একই দিনে দু-দুটো স্মরণীয় ঘটনা ঘটে গেলে কারাে কারাে জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। উনিশ শ’ একাত্তরের সাতই মার্চ রেসকোর্সের জনসমুদ্রে আনােয়ার এক অথৈ দিবাস্বপ্নে ডুবেছিল । লক্ষ জনতার কলােরল ছাপিয়ে তার কানে বেজেছিল অযুত-নিযুত ঘােড়ার পায়ের আওয়াজ আর বিচিত্র ধ্বনিব্যঞ্জনাময়-স্বাধীনতা। সেই একই দিনে ঢাকা শহরের লালমাটিয়া ব্লক সি-র প্রায় নিভৃত বাড়িতে সানা নামের সদ্য-তরুণী গায়ে-মুখে হলুদ মেখে নিজের জন্য নির্মাণ করেছিল অন্য নিয়তি। ঘটনা দুটোর পারস্পরিক ঐক্য বেশ জটিল। কিন্তু নিয়তির মতােই ঘটনা দুটো একে অন্যকে প্যাঁচিয়েছে। দিনে দিনে প্যাঁচটা গাঢ়, গভীর অবিচ্ছিন্নতায় রূপ নিয়েছে এবং ধীরে ধীরে একটা গােটা জনপদে, মানচিত্রে ছায়া ফেলেছে। এ কাহিনী ইতিহাস নয়। নকশা বিশ বছরের, রৌদ্র ও ছায়ার।
ওয়াসি আহমেদের জন্ম ১৯৫৪ সালে, সিলেট শহরের নাইওরপুলে। স্কুলের পাঠ বৃহত্তর সিলেটের নানা জায়গায়। পরবর্তী শিক্ষাজীবন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কবিতা দিয়ে লেখালেখির শুরু। ছাত্রাবস্থায় প্রকাশিত কবিতা সংকলন ‘শবযাত্রী স্বজন’। কথাসাহিত্যে, বিশেষত গল্পে, মনোনিবেশ আশির দশকে। প্রথম গল্প সংকলন ‘ছায়াদণ্ডি ও অন্যান্য’ প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে। পুস্তকাকারে প্রথম উপন্যাস ‘মেঘপাহাড়’ প্রকাশ পায় ২০০০ সালে। সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে কূটনীতিকের দায়িত্ব পালনসহ কাজ করেছেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নানা অঙ্গনে। লেখালেখির স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ দেশের প্রায় সব প্রধান সাহিত্য পুরস্কার।
সেদিনটা ছিলো অন্যরকম। সেদিন সানা'র গায়ে হলুদ আর আনোয়ার যাচ্ছিলো সাতই মার্চের ভাষণ শুনতে। দুজনার মধ্যে প্রেম ছিলো না। কিন্তু তারা জানতো না,নিয়তি দুজনকে এক সুতোয় পেঁচিয়েছে। "দিনে দিনে প্যাঁচটা গাঢ়, গভীর অবিচ্ছিন্নতায় রূপ নিয়েছে এবং ধীরে ধীরে একটা গোটা জনপদে,মানচিত্রে ছায়া ফেলেছে।" মুক্তিযুদ্ধ হয়। মানুষের স্বপ্ন ভাঙে। যুদ্ধবিধ্বস্ত কেউ কেউ নিজের বীরত্বের ভারে ক্লান্ত হয়ে যাপন করে অদ্ভুত জীবন। আনোয়ারের বড়বোন রাবেয়া খোঁজে মুক্তিযুদ্ধে নিখোঁজ স্বামীকে। আনোয়ার খোঁজে ব্যর্থ জীবনের উদ্দেশ্যে আর সানা করে এক "ভাবমূর্তিযাপন।" যেখানে সম্মান আছে,ভক্তি আছে,ক্ষমতা আছে; জীবনটাই নেই শুধু। তাদের জীবনের আলো ও অন্ধকার, রৌদ্র ও ছায়া সৃষ্টি করে এক জটিল নকশার। ওয়াসি আহমেদের স্বর যথারীতি ঠাণ্ডা, নিচু, কাব্যিক, কখনো কখনো তীব্র শিহরণময়। পড়তে পড়তে আনোয়ারের মতো ঘোর লাগে। শব্দগুলো কেমন অপার্থিব মনে হয়। সানা, রাবেয়া, ওমর, আনোয়ার যেন সারা বাংলাদেশের প্রতিরূপ হয়ে ফুটে ওঠে। সবমিলিয়ে "রৌদ্র ও ছায়ার নকশা" পাঠের অভিজ্ঞতা তাই অসাধারণ, অসাধারণ!!
