What do you think?


কিসসাওয়ালা
এক অষ্টাবক্র বামনের প্রেমে মুগ্ধ এক আত্মহত্যাকামী যুবতী। এক ব্যর্থ কবি, যে এখন অতৃপ্ত মহিলাদের কাছে টেলিফোনে যৌন ভাষা বিক্রি করে। একদল চান্দ্রায়ন ব্রতধারী, যারা মানুষের বসতি ভাঙলে প্রাণত্যাগ করে অনশনে। অথবা সেই চালচুলােহীন ছেলেটা, যে ভাসানের দুর্গাপ্রতিমার বুকের ওপরে শুয়ে প্রশ্ন করে, মা, তুই বেশ্যা হয়ে গেলি কেন?
এমনই সব আশ্চর্য চরিত্র আর ঘটনাবলি দিয়ে গড়া এই সংকলনের গল্পগুলি যেন আমাদের দৈনন্দিনের এলিয়ে-পড়া সংসারের সমান্তরাল অন্য এক তীব্র সংসার।
পাঠক, প্রবেশ করুন কিসসাওয়ালার ম্যাজিক-দুনিয়ায়।
এমনই সব আশ্চর্য চরিত্র আর ঘটনাবলি দিয়ে গড়া এই সংকলনের গল্পগুলি যেন আমাদের দৈনন্দিনের এলিয়ে-পড়া সংসারের সমান্তরাল অন্য এক তীব্র সংসার।
পাঠক, প্রবেশ করুন কিসসাওয়ালার ম্যাজিক-দুনিয়ায়।
360 pages, Hardcover
Published January 1, 2018
About the author
Saikat Mukhopadhyay
58 books126 followersতাঁর জন্ম এবং বড় হওয়া হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর উপাধি অর্জনের পরে তিনি রাজ্য সরকারের অধীনে আধিকারিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ দুই-দশকের লেখক-জীবনে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক এবং কিশোর-সাহিত্য, উভয় ধারাতেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তিনি যখন গল্প-উপন্যাস লেখেন, তখন ঘটনার বিবরণের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন মানব-মনের আলোছায়াকে তুলে আনার বিষয়ে। লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি। তাঁর বহু কাহিনি রেডিও-স্টোরি হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে সমাদর পেয়েছে। সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন দীনেশচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার এবং নান্দনিক সাহিত্য সম্মান।
Ratings & Reviews
Friends & Following
Create a free account to discover what your friends think of this book!
Community Reviews
Displaying 1 - 4 of 4 reviews
October 4, 2019
#কিসসাওয়ালা
লেখক ~ সৈকত মুখোপাধ্যায়
প্রকাশক ~ দ্য ক্যাফে টেবিল
লেখকের গল্প আগে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় অল্পবিস্তর পড়া থাকলেও খুব ইচ্ছে ছিল একটা গল্প সংকলন পড়ে দেখার। ক্যাফে টেবিলের হাত ধরে সেই শখ পূর্ণ হল। এতে আছে ওঁর বারো বছরের লেখক জীবনে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত চল্লিশটা গল্প, যা তাঁর লেখা মূলধারার সামাজিক মনস্তাত্বিক কাহিনী।
একতা ভট্টাচার্যের আঁকা স্মার্ট প্রচ্ছদ বইকে একটা ইউনিক লুক দিয়েছে। ৩৬০ পাতার এই বইয়ের বাইন্ডিং দুর্দান্ত, ওজন মোটামুটি আর ফন্ট বেশ স্পষ্ট, পড়তে খুবই ভালো লাগবে।
বইটা শেষ করে আমার মনে হল চল্লিশটা গল্পের সবই যে মন ছুঁয়ে যাবে, এমন নয়। গল্পগুলো লেখক সাজিয়েছেন প্রকাশের ক্রমানুসারে। এতে পাঠক সহজেই বুঝতে পারবেন ওঁর লেখার স্টাইলের অভিযোজন সম্বন্ধে। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে প্রথমদিকের বেশ কিছু গল্প ইন্টারেস্ট বাড়াতে পারল না। একটা সময়ে এমনও মনে হল যে শেষ করতে পারব না হয়তো বইটা। কিন্তু সাত নম্বর গল্প থেকে মোড় এমন ঘুরল যে বইটা রাখা মুশকিল হয়ে পড়ল। যেগুলো মনে ধরল, সেগুলো যেন "আউট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড"! হাঁ করে ভাবতে লাগলাম কীভাবে লেখক ভেবেছেন এমন সব দুর্দান্ত প্লট! প্রকাশের ক্রমানুসারে না সাজিয়ে প্রথমদিকেই ভালো ভালো কিছু গল্প থাকলে মনে হয় পাঠককে আরও তাড়াতাড়ি টেনে নেওয়া যেত।
"অ-ঘ্রাণ আলেখ্য" গল্পে তিনটে আলাদা দৃশ্যকোণের অদ্ভুত সুন্দর সংমিশ্রন করেছেন লেখক। বৃদ্ধ রাজিব গাঙ্গুলি থাকেন বনশ্রী হাউজিং কমপ্লেক্সে। একলা থাকেন বলে বাকি আবাসিকরাও খোঁজখবর নেন৷ কিন্তু রাজিব বাবুর স্মৃতিতে তাঁর জীবনের প্রথম কুড়ি বছর আর অবশিষ্ট নেই। অথচ সেই সময়কার বিভিন্ন গন্ধ আজও চিন্তায় ফেলে দেয় তাঁকে। যেমন, পরীক্ষার কথা উঠলেই উনি গঁদের আঠার গন্ধ পান, কিন্তু ভেবে পান না এর সম্পর্ক। পরে পাশের ফ্ল্যাটের ক্লাস এইটে পড়া অনুরাগের থেকে জানতে পারেন পরীক্ষার হলে সিট নাম্বারগুলো গঁদের আঠা দিয়ে আটকানো হয়। হয়তো সেই গন্ধই পান। কিন্তু দিদিভাইয়ের একটা অদ্ভুত কথার মানে খুঁজে পান না স্মৃতি হাতড়ে কিছুতেই। এদিকে অনুরাগ একদিন রাতে পাশের ফ্ল্যাট থেকে এক দৃশ্য দেখতে পায়। বাকিটা জানতে হলে পড়তে হবে গল্পটা।
"প্লাবনগাথা" গল্প গড়ে উঠেছে হঠাৎ আসা একটা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে কেন্দ্র করে। অতনু আর কেয়া একে অপরের সান্নিধ্য পেতে চায়। কিন্তু দুটো আলাদা সংসারে থেকে সেই কুব্জচেতনা বাস্তবায়িত হতে পারে না। অবশেষে আসে সেই সুযোগ। কিন্তু সাথে নিয়ে আসে এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা, যা এই গল্পটিকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে চলে যায়। গল্পের শেষ লাইনে চরিত্রদ্বয়ের উপলব্ধি চিরকাল মনে থাকবে। আমার পড়া বেস্ট গল্প এই বইয়ের।
"স্বর্গবেশ্যার ছেলে" গল্পে প্রতিমার বিসর্জনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকা ছেলেটার আসল লক্ষ্য, আর মূর্তির সাথে ওর কথোপকথন শুনে চমকে উঠবেন। জলে ভেসে চলা প্রতিমাকে সে জিজ্ঞেস করে, "মা তুই বেশ্যা হলি কেন?" প্লটের শেষ টুইস্টের জন্য কুর্ণিশ জানাই লেখককে। অসাধারণ লাগল গল্পটা।
