রাহাত খান ১৯৪০ সালের ১৯ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার পূর্ব জাওয়ার গ্রামের খান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তৃতীয় শ্রেণীতে পড়াকালীন তাঁর প্রথম গল্পটি লিখেছিলেন। রাহাত খান আনন্দ মোহন কলেজ থেকে অর্থনীতি ও দর্শনে ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষাজীবন শেষ করে খান ময়মনসিংহ জেলার নাসিরাবাদ কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন। এরপর দৈনিক ইত্তেফাকে যোগ দেন, পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পত্রিকাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ছোটগল্প ও উপন্যাস উভয় শাখাতেই রাহাত খানের অবদান উল্লেখযোগ্য। সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও ১৯৯৬ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। বিখ্যাত গোয়েন্দা সিরিজ মাসুদ রানার মেজর রাহাত খান চরিত্রটি তাঁর নামানুসারেই তৈরি করা।
২৮ আগস্ট ২০২০ সালে নিউ ইস্কাটনের নিজ বাসায় রাহাত খান মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। তাঁকে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
রাহাত খানের লেখা প্রথম উপন্যাসের প্রথম লাইন পড়েই নড়েচড়ে বসতে হলো। ধীরে ধীরে পাঠকের সাথে পরিচয় ঘটে রফিক, ফরহাদ, নাজির, কেয়া, কস্তুরী, জুলিয়াসহ উপন্যাসের প্রধান কুশীলবদের।এদের যাপিত জীবনের অম্ল, মধুর, তিক্ত অভিজ্ঞতার গল্পই "অমল ধবল চাকরি।"লেখকের ভাষা ঝরঝরে ও ঋজু। দেখা যাচ্ছে,শুরু থেকেই চারপাশের মানুষ ও সমাজকে নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করার অনায়াস দক্ষতা ছিলো রাহাত খানের। নায়ক রফিক অনায়াসে হুমায়ূন এর সংসারবিমুখ, সাধুপুরুষ নায়ক হতে পারতো। কিন্তু রফিক ভবঘুরে হলেও জীবন সম্পর্কে উদাসীন নয়।নারী মদ মাংসের প্রতি সে নিরতিশয় আসক্ত।তার বন্ধুরাও তাই। বাংলাদেশে ষাট ও সত্তর দশকের সমাজ পরিবর্তন এ উপন্যাসে জীবন্তভাবে ধরা পড়েছে। এটা সেই সময়ের গল্প যখন যৌথ পরিবার ভেঙে পড়ছে, মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে,মানুষ প্রাচীন ধ্যানধারণা ছাড়তে চাচ্ছে আবার যুগের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে পুরোপুরি আধুনিকও হতে পারেনি মানসিকতায়। রফিক ও জুলিয়ার সুখি মানুষ, সুখি পরিবারের সন্ধান এক বিচিত্র বিষাদের জন্ম দেয় মনে। আর নায়কের মতোই আমাদের অমল ধবল জীবন অক্লান্তভাবে বয়ে যেতে থাকে।
দিলুর গল্পের লেখক হিসেবে রাহাত খানের সাথে পরিচয়। মূল পরিচয় অবশ্য আরো আগে, জেনেছিলাম কাজী আনোয়ার হোসেন এনার ছায়াতেই এঁকেছিলেন মাসুদ রানার বস রাহাত খানকে।
এরপর বহু বহু বছর পর, মাসখানেক আগে পুরনো বই বিক্রি করে এরকম এক পেইজে পেয়ে গেলাম বইটা। হাতে পাওয়ার ঠিক অল্প কিছুদিন পর লেখক স্বয়ং বিদায় নিলেন।
অমল ধবল চাকরি সম্ভবত রাহাত খানের প্রথম উপন্যাস। বেরিয়েছিল মুক্তধারা থেকে, ১৯৮২র মার্চে। অন্তত সৌভাগ্যের বিষয়, আমার শেলফে আছে এই প্রথম এডিশনটাই।
অমল ধবল চাকরি পড়ার উপযুক্ত সময় মে বি এইটাই, যখন আপনি হাড় বেকার। হাড় বেকার মানে ডাবল বেকার, চাকরি করে তারপর বেকার, হাতে টাকা নাই, অসহায় লাগতেছে, মাস শেষে পকেটে টাকা আসার কথা মনে পড়তেছে। তবে তখনকার মানুষ বেশ আধুনিক ছিল যা দেখলাম, এখন দিন দিন খুব সম্ভবত অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে।
