চার খন্ডে বিভক্ত শ্রীকান্ত উপন্যাসটির ব্যাপকতা অনেক বেশি। সেটিকে অল্পকিছু শব্দে লিপিবদ্ধ করা বড়ই দুষ্কর । চারটি খন্ড পালাক্রপমে রচিত হয়েছে
১৯১৭ হতে ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ।
উপন্যাসটি শুরু হয় শ্রীকান্তের ভবঘুরে জীবনের শেষপ্রান্তে কোন এক অপরাহ্নবেলায়,কিছু অসমাপ্ত সমীকরণ আর অনেকটা আক্ষেপ
নিয়ে। যেমন করে আমরা জীবনপ্রদীপের শেষ তৈলবিন্দুতে এসে পাওয়া না পাওয়ার হিসেবগুলো মিলিয়ে দেখি ।
শ্রীকান্তের ভবঘুরে জীবনের সূত্রপাত ঘটে ইন্দ্রনাথের মাধ্যমে। বাঁশির মত যার নাক,প্রশস্ত সুডৌল কপাল,মুখে দুই চারিটা
বসন্তের দাগ,বয়সে শ্রীকান্তের চেয়ে কিছু বড়। তার একমাত্র উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল হাত দুটি তার হাঁটুর নিচ পর্যন্ত পড়ত।এই লম্বা দুখানা হাত বাড়িয়েই
সে ইস্কুলের মাঠে ফুটবল ম্যাচের অনাকাঙ্ক্ষিত উশৃংখলতা থেকে শ্রীকান্তকে উদ্ধার করে । সেই থেকে তার সাহসিকতা আর করুণায় মুগ্ধ হয়ে ইন্দ্রকে
জীবনের আদর্শ হিসেবে ভাবতে থাকে শ্রীকান্ত। ইন্দ্রনাথের সঙ্গ খুবই উপভোগ করত শ্রীকান্ত।তারই রেশ ধরে একদিন গভীর অন্ধকারে দুইজনে ডিঙ্গিতে
চড়ে মাছ ধরতে যাবার অজুহাতে কিছু অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয় সে। তাদের সেই ছোট্ট ভ্রমনটিতেই মূলত লেখক আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন
ইন্দ্রনাথ চরিত্রটির সাথে।
ইন্দ্রনাথ মুক্তমনা একজন মানুষ,সংসারের বন্ধন যাকে ছিন্ন করতে পারেনা বাস্তবতা থেকে,মানবতার নিগূঢ় সত্যের অনুসন্ধান প্রাপ্ত এবং সকম জাত-ধর্মীয়
গোঁড়ামিমুক্ত। ইন্দ্রের মাধ্যমেই শ্রীকান্তের জীবনে আসে অন্নদাদিদি,পুরো বইটি জুড়ে বেশ কিছু নারী চরিত্রের সাথে পরিচিত হই আমরা,যার মাঝে ইনিই
প্রথম।অন্নদাদিদি মুসলমান,কূলত্যাগ করে সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে স্বামীর ঘর করতে এসে মাদকাসক্ত স্বামীর অপরিসীম অত্যাচার সত্বেও যে ছিল নিজের
চারিত্রিক মাধুর্যে অটল। তবুও ��ুমুঠো অন্নের তাগিদে সাপের মন্ত্র দেবার বায়না করে,সাপ খেলা দেখিয়ে সে জীবনযাপন করত।ইন্দ্র তাদের ভন্ডামি জানতে
পেরে ঘৃণাভরে তীব্র তিরস্কার করে দিদির সংস্পর্শ ত্যাগ করলেও শ্রীকান্তের কোমল হৃদয় ঠিকই সেই অসহায় দেবতাতূল্য,স্বামীপ্রেমে অনুরক্ত নারীমূর্তিকে
মনের গভীর থেকে ভালবেসেছিল। সর্বংসহা নারীর গভীর স্বামীপ্রেম,আর সততা তার হৃদয়ের মাঝে দাগ কেটেছিল বহুদিন পর্যন্ত।
সময়ের পরিবর্তনে আমাদের জীবনে যেমন নতুন নতুন মানুষের আবির্ভাব ঘটে তেমনি অনেকে হারিয়েও যায়। তেমনি একদিন শ্রীকান্তের জীবন থেকে
ইন্দ্র চরিত্রটি বিদায় নিল।
এল রাজলক্ষ্মী।
এই উপন্যাসের অন্যতম এবং আমার প্রিয় চরিত্র।
রাজলক্ষ্মীর সাথে শ্রীকান্তের পরিচয় হয় ,তারই সহপাঠী রাজপুত্রের শিকার পার্টির নিমন্ত্রণে। সেখানে রাজলক্ষ্মী ছিল বাইজী,নাম পিয়ারী। এই পিয়ারীর সাথে এক
বিশেষ নাটকীয়তার মাধ্যমে স্মৃতির গভীর তল হাতড়ে শ্রীকান্ত খুঁজে পায় এক কিশোরীর ম্লান মুখ,যে তাকে ছেলেবেলায় কাঁটাযুক্ত বইচিঁ ফলের মালা পরিয়ে তারই অলক্ষ্যে
কবে ভালবেসে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেছিল। জীবনের নানা মোড় নানা প্রতিবন্ধকতা পেড়িয়ে যখন দুজনে একিত্রত হয় ,প্রথমটায় রাজলক্ষ্মীকে এড়িয়ে গেলেও শেষে সে-ই
হয়ে উঠে ভবঘুরে শ্রীকান্তের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু । সেই রাজলক্ষ্মীর মাঝেই সে খুঁজে পায় মমতাময়ী মায়ের স্নেহ,বড় বোনের স্নেহময়ী শাসন আবার প্রেমিকার অকৃত্রিম ভালবাসা।
রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্তকে আগাগোড়াই বুঝেছিল। তাই তার ছেলেবেলার হারানোর ভয়,উত্তাল আবেগপূর্ণ ভালবাসা,পয়সার লোভে বাইজী পেশা সবকিছু ছেড়ে যখন ধর্মীয় আদর্শে নিজেকে নতুন
করে গড়ে তুলছিল,তখন শ্রীকান্ত কেও আচলে বেঁধে রাখেনি সে আর। শুধু দূর থেকে মঙ্গল কামনাই হয়ে উঠেছিল ছিল তার ব্রত।
শ্রীকান্তের বর্মায় চাকরি যাত্রার সুবাদে পরিচয় ঘটে আরো একটি অতুলনীয় চরিত্র,অভয়ার সাথে।
অভয়া বাস্তববাদী,সাহসী,আপন যুক্তিতে যার প্রাণ সকল চিরাচরিত নিয়মের বাহিরে গিয়ে গোঁড়ামিমুক্ত সত্যের রস্টুকু আস্বাদন করতে পেরেছিল।
গুণেমানে সে কিছুটা রাজলক্ষ্মীর সমতুল্য,সেই প্রমাণ আমরা পাই,রাজলক্ষ্মী ও অভয়ার পত্র যোগাযোগের মাধ্যমে।
অভয়ার বলা একটি উক্তি আমার খুবই প্রিয়-
"সুখের জন্য দুঃখ স্বীকার করিতে হয় ,এ কথা সত্য; কিন্তু তাই বলিয়া ইহাকে উল্টাইয়া লইয়া যেমন করিয়া হোক কতকগুলা দুঃখ ভোগ করিয়া গেলেই যে সুখ আসিয়া স্কন্ধে ভর করে,তাহা স্বতঃসিদ্ধ
নয়। ইহকালেও সত্য নয় পরকালেও সত্য নয়।"
এবং,
"নিরর্থক ত্যাগের নিষ্ফল মহিমা ,একেবারে ব্যর্থ,একেবারে ভুল।"
এভাবে আরো একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র আসে ,তা হল কমলিলতা। কমলিলতা শ্রীকান্তকে ভালবেসেছিল সত্য, তবে সেই ভালবাসার সীমানা ছিল,আর ছিল তার ঠাকুরদেবতার প্রতি অগাধ বিশ্বাস,শুধুমাত্র এই বিশ্বাসের
জোরেই যে একদিন গন্তব্যহীন পথে যাত্রা করে নতুন জীবনের সন্ধানে।
শেষ হয় শ্রীকান্তের ভবঘুরে জীবনের যাত্রা। সবশেষে রয়ে যায়,সেই রাজলক্ষ্মী।
বিভিন্ন নারীর ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাস,সাহসিকতা যেভাবে ফুটে উঠেছে উপন্যাসটিতে তাতে,সর্বংসহা নারীর অতুলনীয় ধৈর্য এবং বাস্তববাদীতা,সংসারের দুঃখ কষ্টকে অলংকারের মত গলার জড়িয়ে যারা নিত্যদিন হাসিমুখে
ভালবেসে যায় নিঃস্বার্থভাবে, শরটচন্দ্র তা-ই খুব দরদী হাতে ফুটিয়ে তুলেছেন।এখানে শ্রীকান্ত চরিত্রটি ভবঘুরে এবং কতকটা মেরুদন্ডহীন করে তুলে ধরার একটি কারণ হতে পারে নিরপেক্ষতা। কেননা,
সমাজের খুব উঁচু কিংবা নিচু পর্যায়ের মানুষ,যারা কিনা শুধু জীবিকার পেছনে ছোটে,সময় যাদের কাছে মহামূল্যবান,যারা শুধু একটা ছোট্ট গন্ডির মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখে ,মানুষের অন্তরের গভীরতা
এবং প্রকৃতির রহস্যময়তা তাদের অগোচরেই রয়ে যায়। শ্রীকান্ত যার বিপরীত স্রোতে গিয়ে সেই সন্ধান খুঁজে পেয়েছিল।
আমার কিছু প্রিয় উক্তি-
"কালোর যে এত রূপ ছিল,সে তো কোনদিন জানিনাই।তবে হয়তো মৃত্যুও কালো বলিয়া কুৎসিত নয়;একদিন যখন সে আমাকে দেখা দিতে আসিবে,তখন হয়ত তার এমনি অফুরন্ত সুন্দর রূপে আমার দুই চক্ষু জুড়াইয়া
যাইবে।আর সে দেখার দিন যদি আজই আসিয়া থাকে, তবে, হে আমার কালো ! হে আমার অভ্যগ্র পদধ্বনি ! হে আমার সর্বদুঃখ-ভয়-ব্যথাহারী অনন্ত সুন্দর! তুমি আমার অনাদি আঁধারে সর্বাংগ ভরিয়া আমার এই দুটি
চোখের দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ হও,আমি তোমার এই অন্ধতমসাবৃত নির্জন মৃত্যুমন্দিরের দ্বারে তোমাকে নির্ভয়ে বরণ করিয়া মহানন্দে তোমাকে অনুসরণ করি।"
"সত্য যখন সত্যই মানুষের হৃদয় হইতে সম্মুখে উপস্থিত হয়,তখন মনে হয় যেন ইহারা সজীব;যেন ইহাদের রক্তমাংস আছে;যেন তার ভিতরে প্রাণ আছে-নাই বলিয়া অস্বীকার করিলে যেন ইহারা আঘাত করিয়া
বলিবে,চুপ কর। মিথ্যা তর্ক করিয়া অন্যায়ের সৃষ্টি করিয়ো না।"