বই পর্যালোচনা
সিভিলিয়া নামক একটি দেশে ঘটছে একের পর এক নৃশংস খুনের ঘটনা। প্রত্যেক মার্ডার সিনে সিরিয়াল কিলার এঁকে যাচ্ছে একটি করে গোলাপ। গোলাপ আঁকতে সে ব্যবহার করে না কোনো রঙ, বরং সে ব্যবহার করে মৃতের রক্ত। আর তাই পুলিশ এই সিরিয়াল কিলারের নাম দিয়েছে, 'ক্যানভাস কিলার।'
নিজ প্রেমিকাকে হারিয়ে দিশেহারা প্রাইভেট ডিটেকটিভ ডিন ক্লিন্টন ক্যানভাস কিলারকে ধরতে মরিয়া হয়ে উঠে। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড থামাতে ডিনের পাশে দাঁড়ায় পারসোনাল সেক্রেটারি লিসা কবির। উদ্দেশ্য একটাই, ক্যানভাস কিলারের ক্যানভাসটিকে অসমাপ্ত রেখে তার একেকটি শিকারদের বাঁচানো... কিন্তু শেষ রক্ষা কী হলো?
১১টি কেসের তদন্ত ও এক অজানা অপশক্তির আগমন কি এই দুজনকে একজোট রাখতে পারবে?
পাঠ-প্রতিক্রিয়া:
আমি জানি না, যারা বইটি পড়েছেন তারা আমার সঙ্গে একমত হতে পারবেন কিনা তবে আমার মনে হয়, লেখক যেই পটভূমিতে বইটি শুরু করেছিলেন তা কীভাবে যেন হারিয়ে যায়। মানে হঠাৎ করেই, যেন সেই প্লটটা মিলিয়ে যায় এমন আর দ্বিতীয় ভাগে এসে সত্যি সত্যিই সেটা মিলিয়ে যায়। দ্বিতীয় ভাগে এটা ডিটেকটিভ থ্রিলার কম প্যারাসাইকোলজিক্যাল থ্রিলার মনে হয়েছে। বইয়ের মূল জনরা যেহুতু ডিটেকটিভ থ্রিলার তাই দুইটি ভাগেই সমানতালে গোয়েন্দাদের গুরুত্ব থাকাটা আবশ্যকীয়। কিন্তু দ্বিতীয় ভাগে ডিন আর লিসার তেমন কোনো গুরুত্ব খুঁজেই পাওয়া যায়নি। কেস সমাধান করতে গিয়েও তারা বিফল হয়েছে। 'পোস্ট স্ক্রিপ্ট-১' পড়ে ধারণা করা যায়, সিরিজের পরবর্তী বইতেও তারা হেরেছে। শেষ অধ্যায়ের সেই 'আশা' পূর্ণ তো হলো না তবে।
প্রথম ভাগ তাও মোটামুটি ছিল কিন্তু দ্বিতীয় ভাগে এসে মনে হয়েছে সব গুবলেট হয়ে গেছে। ভৌতিক একেকটি বর্ণনা যতোটা রোমহষর্ক হবার কথা ততোটা হয়নি। যে কেউ সেই ব্যাপারগুলো পড়ে যেতে পারবে, ভয় কাজ করবে না অথচ লেখার মাধ্যমে ভয়ের ছাপ ফুঁটিয়ে তোলাটা জরুরী। আমি একটি ক্যারেক্টরকে স্টাডি করছি, সে ভয় পাচ্ছে কিন্তু আমি সেটা অনুভব করতে পারছি না, এটা বেখাপ্পা দেখায়। প্রত্যেকটা ক্যারেক্টরের মনোভাব পাঠকদের মনে দোলা না দিলে সেটা সার্থক হলো না।
ক্যানভাস কিলারকে এতো দ্রুত ধরে ফেলে নাস্তানাবুদ করবে আশা করিনি। বইয়ের মূল আকর্ষণই যেটা ছিলো, সেটাই হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেল। ক্যানভাস কিলারের পরিচয়টাও আগেভাগে প্রকাশ পেয়ে গেল। সাসপেন্স ছিল না... অথচ একটা পরিপূর্ণ থ্রিলারে সাসপেন্স আর টুইস্ট কতোটা জরুরী! আমি সত্যিই এ দুটো জিনিস খুব মিস করেছি।
