গবেষক, ক্ষেত্রসমীক্ষক এবং সংস্কৃতির লোকায়ত ও ধ্রুপদী রূপে বিশেষজ্ঞ সুধীর চক্রবর্তী'র সম্পাদনায় একদা 'ধ্রুবপদ' নামে একটি বার্ষিকী প্রকাশিত হত। সেই সংকলন যাঁরা পড়েছেন (অধমও সেই গোত্রভুক্ত ছিল) তাঁরাই জানেন, বাঙালির জীবন ও সংস্কৃতির নানা দিক নিয়ে চর্চার ক্ষেত্রে কতটা মূল্যবান ছিল ওটি।
সেই বার্ষিকীগুলোর মধ্যে কয়েকটি পরবর্তীকালে পরিমার্জিত ও সামান্য অন্য রূপে বই হয়ে পাঠকের সামনেও এসেছে। আলোচ্য বইটিও একটি বার্ষিক সংকলনের চারটি লেখা সরিয়ে পাঁচটি নতুন লেখা যুক্ত করার ফলশ্রুতি।
সম্পাদকীয় 'আত্মপক্ষ' এই বইয়ের পরিপ্রেক্ষিতটি বুঝিয়ে দিতে চেয়েছে। শ্রীচক্রর্তী যা লিখেছেন সেটাই উদ্ধৃত করি: "সাধারণভাবে গবেষণা বা গবেষক বললে আম-পাঠকের মনে এক ভীতিজনক সম্ভ্রমপূর্ণ দূরত্ব তৈরি হয়। তার কারণ আমাদের বেশিরভাগ গবেষণা গ্রন্থ থান-ইট মার্কা, পাদটীকাকণ্টকিত, ডিগ্রিকামী এবং গবেষকদের দুর্দান্ত পাণ্ডিত্যপূর্ণ সত্তার সগর্ব ঘোষণা।... অথচ এমন বহু গবেষক আছেন যাঁদের অনুসন্ধিৎসার অভিযানে ঘটে নানা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।"
তেমনই তেরোজন গবেষকের নানা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা স্থান পেয়েছে এই বইয়ে।
লেখাগুলো হল~
১. রুশতী সেন-এর 'অনুসন্ধানের গল্প'— বিভূতিভূষণের লেখা আর মানুষটির সন্ধানে গবেষক নিজেই যে কীভাবে পথের দেবতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে এগিয়ে গেছিলেন হাসি-কান্না আর বন্ধুর-কমনীয় অনুভূতিতে ভরা পথে, সেটিই বিধৃত হয়েছে এই প্রবন্ধে।
২. সত্যজিৎ চৌধুরী'র 'গবেষণার রকমফের'— মাঠ থেকে কুমিরের কঙ্কাল উদ্ধার, সুকুমার সেনের মধ্যে এক কনিষ্ঠ ও কিঞ্চিৎ খ্যাপাটে ইতিহাসের অধ্যাপককে প্রণামের বাসনা জাগা, দেশে প্রথম বারুদের কারখানা স্থাপনের ইতিহাস— এমন আরও নানা কথা আর ছবিতে এই প্রবন্ধটি সাদা-কালো হয়েও একেবারে রঙিন!
৩. পথিক গুহ'র 'একটি উপন্যাসের নেপথ্য কাহিনি'— অস্ত্রোপচারের ইতিহাসের সূত্র ধরে গথিক মননে বিজ্ঞান-ভাবনার অনুপ্রবেশ এবং এক আধুনিক প্রমিথিউসের নিষ্ফল ব্যর্থতার গল্প শুনিয়েছেন প্রাবন্ধিক।
৪. প্রভাতকুমার দাস-এর 'যাত্রার সঙ্গে বেড়ে ওঠা'— আমার ছোটোবেলার সীমিত সংখ্যক সুখস্মৃতির অন্যতম ছিল মাঠে পুরু করে পাতা চটে ঠাকুমার গায়ে হেলান দিয়ে ঢুলতে-ঢুলতে যাত্রা দেখার অভিজ্ঞতা। মাত্র ক'দিন আগে পার্চমেন্টের কর্ণধার ফাল্গুনী'র কাছে আক্ষেপ করেছিলাম, বিনোদনের এমন ঐতিহ্যময় ঘরানাটি নিয়ে কেন কাজ হয় না। কপালক্রমে তার পরেই পেলাম এই অসাধারণ লেখাটি!
