্যা হলো অনেক সময় এটি এর কাল্পনিকতা আর বাস্তবিকতা ঠিক তাল মিলে চলতে পারে না কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেই সমস্যা একেবারেই হয়নি। টানটান উত্তেজনা য় খুব ই অল্প সময়ে শেষ করলাম আমার এই বছরে পড়া অন্যতম সেরা বই।

মগ্ন নারাচ পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।

I'm highly recommending this book to everyone who hasn't read it yet .
Profile Image for Suman Das.
37 reviews5 followers
June 2, 2021
এটি একটি ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস। উপন্যাসের মূল কাহিনী হুগলীর মশাট গ্রামের কুলীন ব্রাহ্মণ কৃষ্ণসুন্দর, তার সহধর্মিনী ব্রহ্মময়ী, তাদের দুই কন্যা অপালা ও লোপামুদ্রা, পুত্র দিব্যসুন্দর ও সহোদরা ভুবনমণিকে নিয়ে। উপন্যাসের প্রয়োজনে বিভিন্ন ঐতিহাসিক চরিত্র ও ঘটনা স্থান করে নিয়েছে কাহিনীতে। উপন্যাসটি তথ্যবহুল হলেও উপন্যাসের গতি নষ্ট হয়নি কোথাও। কিছু ক্ষেত্রে কিছু ঘটনার সময়কাল সামান্য অদলবদল করেছেন লেখিকা তা উল্লেখ করেছেন উপন্যাসের শেষে। গ্রামবাংলায় তৎকালীন ব্রাহ্মণসমাজকর্তৃক শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে নারীদের উপর অত্যাচার, বাবুসমাজের বিকৃতযৌনতা ও বহুগামীতা, নারীস্বাধীনতার জন্য ব্রাহ্মসমাজ ও মুক্তমনা মানুষদের আন্দোলন, নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ এর মেটিয়াবুরুজে একটুকরো লক্ষ্ণৌ ও তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা এরকম বিভিন্ন ঘটনা ও স্থানকে লেখিকা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে স্থান দিয়েছেন উপন্যাসে। লেখিকা নারী বলেই হয়তো উনবিংশ শতকে সমাজে নারীদের প্রতি হওয়া অত্যাচার, অবিচার, বঞ্চনাকে এতোটা সহমর্মিতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন উপন্যাসে। তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক রক্ষণশীল সমাজের অন্ধকারদিকটা যেভাবে উন্মোচিত হয়েছে এই উপন্যাসে তা���েই উপন্যাসের সার্থকতা। কিন্তু হঠাৎ করে উপন্যাসের শেষ হয়ে যাওয়াটা পাঠককে অতৃপ্ত রাখে।
Profile Image for Pulkit  Singh.
39 reviews3 followers
January 31, 2023
As I begin to write this, I'm trying to pin down what this story is about- India's first lady doctor or child marriage? Does it catch the Indian women emancipation movement in its nascent stages or capturing the downfall of the last nawab of Awadh is its aim?

It's all this. Which is part of its charm & also the reason why it overpowers you. But let's start from the beginning.

Krishnosundor & his family leave their village with a promise of better days but life sells them off as plantation slaves. His sister, Bhubonmoni, his two daughters & his wife- their lives form the crux of this story.

The first 150 pages pulled me in; the story took off immediately but I found myself emotionally overwhelmed. I asked @pepperandpetals the one who loved this book and gifted it to me, if things get better. She encouraged me to continue reading & I am glad I listened to her.

The story is well-researched & apart from the protagonists there are others who held my interest- I mean, Rabindranath Tagore is practising his poetry & Kadambini Ganguly is studying to be a doctor here. The tapestry is rich with memorable characters, sewn with the silk of the Indian history.
Profile Image for Arpita Bhuyan.
68 reviews15 followers
October 10, 2023
This book came to me when I had asked the salesperson from Bahrisons, Kolkata to suggest a "good" contemporary fiction - this book was neither, well at least not entirely. This is more of a historical fiction and is inspired deeply by the socio-cultural happenings of the 19th century Bengal. You also come across many promitent figures of then Bengal - a few amongst them are Dr. Kandombini Ganguly (one of the first Indian women to become a practicing doctor), Nawab Wajid Ali Shah (who was banished from his beloved kingdom in Lucknow but in this place of exile i.e. Kolkata, he build a mini-Lucknow of sorts in Metiabruz as he tried to bring forth the culture of poetry, art, dancing and so on.

At the heart of it, this novel is about the fate of women in Bengal in the 19th century and it is a painful read. From women being practically sold off to families (mostly men far older in age) before the age of 12 to the fate of young widows, the novel captures it all in a heartwrenching manner.

The author was also able to bring forth the grotesque interpretation of our original shastras by Hindu men, only for the benefit of themselves - interpretations that kept the women subjugated for years and years until various popular social movements such as the The Brahmo Samaj could make a breakthrough of some form. Had it not been for those long years of fight, I dare not think what could have been the state of women be even today.

