মেটাল গ্রামের বাণেশ্বর ঘোষ থানা কমিটির প্রেসিডেন্ট । তার বাবা এ তল্লাটের নামকরা বিচারি ছিলো। বাপের প্রভাব প্রতিপত্তি বাণেশ্বর ভালোমতোই কাজে লাগিয়েছে ।ষাট বছরের বাণেশ্বর ঘোষ অতিশয় ধূর্ত এবং টাউট প্রকৃতির । গ্রামের সাধারণ লোক কিংবা আর দশটা গণ্যমান্য ব্যাক্তির সামনে সে যতই ভালোমানুষি ভাব ধরে থাকুক সকলেই জানে হেন কোন মন্দকাজ নেই যেটা তিনি করেন না বা করতে তার বিবেকে বাঁধে । এ গ্রামের ই একসময়ের কুখ্যাত ডাকাত ক্ষীরোদ ভক্তার ছেলে গোক্ষুর ভক্তা বাণেশ্বরের মতো বাপের গর্ব ধরে রাখতে পারে নি । তার বাবা ঢাক ঢোল পিটিয়ে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অন্যের সম্পদ লুণ্ঠন করতো কিন্তু গোক্ষুরের অতো হাঙ্গামা ভালো লাগে না । সে যা করে নীরবে নিভৃতে করে । বলতে গেলে অন্যের বাড়ির সিঁধকাটাকে সে একটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে ।
ভগীরথ মিশ্র একজন ভারতীয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক। বিশ শতকের সত্তর দশকের পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যে যারা অবদান রেখেছেন তিনি তাদের অন্যতম। তার বহু রচনা বাংলার অনেক শিক্ষার্থীর কাছে গবেষণার বিষয়বস্তু। তিনি একইসাথে একজন ম্যাজিসিয়ান এবং বনসাই বিশেষজ্ঞ।
ভগীরথ মিশ্র স্কুল-কলেজ জীবন হতে লেখালেখিতে বেশি আগ্রহী ছিলেন। সময় পেলেই কাজের ফাঁকে সাহিত্যসৃষ্টিতে লিপ্ত হতেন। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে আশুতোষ কলেজের ছাত্র থাকাকালীন তার লেখা গল্প একটি প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে এবং পরের বছর ম্যাগাজিনে তা ছাপা হয়। এরপর নবকল্লোল পত্রিকায় ‘মূলধন’ নামের একটি গল্প প্রকাশ হয়।
১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে ভগীরথ মিশ্রের গল্প ‘কদমডালির সাধু’ প্রকাশিত হয় বালুরঘাট থেকে প্রকাশিত ‘মধুপর্ণী’ পত্রিকায়। এই গল্পটি প্রশংসিত হয়েছিল। এরপর একই পত্রিকার পূজা সংখ্যায় তার গল্প ‘লেবারণ বাদ্যিগর’ প্রকাশিত হয়। এরপর তিনি উত্তরবঙ্গে গল্পকার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যান। ১৯৮১ সালের মধ্যেই তিনি প্রায় ৪০টি গল্প রচনা করেন। এরপর তিনি মহাশ্বেতা দেবীর ‘বর্তিকা’ পত্রিকায় এবং ‘প্রমা’ এবং ‘অনুষ্টুপ’ পত্রিকায় নিয়মিত গল্প লিখতে থাকেন। এরপর ‘রাবণের বয়স’ নামের একটি গল্প দেশ পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়।
১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ভগীরথ মিশ্রের গল্পগ্রন্থ ‘জাইগেনসিয়া ও অন্যান্য গল্প’ প্রকাশিত হয়। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে প্রমা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম উপন্যাস ‘অন্তর্গত নীলস্রোত’। এটি প্রথম প্রমা পত্রিকার পূজাসংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।
