এই সময়ের তরুণ কথাকারদের মধ্যে হামিরউদ্দিন মিদ্যা অন্যতম আলোচিত, তাঁর শক্তিশালী লেখনীর কারণেই। বাংলা কথাসাহিত্যের শাশ্বত ব্যাটানটি তিনি তাঁর চর্চিত হাতে তুলে নিয়েছেন বেশ কিছুদিন হল। বয়স অল্প। কিন্তু জীবনের যে পাঠ এই তরুণ লেখক পেয়েছেন বা প্রতিনিয়ত পেয়ে থাকেন, তা কোনও বয়সের তোয়াক্কা করে না। জীবনই তাঁকে শিখিয়ে দিয়েছে অহরহ চোরাবাঁক, ভেঙে পড়া আলপথগুলিকে। জীবনই তাঁকে শিখিয়ে দিয়েছে এবড়োখেবড়ো মাটির সখ্য। জীবনের এই আহরণ আর সংবেদী মন, তরুণ লেখককে দিয়েছে এক অবিশ্বাস্য পরিণতিবোধ। যা তাঁর গল্পের ছত্রে ছত্রে ফুটে ওঠে। পাঠক তাঁর পর্যবেক্ষণের গভীরতার সামনে দাঁড়িয়ে বিস্মিত হয়, এবং সবশেষে গল্পে যে অভিঘাত তুলে রাখেন তিনি, তাতে বিহ্বল হতে হয়। আর এই সবকিছুর মধ্যে হামিরউদ্দিন আসলে সচেতনভাবে নির্মাণ করে চলেন তাঁর চিরচেনা গ্রামীণ জীবনের সুষমা। নাগরিকতার শর্তগুলো তিনি খুব আলগোছে ভেঙে ভেঙে দিয়ে এগোতে থাকেন। শুধু ধুলোকাদার গন্ধ বা ভাষাতেই নয়, তাঁর গল্প তাই সঠিক অর্থেই নিরাবরণ জীবনকে জড়িয়ে ধরতে চায়, চায় নিরলংকার, পালিশহীন, নগ্ন জীবন আর তার সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে। এই আশ্লেষ পাঠককে ভাবায়, অস্থির করে। সেটাই হামিরউদ্দিনের বৈশিষ্ট্য, সিগনেচার। তরুণ বয়সেই তিনি তাঁর সাহিত্যচর্চার অভিমুখটি চিহ্নিত করতে পেরেছেন বা বেছে নিয়েছেন সচেতনতাতেই। তাঁর মতো প্রতিশ্রুতিমান তরুণ লেখকের প্রথম গল্প বই প্রকাশ করতে পেরে সৃষ্টিসুখ আনন্দিত।
বইটির ১২টি গল্প শেষ করে নার্ণিয়ার কথা মনে পড়ে গেল। ক্লাইভ লিউইস-এর এই অপরূপ রচনা তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে লেখা। এক জগত থেকে আরেক জগতের মাঝে আছে ছায়াজগত বা "শ্যাডোল্যান্ডস"। ৭টি খণ্ডের বইয়ে, মুখ্য চরিত্ররা সবাই সেই স্থানের অভিযাত্রী। অনুপ্রেরণা পান তাঁর সুহৃদ, জন টোল্কিন যিনি বিশ্ববিখ্যাত হবিট ও "অঙ্গুরীয়কের প্রভু" এর মত অমরকাব্যিক রচনার জন্য, তাঁর থেকে। বর্তমানের আরেক সুধী লেখক ফিলিপ পাল্ম্যানের লেখা "তাঁর অন্ধকারময় উপকরণ"-সিরিজেও এই মধ্যবরতী জায়গার দেখা মেলে। . তেমনই, এই বইয়ের কাহিনীগুলির সব চরিত্রেরাই অভিযাত্রী। ভম্বলের দাদো, খাদুবুড়ি, মজিদ, মকছেদ চাচার পরিবার, মাসেম, টগর, আলতাফ হোসেন, জাহানারা বেগম, বুবু, খাদু বিবি,কথকের আব্বা, মনোয়ারা বিবি - এরা সবাই আটকে আছেন কোথাও না কোথাও। বিপরীতের