All of this the author packs in 300-some pages with a beautiful and heartbreaking story; with characters you get deeply invested in and can't help but root for, despite their utterly bleak circumstances.

And hats off to the translater, Arunav Sinha, for such a seemless translation. I have read books before that makes you realise that you're reading a translated work but not this one; this one was just like reading the novel in its original form, no hiccups at all.

4.7 stars for all the love, heartbreak and most importantly, learning.
Profile Image for Bengali Bookish.
36 reviews16 followers
August 8, 2020
মহাভারতের সময়কার এক অদ্ভুত অস্ত্র, "নারাচ", লোহার তৈরী এই অস্ত্রে ধরাশায়ী করা যেতে একাধিক মানুষকে । সময় এক অমোঘ অস্ত্রে, যে একই সাথে ভিন্ন জায়গার ভিন্ন মানুষকে সে আঘাত করে যেতে পারে সমান্তরাল ভাবে । কিন্ত নারাচের মতোই ক্ষুরধার শাণিত মানুষেরা বারংবার উঠে দাঁড়ায় সবকিছুর বিরুদ্ধে ।
দেবারতি মুখোপাধ্যায় এর লেখা উপন্যাস " নারাচ" মূলত একটি পিরিয়ড নভেল ৷ আঠারোশো শতকের শেষ দিকটা এই উপন্যাসের মূল সময়কাল ৷ রয়েছে প্রচুর চরিত্র ৷ সজ্জন ব্রাহ্মণ, উচ্চবংশীয় কুলীনদের নোংরামো ও ভন্ডামো, মানুষের নীচতা, অসহায় মানুষদের প্রতিবাদী সত্তা, বিনোদনে বেঁচে থাকা, অসহায়ত্বে বেঁচে থাকা - কি নেই 'নারাচ'এ !
আছে রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কীর্তি, তৎকালীন উল্লেখযোগ্য বাঙ্গালী দ্বারকানাথ গাঙ্গুলি, কাদম্বিনী গাঙ্গুলি, উপেন্দ্রকিশোর রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখের জীবনের কথাও উঠে এসেছে এই উপন্যাসে । 
ফল্গু নদীর যেমন ওপরে বালি আর নিচে জল, আমার চোখে "নারাচ" ঠিক এমনই একটি উপন্যাস ৷ মানুষের হাজারো দুঃখ দুর্দশার মাঝেও বয়ে চলে জীবন, হাজারো পঙ্কিলতার মধ্য থেকেও উঠে আসে পদ্মফুল ৷ শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত মানবতার জয়গান গেয়েছেন লেখিকা, পাঠককে দিয়েছেন শান্তি ও তৃপ্তি ; কিন্ত নির্মম বাস্তবগুলো পাঠকের চোখে এনেছে জল । শেষের দিকে কিছু মূহুর্তে বেশ কয়েকবার বইটা বন্ধ করতে হয়েছে, ভাবতে হয়েছে যে দুশো বছর আগেকার এই প্রতিটি কথা সত্য, মিথ্যা নয় ; অজানা অচেনা পূর্বপুরুষদের কথা ভেবে চোখে জল এসেছে  । একইসাথে জীবন যে বিলাসী আভিজাত্য এবং চরম অসহায়ত্ব ও কষ্টে কাটতে পারে, তার এক দলিল "নারাচ" ।  
বইটির দ্বিতীয় খন্ডের জন্য সাগ্রহে প্রতীক্ষা করছি ! অনেক বেশী যত্ন আর শ্রমে লেখা এই বইটি, অতি আবশ্যিক ভাবে সবার পড়া উচিত ।
বইটা পড়তে পড়তে, শেষের দিকে নিজেকে মিলিয়ে ফেলেছি একটা চরিত্রের সাথে, তার নাম "ভুবনমণি" ৷ জীবনের অনেক ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে জাদুর মতোন যখন একান্তই নিজের ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সন্ধান সে পেলো, তখনই তাকে হারিয়ে ফেলতে হলো তার সেই প্রেম, সেই ভালোবাসা ! অন্যের জন্য জিতে গিয়েও নিজের কাছে হেরে যাওয়া এক মানবীর সাথে মিলেমিশে গিয়েছি প্রতিটি অক্ষরে অক্ষরে !
Profile Image for Habib Rahman.
76 reviews1 follower
July 25, 2024
নারাচ একটি পৌরাণিক অস্ত্র। মহাভারতে উল্লেখিত এই লৌহপ্রহরণে ধরাশায়ী করা যেত একাধিক মানুষ অর্থাৎ 'নর'কে। সেই থেকেই নারাচ। এই উপন্যাসে নারাচ অস্ত্রের মতোই শাণিত ও ক্ষুরধার কিছু অত্যাচারিত মানুষের সব হারিয়েও বারবার উঠে দাঁড়ানোর লড়াকু সংগ্রামকে তুলে ধরা হয়েছে।

