Jump to ratings and reviews
Rate this book

চৈতন্য : শেষ কোথায়

Rate this book
বাঙালি তার শ্রেষ্ঠ সন্তান চৈতন‍্যের অন্তর্ধান রহস্য বিস্মৃত হয়নি কখনও। কালে কালে তাঁর মৃত্যুরহস‍্য আরও গভীর হয়েছে। জুড়ে গেছে বিভিন্ন অতিকথন ও মিথ।
বাংলা সাহিত‍্যে এই প্রথম চৈতন্য মৃত্যুরহস‍্যের সমাধান নিয়ে আসছে 'চৈতন‍্য শেষ কোথায়?'

368 pages, Hardcover

Published January 1, 2019

3 people are currently reading
64 people want to read

About the author

Rajat Pal

20 books6 followers

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
8 (61%)
4 stars
2 (15%)
3 stars
1 (7%)
2 stars
1 (7%)
1 star
1 (7%)
Displaying 1 - 2 of 2 reviews
Profile Image for Preetam Chatterjee.
7,090 reviews383 followers
July 16, 2023
বই: চৈতন্য : শেষ কোথায়
লেখক: রজত পাল
ভাষা: বাংলা
প্রকাশক: বইচই পাব্লিকেশন (২০১৯)
পৃষ্ঠা: ৩৬৮
ফরম্যাট: হার্ডবাউন্ড
মূল্য : ৪৪৪/-
‘চৈতন্য’ হোক

বিরাট জলোচ্ছাসের মত জনতা ভেঙে পড়েছে গুন্ডিচা বাটীতে। জনতার অগ্রভাগে গৌরবর্ণ দীর্ঘকায় মানুষটি। সাথে ছায়ার মতো লেপ্টে আছে দামোদর গদাধর। 'জগন্নাথস্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে' মন্ত্রোচ্চারণে দিগ্বিদিক মুখরিত। প্রবল আবেগে উদ্দীপ্ত সেই গৌরবর্ণ পুরুষ মন্দিরে ঢুকল জনতার আগেই। পা দিল বিদ্যাধরের ফাঁদে। প্রবেশ মাত্রই রুদ্ধ হলো মন্দিরের দ্বার। অন্ধকার বাজপাখির বেশে এসে ছিনিয়ে নিয়ে গেল গদাধরকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রহারে প্রহারে নিষ্পিষ্ট, জর্জরিত হয়ে গেল সেই আজানুলম্বিত গৌরবর্ণ পুরুষ।
কে একজন ব্যঙ্গ করে বলে উঠল - সচল জগন্নাথের হাত পা তো সবই আছে, তবু নিজেকে রক্ষা করতে পারছে না ?
ধীরে ধীরে নেমে এলো চিরদিনের অন্ধকার।
সমকালের ওড়িয়া কবি ঈশ্বর দাস লিখছেন -
শ্রী জগন্নাথ কলেবর। একাত্মা একাঙ্গ শরীর ।
সমন্তে এমন্ত দেখন্তি। মায়া শরীর ন জানন্তি ।।
শ্রী জগন্নাথ আজ্ঞা পাই। অন্তর্ক্ষে নেলে শব বহি ।
গঙ্গারে মেলি দেলে শব। সে শব হোইনাক জীব ।।
ঈশ্বর দাস বলছেন , জগন্নাথের সামনেই চৈতন্য দেহ পড়েছিল। তখন জগন্নাথের আজ্ঞায় শবদেহ কাঁধে করে বহন করে নিয়ে গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হলো।
লোচন দাস লিখছেন, "মন্দিরের মধ্যেই দেববিগ্রহের প্রকোষ্ঠ-সংলগ্ন বৃহৎ মণ্ডপের এক কোণে তাঁহাকে সমাধি দেওয়া হয়। ....বেলা তিনটা হইতে রাত্রি আটটা পর্যন্ত তাঁহার সমাধি কার্য্যে ব্যয়িত হয়। তৎপরে সেই মণ্ডপের পাথরগুলি যথাস্থানে সন্নিবেশিত করিয়া সমাধির চিহ্ন বিলুপ্তি করা হইয়াছিল। যাঁহারা সঠিক অবস্থা জানিয়াছিলেন, তাঁহারা তিরোধান বেলা ৩ টায় হইয়াছিল এরূপ লিখিয়াছিলেন।
আধুনিক জনমানসে বিধৃত কন্সপিরেসি থিয়োরির প্রাথমিক জন্মদাতার নাম অবশ্যই রায়বাহাদুর দীনেশ চন্দ্র সেন। সাল ১৯২১। সূত্র তাঁর Ramtanu Lahiri Fellowship Lectures for the year 1919 and 1921-এর অন্তর্গত ‘Chaitanya and His Age’ নামক বক্তৃতা। ১৯২২ সালে তা প্রকাশ পেল বইয়ের আকারে। ২৬৪ পৃষ্ঠায় দীনেশ বাবু লিখলেন :
“Chaitanya was in the Jagannath temple when he suffered from high fever. When the priests apprehended his end to be near they shut the gate against all visitors. This they did to take time to burying him within the temple. If he left the world at 4 p.m. the doors we know were kept closed till 11 p.m. – this time was taken for burying him and repairing the floor after burial. The priests at 11 p.m. opened the gates and gave out that Chaitanya was incorporated with the image of Jagannath. So according to one account he passed away at 11 p.m. But the better informed people knew that he had passed away at 4 p.m., when the door was closed……. They buried him somewhere under the floor of the temple and would not allow any outsider to enter it until the place was thoroughly repaired and no trace left after his burial as I have already stated. This is the only rational explanation that may be advanced for explaining their conduct in shutting the temple gate.”
