যে মেয়েটা ব্রেক আপের পরেও চলে যায় সোনালী পলাশ খুঁজতে আর যে ছেলেটা প্রতিদিন নদীর ঘাটে বসে থাকে শুধু শুধু একজনকে আত্মহত্যার হাত থেকে বাঁচাবে বলে, যে পুরুষটি চায় কমবয়সি মেয়েটি তাকে ভালোবাসার মতন ভুল না করুক আর যে উন্মাদ সারাজীবন শুধু দুটো চোখের ছবি এঁকে একদিন মরে যায় - তাদের এবং তাদের মতনই আরো অনেকের মর্মবেদনার তীব্র ছবি ধরা রইল এই সংকলনের দশটি গল্পে।
তাঁর জন্ম এবং বড় হওয়া হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর উপাধি অর্জনের পরে তিনি রাজ্য সরকারের অধীনে আধিকারিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ দুই-দশকের লেখক-জীবনে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক এবং কিশোর-সাহিত্য, উভয় ধারাতেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তিনি যখন গল্প-উপন্যাস লেখেন, তখন ঘটনার বিবরণের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন মানব-মনের আলোছায়াকে তুলে আনার বিষয়ে। লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি। তাঁর বহু কাহিনি রেডিও-স্টোরি হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে সমাদর পেয়েছে। সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন দীনেশচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার এবং নান্দনিক সাহিত্য সম্মান।
শেষ হয়ে গেলো। এইটুকু একটা বই। একশো-ছত্রিশ পাতা মাত্র। যথানিয়মে ফ্লাডগেট উন্মোচিত এখন। উত্তুরে হাওয়া বইবে এবারে। মলাটের ওপারে তো বটেই। বুকের মাঝটাও শিরশির করে উঠবে দিব্যি। প্রেমের ওষুধে কাপুনি দিয়ে জ্বর নামবে ভীষণ। পাঠক-রন্ধ্র ত্রস্ত, বিভ্রান্ত। মনের গোচরে নড়বে কেবল বসন্তের প্রত্যাশা। আর জন্তর-মন্তরের মাথায় উঠে কতগুলো ছেলেমেয়ে মাপতে চাইবে দিনবদলের ছায়া।
সত্যি কথা। পারেনও বটে লেখক...
অবশ্য, ওনাকে দোষ দিয়ে লাভ কি? আধুনিক বাংলা-সাহিত্যে সৈকত মুখোপাধ্যায়, একটি শীর্ষস্থানীয় স্তম্ভ সমান। অন্তত, এই একটি পাঠকের কাছে তো বটেই। এই শ্রদ্ধামিশ্রিত ভালোবাসার দরুন, ওনার অনেক কটা লেখা পড়ার সৌভাগ্য হলো এতদিনে। রহস্য, রোমাঞ্চ, অলৌকিক, স্পেকুলেটিভ, ফ্যান্টাসি, রোমান্স... সবেতেই ওনার সুলিখিত কলমের রেঞ্জ আশ্চর্য করে বরাবর।
তবে, এই সমুদ্র 'সৈকতে' দাঁড়িয়ে যা একেবারেই পড়া হয়নি তা হলো লেখক রচিত কবিতা। (ফেসবুক বাদে!)
