প্রাথমিকে পড়া ‘ প্রার্থনা' কবিতাটা মনে পড়ে? যে কবিতাটা শুরু হয়েছিল এভাবে ‘ অনন্ত অসীম প্রেমময় তুমি, বিচার দিনের স্বামী'? প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছন্দে ছন্দে আল্লাহর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া সেই কবিতার কবি ছিলেন গোলাম মোস্তফা। তবে এবারের কাজটা আরও ব্যাপক। সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল হযরত মুহাম্মদ (স.) এর জীবনের সাথে তিনি পরিচয় করিয়ে দিতে চেয়েছেন আমাদেরকে।
বইটা দুইটা খন্ডে বিভক্ত। প্রথম খন্ড বিশ্বনবীর জীবনের ঘটনাবলীর ধারাবাহিক বর্ণনা। তবে এতেও লেখকের পাণ্ডিত্যের ছাপ আছে। তিনি শুধু ঘটনার পরপর বর্ণনাই দেন নি, তিনি প্রতিটা ঘটনার বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কেন নবীর জীবনেই সেসব ঘটনা ঘটল, সেসব ঘটনা কিভাবে তাঁকে ‘নবী’ হতে সাহায্য করল, তাঁর উম্মতের জন্য তা কিভাবে আদর্শ স্থাপন করে গেল। তাইতো তিনি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন বিশ্বনবীর এতিম হওয়ার কারণ, তাঁর অপুত্রক হওয়ার প্রয়োজনীয়তা, ধনী খাদিজা ( রা.) এর সাথে তাঁর বিবাহ হওয়ার প্রেক্ষাপট, সিনা চাক বা মিরাজের প্রয়োজনীয়তা, তাঁর বহু বিবাহের তাৎপর্য, খন্দকের যুদ্ধে মাটি কাঁটার গুরুত্ব, মা আয়েশার ( রা.) নামে অপবাদের ঘটনা বা বদরের ও হোনায়েন যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের শিক্ষণীয় দিকটা। এভাবে প্রথম খন্ড জুড়ে লেখক তৎকালীন আরবের অবস্থা ও বিভিন্ন ধর্মের ধর্মগ্রন্থে বিশ্বনবীর আগমণের ভবিষ্যদ্বাণীর দিকটা আলোচনার পাশাপাশি তাঁর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের ঘটনাবলী ব্যাখ্যাসহ বর্ণনা করেছেন।
বইয়ের আকর্ষনীয় দিকটা হলো এর দ্বিতীয় খন্ড। দ্বিতীয় খন্ড মূলত লেখকের কিছু প্রবন্ধের সংকলন যেগুলোতে তিনি নবীর জন্ম তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি, তাঁর বহুবিবাহের তাৎপর্য, মিরাজের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, ‘নবী আমাদের মতো মানুষ’ দাবির সমালোচনা, নবীর মুহাম্মদ ও আহমদ নামের তাৎপর্য ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরেছেন। এসবের মধ্যে স্বাভাবিক, অস্বাভাবিক ও অতিস্বাভাবিকের আলোচনার মাধ্যমে নবীর মানুষ হওয়ার দিকটার ব্যাখ্যা এবং নবীর মুহাম্মদ ( চরম প্রশংসিত) ও আহমদ ( চরম প্রশংসাকারী) নামের ব্যাখ্যা সম্বলিত প্রবন্ধগুলো ভীষণ ভালো লেগেছে। লেখক সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন স্বাভাবিকতা একধরনের ভ্রান্তি, এটা আমাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু নয়। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের অভিজ্ঞতার বাইরে কেন কোনোকিছু বিশ্বাস করতে চাই না সেটা স্পষ্ট করেছেন। নবী কি মুহাম্মদ ছিলেন বা আহমদ ছিলেন শীর্ষক প্রবন্ধগুলো আমার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা ; পূর্বে কখনও এধরনের কোনো আলোচনা শোনা বা পড়ার সুযোগ হয় নি। বিজ্ঞান দিয়ে ধর্ম প্রমাণের বিষয়টা আমার কাছে বরাবরই অপ্রয়োজনীয় মনে হয়, তাইতো মিরাজের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সম্বলিত প্রবন্ধটা ততটা ভালো লাগে নি। তবু লেখক যেভাবে আইনস্টাইনের তত্ত্বগুলোর সহজবোধ্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন সেগুলো দারুণ ছিল।
তথ্য ও তত্ত্বের প্রাচুর্যতা ছাড়াও লেখকের দারুণ ভাষা শৈলী ও তাঁর পড়ার গভীরতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। লেখক নিজে কবি হওয়ায় এবং নবীর প্রতি তাঁর প্রগাঢ় ভালোবাসা থাকায় বর্ণনাভঙ্গি হয়েছে অতি সুস্বাদু। প্রেমিকসুলভ আবেগ এবং লেখকসুলভ রেফারেন্স থাকায় বইটা পড়া গিয়েছে কোনো বাঁধা ছাড়াই। লেখকের পড়ার ব্যাপ্তিটাও লক্ষ্য করার মতো। বাংলা, আরবি ও ইংরেজিতে নবীর জীবনালেখ্য তো পড়েছেনই, বিভিন্ন ধর্মের ধর্মগ্রন্থও বাদ যায় নি তাঁর পাঠ্যতালিকা থেকে। বইয়ের শেষে বিবলিওগ্রাফি অংশটা পরবর্তী পড়াশোনাকে সহজ করবে।
মোটের উপর চার শতাধিক পৃষ্ঠার বইটা পড়ে মুগ্ধ-ই হয়েছি বলা যায়। গুটিকয়েক সীরাত পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার ; তাদের মধ্যে এটা যে সেরা সেটা বলতে সঙ্কোচ নেই। বইটা এমনভাবে লেখা যে প্রতিটা মুসলমান তো বইটা পড়তে পারবেন-ই ( এবং পড়া আবশ্যক বলে মনে করছি!), নবী সম্পর্কে জানতে ইচ্ছুক যেকোনো অমুসলিমও বইটা পড়তে পারবেন বিনা দ্বিধায়।