চৈতন্যের অন্তর্ধান/মৃত্যুর রহস্যন্মোচন হয়নি এখনও।
দীনেশচন্দ্র সেন, জয়ানন্দ ও লোচনদাস গুন্ডিচা মন্দিরেই চৈতন্যের সমাধি দেওয়া হয়েছিল মনে করেছেন। জয়ানন্দর টোটাই দীনেশচন্দ্রের গুন্ডিচা।
গদাধরের আশ্রমে চৈতন্যের মৃত্যু হয় বলছেন বিমানবিহারী মজুমদার। অমূল্যচন্দ্র সেন বলছেন চৈতন্যের অন্তরঙ্গতম পার্ষদদের রটনা যে মহাপ্রভু গুন্ডিচায় চলে গিয়েছেন, বিপথগামী করে ভক্তদের। এই সুযোগে মহাপ্রভুর দেহ টোটা গোপীনাথের বিগ্রহের নীচে সমাধিস্থ করে জগন্নাথে লীন হয়ে যাওয়ার তত্ত্ব প্রচার করা হয়।
কৃষ্ণদাস স্রেফ 'চৌদ্দশত পঞ্চান্নে হইল অন্তর্ধান' বলে ক্ষান্ত হয়েছেন।
গায়েব হয়ে গিয়েছে স্বরূপ দামোদরের কড়চা।
দুর্গাপদ চট্টোপাধ্যায় ও সমরেশ বসু দু'জনেই আঙ্গুল তুলেছেন গোবিন্দ বিদ্যাধর ভোই-এর দিকে।
এই সকল প্রচন্ড প্রতাপশালী ও ভিন্নধর্মী উপসংহারের বিপ্রতীপে যুক্তি ও তথ্যের নিশিত কলম মেলে ধরেছেন শ্রী রজত পাল।
শ্রীচৈতন্যদেব।
মাত্র আটচল্লিশ বছরের জীবনে তিনি বাংলার ধর্মজীবন, সমাজ ও সংস্কৃতির ওপর যে প্রভাব বিস্তার করে গেছেন, তার সমতুল ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া ভার। তিনি কেবল একটি যুগের প্রতিনিধি নন, প্রেম-ভক্তি, ত্যাগ-তিতিক্ষার এক পূর্বদৃষ্টান্তহীন প্রতীক। বাংলার মধ্যযুগীয় সমাজ-সংস্কৃতি ও সাহিত্য শিল্পকলার বিচিত্র ও বিপুল উৎকর্ষের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি।
গতানুগতিক ইতিহাস অনুসরণ করলে জানা যায় যে শ্রীচৈতন্যদেব ১৫১৫ খ্রীস্টাব্দে বৃন্দাবন পরিক্রমা সমাপ্ত করে আবার পুরীধামে ফিরে আসেন এবং ১৫৩৩ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি পুরীধামেই অবস্থান করেন।
পপ্যুলার ন্যারেটিভ অনুসারে এখানেই তাঁর তিরোধান হয়। তবে তাঁর দেহান্তর নিয়ে কোন প্রামাণিক তথ্য পাওয়া যায় না। চলতি মতে জীবনের শেষ বারো বছর তাঁর বাহ্যিক চেতনা প্রায় ছিল না বললেই চলে, এমনই ছিল তাঁর দিব্য উন্মাদনা।
রজত বাবুর মূল contention ঠিক এই জায়গায়। বিস্তারিত আলোচনায় আসা যাবে কিছু পরে।
চৈতন্যদেবের জন্ম হয় পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে ১৪৮৬ খ্রীস্টাব্দে বা ১৪০৭ শকাব্দে।
প্রাক চৈতন্যপর্বের ইতিহাস ও জনজীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে খ্রীস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে নবদ্বীপে ভাগীরথীতীরে বাংলায় হিন্দু রাজত্বের অবসান ঘটে। শেষ স্বাধীন হিন্দু রাজা লক্ষ্মণসেন অতর্কিতে আক্রান্ত হয়ে নবদ্বীপ ত্যাগ করে সপরিবার পূর্ববঙ্গে গমন করেন।
সিংহাসন দখল করেন ইসলাম ধর্মাবলম্বী তুর্কি নেতা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খলজী ।
স্বীয় বুদ্ধিকৌশলে তিনি অল্পদিনের মধ্যে নবদ্বীপের নিকটবর্তী অঞ্চলগুলির একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠেন এবং আমীর ওমরাহতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। এই শাসকগোষ্ঠীর ভাষা, রীতি নীতি, নাগরিক সংস্কৃতি সবকিছুই বাংলার অজানা ছিল। তাই তুর্কি শাসন জনসাধারণকে বিন্দুমাত্র স্বস্তি দিতে পারে নি।
