প্রথমে একটা উপন্যাসের কাহিনী দিয়া শুরু করি। 'পথের পাঁচালী' উপন্যাসে ছোট্ট অপু একটা জীবন্ত খরগোশরে লাফাইতে দেইখা বিস্মিত হয়। সে সারাজীবন বর্ণপরিচয় বইয়ে 'খ' তে খরগোশের ছবি দেখছে ঠিকই, কিন্তু জল-মাটির দুনিয়ার একটা খরগোশ যে এমনে লাফাইতে পারে এটা দেইখা অপুর চোখ বড় বড় হয়া যায়।
আমাদের একাডেমির কথাটাও একবার ভাবেন। আমরা বইয়ে যা পড়ি,তা হইলো ইমেজ বানানি একপ্রকার। লেখারে দৃশ্য আকারে কল্পনা কইরা নেওয়া,কিন্তু সে তো শুদ্ধ দৃশ্য না। তো এইযে খালি বইয়ের জ্ঞান,তার সাথে যদি বাস্তব জগতের আসল রূপের সঙ্গতি না থাকে তাইলে তো বস্তু বা জগত নিয়া এবস্ট্রাক্ট ধারণার উপরই আমাদের জ্ঞানকান্ড গইড়া উঠবে, যেটা খালি নৃবিজ্ঞান না,বাদবাকি যেকোন ডিসিপ্লিনের জন্যই ঝামেলার।
মাতৃভাষার বইয়ের মাধ্যমে কোন ডিসিপ্লিন নিয়া ধারণা পাওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ সেটা এদিক দিয়ে বিবেচনা করা যায়। যে বইয়ের সাথে আমাদের আশেপাশের জগতের সঙ্গতি কম,সে বই পইড়া আমরা খালি জগতের রূপরে ইমেজ আকারে সাজাইতে শিখবো,কিন্তু তার সাথে নিজেরে যুক্ত কইরা বিস্মিত হইতে পারবো না। আর শিক্ষালাভের অন্যতম লক্ষণ তো বিস্মিত হওয়া। এদিক দিয়া মাহ্ফুজ সরকার আর শাহারিয়ার জিমের নৃবিজ্ঞান নিয়া লেখা খাস ইন্ট্রুডাক্টরি এই বইটা একটা বিশেষ ঘটনা অবশ্যই৷একদম সিস্টেমেটিক অর্ডারে সাজানো এই বইটা নতুনদের নৃবিজ্ঞান নিয়া জানতে কাজে লাগবে৷
বইয়ের ফার্স্ট চ্যাপ্টারে সাবজেক্টটার হিস্টরির আলাপ দিয়া শুরু করাতে ভাল্লাগছে৷ ইংলিশ যেকয়টা ইন্ট্রুডাক্টরি বই বাংলাদেশে চলে বেশি,ওইগুলায় দেখলাম কেউই হিস্টরির আলাপ দিয়া শুরু করে নাই। হয় কালচার দিয়া,নাহয় নৃবিজ্ঞান কি বস্তু- তা দিয়া শুরু হইছে৷ কিন্তু কোন সাবজেক্ট জানার জন্য হিস্টরিতে ঢুকা ইম্পর্টেন্ট। নৃবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আরো বেশি ইম্পর্টেন্ট৷ তো এদিক দিয়াও বইটা আমার পছন্দ হইছে৷
বিজ্ঞানের শাখাসমূহের মধ্যে নৃবিজ্ঞান নতুনতম শাখা, যেখানে মূলত মানুষের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। মানুষ (Homo Sapiens) কিভাবে ৭০০০০ বছর আগে পৃথিবীতে উত্তপত্তি লাভ করে, সেখানে থেকে বর্তমানে ধীরে ধীরে কগনেটিভ, এগ্রিকালচারাল, টেকনলজিক্যাল রিভোলিউশনের মাধ্যমে বর্তমান হিউমান সিভিলাইজেশনে এসে পৌছানো সম্পর্কিত সাংষ্কৃতিক, জৈবিক, প্রত্নতাত্ত্বিক আর ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণই নৃবিজ্ঞানের কাজ।
নৃবিজ্ঞানের মূল শাখা চারটি : সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান (এক সংষ্কৃতির সাথে আরেক সংষ্কৃতির তুলনামূলক বিশ্লেষণ) , জৈবিক নৃবিজ্ঞান (মানুষের উত্থান), আর্কিওলজি (বিভিন্ন প্রাচীন ও আধুনিক যুগের মানুষের ব্যবহার সামগ্রীর বিচারে সমাজ বিশ্লেষণ) এবং ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান (ভাষা যেভাবে একটা সমাজ - সংষ্কৃতির শেপ ফর্ম করে)
বইটিতে খুব সুন্দরভাবে নৃবিজ্ঞানের বেসিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে : নৃবিজ্ঞান নিয়ে বাংলাদেশে বর্তমানে এর চেয়ে সাজানো কোনো বই নাই। নৃবিজ্ঞান নিয়ে জানতে আগ্রহী যে কারো জন্য বইটি অবশ্যপাঠ্য।
নৃবিজ্ঞান নিয়ে জানতে আগ্রহী হওয়ার পর খুঁজতে গিয়ে বাংলা বই পাচ্ছিলাম না। তাও যা পাচ্ছিলাম তা প্রাইমারি লেভেলের পাঠকের জন্য যুতসই লাগছিলো না। এর মধ্যে গত বছর বই মেলার সময় ফেসবুক মারফত বইটার খোঁজ পাই। (যারা খোঁজ দিছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ) পরে বইটা সংগ্রহ করে পড়তে গিয়ে সুখপাঠ্য হিসেবে পাই বইটাকে। প্রথম অধ্যায়েই
জ্ঞানকাণ্ড হিসেবে নৃবিজ্ঞানের ইতিহাস আলোচনা করায় পরবর্তী অধ্যায়গুলোর আলাপে এনগেজ করতে সুবিধা
হয়েছে।
বইটার নন্দন শৈলীর প্রশংসা না করলেই না। প্রচ্ছদ, বাঁধাই আর প্রতিটা অধ্যায়ের শুরুতে বিষয়বস্তুর আলোকে আঁকা ছবি অতি অসাধারণ লেগেছে।