জানি, বাজারে ওনার বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ বেশ সুলভে লভ্য। তবে ঐযে, টিপিকাল হনু-মার্কা আমি! কবিতার পেছনে বেহিসেবী খরচ করবো না, এহেন চিন্তাধারা পোষণ করি শিশুকাল থেকে। অগত্যা, লেখকের কাব্যশৈলী হতে কতকটা স্বেচ্ছা-বঞ্চিতই ছিলাম, বলা চলে। আজ, এই বইটি পড়তে বসে দুষলাম নিজেকে। বইয়ের দশটি গল্পের মধ্যে খুঁজে পেলাম কবিতার খাঁটি বীজ। বাক্যবন্ধনের অন্তরে প্রস্ফুটিত গোলাপ গাছ। আত্মউন্মোচনের লিরিকাল পাঠ! যার গদ্যে এতো সুর, না জানি তার কবিতায় কত রঙ? (বলাই বাহুল্য, কটা বাড়তি পয়সা বাজারে সমর্পণ করতে মন চাইছে হঠাৎ।)
যাই হোক, 'আমন মরসুম'-এর এই দশটি লেখা, কোনোকালেই কোনো স্বার্থক ছোটগল্পের তালিকায় জায়গা করে নেবে না। দিনশেষে প্রেমের কাহিনী তো। হোক না সে ম্যাচিউর, নাটকহীন, কষ্ট-কষ্ট সব গল্প। মানবধর্মের প্রতি আস্থা রাখতে গিয়ে সূর্যের কিরণরশ্মি ঢোকবার পথখানি প্রশস্ত করেছেন লেখক। আবেগী হয়েছেন মাঝেমধ্যেই। দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট সেচে, বাতলেছেন ভালো থাকার রেসিপি। যার নেপথ্যে নৃত্যরত, ছাপোষা বাঙালি সেন্টিমেন্ট। সাথে, কোনো মধ্যবিত্ত বাড়ির ছাদের এক কোণে ডাই করে রাখা স্তূপীকৃত স্মৃতির সমান অনেকখানি চাপা অভিমান। এর সবটাই সহজ। পরিণত কলমে গায়কী রীতি।
মন ভালো হয়। মন খারাপ হয়। সুখ-অসুখের মরুদ্যানে, দূরে সরে থাকে আলোহীন জটিলতা।
তবে, ব্যক্তিগত মতামত, 'বেদনার রঙ' ও 'মিতুনের জন্য' - দুটো লেখাই বইয়ের সার্বিক দুর্বলতার প্রতীক। গল্পদুটোয় লেখক মোটা-দাগে উপস্থিত। অতিসরলীকৃত গল্পকথন। সার্ফেস-লেভেল অনুধাবন। সামান্য হতাশ হই পড়ে। বাকিগুলো সব ভিন্ন ছন্দের। পছন্দের তালিকায়, বিশেষ উল্লেখ্য, 'উৎসর্গের পাতা', 'চোখের তারায়', 'সোনালি পলাশ' বা 'টাইগার মথ'-এর দল। কিন্তু যেই লেখাটি বাদে এই আলোচনা আদতেই বৃথা, তার নাম, 'অধীর ঘোষ বাই-লেন'। যা তর্কাতীত, এই স্বল্পদৈর্ঘ্যের বইটির শ্রেষ্ঠ গল্প। জন্মাবধি পড়া সমস্ত ফিল-গুড লেখাদের ভিড়ে, অন্যতম সেরা কাহিনী এই এইটি!
একটি! শুধুমাত্র একটি গল্প যদি এই দশটির মধ্যে থেকে বেছে পড়তে চান, তাহলে এই একখানাই পড়বেন, প্লীজ!
পুনশ্চ : ক্যাফে-টেবলের পরিবেশনা যথেষ্ট ভালো। প্রমাদহীন মুদ্রণ ও শুদ্ধ বানানরীতির সাথে স্বপন চন্দের অলঙ্করণ বইয়ের শোভা বাড়ায় হৃদ্দচিত্তে। তবে, প্রচ্ছদ? বাংলা বইয়ের ক্ষেত্রে এই রকমের কাজ আমার বরাবরই না-পসন্দ। কভারের নামে, অভ্যন্তরীণ অলংকরণে রং চাপিয়ে, সেটার কপালে অদ্ভুত ফন্টে বই ও লেখক পরিচিতি জুড়ে দিলেই, সেটা প্রচ্ছদ হয়ে যায় না। এই ক্ষেত্রে, আরেকটু যত্নশীল হতে ক্ষতি কি? বিশেষত, যখন আলোচ্য বইটি এত সুন্দর?