এক বিশ্বাসঘাতক আমীর আলি মর্দান এর দ্বারা খলজীর মৃত্যু হলে বাংলায় আমীরতন্ত্র অত্যন্ত প্রাধান্য লাভ করল। কিন্তু এতে টনক নড়ল দিল্লীর পাঠান সুলতানের। বাংলার ওপর এরপর অচিরেই কায়েম হল দিল্লীর শাসন।
কিন্তু পরবর্তীকালে দিল্লীর মসনদ নিয়েও পাঠান সুলতানদের মধ্যে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হলে, বাংলায় সেই সুযোগে ইলিয়াস শাহি বংশের প্রতিষ্ঠা হয়।
এই ইলিয়াসশাহি বংশের সমাপ্তি ঘটে তাদেরই লালিত হাবসি খোজাদের হাতে। এরাই শেষে ক্ষমতা দখল করে ১৪৮৭ থেকে ১৪৯৩ পর্যন্ত এই ছয় বছর বাংলা শাসন করে।
এই সময় কুশাসন চরমে ওঠে।
সেই সময় হুসেন শাহ নামক প্রধান এক রাজকর্মচারী অত্যাচারী হাবসি সুলতানকে হত্যা করে বাংলার মসনদ জয় করেন এবং হুসেনশাহি বংশের প্রতিষ্ঠা করেন।
শ্রীচৈতন্যদেবের প্রথম জীবন এঁরই রাজত্বকালে অতিবাহিত হয়।
শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাব এমনই এক যুগসন্ধিক্ষণে।
সঘনে ঢুলায় শির ‘নাড়া নাড়া’ বলে
নাড়ার সন্দর্ভ কেহো না বুঝে সকলে...
‘চৈতন্য ভাগবত’ ও ‘চৈতন্য চরিতামৃত’ আমাদের সাক্ষ্য দেয় যে অদ্বৈত আচার্যকে চৈতন্যদেব মাঝে মধ্যেই ভাবের ঘোরে ‘নাড়া’ বা ‘নাঢ়া’বলে ডেকে উঠতেন।
বাকি ভক্তরা এর অর্থ বুঝতেন না।
বৃন্দাবন দাস বা কৃষ্ণদাস কবিরাজ এই ডাকের রহস্য কখনই প্রকাশ করেন নি। এই রহস্যের বীজ লুকিয়ে রয়েছে নরসিংহ নাড়িয়াল নামক একজন অধুনা বিস্মৃত ব্যক্তির মধ্যে, যিনি ছিলেন বাংলার সুলতান যুগের একমাত্র হিন্দু সম্রাট গণেশের মন্ত্রী। কেবল মন্ত্রী নন, এঁরই পরামর্শে গণেশ সম্রাট হয়েছিলেন।
‘অদ্বৈত প্রকাশ’ নামক গ্রন্থে আমরা পাচ্ছি,
‘সেই নরসিংহ নাড়িয়াল বলি খ্যাত
... যাহার মন্ত্রণাবলে শ্রীগণেশ রাজা’।
নরসিংহের নাম কেন ‘নাড়িয়াল’ হল সেই আলোচনা ভিন্ন। তবে যা আমাদের জেনে রাখা দরকার সেটি হল বজ্রযানী সাধক নাড়োপা-র সাথে সম্পর্কিত গ্রাম ‘নাড়ুলী’ এবং সেই গ্রাম থেকেই এসেছিলেন নরসিংহ নাড়িয়াল মহাশয়।
কিন্তু সিদ্ধাচার্য নাড়োপার সাথে সম্পর্কিত থাকাটা সাধনরাজ্যের গোপন কথা। এই সাধনা হল বৌদ্ধতন্ত্রের সাধনা। অদ্বৈত আচার্য এবং চৈতন্যদেব যে গোপনে তন্ত্রের চর্চা করতেন সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার অবকাশ রয়েছে।
এই নাড়িয়াল মহাশয়ের বংশধর হলেন অদ্বৈত আচার্য।
আমরা অদ্বৈত আচার্যের জন্মসাল এবং রাজা গণেশের রাজত্বকালকে পাশাপাশি রেখে আলোচনা করলে দেখতে পাব যে উভয়ের মধ্যে ফারাক বেশি নয়। আচার্য জন্মেছেন চৈতন্যদেবের জন্মের অনেক আগে, ১৪৩৪ সাল নাগাদ। গণেশ রাজা হয়েছেন ১৪১০ সাল নাগাদ।
গণেশ বেশিদিন রাজত্ব করতে না পারলেও তাঁর পুত্র যদু ওরফে জালালুদ্দীন ও নাতি মিলে আরও ১৫-২০ বছর রাজত্ব করেছেন।
অর্থাৎ অদ্বৈত যখন জন্ম নিচ্ছেন তখন বাংলায় গণেশের বংশের শাসন খুব পুরানো হয় নি। অদ্বৈতের পরিবারে গণেশের উত্থান এবং তার পিছনে নরসিংহের অবদানের কথা আলোচিত হত। এমন হতেই পারে যে অদ্বৈতের শৈশবে নাড়িয়াল মশাই জীবিত ছিলেন।
অদ্বৈত নিজে ১২৫ বছর জীবিত ছিলেন। সেক্ষেত্রে নাড়িয়াল মশাইয়ের দীর্ঘায়ু হওয়া অসম্ভব নয়।
কেবল রাজা গণেশের উত্থানই নয়, কেন হিন্দু রাজা টিকে থাকতে পারল না সে বিষয়েও সম্ভবত আলোচনা হত।