মশাট গ্রামের পুরোহিত কৃষ্ণসুন্দর চট্টোপাধ্যায়। স্ত্রী-সন্তান ও এক বিধবা বোনকে নিয়ে তার সংসার৷ অর্থ-বিত্তের প্রাচুর্য না থাকলেও সংসারে সুখের অভাব নেই। মন্দিরের পুরোহিত হিসেবে সম্মান আর জমিদারের কৃপাদৃষ্টিতে কৃষ্ণসুন্দরের দিনকাল সুখেই কাটছে৷ তবে যত হাসি তত কান্না বিধি মেনে তাদের জীবনেও দুঃখ তার করুণ পরশ নিয়ে একদিন আসে। গোসল করে ফেরবার পথে কৃষ্ণসুন্দরের বোন ভূবণমণি ধর্ষিত হয়। বেদনাদায়ক সে ঘটনার পর সমাজের তথাকথিত সুশীলদের হাত থেকে বাঁচতে রাতের অন্ধকারে কৃষ্ণসুন্দর গ্রাম ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়েন সপরিবারে। চেনা পরিবেশ ছেড়ে অচেনার সে যাত্রায় তাকে নিয়ে আসেন হরিহর নামের এক আড়কাঠি। সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে ভিনদেশে আখ খেতের শ্রমিক হিসেবে ভুলিয়ে ভালিয়ে লোক জোগাড় করাই যার কাজ। কৃষ্ণসুন্দর ও তার পাল্লায় পড়েন। জাহাজের প্রতীক্ষায় ডিপোতে অসহায় অবস্থায় বসে থাকার সময় বুঝতে পারেন গ্রামের বাঘা মোড়লদের হাত থেকে তিনি এখন জলের কুমীরের পাল্লায় পড়েছেন।


নবকিশোর দত্ত জাতে বণিক। ছোটখাটো নানা ব্যবসার পাশাপাশি তার রয়েছে পাখি সাপ্লাইয়ের ব্যবসা। তবে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা তার আদম ব্যবসা। সুদূর কংগো কি সুরিনামে লোক পাঠানোর একজন এজেন্ট সে। এই করে বিরাট অর্থ-বিত্তের মালিক হলেও তার চিত্তে সুখ নেই৷ তিন বউয়ের ঘরেও এখনো যে সন্তান হলো না কোনো৷ এত অর্থ-সম্পত্তি কি শেষমেশ কাকে-বগে খাবে? তা তো হতে দেয়া যায় না। একটি সন্তান লাভ করতে, নির্দিষ্ট করে বললে একটি পুত্র সন্তান লাভ করতে দ্বারস্থ হোন পন্ডিত শ্রেষ্ঠ ধনঞ্জয় এর কাছে। এর আগে বহু লোকের সন্তান লাভের উসিলা ছিলেন ধনঞ্জয় পন্ডিত। নবকিশোরদের মত মাঠে বীরসিংহ কিন্তু খাটে ভেজা বিড়ালদের সাহায্য করেছেন নানা ভাবে। বিনামূল্যে নয়, বিরাট অর্থের বিনিময়ে। সৌভাগ্যবশত নব দত্তের টাকার কমতি নেই। আর টাকা থাকলে কি না পাওয়া যায়! ধরাকে সরা জ্ঞান করা যায়। ধর্ম-বিবেক-বুদ্ধি তুচ্ছ জ্ঞান করে চাহিদামাত্র কাঙ্খিত বস্তু হাতে পাওয়া যায়। তাই তো পুত্র লাভের উদ্দেশ্যে দশ বছর বয়সী শিশু অপালাকে বিয়ে করতে মধ্যবয়সী নবকিশোর দুবার ভাবেন না। পুত্র লাভ যে করতে হবে। পুত্র বিনা পরকালে পুন্নাম নরকে বাস করতে চান না তিনি। তাতে অপালার মত দু'চারটে মেয়ের জীবন তিনি থোড়াই কেয়ার করেন। সুবিশাল ভারতবর্ষে পিতার গলায় বিধে থাকা কন্টকসম কন্যার অভাব যে নেই। অষ্টবর্ষী কন্যা বিদায়ের কুসংস্কারের ব���ড়াজালে কত কন্যার যে জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে। আহা!