পতিতার সঙ্গে ডিন ক্লিন্টনের সঙ্গমের বর্ণনাগুলো এতো বড়ো করে বলার কোনো প্রয়োজন দেখিনি। এগুলো আরেকটু সংক্ষিপ্ত রাখলেও হতো। সঙ্গমের প্রত্যেকটা বর্ণনা স্কিপ করে গেলেও কোনো সমস্যাই হয় না। এই যেমন: পতিতার সঙ্গে সঙ্গমের ব্যাপারগুলো ধৈর্য্য সহকারে পড়ার পর আমি ২৮১-২৮৩ পেজের অর্ধেক স্কিপ করে গেছি পরবর্তী ঘটনা বুঝতে মোটেও সমস্যা হয়নি। এই ব্যাপারগুলোতে বেশি সময় ব্যয় না করে যেখানে ব্যয় করাটা বেশি জরুরী ছিল(যেমন: ভৌতিক বর্ণনাগুলো এমনভাবে প্রেজেন্ট করা যেন প্রত্যেকটা ক্যারেক্টরের সঙ্গে একজন সাধারণ পাঠক রিলেট করতে পারে) সেখানে ব্যয় করেননি। সমাপ্তিতে এসে তাড়াহুড়ো করেছেন বলে মনে হয়েছে। লেখকের ভাষ্যমতে, এটিকে যদি এডাল্ট থ্রিলার ধরেও নেই তাহলেও সঙ্গমের ব্যাপারগুলোয় কোনো প্রয়োজনীয়তার কিছুই দেখিনি। এডাল্ট কন্টেন্ট সম্পন্ন একটা থ্রিলার এডাল্ট কন্টেন্ট এমনভাবে ফুঁটিয়ে তুলতে হয় যেন মনে হয়, এর প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই আছে! কিন্তু এখানে আমার তা মনেই হয়নি।
বইটিতে কোনো লিখিত প্রতিবেদন কিংবা অনলাইন ওয়েবসাইটের খবর হলে খেয়াল করেছি, সেটাকে পুরোপুরি ইংরেজিতে লেখা। এখন আমি হয়তো ইংরেজি ভালো বুঝি তাই হয়তো তাতে আমার কোনো সমস্যা হয়নি কিন্তু যারা প্রপার ইংরেজি জানে না বা ইংরেজি কঠিন শব্দগুলোর মর্মার্থ জানে না, তাদের জন্য এটা বেশ ঝামেলার। আমাদের দেশে অনেক বইপড়ুয়াই আছেন, যারা ইংরেজিতে কাঁচা, একটি ইংরেজি অরিজিনাল বই পড়তে তারা অনুবাদ খোঁজেন তাদের জন্য এই পুরো বিষয়টি বিড়ম্বনায় ফেলতে পারে।
লেখকের লেখনশৈলী আমার খুব একটা ভালো লাগেনি। আরও ইম্প্রুভমেন্টের প্রয়োজন। যেই বাক্যে যে ধরনের শব্দ প্রয়োগ করা আবশ্যক ঠিক সে বাক্যে সে ধরনের শব্দই প্রয়োগ করতে হবে৷ 'চাও' বা 'ইচ্ছে কর' শব্দ দুটি এক না। যেমন: ৪৪৫ নং পৃষ্ঠায় এলিজাবেথ গোমেজের উক্তি, 'তুমি যদি ইচ্ছে কর, আজকে থেকে আমি তোমার আম্মু হতে পারি। কী বল?' উক্তিটা হবে, 'তুমি যদিও চাও, আজকে থেকে আমি তোমার আম্মু হতে পারি।' আবার যদি একটু পেছনে যাই, ৪১২ পৃষ্ঠায় লেখা, 'তার আবিষ্কার যে আজ শত শত মৃত্যুর কারণ, সেটা কি সে শিকার করে নিবে?' শিকার আর স্বীকার শব্দ এক নয়। এটা হবে, 'তার আবিষ্কার যে আজ শত শত মৃত্যুর কারণ, সেটা কি সে স্বীকার করে নিবে?'