দ্বন্দ্ব মাঝে ধরা হয়েছে নতুন-পুরাতন, জীবন-মৃত্যু, শহর-গাঁ, নদী-ড্যাম, ঢেঁকিকল আর গুড়াকল, বন্যা-অনাবৃষ্টি, খাদ্য-খাদক, প্রেম-অপ্রেম, অন্তর ও বাহির, স্বকীয়া-পরকীয়ার ব্যাপ্তিতে, দীপ্ত হয়েছে এদের প্রতিটি আখ্যান। এই যাত্রী-দ্বাদশের সাথে ঘুরে করে এলাম এক নন্দিত পরিমণ্ডলে। . গ্রাম বাংলার চিত্র বাংলা সাহিত্যে নতুন নয়। সেই সুত্রে গ্রামীণ মুসলমান অন্দরমহলও কথাসাহিত্যে কম হলেও একেবারে ব্রাত্য নয়। ক্ষেত্রবিশেষে চর্চিত। আমার সীমিত পঠিত সীমারেখার পরিধিতে শরৎচন্দ্রের 'মাহেশ' বা সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'অলীক মানুষ' পড়া থাকলেও, তাতে খেতে বসে পানির অপেক্ষায় থাকি নি। পারিপার্শ্বিক চরিত্রের ভিড়ে, লৌকিক উপাখ্যান ও গ্রাম্য নিপীড়তা, সুপক্ক রন্ধনশৈলী, সামাজিক বার্তালাপ থাকলেও, মাটির সুর তাতে সেই অর্থে বিদ্যমান পাই নি। প্রথম এই স্বাদ পাই লেখক আনসারউদ্দিনের রচনা - গো-রাখালের কথকথায়। এরপর তারই আরো "উনানে-মেকুর"ময় লেখার পরশ পেয়েছি - 'জন-মুনিষ', 'মাটির মানুষ-মাঠের মানুষে'। এগুলি সবই উপন্যাস। লেখকের গল্পসংকলন থাকলেও তা এখনও পড়া হয়ে ওঠে নি। . এরই মাঝে, ১৪২৬-এর "এই সময়" শারদীয়াতে হামিরউদ্দিন মিদ্যা-র "পির সাহেবের আস্তানা" পড়ি, ও ভাল লাগে। এফবির কল্যাণে, অবগত হই তাঁর প্রকাশিত এই গল্পসংকলনটির। . আমার শহুরে দুপুরের খাঁ-খাঁ নিরিবিলিতে, এই ১২টী গল্প পাখির কুজন বয়ে এনেছে। জীবনের চাওয়া-না পাওয়ার বৃত্তে, তুলনামুলক ভাবে সবাইকেই কখনও না কখনও হার মানতে হয়েছে। মেনে নিতে হয়েছে ভবিতব্য। কোথাও বা আবার নিভৃতে, অজান্তে - সৌভাগ্য এসে দাঁড়িয়েছ দোরগোড়ায়। কখনও সাড়া দিয়েছি, কোথাও আবার তা অধরাই থেকে গেছে। গ্রাম্য পরিধির উর্দ্ধে গিয়ে প্রতিটি চরিত্রেই এই মানবিক হর্ষ-হতাশা-প্রাপ্তির দ্যোতনা - তাদেরকে করে তুলেছে আমার একান্তজন। লেখকের মুনশিয়ানা আমাকে বাধ্য করেছে নিজের অতীতে ফিরে গিয়ে, কলতলায়-দোয়েল-পাখির ডাক মনে করতে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামীণ সংস্কৃতি ও বাচ্য, প্রবীণদের অভ্যাস ও বিশ্বাসের সাথে প্রতিনিয়ত ধাক্কা খেয়ে ওঠা আধুনিকতার আবর্তন, প্রতিটি কাহিনীতে আলাদা রূপে চিত্রিত হয়েছে। পেয়েছে আন্তরিক ছোঁয়া। . খুব সম্ভবত ৩ বছর হবে হয়ত, সাহিত্য জগতে তাঁর পদার্পণ, কিন্তু এই ক্ষুরধার রূপায়নে আমি সম্বুদ্ধ হলাম। লেখককে কুর্ণিশ। অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা রইল সৃষ্টিসুখের জন্যেও, এই বইটি প্রকাশ হেতু। . পরবর্তী রচনার জন্য আপাত অপেক্ষমান।