কেন গণেশের পুত্র ধর্মান্তরিত হলেন সেই আলোচনাও হত। একজন হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের কাছে (অদ্বৈত বংশ) এটি বড়ই গ্লানিকর বিষয়। অবন্তীকুমার সান্যাল তাঁর ‘চৈতন্য ইতিহাস ও অবদান’ নামক গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে ১৫৭০ সালে অবিভক্ত বাংলায় হিন্দুর সংখ্যা ছিল ৬২ লক্ষ এবং মুসলমান ২৫ লক্ষ।
এর প্রায় দেড়শ বছর আগে মুসলমানের সংখ্যা ছিল আরো কম। সেই সময়ে প্রতি পাঁচজনে চারজন ছিল হিন্দু। এই হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ১২০৫ সাল থেকে মুসলিক তুর্কি শাসন চলে আসছিল।
হিন্দুদের তরফ থেকে রাজ্য দখলের কোন উদ্যোগই ছিল না। অথচ প্রতিবেশি কামরূপ ও উড়িষ্যা দীর্ঘসময় ধরে হিন্দু রাজাদের শাসন বজায় রাখতে পেরেছিল।
বাংলায় হিন্দুদের নিস্ক্রিয়তার প্রধান কারণ ছিল এখানের হিন্দুসমাজে প্রবল বর্ণভেদ। সেনেদের শাসনকালে হিন্দু সমাজে পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ এতোটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে একজন ব্রাহ্মণ বলপূর্বক ধর্মান্তরিত হলে সমাজের নিম্ন সম্প্রদায়ে কোনো প্রভাব পড়ত না। উচ্চবর্ণের অত্যাচারের কারণে অনেক অন্ত্যজ স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হত।
রাজা গণেশ নরসিংহের মন্ত্রণায় গৌড় দখল করলেও অন্য হিন্দুদের থেকে কোনো সহায়তাই পেলেন না। হিন্দু সামন্ত রাজা, প্রতিবেশি হিন্দু রাজা এবং অগণিত হিন্দু প্রজা এই বিষয়ে উদাসীন হয়ে রইল।
অথচ মুসলিম দরবেশের আমন্ত্রণে জৌনপুর থেকে সুলতান শর্কি সৈন্যদল নিয়ে চলে এলেন গণেশকে উৎখাত করতে। যাত্রাপথে মিথিলার রাজা কেবল প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন। এর বাইরে একজন হিন্দু শাসকও গণেশের সহায়তায় এগিয়ে এলেন না। ফলে পুত্র যদুকে ধর্মান্তরিত করে সিংহাসনে বসাতে হল।
এসব কথা অদ্বৈত আচার্য জানতেন। তাঁর জন্মের কিছুকাল আগের ঘটনা মাত্র।
তিনি বুঝেছিলেন বাংলায় কেবল সামরিক অভ্যুত্থান যথেষ্ট নয়। এখানে হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। নাহলে ক্ষমতা দখল করলেও ধরে রাখা সম্ভব হবে না।
ঘৃণারহিত প্রেমময় বৈষ্ণব ধর্মই কেবল পারে সকলকে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসতে।
সেই উদ্যোগই নিলেন অদ্বৈত আচার্য। যবন হরিদাসকে তিনিই উদ্ধার করলেন মৃত্যুমুখ থেকে।
তখনও চৈতন্যদেবের জন্ম হয় নি। শ্রীবাসদের একবার বলে বসলেন কেউ যদি যোগ্য না হয়, তিনি নিজেই কৃষ্ণ অবতারের রূপ ধারণ করবেন।
অবশেষে মনের মতন উপযুক্ত আধার পেলেন বিশ্বম্ভর মিশ্রের মধ্যে। আদিতে অদ্বৈতও ‘মিশ্র’। একদল শ্রীহট্ট থেকে আগত মানুষ নবদ্বীপে নতুন যুগের সূচনা করলেন। সঙ্গে নিলেন নিত্যানন্দকে। ঈশ্বরপুরী এলেন।
বিশ্বম্ভর গয়ার পিণ্ড দিতে গেলেন এবং ফিরে এলেন ভিন্ন মানুষ হয়ে।
চণ্ডাল চণ্ডাল নহে যদি কৃষ্ণ বলে
বিপ্র নহে বিপ্র যদি অসৎ পথে চলে
ধর্ম ও রাজনীতির এক অসাধারণ মিশ্রণ প্রকট হল বাংলার মাটিতে। ভারতের অন্য কোনও ভক্তি সংগীতে এই অভিনব মাধ্যমের উপস্থিতি ছিল না শ্রীচৈতন্যের দর্শনের বাহ্যিক প্রকাশ ছিল এই নগর সংকীর্তন।
