#বিসাশন পুরুলিয়া জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রামের এক প্রান্তে রয়েছে পরিত্যক্ত এক মন্দির। গোটা গ্রাম যে ইতিহাস সযত্নে লুকিয়ে রেখেছে তার শতাব্দীপ্রাচীন বুকে, কার দীর্ঘশ্বাসে আবার সেই ইতিহাস জীবন্ত হয়ে উঠতে চলেছে? ঘনিয়ে আসছে কি ভয়াবহ কোনো বিপদ?
#হাতছানি ডাক্তারি জীবনের দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু অচিরেই মুখোমুখি হয় এক ভয়ানক হিপনোটিস্টের। ওদের সমস্ত বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে ফুৎকারে উড়িয়ে দেয় হিমশীতল এক খুনী। ছুঁড়ে দেয় ওপেন চ্যালেঞ্জ। তারপর ?
#রক্তের_রঙ_বেগুনী লক্ষ্ণৌ শহরে মীনাক্ষির সাথে আলাপ হয় এক রহস্যময়ী নারীর,পরিচয় হয় লক্ষ্ণৌ শহরের এক বিতর্কিত অধ্যায়ের সঙ্গে। শয়নেস্বপনে এক বিকট দৃশ্য তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়। স্মৃতি হাতড়িয়ে কোন নিষ্ঠুর সত্যের মুখোমুখি হয় মীনাক্ষি ?
#ওমকারা মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসির দিন সমাগত। মিথ্যে মামলায় ফেঁসে তাঁর শেষ দিন আসন্নপ্রায়। পায়ে পায়ে তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন তাঁর ছোটবেলার স্মৃতিজড়িত আকালীপুর গ্রামের শ্মশানে। তাঁর চোখে আকুল প্রশ্ন।অতীতের দিকে পিছন ফিরে দেখেন মহারাজ, উত্তর মেলে না। দুশো বছর পরে আকালীপুর শ্মশান কি এখনও সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছে?
এ বছর বইমেলায় কেনা সমস্ত বইয়ের ভিড়ে 'বিসাশন' আদতেই ওয়াইল্ড কার্ড। দু-একবার এই সাইটেই বইটার উল্লেখ পেয়ে নেহাতই কৌতূহলের বশে কেনা। এবং কিনলেও যে চরম চমকপ্রদ কিছু আশা করেছিলাম তা নয়। তাই বলছি, আমার মতন হবেন না। দয়া করে আনকোরা লেখিকার বাজে ভূতের গপ্পো বলে দাগিয়ে দেওয়ার আগে, বইটা পড়ুন। পড়লে দেখবেন কপালজোড়ে খুঁজে পেয়েছেন এক ভীষন সম্ভাবনাময় হরর লেখিকার দেখা!
'হাতছানি' নামক একটি অসহজ সাইকোলজিকাল হরর দিয়ে বইয়ের শুরু। এক ক্রুর হিমশীতল হিপনোটিস্ট বনাম বিজ্ঞানমনস্ক দুই ডাক্তার বন্ধুর লড়াইকে ভিত্তি করে এগিয়ে চলে কাহিনী। বিজ্ঞান বনাম কুসংস্কারের অনন্তকালের বিবাদে নয়া সংযোজন এই গল্পটির আবহাওয়া তৈরি করতে পারদর্শীতার পরিচয় দিয়েছেন লেখিকা। সঙ্গে রেখেছেন দুরন্ত কিছু সংলাপ। তবে, অতি-বর্ণনার বেড়াজালে গল্পটি শেষলগ্নে আটকে যায়। থেকে যায় অপ্রাপ্তির রেশ। এটুকুই আক্ষেপ। তিন তারা।
দ্বিতীয় গল্প 'রক্তের রঙ বেগুনী', আমার পড়া হালফিলের অন্যতম সেরা অলৌকিক কাহিনী। পর্যাপ্ত পরিধিতে, পিয়া সরকারের গদ্য ঠিক কতটা কার্যকরী এই গল্পটি তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ। অ্যামনেশিয়ায় ভোগা মিনাক্ষির সাথে আলাপ হয় এক রহস্যময়ী নারীর। পরিচয় হয় লক্ষ্ণৌ শহরের ইতিহাসের এক বিতর্কিত অধ্যায়ের সঙ্গে। কে এই রহস্যাবৃত আরশিন? মিনাক্ষি কেন বারংবার দেখে ওরম ভয়াল স্বপ্ন? মেয়ে মিতুল কেনই বা সমবয়সি আর পাঁচটা বাচ্চার থেকে এত আলাদা?