১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ২০০০ অবধি তার সুবিশাল উপন্যাস ‘মৃগয়া’ পাঁচখণ্ডে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসটি লেখার জন্য লেখক দশ বছর গবেষণা এবং তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। সর্বমোট ১৫ বছর সময় লেগেছিল উপন্যাসটি সম্পূর্ণ করতে। তার ছোটবেলা থেকে জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা এবং চাকরি সূত্র থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে ভ্রমণ এবং আদিবাসীদের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তার এই উপন্যাস রচনার সহায় হয়।
ভগীরথ মিশ্র গল্প এবং উপন্যাস ছাড়াও ভ্রমণ সাহিত্য এবং রম্য রচনাও লিখেছেন। ‘উত্তরবঙ্গ সংবাদ’ পত্রিকাতে তার লেখা রম্যরচনাগুলি নিয়ে ‘অর্বাচীনের জার্নাল’ বইটি প্রকাশিত হয়। ‘লঘুপুরাণ’ তার অপর একটি রম্যরচনার বই।
অসাধারণ বললেও বোধ হয় কম হয়ে যাবে। গল্পটা এক তস্করকে নিয়ে। সাদা বাংলায় যাকে বলে চোর।
ক্ষীরোদ ভক্তা মেটাল গ্রামের নামকড়া ডাকাত। ডাকাতের ছেলে হয়ে গোক্ষুর কি না বড় হয়ে প্রফেশন হিসেবে নিয়েছে চৌর্যবৃত্তিকে। ডাকাতিতে তো মহা হ্যাঙাম। মোটা দাগের কাজ। তার চেয়ে বাপু রাতের আঁধারে ঠান্ডা মাথায় লোকের বাড়িতে সিঁধ কাটা ভালো। এই করেই দিন যাচ্ছিল গোখরার। রাতের আঁধারে লোকের বাড়িতে সিঁধ কাটা আর ভোররাতে সে মাল পাচার করা তার গডফাদারের কাছে। অবশ্য গডফাদার বললে আমাদের চোখের সামনে যেমন সাদা শার্ট কালো কোট আর চোখে কালো সানগ্লাস পড়া কোন মানুষের ছবি কল্পনায় ভেসে উঠে ভগীরথ মিশ্রের উপন্যাস 'তস্কর'-এর গডফাদার কিন্তু আদপে সে রকম নয়। সাদামাটা ধুতি-পাঞ্জাবি কিংবা গেঞ্জি পড়া বাণেশ্বর ঘোষকে যতো ভালো মানুষের মতো দেখতেই লাগুক না কেন, সবাই খুব ভালো করেই জানে এই ব্যক্তি কি চিজ! একরাশ শয়তানি বুদ্ধি কেবল কুটকুট করে তার মাথার মাঝে। হেন কাজ নেই সে করতে পারে না। লোকে মনে মনে যতোই গালমন্দ করুক না কেন, সামনা সামনি ভক্তি শ্রদ্ধা করতে কসুর করে না কোনদিন। অবশ্য আধুনিক যুগের ঈশ্বর তো এরাই। ক্ষুরধার বুদ্ধির সাথে আছে টাকা, সেই সাথে আছে ক্ষমতাও। আর কী চাই? এরাম ঈশ্বরকে খেপিয়ে কোন কালে কে ভালো থেকেছে শুনি?
যাকগে ওসব। বলছিলাম নিরীহ এক চোরার কাহিনি আর বলতে শুরু করলাম কি না তার গডফাদারের গপ্পো! এদিকে গোখরা ব্যাটা চুরি করতে যেয়ে ধরা পড়ি পড়ি অবস্থায় আশ্রয় নেয় তার বাপের প্রাক্তন এক সহকারী মুরালীর বাড়িতে। সেদিন অবশ্য চৈত্র মাস ছিল কি না জানা যায়নি, তবে সর্বনাশ যা হবার গোক্ষুরের সেদিন ঠিক সেটাই হয়েছিল। সুস্থ সবল দেহে নিজের ঘরে ফেরত আসে ঠিক কিন্তু মনটা রেখে আসে ওই বাড়িতে। ওই বাড়ির সদ্য বিধবা কন্যা পঞ্চমীর কাছে। স্বপ্নের জাল বুনতে থাকে সে.. চুরি চোট্টামি ছেড়ে দেবে একেবারে। অবশেষে?
