নিদাস্তিয়া।নিখিল দম নিদাস্তিয়া।কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কাজের উদ্দেশ্যে গিয়েছে।ধীরে ধীরে পরিচিত হয় গুটিকতক মানুষের সঙ্গে যার মধ্যে নানাগাজি একজন।পঞ্চার্ধো একজন মানুষের সাথে তার এমন সখ্যতা হবে তা সেও ভাবতে পারেনি।সুসম্পর্ক আর বন্ধুত্ব হতে বয়স কখনো প্রতিপাদ্য বিষয় হয়ে ওঠেনা তেমনই।কিন্তু ইদানীং সে তার অস্তিত্ব নিয়ে ব্যাধিত।কারণ,এলহাম এদানূর।একটি অস্পষ্ট অবয়ব যে তাকে তার অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্নবিদ্ধ করে হারিয়ে যাই। আসলেই নিদাস্তিয়া জানেনা সে কে!তার মা-বাবা কোথায়!ছোট থেকেই সে বারুশ নামের একজন খ্রিষ্ট ধর্মযাজক এর কাছে বড় হয়েছে।একজন মুসলিম ছেলেকে তিনি কখনো খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত না করে নৈতিক শিক্ষায় উদ্ধুদ্ধ করেছেন।গল্পটির অন্যদিকে দেখা যায় রাবেয়া বুলু নামক চরিত্রের মর্মান্তিক ঘটনা।নিজ দেশে সে এখন শরণার্থী।এর চেয়ে বেদনার আর কী! অন্যদিকে আবাসিক এলাকায় আলী কদম ভবনে গেল রাতে খুন হল রাশা বশরী নামক একজন ফ্যাশন ডিজাইনার এর। অবিবাহিত,সুন্দরী নারী হওয়ায় লোকেমুখে কত কানাঘুষা।স্থানীয় পুলিশ ইনচার্জ আসাদুল করিম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।তিনি চাচ্ছেন না কেইসটা কোনোভাবেই ধুলোয় জমুক।তবুও কেইসটা কেমন মন্থর গতিতে এগোতে থাকে।শেষের দিকে হুট করেই উভয় গল্পের যোগ হয়।কিন্তু তা ছিলো খুব এলোমেলো।খুনটার সাথে কী নিদাস্তিয়ার সম্পর্ক? নানাগাজির কাব্যরচনাগুলো অসাধারণ ছিলো।_
'খানিক বাদেই অন্ধকারের আগমনে ব্যর্থ বাউণ্ডুলে আমি ভাবছি, এই নিকষিত জীবন,তার অব্যহতি কোথায়! কবে হবে নিষ্পত্তি,নিস্তার। অমঙ্গলের গালে চড় মেরেই তো শুধু মঙ্গল মুহূর্ত অন্তর্নিহিত কামনার। একান্ত অভিলাষে উম্মাদনা চেপে রাখা মার্জিত এক স্বান্তনায়..।
অযাচিত ঘটনার কবলে নিস্তেজ হয়ে যাওয়া উজ্জীবিত স্ফুলিঙ্গদের উৎসর্গ করে লেখা 'নিদাস্তিয়া' যেন আকস্মিকভাবে ঘটা অনাকাঙ্খিত কিছু ঘটনার নির্মম পরিণতির এক করুণ উপাখ্যান। মানুষের যাপিত জীবনের গল্পগুলোকে জীবন্ত করে ফুটিয়ে তুলতে একজন লেখক কতোটা পটু হতে পারে তা যেন নিখিল দম নিদাস্তিয়ার অর্থাৎ নিদাস্তিয়ার জীবন সংলগ্ন ঘটনাপ্রবাগুলো পড়তে গেলেই টের পাওয়া যায়।
নিদাস্তিয়া, নিখিল দম নিদাস্তিয়া। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র। শৈশব, কৈশরের চঞ্চলতাপূর্ণ সকল মুহূর্ত যার কেটেছে গীর্জার ছায়ায়, একজন ফাদারের স্নেহের ছায়াতলে। কিন্তু ভীষণ এক চাঞ্চল্যের উদ্ভব হয় যখন শুনি নিদাস্তিয়া তার নিজের পরিচয় সম্পর্কে ভীষণ অজ্ঞ, সে জানেনা তার অতীত, জানেনা তার অস্তিত্বের উৎপত্তি সম্পর্কে। যাকে ভরসা করে জীবনের এতোগুলো বছর অতিক্রান্ত হলো সে ছায়াটাও একসময় নিদাস্তিয়াকে একলা করে হারিয়ে যায় দূর অজানায়, যা কেউ কখনো জানতে পারেনি। কখনো পেরেছে কি না ঠিক জানা হয়ে উঠেনা কিন্তু নিদাস্তিয়া কখনো সেই সবচাইতে আপন মানুষটিকে খোঁজারও চেষ্টা করে নি। কিন্তু কেন?
সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি প্লটে এগোতে থাকে গল্প। দুটি পরিস্থিতি, দুটি রাজ্যের শতো রঙ বেরঙের গল্প, জড়িয়ে থাকা সহস্র অনুভূতির ভেতর ডুবে যাবে যে কেউ উপন্যাসের শুরুতেই। শুরুটাই হয় একটা চাপা উৎকন্ঠার মধ্য দিয়ে। আবাসিক এলাকার এক বহুতল ভবনের মধ্যে একজন তরুণী একা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকেন। সমাজে নানান মানুষের নানান মন্তব্যের দিকে যার খেয়াল নেই বললেই চলে, নিজেকে নিয়েই যার সব চিন্তা, সব স্বপ্ন, গোছানো এক জীবনের। কিন্তু এক সকালে সেই তরুণীর লাশ পাওয়া যায় তার ঘরেই। খুন হয়েছে সে! খবরটা দ্রুত চাউর হয়ে যায় লোক থেকে লোকান্তরে, ভীড় জমায় সবাই। কিন্তু যেই মেয়ে শুধুমাত্র নিজেকে নিয়েই সুন্দর এক পৃথিবী সাজাচ্ছিলো, তার মৃত্যু, তাও আবার অন্যের হাতে। এইরকম ভীষণ চাপা উত্তেজনার মধ্য দিয়েই শুরু হয় উপন্যাস।
আসাদুল করিম নামের এক পুলিশ অফিসার ইনচার্জ, যিনি কিনা ভীষণ মানবিক, যাকে কিনা মানবিক ঘটনাগুলো আঁচড় কাটে সহজেই, যার ভেতরে রয়েছে লুকায়িত রাজ্যের ভয়ও, সে ই কিনা এমন এক ঘটনা সুরাহা করার দায়িত্ব পান। বয়সের কোঠা বেশির ঘরে গেলেও, নব্য বিবাহিত এই আসাদুল করিম। বাসায় তার অপেক্ষমাণ নব্য বিবাহিতা স্ত্রী।
নানান ঘটনাপ্রবাহে যখন গল্প এগিয়ে চলে হঠাৎ এক বৃষ্টিমুখর রাতে লেখক পরিচয় করিয়ে দেন নিদাস্তিয়ার সঙ্গে।
কলাতলির মোড়, কক্সবাজার। চাকরির সুবাদে যার এখানে আসা। গল্প এগুতে থাকে একরাশ অজানাকে জানার উৎকন্ঠা নিয়ে।
নাগরিক জীবনের গল্প বলাতে লেখক যে ভীষণ পটু, তা যেন গল্প প্রবাহের ধরণ দেখলেই আঁচ করা যায়। প্রকৃতির মধুর বর্ণনা থেকে শুরু করে নিত্যনতুন চরিত্রকে নিয়ে এসে গল্পের প্রবাহের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে জোয়ার সৃষ্টি করা এবং একসময় ভাটার স্রোতে তাকে আবারও যাপিত জীবনের গল্পগুলোর মাঝে আড়াল করে ফেলতে পারার দারুণ গুণ যেকোন লেখাকেই করে তুলে ভীষণ প্রাণবন্ত। যা এই নিদাস্তিয়ায় ডুবে যাওয়া পাঠকদের, ডুবে যাওয়ার প্রধাণ কারণ। যখনই আসাদুল করিমের সঙ্গে এইসব খুনের ঘটনা নিয়ে প্রচুর চিন্তায় ডুব দিবেন, তখনই নিদাস্তিয়ার জীবন থেকে শুনতে পাবেন নতুন সব গল্প, প্রতিদিনকার তার সাথে ঘটে চলা ঘটনাসমূহ এবং নানান মানুষের জীবন্ত গল্পসমূহ।