দুজন ক্যারেক্টরের কথোপকথনের মাঝে যদি তৃতীয় কোনো পক্ষ এসে আচমকা কথা বলে উঠে তাহলে অবশ্যই তার নামটা স্বমোধন করতে হবে। নাহলে হুটহাট কে কথা বলছে, সেটা পাঠক ধরতে পারবে না।(পৃষ্ঠা: ৩৮৮)
প্রেমিকা তার প্রেমিককে হঠাৎ করে 'ভাইজান' বলে স্বমোধন করলে প্রেমিকের কাছ থেকে আপনি কী ধরনের এক্সপ্রেশন অভিলাষ করেন? অবশ্যই সে অবাক হবে, তাই নয় কী? ৩৮৫ নং পৃষ্ঠায় ঠিক একই ঘটনা ঘটলো অথচ প্রেমিক অবাক তো হলোই না বরং বিষয়টা সাধারণভাবেই নিল৷ অথচ তাদের প্রেমের সম্পর্ক শুরু হবার পর থেকে প্রেমিকা তাকে কখনোই 'ভাইজান' বলে ডাকেনি। সম্পর্কের আগে 'ভাইয়া' ডাকাটা ছিল এক হিশেব এরপর অন্য হিশেব। এই বিষয়টা মিস গেছে।
৩৮৩ নং পৃষ্ঠায় শটগানকে লক্ষ্য করে কোল্ট বলা লিসা কোল্ট এম- ১৯১১ বের করার পর জালাল উদ্দিন বলে, 'এটা দিয়ে কাজ হবে না।' এর প্রত্যুত্তরে লিসা জানায়, 'জানি। আগেও বলেছেন।' অথচ এমন কোনো কথোপকথন জালাল সাহেব লিসার মধ্যে হয়নি। কখন বলল, সেটাই বোধগম্য না।
যতিচিহ্ন ব্যবহারে ভুল ও বানান ভুল পেয়েছি। কথোপকথনের মাঝপথেই '?' চিহ্ন কিংবা '।' দেখতে পাই। যেখানে হবার কথা 'কখনো', সেখানে হয়ে যায় 'কখন'। এই হচ্ছে আমার চোখে পড়া কিছু অসঙ্গতি।
অন্বেষা প্রকাশনের প্রডাকশন যথারীতি ভালোই হয়েছে। বাঁধাই, পৃষ্ঠার মান ও প্রিন্টিং সবই ভালো হয়েছে। কিন্তু প্রচ্ছদের প্রিন্টটা ভালো আসেনি।
অনেক সমালোচনা করলাম। সবার সঙ্গে আমার মতামতের মিল নাও হতে পারে। আর যারা বইটি পড়তে আগ্রহী, তারা অবশ্যই বইটি পড়ুন ও নিজের প্রতিক্রিয়া জাহির করতে ভুলবেন না।
বই: অসমাপ্ত ক্যানভাস
লেখক: জুনায়েদ ইসলাম
প্রকাশনী: অন্বেষা প্রকাশন
ধরন: ডিটেকটিভ থ্রিলার
প্রচ্ছদ: জুনায়েদ ইসলাম
মুদ্রিত মূল্য: ৬৭০ টাকা
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৪৪৬
©RHR