রাহাত খান ১৯৪০ সালের ১৯ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার পূর্ব জাওয়ার গ্রামের খান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তৃতীয় শ্রেণীতে পড়াকালীন তাঁর প্রথম গল্পটি লিখেছিলেন। রাহাত খান আনন্দ মোহন কলেজ থেকে অর্থনীতি ও দর্শনে ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষাজীবন শেষ করে খান ময়মনসিংহ জেলার নাসিরাবাদ কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন। এরপর দৈনিক ইত্তেফাকে যোগ দেন, পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পত্রিকাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ছোটগল্প ও উপন্যাস উভয় শাখাতেই রাহাত খানের অবদান উল্লেখযোগ্য। সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও ১৯৯৬ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। বিখ্যাত গোয়েন্দা সিরিজ মাসুদ রানার মেজর রাহাত খান চরিত্রটি তাঁর নামানুসারেই তৈরি করা।
২৮ আগস্ট ২০২০ সালে নিউ ইস্কাটনের নিজ বাসায় রাহাত খান মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। তাঁকে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
রাহাত খানের লেখা প্রথম উপন্যাসের প্রথম লাইন পড়েই নড়েচড়ে বসতে হলো। ধীরে ধীরে পাঠকের সাথে পরিচয় ঘটে রফিক, ফরহাদ, নাজির, কেয়া, কস্তুরী, জুলিয়াসহ উপন্যাসের প্রধান কুশীলবদের।এদের যাপিত জীবনের অম্ল, মধুর, তিক্ত অভিজ্ঞতার গল্পই "অমল ধবল চাকরি।"লেখকের ভাষা ঝরঝরে ও ঋজু। দেখা যাচ্ছে,শুরু থেকেই চারপাশের মানুষ ও সমাজকে নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করার অনায়াস দক্ষতা ছিলো রাহাত খানের। রফিক হুমায়ূন আহমেদের সংসারবিমুখ, সাধুপুরুষ নায়ক হতে পারতো। কিন্তু রফিক ভবঘুরে হলেও জীবন সম্পর্কে উদাসীন নয়। নারী মদ মাংসের প্রতি সে নিরতিশয় আসক্ত। তার বন্ধুরাও তাই। বাংলাদেশে ষাট ও সত্তর দশকের সমাজ পরিবর্তন এ উপন্যাসে জীবন্তভাবে ধরা পড়েছে। এটা সেই সময়ের গল্প যখন যৌথ পরিবার ভেঙে পড়ছে, মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে,মানুষ প্রাচীন ধ্যানধারণা ছাড়তে চাচ্ছে আবার যুগের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে পুরোপুরি আধুনিকও হতে পারেনি মানসিকতায়। রফিক ও জুলিয়ার সুখি মানুষ, সুখি পরিবারের সন্ধান এক বিচিত্র বিষাদের জন্ম দেয় মনে। আর নায়কের মতোই আমাদের অমল ধবল জীবন অক্লান্তভাবে বয়ে যেতে থাকে।
(২৬ আগস্ট, ২০২১)
বহুবছর প্রিন্টআউট থাকার পর পশ্চিমবঙ্গের ব্রেনফিভার থেকে বইটির নতুন সংস্করণ (+ সুলভ বাংলাদেশি সংস্করণ) প্রকাশিত হয়েছে। ২০২১ এ গুডরিডসে পাঠ-প্রতিক্রিয়া লেখার পর বহু পাঠক বইটার খোঁজ নিয়েছেন। আশা করি এখন তারা সংগ্রহ করে উপন্যাসটি পড়তে পারবেন। রাহাত খান আমার খুব পছন্দের একজন কথাশিল্পী। তার কাজ নিয়ে আলোচনা হয় না একদমই। নতুন প্রজন্মের পাঠকরা তাকে চেনে না বললেই চলে। "অমল ধবল চাকরি" রাহাত খান পাঠের চমৎকার একটি সূচনা হতে পারে।