গ্রাম বাংলার নিত্যদিনের জীবন কে এই ভাবে গল্পের পাতায় তুলে ধরতে খুব কম লেখক ই পারেন। গল্প গুলো পড়তে পড়তে স্পষ্ট কল্পনা করা যায় দামোদর নদীর পারে ছোট্ট একটা গ্রাম। এই বইটির আরেকটি বৈশিষ্ট হলো পশ্চিমবাংলার মুসলমান সমাজ এর রোজকার জীবন যাপন সম্পর্ক নানা তথ্য তুলে ধরা।
অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ব্যক্তিগতভাবে ভীষণ পছন্দের এক গল্পসংকলন, হামিরউদ্দিনের মত নবীন কলমচির হাত ধরে। বহুদিন আগে বইটির প্রথম পাঠ-প্রতিক্রিয়া আমি লিখেছিলাম এবং সেখান থেকেই লেখকের সাথে আলাপ।
🔸বেশ কিছুদিন পর ফিরে এলাম আবার একটা অন্যরকম গল্প সংকলনের পাঠ প্রতিক্রিয়া নিয়ে। এই বছর (২০১৮) কলকাতা বইমেলা চলাকালীন বড় অদ্ভুত ভাবে এই বইয়ের সন্ধান পাই। বইপাড়ার বন্ধু এবং দাদা অভিষেক আইচের প্রোফাইল থেকে। নিজের প্রকাশক সত্তা থেকে বেরিয়ে এসে পাঠক হিসাবেই যখন অন্য প্রকাশনীর এক তরুণ গল্পকারের প্রথম বই নিয়ে তাকে আলোচনা করতে দেখি, ঠিক করি এই বই ব্যাগস্থ করার। বইমেলায় পরপর দুদিন সৃষ্টিসুখ প্রকাশনীর স্টলে ঘুরে তৃতীয় দিন আমি ও আমার ভাই অমৃতের সন্তান এই বই সংগ্রহ করি।
"মনে পড়ে সেই সুপারি গাছের সারি, তার পাশে মৃদু জ্যোৎস্না মাখানো গ্রাম। মাটির দেওয়ালে গাঁথা আমাদের বাড়ি, ছোটো ছোটো সুখে সিদ্ধ মনষ্কাম।"
- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের 'ধানক্ষেত' থেকে , 'নকশি কাঁথার মাঠ' কাব্যে পল্লী জীবনের নৈসর্গিক চিত্রণ , বিভূতিভূষণ এর 'পথের পাঁচালী'র সরল গ্রাম্য জীবনের মনোমুগ্ধকর ছবির হাত ধরেই মুখ্যত আমার গ্রামজীবন পরিদর্শন সমাধা হলেও গ্রামীণ জীবনের অন্দরমহলে সেই অর্থে প্রবেশ ঘটেনি।
না, আমি সেইভাবে কোনোদিন গ্রামে যাই নি, গ্রামে ঘুরতে গেলেও তা বড়জোর এক দুদিনের।ছোট্টবেলা থেকে গ্রামের একমাত্র স্বাদ পেয়েছি সেই দূরপাল্লার ট্রেনে চড়ে জানলার ধার বাগিয়ে। কুঝিকঝিক করে ট্রেন পেরিয়ে যায় ধান ক্ষেত, জলা জমি, তাল সুপারির সারি... তাই দুধের স্বাদ এতোদিন ঘোলেই মেটাতে হয়েছে। টিভিতে কোনো সংবাদ পাঠের সময়ে দেখেছি বড়জোর সেই মানুষদের দুঃখের কথা, তাদের জীবন সংগ্রামের কথা, বন্যায় সংসার, ঘটি বাটি, আপনজন, পালিত পোষ্য নিয়ে ভেসে যাবার করুণ ছবি। কিন্তু কোনোদিন অনুভব করতে