উনিশ শ' একাত্তরের সাতই মার্চ একদিকে যখন আনোয়ার নামের এক যুবক রেসকোর্সের ময়দানে ডুবেছিল লক্ষ জনতার জনসমুদ্রে, অন্যদিকে তখন সানা নামের সদ্য-তরুণী গায়ে মুখে হলুদ মেখে তৈরি করছিল নিজের জন্য অন্য এক নিয়তি। প্রধান এই দুই চরিত্রের জীবনে একই দিনে দুটো স্মরণীয় ঘটনা ঘটে যাওয়ার মধ্য দিয়েই উপন্যাস খুঁজে পায় নিজের গতি, চলার পথে সেখানে উঠে আসে ইমতিয়াজ, টুটু কিংবা জাফরির মতো চরিত্ররা। একশ চুরাশি পৃষ্ঠার এই উপন্যাসে বিশ বছরের রৌদ্র ও ছায়ার যে নকশা ওয়াসি আহমেদ এঁকেছেন, তার মুগ্ধতা বজায় থাকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।
উপন্যাসটির রচনাকাল উনিশ শ' সাতানব্বই সাল। দৈনিক সংবাদ সাহিত্য সাময়িকীতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের পর ঐতিহ্য থেকে বই আকারে প্রকাশিত হয়, যার প্রথম মুদ্রণ এখনও পাওয়া যাচ্ছে বাজারে।
ছোট বেলায়, বিকেলের ঘুম ভাঙলে, যখন খেলার সঙ্গী পেতাম না,এসে চুপ চাপ বসে থাকতাম পুকুর পাড়ে। বাঁশের একটা ঘাট ছিল, যাতে নেমে সবাই স্নান সহ অন্য কাজ করতে পারে। আমি ঘাটে বসতাম না,বসতাম সেগুন গাছের নিচে,আমাদের পুকুর পাড় টা সেগুন গাছে ঘেরা ছিল। গাছের নিচে বসে কাটিয়ে দেয়া,সেই সব বিকেল গুলো ছিল অপার্থিব। বিকেলের মরে আসা আলোর সঙ্গী হতো চারপাশের ভুতুড়ে নিরবতা,সামনে বেশ মোটামুটি আকারের একটা জলাশয়। আমার দৃষ্টি থাকত সেই সমাহিত জলের দিকে,একদম শান্ত জল,তার উপরে হালকা সবুজ রঙা শেওলা,অদ্ভুত একটা সৌন্দর্যের সৃষ্টি করত। কখনো কখনো একটা মাছরাঙা যদি ঝাঁপ দিত জলে,মনে হতো সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা অনেকগুলো ফুল কেউ হাত দিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, শৃঙ্খল অবস্থা টা ভেঙে দিলো...
ওয়াসি সাহেবে লেখা,আমার কৈশোরে দেখা পুকুরের জলের মতো। স্থির,সমাহিত। পাঠক পাড়ে বসে শুধু দেখবে,অপার্থিব সৌন্দর্য টা। হঠাৎ যখন বই টা শেষ যাবে, তখন মনে হবে কোন মাছরাঙা এসে, স্থির জল রাশির মৌন ভাব ভেঙে দিলো। তখন কিছু সময়ের জন্য মন বিক্ষিপ্ত হবে,তারপর আবার স্থির হয়ে যাবে,গজিয়ে উঠবে নতুন চিন্তার চারাগাছ,যেটা লেখক বুনতে চেয়েছেন...
ওয়াসি আহমেদের লেখা এবারই প্রথম পড়া। ১৫/২০ পৃষ্ঠা পড়ার পর বন্ধু কে বললাম," কি লেখে এই লোক,কোন গতি নাই,কিচ্ছু নাই,কেমন ভোঁতা ধরনের লেখা"। বন্ধু বেশ রুক্ষ স্বরে বলল,"দোষ তোমার, তুমি বুঝতেছো না লেখা,মন দিয়ে পড়ার চেষ্টা কর"। পড়লাম মন দিয়ে,সাথে অনেক সময় দিয়ে। ভালো লাগার চেয়ে, মন্দের ভাগ খুবই কম। যেটুকু মন্দ লেগেছে, ত্রুটি টা হয়ত আমার। তাও বলি, " কিছু কিছু জায়গায় খুব মেকি লেগেছে, যে তালে লেখাটা এগিয়েছে তার সাথে সঙ্গতি রাখতে পারেনি ঐ জায়গাগুলো। " যাই হোক,লেখকের লেখা আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে, আরো পড়ব। উনি ছোট গল্পের জন্য বিখ্যাত,দেখি পরবর্তী ছোট গল্প ট্রাই করব।
কেউ কী বলতে পারেন,ছোটদের(কিশোর) জন্য লেখা উনার কোন বই আছে কিনা?