দিলুর গল্পের লেখক হিসেবে রাহাত খানের সাথে পরিচয়। মূল পরিচয় অবশ্য আরো আগে, জেনেছিলাম কাজী আনোয়ার হোসেন এনার ছায়াতেই এঁকেছিলেন মাসুদ রানার বস রাহাত খানকে।
এরপর বহু বহু বছর পর, মাসখানেক আগে পুরনো বই বিক্রি করে এরকম এক পেইজে পেয়ে গেলাম বইটা। হাতে পাওয়ার ঠিক অল্প কিছুদিন পর লেখক স্বয়ং বিদায় নিলেন।
অমল ধবল চাকরি সম্ভবত রাহাত খানের প্রথম উপন্যাস। বেরিয়েছিল মুক্তধারা থেকে, ১৯৮২র মার্চে। অন্তত সৌভাগ্যের বিষয়, আমার শেলফে আছে এই প্রথম এডিশনটাই।
এই মুহূর্তে মানুষ যে কিসের পিছনে ঘুরে, নিজেরাও জানে না। তবে একটা বড়ো অংশ ঘুরে হচ্ছে সমাজে প্রতিষ্ঠা পাবার জন্যে। ভালো রেজাল্ট করতে হবে, তারপর ভালো চাকরি পেতে হবে, সেখানেও ভালো করতে হবে, উপর উঠতে হবে, ভ্যালিডেশন পেতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। ট্রাস্টিং দি প্রোসেস, হ্যাভিং পেশেন্স, এম্বিশনের চেয়ে মেন্টাল পিসকে একটু বেশি প্রাধান্য দেয়া - এইসব এখন আর ধোপে টেকে না অতটা। ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্সের ট্রেড অফের মধ্যে কেন যেন মনে হয় হারানোর ভাগটা বেশি থাকে ইদানীং। এই বইয়ের চরিত্রগুলো এইসব জাগতিক চিন্তাভাবনা থেকে খানিক দূরেই বসবাস করে। কোনো নির্দিষ্ট গল্প বা চরিত্রকে প্রধান করে এই উপন্যাস লেখা হয় নাই, বরং এখানে একটা বার্ডস আই ভিউতে চরিত্রগুলোর জীবনের গল্প লেখকের সুন্দর বর্ণনাশৈলীতে ফুটে উঠেছে। প্রত্যেকের জীবনের চাহিদা, ইচ্ছা, সামর্থ্য, ভিন্ন; তবে একটা জায়গায় সবাই এক - মেনে নেয়া। নিজের বর্তমান অবস্থা মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে চলায় সকলেই তৃপ্ত। এদেরকে সেলফ কমপ্লিসেন্ট না, বরং "কন্টেন্ট" বলতে পারি আমরা। এই মুহূর্তে আমাদের এটাই সম্ভবত বেশি প্রয়োজন: "দাঁড়াও, পথিক-বর, জন্ম যদি তব বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল!"
আমরা হয়তো কমিটমেন্ট আর টার্গেট ফুলফিল করার স্ট্রেসে পরিপূর্ণ জীবনের দুপুর রোদে গাছের নিচে একটু বসে জিরিয়ে নেয়ার চিন্তা করতেই পারি।
যদি বলি অনেকদিন পর একটি বই এক বসায় শেষ করেছি তাহলেও মিথ্যা বলা হবে না। রাহাত খানের এই উপন্যাস ধৈর্যচ্যুত এবং উন্নাসিক এই আমাকে অনেকদিন পর একটানা কোন বই পড়তে সাহায্য করেছে। লেখকের ভাষা বেশ সুন্দর সাবলীল, অনেকটা নিজের মুখের বলা দৈনন্দিন কথাবার্তা মতোই। আর প্রচ্ছদে যদি তাকান তাহলে দেখবেন ছয়টি মুখ। এই মুখ হয়তো গল্পে তথাকথিত পঞ্চপাণ্ডব এবং দ্রৌপদীকে উপস্থাপন করে।(আমার নিজের ধারণা, অন্য কিছুও হতে পারে) গল্পের শুরুতে রফিক তার চাকরি হারায়। চাকরি হারানো রফিক এবং তার সমসাময়িক ঢাকা গল্পের উপজীব্য। অনেক ভালো লেখা হারিয়ে যায় সময়ের অতলে। সেই অতল থেকে কিছু লেখা আবারও আলোর মুখ দেখতে চায়। রাহাত খানের রচিত এই উপন্যাসটি তার রচিত প্রথম উপন্যাস। যদিও আজকাল আর পাওয়া যায় না বলতে গেলে। তবুও সময়ে অসময়ে ফুটপাতে কিংবা নীলক্ষেতে দেখা মিলিতে পারে।