এছাড়াও লুসিপাসের ললাটলিপি, বারাহী, বামন বিষাদময়ী কথা, কাঁকনের সংসার, দয়াল বাংলো, মেটাল - এই গল্পগুলো চিরকাল মনে থেকে যাবে।
আশা করি পাঠকরা বুঝে গেছেন এই বই থেকে কী পেতে পারেন। প্রকাশকের কাছে অনুরোধ রইল সৈকত বাবুর আরও কিছু ভিন্নস্বাদের গল্প নিয়ে আসুক নতুন সংকলন।
© অরিজিৎ গাঙ্গুলি
লেখক ~ সৈকত মুখোপাধ্যায়
প্রকাশক ~ দ্য ক্যাফে টেবিল
লেখকের গল্প আগে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় অল্পবিস্তর পড়া থাকলেও খুব ইচ্ছে ছিল একটা গল্প সংকলন পড়ে দেখার। ক্যাফে টেবিলের হাত ধরে সেই শখ পূর্ণ হল। এতে আছে ওঁর বারো বছরের লেখক জীবনে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত চল্লিশটা গল্প, যা তাঁর লেখা মূলধারার সামাজিক মনস্তাত্বিক কাহিনী।
একতা ভট্টাচার্যের আঁকা স্মার্ট প্রচ্ছদ বইকে একটা ইউনিক লুক দিয়েছে। ৩৬০ পাতার এই বইয়ের বাইন্ডিং দুর্দান্ত, ওজন মোটামুটি আর ফন্ট বেশ স্পষ্ট, পড়তে খুবই ভালো লাগবে।
বইটা শেষ করে আমার মনে হল চল্লিশটা গল্পের সবই যে মন ছুঁয়ে যাবে, এমন নয়। গল্পগুলো লেখক সাজিয়েছেন প্রকাশের ক্রমানুসারে। এতে পাঠক সহজেই বুঝতে পারবেন ওঁর লেখার স্টাইলের অভিযোজন সম্বন্ধে। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে প্রথমদিকের বেশ কিছু গল্প ইন্টারেস্ট বাড়াতে পারল না। একটা সময়ে এমনও মনে হল যে শেষ করতে পারব না হয়তো বইটা। কিন্তু সাত নম্বর গল্প থেকে মোড় এমন ঘুরল যে বইটা রাখা মুশকিল হয়ে পড়ল। যেগুলো মনে ধরল, সেগুলো যেন "আউট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড"! হাঁ করে ভাবতে লাগলাম কীভাবে লেখক ভেবেছেন এমন সব দুর্দান্ত প্লট! প্রকাশের ক্রমানুসারে না সাজিয়ে প্রথমদিকেই ভালো ভালো কিছু গল্প থাকলে মনে হয় পাঠককে আরও তাড়াতাড়ি টেনে নেওয়া যেত।
"অ-ঘ্রাণ আলেখ্য" গল্পে তিনটে আলাদা দৃশ্যকোণের অদ্ভুত সুন্দর সংমিশ্রন করেছেন লেখক। বৃদ্ধ রাজিব গাঙ্গুলি থাকেন বনশ্রী হাউজিং কমপ্লেক্সে। একলা থাকেন বলে বাকি আবাসিকরাও খোঁজখবর নেন৷ কিন্তু রাজিব বাবুর স্মৃতিতে তাঁর জীবনের প্রথম কুড়ি বছর আর অবশিষ্ট নেই। অথচ সেই সময়কার বিভিন্ন গন্ধ আজও চিন্তায় ফেলে দেয় তাঁকে। যেমন, পরীক্ষার কথা উঠলেই উনি গঁদের আঠার গন্ধ পান, কিন্তু ভেবে পান না এর সম্পর্ক। পরে পাশের ফ্ল্যাটের ক্লাস এইটে পড়া অনুরাগের থেকে জানতে পারেন পরীক্ষার হলে সিট নাম্বারগুলো গঁদের আঠা দিয়ে আটকানো হয়। হয়তো সেই গন্ধই পান। কিন্তু দিদিভাইয়ের একটা অদ্ভুত কথার মানে খুঁজে পান না স্মৃতি হাতড়ে কিছুতেই। এদিকে অনুরাগ একদিন রাতে পাশের ফ্ল্যাট থেকে এক দৃশ্য দেখতে পায়। বাকিটা জানতে হলে পড়তে হবে গল্পটা।
"প্লাবনগাথা" গল্প গড়ে উঠেছে হঠাৎ আসা একটা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে কেন্দ্র করে। অতনু আর কেয়া একে অপরের সান্নিধ্য পেতে চায়। কিন্তু দুটো আলাদা সংসারে থেকে সেই কুব্জচেতনা বাস্তবায়িত হতে পারে না। অবশেষে আসে সেই সুযোগ। কিন্তু সাথে নিয়ে আসে এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা, যা এই গল্পটিকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে চলে যায়। গল্পের শেষ লাইনে চরিত্রদ্বয়ের উপলব্ধি চিরকাল মনে থাকবে। আমার পড়া বেস্ট গল্প এই বইয়ের।
"স্বর্গবেশ্যার ছেলে" গল্পে প্রতিমার বিসর্জনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকা ছেলেটার আসল লক্ষ্য, আর মূর্তির সাথে ওর কথোপকথন শুনে চমকে উঠবেন। জলে ভেসে চলা প্রতিমাকে সে জিজ্ঞেস করে, "মা তুই বেশ্যা হলি কেন?" প্লটের শেষ টুইস্টের জন্য কুর্ণিশ জানাই লেখককে। অসাধারণ লাগল গল্পটা।
এছাড়াও লুসিপাসের ললাটলিপি, বারাহী, বামন বিষাদময়ী কথা, কাঁকনের সংসার, দয়াল বাংলো, মেটাল - এই গল্পগুলো চিরকাল মনে থেকে যাবে।
আশা করি পাঠকরা বুঝে গেছেন এই বই থেকে কী পেতে পারেন। প্রকাশকের কাছে অনুরোধ রইল সৈকত বাবুর আরও কিছু ভিন্নস্বাদের গল্প নিয়ে আসুক নতুন সংকলন।
© অরিজিৎ গাঙ্গুলি
August 5, 2020
বইয়ের ভূমিকায় লেখক জানিয়েছেন যে তার ‛কিসসাওয়ালা’ হওয়ার স্বপ্ন ছিল । ‛কিসসাওয়ালা’ যেমন হাটের এক কোণে বসে হাট-ফেরতা সব মানুষদের বানিয়ে বানিয়ে গল্প শোনায়, লেখকও তেমনই বানিয়ে বানিয়ে গল্প লিখে আমাদের শোনাতে চেয়েছেন । বলাই বাহুল্য, ‛কিসসাওয়ালা’ সৈকত মুখোপাধ্যায় সম্পূর্ণরূপে সফল । এই সংকলনটি বর্তমান বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গল্প-সংকলনগুলির মধ্যে খুবই উপরের দিকে থাকবে ।
এই সংকলনটি লেখকের (2006-2017) ১২ বছর ধরে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত ছোটগল্পের সংকলন । প্রকাশকালের ক্রমানুসারে গল্পগুলি সাজানো হয়েছে, যাতে পাঠক সহজেই বুঝতে পারেন লেখকের লেখনীর অভিযোজন সম্পর্কে ।
বইটির সবকটি গল্পই হৃদয় ছুঁয়ে যাবে এমন কিন্তু নয় । প্রথমদিকের বেশ কয়েকটি গল্প (2006-2007) বেশ আলগা গোছের, এগোতেই চায় না । এতে আমার মনে হয়েছিল হয়তো বইটা শেষ করে উঠতে পারবো না । কিন্তু 2007 এর শেষের দিক থেকে যে গল্পগুলি পেলাম, সেগুলি সম্পর্কে বলার ভাষা আমার নেই । পাতার পর পাতা উল্টে গেছি, গল্প শেষ হয়েছে, স্তম্ভিত হয়ে বসে থেকেছি, ভেবেছি এটা কি পড়লাম, তারপর সেই ঘোর কাটিয়ে উঠে চলে গেছি পরের গল্পে । কি অভূতপূর্ব লেখনী, আহা ।