‘রৌদ্র ও ছায়ার নকশা’ পড়ার পর খুব মিশ্র অনুভূতিতে ভুগছি। আর সেটা আসলে শুরু থেকেই পাচ্ছিলাম। শেষটা ভালো হতে হতে কি জানি হয়ে গেল! ওয়াসি আহমেদের এর আগে কোন বই পড়া ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের উপর উপন্যাস পড়তে চাওয়া থেকে বইটা তুলে নিয়েছিলাম।
মূল চরিত্র আনোয়ার একজন মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু, স্বাধীনতার চেতনায় তাঁকে খুব উজ্জীবিত দেখানো হয় নি। সেটা জরুরীও না। কারন, পড়ে মনে হয়েছে যে লেখকের এটি একটি সচেতন সিদ্ধান্ত। ঘটনাও ওভাবে এগোয়। আনোয়ারের মধ্যে তার বাড়িওয়ালার মেয়ে সানার প্রতি একটা ভালো লাগা তৈরি হলে তা কখনোই তার মুখ ফুটে বলা হয়ে ওঠে না। যুদ্ধ ও যুদ্ধ পরবর্তী নানা ঘটনা ও দুর্ঘটনার পর দুজনের মধ্যে একটা স্বাভাবিক চেনাজানা বজায় থাকে, আসা যাওয়াও। তারা পরষ্পরকে নিয়ে কি ভাবছে, তা থেকে আঁচ করা সহজ হয় যে এই সম্পর্ক ঠিক বন্ধুত্বও নয়। প্রেমও নয়। সম্ভবত দুজন প্যাসিভ মানুষের সম্পর্কে গভীরতা আরোপের দুর্বার চেষ্টার কারনেই সম্পর্কটা লেখক ভাসাভাসা রাখতে চেয়েছেন। কিন্তু, কতোটা সফল হয়েছেন, তা প্রশ্নবিদ্ধ। কারন, পাত্রপাত্রীর কোন চিন্তাই মনে গভীর কোন দাগ কাটে না। বরং, কিছুটা বিরক্তই লাগে তাদের এই ‘কি বলছি, কি করছি’ আচরণ। চরিত্রগুলোর অতি সাধারনত্ব আরো নানা কারনে পানশে ঠেকে। এখানে লেখকের সত্তর দশকের বাঙালী নারী পুরুষের বাস্তব চিত্র আঁকার চেষ্টা আমাদের শিকড়ের সন্ধান দেয় না কোন। প্রায় প্রতি বাক্যেই উপমার ব্যবহারও উপদ্রবের মতো মনে হয়।
পটভূমি মুক্তিযুদ্ধ বলে এতে আনোয়ারের যুদ্ধে যাওয়ার আগের পরিস্থিতি, যুদ্ধে যাওয়া, সেখান থেকে ফিরে এসে পত্রিকা বের করা, পুরনো বন্ধুদের সাথে কথা বলা, এসব জায়গায় মুক্তিযুদ্ধের একটা চেনা চিত্র আমরা পাই। কিন্তু, মুল কাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধ ‘পটভূমি’ বাদে আর কিছু নয়। আর মূল কাহিনীও আসলে চলমান জীবনের বাইরে কিছু নয়। চেনা চিত্রও যেন বড় বেশি চেনা, কখনো কখনো একারনেই খুব কৃত্রিম। রাবেয়ার পরিণতি কিছুটা নতুন দিক উন্মোচন করলেও মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস হিসেবে বাকিদেরকে জোর গলায় এই বই পড়তে বলার জন্য এই অংশ যথেষ্ঠ না। আনোয়ার ও সানা দুই মূল চরিত্রেরই উত্থান পতন এমন যে তাদের সাথে ঘটে যাওয়া কোন দুর্ঘটনাই তাদের প্রতি সহানুভূতি তৈরি করে না।