আসাদুল করিমের সঙ্গে একসময় অল্পতেই রেগে যাওয়া তরুণ পুলিশ অফিসার শংকরের দেখা পাবেন। অপর দিকে নিদাস্তিয়ার সঙ্গী হিসেবে দেখা পাবেন এক বৃদ্ধের, নাম নানাগাজী। গল্প এগোতে থাকে, মোড় নেয়, থেমে যায়, আবার এগোতে থাকে। নিদাস্তিয়ার ঘোরে বন্দী হয়ে যায় সব পাঠক। কি হতে চলেছে, কি হবে, কি হচ্ছে কিছুই যেন আঁচ করা যায়না। ভেতরে একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতির প্রতিফলন দেখতে পাবেন উপন্যাসটি পড়ার সময়।
শুরুতেই এক তরুণীর মৃত্যুর খবর দিয়েছিলাম আপনাদের৷ নাম যেন কি ছিলো? আচ্ছা নাম জানার প্রয়োজন নেই, উপন্যাসেই পাবেন। আসাদুল করিম সেই তরুণীর ঘাতককে খুঁজতে যেন পাগলপ্রায় হয়ে উঠেন, আসলেই কি পাগলপ্রায় হন? শংকর সাহায্য করতে থাকে ঘাতককে খুঁজে পেতে, গল্প আগায়।
নিদাস্তিয়ার পরিচয় কি দিয়েছিলাম সম্পূর্ণ? নিদাস্তিয়াও একসময় তার পরিচয় পাওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠে। প্রয়োজন দেখা দেয় অইযে বেড়ে উঠা যার স্নেহের ছায়াতলে তাকে খুঁজে পেতে। এসব মুহূর্তে গল্প বাঁক নিতে থাকে। না বাঁক নেয় নাকি সম্পূর্ণ ঘুরে যায়, নাকি ঠিকই থাকে কে জানে? কিন্তু নিদাস্তিয়ার চেয়েও বেশি উৎসুক হয়ে উঠেছিলাম আমি তার আসল পরিচয় জানার জন্য।
আচ্ছা আপনাদের বলি তার আসল পরিচয়টা আপনারা উপন্যাসটা পড়ুন, পাবেন। হয়তো কোন এক সময়। কেউ না কেউ হয়তো দিয়ে যাবে।
একসময় এই উপন্যাস শেষ হয়। কিন্তু কখন, কোথায়, কিভাবে শেষ হয় ঠিক বলতে পারবোনা। যখন রিভিউ বা আলোচনা লিখছি নিদাস্তিয়া নিয়ে তখনো মনে হচ্ছে আমি নিদাস্তিয়ার গল্পেরই কেউ একজন। হয়তো কেউ। ঘোরে বন্দী আছি এখনো। কিছু একটা হয়েছে উপন্যাসের শেষে, যা হওয়াটা উচিত হয়নি। লেখকের উপর বড্ড অভিমান জমে। আবার অভিমানের মেঘ কাটে যখন ভাবি লেখাগুলো কি চমৎকার, ঘটনাপ্রবাহ কি সুন্দর, রোমাঞ্চকর, প্রাণবন্ত! আমি জানি না লেখক কখনো উত্তর দিবে কিনা কেন তিনি এমন করেছেন?
আচ্ছা কি ই বা হয়েছিলো এই "নিদাস্তিয়া" র শেষে? পড়বেন কিন্তু! পড়লেই বুঝবেন কেন আমি লিখেছি এই উপন্যাসটি ছুঁয়ে যাওয়ার মতো নয়, তার চেয়েও বড্ড বেশি কিছু!
বইয়ের নামঃ নিদাস্তিয়া লেখকঃ Tokib Towfiq প্রকাশনীঃ নালন্দা
এবারের বই মেলায় কেনা বইগুলোর মাঝে নবীন লেখকদের প্রাধান্য দিয়েছি। নবীন লেখক তকিব তৌফিকের ৩য় বই নিদাস্তিয়া। মূলত ট্রিলজি উপন্যাসের প্রথম ভাগ এটি। লেখকের লেখনীতে এতটাই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি যে বইয়ের পরবর্তী অংশের অপেক্ষায় রইলাম।