এই সংকলনের ৪০টি গল্পের মধ্যে লেখক আমাদের জীবনদর্শনের নানা উপাদান নিয়ে আলোচনা করেছেন । প্রতিটি গল্পই প্রাপ্তমনস্ক পাঠকদের জন্য লেখা মূলধারার সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক কাহিনী । বিষয়বস্তু?? কি নেই ??? বন্ধুত্ব, প্রেম-অপ্রেম, পরকীয়া, হারিয়ে পাওয়া প্রেম, মনুষ্যত্ব, বেশ্যাদের কাহিনী । কখনো স্বপ্নপূরণ, কখনো হতাশা, কখনো নিত্যদিনের যাপন, আবার কখনো চরম হিংসার মোড়কে এক অদ্ভুত কিসসা । নিতান্ত সাদামাটা রোজনামচা দেখা গেলেও, তার আড়ালে ঘটে চলে অন্যরকম মনস্তাত্ত্বিক কাহিনী । লেখক সৈকত মুখোপাধ্যায় ‛কিসসাওয়ালা’ হতে চেয়ছেন, কিন্তু তিনি আসলে জাদুকর । সামান্যতম ফ্যান্টাসিও অসামান্য হয়ে উঠেছে লেখকের কলমের স্পর্শে ।
৩৬০ পাতার এই সংকলনটি চমৎকার । পাতার মান, ছাপার গুণমান, হার্ড বাইন্ডিং - সবকিছুই অসামান্য, এবং সেই তুলনায় দাম কিন্তু বেশ পকেট ফ্রেন্ডলি । প্রচ্ছদটি অত্যন্ত সুন্দর । মরুভূমির মাঝে চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে কিসসাওয়ালা’র তাবু । এই তাবুতে বসেই পাঠকদের গল্প শোনাচ্ছেন ‛কিসসাওয়ালা’ সৈকত মুখোপাধ্যায় ।
পাঠক, প্রবেশ করুন কিসসাওয়ালা’র ম্যাজিক-দুনিয়ায় ।
এই সংকলনটি লেখকের (2006-2017) ১২ বছর ধরে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত ছোটগল্পের সংকলন । প্রকাশকালের ক্রমানুসারে গল্পগুলি সাজানো হয়েছে, যাতে পাঠক সহজেই বুঝতে পারেন লেখকের লেখনীর অভিযোজন সম্পর্কে ।
বইটির সবকটি গল্পই হৃদয় ছুঁয়ে যাবে এমন কিন্তু নয় । প্রথমদিকের বেশ কয়েকটি গল্প (2006-2007) বেশ আলগা গোছের, এগোতেই চায় না । এতে আমার মনে হয়েছিল হয়তো বইটা শেষ করে উঠতে পারবো না । কিন্তু 2007 এর শেষের দিক থেকে যে গল্পগুলি পেলাম, সেগুলি সম্পর্কে বলার ভাষা আমার নেই । পাতার পর পাতা উল্টে গেছি, গল্প শেষ হয়েছে, স্তম্ভিত হয়ে বসে থেকেছি, ভেবেছি এটা কি পড়লাম, তারপর সেই ঘোর কাটিয়ে উঠে চলে গেছি পরের গল্পে । কি অভূতপূর্ব লেখনী, আহা ।
এই সংকলনের ৪০টি গল্পের মধ্যে লেখক আমাদের জীবনদর্শনের নানা উপাদান নিয়ে আলোচনা করেছেন । প্রতিটি গল্পই প্রাপ্তমনস্ক পাঠকদের জন্য লেখা মূলধারার সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক কাহিনী । বিষয়বস্তু?? কি নেই ??? বন্ধুত্ব, প্রেম-অপ্রেম, পরকীয়া, হারিয়ে পাওয়া প্রেম, মনুষ্যত্ব, বেশ্যাদের কাহিনী । কখনো স্বপ্নপূরণ, কখনো হতাশা, কখনো নিত্যদিনের যাপন, আবার কখনো চরম হিংসার মোড়কে এক অদ্ভুত কিসসা । নিতান্ত সাদামাটা রোজনামচা দেখা গেলেও, তার আড়ালে ঘটে চলে অন্যরকম মনস্তাত্ত্বিক কাহিনী । লেখক সৈকত মুখোপাধ্যায় ‛কিসসাওয়ালা’ হতে চেয়ছেন, কিন্তু তিনি আসলে জাদুকর । সামান্যতম ফ্যান্টাসিও অসামান্য হয়ে উঠেছে লেখকের কলমের স্পর্শে ।
৩৬০ পাতার এই সংকলনটি চমৎকার । পাতার মান, ছাপার গুণমান, হার্ড বাইন্ডিং - সবকিছুই অসামান্য, এবং সেই তুলনায় দাম কিন্তু বেশ পকেট ফ্রেন্ডলি । প্রচ্ছদটি অত্যন্ত সুন্দর । মরুভূমির মাঝে চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে কিসসাওয়ালা’র তাবু । এই তাবুতে বসেই পাঠকদের গল্প শোনাচ্ছেন ‛কিসসাওয়ালা’ সৈকত মুখোপাধ্যায় ।
পাঠক, প্রবেশ করুন কিসসাওয়ালা’র ম্যাজিক-দুনিয়ায় ।
April 14, 2025
#পাঠ_প্রতিক্রিয়া- ১০/২০২৫
কিসসাওয়ালা
লেখক- সৈকত মুখোপাধ্যায়
প্রকাশনা- দ্য কাফে টেবিল
মুদ্রিত মূল্য- ৪০০/- টাকা।।
বছরের ১০ নম্বর বই, ৭ নম্বর গল্প সংকলন সৈকত মুখোপাধ্যায় এর লেখা ছোট গল্প সংকলন কিসসাওয়ালা।। বইয়ের ভূমিকায় লেখক জানিয়েছেন যে তার ‛কিসসাওয়ালা’ হওয়ার স্বপ্ন ছিল।। ‛কিসসাওয়ালা’ যেমন হাটের এক কোণে বসে হাট-ফেরতা সব মানুষদের বানিয়ে বানিয়ে গল্প শোনায়, লেখকও তেমনই বানিয়ে বানিয়ে গল্প লিখে আমাদের শোনাতে চেয়েছেন।। সৈকত বাবু লেখা শুরু করেছিলেন ২০০৬ সালে আনন্দবাজার পত্রিকার মাধ্যমে।। আর এই বইয়ের মধ্যে আছে সেই ২০০৬ সালে প্রকাশিত গল্প থেকে ২০১৭ সাল অবধি প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় গল্পগুলির একটি সংকলন।। এখানে মোট ৪০ টি গল্প আছে।। ৪০ টি গল্পের জনরা একদম পৃথক।। একে অপরের সাথে কোন জায়গাতেই তাদের মিল নেই।। বইটির প্রচ্ছদ অত্যন্ত সুন্দর এবং আকর্ষণীয়।। খুব ক্রিয়েটিভ ভাবনাচিন্তার মাধ্যমে এই কাজ করা হয়েছে।।
মোট ৪০ টি ছোট গল্পের সংকলন এই বইটি, আমি আমার পছন্দের কিছু গল্প সংক্ষেপে আলোচনা করে রাখলাম।।
🖤 আরোগ্য কামনা - আত্মহত্যাপ্রবন, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকা ত্বিষা, মনোবিদ বিতান কে বলেছে, আনন্দের গল্প, বেঁচে থাকার গল্প শোনাতে ত্বিষাকে।। বিতান শোনায় শ্রমোনা গ্রামের অভেরি জাতিদের গল্প।। যারা নিজেদের গ্রামের মধ্যে দিয়ে যাতে জাতীয় সড়ক না তৈরি হয় সেই প্রচেষ্টায় গোটা একটা গ্রাম মৃত্যুর পথ বেছে নেয়।।
🖤 রক্তকস্তুরি - ওঙ্কার যোশী সুগন্ধ সন্ধানী, এডভেঞ্চার প্রিয় এক মানুষ।। তার নেশা আর পেশা হল, সুগন্ধ সন্ধ্যান করা।। এই গল্প তেমনি এক সুগন্ধীর গল্প।। এর সাথে আছে বৌদ্ধ তন্ত্র, এক প্রাগৈতিহাসিক ঘটনা, এবং ইয়ংজং গুহা।।
🖤 বারাহী - একটা পরিবারের নৃশংস পরিণতি, অভাব অনটনের সংসারে বাবাহারা বাচ্চাদের পেটে খাবার তুলে না দিতে পারার যে গ্লানি, শিবানী তা রোজ অনুভব করে, শ্বশুরমশাই মারা যাওয়ার পর তো একমাত্র ভাশুর ও হাত তুলে নিয়েছে।। শিবানী, বুলা, খোকন, রাধি এরা তাহলে বাঁচবে কি করে।।