পারিনি তাদের বুকের ধুকপুকানি, বুঝে উঠতে পারি নি তাদের হাসি, কান্না, চোখের ভাষা। হয়ে উঠতে পারিনি তাদের একজন, যা সত্যি হয়তো সম্ভব নয় বা সম্ভব হতে পারেনা আমার মতো শহুরে মানুষের। কিন্তু এই গল্প সংকলনের সংস্পর্শে আসার পর কোথাও গিয়ে হয়তো আমি পেরেছি সেই প্রান্তিক মানুষগুলোর সাথে কিছুটা হলেও একাত্ম হতে, তাদের মতো করে ভাবতে, বাঁচতে। শহরের ঔদাসীন্য ছেড়ে গ্রাম্য জীবনের টুকরো টুকরো ভালোবাসা - অভিমান , সুখ - দুঃখ, হাতে হাত রেখে জীবন যাপনের মাধ্যমে মাটির কাছাকাছি বেঁচে থাকতে।
কি কি গল্প আছে এই বইতে? 🔹 বককল 🔹আজরাইলের ডাক 🔹শালীনদীর হড়পা বান 🔹মকছেদ চাচার ঢেঁকিশাল 🔹শোকনামা 🔹প্রেমপাগল কিংবা পাগলের প্রেমবৃত্তান্ত 🔹শিকড়টা ছিঁড়ে যাবার পর 🔹জাহানারা বেগমের মুক্তি 🔹খোপ 🔹ভাঙা গড়ার উপাখ্যান 🔹যুগ যুগ ধরে 🔹মনোয়ারা বিবির দিনকাল
এই বারোটি গল্প আমাকে হড়পা বানের মতোই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। সহজ সরল খেটে খাওয়া মানুষের সুখ দুঃখভরা জীবনযাত্রা, চোরাবালিতে তলিয়ে যাওয়া সম্পর্কের সমীকরণগুলো মনে হয়েছে নিজেরই গলায় কখনো 'বককল' এর মতোই আটকে বসেছে, ছটফট করেছি দাদোর কষ্ট��, মনোয়ারা বিবির কষ্টে। 'মকছেদ চাচার ঢেঁকিশাল' আমাকে স্তব্ধ করে রেখে গেছে, এক অব্যক্ত কষ্ট গলায় জমে বসেছে। লেখক বয়সে নবীন কিন্তু সত্যিই এ�� অত্যন্ত শক্তিশালী লেখনীর অধিকারী। ধূলো জল কাদার বুনটে জীবনের শাশ্বত সত্যকে তুলে ধরেছেন অনায়াসে।
'শোকনামা' গল্পের বুধী এবং মাসেমের চোখের জল মনে করিয়ে দিয়েছে মহেশ - গফুরের সেই চিরন্তন অব্যক্ত বন্ধন। 'প্রেমপাগল কিংবা পাগলের প্রেমবৃত্তান্ত' পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। সোহাগ, টগর এবং আলিজানের এই প্রেমবৃত্তান্ত মনে থাকবে বহুদিন। জাহানারা বেগমের মুক্তি, ভাঙা গড়ার উপাখ্যান, যুগ যুগ ধরে, খোপ, শোকনামা প্রতিটি গল্প ভীষণ ভাবে মন ছুঁয়েছে,একবার পড়ে আঁশ মেটেনি, বারবার পড়েছি এবং মুগ্ধ হয়েছি । গ্রামবাংলার এবড়োখেবড়ো মাঠ, সরু আলপথ, সবুজ ক্ষেতের সাথে অদ্ভূত ভাবে জুড়ে গেছে কিছু মানুষের আটপৌরে সাদামাটা জীবনযাপন, সম্পর্কের ওঠাপড়া, প্রতিনিয়ত দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকা, বিচ্ছেদ, ভালোবাসা, প্রেম, পরীতে পাওয়া মানুষ এবং অবশ্যই আজরাইলের ডাক।
🔸লেখকের কলমের এক চিলতে তুলে আনলাম সবার জন্য, তার গল্প 'আজরাইলের ডাক' থেকে...