নারাচ বইটি পড়বার সময় আমার কেন জানি বারবার দুটি বইয়ের কথা ভীষণ মনে পড়ছিল। একটি ওবায়েদ হকের আড়কাঠি আরেকটি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই সময়। আড়কাঠিদের নৃশংসতা ওবায়েদ হকের উপন্যাসে ঠিক তেমনভাবে ফুটে না উঠলেও নারাচে তা রোমহষর্ক রূপেই লেখক তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে সেই সময় এর মতো নারাচেও উনিশ শতকের রবীন্দ্রনাথ,দ্বারকানাথ, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর মত নানা কীর্তিমান পুরুষের কথার পাশাপাশি উঠে এসেছে ভারতবর্ষের প্রথম বাঙালি মহিলা চিকিৎসক ডঃ কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় এর কথা। ইতিহাসের পাতায় স্বাক্ষর রেখে যাওয়া এসব মানুষের কথা পড়ে মন রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে৷
তবে নারাচের বিশেষত্ব শুধু অতীত রোমন্থন নিয়ে নয়৷ সমাজের নানা অনাচারের বিরুদ্ধে কিছু সাহসী, হাল না ছাড়া মনোভাবের মানুষের পৌরাণিক অস্ত্র নারাচের মতোই অন্যায়কে ধরাশায়ী করবার কথাই এ উপন্যাসের মূল উপজীব্য।


নারাচে আড়কাঠি এবং তাদের লোভের বলি হওয়া সাধারণ মানুষের দাসত্বের বেড়িজালে বন্দী হবার নির্মমতা উঠে এসেছে। অর্থলোভে অন্ধ মানুষের নীচ মনের পরিচয় পেয়ে আমরা শিহরিত হয়ে উঠি। তবে নারাচ শুধু ইতিহাসের এই কালো দিকটিই তুলে ধরেনি। তুলে ধরেছে বাল্যবিবাহের মত ভয়াবহ এক ব্যাধির কথা। কুসংস্কারাচ্ছন্ন যুক্তিবোধহীন মানুষের কাছে ফুলের মত নিষ্পাপ অপ্রাপ্তবয়স্কা মেয়েদের নিষ্পেষিত হতে দেখে হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। মাত্র দশ বছরে স্বামী সোহাগের তীব্রতায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অপালা কিংবা ফুলমণির হৃদয়বিদারক পরিণতি মনে রক্তক্ষরণ করে।

নারাচের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ধর্মের ঝান্ডা থেকে মনুষ্যত্বের ঝান্ডাকে উঁচিয়ে তোলার লেখকের প্রয়াস। তাই তো শুক্লসুন্দর ভালোবাসার টানে হয়ে যান বুলবুল মিয়া। যিনি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতেন ধর্মের অযৌক্তিক অনুশাসনকে। যিনি বিশ্বাস করতেন একটি মাত্র ধর্ম—মনুষ্যত্বে। যিনি কোনো ভেদাভেদ ছাড়াই বড় করছিলেন কন্যাকে। নাম রেখেছিলেন ভালোবাসা। এই ভালোবাসার টানে ভালো ঘরের হিন্দুর ছেলে হয়েও মুসলমান বাইজির টান উপেক্ষা করতে পারে না চন্দ্রনাথ। ভালোবাসা কি দেশ,ধর্ম,বর্ণ,গোত্রের সীমা মানে?


আমার কাছে নারাচের সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ ছিল মেটিয়াবুরুজ। ইংরেজদের কাছে রাজত্ব হারাবার পরে নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ কলকাতার মেটিয়াবুরুজে এসে বসবাস শুরু করেন। আমৃত্যু এখানেই ছিলেন নবাব। আজীবন ভাবুক দার্শনিক নবাব ছিলেন কাব্য,শায়েরী, নাচগান ছাড়া সবকিছুর প্রতি চির উদাসীন। একমাত্র শখ ছিল চিড়িয়াখানায় নানা অদ্ভুত পশুপাখি সংগ্রহ এবং মনপছন্দ আওরাতদের মুতআ বেগম করে নেয়া। রাজত্ব হারাবার পর সেই মুতআ বেগম আর তাদের ঔরসে জন্মানো সন্তানদের সবাই নবাবের সাথে মেটিয়াবুরুজে আশ্রয় নেয়৷ আশ্রয় নেয় নবাবের শখ পূরণের পাশাপাশি নিজের আখের গোছানোর অভিসন্ধি নিয়ে আসা নানা কিসিমের মানুষ। যতদিন নবাব ছিলেন মেটিয়াবুরুজ ছিল ঝকঝকে, তকতকে। যেন কলকাতার মধ্যে এক টুকরো সেই প্রাচীন লখনৌ৷ তবে এত আনন্দের মাঝে সবচেয়ে বড় ট্রাজেডিটা ছিল বোধহয় নবাবের কাছের দুই নরনারীকে ঘিরে। মেটিয়াবুরুজের কসবি মোতি আর নবাবের গায়ক চন্দ্রনাথের শেষ পরিণতি ছিল মেটিয়াবুরুজের নবাবের মতোই করুণ। জীবন সায়াহ্নে তীব্র একাকীত্ব ভোগ করা ভাবুক নবাবের প্রতি আমার মন যেন কেমন করে ওঠে। আবার মোতি আর চন্দ্রনাথের করুণ পরিণতিতে নবাবেরও পরোক্ষ হাত ছিল মনে হলে মেটিয়াবুরুজের আখতার পিয়া নবাবের প্রতি জাগে ঘৃণা ।