🖤 বামন বিষাদময়ী কথা - এই গল্পটি আদপে একটি প্রেমের গল্প।। প্রেম যে কত গভীর হতে পারে তার প্রমাণ দেয় এই গল্পের চৈতন্য এবং লবঙ্গ।।
🖤 বাদল আর জাদুকর সূর্যকুমার - বাদল ১৩ বছর বয়সী এক পথশিশু, মা মৃত, বাবার খোঁজ নেই।। বাদলের বেঁচে থাকার লড়াই, জাদুকরের সাথে তার বন্ধুত্ব এবং অন্তিম পরিণতি এই গল্পের উপজীব্য।।
🖤 চিরদুয়ার - এই এই গল্পটিও নিরন্তন প্রেমের গল্প সব প্রেম তো পূর্ণতা পায় না সেই রকমই এক অপূর্ণ কিন্তু আপাত পূর্ণতা পাওয়া এক প্রেমের কথা বলে এই লেখা।। অলকেশ এবং দিঠি, তাদের মাঝে একটি দরজা, একটি দুয়ার যা চিরকালীন দুয়ার হয়েই থেকে গেল।।
🖤 স্বর্গবেশ্যার ছেলে - ফেলারাম, রাতের অন্ধকারে ভাগীরথীর পারে বসে অপেক্ষা করছে মোহিতপল্লি বান্ধব দলের ঠাকুর বিসর্জনের।। সদাসতর্ক ও সুযোগসন্ধানী ফেলারাম, বিসর্জনের পর ওই প্রতিমার মুখ দেখে নিজের মায়ের কথা মনে পরে, আসলে ফেলারাম কিন্তু একটা কাজে এসেছে সেই কাজ এখন সে করছে, সেই কাজ তাকে দিয়েছে বিখ্যাত প্রতিমাশিল্পী শঙ্কর পাল।। এই গল্পটিও এই বইয়ের মধ্যে অসাধারণ একটি গল্প।।
🖤 প্রস্তুতিপর্ব - এই লেখাটি এক মধুমিতার কথা বলে যে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশেষ পরীক্ষার।। ভারতীয় রাগ রাগিনীর উপর এক গোছা বই নিয়েছে সারা জীবন ঘুরে বেড়ায় পথে পথে।।
🖤 ম্যাডাম কিউ - কিউ মানে বিরাট একটা প্রশ্ন চিহ্ন, কিউ মানে অপেক্ষমান নারীদের দীর্ঘ এক সারি।। কিউ মানে কুইন, কিউ মানে মর্গে শুয়ে থাকা রাজেন্দ্রানী।। এক ব্যর্থ কবি জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছে ফোনে কথার মাধ্যমে যৌনসুখ দেওয়ার পন্থাকে।। এই বইয়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি লেখা।।
🖤 মেটাল - মিঠাপানি গির্জার বাগানে একটা ঘণ্টা লাগানোর স্বপ্ন ফাদার জোসেফ হারাধন টুডুর।। ঘন্টা বসাতে খরচ ২৫ হাজার টাকা অথবা ত্রিশ কেজি মেটাল।। মিঠাপানি গ্রামের গরিব মানুষজন কি পারবে সেই ঘণ্টা বসাতে।।
🖤 বুকের পাথর - নিজের বউকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে কোম্পানির থেকে অর্ডার নেয় রনিত গুপ্ত।। নারীকে পণ্য করার ঘটনা মহাভারতের সময় থেকেই চলে আসছে আর এই গল্প আধুনিক সময়ে তাড়িয়ে তেমনি এক নিদর্শন।।
🖤 মাটির বেহালা - ভারত সরকারের উন্নয়ন মন্ত্রকের সর্বেসর্বা হীরালাল টুডু আর তার সর্বক্ষণের দেহরক্ষক মুসাফির।। দুজনের বার্তালাপ এই গল্পের উপজীব্য।। এই গল্পটিও এই বইয়ের মধ্যে অসাধারণ একটি গল্প।।
🖤 মৌনের মিনার - পার্শী সম্প্রদায়ের মানুষদের মৃতদেহ কিভাবে সৎকার করা হয় জানেন।। তারা মৃতদেহকে আগুনে পোড়ায় না বা মাটিতে কবর দেয় না, টাওয়ার অফ সাইলেন্স নামে একটি জায়গায় তারা মৃতদেহকে তুলে রাখে, তারপরে শকুন বিভিন্ন মাংস খেকো পাখিরা সেই মৃতদেহকে খুবলে খুবলে খায়।। আর এই গল্প তেমনি একটি নৃশংস নিষ্ঠুর গল্প।। পড়ুন ভালো লাগবে।।আরো বহু গল্প নিয়ে বলাই যায় কিন্তু এর পরে লিখতে গেলে আরো লেখাটি বড় হয়ে যাবে।। তাও এখানে বলে দিচ্ছি আরো যে কটি গল্প অত্যন্ত ভালো লেগেছে।।চান্দ্রায়ন ব্রতকথা, হাতছানি, কাঁকনের সংসার, দয়াল বাংলো, ভারসাম্য।।
🍁🍁পাঠ প্রতিক্রিয়া -
প্রতিটি গল্পই প্রাপ্তমনস্ক পাঠকদের জন্য লেখা মূলধারার সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক কাহিনী।। বিষয়বস্তু ?? কি নেই ??? বন্ধুত্ব, প্রেম-অপ্রেম, পরকীয়া, হারিয়ে পাওয়া প্রেম, মনুষ্যত্ব, বেশ্যাদের কাহিনী।। কখনো স্বপ্নপূরণ, কখনো হতাশা, কখনো নিত্যদিনের যাপন, আবার কখনো চরম হিংসার মোড়কে এক অদ্ভুত কিসসা।। নিতান্ত সাদামাটা রোজনামচা দেখা গেলেও, তার আড়ালে ঘটে চলে অন্যরকম মনস্তাত্ত্বিক কাহিনী।। আসলে সৈকত মুখোপাধ্যায় বাবুর উপন্যাস এর থেকে অনেক অনেক ভালো লেখেন এই গল্পগুলি, এই সংকলন এর প্রথম ৬ টি গল্প একটু আলাদা ধরনের, বোঝা যায় প্রথম সারির লেখা, তারপরের লেখা গুলো অনেক বেশি ডাইরেক্ট, অনেক পরিণত, বেশি নারেশন নেই, সুন্দর সাবলীল ভাষায় লেখা।। বেশ কয়েকটি লেখা পড়ে পাঠকের মনে হবে এর মধ্যে আর কি গল্প থাকতে পারে!! কিন্তু সমান্তরাল ভাবেই লেখক বুনে গেছেন দারুন দারুন সব প্লট।। আরেকটি বিশেষ দিক হল প্রত্যেকটি গল্পই বাস্তব জীবনের খুব কাছাকাছি।। বারাহী, স্বর্গবেশ্যার ছেলে, ম্যাডাম কিউ, মেটাল গল্পগুলি এতটাই ভালো লেগেছে যে এখনো একটা ঘোরের মধ্যে আছি আমি।। এই ধরনের লেখা আরো আশা করবো লেখকের থেকে আগামী দিনে।।
কিসসাওয়ালা
লেখক- সৈকত মুখোপাধ্যায়
প্রকাশনা- দ্য কাফে টেবিল
মুদ্রিত মূল্য- ৪০০/- টাকা।।
বছরের ১০ নম্বর বই, ৭ নম্বর গল্প সংকলন সৈকত মুখোপাধ্যায় এর লেখা ছোট গল্প সংকলন কিসসাওয়ালা।। বইয়ের ভূমিকায় লেখক জানিয়েছেন যে তার ‛কিসসাওয়ালা’ হওয়ার স্বপ্ন ছিল।। ‛কিসসাওয়ালা’ যেমন হাটের এক কোণে বসে হাট-ফেরতা সব মানুষদের বানিয়ে বানিয়ে গল্প শোনায়, লেখকও তেমনই বানিয়ে বানিয়ে গল্প লিখে আমাদের শোনাতে চেয়েছেন।। সৈকত বাবু লেখা শুরু করেছিলেন ২০০৬ সালে আনন্দবাজার পত্রিকার মাধ্যমে।। আর এই বইয়ের মধ্যে আছে সেই ২০০৬ সালে প্রকাশিত গল্প থেকে ২০১৭ সাল অবধি প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় গল্পগুলির একটি সংকলন।। এখানে মোট ৪০ টি গল্প আছে।। ৪০ টি গল্পের জনরা একদম পৃথক।। একে অপরের সাথে কোন জায়গাতেই তাদের মিল নেই।। বইটির প্রচ্ছদ অত্যন্ত সুন্দর এবং আকর্ষণীয়।। খুব ক্রিয়েটিভ ভাবনাচিন্তার মাধ্যমে এই কাজ করা হয়েছে।।