'একটুক্ষণ আগেই পানি থেমে গেছে।গাছের পাতারা স্তব্ধ হয়ে যেন কোন মৃত মানুষের নীরবতা পালন করছে।নিশ্ছিদ্র আঁধার ও গভীর নীরবতা ভারী হয়ে নামল খাদুবুড়ির বুকের উপর।কঠিন পাথরের মত,অসহনীয় অচল বোঝার মত।দু'চোখ জুড়ে নেমে আসছে কী নিকষ কালো আঁধার!মৃত্যুর সময় এমনই তো আঁধার ঘনিয়ে আসে! কান পেতে রইল খাদুবুড়ি।আজরাইল এলে তার পায়ের শব্দ শুনতে পাবে কি জিনের চলার মতো?জিনের নাকি পা নয়,খুর।মসজিদে জিনরা যখন মানুষের ভেক ধরে নামাজ পড়তে আসে,তখন ওদের খুরের শব্দ পেয়েই নাকি ইমাম সাহেব টের পায়।ভিড়ের মধ্যে ঘাপটি মেরে মিশে থাকে।অনেক সময় যে মুসল্লি নামাজ ক্বাজা করে,তার ভেক ধরেই আসে।তাই কেউ বুঝতে পারে না।'
জীবন হয়তো বাস্তবে তাই, মৃত্যুদূত বা মৃত্যুর ফেরেশতা, আজরাইল, সত্যি কখন কি ভেক ধরে আসে, জানা যায় না, আগে থেকে অনুমান করা যায় না, সতর্ক হওয়া যায় না, শেষ পর্যন্ত এড়ানো যায় না।
🔸লেখক হামিরউদ্দিন মিদ্যাকে আমি চিনতাম না ব্যক্তিগত ভাবে, 'আজরাইলের ডাক' পড়ে তাকে আবিষ্কার করি, লেখক আমার থেকে ৭- ৮ বছরের ছোটো হবেন কিন্তু তার এই জীবনবোধ যা তার কলম দিয়ে বেরিয়ে এসেছে 'আজরাইলের ডাক' হয়ে, আমার মতো ক্ষুদ্র পাঠকের মুগ্ধ হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ। তবে সঙ্গে এও আশা রাখি লেখক বিষয়বৈচিত্র্যর দিকে যথেষ্ঠ খেয়াল রেখেছেন, কিন্তু গল্পগুলি আবর্তিত হয়েছে সমাজের এক বিশেষ শ্রেণীর, জীবিকার ও ধর্মের মানুষকে নিয়ে, বলাই বাহুল্য এই গল্প সংকলনের মাধ্যমে তাঁর আত্মপ্রকাশ, তাই তার কমফোর্ট জোনের মধ্যেই তিনি থাকবেন, কিন্তু মুগ্ধ পাঠক হিসেবে আমার আশা এর পর ওনার গল্পে হয়তো সমাজের অন্য স্তরের, অন্য জীবিকার, অন্য ধর্মের, শহুরে, মফস্বলি মানুষের, পৃথিবীর অন্য কোন কোণের থেকে উঠে আসা গল্প নিয়ে উনি আমাদের জন্য হাজির হবেন। ভালো থাকবেন হামিরউদ্দিন, চলতে থাকুক আপনার কলম এইভাবেই। প্রকাশনীকে অনেক ধন্যবাদ আবার একটি অন্যরকমের গল্প সংকলন উপহার দেওয়ার জন্য।
বইয়ের প্রচ্ছদ আমার ভীষণভাবে সাধারণ মনে হয়েছে, ব্যক্তিগত মত, আরো ভালো করা যেতো। বইয়ের বাঁধাই ও বিশেষ ভালো ছিলো না, হয়তো বইমেলায় জোগানের চাপে!
বইটির নাম আজরাইলের ডাক, দেখামাত্রই মনে হতে পারে এটি একটি ভূতের গল্পের সংকলন। আগে যারা লেখক এর লেখা পড়েছেন তারা জানবেন, হামিরুদ্দিন মিদ্দ্যা গ্রাম বাংলা নিয়েই লিখতে বেশি সচ্ছন্দ। মাত্র ১১০ পাতার বইটিতে লেখক গ্রাম বাংলার মেঠো পথ, নদীর চর, সোঁদা গন্ধ, সবুজের ভরপুর প্রকৃতিকে লেখনীর মাধ্যমে দারুন ভাবে তুলে ধরেছেন। এর আগে লেখকের কিছু লেখা পড়েছিলাম লিটল ম্যাগাজিন এর পাতায়, মায়াবী লেখনী, লেখায় গ্রাম বাংলার ছোঁয়া তাকে আলাদা করে জায়গা করে দেয়। বইটির প্রচছদ খুবই সাদামাটা।
পটভূমি -
নিজের পছন্দের কিছু গল্প সংক্ষেপে আলোচনা করা রইলো
২. আজরাইলের ডাক - শয্যাশায়ী খাদুবুড়ি মরার জন্য প্রস্তুত। তবু মৃত্যুদূত আজরাইল এখনও আসছে না। আজরাইল আসে ভিন্ন সাজে জান কবজ করার জন্য। আজ তার বড়ো ছেলের আসার কথা নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য, তাহলে কি?
