মঈনুস সুলতানের এবারের ভ্রমণ হেঁটে। যুক্তরাষ্ট্রের বনবনানীতে ভ্রমণকালে কত মানুষের দেখা মেলে, পরিচয় ও অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠে। শুরুতে লেখকের পথসঙ্গী ইফফতের গল্প আর সংশয়ে বিক্ষত হন লেখক। ক্যানসারে মরণাপন্ন রেড ইন্ডিয়ান নারী মিমোজা ও তাঁর পুরুষসঙ্গী পাঠককে নিয়ে যায় প্রকৃতিলগ্ন জীবনের মধ্যে। ভার্জিনিয়ায় যাওয়ার পথে কম্পোডিয়ার খেমার বংশোদ্ভূত স্ট্রিপার গার্ল চম্পো বর্ণনা করে নিজের করুণ গল্প। শ্যানানডোয়ার বনানী আর ওল্ডর্যাগ পাহাড়ের চূড়ায় যেতে যেতে প্রজাপতি পোষা পুরুষ আর্থার ওয়েসলি ও পায়ে উল্কি আঁকা নারী বিয়াত্রিসের সঙ্গ ও গল্প পাঠককে আবিষ্ট করে রাখবে।
মঈনুস সুলতানের জন্ম ১৯৫৬ সালে, সিলেট জেলার ফুলবাড়ী গ্রামে। তাঁর পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ে পিএইচডি। খণ্ডকালীন অধ্যাপক ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস এবং স্কুল অব হিউম্যান সার্ভিসেসের। ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকার ভিজিটিং স্কলার। শিক্ষকতা, গবেষণা ও কনসালট্যান্সির কাজে বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তাঁর ‘জিম্বাবুয়ে : বোবা পাথর সালানিনি’ গ্রন্থটি প্রথম আলো বর্ষসেরা বই হিসেবে পুরস্কৃত হয়। ২০১৪ সালে ভ্রমণসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। প্রাচীন মুদ্রা, সূচিশিল্প, পাণ্ডুলিপি, ফসিল ও পুরোনো মানচিত্র সংগ্রহের নেশা আছে মঈনুস সুলতানের।
যেই ধাঁচে মঈনুসসুলতান তার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লিখেছেন তাতে একে উপন্যাস বলে ঘোষণা করলেও দোষের কিছু হতো না। বইয়ের গায়েগতরে ঘটনাপ্রবাহের প্লট আছে, চরিত্র আছে, প্রেমের ট্র্যাজেডি আছে। তারউপর গল্প বলার বিশেষ কৌশল এবং সময়ের একাধিক স্রোতের কারণে পুরো ব্যাপারটিই বেশ আকর্ষণীয়। ঘটনা মূলত লেখকের যুবা বয়েসের এক ভ্রমণ বৃত্তান্ত যখন তিনি ভার্জিনিয়ার ওল্ড র্যাগ পর্বতের চূড়ায় পৌঁছাবার হাইক অর্থাৎ আঁকা বাঁকা বনানীর ট্রেইল পেরিয়ে পর্বতের চূড়ায় আরোহণ করেছিলেন। সাথে প্রাণ-প্রকৃতির ধারাবর্ণনা তো আছেই। যেতে যেতেই লেখক অনায়াসে মিলিয়েছেন অতীত বিভিন্ন ঘটনা, পথে পথে নানান রকমের মানুষের সাথে মোলাকাত-বাতচিত, জীবনের বহু ঘটনা ভাগাভাগি করে নেওয়া। মুসাফিরেরা পরস্পর সম্পূর্ণ অপরিচিত হয়েও, হয়তো নিজেদের মধ্যে এমন সব স্মৃতি-অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে নিতে পারেন যা হয়তো শহুরে-স্বাভাবিক জীবনের পটভূমিকায় কল্পনাও করা যায় না । মঈনুস সুলতানের মুসাফির জীবনের একদম গোড়ার দিককার গল্প হয়তো এসব। পথে চলতে চলতে কতো মানুষ, শুধুই কি মানুষ? একেকটা মানুষের সাথে জুড়ে আছে একেকটা জীবন। কত শত জীবনের কতো রকমফের! খেয়াল করলেই দেখা যায় লেখক নিজের সাথেই কথোপকথনে যাচ্ছেন, প্রশ্ন করছেন নিজেকেই। কেন এই পথচলা, কোথায় বা তিনি পৌঁছুতে চান!