মোট ৪০ টি ছোট গল্পের সংকলন এই বইটি, আমি আমার পছন্দের কিছু গল্প সংক্ষেপে আলোচনা করে রাখলাম।।
🖤 আরোগ্য কামনা - আত্মহত্যাপ্রবন, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকা ত্বিষা, মনোবিদ বিতান কে বলেছে, আনন্দের গল্প, বেঁচে থাকার গল্প শোনাতে ত্বিষাকে।। বিতান শোনায় শ্রমোনা গ্রামের অভেরি জাতিদের গল্প।। যারা নিজেদের গ্রামের মধ্যে দিয়ে যাতে জাতীয় সড়ক না তৈরি হয় সেই প্রচেষ্টায় গোটা একটা গ্রাম মৃত্যুর পথ বেছে নেয়।।
🖤 রক্তকস্তুরি - ওঙ্কার যোশী সুগন্ধ সন্ধানী, এডভেঞ্চার প্রিয় এক মানুষ।। তার নেশা আর পেশা হল, সুগন্ধ সন্ধ্যান করা।। এই গল্প তেমনি এক সুগন্ধীর গল্প।। এর সাথে আছে বৌদ্ধ তন্ত্র, এক প্রাগৈতিহাসিক ঘটনা, এবং ইয়ংজং গুহা।।
🖤 বারাহী - একটা পরিবারের নৃশংস পরিণতি, অভাব অনটনের সংসারে বাবাহারা বাচ্চাদের পেটে খাবার তুলে না দিতে পারার যে গ্লানি, শিবানী তা রোজ অনুভব করে, শ্বশুরমশাই মারা যাওয়ার পর তো একমাত্র ভাশুর ও হাত তুলে নিয়েছে।। শিবানী, বুলা, খোকন, রাধি এরা তাহলে বাঁচবে কি করে।।
🖤 বামন বিষাদময়ী কথা - এই গল্পটি আদপে একটি প্রেমের গল্প।। প্রেম যে কত গভীর হতে পারে তার প্রমাণ দেয় এই গল্পের চৈতন্য এবং লবঙ্গ।।
🖤 বাদল আর জাদুকর সূর্যকুমার - বাদল ১৩ বছর বয়সী এক পথশিশু, মা মৃত, বাবার খোঁজ নেই।। বাদলের বেঁচে থাকার লড়াই, জাদুকরের সাথে তার বন্ধুত্ব এবং অন্তিম পরিণতি এই গল্পের উপজীব্য।।
🖤 চিরদুয়ার - এই এই গল্পটিও নিরন্তন প্রেমের গল্প সব প্রেম তো পূর্ণতা পায় না সেই রকমই এক অপূর্ণ কিন্তু আপাত পূর্ণতা পাওয়া এক প্রেমের কথা বলে এই লেখা।। অলকেশ এবং দিঠি, তাদের মাঝে একটি দরজা, একটি দুয়ার যা চিরকালীন দুয়ার হয়েই থেকে গেল।।
🖤 স্বর্গবেশ্যার ছেলে - ফেলারাম, রাতের অন্ধকারে ভাগীরথীর পারে বসে অপেক্ষা করছে মোহিতপল্লি বান্ধব দলের ঠাকুর বিসর্জনের।। সদাসতর্ক ও সুযোগসন্ধানী ফেলারাম, বিসর্জনের পর ওই প্রতিমার মুখ দেখে নিজের মায়ের কথা মনে পরে, আসলে ফেলারাম কিন্তু একটা কাজে এসেছে সেই কাজ এখন সে করছে, সেই কাজ তাকে দিয়েছে বিখ্যাত প্রতিমাশিল্পী শঙ্কর পাল।। এই গল্পটিও এই বইয়ের মধ্যে অসাধারণ একটি গল্প।।
🖤 প্রস্তুতিপর্ব - এই লেখাটি এক মধুমিতার কথা বলে যে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশেষ পরীক্ষার।। ভারতীয় রাগ রাগিনীর উপর এক গোছা বই নিয়েছে সারা জীবন ঘুরে বেড়ায় পথে পথে।।
🖤 ম্যাডাম কিউ - কিউ মানে বিরাট একটা প্রশ্ন চিহ্ন, কিউ মানে অপেক্ষমান নারীদের দীর্ঘ এক সারি।। কিউ মানে কুইন, কিউ মানে মর্গে শুয়ে থাকা রাজেন্দ্রানী।। এক ব্যর্থ কবি জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছে ফোনে কথার মাধ্যমে যৌনসুখ দেওয়ার পন্থাকে।। এই বইয়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি লেখা।।
🖤 মেটাল - মিঠাপানি গির্জার বাগানে একটা ঘণ্টা লাগানোর স্বপ্ন ফাদার জোসেফ হারাধন টুডুর।। ঘন্টা বসাতে খরচ ২৫ হাজার টাকা অথবা ত্রিশ কেজি মেটাল।। মিঠাপানি গ্রামের গরিব মানুষজন কি পারবে সেই ঘণ্টা বসাতে।।
🖤 বুকের পাথর - নিজের বউকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে কোম্পানির থেকে অর্ডার নেয় রনিত গুপ্ত।। নারীকে পণ্য করার ঘটনা মহাভারতের সময় থেকেই চলে আসছে আর এই গল্প আধুনিক সময়ে তাড়িয়ে তেমনি এক নিদর্শন।।
🖤 মাটির বেহালা - ভারত সরকারের উন্নয়ন মন্ত্রকের সর্বেসর্বা হীরালাল টুডু আর তার সর্বক্ষণের দেহরক্ষক মুসাফির।। দুজনের বার্তালাপ এই গল্পের উপজীব্য।। এই গল্পটিও এই বইয়ের মধ্যে অসাধারণ একটি গল্প।।
🖤 মৌনের মিনার - পার্শী সম্প্রদায়ের মানুষদের মৃতদেহ কিভাবে সৎকার করা হয় জানেন।। তারা মৃতদেহকে আগুনে পোড়ায় না বা মাটিতে কবর দেয় না, টাওয়ার অফ সাইলেন্স নামে একটি জায়গায় তারা মৃতদেহকে তুলে রাখে, তারপরে শকুন বিভিন্ন মাংস খেকো পাখিরা সেই মৃতদেহকে খুবলে খুবলে খায়।। আর এই গল্প তেমনি একটি নৃশংস নিষ্ঠুর গল্প।। পড়ুন ভালো লাগবে।।আরো বহু গল্প নিয়ে বলাই যায় কিন্তু এর পরে লিখতে গেলে আরো লেখাটি বড় হয়ে যাবে।। তাও এখানে বলে দিচ্ছি আরো যে কটি গল্প অত্যন্ত ভালো লেগেছে।।চান্দ্রায়ন ব্রতকথা, হাতছানি, কাঁকনের সংসার, দয়াল বাংলো, ভারসাম্য।।
🍁🍁পাঠ প্রতিক্রিয়া -
প্রতিটি গল্পই প্রাপ্তমনস্ক পাঠকদের জন্য লেখা মূলধারার সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক কাহিনী।। বিষয়বস্তু ?? কি নেই ??? বন্ধুত্ব, প্রেম-অপ্রেম, পরকীয়া, হারিয়ে পাওয়া প্রেম, মনুষ্যত্ব, বেশ্যাদের কাহিনী।। কখনো স্বপ্নপূরণ, কখনো হতাশা, কখনো নিত্যদিনের যাপন, আবার কখনো চরম হিংসার মোড়কে এক অদ্ভুত কিসসা।। নিতান্ত সাদামাটা রোজনামচা দেখা গেলেও, তার আড়ালে ঘটে চলে অন্যরকম মনস্তাত্ত্বিক কাহিনী।। আসলে সৈকত মুখোপাধ্যায় বাবুর উপন্যাস এর থেকে অনেক অনেক ভালো লেখেন এই গল্পগুলি, এই সংকলন এর প্রথম ৬ টি গল্প একটু আলাদা ধরনের, বোঝা যায় প্রথম সারির লেখা, তারপরের লেখা গুলো অনেক বেশি ডাইরেক্ট, অনেক পরিণত, বেশি নারেশন নেই, সুন্দর সাবলীল ভাষায় লেখা।। বেশ কয়েকটি লেখা পড়ে পাঠকের মনে হবে এর মধ্যে আর কি গল্প থাকতে পারে!! কিন্তু সমান্তরাল ভাবেই লেখক বুনে গেছেন দারুন দারুন সব প্লট।। আরেকটি বিশেষ দিক হল প্রত্যেকটি গল্পই বাস্তব জীবনের খুব কাছাকাছি।। বারাহী, স্বর্গবেশ্যার ছেলে, ম্যাডাম কিউ, মেটাল গল্পগুলি এতটাই ভালো লেগেছে যে এখনো একটা ঘোরের মধ্যে আছি আমি।। এই ধরনের লেখা আরো আশা করবো লেখকের থেকে আগামী দিনে।।