অমল ধবল চাকরি পড়ার উপযুক্ত সময় মে বি এইটাই, যখন আপনি হাড় বেকার। হাড় বেকার মানে ডাবল বেকার, চাকরি করে তারপর বেকার, হাতে টাকা নাই, অসহায় লাগতেছে, মাস শেষে পকেটে টাকা আসার কথা মনে পড়তেছে। তবে তখনকার মানুষ বেশ আধুনিক ছিল যা দেখলাম, এখন দিন দিন খুব সম্ভবত অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে।
১৯৭৭, স্বাধীনতা যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি থেকে ঢাকা অনেকটা সেরে উঠেছে, উঠছে। আর সময়ের স্রোতরেখায় জীবনও এগিয়ে চলছে জীবনের নিয়মে। অমল ধবল চাকরি বইয়ের আখ্যান সেই সময়ের ঢাকার পটভূমিতে বর্ণিত। সাদামাটা ধাঁচে বইটা শুরু হয়, চাকরি চলে যাওয়ার খবর শুনতে শুনতে, রফিকের নির্বিকারভাবে বাদাম খাওয়ার বর্ণনা দিয়ে। এরপরে গল্প চলতে থাকে এক খেয়ালী নদীর মত, রফিকের পাগলাটে ভাবের সাথে তার বেশ মিল আছে।
সেই সময়ের ঢাকা শহর দ্রুত ভাঙাগড়ার ভেতর দিয়ে বদলে যাওয়ার মত, বদলে যাচ্ছে রফিকদের বন্ধুদের সার্কেলও। একটা বিজ্ঞাপন অফিসে পঞ্চপাণ্ডব আর এক দৌপ্রদী, এই মিলে তাদের ছোট বৃত্ত। কিন্তু জীবিকার তাগিদে একেকজন ছড়িয়ে পড়ে একেক দিকে, বৃত্তের বিন্দুগুলোকে ঘিরে তৈরি হয় তাদের নিজস্ব বৃত্ত। একই শহরে, একই ঘোলাটে আকাশের নিচে থেকেও, তাদের দূরত্ব যোজন যোজন মাইল দূরে। অনেকটা সমুদ্রের ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন নির্জন দ্বীপের মত। এই দ্বীপের মাঝেই বসবাস করে সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্নার বিভিন্ন গল্প।
সাংবাদিকতার চাকরি রফিককে ছেড়ে গেলেও, রফ��ক সাংবাদিকতা ছাড়তে পারেনি। নিজ মনেই সে রিপোর্ট তৈরি করে, সাক্ষাৎকার নেয়। রমনার বিশাল মাঠে ভিক্ষের সন্ধানে বসে থাকা বৃদ্ধ, যার একমাত্র সম্বল রমনার বিশাল মাঠের চেয়েও বড় নিঃস্বতা, তাকে প্রশ্ন করে রফিক, "জীবনে মোক্ষলাভের উপায় কী?"
গল্পের বাকিসব চরিত্ররাও রফিকের মতই ইন্টারেস্টিং। গল্পে পাওয়া যায় সুদূর বাভারিয়া থেকে আগত এক বিদেশিনী ট্যুরিস্ট, যার ইচ্ছে বাংলাদেশ ঘুরে দেখা। পাওয়া যায় রকিব আর তার ছেলে পিলুকে, যাকে কিনা শোনাতে হয় বগা মিঞা আর বাঘের মিষ্টি খাওয়ার গল্প। কেয়া মীর্জা, উৎফুল্ল, হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণশক্তিতে ভরপুর এক যুবতী। আরও আছে বন্ধুবর ফরহাদ এবং টুনু, পাগলা নাজির এবং অন্যান্য পার্শ্বচরিত্র। অতীতের স্মৃতি রোমন্থন আর বর্তমানে দৈনন্দিনতার ছন্দে চলতে চলতে গল্প এগিয়ে চলে তার নিজস্ব গতিতে।