ঈশ্বর প্রেমের ভিত্তিভূমি ছাড়া মানবপ্রীতি দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না— এই উদারবাদী চেতনার মূল ভিত্তিকে সম্বল করে তৎকালীন সমাজের তীব্র বেড়াজালকে চূর্ণ করে দিয়ে সাম্যের ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন শ্রীচৈতন্যদেব। চৈতন্যের ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন সমাজের বেশির ভাগ পিছিয়ে পড়া নিঃসহায় মানুষ।
নবদ্বীপে নগর সংকীর্তন শুরু হল, সামনে নিত্যানন্দ ও হরিদাসকে রেখে।
একজন ব্রাহ্মণ ও সন্ন্যাসী, অপরজন যবন ও কৃষ্ণপ্রেমী।
শ্রীচৈতন্যের নগর সংকীর্তন বৈষ্ণবদের কাছে একটি অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় কর্ম হিসেবে পরিগণিত হয়। ঢোল, করতাল মৃদঙ্গ, মন্দিরা সহযোগে নৃত্যগীত ও কৃষ্ণভক্তি মিছিলে নবদ্বীপের পথঘাট মুখরিত হয়ে ওঠে। এই পন্থায় সমাজের সব ধর্মের মানুষ গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের কীর্তন মিছিলের সদস্যে পরিণত হয়ে উঠেছিল অচিরেই।
ধর্মীয় আন্দোলনের সাথে রাজনৈতিক লক্ষ্যপূরণে সুলতান হুসেন শাহর উচ্চপদস্থ হিন্দু কর্মচারীদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা হল। যারা সারা দিলেন তাঁদের মধ্যে বিখ্যাত হলেন,
১। রূপ-সনাতন – একজন ‘দবীর খাস’ ও অন্যজন ‘সাগির মল্লিক’। সেক্রেটারি পদমর্যাদার দুজন আমলা। শ্রীনাথ আচার্যের মাধ্যমে এই দুজনের সাথে ঘনিষ্টতা হয়েছিল। সনাতনের শিক্ষাগুরু ছিলেন বিদ্যাবাচস্পতি (‘ভক্তি রত্নাকর’ মতে) এবং তাঁর জ্যেষ্ঠ ছিলেন বাসুদেব সার্বভৌম, পুরীতে যাঁর নিকট প্রথমে আশ্রয় নিয়েছিলেন চৈতন্যদেব।
২। নরহরি সরকার – এঁর পূর্বপুরুষ বল্লাল সেনের একজন সেনাপতি ছিলেন। দীনেশচন্দ্র সেনের মতে ইনি গৌড়ের রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত ছিলেন। হিন্দু জাগরণের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা এঁর মধ্যেও ছিল।
৩। সূর্যদাস সরখেল – ‘ভক্তি রত্নাকর’ মতে ইনি গৌড়ের শাসকের থেকেই ‘সরখেল’ উপাধি প্রাপ্ত হন।
৪। নরোত্তম ঠাকুর – এঁর পিতা কৃষ্ণদত্ত হুসেন শাহর আমাত্য ছিলেন।
৫। কবিরঞ্জন – ইনি হুসেন শাহর কর্মচারী ছিলেন।
৬। কেশব ছত্রী (বসু) – ইনি হুসেন শাহর রক্ষীদলের সেনাপতি ছিলেন।
৭। রঘুনাথদাস গোস্বামী – এঁর পিতা ছিলেন সপ্তগ্রামের স্থানীয় শাসক। বছরে ১২ লক্ষ টাকা কর দিতেন।
পালযুগে কৈবর্ত্য, দুলে, বাগদী ইত্যাদি সমাজের মানুষেরা যোগ্যতা অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও সেনযুগে তাঁদের সমাজে গুরুত্ব হ্রাস হয়েছিল।
এছাড়া ছিলেন অগণিত বৌদ্ধ জনতা যারা নিজেদের প্রান্তিক মনে করছিলেন। মুসলিম শাসকদের আগমনে এঁদের মধ্যে প্রবলভাবে ধর্মান্তরিত হওয়ার ঝোঁক এসেছিল। ধর্মান্তরের এই স্রোতকে প্রতিহত করতে বৈষ্ণব ধর্মকে সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হল। অদ্বৈত-চৈতন্য-নিত্যানন্দকে সামনে রেখে সকলে আপন করে নেওয়ার প্রেমের ধর্মের প্রবর্তন করা হল।
কৃষ্ণনামে মাতোয়ারা চৈতন্যদেব সন্ন্যাস গ্রহণ করে শ্রীকৃষ্ণ স্মৃতি বিজড়িত মথুরা-বৃন্দাবন বা দ্বারকার বদলে এসে ঠাই নিলেন পুরীতে। জগন্নাথদেবকে যতই বিষ্ণুর প্রতীক বলা হোক না কেন, এমন মন্দিরের অভাব ভারতে নেই।
তাহলে কেন উড়িষ্যায় এলেন তিনি ?
এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমাদের সেদিনের ভারতের রাজনৈতিক পরিবেশকে স্মরণে রাখতে হবে।
সমগ্র উত্তর ভারত মুসলিম শাসকদের দখলে চলে এলেও সেদিন পর্যন্ত উত্তর-পূর্বে কামরূপ এবং দক্ষিণে উড়িষ্যা ও বিজয়নগর সাম্রাজ্য ছিল হিন্দু রাজাদের ���ধীনে।
কামরূপকে আলাদা করে আলোচনায় রেখে আমরা দেখতে পারব যে দক্ষিণের দুই হিন্দু রাজা পরস্পরের সাথে দীর্ঘদিন লড়াইতে নিযুক্ত।
ওদিকে বিজাপুর ও এদিকে গৌড়ের মুসলিম শাসকদের আক্রমণকে প্রতিহত করতে বিজয়নগর ও উড়িষ্যার রাজাদের মধ্যে মিত্রতার পরিবেশ তৈরি হওয়া জরুরী ছিল। গোপনে এই দৌতকার্য করলেন চৈতন্যদেব। মাধবেন্দ্র পুরী, ঈশ্বরপুরী এবং কৃষ্ণদেব রায়দের মাধ্ব গুরুর সহায়তায় এই কার্য সফল হল একপ্রকার।
১৫১০-১৫৩০ দুই রাজার মধ্যে কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হল না। প্রতাপরুদ্রের কন্যার সাথে বিবাহ হল কৃষ্ণদেব রায়ের। ধার্মিক হিন্দুদের ��স্তিত্ব রক্ষার জন্য কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, অন্ধ্র, উড়িষ্যা সহ বাংলার মেদিনীপুর, হাওড়া ও হুগলীর কিছু অঞ্চল জুড়ে এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল রইল।
একদল অনুগামীর সাহায্যে মথুরা, বৃন্দাবন অঞ্চলে বৈষ্ণব ধর্মের জাগরণ ঘটানো হল। চৈতন্যদেবের নিজ উদ্যোগে বাংলা ও দক্ষিণ ভারতে বহু শাক্ত, শৈব, এমনকি জৈন ভাবধারার মানুষ বৈষ্ণব ধর্মে যুক্ত হলেন।
‘চৈতন্যঃ শেষ কোথায় ?’ নামক গ্রন্থে এক বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে পুরীতে চৈতন্যদেবের মৃত্যুর সম্ভাবনাকে বাতিল করা হয়েছে।
কেন ১৫৩৩ সালে পুরীতে শ্রীচৈতন্যের গুপ্তহত্যা হতে পারে না, সে বিষয়ে অজস্র যুক্তির উপস্থাপনা করেছেন লেখক।
বইয়ের বক্তব্যের প্রধান সুর নির্ধারিত করা হয়েছে এক্কেবারে প্রথমপর্বেই -- 'প্রশ্ন একবিংশম' নামক একুশটি pointed জিজ্ঞাসার মাধ্যমে।
সেগুলি কী ও কেমন?
১)বাংলার সামাজিক অবস্থা তখন কী? পিরাল্যাবাসীদের নবদ্বীপের উপর আক্রোশের কারণ কী?
২) শ্রীহট্টের সাথে বিশেষ যোগাযোগ কী ছিল?
৩) আকস্মিক পিণ্ডদানেচ্ছা, গয়াগমন, ভাবোন্মাদনা ও ঈশ্বরপুরীর কাছে দীক্ষা , এসব কী সম্পূর্ণ কাকতালীয়?
৪) নিত্যানন্দের আগমন কি আকস্মিক ?
৫) কাজীকে নিয়ে প্রকৃতপক্ষে কী হয়েছিল ?
৬) হঠাৎ সন্ন্যাস নিলেন কেন ?
৭) কেশব ভারতী কি বৈষ্ণব গুরু?
৮) পুরী গেলেন কেন?
৯) দলবল নিয়ে কেন গেলেন পুরী ?
১০) যাজপুরে একদিনের জন্য নিরুদ্দেশ হলেন কেন?
১১) পুরী আসার পথে নানা শিবমন্দিরে পুজো দিলেন কেন?
১২) সর্বভৌমের সাথে কি হঠাৎই দেখা?
১৩) দাক্ষিণাত্যে একাকী গেলেন কেন?
১৪) ফিরে এসে দু'বছর পুরীতে কী করলেন?
১৫) বৃন্দাবনের নাম করে গৌড়ে এলেন কেন ?
১৬) চৈতন্যদেবকে গুপ্তহত্যা করা হয় না উনি পরিকল্পিত অন্তর্ধান করেন?
১৭) যদি আকস্মিক অন্তর্ধান করলেন, তাহলে তা করলেন কেন?
১৮) অন্তর্ধান করে কোথায় গেলেন? তাঁর বিষয়ে গৌড়ীয় বৈষ্ণবেরা আশ্চর্যজনকভাবে নীরব কেন?
১৯) চৈতন্যদেব কি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন?
২০) মহাপ্রভুর কোনও গোপন সামাজিক অথবা রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল কি?
এবং
২১) রস সাধনা বা যুগল সাধনা বা সহজিয়া সাধনার অভ্যাস অথবা প্রচার করেছিলেন কি চৈতন্যদেব?