৪. মকছেদ চাচার ঢেঁকিশাল - গ্রামে নতুন চাল কুটার মেশিন লাগিয়েছে, এখন চাল কুটতে আর বেশি সময় লাগেনা, তাই মকছেদ চাচার ঢেঁকিশালে আর কেউ যায় না। চাচা কেমন আছে এই সময়ে?
৫. শোকনামা - দুই মাসের বাছুর যখন বুধী, তখন মা গাইটা মরে গেল। সেই থেকে তার দেখভাল করে আসছে মাসেম। আজ কেনো বুধির চোখে জল, মাসেম কী বুঝতে পারলো?
৬. প্রেমপাগল কিংবা পাগলের প্রেমবৃত্তান্ত - টগরকে দেখলেই আলিজান খ্যাপাটা সামনে ছুটে চলে আসে। টগর অপ্রস্তুত হয়, কী করবে বুঝতে পারে না। কীসের বন্ধন খ্যাপার সাথে টগরের? টগরই বা নিজেকে দোষী ভাবে কেন?
৮. জাহানারা বেগমের মুক্তি - জাহানারা বেগম মরতে চায়। ছেলে, বউ, মেয়ে, জামাই নিয়ে তার ভরা সংসার। তবুও নিজের মরদটা মরে যাবার পর থেকে মৃত্যু যেন তাকে নানাভাবে হাতছানি দিয়ে ডাকে।
৯. খোপ - পায়রা বাড়িতে সংসারে বরকত আনে, ঘুলঘুলিতে বা কার্নিশে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিলেও, 'খোপ' পায়রার কাছে সর্বদাই নিশ্চিন্ত আশ্রয়। পায়রার মত আমরাও কি প্রত্যেকে নিজ নিজ খোপের অধীন?
১২. মনোয়ারা বিবির দিনকাল - মনোয়ারা বিবির সংসারে এক ছেলে আর এক মেয়ে, স্বামী পাগল হয়ে গেছে চিকিৎসার অভাবে, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, বাড়ি ফেরে না প্রায় বছরভর। এবার পাগল স্বামী ফিরে আসে, তারপর?
পাঠ প্রতিক্রিয়া -
আমার বেড়ে ওঠা শহরতলী অঞ্চলে, তাই শহর ও গ্রামের মানুষজনের সঙ্গে সম্পর্ক সেই ছেলেবেলা থেকেই। যদিও হামিরউদ্দিন মিদ্যার ১২টি গল্প আমাকে পরিচয় করায় গ্রাম্য মুসলিম সমাজের সঙ্গে, যার বেশিরভাগটাই আমার কাছে অচেনা ছিল। হ্যাঁ, রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় কয়েক মুহূর্তের জন্য চাক্ষুস করেছি তাদের জীবনযাত্রা, আমাকে নিয়ে গেছে সেইসব মানুষদের বাড়ির অন্দরমহলে। আমি ঘুরে ফিরে দেখেছি তাদের জীবন-নকশা। ভালো থাকবেন হামিরউদ্দিন, চলতে থাকুক আপনার কলম এইভাবেই। প্রকাশনীকে অনেক ধন্যবাদ আবার একটি অন্যরকমের গল্প সংকলন উপহার দেওয়ার জন্য। এই ১২টি গল্প প্রত্যেকটি আপনাকে ভাবতে বাধ্য করবে, জীবনবোধ, খেটে খাওয়া মানুষের সুখ দুঃখের গল্প, সম্পর্কের সমীকরণগুলো যেনো জীবন্ত, সেই ছোটগল্প যেমন শেষ হয়েও হয়না শেষ।
Please follow Journal of a Bookworm page in facebook
খুব প্রিয় একটি গল্প সংকলন।গ্রামবাংলার সহজ সরল মানুষদের মনের অন্দরমহলে প্রবেশ করে লেখক তুলে এনেছেন এক একটি রত্ন।মুসলিম সমাজেরও নানান অজানা দিক উঠে এসেছে।বইটি পড়া অবশ্যই দরকার।
This entire review has been hidden because of spoilers.