প্রিয় বন্ধু সিদ্ধার্থ , যদিও তুমি ইংরেজি ভাষা ইংরেজের মতোই বলিতে ও লিখিতে শিখিয়াছ , তথাপি এই চিঠিখানি বাংলাতেই লিখিলাম , আমার ই সুবিধার খাতিরে - আমি ইংরেজি জানি না। এখন সুস্থিরচিত্তে একটি সৎ পরামর্শ গ্রহণ করিবে কি ? তোমার শ্রীবৃদ্ধি বিষয়ে আমি সন্দিহান নহি । তোমার বিচারবুদ্ধি , ভুয়োদর্শন , বাকচাতুর্য্য প্রভৃতি সবই আছে এবং ছিলো , কিন্তু ক্ষেত্রনির্বাচনে তোমার ভুল হইয়াছিলো । ব্যবসা তোমার কাজ নহে , অতএব সে সংকল্প ত্যাগ করো । ও পথে গিয়া একবার তোমার পতন হইয়াছে , আবার যদি পড়ো তাহলে আর তোমাকে তোলা যাইবে না । তোমার দেহে কান্তি আছে , সৌষ্ঠব আছে , সর্বাঙ্গে তোমার লক্ষীশ্রী বিরাজ করিতেছে, তোমার অশেষ গুণ , তোমার বাক্য প্রাণস্পর্শী , তোমার মাথা হেলাইবার ভঙ্গী চমৎকার , তোমার বাহ্যজ্ঞান অসাধারণ এবং সুদ জমিয়াছে ঢের । শেষোক্ত দ্রব্যটিকে পরিশোধ অপরাপর সদগুণগুলি কাজে লাগাও । তুমি বিবাহ করো। আজকাল তোমার উপযুক্ত পাত্রী মিলিতেছে । এমন স্ত্রী গ্রহণ করিবে যে তোমাকে তুলিতে পারে । তোমার বয়স এখন ত্রিশ কিংবা তার কিছু বেশী , সুতরাং পাঁচ সাতটি বছর তুমি অকারণে জলে নিক্ষেপ করিয়াছ । বয়সের অপব্যয়টা স্মরণ করিয়ায় তৎপর হও । পুনশ্চঃ সুদ বাবদ তোমার নিকট হইতে এ পর্য্যন্ত একটি পয়সা ও পাই নাই। অথচ হ্যান্ডনোট দুইবার পরিবর্তন করিতে হইয়াছে । সুদাদি কিছু পরিশোধ করিবার সুবিধা হইবে কি ? তোমারে তাগিদ দিতে বাধ্য হই , ইহাতে আমার প্রাণে যেমন ব্যথা বাজে , তেমন বোধ করি তোমার ও বাজে না! তোমার বিশ্বস্ত অমুক ।
নাটকীয়তায় পূর্ণ এ উপন্যাসের মধ্যে মহৎ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিলো। অসাধু নায়কের অন্তর্দ্বন্দ্ব আর নিষ্পাপ নায়িকার সারল্য ভালো লাগলেও গল্পটা একপেশে হয়ে গেলো। ঠিক যা হওয়ার ছিলো তা-ই হোলো। উপসংহারটা হতাশাজনক।
সিদ্ধার্থের বুঝি আর বাঁচিয়া থাকা হইলো না এই জঘন্য ভুবনে । একটি কারবারে হাত দিয়াছিলো কিছু অর্থ উপার্জনের আশায় কিন্তু তার ফলাফল অতি নির্মম ।হাতে যা ছিলো তা তো সর্বস্ব গিয়াছেই তাহার সহিত একটি কিনিলে আরেকটি এমনিই পাইবার মতো ঋণগ্রস্থ হইয়া এখন শেষমেশ লুকাইয়া থাকিতে হইতেছে । যখন তখন বাড়িতে পাওনাদার আসিয়া দরজার খিল ধাক্কাইয়া বিরক্ত করে । কখনো কখনো তা হাতাহাতি পর্যায়েও চলিয়া যায় । সে এতো লোকের কাছ হইতে ঋণ লইয়াছে যে এখন আর এমন কেউ অবশিষ্ট নাই যার হইতে ঋণ লইয়া অপরের ঋণ পরিশোধ করিবে । সুতরাং সিদ্ধার্থ সিদ্ধান্ত লইলো সে কোন বড় পাহাড় হইতে ঝাঁপ দিয়া এই জাগতিক ঋণ হইতে ইনিস্টেন্ট মুক্তি অর্জন করিবে । কিন্তু বিধাতার তাকে লইয়া আরেকটু তামাশা করিবার অভিপ্রায় ছিলো ।
১৯২৯ সালে যদি একজন বাঙালী লেখক 'catch me if you can' মুভি/উপন্যাসের মত কাহিনি লিখে বসেন, বিষয়টা কেমন হবে? রবীন্দ্র যুগে এই রকম উপন্যাস আশাই করা যায় না। রীতিমতো অবাক হতে হলো। অসাধু সিদ্ধার্থ অবশ্যই বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে।
‘Depressed but sneaky chad tries to seduce gullible nibbi, almost succeeds, but in the end is undone by his own past.’
এইটা বইয়ের পিছনে ব্লার্ব হিসাবে প্রিন্ট করে দেওয়া উচিত।
কাহিনি এরকমই: নায়ক খ্রাপ, সে নিজেরে ঘেন্না করে, মরতে চায়। কিন্তু এক মেয়েরে দেইখা তার প্রেম জাগ্রত হয়। সে মরার চিন্তা বাদ্দিয়া পরিচয় পালটায়, মেয়ের পিছে ঘুইরা, পটায়। বিয়া প্রায় হয়াই যাবে প্রায়, এমন সময়ে তার ভন্ডামি প্রকাশ হয়া যায়। সে ভেগে যায়। শ্যাস।
টিপিক্যাল এলিট-কেন্দ্রিক সাহিত্য মনে হইলো। এলোমেলো। সময় অনুসারে আগায়া ছিল হয়তো এই উপন্যাস, কিন্তু এখন পাঠের আনন্দ দিতে পারলো না। আমি আপসোস করলাম লেখকের পর্যবেক্ষণ এবং লেখনীশক্তির অপচয় দেইখা। তিনি নিঃসন্দেহে ভালো দখল রাখেন ভাষার ওপরে, তাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু যে টুলস গুলা তিনি ব্যভার করছেন উপন্যাস সাজাইতে, মিলে নাই। সিদ্ধার্থের প্রতি আমাদের কোন সহানুভূতি জাগে না। বরং আড়ালে আবড়ালে প্রকৃত যে সিদ্ধার্থ, তার প্রতি ভালো-লাগা সৃষ্টি হয়। প্রথমে ভাবলাম লেখক এইটাই চাচ্ছেন হয়তো। কিন্তু দেখলাম এর কারণে নায়িকার সাথে সকল আলাপে নকল সিদ্ধার্থের কথাগুলাও নকল লাগতাছে, এই কারণে বইয়ের পেট থেকে উরু অব্দি পুরা জায়গা গুরুত্ব হারায়ে ফেলছে। আমরা আর কী দেখমু? দুই ভাই বোনের মধ্যেকার সম্পর্ক? অজয়ার নরম মন? "চাকর-চাকরাণি"দের ব্যান্টার? কোনোটাই মনোযোগ ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট গুরুত্ববহ না।
নাটক হিসাবে চলতো জিনিসটা। হয়তো। কিন্তু সাহিত্যকর্ম হিসাবে বড়ই অপ্রতুল।