এবার একটু লেখক, আর লেখনী প্রসঙ্গে বলি। রাহাত খানের "দিলুর গল্প" বইটার মাধ্যমে লেখকের সাথে আমার প্রথম মোলাকাত। গপ্পোবাজ দিলু আর পাড়ার বন্ধুবান্ধবের নানাবিধ হাস্যরসাত্মক অ্যাডভেঞ্চারের গল্প নিয়ে লেখা বইটা আদর্শ কিশোর উপন্যাসের উদাহরণ। এরপরে লেখকের আরও বই পড়ার ইচ্ছে থাকলেও, কখনো সেভাবে খোঁজা হয়নি, পাওয়াও যায়নি। অর্ক ভাইয়ের বদৌলতে অবশেষে অমল ধবল চাকরি পড়া হলো।
বইটায় লেখক তার নিজস্বতায় প্রতীয়মান। দিলুর গল্পের মত হাস্যরস উপস্থিত থাকলেও, দৈনন্দিন বাস্তবতার উপজীব্য ফুটিয়ে তুলেছেন দক্ষতার সাথেই। সুতরাং, পুরোদমে কমেডি একে বলা চলে না। এই বইতে খুঁজে পাওয়া যায় অন্য আরেক রাহাত খানকে। বর্ণনা, উপমার ব্যাপারেও লেখক তার স্বাধীনতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন।
বেশ কিছু লাইন পড়ে শুরুতে একটু অদ্ভুত লাগলেও, পরে মনে হয়েছে বর্ণনাটা অদ্ভুত সুন্দর। যেমন সেই সময়ের ইন্টারকনের বর্ণনা করেছেন এভাবে, "এখন চারদিকে গোধূলি বেলার নম্র সুন্দর কনে দেখা আলো। ইন্টারকন ও ভিআইপি মার্কেটের পরিসরে আকাশ নিচু হয়ে নেমেছে, পাতলা নীল ওড়নার মতো উড়ছে। টুংটাং ঘণ্টা বাজিয়ে রিকশা ছুটল। ঢাকা শহরের নিরীহ বাসিন্দা কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো পূর্বের বাতাসকে আয় আয় বলে ডাকছে। কিছু মেঘও তাকিয়ে আছে শহরের দিকে।"
অদ্ভুত, কিন্তু সুন্দর। আবার সন্ধ্যের ঢাকার আলোছায়ার বর্ণিল চিত্র এঁকেছেন মৃত মানুষের বিশ্বাসকে টুকরো টুকরো মেঘের মত ভাসিয়ে দিয়ে। শহরের বদলে যাওয়াকে যিনি তুলনা করেন মানুষের হৃদয়ে পুরনো দুঃখকে সরিয়ে নতুন দুঃখের জায়গা করে নেওয়ার সাথে। এমন নানাবিধ খামখেয়ালির মধ্য দিয়ে যবনিকাপাত হয়, অমল ধবল চাকরির।
কাঁচা হাতের প্রিটেনশাস গদ্য। বলপূর্বকভাবে বোহেমিয়ান বানানো হয়েছে এমন কয়েকটা হাফবয়েল্ড চরিত্র। সেইসব চরিত্রদের নির্মিতিও অসম্পূর্ণ। কাহিনিরও বিশেষ মাথামুন্ডু খুঁজে পেলাম না। যে-সময়ে এই উপন্যাস লেখা হয়েছিল, সেই সময়ে হয়তো নতুনত্বের খাতিরে পড়তে ভালো লাগতে পারে, কিন্তু এই থিম নিয়ে বাংলা ভাষাতেই এত সার্থক গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে যে, আজকের দিনে এসে বিশেষ কিছুই মনে হলো না।
মানব জীবন পূর্ণ দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মতন। গল্পের পর গল্প রচনা করা আছে,সেই মত জীবন বয়ে যায়। অথচ কারো টা কারো সাথে মিলে না। যেমন মিলে না রফিকের সাথে নাজিরের,নাজিরের সাথে রকিবের কিংবা কস্তুরীর সাথে জুলেখার...
জীবন বৈচিত্র্যময়। জীবন আমূল রহস্যে ঘেরা! কে বোঝে, ক'জন বোঝে জীবনের মানে? সবাই শুধু জীবনকে হাতড়ে খুঁজে বেড়ায়,জীবনের মানে খুঁজে চলে সায়রের মাঝে রফিক কিংবা জুলেখার মত...