চৈতন্যদেব পুরীতে গিয়ে ১৫১০ সালে প্রথমবার জগন্নাথদেবের গর্ভগৃহে প্রবেশ করার পরে পরবর্তী ২৩ বছর আর কোনোদিন সেখানে প্রবেশ করেন নি। একেবারে শেষদিনে তিনি নাকি প্রবেশ করেছিলেন এবং সেখানে তাঁকে হত্যা করা হয় – একথা বলা হলেও যুক্তি তর্কের দ্বারা এটি অসম্ভব মনে হয়েছে।
রজতবাবুর মতানুযায়ী, কারণগুলি এরূপ –
১। যে মানুষটি ২৩ বছর ধরে গর্ভগৃহে প্রবেশ করেন নি, কেবল বাইরে থেকে প্রণাম করে চলে আসতেন, তাঁকে গর্ভগৃহে হত্যার পরিকল্পনা করা কিভাবে সম্ভব ? একজন যেখানে প্রবেশই করেন না, সেখানে হত্যা করার জন্য লোকজন কেন পরিকল্পিতভাবে উপস্থিত থাকবে ?
২। যদি আলোচনার খাতিরে ধরেও নিই যে গর্ভগৃহের বাইরে দণ্ডায়মান চৈতন্যদেবকে জোর করে গর্ভগৃহে টেনে আনা হয়েছিল, সেটাও যুক্তিসঙ্গত মনে হয়নি। কারণ আমাদের মধ্যে চৈতন্যদেব সম্পর্কে একাকী, উদাসীন সন্ন্যাসীর ধারণা থাকলেও, আসলে পুরীতে চৈতন্যদেব মোটেই একাকী থাকতেন না। চৈতন্যদেবের দেহরক্ষী হিসেবে সর্বদাই থাকতেন কাশীশ্বর। এই কাশীশ্বর একজন বলশালী ব্যক্তি ছিলেন এবং ছিলেন ঈশ্বরপুরীর শিষ্য।
কৃষ্ণদাস কবিরাজ লিখেছেন,
লোক ঠেলি পথ করে কাশী বলবানে
... প্রভুরে করান লঞা ঈশ্বর দর্শন
লোক ভিড় আগে সব করি নিবারণ।
একে তো কাশীশ্বর সর্বদাই সঙ্গে থাকতেন, তার উপর গর্ভগৃহের বাইরে থাকত অগণিত ভক্ত। এঁদের সকলের মাঝে চৈতন্যদেবকে জোর করে গর্ভগৃহে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না।
চৈতন্যদেব নিজেও একজন বলশালী ব্যক্তি ছিলেন। প্রথমবার জগন্নাথ দর্শনের সময়ে রক্ষীদলের প্রধান অনন্ত প্রতিহারকে তিনি ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন। এই অনন্ত পরবর্তীকালে চৈতন্যদেবের পরম ভক্ত হয়ে পড়েন।
৩। অনন্ত প্রতিহার ছাড়াও জগন্নাথ মন্দিরের বহু পাণ্ডা এবং দায়িত্ববান ব্যক্তি চৈতন্যদেবের অনুগামী ছিলেন।
৪। মন্দিরের করণ হিসেবে কর্মরত তিন ভাইবোন শিখি, মুরারী ও মাধবী মোহান্তি ছিলেন চৈতন্যভক্ত।
৫। কাশী মিশ্র এবং বাসুদেব সার্বভৌমের প্রবল প্রতিপত্তি ছিল মন্দিরে।
৬। সর্বোপরি রামানন্দ রায় ও স্বরূপ দামোদর চৈতন্যদেবকে কখনই একাকী ছাড়তেন না।
৭। পঞ্চসখা ও তাঁদের অনুগামীদের কেউ কেউ চৈতন্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী মনে করলেও আসলে এঁরা চৈতন্যদেবের অতি ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এতোটাই ঘনিষ্ঠতা ছিল যে গৌড়ীয় বৈষ্ণবদল বেশ রুষ্ঠ হয়ে যেতেন চৈতন্যদেবের উপর।
৮। সর্বোপরি মহারাজ প্রতাপরুদ্রের চৈতন্যপ্রীতির কথা সকলের জ্ঞাত ছিল।
‘চৈতন্য শেষ কোথা ?’ বইটিতে ধরে ধরে যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা হয়েছে যে অন্তর্ধানের পরিকল্পনা ছিল স্বয়ং চৈতন্যদেবেরই।
তিনিই এমন পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন যাতে তিনি জীবিত নেই এই ধারনাই প্রচারিত হয়েছিল। অবশ্যই চৈতন্যদেবের ঘনিষ্টরা সবই জানতেন এবং পরিক্লপনার শরিক হিসেবে চুপ করে ছিলেন।
পাঁচ পর্বে বিভক্ত রজতবাবুর বইটি। প্রথম পর্বের শিরোনাম 'ভূমিকা'। এই পর্বের ও সমগ্র বইয়ের অন্যতম ভাস্বর অংশটির subtitle 'নিবিড় পাঠের নির্দেশিকা'। চৈতন্যদেব সংক্রান্ত বইপত্রের এক comprehensive পাঠ্যতালিকা।