ব্যস্ত দিনে, ততোধিক ব্যস্ত শহরে, যৎপরোনাস্তি ব্যস্ত এই সময়কালে দাঁড়িয়েও যখন জমে থাকা কাজের পর্বত সরিয়ে দুই মলাটের মধ্যে আদ্যোপান্ত ডুবে যেতে হয়, তখন বোঝা যায় এ বই লেখা হয়েছে এক জাদুকলম দিয়ে, সে কলম যাঁর তিনি অন্তর্যামী, তাঁর দৃষ্টিতে তুচ্ছতম মুহূর্তগুলিও ধরা পড়ে যায় অন্তর্নিহিত গোপন দ্যুতির আলোয়, আর তাঁর বুকে আছে মানুষের জন্য অতল দীঘির মত ভালবাসা - তাদের দীর্ণ সামান্য শ্রান্ত জীবনগুলি তাই একেকটি নিটোল আখ্যান হয়ে উঠে আসতে পেরেছে বইয়ের পাতায় - প্রদীপের মত স্নিগ্ধ, ময়ূরপালকের মত উজ্জ্বল, শিশিরের মত মায়াবী।
'বেদনার রঙ' বড় বেদনাতে কলম ডুবিয়ে লেখা, সারা গল্পে উন্মোচিত হয়েছে বর্তমান সমাজের এক কঠিনহৃদয়ের দিক।
'অধীর ঘোষ বাই-লেন'এর মত গল্প কেন যে লেখেন ইনি! এত সহজে এত প্রত্যয়ী লেখা - আবার মানুষের উপর আস্থা রাখতে বড্ড ইচ্ছে করে এসব লেখা পড়লে।
বুক মুচড়ে কাঁদানোর মত গল্প 'চোখের তারায়'। গল্পের পাশের বাড়ি মেয়ে গোছের নায়িকা না মূল চরিত্রটি, কার জন্য কাঁদবেন, সে আপনার উপর।
'মিতুনের জন্য' মনে পড়িয়ে দেয় ইনি 'বারাহী'র লেখক। সেই চরম নিস্পৃহ ভঙ্গিমায় যন্ত্রণার মুক্তো তুলে এনে অনায়াসে গেঁথে দিয়েছেন ধারালো ছুরির মত কাহিনির হাতলে - সোজা বুকে এসে বিঁধে যায়।
'রইল অভিমান' অপূর্ব সুন্দর লেগেছে আমার। একমাত্র কিসসাওয়ালাই পারেন, এত ছোট্ট ছোট্ট ঘটনায় সাজিয়েও শেষ অবধি শুধুমাত্র বিশুদ্ধ এক অনুভবকে গল্পে এভাবে ধরে ফেলতে।
'টাইগার মথ'এর শেষের ট্যুইস্ট আচমকা যেন এই সমাজকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, বাকরুদ্ধ হয়ে যেতে হয়।
'উৎসর্গের পাতা' যেমন নির্মম কঠিন, তেমনি সত্য।
তেমনি অবাস্তব অথচ অমোঘ প্রেমের কথা বলে 'মায়াপথ', আর শেষে গিয়ে চেনা যায় তার পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা আসল ভালবাসার চেহারা।
'পাপ কিংবা ফুলের গন্ধ'র মত অন্তঃস্থল রিক্ত করে হাহাকার তুলে আনা গল্প নিয়ে কিছু বলা যায় না। এ এমনই এক গল্প যা ভুলে যেতে চাইলেও ভোলা যায় না।
হার্ডকভার বইটি সুমুদ্রিত, সুন্দর। যেটি আলাদা করে না বললে অন্যায় হবে, তা হল স্বপন কুমার চন্দের করা প্রচ্ছদ এবং প্রতি গল্পে অলংকরণগুলি। সাদা কালোয় অলংকরণগুলি এত সুন্দর, এত জীবন্ত - চোখ ফেরানো যায় না। তেমনই প্রচ্ছদ - এরকম সুন্দর প্রচ্ছদ ইদানীংকালে খুব কম দেখি। জলরঙের মায়াবী খেলা, অপেক্ষার নত নরম মেজাজ, অনুগ্র স্নিগ্ধ ভঙ্গিমা, আর সব ছাপিয়ে মুখে এসে পড়া ওই মেঘ ছেঁড়া আলো - মন জুড়োয়, মনে হয় চেয়ে চেয়ে দেখতেই থাকি। কলমের জাদুর যোগ্য সঙ্গত করেছে তুলির জাদু - এটি এ বইয়ের এক মস্ত বড় সম্পদ।
নাম - আমন মরসুম লেখক - সৈকত মুখোপাধ্যায় প্রকাশক - দ্য কাফে টেবল মুদ্রিত মূল্য - ২০০/-
