বদরুদ্দীন উমরের "যুদ্ধোত্তর বাঙলাদেশ" গ্রন্থের একটি ইতিহাস মূল্য রয়েছে দুইটি কারণে। এক. এই বইয়ের সকল প্রবন্ধ ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সালে তৎকালীন প্রেক্ষাপটে রচিত। দুই. বঙ্গবন্ধু শাসনামল নিয়ে এদেশে যে মিথ তৈরি হয়েছে তা ভেঙে সত্যিকার পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করবে এই গ্রন্থ।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেই অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, বাংলাদেশ কোনো মার্কিন সাহায্য নেবে না। কঠোর ভাষায় ক্ষমতাসীন দল সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করেছিল। রাজনৈতিক বুলি হিসেবে সাম্রাজ্যবাদকে গালাগালি দেওয়া ছিল ষাট ও সত্তরের দশকের স্মার্টনেস। কিন্তু সদ্য শত্রুমুক্ত ধ্বংসপ্রায় একটি দেশের শাসকগোষ্ঠীর সাম্রাজ্যবাদের মোকাবিলা করার জন্য যে পরিমাণ সৎসাহস ও নৈতিকতা দরকার তা পর্যাপ্ত ছিল না। তাই অচিরেই সাম্রাজ্যবাদের ঈশ্বর যুক্তরাষ্ট্র পিএল-৪৮০ ছদ্মবেশে এদেশে অবতরণ করলো। আমরা তখন রাষ্ট্রীয়ভাবে মার্কিনিদের সাহায্য নিচ্ছি, অথচ গলাবাজিতে তুলোধুনো করছি সাম্রাজ্যবাদকে। বদরুদ্দীন উমর এই দ্বিচারিতা নিয়ে লিখেছেন,
" ‘মার্কিন সাহায্য শর্তহীন’, শর্তযুক্ত সাহায্য আমরা নেবো না ইত্যাদি বলে বাঙলাদেশ সরকার যতই চিৎকার করুন, আমরা জানি মার্কিন সাহায্যের এই আলিঙ্গনের অর্থ কি। সেদিক দিয়ে ‘কড়ি নেবো অথচ প্রেম দেবো না’—বাঙলাদেশ সরকারের এই হাস্যকর ঘোষণা ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়। "
কোনো রাষ্ট্রকে সমাজতান্ত্রিক ঘোষণা করলেই তাতে সমাজতন্ত্র কায়েম হয়ে যায় না। সমাজতন্ত্র সরকারি বিষয় নয়, বরং সকল শোষিত শ্রেণির স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমেই একটি রাষ্ট্র সমাজতন্ত্রের মহাসড়কে চলার পাথেয় জোগায়। কিন্তু সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র হয়েগিয়েছিল একটি রাষ্ট্রীয় বুলির মতো। যেমন- সমাজতন্ত্রের পয়লা পদক্ষেপ হিসেবে সকল শিল্পকে জাতীয়করণের কথা বলা হলো। অর্থাৎ এদেশে সমাজতন্ত্র মানে সকল শিল্প রাষ্ট্রের মালিকানায় নিয়ে আসা। নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু মজার ব্যাপার এই যে সকল শিল্প, ব্যাংক-বিমাকে জাতীয়করণ করা হয়নি। শুধু পশ্চিম পাকিস্তানিদের ফেলা যাওয়া ও এদেশের গুটিকয় বাঙালির প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করা হয়েছিল। কোনো মার্কিন ও ব্রিটিশ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে নব্য "সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র" স্পর্শ করার দুঃসাহস দেখায়নি। এই অদ্ভুতুড়ে সমাজতন্ত্র নিয়ে বদরুদ্দীন উমরের মন্তব্য,
"আওয়ামী লীগ সরকারের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বোল-চাল যে নিতান্তই ভণ্ডামি সেটা হাতেনাতে প্রথম ধরা পড়েছিলো তাদের জাতীয়করণ কর্মসূচী ঘোষণার সময়। এই ঘোষণার অনেক দেশীয় শিল্প এবং ব্যাঙ্ক-বীমা সরকার নিজের হাতে নিয়ে এলেও বৃটিশ-মার্কিন শিল্প, ব্যাঙ্ক, বীমা ইত্যাদিকে তাঁরা ‘পবিত্র’ জিনিস হিসেবে বিবেচনা করে সেগুলিকে জাতীয়করণ কর্মসূচীর আওতার বাইরে রেখেছিলেন। সাম্রাজ্যবাদী সাহায্যের প্রতি বাঙলাদেশ সরকার এবং তাদের পরিকল্পনাবিদদের লোলুপ দৃষ্টি তখনই ধরা পড়েছিলো। "