একইসঙ্গে অদ্ভুত এক চেনা নস্টালজিয়া আর তীক্ষ্ণ আধুনিকতার মিশেল পাওয়া যায় 'অমল ধবল চাকরি' উপন্যাসে। রাহাত খান সেই ১৯৮২ সালে তাঁর স্বতন্ত্র উইট, সাবলীল ব্যঙ্গ এবং চমৎকার ভাষাশৈলীর মাধ্যমে এক পরিচিত সময় ও সামাজিক বাস্তবতাকে তুলে ধরেছিলেন নতুন আলোয়। সেখানে কখনও বিভ্রমে, কখনও বিপুল দর্পে দাপিয়ে বেড়ায় উপন্যাসের চরিত্রগুলো। আর শেষ পর্যন্ত রেখে যায়, কোনো ঝোড়ো রাতের দুর্যোগ শেষে নেমে আসা এক অসীম শূন্যতা।
একটা স্বপ্নাবিষ্ট জীবনের হাতছানি আছে লেখায়.. যেন ঐ গত জীবনের কোন গল্প যা ফেলে আসার পর আফসোস থেকে যায় মনে.. রাহাত খানের গদ্য মিঠে বাতাসের মতো.. ক্লান্তি দূর করে আর এই গল্পের নির্লিপ্ততার মাঝে উঁকি দিয়ে যাওয়া রক্ত মাংসের জীবন আবারও দাঁড় করিয়ে দেয় সে’ই আয়নার সামনে যেখানে লেগে আছে চিরস্থায়ী ধুলো।
চাকরি মানুষকে একটি শিকলে আবদ্ধ করে ফেলে। দায়বদ্ধতার বেড়াজালে মানুষের স্বাধীনচেতা মনকে বন্দী করে রাখে। কিন্তু যার মধ্যে স্বাধীনতার বীজ রয়েছে তাকে কি এভাবে থামিয়ে রাখা যায়? তাই বারবার উড়নচণ্ডী মন নিয়ে রফিক মাঝে মাঝেই গা ঢাকা দেয়। কোথায় হারিয়ে যায়, কেউ জানে না।
একবার সহ্য করা যায়, দুইবার সহ্য করা যায়! কিন্তু বারবার কি আর মেনে নেওয়া যায়? সাংবাদিকতা চাকরি থেকে রফিকের অব্যহতি তাই অবধারিত ছিল। আর গল্পের শুরুটাও এই নির্মম এক ঘটনার মধ্য দিয়ে।
স্বভাবতই কোনো গল্পের শুরুতে কারো চাকরি চলে যাওয়ার ঘটনা জানতে পারলে একটা ধারণা হতে পারে, এই বইটা হয়তো কোনো ট্র্যাজেডি বা বিষাদের উপলক্ষ্য এনে দিতে পারে। কিন্তু ঘটনার দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। রফিক এতটাই বাউন্ডুলে যে নিজের এই চাকরির খবর শুনে হাপিত্যেশ না করে পরিস্থিতি মেনে নেওয়াটাই জরুরি মনে করেছে। জীবন তো একটাই। একাকীত্বের এই জীবনে যখন কোনো সঙ্গী নেই, কোনো পিছুটান নেই তাহলে কেন এই আক্ষেপ? বরং সামনে যা আছে তাকে মেনে নিয়েই জীবনটা উপভোগ করা উচিত।
“অমল ধবল চাকরি” বইটা দেশ স্বাধীন হওয়ার এক দশক পরের ঘটনা। দেশ তখন কঠিন সময়কে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় হাতে নিয়েছে। যদিও এই বইটিতে রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ, দেশীয় পরিস্থিতির উপর লেখক গুরুত্ব দেননি; বরং লেখক দেখিয়েছেন সেই সময়ের আর্থসামাজিক অবস্থা। দেখানোর চেষ্টা করেছেন সেই সময়ের ঢাকার একটা খণ্ডচিত্র। আর সবচেয়ে বড় কথা, এখানে উঠে এসেছে তখন কিছু তরুণ, যুবকদের জীবনের গতিপথ। যেখানে কত রূপ ভিন্ন পরিস্থিতিতে সামনে আসে। এই বিষয়টাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একটি বন্ধুমহলের কথা এখানে বলা হয়েছে, যেখানে সমাজের প্রতিটি শ্রেণির মানুষের বসবাস। কেউ সদ্য চাকরি হারিয়ে বাউন্ডুলে, ক��রো অঢেল পয়সাকড়ি আছে, কেউ অর্থিক দিক দিয়ে এমনভাবে ধুঁকছে যে বাসাভাড়া দিতে না পারার কারণে বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়া হয়, কেউ সদ্য স্ত্রী হারিয়ে এক সন্তানকে আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করছে, কিংবা প্রেমের এক মধুর গল্পের আড়ালে অন্ধকার কিছু অধ্যায় সামনে চলে এলেও আসতে পারে।