'কলেরার দিনগুলিতে প্রেম' মনে পড়ে? তেমন কিছু কি হয় এই করোনাকালে? হয় না। বরং বাড়িতে প্রেম করতে গেলে গৃহলক্ষ্মী হাতে স্কচবাইট বা ঘর মোছার ন্যাতা ধরিয়ে দেন। আর বাইরে প্রেম (আমার ক্ষেত্রে এখানে একটা অট্টহাস্যর ইমোজি বসিয়ে নেবেন প্লিজ) হয় মেসেঞ্জারে, হোয়াটসঅ্যাপে আর ক্যামেরায়— কঠোরভাবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে। বিশ্বাস হতে না চাইলেও একটা সময় ছিল যখন মাস্ক আর ক্যামেরার ব���ইরেও চোখে চোখ তো বটেই, স্যানিটাইজার-বর্জিত হাতে হাত, এমনকি (ইঁইঁইঁ!) ঠোঁটে ঠোঁটও দেওয়া যেত। সেই অলীক সময়ের নাগাল পাওয়ার জন্যই এই বইটা পড়লাম আজ। আমাদের সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক সৈকত মুখোপাধ্যায়ের দশটি গল্পের এই নাতিদীর্ঘ সংকলনের বিশেষত্ব হল, এর সবক'টি গল্পই প্রেমের নানা রূপ, প্রকাশ ও পরিণতি নিয়ে লেখা। সেই গল্পগুলো হল~ ১. বেদনার রঙ ২. অধীর ঘোষ বাই-লেন ৩. চোখের তারায় ৪. মিতুনের জন্য ৫. রইল অভিমান ৬. সোনালি পলাশ ৭. টাইগার মথ ৮. উৎসর্গের পাতা ৯. মায়াপথ ১০. পাপ কিংবা ফুলের গন্ধ গল্পগুলোর ভালো-মন্দ নিয়ে কিছু লেখার ক্ষমতা আমার নেই। অকিঞ্চিৎকর এই জীবনে যাঁদের গদ্যের মাধ্যমে অমৃতলোকের হাতছানি অনুভব করি, তাঁদের একজন হলেন সৈকত মুখোপাধ্যায়। এই বইয়ের গল্পগুলোও ব্যতিক্রম নয়। তাদের থেকে বিচ্ছুরিত হয়েছে লেখনীর সেই অমোঘ টান। নিতান্তই টুকরো-টুকরো শব্দ আর বাক্যে চোখের সামনে ফুটে উঠেছে চেনা-অচেনা পথঘাট, ঘাড়-ঘোরালেই দেখা যায় এমন চরিত্র, আর ষড়রিপু ও অমরত্বের টানাপোড়েনে দীর্ণ চলমান জীবন। তবে লেখক সবক'টা গল্পই অশ্রুর লবণাক্ত স্বাদে সিঞ্চিত করেছেন দেখে মনটা ফুরফুরে হওয়ার বদলে শেষ অবধি খারাপই হয়ে গেল। কেন? প্রেম মানেই কি তার শেষে মধুরের বদলে অম্লরসের প্রাধান্য দেখা দেবে? বইটাকে অন্য লেভেলে নিয়ে গেছে স্বপন চন্দ'র প্রচ্ছদ ও অলংকরণ। একটা সময় যেমন সুধীর মিত্র আমাদের সামনে স্মার্ট এবং ইয়ে... আকর্ষণীয়া বঙ্গললনার আর্কিটাইপ তুলে ধরেছিলেন, এই বইয়ের ছবিগুলোতে সেভাবেই আমরা পাই ঘরোয়া অথচ শুচিস্মিতা বঙ্গবালাদের। মনে হয়, গল্পের গ্রহণ-লাগা প্রেমের বিষয় হয়ে থাকার জন্যই সেই পূর্ণজ্যোৎস্নারূপী নারী এবং তাদের পারিপার্শ্বিককে এঁকেছেন শিল্পী। আভূমি সেলাম, সাষ্টাঙ্গ প্রণাম ইত্যাদি রইল তাঁর উদ্দেশে। বইটি সত্যিই সুমুদ্রিত। কিন্তু একটা গল্পেরও প্রথম প্রকাশ সংক্রান্ত তথ্য নেই দেখে মাথা গরম হল। এইরকম গল্পের ডকুমেন্টেশন অত্যন্ত জরুরি। আশা রাখি যে পরবর্তী সংস্করণে প্রকাশক সেটুকু সংযোজিত করে নেবেন। তবে এমন একটি বইয়ে "বর্ণচোর"-এর মতো প্রেমের গল্প নেই বলে বড্ড কষ্ট পেলাম। জানি, ওটি অন্য এক সংকলনের সম্পদ হয়ে আছে। তবু, এই বইয়ে আমি সেটিকে বড্ড বেশি করে চেয়েছিলাম। নিজের তুচ্ছ, মলিন জীবনে ওইরকম এক-আধটা গল্প পড়েই ভালো থাকার রসদ পাই তো! কিন্তু তা বলে এই সংকলনটি কোনোমতেই উপেক্ষা করবেন না!