জাতীয়করণ ছাড়াও তৎকালীন সরকারের আরও একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হিসেবে জমির ১শ বিঘা সিলিং নির্ধারণ ও ২৫ বিঘা পর্যন্ত খাজনা মওকুফকে আজও প্রচার করা হয় ব্যাপক ভাবগাম্ভীর্য সহকারে। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের পূর্বে কমপক্ষে দুইবার জমির সিলিং ঠিক করে দেওয়া হয়েছিল৷ প্রথমবার নুরুল আমিনের আমলে পরিবারপ্রতি ১শ বিঘা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। দ্বিতীয়বার সিলিং ঠিক করে দেওয়া হয়েছিল আইয়ুবের আমলে। মোটকথা, জমির ১শ বিঘা সিলিং নির্ধারণ নয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। বরং পাকিস্তান আমলেই এর নজির ছিল৷ বাকি রইল জমির ২৫ বিঘা পর্যন্ত খাজনা মওকুফ। খাজনা মওকুফ দরিদ্র চাষীর জন্য কোনো আশীর্বাদস্বরূপ ছিল না। জমির খাজনা মওকুফ করে সরকার সারের দাম বৃদ্ধি করেছিল কিংবা সারের দাম বেড়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ খাজনা মওকুফের সুফল কৃষক পায়নি। বদরুদ্দীন উমরের ভাষায়,
" বিঘাপ্রতি সার প্রয়োজন হয় এক মণের মতো। এই সারের মূল্য সরকারীভাবে এখন শতকরা একশো ভাগের মতো বৃদ্ধি করা হয়েছে। সব থেকে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত সার ইউরিয়ার মূল্য পূর্বে ছিলো মণপ্রতি দশ টাকা। এখন তার দাম বেঁধে দেওয়া হয়েছে বিশ টাকা। এই ফল দাঁড়াচ্ছে এই যে, বিঘাপ্রতি তিন টাকা খাজনা বাবদ টাকা দিতে না হলেও সারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে কৃষককে বিঘাপ্রতি বেশী দিতে হচ্ছে দশ টাকা। অর্থাৎ যোগ-বিয়োগ করে দেখলে বিঘাপ্রতি কৃষককে দিতে হচ্ছে পূর্বের তুলনায় বেশি। "
বঙ্গবন্ধু শাসনামল এক বছরের কম সময়ের মধ্যে জাতিকে একটি সংবিধান উপহার দেওয়াকে বিরাট কৃতিত্ব হিসেবে তখনো প্রচার করা হয়েছিল এবং এখন এই প্রচার শতগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি একটি গৌরবময় অর্জন তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু যেভাবে মহিমান্বিত করা হয়েছে আদৌ কী তা সঠিক ছিল? বদরুদ্দীন উমরের মতে, শাসনতন্ত্র তাড়াতাড়ি দেওয়াতে বিশেষ গৌরবের কিছু ছিল না। পাকিস্তানে ছিল একটি জটিল রাষ্ট্রকাঠামো। অমীমাংসিত ইস্যু, সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো রাজনৈতিক দল না থাকা ছাড়াও অভ্যন্তরীণ আরও সমস্যায় জর্জরিত ছিল দেশটি। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশকে রাষ্ট্র গঠন ব্যতীত অন্যান্য ঝামেলা পোহাতে হয়নি। সাধারণত শাসনতন্ত্র সংসদে পাশের আগে তিন দফায় আলোচনা হয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় দীর্ঘ আলোচনা-সমালোচনা করা হয়। কিন্তু এদেশে সংবিধান পাশ হয়েছে নিমিষেই। বদরুদ্দীন উমর মনে করেন, সংসদে যা হয়েছিল তাকে কোনো অর্থেই আলোচনা বলে চালানো যায় না।