May 30, 2021
#কিসসাওয়ালা
#সৈকত_মুখোপাধ্যায়
#দ্য_কাফে_টেবিল
#মূল্য_৩৫০_টাকা
#প্রথম_প্রকাশ_কলকাতা_বইমেলা_২০১৮
গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যাদের জন্ম,একবিংশ শতকের প্রথম দিকে শৈশব ছাড়িয়ে তারা কৈশোরের পথে পা বাড়িয়েছি।সেইসব সেপিয়া রঙের দিনগুলোয় ছাদে গিয়ে এন্টেনা ঘুরিয়ে ছবি ঠিক করে সাদা-কালো দূরদর্শনে শক্তিমান,জুনিয়র-জি,ক্যাপ্টেন ব্যোম ইত্যাদি গলাধঃকরণ করার পাশাপাশি বই নিয়েও চলত দাদা,বোনেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি।ছোটদের বই পড়ার সাথে সাথে লুকিয়ে বড়দের পত্রিকা পড়ার অভ্যাসও শুরু এর পরে পরেই।আনন্দমেলা,শুকতারা,সন্দেশ,কিশোর ভারতী,কিশোর জ্ঞান-বিজ্ঞান এর পাশাপাশি রুটিনে জায়গা করে নিচ্ছিল দেশ,বর্তমান,পত্রিকা,সানন্দা,নবকল্লোল।প্রথম বড়দের লেখা পড়ার নিষিদ্ধ আনন্দের স্বাদ পাঠকমাত্রেই জানেন।কিন্তু কয়েকজন হাতেগোনা লেখকের কিছু গল্প-উপন্যাস ছাড়া সেইভাবে বড়দের লেখা টানেনি কোনোদিনই।অর্থাৎ,ছোটদের লেখা যেমন নির্বিচারে পড়তে ভালো লাগে,উপন্যাস ছাড়া বড়দের লেখায় সেইভাবে মুগ্ধ হবার অবসর হয়নি।
কর্মজীবনে প্রবেশ করার পর অবসর সময়ে উপন্যাসের প্রতি চিরকালীন পক্ষপাতিত্ব থাকলেও গল্পের ব্যাপারে খুঁতখুঁতুনি রয়েই যায়।লেখক পছন্দের হলেও মনভরেনা অনেকসময়ই।আজকের দুর্বারগতির জীবনে ঝকঝকে জীবনযাত্রার মত গল্পেরাও ঝকঝকে,ভাষাও মেদহীন,তৎসম শব্দের প্রয়োগ তাতে উল্লেখযোগ্য ভাবে কম।উপন্যাসে,বিশেষ করে ঐতিহাসিক উপন্যাসে এখনও এর চল রয়েছে,কিন্তু গল্পের ক্ষেত্রে ব্যবহার নগণ্য।অন্তত,বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলিতে ছাপা বেশিরভাগ গল্পই আধুনিক শব্দেই রচিত।তৃষ্ণার্ত মন তাই ভাষার অলঙ্কারে সজ্জিত একেকখানি নিটোল গল্পের পথ চেয়ে থাকে।খুব কম সময়ই পাওয়া যায় সেই চোখের আরাম,মনের শান্তি।
গল্প হবে এমনই,যা স্পর্শ করে যাবে হৃদয়ের অন্তরতম স্থলটি।সেই স্পর্শের মাধ্যম হতে পারে কখনও কোমল প্রেমানুভূতি,কখনও তীক্ষ্ণ শ্লেষ,কখনও বা নির্ভেজাল হাস্যরস,আবার প্রবল বিষাদসাগরে নিমজ্জিত হতে হলেও কোনো ক্ষতি নেই।মোদ্দা কথাটা হল,সাগরতীরের বালুকাবেলায় আঙুল দিয়ে কাটা ক্ষণস্থায়ী দাগের মত নয়,ভীমবেটকার গুহামানব যে অক্লান্ত পরিশ্রমে পাথরের গায়ে কালজয়ী দাগগুলো কেটেছিল,ঠিক সেইরকম হবে পাঠকমনে এর স্থায়ীত্ব।তাই পাঠকের প্রশ্ন হল,এইসময়ে দাঁড়িয়ে কার লেখায় এই বিবিধ ভান্ডার খুঁজে ফিরব?কার লেখায় পাব সেই স্বতঃস্ফুর্ত ভাষানির্মাণ যাতে সাধারণ চরিত্ররাও অপরূপ রূপে ধরা দেবে?
যাঁরা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নিয়মিতভাবে গল্প লিখছেন,যাদের প্রায় প্রত্যেকটি গল্পই নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও গুণমান বজায় রেখে নির্মাণ করে চলেছে এক আশ্চর্য মায়াবী জগৎ,যার কলাকুশলীরা সকলে আমাদেরই চারপাশের চেনা-অচেনা চরিত্র,তাঁদের প্রথম কয়েকজনের একজন হলেন সৈকত মুখোপাধ্যায়।বারো বছরের লেখকজীবনের চল্লিশটি বাছাই করা মণিমুক্তো প্রকাশের ক্রমানুসারে সাজিয়ে পাঠকের কাছে তিনি পেশ করেছেন 'কিসসাওয়ালা' নামে।নিজেকে লেখকের তুলনায় 'কিসসাওয়ালা' বা গল্পবলিয়ে ভাবতেই যিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন,তাঁর গল্পসংকলনের এমনধারা নাম হওয়াই বাঞ্ছনীয় নয় কি?
কোন এক অজানা গাঁয়ে হাটবারের সন্ধেতে মাথার ওপর চাঁদ উঠলে কিসসাওয়ালার আসর বসেছে।বেচাকেনা-ক্লান্ত হাটুরের দল উৎসাহভরে তার মুখের দিকে চেয়ে আছে,না জানি কোন আশ্চর্য গল্প শুনিয়ে তাদের সারাদিনের শ্রান্তি ধুইয়ে দেবে সে।আসুন,গুটিগুটি পায়ে পেছনের সারিতে বসে পড়ি আমরাও,ঢুকে পড়ি কিসসাওয়ালার আজব কিসসার জগতে।
লেখকজীবনের শুরুর দিকের গল্পগুলি মূলত বিষাদধর্মী এবং খানিক জটিলতা বয়ে চলতে ইচ্ছুক।তবে শল্কের পর শল্ক ছাড়িয়ে গভীরে গেলে দেখা হয়ে যায় 'অবলোকিতেশ' এর যৌনপ্রত্যাখ্যাত থেকে মৃতকামী হয়ে ওঠা বাসবী,বকুলগন্ধে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকা 'অ-ঘ্রাণ আলেখ্য'র গাঙ্গুলীদাদু,'আরোগ্য কামনা'র আত্মহত্যাকামী ত্বিষা বা 'চান্দ্রায়ণ ব্রতকথা'র রাজীবের মত দৈনন্দিন জীবন থেকেই উঠে আসা বর্ণময় চরিত্রের সঙ্গে।গল্পের চলন এবং তার ভাষাশরীর নির্মাণ দুইয়েই লেখকের প্রস্তুতিপর্বের পরিশ্রম পরিলক্ষিত হয়েছে।আবার আশ্চর্য প্রকৃতিপ্রেম ও রিপুসংবরণের উদাহরণ 'রক্তকস্তুরী',জাদুবাস্তবতার সার্থক প্রয়োগে 'সেরিবান যে পথটা খুঁজেছিল' দিয়ে তাঁর অন্যধারার গল্প লেখার শুরু।আলাদা করে বলতেই হয় 'বারাহী'র কথা।প্রাচীন বৌদ্ধদেবীর মূর্তিখোদিত নৌকার উল্লেখ এবং গভীর দুঃখজনক পরিণতি একে স্বতন্ত্র করেছে।'সন্ধ্যার গোয়েন্দা একজন'এ রহস্য গল্পচ্ছলে আলোকপাত করা হয়েছে এক যৌন-উপবাসী মেয়ের জটিল মনোবৃত্তে।মানুষ নিজেকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে,প্রেমও তার কাছে কিছুই নয়,এই আপ্তবাক্যের উপলব্ধি 'বামন বিষাদময়ী কথা'য়।গত দশকের শেষ থেকে চলতি দশকের শুরুতে প্রকাশিত গল্পগুলিতে ফের গভীর দীর্ঘশ্বাস বিস্তৃত হয়েছে।