যদি বলি অনেকদিন পর একটি বই এক বসায় শেষ করেছি তাহলেও মিথ্যা বলা হবে না। রাহাত খানের এই উপন্যাস ধৈর্যচ্যুত এবং উন্নাসিক এই আমাকে অনেকদিন পর একটানা কোন বই পড়তে সাহায্য করেছে। লেখকের ভাষা বেশ সুন্দর সাবলীল, অনেকটা নিজের মুখের বলা দৈনন্দিন কথাবার্তা মতোই। আর প্রচ্ছদে যদি তাকান তাহলে দেখবেন ছয়টি মুখ। এই মুখ হয়তো গল্পে তথাকথিত পঞ্চপাণ্ডব এবং দ্রৌপদীকে উপস্থাপন করে।(আমার নিজের ধারণা, অন্য কিছুও হতে পারে) গল্পের শুরুতে রফিক তার চাকরি হারায়। চাকরি হারানো রফিক এবং তার সমসাময়িক ঢাকা গল্পের উপজীব্য। অনেক ভালো লেখা হারিয়ে যায় সময়ের অতলে। সেই অতল থেকে কিছু লেখা আবারও আলোর মুখ দেখতে চায়। রাহাত খানের রচিত এই উপন্যাসটি তার রচিত প্রথম উপন্যাস। যদিও আজকাল আর পাওয়া যায় না বলতে গেলে। তবুও সময়ে অসময়ে ফুটপাতে কিংবা নীলক্ষেতে দেখা মিলিতে পারে।
কাঁচা হাতের প্রিটেনশাস গদ্য। বলপূর্বকভাবে বোহেমিয়ান বানানো হয়েছে এমন কয়েকটা হাফবয়েল্ড চরিত্র। সেইসব চরিত্রদের নির্মিতিও অসম্পূর্ণ। কাহিনিরও বিশেষ মাথামুন্ডু খুঁজে পেলাম না। যে-সময়ে এই উপন্যাস লেখা হয়েছিল, সেই সময়ে হয়তো নতুনত্বের খাতিরে পড়তে ভালো লাগতে পারে, কিন্তু এই থিম নিয়ে বাংলা ভাষাতেই এত সার্থক গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে যে, আজকের দিনে এসে বিশেষ কিছুই মনে হলো না।
অনেক কসরত, অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাওয়া বই।বলা চলে, একটা সময় বা একটা জেনারেশনের গল্প। তাদের জীবন যাপন, মুখের ভাষা, চিন্তা ভাবনা এখানে পাওয়া যায়। খুব যে আহামরি কিছু তা বলা যাবে না। অন্তত যতখানি আশা করেছিলাম তা নয় কিন্তু ঐযে এই বইয়ে একটা raw vive আছে ওই জিনিসটা আজকের দিনের লেখকরা দিতে ভুলে গেছে। এই একটা কারণই রাহাত খানের এই বইটা ভালো লাগতে যথেষ্ট।
এই বইটার কথা মনে থাকবে অনেকদিন অথবা আজীবন। বইটা খুঁজছিলাম অনেক অনেক দিন ধরে। বইটা এখন আর কিনতে পাওয়া যায় না। কোথাও কোন ইবুক ও পাওয়া যায়না। আবার ভৌগলিক অবস্থানের কারণে কারো কাছ থেকে ধার নিয়ে পড়ার ও কোন উপায় নাই। গুডরিডস এ পড়ে রিভিউ দিছে এমন দুই জন কে ম্যাসেজ দিয়ে বলেছিলাম, বইটার ছবি তুলে একটু পাঠানো যায় কিনা। কিন্তু সময়ের অভাবে কেউ ই পেরে উঠছিল না। অবশেষে অনিক চৌধুরী নামের এক পড়ুয়াকে নক দিতেই তিনি ছবি তুলে পিডিএফ বানিয়ে পাঠিয়ে দিলেন। সহস্র ভালোবাসা কৃতজ্ঞতা তার জন্য।
কেউ পড়তে আগ্রহী হলে আমাকে ম্যাসেজ দিতে পারেন। আমি পিডিএফ টা ইমেইল করে দিব, যেহেতু বইটার প্রিন্টেড কপি অ্যাভেলেবল না। তবে পিডিএফ টাতে ৩/৪ পেজ আপাতত মিসিং আছে। অনিক আমাকে কথা দিয়েছেন পিডিএফ টা কমপ্লিট করে আমাকে আবার পাঠাবেন।
১৯৭৭, স্বাধীনতা যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি থেকে ঢাকা অনেকটা সেরে উঠেছে, উঠছে। আর সময়ের স্রোতরেখায় জীবনও এগিয়ে চলছে জীবনের নিয়মে। অমল ধবল চাকরি বইয়ের আখ্যান সেই সময়ের ঢাকার পটভূমিতে বর্ণিত। সাদামাটা ধাঁচে বইটা শুরু হয়, চাকরি চলে যাওয়ার খবর শুনতে শুনতে, রফিকের নির্বিকারভাবে বাদাম খাওয়ার বর্ণনা দিয়ে। এরপরে গল্প চলতে থাকে এক খেয়ালী নদীর মত, রফিকের পাগলাটে ভাবের সাথে তার বেশ মিল আছে।
সেই সময়ের ঢাকা শহর দ্রুত ভাঙাগড়ার ভেতর দিয়ে বদলে যাওয়ার মত, বদলে যাচ্ছে রফিকদের বন্ধুদের সার্কেলও। একটা বিজ্ঞাপন অফিসে পঞ্চপাণ্ডব আর এক দৌপ্রদী, এই মিলে তাদের ছোট বৃত্ত। কিন্তু জীবিক���র তাগিদে একেকজন ছড়িয়ে পড়ে একেক দিকে, বৃত্তের বিন্দুগুলোকে ঘিরে তৈরি হয় তাদের নিজস্ব বৃত্ত। একই শহরে, একই ঘোলাটে আকাশের নিচে থেকেও, তাদের দূরত্ব যোজন যোজন মাইল দূরে। অনেকটা সমুদ্রের ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন নির্জন দ্বীপের মত। এই দ্বীপের মাঝেই বসবাস করে সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্নার বিভিন্ন গল্প।
সাংবাদিকতার চাকরি রফিককে ছেড়ে গেলেও, রফিক সাংবাদিকতা ছাড়তে পারেনি। নিজ মনেই সে রিপোর্ট তৈরি করে, সাক্ষাৎকার নেয়। রমনার বিশাল মাঠে ভিক্ষের সন্ধানে বসে থাকা বৃদ্ধ, যার একমাত্র সম্বল রমনার বিশাল মাঠের চেয়েও বড় নিঃস্বতা, তাকে প্রশ্ন করে রফিক, "জীবনে মোক্ষলাভের উপায় কী?"