মিশ্র অনুভূতি থেকে বের না হয়েই বলছি যে লেখনী অন্যরকম, কিন্���ু, তা টেনে ধরে রাখে না। ভিন্ন স্বাদ যে একেবারেই কোথাও পাই নি বলছি না। যেমন, গোলাম আজমের উল্লেখ আসে যেখানে, সেই অংশ উপন্যাসটির দারুন একটি জায়গা। নানা ধরনের ক্রাচের সমারোহের অংশটিও। কিন্তু, পুরোটা জুড়ে এক ধরণের ‘গা বাঁচানো’ সুর স্পষ্ট। সব চরিত্রের নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ন্ত্রনহীনতা দুটোই অকারনে সীমা ছাড়ায়। এমনকি টুটুকেও শেষমেশ বেশ আদর্শ যুবকই মনে হয়। তার ডায়েরীর সেই রহস্যময় বাক্যের আগমন মূল চরিত্রকে যতোটা চিন্তায় ফেলে, বাকি পাঠকদেরকে কতোটা ফেলেছে জানি না। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই অংশে এসে চমৎকৃত হই নি।
নেতিবাচক রিভিউ দিতে ভালো লাগে না। জানি না, সেটা করে ফেলছি কিনা। পাঠোচ্ছ্বাসেই স্বছন্দ আমি। কিন্তু, এর চেয়ে সৎভাবে এই উপন্যাস যে পুরোপুরি পছন্দ করতে পারি নি, তা বলা সম্ভব হচ্ছে না। এই বই নিয়ে আমি ‘না ভালো না খারাপের’ দোটানায় পড়ে আছি! সেই দোটানা খুব স্বস্তিদায়ক না। কারন, মনে হচ্ছে লেখকের এই কাজটিই হয়তোবা কিছুটা দুর্বল তাঁর অন্যান্য লেখার তুলনায়। বাকি লেখা না পড়েই এই মন্তব্য করার কারন নিজেকে তাঁর ভালো কোন লেখা পড়ব তা নিয়ে আশা দেওয়ার একটা ক্ষুদ্র চেষ্টা করা। এরপর, ওনার ‘বরফকল’ পড়ার ইচ্ছা আছে। দেখা যাক, সেই বই পড়ে তাঁর লেখনী নিয়ে মিশ্র অনুভূতি দূর হয় কিনা।
একদিন ঘোরলাগা ঘুম ভেঙে এক যুবক দেখে রোদ আর ছায়া তার বিছানায় পাতানো মশারির সুতো ধরে ঝুলে ঝুলে তার সমস্ত খাট জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। অন্ধকারাচ্ছন্ন এক ঘরে জীবন কাটানো সেই যুবক ঘুম ভেঙে রাস্তায় বের হয়ে দেখলো হাজার হাজার মানুষ বাঁশ হাতে মিছিলে নেমেছে। ভুল বললাম বোধহয় রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছে সে দেখলো লক্ষ লক্ষ মানুষের স্রোতের মাঝে মাঝে পৌঁছে গিয়েছে সে। দূরের ঐ মঞ্চে কে উঠেছেন? বাঙালির স্বপ্ন গড়ার কারিগর? এত মানুষের মাঝে যখন সেই স্বপ্ন দেখানো কারিগরের গাড়ি রাস্তা করে বের হচ্ছে তখন তার চোখে স্বপ্ন নাকি ভয় খেলা করছে?
