আপনজনার লেখা নিয়ে কিছু বলতে বসলে, সবচেয়ে বেশি অসুবিধে হল নির্বিকার পাঠকসত্ত্বাকে ঠেলে ফেলে গুঁতিয়ে জায়গা করে নিতে চায় এক বুক ভালোবাসা। সইয়ের সাথে টুকটাক কথা বিনিময়, পুটুর পুটুর খিল্লি, অবরে সবরে মনের কথার আদানপ্রদান আর বইমেলায় নিয়মিত লোকেদের আমাদের দুজনকে গুলিয়ে ফেলার বিপর্যয় - এই সব মিলিয়ে আমার আপনজনার জন্য নির্দিষ্ট অন্দরমহলে একখানা নিজস্ব ঘর বাগিয়ে ফেলেছেন মহিলা।
কিন্তু আমি যে এদিকে ত্যাঁদড় পড়ুয়া। ভালো না লাগলে সেরেফ মুখের ওপর বলে দেব ভাল্লাগেনি। কাজেই খুব ভয়ে ভয়ে, নানা বাহানায় দেরি করেটরে শেষ অবধি বসলাম বইটা নিয়ে।
২২টা লেখার সংকলন 'আমোদিনীর আরশি'। লেখাগুলিকে গল্প বলতে পারলুম না, রম্য স্মৃতিচারণ বললে বরং যথাযথ হয়। ছোট্ট ছোট্ট, টুকরো টাকরা ঘটনা, আপাততুচ্ছ কিছু মুহূর্ত, কিছু মনে থেকে যাওয়া গপ্পো। ভাষার জাদুকাঠিতে সঙ্গীতা তাদের সাজিয়ে গুছিয়ে, এক মায়াদর্পণে ধরে নিয়েছেন - শুধুমাত্র এমন মমতায় দ্রব মন যা করতে পারে।
অ্যালিস থ্রু দ্য লুকিং গ্লাস এর মত এক অপূর্ব মায়ার জগৎ এটা, যেখানে মিন্টিমাসি ফেসপ্যাকের পর ফেসপ্যাক লাগান, হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে আমোদের ভিজে জুতো শুকিয়ে দেন, এবং চুল আঁচড়ানোর মত অবলীলায় আমাদের আমূল চমকে দিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ আত্মসম্মানের পরিচয় দিয়ে ফেলেন গল্পের শেষে। মায়ের জ্বরের দিনে টুক করে বড় হয়ে যায় পানু, পাড়ার দোকানের চেনা সুবাস দোকান উঠে যাবার পরও মাখামাখি হয়ে থাকে মনখারাপ সকালে, আসানসোলে শহরের ওপর এক চিরস্থায়ী কনে দেখা আলো ফিক্সড হয়ে যায় আমার মনের মধ্যে, চাঁদবালী হাতে এক কিশোরের দৌড় অমোঘ গেঁথে যায় পাঠকের বুকে, অথবা সন্তান হারানো স্বামী স্ত্রী পরস্পরের কাছে অনন্ত অভিনয় করে যান।
নিজেদের ছোটবেলার আয়নার ভাঙা ভাঙা টুকরো উঠে আসে আমোদিনীর আরশিতে।
রূপকথার জগতের মায়া আমার সইয়ের হাতে। যারা মুগ্ধ হতে জানে, তাদের ডুব দেবার আদুরে দীঘি তার কলম।
বইটির প্রচ্ছদও বড় মায়াকাড়া। বাঁধাই, ছাপা সুন্দর।
সম্পাদকের কাছে দুটি নিবেদন - ১) 'কথোপকথন' এর মত শক্তিশালী গল্পে আগাগোড়া 'পুঁতি'কে 'পুঁথি' ছাপা হয়ে পুরো লেখাটার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে।
২) 'নিতুদি' আর 'সুখস্বপ্ন'র মত দুটো আদ্যন্ত 'বস্তুত ফেসবুক স্ট্যাটাস' এই সংকলনে কেন? দুটোই আমায় হতাশ করেছে এবং বাকি লেখাগুলোর পাশে বড্ড বেমানান মনে হয়েছে। অবশ্যই, মতামত ব্যক্তিগত।