১৯৯৫ সাল। আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। আমাদের স্কুল লাইব্রেরিতে একটা বিবর্ণ, ছেঁড়া, ধুলোয় ছেয়ে যাওয়া বই ছিল — মাঝে সোনালী হরফে হঠাৎ জেগে থাকা এক নাম: H. P. Lovecraft। প্রথম পড়া গল্পটা ছিল The Rats in the Walls।
সে রাতে আমি ঘুমোতে পারিনি। আতঙ্কে নয়, বরং এমন ভাষা আগে পড়িনি—যেটা simultaneously both distant and intimate লাগে। যেন আমি অন্য কারও দুঃস্বপ্নে ঢুকে পড়েছি, এবং সেই স্বপ্ন আমাকে নিজের ভাষায় কিছু বোঝাতে চাইছে।
তিন দশক পরে, সেই স্বপ্ন ফের ফিরে এল—এইবার বাংলায়—“ভয়াল রসের সম্রাট: এইচ. পি. লাভক্র্যাফট – শ্রেষ্ঠ বারোটি রচনা” বইটির মাধ্যমে। কল্পবিশ্ব প্রকাশিত এই সংকলনে লাভক্র্যাফটের নির্বাচিত বারোটি লেখা, সাথে বিস্তৃত ভূমিকা, সম্পাদকীয় টীকা, অনুবাদকের স্মরণলিপি—এ যেন শুধু অনুবাদ নয়, এক প্রকার সাহিত্যিক séance।
প্রথমেই বলা ভাল যে এই কাজটি অত্যন্ত সাহসী। লাভক্র্যাফটের ভাষা — ঐশ্বর্যময়, ধীর, এবং মেটাফিজিক্যাল আতঙ্কে পরিপূর্ণ— translator's nightmare বলা চলে।
লাভক্র্যাফটের ভাষা বিখ্যাতভাবে জটিল, প্রাচীনধর্মী এবং অলঙ্কারময়—যা একদিকে যেমন তাঁর রচনায় গাঢ় আবহ সৃষ্টি করে, অন্যদিকে পাঠকের কাছে তা হয়ে ওঠে দুরূহ ও চ্যালেঞ্জিং।
নিচে তাঁর ভাষার জটিলতার কয়েকটি দিক ব্যাখ্যা করা হলো—
১. প্রাচীন ও দুর্বোধ্য শব্দভান্ডার: লাভক্রাফট প্রায়শই এমন সব শব্দ ব্যবহার করেছেন যেগুলো তাঁর যুগেই ছিল অপ্রচলিত বা প্রাচীন ধাঁচের। যেমন:
eldritch (অলৌকিক, ভীষণ)
gibbous (স্ফীত, বিশেষত চাঁদের বর্ণনায়)
cyclopean (প্রাচীন ও বিপুল)
rugose (কুঞ্চিত, কুঁচকানো)
squamous ( আঁশযুক্ত )
antediluvian (প্রাক-প্রলয় যুগের, অতি প্রাচীন)
এই শব্দগুলো তাঁর রচনাকে প্রাচীন কাব্যিকতা এবং পৌরাণিক মহিমায় পূর্ণ করলেও আধুনিক পাঠকের কাছে তা হয়ে দাঁড়ায় একধরনের বাধা।
২. দীর্ঘ, বক্র ও ছন্দহীন বাক্যগঠন: লাভক্রাফট প্রায়ই বহু উপবাক্য, সেমিকোলন, এবং বন্ধনীর মধ্যবর্তী বিবরণে পূর্ণ দীর্ঘ বাক্য রচনা করেন। যেমন —
“It is true that I have sent six bullets through the head of my best friend, and yet I hope to show by this statement that I am not his murderer.”
এ ধরনের বাক্য পাঠে একদিকে উদ্বেগ ও আতঙ্কের আবহ তৈরি করে, অন্যদিকে পাঠের গতি ধীর করে দেয়, বোঝার ক্ষেত্রে অসুবিধা সৃষ্টি করে।
৩. বিমূর্ত ও অস্পষ্ট বিবরণ: তিনি প্রায়শই বিষয়বস্তুর স্পষ্ট বর্ণনার বদলে ইচ্ছাকৃত অস্পষ্টতা বজায় রাখেন, যাতে ভয় আরও গভীরতর হয়। যেমন—
“...a thing which could not be described—there is no language for such abysms of shrieking and immemorial lunacy, such eldritch contradictions of all matter, force, and cosmic order.”
