বুঝে দেখ জটায়ুর কলমের জোর,
ঘুরে গেছে রহস্য কাহিনীর মোড়।
থোর বড়ি খাড়া
লিখে তাড়া তাড়া,
এইবারে লিখেছেন খাড়া বড়ি থোর।
হাসবেন না। একদম হাসবেন না। লোকে ভাবে আমার বুঝি কালীপদ মুখুজ্জের সাথে পুরোনো কোনো শত্তুরতা রয়েছে। বা সৌমিক দের পৃথিবীর প্রতি কোনোরূপ বিশ্রী বিরূপতা। সেরম যে আদতে কিছু নাই, সেই কথা কাউকে বিশ্বাস করানো দায়। আপনি বলবেন, ভুলভাল (সত্যজিৎ বিরচিত) লিমেরিক দিয়ে রিভিউ করছেন, এক-দুই তারকা রেটিং দিচ্ছেন। এখন আবার পালটি খাচ্ছেন। আপনি তো মশাই হাড় বজ্জাত মানুষ!
কথাটা কিছুটা হলেও সত্য। তবে পাঁকে ফোঁটা পদ্মকুঁড়ি ন্যায়, অসত্যের মাঝেই সত্যের নিবাস। বিদ্বেষ পুষে রাখলে, গাঁটের পয়সা খরচ করে, বারংবার এই জিনিস পড়তুম না। পড়ি, কারণ লেখক আর যাই করুন, দেশজ উপাদানে, গ্রাম্য মনোভাবটুকু ধরতে জানেন। বাংলার আচার, আচরণ, বিশ্বাস, অবিশ্বাস। খাঁটি গদ্য ও দ্রুত লয়ে, পড়তে সবটাই ভালো লাগে। সিরিজের দ্বিতীয় বই হওয়ার দরুন, লেখনীতে পরিপাকের ছাপ বিদ্যমান। এটাও অদেখা করা যায় না একেবারে।
তবে, মুশকিল অন্যখানে। শেষবার যখন কালীগুনীন পড়ি। বিরক্তিতে রিভিউ লেখার ইচ্ছা হয়নি আর। কেবল ইংরেজিতে একটা শব্দ ব্যবহার করেই ইতি টানি। রিপিটেটিভ। লেখকের খাড়া বড়ি থোর। পুনরাবৃত্তির বিশ্রী প্রবণতা। 'কিস্তিমাত' জুড়ে পাঁচটি গল্প। এবং দুঃখের কথা, প্রথম তিনটে কাহিনীতেও সেই একই জিনিস। সেই একই ঘটনাক্রম, আবার! আর কতো? অভিশাপগ্রস্ত কোনো গাঁ বা পরিবার, তান্ত্রিক কি রাক্ষসের ভয়ানক তান্ডবনৃত্য, নৃশংস রক্তাক্ত মৃত্যু, কালীপদর লেট এন্ট্রি, "বন্ড জেমস্ বন্ড", ছলনা/ইতি গজ, তন্ত্র-মন্ত্র ম্যাডনেস্, সমাপ্তি। ছকে বাঁধা সার্কাস যেন।
ফেসবুকে যারা কালীকে তারানাথের উত্তরসুরী হিসেবে প্রতিনিয়ত সিংহাসনে বসান, তাদের প্রতি বাণ-টাণ নিক্ষেপ করতে মন চায় আরকি। তবে, আমার বিশ্বাস, লেখক নিজেও এসব বাজে তুলনার ধার ধারেন না। কারণ, এই গল্পগুলিতে তান্ত্রিক কাহিনীর উপাদান ঠুসে মজুদ হলেও, উৎকৃষ্ট হররের গুণাবলী নেই বললেই চলে। ভয় দেখানোর অতি উদগ্রীবতা হেতু, কার্টুন-মাফিক সব খলচরিত্র এবং উগ্র রাক্ষুসে উষ্টুম-ধুষ্টুমের সাহায্য নিয়ে হাস্যকর পর্যায়ে পৌঁছে যান লেখক। এ জিনিসকে হরর না বলে, কোনও হালকা চালের, পিরিয়ড পিস/পৌরাণিক ফ্যান্টাসি হিসেবে ক্লাসিফাই করলেও করা যেতে পারে।
তবে, সবই যে খারাপ, তেমনটা নয় কিন্তু। বইয়ের চতুর্থ গপ্পো, 'পিশাচের নখ'। শুরু হয় চমৎকার ভাবে। লেখক ছক ভাঙেন। দেন কথক ও কালীগুনীনের বন্ধুত্ত্ব ও বাৎসল্যের মনোরম নিদর্শন। পাঠকের কৌতূহল পকেটস্থ করে, প্রায় অভিযানমূলক ভাবে গল্প নিয়ে যান সুন্দরবনের এক ভয়াল দ্বীপে। এবং...এখানেই টাইটানিক ন্যায় ডুবে যায় তরী। অতি-প্রলম্বিত ন্যারেটিভে, কষ্টকল্পিত রেজোলিউশনে শিকার কাহিনী। সাধারণ তান্ত্রিক থেকে কালীপদ হয়ে ওঠেন সাক্ষাৎ হাতিম-তাই!
আপনি বলতেই পারেন, তাহলে, দুই তারা হোয়াই? শূন্য রানে চার উইকেট হারিয়ে, অবস্থা কাহিল হওয়ার কথা। তবে, কেন ক্রিজ আঁকড়ে পড়ে থাকা? ঠিক এখানেই, লেখক ম্যাচ বাঁচানোর তাগিদে শেষ একটা ইনিংস খেলেছেন। এমন এক ইনিংস যা প্রায় একা হাতে বইটির রেটিং দুই কি আড়াইয়ে টেনে এনেছে। ধন্যি, রায়দীঘড়ার অকাল্ট গোয়েন্দা! ইনিংসের নাম, 'কালীগুনীন এবং পঞ্চবান রহস্য'। বইয়ের শেষ ও বৃহত্তম কাহিনী। প্রায় ৯০ পাতার, ছোটখাট উপন্যাস সমান।
ভালোভাবে, ছক-ভেঙে, পর্যাপ্ত ভাবনাচিন্তার সাহায্যে লিখলে যে এই সিরিজের কাহিনী আসলে কতটা উপাদেয় হয়ে উঠতে পারে, সেই সম্ভাবনার চূড়ান্ত নিদর্শন। শেষ রাতে নিয়ে বসলে, এই জিনিসে যে গা-ছমছম করবে না, সেটা বলা দায়। তাই আর কোনো গল্প না পড়লেও, পঞ্চবানে একটিবার বিদ্ধ হতেই পারেন। কেবল আক্ষেপ, এই একটি ভালো গল্প পেতে, আমায় দশটি বাজে গল্প পেরিয়ে আসতে হলো। যা প্রায় কংক্রিটের সমুদ্রে সাঁতরানোর সমান। কি আর বলি...
(২/৫)