৫. সমীর সেনগুপ্ত'র 'সোনার হরিণ চাই'— ঠিক কোন প্রেরণা থেকে ইতিমধ্যেই স্বক্ষেত্রে সফল এক মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজে, সে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতাসমূহ আকলন হোক বা রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকে উদ্ধৃতি-সংগ্রহ বা তাঁর গানের ইতিহাস খুঁজে বের করা, সবেতেই একইরকম উৎসাহ নিয়ে ঝাঁপাতে পারেন? উত্তর পাওয়া যাবে এই প্রবন্ধে।
৬. শীলাঞ্জন ভট্টাচার্য'র 'মানুষ-রতন'— বাদাবনের জল, মাটি, আকাশ মানুষের মধ্যেও কী জাদু ছড়িয়ে দেয়, সেই নিয়ে রচিত হয়েছে এই ছোট্ট লেখাটি।
৭. সর্বানন্দ চৌধুরী'র 'অপাবৃণু'— গানের নেশা যে মানুষকে কাঁদায়, হাসায়, উন্মনা করে, এমনকি তার ঘর-দোর ভাসিয়ে দেয়— এ আমরা জানি। সেই শুদ্ধতার নেশায় মগ্ন হয়ে হারিয়ে যাওয়া গানের পদ আর সুরসন্ধানী এক গবেষকের গল্প আছে এই প্রবন্ধে।
৮. অনুরাধা রায়-এর 'বোকা বসন্তের গল্প'— এও এক সোনার হরিণের পেছনে ছোটার গল্প। তবে এতে যে দূর্বাদলশ্যাম নায়কদের আমরা বনের গভীরে হারিয়ে যেতে দেখি, সেই চিন্মোহন সেহানবীশ বা খালেদ চৌধুরী'র মতো মানুষদের আমরা 'সত্যি' বলে চিনি। হয়তো সেজন্যই তাঁদের ব্যর্থতা আর ছদ্মবেশী রাবণের অট্টহাসিটা বড়ো বেশি মনে বাজতে থাকে।
৯. অজয় কোনার-এর 'অনুসন্ধান: মানুষের দরবারে'— ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা-র দ্রষ্টব্য থেকে নানা গ্রামীণ উৎসবের মধ্যে কীভাবে ছড়িয়ে থাকে অকথিত, অচর্চিত, অথচ সত্যিকারের ইতিহাস, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সেটাই দেখিয়ে প্রাবন্ধিক।
১০. সুশোভন অধিকারী'র 'রবিঠাকুরের ছবি: গবেষণা গালগল্প'— মানুষটির বিপুল সৃষ্টির ভগ্নাংশও আমরা এক জীবনে উপলব্ধি করে উঠতে পারি না। তাঁর যে অংশটি সবচেয়ে দুর্জ্ঞেয় জ্ঞানে আমরা এড়িয়ে চলি, সেই চিত্রকলা অনুসন্ধানের ইতিহাস আর সেই সূত্রে উন্মোচিত নানা তথ্য পরিবেশিত হয়েছে এই প্রবন্ধে।
১১. শক্তিনাথ ঝা'র 'লোকধর্মের বাহান্ন বাজার'— ভদ্রসভ্য সংস্কৃতি আর ধর্মের রাজপথের বাইরেও আছে অনেক অলি-গলি। সেই পথ আর তাতে হাঁটা মানুষদের দিকে আমরা সোজা চোখে তাকাই না। তেমনই কিছু পথ ও পথিকের কথা এই প্রবন্ধে লিখেছেন প্রবাদপ্রতিম গবেষক ও ক্ষেত্রসমীক্ষক।
১২. নিত্যপ্রিয় ঘোষ-এর 'এক না-গবেষকের না-গল্প'— রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করার 'অপরাধে' নানা লাঞ্ছনা তথা রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি দিয়েই তাদের অতিক্রমের জোর পাওয়া নিয়ে লিখেছেন প্রাবন্ধিক।
১৩. কুণাল চক্রবর্তী'র 'মধুর রসের সন্ধানে'— মিষ্টি আর বাঙালির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের তত্ত্বতালাশ করতে বেরিয়েছেন প্রাবন্ধিক। কিন্তু সেই সূত্রেই তাঁর লেখায় ধরা পড়েছে সমাজ, অর্থনীতি, আর পুরোনো পেশা হারিয়ে যাওয়ার দীর্ঘশ্বাস।
এই সুখপাঠ্য অথচ তথ্যনিষ্ঠ, যৌক্তিক অথচ সৎ লেখাগুলো পড়তে গিয়ে কী হল জানেন? বাংলার নগর আর গ্রাম, তাদের পালটে যাওয়া চেহারা, পালটাতে থাকা মানুষজন আমার সামনে উজ্জ্বল হয়ে ধরা পড়ল নতুন করে। সঙ্গে রইল কিছু ব্যথিত বাতাস, কিছু হারানো ইতিহাস, আর অনেক হারিয়েও টলটল করে ওঠা সংস্কৃতির ধারাটি।
সুযোগ পেলে এই বইটি অবশ্যই পড়ুন। বাংলায় এত ভালো বিবিধবিদ্যাসংগ্রহ, সেও আবার এমন ন্যায্য মূল্যে, আমরা পড়তে পাই না কিন্তু।