মহাভারত ভারতবর্ষের মানুষের মানুষিক আশ্রয়। ধিরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য তার নতুন গ্রন্থে এবার লিপিবদ্ধ করেছেন মহাভারতের নারীদের জীবনকথা। সেই নারী যার কন্যা জায়া জননী - নানা রূপে এই মহান ভারতকথাকে সমৃদ্ধ করেছেন, কখনোবা হয়ে উঠেছেন নিয়ন্তা। যাদের প্রভাব কেবলমাত্র মহাভারতের কাহিনীতে নয়, ভাবিকালের উপরেও পড়েছে।
মহাভারতের গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্রগুলো নিয়ে আলাদা আলাদা আলোচনা করেছেন বইয়ের লেখক ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য। নারী চরিত্র সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলির সংকলন হিসেবে বইটি দারুণ।
ব্যাসদেবের মহাভারত গ্রন্থের ৬০টি নারী চরিত্র থেকে বিশিষ্ট চরিত্রগুলো নিয়ে লেখক আলোচনা করেছেন। তারা হলেন: অদিতি, উর্বশী, শর্মিষ্ঠা, দেবজানী, শকুন্তলা, গঙ্গা, সত্যবতী, অম্বিকা, অম্বালিকা, অনামিকা, গান্ধারী, জরা, কুন্তী, মাদ্রী, হিড়িম্বা, দ্রৌপদী, তিলোত্তমা, উলূপী, চিত্রাঙ্গদা, তপতী, অম্বা, সত্যভামা, সুদেষ্ণা ও উত্তরা। মহাভারতের নায়িকা হিসেবে উল্লেখ করে দ্রৌপদীর সম্পর্কে সবচেয়ে দীর্ঘ আলোচনা করা হয়েছে বইয়ে। লেখকের মতে, "পৃথিবীর চারটি আদি মহাকাব্যের সর্বাপেক্ষা তেজস্বিনী নারী দ্রৌপদী। তিনি সর্বংসহা ছিলেন না, তিনি নিঃসঙ্গ ছিলেন না-কেবলমাত্র প্রতিবাদী চরিত্রের নারীও ছিলেন না। সপত্নী থাকা সত্ত্বেও পঞ্চস্বামীর সংসারে তিনিই ছিলেন সর্বময়ী কর্ত্রী।" এই বইয়ে লেখক সাবিত্রী, সীতা, দময়ন্তী শৈব্যা ইত্যাদি চরিত্র বর্ণনা করেননি। কারণ লেখক তাদের মহাভারতের চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করেননি, তাদের ঘটনাগুলোকে সমান্তরাল কাহিনী হিসেবে দেখেছেন। নারী চরিত্রগুলির বর্ণনায় লেখক ব্যাসদেবের অনুসরণ করেছেন।
নারী চরিত্রের আলোচনায় নারীদের ভূমিকার বিশ্লেষণমূলক উপস্থাপন না করে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র ঘটনার সম্পৃক্ত অংশ বিবৃত করেছেন তিনি। তাঁর বর্ণনায় মহাভারতের ঘটনাক্রমে নারীর ভূমিকা প্রায় ক্ষেত্রেই শুধু সন্তান জন্মদানে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। এমনকি সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রেও মূল শ্লোক অনুসরণে তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে, এখানে স্বামীরা সন্তান উৎপাদন করেছেন! মহাভারতের বাণী দ্বিধাহীন সত্য হিসেবে উপস্থাপন করে তিনি সংঘটিত সকল বিবৃতি ও ঘটনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয়। লেখকের ভাষায়, "জলজ, উদ্ভিজ্জ, অণ্ডজ, জরায়ুজ - এই চার শ্রেণীর প্রাণী সম্পর্কে মহাভারতের বাণী আজও সমান সত্য। পারস্পরিক যোগাযোগের ভাষাটাই শুধু হারিয়েছে। কিন্তু বোঝার অসুবিধা হচ্ছে না এবং বিনিময়ের ভাষাটাও খুঁজে পাওয়া যাবে কিছু কালের মধ্যেই।" লেখকের মতে, মহাভারত বিশ্বের আধুনিকতম রচনা। সে কারণেই হয়তো লেখক মহাভারতের কোন নারী চরিত্রের সাহিত্যিক সমালোচনা থেকে বিরত থেকেছেন। ফলে "মহাভারতের নারী" বইটি শতভাগ সাহিত্য মানোত্তীর্ণ নয় বলে ধারণা করি। তবে মহাভারতের নারী চরিত্রগুলোর সংকলন হিসেবে বইটি প্রণিধানযোগ্য।
বইটার প্রধান সমস্যা হল এখানে শুধু নারী চরিত্রগুলো সম্পর্কিত ঘটনার বর্ণনা দেওয়া আছে। যাঁরা অল্প কিছুটা হলেও মহাভারত পড়েছেন তাঁরা সবাই কম বেশি এসব কাহিনি জানেন। কাহিনি বর্ণনা কমিয়ে চরিত্রগুলো সম্পর্কে সাধারণ আলোচনাকে প্রাধান্য দিলে ভালো হত।