বইয়ের সর্বশেষ অংশে ছিল টাইটানিক জাহাজডুবির ঠিক ২৫ বছর আগে হওয়া এক হৃদয়বিদারক ট্রাজেডি। এ সম্পর্কে খুব সম্ভবত ম্যাসন সিরিজে পড়েছিলাম। তবুও তৈরি থাকবার পরেও সে ঘটনা মনকে করে তোলে বেদনা ভারাক্রান্ত।

নারাচ উপন্যাসে সেই অর্থে প্রোটাগনিস্ট যাকে বলে তেমন কেউ নেই। শুরুতে অন্যায়ের সামনে মাথা নত করে থাকা মিনমিনে স্বভাবের কৃষ্ণসুন্দর যখন আদিবাসীদের জমি দখলের অন্যায় এর প্রতিবাদ করে তখন আমার কাছে সে-ই নায়ক। আজীবন অসূর্যম্পশ্যা দয়াময়ী যখন লজ্জা ভেঙে সতীনের জীবন রক্ষার্থে বেরিয়ে পড়েন তখন তাকেই মনে হয় গল্পের নায়িকা৷ ট্রাজেডিকে পিছনে ফেলে নতুন করে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখা ভূবণমণি কিংবা শত বাধা পেরিয়ে ডাক্তার হতে চাওয়া কাদম্বিনী সবাই এ গল্পের প্রোটাগনিস্ট । এছাড়া বইয়ের প্রতিটি চরিত্রই তা যত ছোট হোক না কেন, মনে একেবারে দাগ কেটে দিয়ে যায়। ভূবণমণির সাথে জানালার পাশে বসে যুবক সৌরেন্দ্রের অপেক্ষায় তাই আমিও বসে থাকি।
লেখকের চরিত্রায়ন তাই সর্বক্ষেত্রে সার্থক৷ কৃষ্ণসুন্দরের দুঃখে আমরা দুঃখীত হই, সব হারানো ভূবনমণিকে বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজে পেতে দেখে আমরা উল্লাসিত হই। আবার প্রতিটি খল চরিত্রই তাদের প্রতি মনে ভীষণ বিবমিষা জাগায়। নবকিশোর দত্ত কিংবা ধনঞ্জয় পন্ডিতের প্রতি জিঘাংসায় তাদের টুটি চেপে ধরতে ইচ্ছে করে। বইয়ের সাদা কাগজে কালো কালো হরফে এসব চরিত্রের সাথে সাবলীল লেখনীতে পাঠকের মনকে এক করে দিয়েছেন লেখক৷ তাই তো বলতে হয় পাঠককে বড়শিতে গেথে ফেলার বিদ্যা লেখক ভালোই রপ্ত করেছেন।

বইয়ের শেষে অনেক প্রশ্নের উত্তর লেখক দেননি। পরবর্তী খন্ডে সেসব প্রশ্নের উত্তর পাবার প্রতীক্ষায়।
Profile Image for Rehnuma.
447 reviews21 followers
Read
August 15, 2024
❛পৌরাণিক এক অমোঘ অ স্ত্র ❛নারাচ❜। কুরুক্ষেত্রের ময়দানে ভীষ্মের হাতের এই ধারালো বস্তু একত্রে নাশ করতে পারত অনেক নর অর্থাৎ মানুষকে।❜

মশাট গ্রামের পুরোত মশাই কৃষ্ণসুন্দর চট্টোপাধ্যায়। স্ত্রী, দুই কন্যা এক পুত্র আর বিধবা ভগিনীকে নিয়ে সুখেই দিন যাচ্ছিলো। তৎকালীন ব্রাহ্মণ গোড়া সমাজে থেকেও কৃষ্ণ মশাই এক অন্য ধাতে গড়া মানুষ ছিলেন। কন্যাদের শিক্ষা দিচ্ছেন। তার স্ত্রী শুধু শয্যাসঙ্গী নয় আক্ষরিক অর্থেই সহচরী হয়ে সংসার ধর্ম পালন করছেন। তাইতো সুখে দিনযাপন করছিলেন। কিন্তু ঐযে সুখের পরে দুঃখের অধ্যায় আসেই তেমনটাই এসেছিল তাদের পরিবারে। এক দুপুরে স্নান সারতে গিয়ে বিধবা ভগিনী ভুবনময়ী শিকার হয়েছিল কিছু পুরুষের লালসার। গোড়া সম্প্রদায় তাদের ছিঁড়ে খাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল পাপমোচনের নামে। সেই থেকেই বাঁচতে এক ভোরে পরিবার নিয়ে তিনি চলে এলেন কলকাতায়। উপলক্ষ হরিহর নামে এক আড়কাঠির দেয়া চাকরির আশ্বাস।
কিন্তু বিধিবাম। ঝামেলা পিছু ছাড়ে না। কলকাতায় এসে এক ডিপোতে কঠিন দিনাতিপাত করতে করতে একসময় জাহাজে চড়ে বসতে হয় আখ ক্ষেতের ইন্ডেনচার্ড নামের দাসত্বে। কোন সে দেশ সুরিনামে তাদের দাসত্বের শিকল পরে থাকতে হবে কতজীবন কে জানে!?