গল্পটির সান্নিধ্যে কেমন এক মায়াময় ঘোরে আবিষ্ট ছিলাম বেশ কটা দিন। (শেষ এরম হয়েছিল, মিথিল সরকারের 'উপরতি' পড়ে।) পরিণত কলমগুণে, লেখিকা, তাওয়াইফদের বিষাদ-রঙিন পৃথিবীকে সজীব দক্ষতায় মিশিয়ে দিয়েছেন ঘেন্না, লালসা ও বিদ্বেষের ওমে। একটাই যা অভিযোগ, রুহানিয়াতের পাথুরে প্রাসাদটিকে আরেকটু গথিক রূপে তুলে ধরা যেত না?
যাক গে, গল্পটিকে পাঁচ তারার কম দেওয়াটা ধৃষ্টতা।
তবে, দুঃখের বিষয়, তৃতীয় ও নাম-গল্প 'বিসাশন' ভীষনই দুর্বল। একটি চেনা ছকের তন্ত্রভিত্তিক কাহিনী, যা বইয়ের মান এক লহমায় নামিয়ে দেয় অনেকটা। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী 'রঙ্কিনি দেবীর খড়্গ'-র একটি প্রিক্যুয়েল লিখতে যাওয়াতে লেখিকার সাহসের পরিচয়। তবে স্বল্প পাতায়, যথেষ্ট তাড়াহুড়োয় গুটিয়ে নেওয়া গল্পটি সংকলনে না রাখলেই ভালো হতো বলে আমার বিশ্বাস। খারাপ লাগলেও, এটিকে এক তারা বই কিছু দেওয়া মুশকিল।
শেষ পাতে, মহারাজা নন্দকুমার জীবনী ও বীরভূমের আকালীপুর শ্মশানের গুহ্য-কালি মন্দির নিয়ে সেমি-হিস্টোরিক ন্যারেটিভ 'ওমকারা'। লেখাটা সামান্য মেদবর্জিত হলে মন্দ হতো না। তবে কিনা গোর্ অথবা নৃশংসতা লিখতেও যে উনি সমানতালে পারদর্শী সেটাই যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন লেখিকা। সাথে, সুষ্ঠু পড়াশোনা ও রিসার্চের ছাপ। যা গল্পটিকে এক মুহূর্তের জন্যেও বসিয়ে রাখে না। প্রাচীন দেবীমূর্তি কেন্দ্র করে, ভয়ঙ্করী উপাখ্যান হিসেবে কদিন আগে 'ধুমাবতীর মন্দির' খুব হাইপ-আপ হয়েছিল। এই গল্পটি যে সেটাকে বলেকয়ে শতগোল দেবে সেটা আলাদা করে বলে দিতে হয় না।
'ধুমাবতী'কে দিয়েছিলাম দুই তারা, এটাকে দেব চার!