“অমল ধবল চাকরি”-র ভাষাশৈলী অনেক শক্তিশালী। পড়ে ভালো লেগেছে। সাবলীল বাচনভঙ্গিতে লেখক কিছু মানুষের জীবনের গল্পটা রচনা করেছেন। তখনকার সময়কার প্লট হিসেবে আধুনিক সমাজ; উচ্চ, মধ্য বা নিম্নবিত্ত শ্রেণির এই গল্প সেই সময়ের ঢাকা ও এর তরুণ সমাজের প্রতিচ��ছবি হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। আমি মূলত বাংলা বইয়ে ইংরেজি শব্দের আধিক্য পছন্দ করি না। কিন্তু এই বইতে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়েছে। কথাবার্তা, সংলাপে ইংরেজির ব্যবহার তখনকার সমাজের শিক্ষিত হয়ে ওঠার ব্যবস্থাকেই প্রতিফলিত করে। জোর করে নয়, বরং এ-ই যেন স্বাভাবিক।
রাহাত খানের লেখা এর আগে পড়া হয়নি। যদিও একটি বই পড়েই এমন আলোচনা করা ঠিক নয়, তারপরও মনে হয়েছে লেখক হিসেবে তিনি যথেষ্ট শক্তিমান। কিছুটা আন্ডাররেটেডও বটে। তবে লেখকের অন্যান্য বইগুলো পড়ে আরও ভালো বিচার করা সম্ভব হবে।
এই গল্পের চালিকাশক্তি এর চরিত্ররা। এবং বইয়ের সবচেয়ে দুর্বল দিকও বটে। কেননা, ছোট এই বইতে এত এত চরিত্র এসেছে যে সবগুলো চরিত্রকে ঠিকঠাক ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হয়নি। কিছু চরিত্রকে ভাসাভাসাভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মূল চরিত্র হিসেবে রফিক, নজির, কেয়া বা জুলিয়াকে ধরে নেওয়া যায়। বাকিরা মূল চরিত্র ও পার্শ্বচরিত্রের মাঝামাঝি এক অবস্থানে ছিল।
একটি বন্ধুমহলে সব ধরনের বন্ধু থাকে। কেউ বিত্তশালী হয়ে ইন্টারকনে সুইট বুক করার ক্ষমতা রাখে, কেউ সামান্য বিদ্যুৎ বিলও দিতে পারে না। বাহ্যিক দিক দিয়ে মানুষের মনের অবস্থা ঠিক বোঝা যায় না। লেখক এখানে তা-ই যেন বুঝিয়েছেন। নাহলে সদ্য চাকরি হারানো রফিকের স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার অভ্যন্তরে হয়তো দুঃখবোধ আছে, যা লেখক প্রকাশ্যে আনেননি। একইভাবে কেয়া কিংবা নাজির অথবা জুলিয়া সবার হাসিখুশি স্বাভাবিক জীবনের অভ্যন্তরে কোথাও দুঃখবোধ লুকিয়ে আছে। আছে অনেক না বলা কথা।
এখানে প্রধান দুই নারী চরিত্রের একজন কেয়া, অপরজন জুলিয়া। জুলিয়া জার্মানি থেকে এসেছে নিজের অতীতের খোঁজে। স্বাধীনতাকে ঠিকঠাক উপভোগ করতে। যার পিছুটান নেই। যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। যেখানে খুশি যেতে পারে। অন্যদিকে কেয়ার বিষয়টা অন্য। তার জীবনের গল্পে বেশ পিছুটান আছে। পরিবারকে দেখতে হয়। ভাইবোনের উপর ছায়া হয়ে থাকতে হয়। তাই ভালোবাসা থাকলেও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আগে তাই বেশ ভাবতে হয় পরবর্তী জীবনের পরিস্থিতি।