পিতার প্রয়াণের পর তার দেয়া এক পত্র হাতে কলকাতায় আগমন চন্দ্রনাথের। মেটিয়াবুরুজের নবাবের কাছে যদি তার গুণের কোনো মর্ম পেয়ে যায় তো।
লক্ষণৌয়ের বিতাড়িত নবাব ঘাটি গেড়েছেন এই মেটিয়াবুরুজে। সারাদিন নিজের গান, পশুপাখি সংরক্ষণ এসবই কাটিয়ে দেন। মেটিয়াবুরুজ ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের ঊর্ধ্বে এক স্থান। এখানে গুণের কীর্তন হয়। চন্দ্রনাথও নিজের গানের গুনে নবাবের সুনজরে আছে। দিন চলছে ভালো।

নবকিশোর দত্ত জাত ব্যবসায়ী। তৎকালীন সমাজে বহুপত্নী আর তাদের ইচ্ছেমত ভোগের ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত পুরুষ। এত প্রতিপত্তির মাঝেও তার দুঃখ কোনো উত্তরসূরি নেই। এই আশায় তিনটে বিয়ে করেছেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পুত্রলাভ তো দূর কোনো সন্তানই জোটে নি কপালে। তার সমস্যার সমাধানে তাই কাজ করছেন ব্রাহ্মণ পন্ডিত ধনঞ্জয়। উপায় বাতলে দিচ্ছেন। তদবির চলছে উঁচু প্রণামিতে। কিন্তু ফলাফল শূন্য। এবার তাই পন্ডিত মশাই দিলেন ব্রাহ্মণ নবম দশ বয়েসী কন্যাকে বিয়ের উপায়। অপালাকে তাই ঘরে তুললেন তিনি। বাল্যবিবাহ সাথে শিশু কন্যার সাথে সহবাসে অপালা একেবারে শেষ হয়ে গেলো।
তখন সমাজে চলছে নানা আইনের প্রবেশ। বিধবাবিবাহ চালু, সহবাস সম্মতি আইন, বাল্যবিবাহ রোধ নিয়ে কাজ করছে সে সময়ের নারাচের মতো ক্ষুরধার ব্যক্তিরা। পিছিয়ে নেই গোড়া হিন্দু সমাজ। তারাও ধর্মের দোহাই, শ্লোকের ব্যবহার করে ইংরেজ আর মাথা পা গল ব্রহ্ম সমাজের এইসব কাজের বিরোধিতা করছে। সে সময়েই ছিল দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়, বাঙালি প্রথম নারী ডাক্তার কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্ব। সমাজের এইসব জঞ্জাল পরিষ্কারে তারা কাজ করে যাচ্ছেন নিয়মিত। অপালার মতো মেয়েদের বাঁচাতে আরেকদিকে তাদের বলি দিতে চলছে নানা পক্ষ বিপক্ষের খেলা। হিন্দু সমাজ প্রাচীন রীতি ভুলে মনগড়া কিছু নিয়মে আবদ্ধ রেখেছে নারীদের। সে সময়ের প্রায় ৯০ভাগ নারীরই ছিল এই দশা। তাদে মধ্যে থেকে কাদম্বিনীরা নিজেদের ব্যক্তিত্বকে তুলে ধরছে ধারালো ভাবে। সমাজ সংস্কার চলছে।
অপালা, লোপদের মতো কিশোরীদের জীবন রক্ষা পাবে কি?

নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ কী নিয়ে যেন দুঃখে ভাসছেন। কার প্রস্থানে এত ব্যথিত তিনি? বারবার বলছেন,

❛সব মুঝে ছড়কে চালা য্যাতা হ্যা। কেয়া মে ইতনি বুড়া হু? উয় কাহা গায়?❜
মেটিয়ার শান শোকাত মিলিয়ে যেতে থাকে নবাবের প্রয়াণে। স্ক অসীম দুঃখ, একাকীত্বের বোঝা নিয়ে তিনি পরপারে পাড়ি জমান। শেষ হয়ে যেতে থাকে কলকাতার বুকে এক টুকরো লক্ষণৌ।

চন্দ্রনাথের জীবনে এমন কী ঘটনা ঘটলো যে সে লাপাতা হয়ে গেল? অপালা, লোপা, ভুবন বা কৃষসুন্দরদের জীবনের ভবিতব্য কী?