বিশেষত,'বাদল আর জাদুকর সূর্যকুমার' সহজ লিনিয়ার ন্যারেটিভে বলে যাওয়া অথচ তীব্র অভিঘাতযুক্ত একটি উৎকৃষ্ট কাজ।আবার,'চিরদুয়ার' গল্পে দেখা মেলে সেই চিরন্তন নরনারীর,অবধারিত বিচ্ছেদ জেনেও যারা যুগযুগ ধরে বন্ধ দরজার দুদিকে অপেক্ষমান।মানুষের জীবনের বেশিরভাগ জায়গাটা জুড়ে আছে তীব্র দুঃখ-কষ্ট,হতাশা,সুখ সেখানে ডুমরের ফুলের মত বস্তু।আর কে না জানে,চিরকাল দাগ ফেলার ক্ষমতা দুঃখেরই বেশি। লেখক অক্ষরসেতু দিয়ে পাঠককে পার করাতে চেয়েছেন সেই অসীম বিষাদসিন্ধু,বা হয়তো পার করাতে নয়,টেনে মুখোমুখি দাঁড় করাতে চেয়েছেন সেই অন্ধকারতম সত্যের মুখোমুখি।তাই প্রায় প্রত্যেকটি গল্পেই আধিপত্য চরম কষ্টের।ঘুণধরা সমাজের প্রায় প্রতিটি কোণায় জড়সড় হয়ে থাকা অসহায়,লাঞ্ছিত,অপমানিত,সর্বহারা মানুষগুলোই প্রধান চরিত্ররূপে বারবার এসে দাঁড়িয়েছে গল্পের আঙিনায়।তারমধ্যে কাহিনীর অভিনবত্বেই হোক বা তার আশ্চর্য সমাপ্তিতেই হোক,'স্বর্গবেশ্যার ছেলে','কাঁকনের সংসার','দয়াল বাংলো','মেটাল','মেহেদিবাড়ির করাতকল','মাটির বেহালা','পিতৃমুখী','মৌনের মিনার' আলাদা জায়গার দাবি রাখে।আবার,সংকলনের শেষ গল্প 'টেকেন ফর গ্র্যান্টেড' তার সর্বজ্ঞ কথকের কারণে হয়ে উঠেছে অনন্য।লক্ষণীয় এই যে,বারো বছর ধরে গল্পের ভাষা ক্রমশঃ সহজ হয়ে এসেছে,রূপকের আড়াল ছেড়ে সোজাসুজি চরিত্রের মাধ্যমেই আঘাত হেনেছে পাঠকের বুকে।এই সরলীকরণের কারণ অজ্ঞাত,তাও প্রথমদিকের গল্পগুলির মধ্যে যে আবিষ্কারের আনন্দ রয়েছে,তাতে ভবিষ্যতে এধরণের গল্পের প্রত্যাশা থাকবেই।প্রত্যেকটি গল্পের শেষে প্রকাশকাল থাকায় লেখনীর বিবর্তনপথ বুঝতে বেশ সুবিধা হয়েছে,একথা অনস্বীকার্য।
এ তো গেল গল্পের জগতের কথা।বইটির ভূমিকা 'স্বপ্নে স্বপ্নান্তরে'র কথা খানিক না বললে এ কীবোর্ড এর খটখটানি বৃথা।এই যে কিসসাওয়ালা হওয়ার অলীক স্বপ্ন,প্রতিটি গল্পেই একটি নিটোল গোলগল্প পাঠককে উপহার দেওয়ার আপ্রাণ প্রচেষ্টা,ফ্যান্টাসীর আড়ালে লুকিয়ে রাখা কষ্টের তাসটি ঠিকই চিনিয়ে দেওয়া,গল্পের বিভিন্ন আঙ্গিকে পরীক্ষানিরীক্ষা এবং সর্বোপরি মানুষের কথা লিখে চলার যে আকুল প্রার্থনা,এই সবই লেখক তাঁর অদ্ভুত সুন্দর ভাষার মাধ্যমে পাঠকের হাতে তুলে ধরেছেন এই ভূমিকার মধ্যে দিয়েই।তাই শুধুমাত্র এইটুকু পড়ার জন্যই আমি বইটি বারবার হাতে তুলে নিতে মুখিয়ে থাকব।
অবশেষে,প্রচ্ছদের ক্ষেত্রে বলি,কিসসাওয়ালার জন্য বেদুইন তাঁবুর চেয়ে বড় আশ্রয় আর কীই বা হতে পারে?আর,পাঠকের হাতে এই অমূল্য উপহার তুলে দেওয়ার জন্য 'দ্য কাফে টেবিল'এর অবশ্যপ্রাপ্য অসংখ্য ধন্যবাদ।যাঁরা এতক্ষণ ধৈর্য ধরে আমার এই অসীম ধৃষ্টতার নমুনা পড়েই ফেলেছেন,তাঁদের অনুরোধ,কিসসাওয়ালার আসরে একবার এসে বসেই পড়ুন।লোকটা বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলে বটে,তা বলে সে কাউকে ঠকাবার ইচ্ছা রাখেনা,একথা নিশ্চিত বলতে পারি।
#সৈকত_মুখোপাধ্যায়
#দ্য_কাফে_টেবিল
#মূল্য_৩৫০_টাকা
#প্রথম_প্রকাশ_কলকাতা_বইমেলা_২০১৮
গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যাদের জন্ম,একবিংশ শতকের প্রথম দিকে শৈশব ছাড়িয়ে তারা কৈশোরের পথে পা বাড়িয়েছি।সেইসব সেপিয়া রঙের দিনগুলোয় ছাদে গিয়ে এন্টেনা ঘুরিয়ে ছবি ঠিক করে সাদা-কালো দূরদর্শনে শক্তিমান,জুনিয়র-জি,ক্যাপ্টেন ব্যোম ইত্যাদি গলাধঃকরণ করার পাশাপাশি বই নিয়েও চলত দাদা,বোনেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি।ছোটদের বই পড়ার সাথে সাথে লুকিয়ে বড়দের পত্রিকা পড়ার অভ্যাসও শুরু এর পরে পরেই।আনন্দমেলা,শুকতারা,সন্দেশ,কিশোর ভারতী,কিশোর জ্ঞান-বিজ্ঞান এর পাশাপাশি রুটিনে জায়গা করে নিচ্ছিল দেশ,বর্তমান,পত্রিকা,সানন্দা,নবকল্লোল।প্রথম বড়দের লেখা পড়ার নিষিদ্ধ আনন্দের স্বাদ পাঠকমাত্রেই জানেন।কিন্তু কয়েকজন হাতেগোনা লেখকের কিছু গল্প-উপন্যাস ছাড়া সেইভাবে বড়দের লেখা টানেনি কোনোদিনই।অর্থাৎ,ছোটদের লেখা যেমন নির্বিচারে পড়তে ভালো লাগে,উপন্যাস ছাড়া বড়দের লেখায় সেইভাবে মুগ্ধ হবার অবসর হয়নি।
কর্মজীবনে প্রবেশ করার পর অবসর সময়ে উপন্যাসের প্রতি চিরকালীন পক্ষপাতিত্ব থাকলেও গল্পের ব্যাপারে খুঁতখুঁতুনি রয়েই যায়।লেখক পছন্দের হলেও মনভরেনা অনেকসময়ই।আজকের দুর্বারগতির জীবনে ঝকঝকে জীবনযাত্রার মত গল্পেরাও ঝকঝকে,ভাষাও মেদহীন,তৎসম শব্দের প্রয়োগ তাতে উল্লেখযোগ্য ভাবে কম।উপন্যাসে,বিশেষ করে ঐতিহাসিক উপন্যাসে এখনও এর চল রয়েছে,কিন্তু গল্পের ক্ষেত্রে ব্যবহার নগণ্য।অন্তত,বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলিতে ছাপা বেশিরভাগ গল্পই আধুনিক শব্দেই রচিত।তৃষ্ণার্ত মন তাই ভাষার অলঙ্কারে সজ্জিত একেকখানি নিটোল গল্পের পথ চেয়ে থাকে।খুব কম সময়ই পাওয়া যায় সেই চোখের আরাম,মনের শান্তি।
গল্প হবে এমনই,যা স্পর্শ করে যাবে হৃদয়ের অন্তরতম স্থলটি।সেই স্পর্শের মাধ্যম হতে পারে কখনও কোমল প্রেমানুভূতি,কখনও তীক্ষ্ণ শ্লেষ,কখনও বা নির্ভেজাল হাস্যরস,আবার প্রবল বিষাদসাগরে নিমজ্জিত হতে হলেও কোনো ক্ষতি নেই।মোদ্দা কথাটা হল,সাগরতীরের বালুকাবেলায় আঙুল দিয়ে কাটা ক্ষণস্থায়ী দাগের মত নয়,ভীমবেটকার গুহামানব যে অক্লান্ত পরিশ্রমে পাথরের গায়ে কালজয়ী দাগগুলো কেটেছিল,ঠিক সেইরকম হবে পাঠকমনে এর স্থায়ীত্ব।তাই পাঠকের প্রশ্ন হল,এইসময়ে দাঁড়িয়ে কার লেখায় এই বিবিধ ভান্ডার খুঁজে ফিরব?কার লেখায় পাব সেই স্বতঃস্ফুর্ত ভাষানির্মাণ যাতে সাধারণ চরিত্ররাও অপরূপ রূপে ধরা দেবে?