গল্পের বাকিসব চরিত্ররাও রফিকের মতই ইন্টারেস্টিং। গল্পে পাওয়া যায় সুদূর বাভারিয়া থেকে আগত এক বিদেশিনী ট্যুরিস্ট, যার ইচ্ছে বাংলাদেশ ঘুরে দেখা। পাওয়া যায় রকিব আর তার ছেলে পিলুকে, যাকে কিনা শোনাতে হয় বগা মিঞা আর বাঘের মিষ্টি খাওয়ার গল্প। কেয়া মীর্জা, উৎফুল্ল, হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণশক্তিতে ভরপুর এক যুবতী। আরও আছে বন্ধুবর ফরহাদ এবং টুনু, পাগলা নাজির এবং অন্যান্য পার্শ্বচরিত্র। অতীতের স্মৃতি রোমন্থন আর বর্তমানে দৈনন্দিনতার ছন্দে চলতে চলতে গল্প এগিয়ে চলে তার নিজস্ব গতিতে।
এবার একটু লেখক, আর লেখনী প্রসঙ্গে বলি। রাহাত খানের "দিলুর গল্প" বইটার মাধ্যমে লেখকের সাথে আমার প্রথম মোলাকাত। গপ্পোবাজ দিলু আর পাড়ার বন্ধুবান্ধবের নানাবিধ হাস্যরসাত্মক অ্যাডভেঞ্চারের গল্প নিয়ে লেখা বইটা আদর্শ কিশোর উপন্যাসের উদাহরণ। এরপরে লেখকের আরও বই পড়ার ইচ্ছে থাকলেও, কখনো সেভাবে খোঁজা হয়নি, পাওয়াও যায়নি। অর্ক ভাইয়ের বদৌলতে অবশেষে অমল ধবল চাকরি পড়া হলো।
বইটায় লেখক তার নিজস্বতায় প্রতীয়মান। দিলুর গল্পের মত হাস্যরস উপস্থিত থাকলেও, দৈনন্দিন বাস্তবতার উপজীব্য ফুটিয়ে তুলেছেন দক্ষতার সাথেই। সুতরাং, পুরোদমে কমেডি একে বলা চলে না। এই বইতে খুঁজে পাওয়া যায় অন্য আরেক রাহাত খানকে। বর্ণনা, উপমার ব্যাপারেও লেখক তার স্বাধীনতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন।
বেশ কিছু লাইন পড়ে শুরুতে একটু অদ্ভুত লাগলেও, পরে মনে হয়েছে বর্ণনাটা অদ্ভুত সুন্দর। যেমন সেই সময়ের ইন্টারকনের বর্ণনা করেছেন এভাবে, "এখন চারদিকে গোধূলি বেলার নম্র সুন্দর কনে দেখা আলো। ইন্টারকন ও ভিআইপি মার্কেটের পরিসরে আকাশ নিচু হয়ে নেমেছে, পাতলা নীল ওড়নার মতো উড়ছে। টুংটাং ঘণ্টা বাজিয়ে রিকশা ছুটল। ঢাকা শহরের নিরীহ বাসিন্দা কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো পূর্বের বাতাসকে আয় আয় বলে ডাকছে। কিছু মেঘও তাকিয়ে আছে শহরের দিকে।"
অদ্ভুত, কিন্তু সুন্দর। আবার সন্ধ্যের ঢাকার আলোছায়ার বর্ণিল চিত্র এঁকেছেন মৃত মানুষের বিশ্বাসকে টুকরো টুকরো মেঘের মত ভাসিয়ে দিয়ে। শহরের বদলে যাওয়াকে যিনি তুলনা করেন মানুষের হৃদয়ে পুরনো দুঃখকে সরিয়ে নতুন দুঃখের জায়গা করে নেওয়ার সাথে। এমন নানাবিধ খামখেয়ালির মধ্য দিয়ে যবনিকাপাত হয়, অমল ধবল চাকরির।