পাঠ প্রতিক্রিয়া:

❝নারাচ❞ দেবারতি মুখোপাধ্যায়ের লেখা ঊনবিংশ শতাব্দীকে ঘিরে এক ঐতিহাসিক উপন্যাস।

নারাচ নামের সাথেই মিল রেখে উপন্যাসে এসেছে নানা কাহিনি। এসেছে ক্ষুরধার মস্তিষ্কের মানুষের কাজের সাথে কুচক্রী মহলের নানা ঘটনা।
উপন্যাসটাকে কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। মেটিয়ার নবাব, কৃষণসুন্দরের পরিবার, নবকিশোর দত্তের ঘটনা, কাদম্বিনীদের ইতিহাস।
অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণনা দেয়া হয়েছে প্রতিটা ভাগের। উপন্যাসের গল্পের সাথে এসে মিশেছে ঊনবিংশ শতকের এক টুকরো ইতিহাস। ভারতবর্ষে যখন চলছে নানা কুসংস্কার প্রথার উচ্ছেদ আর একে ধীরে একশতে বিপক্ষের তর্ক বিতর্ক। জাত গেলো দোহাই দিয়ে যারা পুরুষত্ব দেখিয়ে নারীদের ভোগ্য বস্তু খেলনায় রেখে দিচ্ছে তাদের হম্বিতম্বি। তাদের কণ্ঠকে রোধ করতে নারাচের মতো যারা কাজ করে যাচ্ছে তাদের কথা এসেছে।
��ুরো উপন্যাসে সে সময়ের নানা ঘটনা এসেছে। আড়কাঠিদের কথা এসেছে। কীভাবে তারা ফুসলিয়ে মানুষের জীবনকে নরকের দুয়ারে পৌঁছে দেন তার নির্মম দৃশ্য এসেছে কৃষ্ণসুন্দরের পরিবারের পরিণতির মাঝে।
উপন্যাসের সবথেকে সুন্দর দিক অতীতের আলোক সেই সময়ের ঐতিহাসিক চরিত্রদের উপস্থিতি এবং সে বর্ণনাগুলো ছিল মনোমুগ্ধকর। পড়েছি আর অবাক হয়েছি। কাদম্বিনীকে নিয়ে সিরিয়াল হতো আমি সেটা দেখেছিলাম। উপন্যাস পড়তে গিয়ে সে চরিত্রটাই চোখে ভাসছিল। এই বর্ণনাগুলো দারুণ ছিল।
নির্মমতা আর করুণ ছিল কৃষ্ণসুন্দরের দুর্দশা। দাস প্রথা বিলুপ্ত হলেও একটা শব্দের মাধ্যমে যেভাবে দাস প্রথার প্রতিশব্দ চালানো হচ্ছিল সুরিনাম দেশে সেই চিত্র ছিল হৃদয়বিদারক।
সে সময় নারী, কিশোরীদের উপর হওয়া যে সুবিধাবাদী মহলের অত্যাচার তার নির্মম বলির ঘটনাগুলো পড়ে বেশ খারাপ লেগেছে। আজকের এই পর্যায়ে আসতে নারীদের সহ সমমনা কিছু মানুষদের কত কিছু সহ্য করতে হয়েছে উপলব্ধি করা যায়। এত দারুণ ভাবে সে ঘটনাগুলো এসেছে এখানে মনে হচ্ছিল আমি নিজেই সে সময়ে ফিরে গেছি।
উপন্যাসের সবথেকে আলোকিত জায়গা মেটিয়াবুরুজকে এঁকেছেন দারুণ স্নিগ্ধতায়। সেখানে যেমন মুগ্ধতা ছিল তেমন ছিল বিষাদের ছোঁয়া। অসাম্প্রদায়িক মনোভাব ছিল। তাইতো বুলবুল খাঁ হতে পেরেছিলেন ধর্ম, বর্ণের ঊর্ধ্বে। যেখানে ভালোবাসা কথাটাই আসল। মোতি আর চন্দ্রনাথের করুন পরিণতি দুঃখ দিয়েছে। সব ঠিক থাকলেও বিধাতার বিধান মাঝেমাঝে বেজায় নির্মম। তাইতো করুণ ঘটনাকে এড়ানো যায় না। এতকিছুর মাঝেও আশার আলো ছিল একদিন সব ঠিক হবে।
উপন্যাসে টাইটানিকের আগেও এর থেকে করুণ জাহাজডুবির ঘটনা এনেছেন। যেটা ইংরেজদের কষাঘাতে সমুদ্রেই তলিয়ে ছিল। ইতিহাসের পাতায় ❛নেটিভ❜ বলে সেই করুণ জাহাজ ডুবির ঘটনা চাপা পড়ে গেছে। লেখিকার উদ্যোগে সেটা জানা হলো। এই ঘটনার মাঝে যেটুক গল্প ছিল সেটা হৃদয়কে ব্যথিত করতে যথেষ্ট।