.....ভালোলাগার বইয়ের মধ্যে কিছু বই এমন থাকে যা শেষ করার পর তার স্রষ্টাকে প্রশংসায় ভরিয়ে তুলতে ইচ্ছে হয়, শব্দ কম পড়ে যায় ভালোলাগার কারণ ব্যক্ত করতে গিয়ে । আর কিছু বই এমন হয়, যার শেষটুকু পড়ে ফেলার পর শুধু নীরবে রেশটুকুকে ধরে রাখতে চায় মন । কোনো ভাষাতেই সেই লেখার মাধুর্য বর্ণনা করা যায় না । ‛আমন মরসুম’ এই দ্বিতীয় শ্রেণীর বই ।
বইয়ের ভূমিকায় লেখক বলেছেন - “এই কংক্রিট নগরীর রাস্তায়, উজ্জ্বল রোদের দুপুরে কিংবা নির্মেঘ গোধূলিতেও হঠাৎই সোঁদা মাটির গন্ধ পাই । চারিদিকে আপাত উদাসীন, বৈষয়িক নারী-পুরুষের বুকের ভেতর থেকেই নিশ্চিত ভাবে ভেসে আসছে সেই মাটির গন্ধ, বৃষ্টি ফোঁটার টাপুর-টুপুর, জলজ সুঘ্রাণ । মানুষের বুকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই পরিব্যাপ্ত আমন মরসুম আমাকে খুশি করে তোলে । বুঝতে পারি, ভালোবাসা নামের সেই আশ্চর্য অন্নকূটের কোনো অন্ত নেই ।” আদ্যান্ত প্রেমের, ভালোবাসার গল্পের সংকলন সৈকত মুখোপাধ্যায়ের ‛আমন মরসুম’ ।
সব ভালোবাসাই একটা গল্প তৈরী করে । প্রেম যেখানে পরিণতি পায়, অথবা পায় না, সেখানেও থেকে যায় গল্প । আমরা কান পেতে শুনিনা, মন দিয়ে বুঝিনা । প্রেমের চোরাবালির অস্তিত্ব হৃদয় জুড়ে তোলপাড় হতে থাকে । দশটি ভিন্ন মাপের ছোটগল্প নিয়ে এই সংকলন । কিন্তু এখানে গতানুগতিক প্রেম নয়, বরং তার বদলে আছে মনস্তাত্ত্বিক প্রেমের গল্প । এমন প্রেমের গল্প যা পড়ার পর শুধু নির্জনে অনুভব করতে হয় ।
কিন্তু ইতিমধ্যেই প্রকাশিত এবং পাঠকদের পরম আদৃত অসংখ্য প্রেমের গল্পের স্রষ্টা অন্যান্য বরেণ্য সাহিত্যিকদের থেকে কোথায় আলাদা হলেন সৈকত ? উত্তরে বলা যায় ‛আমন মরসুম’এর আদতে । যারা ভালোবাসে, তাদের প্রত্যেকের কথা হয়ে উঠেছে এই সংকলন । বলে চলেছে গভীর অনুভূতির অভিঘাতে দিব্যোন্মাদ পরিণতির মর্মস্পর্শী কাহিনী, যা পড়ে সারাদিন আর কোনোকিছুতেই মন বসে না । হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও চিলেকোঠায় বন্দী থেকে ছবি এঁকে যাওয়া একজন মানুষের জন্য মায়ায় ভরে ওঠে মন । রাতে লেপটা গায়ে টেনে নিয়ে মনে হয় ‛মিতুনের জন্য’ এখনও কি নদীর ধারে বসে আছে সেই প্রেমিক ? এইভাবেই কলমের নিপুণ ছোঁয়ায় ভালোবাসার ছবি এঁকেছেন শিল্পী ‛সৈকত মুখোপাধ্যায়’ ।