দুইজন নারী, অথচ তাদের এই বৈপরীত্য যেন এই গল্পের মূল ভাবনা। বিদেশিনী যেখানে নিজেকে খুঁজে পায় এক দেশ থেকে আরেক দেশের প্রকৃতিতে; সেখানে দেশীয় নারী পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ছোটো এক ঘরে তৈরি করে নিয়েছে এক পৃথিবী। যেখান থেকে আর কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই।
তাছাড়া মানুষের সাথে মানুষের বন্ধন বা অপরিচিত মানুষের প্রতিও এক মায়া এখানে দেখানো হয়েছে। কস্তুরী মানুষ হিসেবে কেমন, সে অন্য আলাপ। কিন্তু রফিকের তার প্রতি সহায় দৃষ্টি কখনোই ভাবতে বাধ্য করবে না, সে আসলে ততটাই নিস্পাপ নয়, যতটা দেখা যায়। মানুষ আসলে এমনই। যেখানে দেখা যায় যেমন, তেমনটা বোঝা যায় না। মনের ভিতরে অন্য এক গল্পের বাস, আর বাইরে ভিন্ন এক সত্তা।
আশির দশকের ঢাকা, তখনকার তরুণ বা যুব সমাজ এই বইয়ের প্রধান উপজীব্য। আমি যেন অনুভব করতে পারছিলাম সেই ঢাকাকে। তখনকার সময়ের জন্যসংখাকে যেভাবে বিপুল আখ্যা দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান সময়ের ক্ষেত্রে লেখক কী বলতেন, ভাবনার বিষয়।
বইটা অনেকদিন ধরে প্রিন্টের বাইরে ছিল। ভারতীয় প্রকাশনী ব্রেনফিভারের উদ্যোগে নতুন করে প্রকাশ পেয়েছে। ক্রাউন সাইজের পেপারব্যাক এই বইয়ের সম্পাদনা, মুদ্রণ সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল।
পরিশেষে, এই ধরনের অজস্র বই বাংলা সাহিত্যে আছে যার কথা আমরা জানি না। সময়ের পরিক্রমায় হারিয়ে গেছে সেসব মানসম্পন্ন বই। কিছু কিছু বইয়ের খোঁজ পাওয়া গেলেও দেশেও প্রকাশনীর অনেকেই এগুলো প্রকাশের উদ্যোগ নেয় না। কেননা, ভালো সাহিত্য পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেয়ে ব্যবসাই তাদের কাছে মুখ্য। কিন্তু আমি মনে করি ব্যবসায়িক বইগুলো একটা সময় তার সক্ষমতা হারায়। কিন্তু এমন ভালোমানের বইগুলো প্রচুর ব্যবসা দিতে না পারলেও প্রতিযোগিতার এই বাজারে দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে।
অনেক কসরত, অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাওয়া বই।বলা চলে, একটা সময় বা একটা জেনারেশনের গল্প। তাদের জীবন যাপন, মুখের ভাষা, চিন্তা ভাবনা এখানে পাওয়া যায়। খুব যে আহামরি কিছু তা বলা যাবে না। অন্তত যতখানি আশা করেছিলাম তা নয় কিন্তু ঐযে এই বইয়ে একটা raw vive আছে ওই জিনিসটা আজকের দিনের লেখকরা দিতে ভুলে গেছে। এই একটা কারণই রাহাত খানের এই বইটা ভালো লাগতে যথেষ্ট।
পড়ে দেখুন। চমৎকার একটা বই। রফিক, রকিব, টুনু,বিদেশিনী জুলিয়া, কস্তুরী নাজির সহ আরো অনেকের যে সংযোগ তা দেখে দারুণ লাগবে। এর বাইরেও আরো চরিত্র আছে কিন্তু লেখক যেভাবে সবগুলোকে তুলে ধরেছেন তাতে কোথাও কম বেশি মনে হয়নি। লেখকের গদ্যশৈলী দারুণ। সেই সময়ে এত মর্ডানাইজ লেখা ভাবাই যায় না। অনেক সুন্দর সময় কেটেছে।