এই 'অবশেষ'টুকু না হয় বই পড়েই জানা যাবে। বইটার মূল বিষয় সাধারণ নিরীহগোছের এক চোরকে নিয়ে হলেও বইয়ের পাতায় পাতায় উঠে এসেছে আরও অনেক বর্ণিল চরিত্র। নীচু জাতের মানুষদের দু:খ দুর্দশা, অসহায়ত্ব, দু বেলা দু'মুঠো খাবারের জন্য একদল মানুষের বাঁচার লড়াই, অতি নোংরা ভিলেজ পলিটিক্স সব কিছু খুব নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে এ বইটিতে। মন্দ চরিত্রের জন্য তীব্র ঘৃণা কিংবা বেচারাগোছের কোন চরিত্রের জন্য যদি বই পড়তে পড়তে একটু হলেও 'আহারে বেচারা' টাইপ সমবেদনা আসে-তাহলে নির্দ্বিধায় বলে ফেলা যায় বইটা সফল এবং অতি অবশ্যইভাবে সফল লেখকও। এই বইয়ের মাধ্যমে ভগীরথ মিশ্র শুধু টেনেটুনে এ প্লাস না, একদম গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে গেছেন। বইটার নাম জানতাম না। DEHAN ভাইকে ধন্যবাদ। নাম জানানো এবং বই বিতরণের জন্য। শবর ভাইকেও ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা। ❤
ভগীরথ মিশ্রকে চিনতাম অন্যদুটো বইয়ের কারণে। তিনি যে তস্করের মতো অসাধারণ একটা উপাখ্যান ও রচনা করেছেন,সেটা জানলাম সুহৃদ ফারজানা রাইসার মাধ্যমে। তস্করের প্লট নিয়ে কিছু বলার সাধ্যি আমার নেই। আমি শুধু মুগ্ধতার কথা বলতে পারি। কেমন যেন ঘোর লাগা লেখনী। শব্দে,বাক্যে বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে দেওয়ার ক্ষমতাও রাখেন ইনি। পাঠকদের সামনে যেন কোনো উপাখ্যান নয়, একের পর এক শব্দে ঘোরলাগা একটা আলাদা জগৎ তৈরি করেন ভগীরথ মিশ্র।
গোক্ষুর ভক্তা একজন নিচুজাতের চোর । আর বাণেশ্বর ঘোষ একজন উঁচুজাতের । রাতে চুরি করে গোক্ষুর যা পায় সব নিয়ে আসে বাণেশ্বরের কাছে । বাণেশ্বর ঘোষ খুব আগ্রহ নিয়ে চুরির মাল গোক্ষুরের কাছ থেকে বিস্তর ঠকিয়ে কিনে নেয় । শুধু তাই নয় কোন বাড়িতে টাকা পয়সা , স্বর্ণালংকার আছে সে খবর ও গোক্ষুর বাণেশ্বরের কাছ থেকে পায় । এই তো সেবার অনেক টাকা ও গয়না যৌতুক দিয়ে বাণেশ্বর তার মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলো । তার কয়েকদিন বাদেই সে গোক্ষুরকে বললো ‘’যা যা দিয়েছি সব আবার নিয়ে আয়’’ । তো এই