ভালোবাসার গল্পের এই সংকলন চরিতার্থ এবং অচরিতার্থ প্রেমের আখ্যান দিয়ে গড়া । যে মেয়েটা ব্রেক-আপের পরেও চলে যায় প্রতিশ্রুত ‛সোনালী পলাশ’ খুঁজতে, আর যে ছেলেটা প্রতিদিন নদীর ঘাটে বসে থাকে শুধু একজনকে আত্মহত্যার হাত থেকে বাঁচাবে বলে । যে পুরুষটি চায় কমবয়সী মেয়েটি তাকে ভালোবাসার মতো ভুল না করুক, আর যে উন্মাদ সারাজীবন শুধু দুটো চোখের ছবি আঁকতে আঁকতে একদিন মরে যায় - তাদের এবং তাদের মতোই আরো অনেকের ভালোবাসার মর্মস্পর্শী ছবি তুলে ধরেছে এই সংকলন ।
প্রেম—রহস্য, আকর্ষণ আর শক্তির আরেক নাম। এই একটা জিনিসই কখনও ছারখার হয়ে যাওয়া জীবনকে সাজিয়ে তোলে আবার কখনও সাজানো জীবনকেও ছারখার করে দেয়। এমন দশটি প্রেমের উপাখ্যান দিয়েই মরমি কথাকার সৈকত মুখোপাধ্যায় সাজিয়েছেন তার নতুন গল্পসংকলন:‘আমন মরশুম’। প্রথমটিকে বাদ দিলে, বাকি গল্পগুলো খুব ছোট ছোট। তাই বিষয়বস্তু নিয়ে কিছু বলতে গেলেই স্পয়লার হয়ে যাবে। তবে প্রেমকে গোটা বই জুড়ে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে ধরার চেষ্টা করেছেন লেখক। অধিকাংশ কাহিনীই যেমন হঠাৎ শুরু হয়েছে, তেমনই আচমকা শেষ হয়ে গেছে। অধিকাংশ প্রেমই পূর্ণতা পায়নি। ব্যর্থ প্রেম কখনও কাউকে পাগল করে দিয়েছে, কখনও কাউকে বাস্তব সম্পর্কে নিরাসক্ত করে তুলেছে। প্রেমের পিছু পিছু এসেছে অবৈধ সম্পর্ক। লেখকের সহজাত নির্মেদ গদ্যের জন্য খুব তাড়াতাড়ি পড়ে ফেলা যায় বইটা। অযথা জটিলতা নেই, অকারণ উপমা বা দার্শনিক বিশ্লেষণের ভার নেই, সারপ্রাইজিং এন্ড করার জন্য আরোপিত টুইস্ট নেই। আছে শুধু একেকটা গল্প বলে যাওয়া—কখনও সেই গল্প নিটোল, কখনও খুব বড় একটা গল্পের খন্ডচিত্র মাত্র। গল্পগুলো পড়ে কেমন লাগল? সে তো মিশ্র প্রতিক্রিয়া—কখনও আনন্দ হয়েছে, কখনও দুঃখে মনের ভিতরটা পাকিয়ে উঠেছে। আর প্রায় প্রতিটা গল্পের শেষেই মনে হয়েছে—এমন কেন হল? তবে একজন সাধারণ পাঠক হিসাবে আমার মনে হয়েছে চরিত্রে বা বিষয়ে হয়ত আরেকটু বৈচিত্র্য রাখলে আরও ভাল হত। প্রচ্ছদ সুন্দর। মুদ্রণ প্রমাদ প্রায় নেই বললেই চলে। পৃষ্ঠা, বাঁধাইও খুব ভাল। তবে দাম বিচার করলে ভিতরের ছবিগুলো কিন্তু আরেকটু ভাল করে ছাপা যেত। তবে এই হরর-থ্রিলারের যুগে দাঁড়িয়ে এমন বই প্রকাশ করার জন্য প্রকাশক-দ্বয়কে অনেক ধন্যবাদ। আর কী? হালকা প্রেমের গল্প পড়তে চাইলে হাতে তুলে নিতেই পারেন এই বই। ঠকবেন না এট���কু গ্যারান্টি।
প্রায় প্রতিটি গল্প ই খুব ভালো,লেখনী খুব সুন্দর....প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ পুরো চুমু😘 যেগুলি ভালো লেগেছে:- ১) বেদনার রং ২)অধীর ঘোষ বাই লেন ৩)চোখের তারায় ৪)মিতুনের জন্য ৫) উৎসর্গের পাতা(এই সংকলনের সেরা গল্প) বাকি গুলোও বেশ ভালো