এই ধরনের নাকচ করে দেওয়া (negation) ও অস্পষ্ট রূপায়ণ তাঁর cosmic horror-এর অজ্ঞেয়তাকে জোরালো করে তোলে।
৪. উদ্ভাবিত শব্দ ও মিথজগতের পরিভাষা:লাভক্র্যাফট নিজেই উদ্ভাবন করেছেন নানা নাম—Cthulhu, Azathoth, Yog-Sothoth—এবং স্থান—R’lyeh, Arkham ইত্যাদি। এইসব উচ্চারণ-অদ্ভুত নাম পাঠকের মনে এক প্রকার অচেনা, বহির্জাগতিক অনুভব তৈরি করে।
৫. অতিরিক্ত বিশেষণ প্রয়োগ: তিনি পরিবেশ ও আবহ গঠনের জন্য বিশেষণের উপর অনেক বেশি নির্ভর করেন। যেমন—
hideous (বীভৎস)
blasphemous (ধর্মবিরোধী)
gibbering (অবোধ্য বকবকানি)
fungous (ছত্রাকসদৃশ)
noisome (দুর্গন্ধযুক্ত)
daemoniac (অশুভ প্রেতসুলভ)
এই পদ্ধতি তাঁর গথিক, আতঙ্কময় রীতিকে জোরালো করে তুললেও কোথাও কোথাও তা অতিনাটকীয় বা ভারী হয়ে ওঠে।
৬. বর্ণনাকারীর দূরত্ব ও পুরাতাত্ত্বিকতা: তাঁর গল্পের বর্ণনাকারীরা সাধারণত হন কোন পণ্ডিত, ইতিহাসবিদ, বা নির্জনবাসী, যারা ঘটনাগুলো ঘটার অনেক পরে তা পুনরায় বর্ণনা করেন। যেমন—
“I have examined maps of the city with the greatest care, yet have never again found the Rue d’Auseil.”
এই ভঙ্গিতে যেমন এক ধরনের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং রহস্য তৈরি হয়, তেমনই পাঠককে গল্পের ঘটনার থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
সুতরাং, লাভক্র্যাফটের এই জটিল ভাষা আদতে একটি সচেতন শিল্পরীতি — যার লক্ষ্য এক এমন মহাজাগতিক বাস্তবতার সৃষ্টি, যা মানব চেতনার আওতার বাইরে—নিরাসক্ত, বিস্তীর্ণ, এবং নির্মম। যদিও এই ভাষা অনেক সময় প্রবেশযোগ্য নয়, তবুও এই স্টাইলই তাঁর আতঙ্কের সাহিত্যকে অনেক পাঠকের কাছে এতটা প্রভাবশালী করে তোলে।
কিন্তু দীপ ঘোষ, সন্তু বাগ, এবং কল্পবিশ্বের অনুবাদকদল সেই দুঃস্বপ্নকে বাংলার মিষ্টি ভোরের আবেশে নিয়ে এসেছেন পাঠকের জন্য — ভয়কে শব্দে রূপ দিয়েছেন, শব্দকে রূপকের চেয়েও গা ছমছমে করে তুলেছেন।
লাভক্র্যাফট নিজেই লিখেছিলেন— “The oldest and strongest emotion of mankind is fear, and the oldest and strongest kind of fear is fear of the unknown.”