বইয়ের দ্বিতীয় পর্বের শিরোনাম, 'নদের নিমাই থেকে সচল জগন্নাথ: কিন্তু তারপর?'। তৎকালীন রাজনৈতিক পটভূমিকার পরিচয় পাওয়া যাবে এই পর্বে। রয়েছে চৈতন্যের জীবনকথার পুঙ্খানুপুঙ্খ। রয়েছে তৎকালীন বাংলার পরিস্থিতি, চৈতন্যের কর্মসূচী, নবদ্বীপ ও গৌড়ের রাজনীতি প্রসঙ্গ। এই পর্বেই পাঠক পরিচিত হবেন ওড়িষ্যার ধর্ম ও রাজনীতি, চৈতন্যের ওড়িষ্যা গমন, দক্ষিণের রাজনৈতিক ইতিহাস, চৈতন্য ও মুসলিম সমাজ ইত্যাদি প্রসঙ্গের সাথে।
এই বইয়ের ভাষ্য তারসপ্তকে উঠছে তৃতীয় পর্বে। পর্বের শিরোনাম, 'হত্যা নয়, অন্তর্ধান'।
প্রকৃতপক্ষে চৈতন্যদেবের তথাকথিত হত্যা/অন্তর্ধান বিষয়ে সাতটি মত বহুল প্রচলিত: - ১) নীলাচলে জগন্নাথ মূর্তিতে লীন হয়ে যাওয়া; ২) শ্রী মন্দিরের মধ্যে নৃত্যরত অবস্থায় পতনজনিত আঘাতে মৃত্যু; ৩) পায়ে ইঁটের আঘাতে সেপ্টিসিমিয়া হয়ে মৃত্যু; ৪) ছদ্মবেশে নীলাচল ত্যাগ; ৫) সমুদ্রের জলে ডুবে মৃত্যু; ৬) নিত্যানন্দের কোলে মাথা রেখে মৃত্যু ও ৭) গুপ্ত হত্যা
এই পর্বটি রজতবাবু বিভক্ত করেছেন সর্বমোট কুড়িটি অধ্যায়ে। প্রত্যেকটি অধ্যায়ে যুক্তির দীপ্তি সহকারে খণ্ডিত করেছেন প্রায় সবকটি প্রচলিত মতামত। এই পর্বের অধ্যায়গুলি দেখে নেওয়া যাক --
৩.১ অন্তর্ধানের ভূমিকা
৩.২ ইঁটের ঘায়ে মৃত্যু নয় কেন?
৩.৩ সমূদ্রে ডুবে মৃত্যু নয় কেন?
৩.৪ বিলীন তত্ত্ব
৩.৫ গুপ্তহ্ত্যা নয় কেন?
৩.৬ গৌড়ীর জীবনীকারদের আশ্চর্য নীরবতা
৩.৭ পঞ্চসখাদের বর্ণন
৩.৮ ঈশ্বর দাসের সংকেত
৩.৯ অম্বিকা চরণের তিন অধ্যায়
৩.১০ প্রতক্ষদর্শীদের বর্ণনায় পার্থক্য
৩.১১ আউল - বাউল - চাউল
৩.১২ অন্তর্ধানের পরিকল্পনা
৩.১৩ অন্তর্ধানের পরিকল্পনার প্ৰয়োজনীয়তা
৩.১৪ পরিকল্পনায় শরিক
৩.১৫ গুপ্তপথের সন্ধানে
৩.১৬ গোবিন্দ বিদ্যাধর দোষী নন
৩.১৭ সেই দিনে গর্ভগৃহে
৩.১৮ আসলে কি হল
৩.১৯ কেবল কি চৈতন্যদেবের অন্তর্ধান হয়েছিল?
৩.২০ একটি আষাঢ়ে গল্প
Profile Image for Riju Ganguly.
Author 37 books1,867 followers
January 8, 2022
ঠিক কী হয়েছিল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু'র সঙ্গে?
অলৌকিক অন্তর্ধান, স্বাভাবিক মৃত্যু, নাকি হত্যাকাণ্ড?
তৃতীয় সম্ভাবনা��ি নিয়ে অজস্র বই আছে— নিচু স্তরের কন্সপিরেসি থ্রিলার থেকে শুরু করে তুহিন মুখোপাধ্যায়ের গবেষণাগ্রন্থ "চৈতন্যের শেষ প্রহর।" সেগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয়ও বটে।
কিন্তু এর বাইরেও কি থেকে যায় কোনো সম্ভাবনা— যা হয়তো যুক্তির নিরিখে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য?
এই অনুসন্ধান, তথা পাঁচশো বছর পুরোনো এক কোল্ড কেসের সবচেয়ে যৌক্তিক তদন্তই লিপিবদ্ধ হয়েছে এই বইয়ের দু'মলাটের মাঝে।
তার শেষে লেখক কী পেয়েছেন?
সেও এক সম্ভাবনাই— যাকে হয়তো আজ আর খতিয়ে দেখার উপায়ও নেই। অথচ... এই বইয়ের যুক্তিক্রম অনুসরণ করলে তাকে আপনি স্রেফ গঞ্জিকাধূম্রসঞ্জাত বলে কিছুতেই উড়িয়ে দিতে পারবেন না।
বরং বইটা পড়ে দেখুন। আমার বিশ্বাস, খোলা মনে পড়লে এটির শেষে নথিবদ্ধ ধারণাটিকেও আপনি উপেক্ষা করবেন না। হয়তো তখন থেকেই শুরু হবে, সত্যের সন্ধানে আপনারও এগিয়ে চলা।
চলুন, এগিয়ে যাই।
Displaying 1 - 2 of 2 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.