এই বইটার কথা মনে থাকবে অনেকদিন অথবা আজীবন। বইটা খুঁজছিলাম অনেক অনেক দিন ধরে। বইটা এখন আর কিনতে পাওয়া যায় না। কোথাও কোন ইবুক ও পাওয়া যায়না। আবার ভৌগলিক অবস্থানের কারণে কারো কাছ থেকে ধার নিয়ে পড়ার ও কোন উপায় নাই। গুডরিডস এ পড়ে রিভিউ দিছে এমন দুই জন কে ম্যাসেজ দিয়ে বলেছিলাম, বইটার ছবি তুলে একটু পাঠানো যায় কিনা। কিন্তু সময়ের অভাবে কেউ ই পেরে উঠছিল না। অবশেষে অনিক চৌধুরী নামের এক পড়ুয়াকে নক দিতেই তিনি ছবি তুলে পিডিএফ বানিয়ে পাঠিয়ে দিলেন। সহস্র ভালোবাসা কৃতজ্ঞতা তার জন্য।
কেউ পড়তে আগ্রহী হলে আমাকে ম্যাসেজ দিতে পারেন। আমি পিডিএফ টা ইমেইল করে দিব, যেহেতু বইটার প্রিন্টেড কপি অ্যাভেলেবল না। তবে পিডিএফ টাতে ৩/৪ পেজ আপাতত মিসিং আছে। অনিক আমাকে কথা দিয়েছেন পিডিএফ টা কমপ্লিট করে আমাকে আবার পাঠাবেন।
এই বইটা পড়তে পড়তে বার বার মনে পড়ে যায় এরিক রোমারের ( Eric Rohmer) সিনেমার কথা। রোমারের সিনেমার চরিত্রদের মতো এই উপন্যাসের চরিত্ররাও, রফিক, কেয়া, ফরহাদ, টুনু কিংবা জুলিয়া তারা বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের এক মুক্তমনা ঢাকা শহরে ঘুরে বেড়ায়, ইচ্ছে হলে কাজ করে, উদ্দেশ্যবিহীন এক আনন্দময় জীবনযাপনের সেই বহুকাঙ্খিত অবসর তাদের রয়েছে যা তারা উদযাপন করে খুব, আবার সেই আনন্দময় মুহূর্তগুলোর মধ্যে যেভাবে আঙুলের ফাঁক দিয়ে ক্রমশ গলে পড়ে বালি, জীবন ও পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা যে ক্রমশ পাল্টে যাচ্ছে এই অমোঘ উপলব্ধির কাঁধে ভর করে কোথাও চুপিসারে ঢুকে পড়ে খানিক বিষাদ। বড় উপভোগ্য এই উপন্যাস কোথাও সেই জীবনের কথা বলে যা আমাদের অনেকেরই পরিচিত অথচ সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার দায়ে আজ প্রায় অধরা হয়ে গিয়েছে, পড়তে পড়তে যুগপৎ ভালো লাগা ও সামান্য মন কেমন দুই-ই বোধ হয়। এই বই পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের কাছে আবারও পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রকাশকদের সাধুবাদ।
বৃক্ষ বললেন, "রফিক, এক একটা গল্প এভাবেই তৈরি হয় পৃথিবীতে।"
আমরা সবাই নিজেদের গল্পে মেইন ক্যারেক্টার। অন্য সবার গল্পে আমরা সাইড ক্যারেক্টারের ভূমিকা পালন করি। সবার গল্পেরই একটা আলাদা কেন্দ্রবিন্দু থাকে। অনেক সময় আমাদের কাছের মানুষের গল্প জানার পরও তাদের গল্প আমরা যেমন মনে করি তা আদৌ সেরকম না। মাঝে মাঝে আমরা অন্যের গল্পকে নিজের করে সে পথে এগিয়ে যাই । দিনশেষে, আমরা সবাই একেকটা গল্প যার সূচনা হয়ত ৩০০০বছর আগে হয়েছে আর অজানা সমাপ্তির আগ পর্যন্ত তা চলতে থাকবে।
এই শহরের বদলানোর কথা, বদলাচ্ছে। মানুষের হৃদয় পুরোনো দু:খ পুষে রাখার জায়গা আর বিশেষ জোগাতে পারে না, নতুন দু:খ,- তারাই অনেকটা স্পেস দখল করে নেয়। আগের দিনগুলোর শুধু জেগে থাকে এক ধরনের মৃদু ছায়াপাত, সুদূর শ্রুত সঙ্গীতের মতো পাপড়িগুলো বাতাসে ওড়ে। -অমল ধবল চাকরি, রাহাত খান