বাণেশ্বরের মেয়ের শ্বশুরবাড়ির সিঁধ কাটতে গিয়েই মেয়ের জামাইয়ের কাছে ধরা খেয়ে গোক্ষুর আশ্রয় নেয় আরেক অবসরপ্রাপ্ত ডাকাত মুরলী কোটালের বাড়িতে । সেখানে তার সাথে দেখা হয় মুরলীর সদ্যবিধবা মেয়ে পঞ্চমীর সাথে …… সে সময় নিচু জাতের মানুষদের পড়াশোনা যে কত কষ্ট করে করতে হতো তার একটা উদাহরণ পেলাম ভগীরথ মিশ্রের কাছ থেকে । উপন্যাসের একটা চরিত্রের নাম মধু মল্লিক । তার মেধা দেখে মেটালের একটা ইস্কুলে ভরতি করানো হয়েছিলো ।স্কুলে ভরতি হতে পারলেও বোর্ডিং এ নিচু জাতের কোন ছেলের সাথে কেউ থাকতে রাজী নয় তাই মধুর থাকার ব্যবস্থা হলো একতলার একটি ক্লাসঘরে ।ঘরের এক কোণে বাক্স-বিছানা রাখলো সে । বোর্ডিং এ কোন পৃথক খাবার ঘর ছিলো না । ছাত্ররা রান্নাঘরের বারান্দায় বসে খাবার খেত। মধুর খাবার ব্যবস্থা হলো বারান্দা সংলগ্ন নিমগাছের তলায়। একখানা কোদাল ধরিয়ে দেওয়া হলো তাকে। সারা বিকেল ঐ কোদাল দিয়ে নিমতলাটি পরিষ্কার করলো সে । বোর্ডিং এর সমস্ত ছাত্র যখন বারান্দায় বসে খেত মধু তখন নিমগাছের তলায় এনামেলের থালাটিতে নিঃশব্দে খেয়ে যেত । প্রচন্ড শীতে কাঁপতে কাঁপতে সে গ্রাসের পর গ্রাস তুলতো ।খাওয়া শেষ করে কলতলায় গিয়ে দেখতো ছেলেদের ভীড় । মধুকে নিরাপদ দূরত্বে অপেক্ষা করতে হতো যতক্ষণ না শেষ ছেলেটি চলে যেতো ততক্ষন পর্যন্ত । ক্লাস ফাইভের ঘরখানাতেই থাকতো মধু । ঘরের এক কোণায় থাকতো তার তোবড়ানো বাক্স আর খেজুর পাতার চাটাইতে জড়ানো ছেঁড়া কাঁথা , ময়লা বালিশ । সেই বালিশ দিয়ে ক্লাসের অন্যছেলেরা ফুটবল খেলতো ক্লাসের ভেতর । একটা ক্লাস শেষ হয়ে যাওয়ার পর মাস্টারমশাইয়ের পিছু পিছু মধুও বেড়িয়ে যেত বাইরে ।পেছন থেকে আওয়াজ তুলে ছুটে আসতো শ্লেষ বিদ্রুপের বাণ । না শোনার ভাণ করতো মধু। অফিসঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতো যতক্ষণ না পরের পিরিয়ডের মাস্টারমশাই ক্লাসে ঢুকেন । মধুর পড়াশোনার এবং খাওয়াদাওয়ার খরচ গ্রামের বিশজন সম্ভ্রান্ত লোক দিতেন । এই অর্থ মধুকেই সংগ্রহ করতে হতো । যখন বিকেলে সব ছেলে মাঠে খেলাধুলায় ব্যস্ত তখন মধু বাড়ি বাড়ি ঘুরছে পয়সার জন্য । অনেকেই