যাঁরা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নিয়মিতভাবে গল্প লিখছেন,যাদের প্রায় প্রত্যেকটি গল্পই নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও গুণমান বজায় রেখে নির্মাণ করে চলেছে এক আশ্চর্য মায়াবী জগৎ,যার কলাকুশলীরা সকলে আমাদেরই চারপাশের চেনা-অচেনা চরিত্র,তাঁদের প্রথম কয়েকজনের একজন হলেন সৈকত মুখোপাধ্যায়।বারো বছরের লেখকজীবনের চল্লিশটি বাছাই করা মণিমুক্তো প্রকাশের ক্রমানুসারে সাজিয়ে পাঠকের কাছে তিনি পেশ করেছেন 'কিসসাওয়ালা' নামে।নিজেকে লেখকের তুলনায় 'কিসসাওয়ালা' বা গল্পবলিয়ে ভাবতেই যিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন,তাঁর গল্পসংকলনের এমনধারা নাম হওয়াই বাঞ্ছনীয় নয় কি?
কোন এক অজানা গাঁয়ে হাটবারের সন্ধেতে মাথার ওপর চাঁদ উঠলে কিসসাওয়ালার আসর বসেছে।বেচাকেনা-ক্লান্ত হাটুরের দল উৎসাহভরে তার মুখের দিকে চেয়ে আছে,না জানি কোন আশ্চর্য গল্প শুনিয়ে তাদের সারাদিনের শ্রান্তি ধুইয়ে দেবে সে।আসুন,গুটিগুটি পায়ে পেছনের সারিতে বসে পড়ি আমরাও,ঢুকে পড়ি কিসসাওয়ালার আজব কিসসার জগতে।
লেখকজীবনের শুরুর দিকের গল্পগুলি মূলত বিষাদধর্মী এবং খানিক জটিলতা বয়ে চলতে ইচ্ছুক।তবে শল্কের পর শল্ক ছাড়িয়ে গভীরে গেলে দেখা হয়ে যায় 'অবলোকিতেশ' এর যৌনপ্রত্যাখ্যাত থেকে মৃতকামী হয়ে ওঠা বাসবী,বকুলগন্ধে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকা 'অ-ঘ্রাণ আলেখ্য'র গাঙ্গুলীদাদু,'আরোগ্য কামনা'র আত্মহত্যাকামী ত্বিষা বা 'চান্দ্রায়ণ ব্রতকথা'র রাজীবের মত দৈনন্দিন জীবন থেকেই উঠে আসা বর্ণময় চরিত্রের সঙ্গে।গল্পের চলন এবং তার ভাষাশরীর নির্মাণ দুইয়েই লেখকের প্রস্তুতিপর্বের পরিশ্রম পরিলক্ষিত হয়েছে।আবার আশ্চর্য প্রকৃতিপ্রেম ও রিপুসংবরণের উদাহরণ 'রক্তকস্তুরী',জাদুবাস্তবতার সার্থক প্রয়োগে 'সেরিবান যে পথটা খুঁজেছিল' দিয়ে তাঁর অন্যধারার গল্প লেখার শুরু।আলাদা করে বলতেই হয় 'বারাহী'র কথা।প্রাচীন বৌদ্ধদেবীর মূর্তিখোদিত নৌকার উল্লেখ এবং গভীর দুঃখজনক পরিণতি একে স্বতন্ত্র করেছে।'সন্ধ্যার গোয়েন্দা একজন'এ রহস্য গল্পচ্ছলে আলোকপাত করা হয়েছে এক যৌন-উপবাসী মেয়ের জটিল মনোবৃত্তে।মানুষ নিজেকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে,প্রেমও তার কাছে কিছুই নয়,এই আপ্তবাক্যের উপলব্ধি 'বামন বিষাদময়ী কথা'য়।গত দশকের শেষ থেকে চলতি দশকের শুরুতে প্রকাশিত গল্পগুলিতে ফের গভীর দীর্ঘশ্বাস বিস্তৃত হয়েছে।বিশেষত,'বাদল আর জাদুকর সূর্যকুমার' সহজ লিনিয়ার ন্যারেটিভে বলে যাওয়া অথচ তীব্র অভিঘাতযুক্ত একটি উৎকৃষ্ট কাজ।আবার,'চিরদুয়ার' গল্পে দেখা মেলে সেই চিরন্তন নরনারীর,অবধারিত বিচ্ছেদ জেনেও যারা যুগযুগ ধরে বন্ধ দরজার দুদিকে অপেক্ষমান।মানুষের জীবনের বেশিরভাগ জায়গাটা জুড়ে আছে তীব্র দুঃখ-কষ্ট,হতাশা,সুখ সেখানে ডুমরের ফুলের মত বস্তু।আর কে না জানে,চিরকাল দাগ ফেলার ক্ষমতা দুঃখেরই বেশি। লেখক অক্ষরসেতু দিয়ে পাঠককে পার করাতে চেয়েছেন সেই অসীম বিষাদসিন্ধু,বা হয়তো পার করাতে নয়,টেনে মুখোমুখি দাঁড় করাতে চেয়েছেন সেই অন্ধকারতম সত্যের মুখোমুখি।তাই প্রায় প্রত্যেকটি গল্পেই আধিপত্য চরম কষ্টের।ঘুণধরা সমাজের প্রায় প্রতিটি কোণায় জড়সড় হয়ে থাকা অসহায়,লাঞ্ছিত,অপমানিত,সর্বহারা মানুষগুলোই প্রধান চরিত্ররূপে বারবার এসে দাঁড়িয়েছে গল্পের আঙিনায়।তারমধ্যে কাহিনীর অভিনবত্বেই হোক বা তার আশ্চর্য সমাপ্তিতেই হোক,'স্বর্গবেশ্যার ছেলে','কাঁকনের সংসার','দয়াল বাংলো','মেটাল','মেহেদিবাড়ির করাতকল','মাটির বেহালা','পিতৃমুখী','মৌনের মিনার' আলাদা জায়গার দাবি রাখে।আবার,সংকলনের শেষ গল্প 'টেকেন ফর গ্র্যান্টেড' তার সর্বজ্ঞ কথকের কারণে হয়ে উঠেছে অনন্য।লক্ষণীয় এই যে,বারো বছর ধরে গল্পের ভাষা ক্রমশঃ সহজ হয়ে এসেছে,রূপকের আড়াল ছেড়ে সোজাসুজি চরিত্রের মাধ্যমেই আঘাত হেনেছে পাঠকের বুকে।এই সরলীকরণের কারণ অজ্ঞাত,তাও প্রথমদিকের গল্পগুলির মধ্যে যে আবিষ্কারের আনন্দ রয়েছে,তাতে ভবিষ্যতে এধরণের গল্পের প্রত্যাশা থাকবেই।প্রত্যেকটি গল্পের শেষে প্রকাশকাল থাকায় লেখনীর বিবর্তনপথ বুঝতে বেশ সুবিধা হয়েছে,একথা অনস্বীকার্য।
এ তো গেল গল্পের জগতের কথা।বইটির ভূমিকা 'স্বপ্নে স্বপ্নান্তরে'র কথা খানিক না বললে এ কীবোর্ড এর খটখটানি বৃথা।এই যে কিসসাওয়ালা হওয়ার অলীক স্বপ্ন,প্রতিটি গল্পেই একটি নিটোল গোলগল্প পাঠককে উপহার দেওয়ার আপ্রাণ প্রচেষ্টা,ফ্যান্টাসীর আড়ালে লুকিয়ে রাখা কষ্টের তাসটি ঠিকই চিনিয়ে দেওয়া,গল্পের বিভিন্ন আঙ্গিকে পরীক্ষানিরীক্ষা এবং সর্বোপরি মানুষের কথা লিখে চলার যে আকুল প্রার্থনা,এই সবই লেখক তাঁর অদ্ভুত সুন্দর ভাষার মাধ্যমে পাঠকের হাতে তুলে ধরেছেন এই ভূমিকার মধ্যে দিয়েই।তাই শুধুমাত্র এইটুকু পড়ার জন্যই আমি বইটি বারবার হাতে তুলে নিতে মুখিয়ে থাকব।
অবশেষে,প্রচ্ছদের ক্ষেত্রে বলি,কিসসাওয়ালার জন্য বেদুইন তাঁবুর চেয়ে বড় আশ্রয় আর কীই বা হতে পারে?আর,পাঠকের হাতে এই অমূল্য উপহার তুলে দেওয়ার জন্য 'দ্য কাফে টেবিল'এর অবশ্যপ্রাপ্য অসংখ্য ধন্যবাদ।যাঁরা এতক্ষণ ধৈর্য ধরে আমার এই অসীম ধৃষ্টতার নমুনা পড়েই ফেলেছেন,তাঁদের অনুরোধ,কিসসাওয়ালার আসরে একবার এসে বসেই পড়ুন।লোকটা বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলে বটে,তা বলে সে কাউকে ঠকাবার ইচ্ছা রাখেনা,একথা নিশ্চিত বলতে পারি।
Displaying 1 - 4 of 4 reviews