এই "অজানার ভয়" বাঙালির মনোজগতে খুবই প্রাসঙ্গিক—জলের নিচে কি আছে, শ্মশানের পাশে কে হেঁটে যায়, বা পূর্বপুরুষের অভিশাপ আজও কি কানে ফিসফিস করে? বাংলার ভূগোলেই যেন লাভক্র্যাফট জন্ম নিতে পারতেন।
'ডেগন' গল্পটি বাংলায় পড়ে মনে হল, এটি তো সেই জলদেবতা—যার উপাসকরা যমুনার তীরে ঘর বাঁধে। The Shadow Over Innsmouth অনুবাদ 'ইন্সমাউথের ইশারা'-তে যেন খুলে গেল হুগলি-তীরবর্তী কোনও পুরনো নগরের গোপন দরজা—যেখানে মানুষ আর মাছের মধ্যবর্তী কোনো জাতি এখনও নিঃশব্দে নিশ্বাস ফেলে।
লাভক্র্যাফটকে প্রায়শই তুলনা করা হয় পো, কাফকা, বা এম. আর. জেমস-এর সঙ্গে। তবে তিনি তাঁদের সকলের চেয়ে আলাদা—পো-এর ভয় ব্যক্তিগত, কাফকার ভয় আমলাতান্ত্রিক, কিন্তু লাভক্র্যাফটের ভয় কসমিক, নিষ্ঠুর, এবং অতীত-ভবিষ্যৎকে একাধারে গ্রাস করে।
“We live on a placid island of ignorance in the midst of black seas of infinity…”
এই black seas of infinity-র প্রতিধ্বনি আমি শুধু লাভক্র্যাফটে পাই না—বোর্হেস-এর লেখা, বিশেষ করে The Aleph পড়লেও মনে হয় এই একই 'চিহ্নিত অজানার' মুখোমুখি হচ্ছি।
আর Hypnos গল্পটির বাংলা অনুবাদ যখন পড়ছিলাম, মনে পড়ছিল Dostoevsky—বিশেষ করে Notes from Underground—যেখানে সত্তার একাকীত্ব, বাস্তব আর স্বপ্নের ধ্বংসাবশেষে দাঁড়িয়ে থেকেছে।
লাভক্র্যাফট যদি আমাদের বলেন — “That is not dead which can eternal lie, and with strange aeons even death may die,” তবে দস্তয়েভস্কিও যেন বলেন —জীবনটাই এক perpetual unburial।
এই সংকলনের অনুবাদগুলি শুধু শব্দে অনুবাদ নয়—রস এবং রন্ধ্রে অনুবাদ। The Hound বা The Moon-Bog পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, এইসব গল্পের জন্য বাংলার অলংকারময়তা, তার পৌরাণিক শব্দভাণ্ডার আদর্শ।
বিশেষ করে বিশ্বদীপ দে, সুমিত বর্ধন, এবং অন্যান্য অনুবাদকদের কাজ একেবারেই মুখস্থ অনুবাদ নয়। লাভক্র্যাফটের আড়ষ্ট, ভারি ইংরেজি স্ট্রাকচারের জায়গায় এসেছে ছন্দময় কিন্তু ক্লান্তিহীন বাংলা, যেখানে প্রতিটি বাক্য পড়তে পড়তে এক ধরণের অস্বস্তিকর মুগ্ধতায় মন ডুবে যায়।
এমনকি লাভক্র্যাফটের যে একরকম “excessive over-description” বলা হয়— “...a mountain walked or stumbled...” সেই imagery-টাও বাংলা শব্দে, সঠিক টোনে, যথার্থ সঞ্চারিত হয়েছে।
বইটি হাতে নিলে বোঝা যায়, এ শুধু পাঠ্য নয়, সংগ্রহযোগ্য। প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে ফন্টের বিন্যাস, পাদটীকার সংযোজন, ভূমিকাগুলির গবেষণামূলক স্বর—সব মিলিয়ে এটি এক “সম্মিলিত শিল্পকর্ম”।
এমনকি ভূতের গল্প অনুরাগীরা, যারা Abraham Merritt, Algernon Blackwood কিংবা Arthur Machen পড়েছেন, তারাও এখানে আত্মীয়স্বজনের গন্ধ পাবেন।
যারা লাভক্র্যাফট কখনও পড়েননি—তাঁদের জন্য এই বইটি এক আদর্শ beginning point। যারা আগে পড়েছেন—তাঁদের জন্য এটি এক পুনর্জন্ম।
“The most merciful thing in the world… is the inability of the human mind to correlate all its contents.”
এখন বাংলা ভাষাতেই সেই অসম্পূর্ণ, ব্যাখ্যাতীত, অথচ অলঙ্ঘ্য আতঙ্ক প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
খুলে দেখবেন নাকি বইটা?
তাহলে শুনবেন, দূর থেকে কেউ বলছে, ph’nglui mglw’nafh Cthulhu R’lyeh wgah’nagl fhtagn.
এবং এবার সেই ডাক, বাংলাতেই।
অলমতি বিস্তরেণ।