ফিরিয়ে দিতেন বলতেন পরের মাসে এসো একসাথে দুই মাসের দিয়ে দিবো । আবার কিছু কিছু বাড়িতে নিচু জাতের হওয়ার জন্য ঢোকার অনুমতিও পাওয়া যেত না । প্রতি মাসে একই বাড়িতে দু তিনবার যেতে হতো মধুর । এইভাবে শেষ হয়ে যেত মাসের সবগুলি বিকেল । তাও সব কিছুকে তুচ্ছ করে এক পেট ক্ষিদে বয়ে বয়ে, সে ঘুরে বেড়াতো চটের বস্তা কাঁধে চাপিয়ে । আকুল প্রার্থনায় , আকণ্ঠ অভিমানে ''তস্কর'' ভগীরথ মিশ্রের এক অনবদ্য উপন্যাস । খুব ই সুখপাঠ্য । এই একটা উপন্যাসে দেখলাম যেখানে তেল,নুন,মরিচ,পেঁয়াজ সব কিছুই পরিমাণমতো আছে । পাঁচ তারকা কম হয়ে যায় ,অনেক কম। মাঝমধ্যে রেটিং দিতে গিয়ে এক বিপদেই পড়তে হয়
'তস্কর' (সন্ধিবিচ্ছেদ�� তৎ+কর) অর্থ চোর, গল্পও চোরের, কিন্তু উপন্যাসটা হয়েছে এক দীর্ঘ সামাজিক অভ্যাসের বিবরণ। অর্বাচীনদের গল্প। যেখানে মানুষ অপরাধী হয়ে ওঠে না; তাকে তুলে অপরাধীর জায়গায় রেখে আসা হয়।
গোক্ষুর ভক্তা ভূমিহীন লোধা সম্প্রদায়ের একজন মানুষ। সমাজ তার পরিচয় আগেই ঠিক করে দিয়েছে—চোর। জন্মসূত্রে চোর আরকি। লোধাদের নিয়ে সমাজ বলে- "লধ্বা চোর, অর ব্যাটাও চোর, অর লাত্তিও চোর ..... অর ঘরের কুত্তা বিলাই টিও চোর" গোক্ষুর চুরি করে ঠিকই, কিন্তু সেই চুরি তার ব্যক্তিগত নৈতিক পতনের ফল নয়, বরং এমন এক ব্যবস্থার অংশ, যেখানে আর কোনো উপায় নেই, বিকল্প রাস্তা শুরুতেই বন্ধ। তার জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত যেন আগে থেকেই লিখে রাখা।
ভগীরথ মিশ্র এবং তস্কর, বাংলা সাহিত্যের এক বিস্মৃতপ্রায় লেখা এবং লেখক। উপন্যাসে লেখক খুব স্পষ্টভাবে ক্ষমতা আর অপরাধ এর সাস্টেইনাবিলিটি আর অ্যাডাপ্টিবিলিটিটা দেখান। গ্রামীণ সমাজের যে মুখটা দিনের আলোয় ভদ্র, সজ্জন আর সম্মানিত, রাত নামলেই সেই মুখটাই অন্যভাবে কাজ করে। যারা আইন মানে, তারাই নিয়ম ভেঙে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়। আর যারা নিয়ম ভাঙে, তারা চিরকালই অপরাধী থেকে যায়। চোর গোক্ষুরের বারবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চায়। কিন্তু বাণেশ্বর নামের ভদ্দরনোকেরা তা হইতে দিব ক্যান?