পাকিস্তান আমলে সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত দল আওয়ামী লীগ। দলটি পাকিস্তান আমলের যে-কোনো কালা কানুনের বিপক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিল। স্বাধীন দেশে পূর্বেকার নিবর্তনমূলক আইন বাতিল করা হবে - এমনটা ভাবাই স্বাভাবিক। গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের জন্য আইয়ুবের আমলে প্রেস আ্যন্ড পাবলিকেশন আ্যক্ট জারি করা হয়েছিল সরকারের বিরুদ্ধে একটু আওয়াজ করলেই 'কক করে' ঘাড় ধরে শায়েস্তা করা হতো। আইয়ুবের এই কালা কানুনটি আওয়ামী লীগের শাসনামলেও ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল। ১৯৭৩ সালে নয়া অডিন্যান্স জারি করা হয়। সেই নয়া আইনখানা ছিল নতুন বোতলে পুরোনো মদ। বঙ্গবন্ধুর আমলে বেশকিছু সংবাদপত্রকে বন্ধ করে দেওয়া হয় ( চতুর্থ সংশোধনীর আগেই)। বদরুদ্দীন উমর সরকারের রোষানলে পতিত সংবাদপত্রগুলোর নামোল্লেখ করেছেন। কিন্তু কী ধরনের সংবাদ প্রকাশের জন্য সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতো তা উল্লেখ করেননি। করলে স্পষ্টভাবে সত্যাসত্য বোঝা যেতো। মোটকথা, গণমাধ্যমের "ব্যাপক স্বাধীনতা ছিল" বলে যে প্রচার আমরা শুনতে পাই, তা শতভাগ সত্য নয়। বরং কেউ এর বিপরীত দাবি করলে তাকেও নির্জলা মিথ্যুক আখ্যা দেওয়া কঠিন হবে।
এদেশে নির্মোহ সমালোচক সাধারণত জন্মান না। যারা সমালোচনা করেন, তারা অপরপক্ষকে ঘোরতর শত্তুর জ্ঞান করেন। তাই সমালোচনা অনেকক্ষেত্রে ঈর্ষাপ্রসূত বক্তব্য কিংবা গিবতের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এখানেই বদরুদ্দীন উমরের সাফল্য। তিনি বঙ্গবন্ধুর শাসনামলকে ঘিরে প্রতিটি সাফল্যকে নিরীক্ষণ করেছেন যুক্তিতর্ক ও তথ্যের ভিত্তিতে। এমনটা নিঃসন্দেহে বিরল।
তবু শতভাগ সততা বদরুদ্দীন উমর দেখাতে পারেননি। দুইটা উদাহরণ দিই- এক. ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বরের লেখায় তিনি মুক্তিযুদ্ধকে বোঝাতে "গৃহযুদ্ধ" শব্দটি ব্যবহার করেছেন৷ পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে বেশুমার জনতার আত্মাহুতি কীভাবে স্রেফ গৃহযুদ্ধ হয় তা বোধগম্য হয়নি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ��যাপক বদরুদ্দীন উমর গৃহযুদ্ধ বনাম মুক্তিসংগ্রামের পার্থক্য জানেন না এটি হতে পারে না। বিদ্বেষপ্রসূত হয়ে দেশের শ্রেষ্ঠ অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ভালো লক্ষণ নয়। দুই. ১৬ ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ওসমানির অনুপস্থিতিকে তিনি অস্থায়ী সরকারের পরাজয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বদরুদ্দীন উমর কী জানতেন না ওসমানী একটি স্বাধীন দেশের সেনাপ্রধান। আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানে ভারতীয় সেনাপ্রধান উপস্থিত ছিলেন না। তাহলে প্রটোকল সচেতন ওসমানী কেন উপস্থিত থাকবেন? পণ্ডিতমূর্খের মতো সমালোচক গ্রহণ করা কঠিন।
"যুদ্ধোত্তোর বাঙলাদেশ" অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। কিছু একচোখামি সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু শাসনামল নিয়ে প্রচলিত প্রচারণাকে ফ্যাক্ট ও যুক্তিতর্কের কামানের মুখে গোলা মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন লেখক। বাংলাদেশের পাঠকদের অবশ্যই পড়া উচিত।