সমাজের জঞ্জালে থাকা এইসব নিয়ম কানুনের দোহাই থাকলেও সেই সময়ের কিছু নারাচের মধ্য ধারালো ব্যক্তিদের দ্বারা নিয়ম কেটেছে সূক্ষ্মভাবে। নাহয় আজও নিপীড়িত হতে হতো বা মাত্র আরো বৃদ্ধি পেতো।

চরিত্র:

উপন্যাসে অনেক চরিত্রের সমাগম। ফিকশনের পাশাপাশি এসেছে ঐতিহাসিক বড়ো সব নাম। উপেন্দ্রকিশোর, কাদম্বিনী, দ্বারকানাথ, রবি ঠাকুর সহ ঐতিহাসিক চরিত্রগুলো উপন্যাসের শ্রী বৃদ্ধি করেছে অনেক।
কৃষ্ণসুন্দর, ব্রহ্মময়ী কিংবা ভুবনের মতো চরিত্রগুলো মনে দাগ ফেলেছে। ভালো লেগেছে দয়াময়ীকে। আজীবন যাঁতাকলে থেকেও যে সত্যের প্রতিষ্ঠায়, অন্যায় রুখে দিতে ধারালো অবদান রেখেছেন তাদের কথা মনে দাগ না ফেলে পারে?
নবাবকে বেশ লেগেছে। বুলবুল কিংবা চন্দ্রনাথ বা মোতি তাদের উপস্থিতিও ছিল দারুণ।
সব মিলিয়ে প্রতিটা চরিত্র তাদের নিজেদের অবস্থানে ছিল দারুণ।

❛ইতিহাস সাক্ষী রয়ে যায়। সমাজে নিয়ম অনিয়ম তৈরি আর ভাঙতে এমন ধারালো কাউকে দরকার। দরকার দাসত্বের শিকল থেকে মুক্তি পেতে সাহস।❜


Profile Image for Chandan Nandi.
7 reviews
May 16, 2021
পাঠ প্রতিক্রিয়া - নারাচ
লেখিকা - দেবারতি মুখার্জী
প্রকাশক - পত্রভারতী

অসাধারণ। শুধুমাত্র এই একটি শব্দটি লিখে অবলীলায় পাঠ প্রতিক্রিয়া শেষ করতে পারতুম। কিন্তু মনে হলো তাতে অন্যায় হবে। খুব সাম্প্রতিক কালে এতো দুরন্ত উপন্যাস খুব পড়িনি। উনিশ শতকের পটভূমিকায় এই উপন্যাস তৎকালীন হিন্দু সমাজের ক্ষত গুলো ছুঁয়ে গেছে। শুধু আইন প্রণয়ন করে যে কোনো সামাজিক প্রথা - অর্থাৎ বাল্য বিবাহ -রোধ করা যায়না, প্রয়োজন হয় দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী মহাশয়ের মতো একজন শানিত অস্ত্রের যা মহামহিম ভীষ্যের মতো একসাথে শত শত্রুর বক্ষ একসাথে বিদীর্ণ করবে। আর সেই অস্ত্রই হলো নারাচ। সার্থক নামকরণ। পন্ডিত ব্রাহ্মণ কৃষ্ণসুন্দর এবং তার পরিবারের কথা , ব্রাহ্ম সমাজের অন্দরের কথা,মেটিয়াবুরুজ নবাবের কথা এই উপন্যাস ছুঁয়ে যায় ইতিহাসে অলি গলি।
দোয়াত থেকে কালি ব্লটিং পেপারে পড়লে যেমন ব্লটিং পেপার তা শুষে নেয় তেমনি করে পাঠকের ঋদয় এই উপন্যাসটির কাহিনি শুষে নিলো। আহঃ কি তৃপ্তি। আপনি থাকছেন ম্যাম।
Profile Image for Jiya...
59 reviews1 follower
February 27, 2023
আমার মতোই যাদের পাঠ্য বইয়ের ইতিহাস পড়তে ভালো লাগে না, সেইসব পাঠকের মনে ইতিহাসের নেশা ধরিয়ে দেওয়ার মত বই। আমার মনে হয় এই বইটা সম্পর্কে বেশি কিছু বলা মানে স্পয়লার দিয়ে দেওয়া, কারণ এর প্রতিটা পাতায় রয়েছে নতুন নতুন চমক, যা পাঠককে ভাবাতে বাধ্য করবে। উপন্যাসে কিছু কিছু দৃশ্য ঠিক থ্রিলার উপন্যাসের মতো গায়ে শিহরণ ধরিয়ে দেবে।
বইটাকে কোন বিশেষণে বিশেষিত করব সত্যিই বুঝে উঠতে পারছি না। লেখিকা লেখনিতে সত্যিই জাদু আছে। আর কিছু নয়, এখন অপেক্ষা শুধু বইটার second part এর।
Displaying 1 - 30 of 120 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.