সদ্য বিবাহিত তরুণীর স্বপ্ন খসে পড়তে দেখেছেন কখনো? একলহমায় কীভাবে নববিবাহিতা নিজের তৈরি করা একটা আবেগপূর্ণ পৃথিবীর ধ্বসে পড়ার সাক্ষী হয়? ধুলোয় আকীর্ণ মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে যুদ্ধকে শাপশাপান্ত করবে নাকি নিজের সদ্য হারানো ভালোবাসার মানুষের জন্য বিলাপ করবে? ঘোরের মাঝেই তার দিন কেটে গেলো ভাবনাগুলো এলোমেলো ডানা মেলবার আগেই।
স্বাধীন দেশ স্বাধীনতার স্বাদ পেয়ে কেমন আছে বলে মনে হয়? নয় মাসের মধ্যে কী ইতিহাস তার সময়ের গতিপথে বাড়িয়ে দিয়েছে নাকি মন্থর করেছে? অগুনিত মানুষ ঘরে ফিরেনি পথ চেয়ে বসে আছে তাদের আপনেরা। প্রতীক্ষা কিসের? মানুষ কী না ফেরা প্রিয়জনের মৃত্যুর সংবাদের জন্য উদগ্রীব? নাকি তাদের জীবন্ত ভেবেই খোঁজ চালিয়ে যাওয়াতে তৎপর? প্রশ্ন অনেক সংশয়ও অনেক। সময়ও কী রৌদ্র ও ছায়ার মতো প্রথমেই বলা সেই যুবকের মশারির ফাঁক গলে হেলেদুলে বাঁদরের মতো প্রশ্রয় খুঁজে? ঘোর লাগা ঘুম থেকে উঠে আড়মোড়া ভেঙে আর কোনদিন কী বাঙালি আবার সমবেত হবে নিজেদের অধিকার আদায়ে? সেইদিনও কী মিছলে প্রতিটা মানুষের হাতে থাকবে বাঁশ? লক্ষ লক্ষ বাঁশ পিচঢালা রাস্তায় টুকে মানুষ অধিকারের স্লোগানে মরিয়া হওয়ার দৃশ্য দেখবো বলেই বোধহয় আজও বেঁচে আছি। দূর থেকে সেই শব্দ শুনে মনে হবে ছুটে আসছে তেজী ঘোড়া, লক্ষ লক্ষ লাগামহীন ঘোড়া। সেইদিন রেসকোর্স উঠবে ধুলোর ঝড়, ধুলোর মেঘে ছেয়ে যাবে আকাশ বাতাস সমগ্র কিছু। আর সেই ঝড় ভেদ করে কী কেউ মঞ্চে উঠে হাঁক দিবে কী নতুন কোনো সূচনার?
১৯৫৫ তে “পথের পাঁচালী” মুক্তির পর তরুণ মজুমদারসহ আরো বেশকজন মিলে রাস্তায় প্ল্যাকার্ড হাতে মিছিলে নামেন। প্ল্যাকার্ডে লিখা “পথের পাঁচালী দেখুন”। অমন একটা ভালো সিনেমা দর্শক পাচ্ছেনা এই আক্ষেপ তাদের পুড়িয়ে মারছিল হয়তো। ওয়াসি আহমেদের প্রত্যেকটা লিখা শেষ করার পর আমারও ইচ্ছে হয় অমন একটা প্ল্যাকার্ড হাতে মিছিলে নামলে কেমন হয়? যাতে লিখা থাকবে “ওয়াসি আহমেদ পড়ুন”। এতো চমৎকার গদ্যলেখক এতোদিন পরও পাঠকদের নজরে না আসাটা বড় দুঃখজনক।
তিনি সেই ধারার লেখক যারা গল্পকে রোমাঞ্চকর করার পরিবর্তে সর্বদা একে সমাজের প্রতিফলিত চিত্র হিসেবে উপস্থাপনের দিকে নজর রাখেন। সময় নিয়ে ভেবেচিন্তে ঘটনাকে এগিয়ে নেন, শব্দচয়নের ব্যাপারেও তার সতর্কতা পরিলক্ষিত হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার চরিত্ররা বৈষম্যের স্বীকার অথচ তাদের আত্মসম্মান বোধ প্রবল।
"রৌদ্র ও ছায়ার নকশা"কে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস বলা যায়। এতে যুদ্ধের ঠিক পূর্বের সময়কাল, যুদ্ধ এবং তৎপরবর্তী সময়ের চিত্র আকা হয়েছে। সেই সময়কালের মানবীয় মনোস্তত্ব, দ্বন্দ্বগুলো তার লিখায় সুনিপুণভাবে ফুটেছে। তার যুদ্ধপরবর্তী বর্ণনাগুলো কতো দারুণ হয় তার প্রমাণ তো তিনি "বরফকল" উপন্যাসেই রেখেছেন। সমাজের অনিয়মকে লক্ষ্য করে শ্লেষের ব্যবহার একে অন্যগুলো থেকে আলাদা এবং চমৎকার করে তুলেছে।
ওয়াসি আহমেদের লিখায় সাধারণত সে অর্থে সমাপ্তি থাকেনা। নিজের পরিণতি মেনে নিয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়া চরিত্রদের একটা চলমান যাত্রায় রেখেই সমাপ্তি টেনে দেন। ব্যাক্তিগতভাবে এই ব্যাপারটাও আমার ভালো লাগে।