গল্পটা এক চোরকে কেন্দ্র করে হলেও, খুব সুচারুভাবে এ গল্পটা আসলে জাতের, বর্ণের। আমরা যেটাকে বলি রেসিজম। এখানে অনেক মানুষ, অনেক কাহিনি, অনেক রকম কষ্ট। জাতের কারণে ছোট হয়ে যাওয়া জীবন, পেটের দায়ে লড়ে যাওয়া মানুষ, আর গ্রামের নোংরা পলিটিক্স সবকিছু খুব স্বাভাবিক।
এই বইয়ের বড় শক্তি এর সংযম। লেখক কোথাও পাঠককে উত্তেজিত করেন না, কাউকে জোর করে দোষী বা নির্দোষ প্রমাণ করেন না। তিনি শুধু পরিস্থিতিগুলো সাজিয়ে দেন। অশিক্ষা, দারিদ্র্য, জাত, রাজনীতি এবং এরপর কোনঠাসা পাঠক উপলব্ধি করে নেয় নিজ তাগাদায়। ভগীরথ মিশ্র এখানে আলাদা করে প্রমাণ করতে যাননি যে তিনি ভালো লেখক। তিনি স্রেফ গল্পটা বলে গেছেন, বাকিটা তার শব্দবন্ধনে ঘোর লেগে যায়। যা পড়ে আমি অভিভূত এবং মুগ্ধ।
তস্কর এর কোনো সমাপ্তি নাই। এক ধরনের স্থির, ভারী উপলব্ধি আছে। যে সমাজ দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যকে স্বাভাবিক করে তোলে, সেখানে গোক্ষুরদের জন্ম শুধু পুনরাবৃত্তি। এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের এমন এক বাস্তবতাকে ছুঁয়ে যায়, যেটা অনেকদিন অদৃশ্য ছিল। মনোজ বসুর লেখা 'নিশিকুটুম্ব' উপন্যাসটির মূল বিষয়বস্তও চোর, কিন্তু ওতে এর দর্শন আবার অন্যরকম। ওখানে মূল চরিত্র বলে- "হে মা কালি, আমায় মন্দ করে দাও।" অভাবের চোরদের ন্যারেটিভ কাজী নজরুল ইসলামও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। 'সাম্যবাদ' কাব্যগ্রন্থের চোর-ডাকাত নামের একটি কবিতার শেষ লাইনগুলো এমন-
"কে বলে তোমায় ডাকাত, বন্ধু কে বলে করিছ চুরি? চুরি করিয়াছ টাকা ঘটি-বাটি, হৃদয়ে হানোনি ছুরি! ইহাদের মতো অমানুষ নহ, হতে পার তস্কর, মানুষ দেখিলে বাল্মীকি হও তোমরা রত্নাকর!"
এত সাধারণ কাহিনি নিয়ে এত সুন্দর লিখেছেন। বাস্তবধর্মী ঘটনার এক্সিকিউশন ও চমৎকার। উপন্যাস লেখার চেষ্টা করেননি বরং সমাজ,বাস্তবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন মূল দুই চরিত্র গোক্ষুর ভক্তা আর বাণেশ্বরের মাধ্যমে। ভগীরথ মিশ্রের তস্কর আরো আলোচনার দাবি রাখে।
আমার পড়া ভগীরথ মিশ্রের প্রথম বই। এক কথায় বলা যায় অসাধারণ এক উপাখ্যান। গ্রাম গঞ্জের মধ্যেও জাত ভেদে যে অন্যায় অবিচার বিদ্যমান তা খুব সুন্দরভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। পড়ছিলাম আর ধীরে ধীরে গল্পের সাথে একাত্মতা ও অনুভব করছিলাম।বাণেশ্বর ঘোষের অত্যাচারের প্রতি গোক্ষুরের মতনই ক্ষোভ জমছিল। কিন্তু কি আর? নিতাই মাস্টারের মতন শেষ পর্যন্ত অসহায় ই আমি। গল্পখানা লেখার কলমখানা যদি আমার হাতে থাকত তাহলে হয়ত বাণেশ্বর ঘোষ কে ফাঁসিকাষ্ঠেই ঝুলোতাম। সমাজের অন্যায় অবিচার যে আজীবন ই ছিল সেটা আমাদের কারোই অজানা নয়। এ নিয়ে লেখার ও অভাব নেই। কিন্তু কিছু লেখা প্রচন্ড দাগ কাটে মনে। তস্কর পড়েও মনে বিশাল দাগ কেটেছে। লোধাদের প্রতি সহানুভূতি জাগে, তাদের দুঃখে একাত্ম হতে ইচ্ছে করে। সমাজের সমস্ত জাত ভেদ তুলে দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু নিরীহ মুখ্য সুখ্য মানু্ষ গুলো কি শেষ পর্যন্ত পারে নিজেদের অধিকার আদায় করতে?
রাইসা আপু কে ধন্যবাদ অসাধারণ এই বইখানার সফটকপি সংগ্রহ করে দেবার জন্য।