জগদীশ গুপ্ত-কে নিয়ে লিখতে বসলে দুটো কথা সবচেয়ে আগে মনে হয়। প্রথমত, কল্লোল যুগের লেখক হলেও তথাকথিত সমাজ-বাস্তবতার ধার তিনি ধারেননি। তাঁর গল্পে সমাজ আছে। চরিত্ররাও কঠোরভাবে বাস্তব। কিন্তু তার সূত্র ধরে ঔপনিবেশিক সমাজের ফাটল-ধরা, সাপের খোলস আর গাছের শেকড় দিয়ে লাঞ্ছিত চেহারাটি তুলে ধরতে তিনি আদৌ আগ্রহী ছিলেন না। বরং দারিদ্র্যের পীড়ন কীভাবে মানুষের মনকে হলাহলে জারিত করে, লালসা কীভাবে বিকৃতির আগুনে ঝলসে দেয় সম্পর্ক থেকে শরীর— এগুলোকেই যথাসম্ভব কম কথায় ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। দ্বিতীয়ত, সমসাময়িক নানা 'প্রবণতা' বা ঝোঁক তাঁর লেখাকে আদৌ স্পর্শ করেনি। বরং নিজের অভিজ্ঞতায় দেখা অজস্র মানুষ, বিশেষত নারীদের দুঃখ-অপ্রাপ্তি-ভয়কে যথাসম্ভব বাস্তবিক আকারে ফুটিয়ে তোলাতেই তিনি মগ্ন থেকেছেন। তাঁর লেখায় সুখপাঠ্যতা নেই। তাতে নেই কোনো তত্ত্ব, তথ্য, আদর্শ, নদীর জল, সন্ধ্যাতারা। আছে পাঁক, পায়ে কাঁটা বিঁধে হওয়া যন্ত্রণা আর রক্ত-পুঁজ, শীর্ণ পুত্রকে চোখের সামনে মানব থেকে শুষ্ক ও নিষ্প্রাণ একটুকরো মাংসপিণ্ড হয়ে যেতে দেখার অনুভূতি, আর অসহায়তা। আলোচ্য গল্প-সংকলনটিতে জগদীশ গুপ্ত'র আনক্যানি ও বিজ়্যার গল্পগুলি স্থান পেয়েছে। এরা হল: ১) একটি...... দুটি ২) অ-মৃত ৩) দিবসের শেষে ৪) হাড় ৫) যাহা ঘটিল তাহাই সত্য ৬) তৃষিত আত্মা ৭) দৈবধন (ডব্লিউ ডব্লিউ জ্যাকবস্-এর 'দ্য মাংকিজ প'-র বঙ্গীকরণ) ৮) আলুনী সাকু ৯) চিহ্ন ১০) পদশব্দ (ডব্লিউ ডব্লিউ জ্যাকবস্-এর 'দ্য টোল হাউজ'-এর বঙ্গীকরণ) 'কৈফিয়ত' ও 'ধরতাই' অংশে রাজীব চৌধুরী বিস্তর তত্ত্বকথা আউড়ে বোঝাতে চেয়েছেন, কেন জগদীশ গুপ্তের লেখার মধ্যে এই অদ্ভুত ও অপ্রাকৃত ভাবটি নিতান্ত স্বাভাবিকভাবেই ফোটে। কিন্তু এ-কথা আগেই বলে দেওয়া যায় যে এই বইটি কোনোমতেই তাঁর প্রতিনিধিস্থানীয় গল্প-সংকলন নয়। তবে হ্যাঁ, এই বইয়ের 'দিবসের শেষে' এবং 'হাড়' গল্পদুটি মাস্টারপিস! আর বইটির মুদ্রণ ও সামগ্রিক গ্রন্থনির্মাণ ভারি চমৎকার। তাই এই স্বল্প-আলোচিত অথচ একেবারেই অনন্য সাহিত্যিকের লেখনীর নিদর্শন পেতে চাইলে বইটি সংগ্রহ করতেই পারেন। আর যদি সিরিয়াসলি এই সাহিত্যিকের সম্বন্ধে জানতে চান, তাহলে গল্পসমগ্রটিই জোগাড় করুন। তবে হ্যাঁ, এই সাহিত্যপাঠের অভিজ্ঞতা যে সুখদায়ক হবে না— এ আগেই বলে রাখি।
জগদীশ গুপ্ত বাংলাদেশের বিস্মৃতপ্রায় একজন শক্তিমান সাহিত্যিকের নাম। তাঁর অন্য কোনও বই না পড়লেও এই বইটা সবাইকে অবশ্যই একটু পড়ে দেখতে বলব। নিতান্ত সাধারণ একটা মধ্যবিত্ত সমাজের জীবনের গল্প মনে হওয়া এই গল্পটা কিভাবে যে সাসপেন্সে রূপ নেয় সেটা ভাবলে এখনও বিস্ময় জাগে। স্কুল পড়ুয়া কেউ যদি বইটার সন্ধান পেয়ে যায় তাহলে পোয়া বারো। -সপ্তর্ষি (২৯/১১/২০২২)
সানডে সাসপেন্সে এই গল্পের বেতার নাট্যরূপ শুনতে শুনতে ভাবছি — এই গল্পে সাসপেন্স কোথায় রে ভাই? ২০মিনিটের গল্পে তখন আর তিন মিনিটও বাকি নেই। শেষের ৩ মিনিটে যা ঘটল তা ভয়ঙ্কর। তাই সত্য।