সবশেষে বলব, পরিবেশনার দিকে নজরটা কিঞ্চিৎ বেশি দিলে বইটা মাস্ট-বাই হয়ে উঠতো। বেশ কিছু গল্পে চোখে লাগে আলপটকা বানান ভুল। সাথে দায়সারা মুদ্রণ গলদ। এছাড়াও, লেখিকারও উচিত ছিল সচেতন প্রচেষ্টায় নিজের কলমের প্রতি রাশ টেনে ধরার। ওনার গদ্য সুন্দর। তবে তাই বলে, সংযম ভুলে যাওয়া চলে না। বিশেষত যখন ভয়ের গল্পের মেজাজ গিয়ে ধাক্কা খায় অধিক বর্ণনার পিঠে। তবে এটুকু যদি ক্ষমা করতে পারেন তাহলে 'বিসাশন' পড়ে দেখুন। আর কিছু না হোক, ওই দ্বিতীয় গল্পটির জন্যই পড়ুন।
অন্ধকারের একটা আলাদা আকর্ষণ আছে। আলো আমাদের ঘিরে রাখে। ততই আমরা ডুবে যেতে চাই নিজস্ব অন্ধকারে। সচেতনভাবে হয়তো আমরা তাকে ভয় পাই, এমনকি ঘোষিতভাবেই বিতৃষ্ণা ব্যক্ত করি অন্ধকারের প্রতি। কিন্তু অবচেতনে অন্ধকার এক কালো নদী হয়ে আমাদের ডাকে "আয়-আয়!" বলে৷ সে বলে, এই তমসার মধ্যেই আছে নিশ্চিন্ত নিরুপদ্রব ঘুমের প্রকরণ। তাই আমরা আলো-ঝলমল পরিবেশে, হাই-ডেফিনিশন ছবি আর চিহ্ন দেখতে-দেখতে অন্ধকার খুঁজি। গল্পকারেরা আমাদের মতো করে গল্প লেখেন। তার কোনোটাতে থাকে হিংসা আর রিরংসার আগুন। কোনোটাতে থাকে তান্ত্রিক অভিচারের ঘোর লালিমা। আর কোনো-কোনো বইয়ে থাকে সম্পর্ক আর সম্ভব-অসম্ভবের টানাপোড়েনে বিষিয়ে যাওয়ার নীলাভ দ্যুতি। যেমন বিসাশন।
পিয়া সরকার আমাদের সময়ের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় লেখকদের অন্যতম। তাঁর প্রথম বই এটি। প্রাককথনের পর এতে স্থান পেয়েছে~ ১. হাতছানি ২. রক্তের রং বেগুনি ৩. বিসাশন ৪. ওমকারা এদের প্রতিটিই অন্ধকারের আখ্যান। দ্বিতীয় এবং চতুর্থ কাহিনিদু'টি লা-জবাব৷ প্রথম কাহিনিটি শেষে এসে আর ম্যানেজ করা যায়নি। তৃতীয় কাহিনিটির তুলনায় ঢের ভালো গল্প পিয়া হেথায়-হোথায় লিখে থাকেন।
সংকলনটি পড়ার পর আমার তিনটি কথা মনে হল। প্রথমত, প্রকাশকের কী এমন তাড়া ছিল যে তিনি এই গল্পগুলোতে হওয়া অতিকথন ট্রিম করানোর মতো সময়টুকুও দিতে পারলেন না? বিশাসন-এর পরিবর্তে 'নিশিগন্ধা' নামক কাহিনিটি এই সংকলনে নেওয়া উচিত— এও কি তিনি বোঝেননি? দ্বিতীয়ত, পিয়া'র হাতে অত্যন্ত বলিষ্ঠ গদ্য রয়েছে। ঠিক সে-জন্যই তাঁর জানা উচিত কোথায় বর্ণনা স্তূপীকৃত হতে-হতে রাশ ঢিলে হয়ে যায়। তার ঠিক আগে তাঁর থেমে যাওয়া উচিত। তৃতীয়ত, যাঁরা ডার্ক ফিকশন পছন্দ করেন— সে ফ্যান্টাসি হোক বা স্পেকুলেটিভ ফিকশন, তাঁদের কাছে এই সংকলন অপরিহার্য। অলমিতি।
প্রথম দুটা গল্প দারুণ লেগেছে, একদমে ১০/১০, ৯/১০ টাইপের। পরের দুটো একদমই দুর্বল, ৫ও পাবে না আমার কাছে। তবে প্রথম দুটো গল্পের জন্যই বইটাকে ৩/৫ দেয়া যায়। আর এমনিতে লেখকের লিখনশৈলী আমার দারুণ পছন্দের।
লেখিকার প্রচেষ্টা প্রশংসাযোগ্য। চারটে গল্পের মধ্যে, রক্তের রং বেগুণী গল্পটি সবচেয়ে ভালো লেগেছে। চতুর্থ তারাটি শুধু এরই জন্য। বইটি থেকে লেখিকার কাছে ভবিষ্যতে আরো অনেক ভালো ভালো লেখা পাওয়ার প্রত্যাশা রইল!