বছর শুরুর প্রারম্ভে একাধিক উপলক্ষ্যকে সামনে রেখে যখন উৎসবের আমেজে সেজেছে পুরো শহর এমন সময় আন্তর্জাতিকভাবে কুখ্যাত এক অপরাধী নিতান্ত আকস্মিকভাবে ধরা পড়লো এয়ারপোর্টে। ধরা পড়েই সে জানালো তাকে ছেড়ে দেওয়া না হলে বছরের প্রথমদিন ঘটবে এমন এক ঘটনা, যার ফলে প্রাণ হারাবে লক্ষাধিক মানুষ। একদিকে ইন্টারপোলসহ বিশ্বের বড়-বড় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর চাপ, অন্যদিকে কুখ্যাত এই অপরাধীর বিশেষ প্রস্তাবের কূটচালে প্রশাসন যখন দিশেহারা এমন সময় জটপাকানো এই ঘটনার দায়িত্ব এসে পড়ে দীর্ঘদিন যাবৎ স্বেচ্ছা-অবসরে থাকা সাইকোলজির এক প্রফেসরের ওপরে। জটিল ও প্রাণঘাতী এই ষড়যন্ত্রের স্বরূপ উদঘাটনের জন্যে প্রফেসরের একমাত্র অস্ত্র তার বুদ্ধিমত্তা, হাতে সময় মাত্র এক রাত। প্রফেসর কি পারবে কুখ্যাত এই অপরাধীকে নিজের বুদ্ধিমত্তার জালে বন্দি করে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ বাঁচাতে...? জবাব জানতে পড়ুন ২৫শে মার্চ, সপ্তরিপু, ব্ল্যাকবুদ্ধা’র মতো উপন্যাস দিয়ে বাংলাদেশ ও কলকাতায় পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করা লেখক রবিন জামান খানের সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার সিরিজের প্রথম উপন্যাস ‘শব্দজাল’- যেখানে ধীশক্তি আর শব্দের খেলায় ফুঁটে উঠেছে মানবমনের বিচিত্র এক অন্ধকার উপাখ্যান।
রবিন জামান খান একজন বাংলাদেশি কথাসাহিত্যিক । রবিন জামান খানের জন্ম ময়মনসিংহ শহরে, পৈত্রিক নিবাস নেত্রকোনার কেন্দুয়ায়। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পড়ালেখা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষাতত্বে দ্বিতীয় মাস্টার্স সম্পন্ন করেন তিনি। পড়া-পড়ানো, শেখা-শেখানোর চর্চা থেকেই শিক্ষকতাকে পেশা ও লেখালেখিকে নেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সংকলনে বেশকিছু মৌলিক ও অনুবাদ গল্প লেখার পাশাপাশি লিখেছেন একাধিক টিভি নাটক। তার মৌলিক থৃলার উপন্যাস শব্দজাল, ২৫শে মার্চ, সপ্তরিপু, ব্ল্যাক বুদ্ধা, ফোরটি এইট আওয়ার্স, দিন শেষে, আরোহী ও অন্ধ প্রহর ইতিমধ্যেই অর্জন করেছে বিপুল পাঠক প্রিয়তা। বাংলাদেশের পাশাপাশি কলকাতা থেকে প্রকাশিত তার মৌলিক গ্রন্থ ২৫শে মার্চ, সপ্তরিপু ও শব্দজাল পশ্চিম বঙ্গের পাঠক মহলে ভালোবাসা কুড়িয়েছে। ভারতবর্ষের ইতিহাসের রহস্যময় ঘটনাবলী, সেইসাথে মানব মনের জটিল মনস্তত্ত্ব বিষয়ে আগ্রহ থেকে উনি বর্তমানে কাজ করে চলেছেন একাধিক ইতিহাস নির্ভর ও সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার উপন্যাস নিয়ে। এরই প্রেক্ষিতে খুব শিঘ্রই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে তার মৌলিক থ্রিলার উপন্যাস বিখন্ডিত, রাজদ্রোহী, ধূম্রজাল, সিপাহী, অশ্বারোহী, মুক্তি। রবিন জামান খান ঢাকায় প্রথম সারির একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের সহকারি অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবষেণা করছেন তিনি।
৩.৫/৫ মাত্র একরাতের ঘটনা।লেখক শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গল্পের গতি ধরে রাখতে পেরেছেন।টুইস্টগুলো চমৎকার ছিলো। কৌশলে হুমায়ূন আহমেদের প্রতি ট্রিবিউট-টাও ভালো লেগেছে। আধুনিক প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার আর একটু দৃষ্টিকটুভাবে জ্ঞান ফলানোর জন্য রেটিং আধা কম দেওয়া হয়েছে(যেগুলো অনেকের কাছে আবার অনেক ভালো লাগতে পারে)। এই গল্প নিয়ে কম বাজেটে দারুণ একটা সিনেমা নির্মিত হতে পারে।
উপন্যাসের নাম 'শব্দজাল', কিন্তু লেখকের শব্দ আর বাক্যবিন্যাসের যা হাল, তাতে মনে হয় ক্লাস সিক্স-সেভেন পড়ুয়া কোন কিশোরের লেখা। সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার নাম দেয়ার পর যদি বাক্যের জাদুতে সঠিক আবহ তৈরি করা না যায়, তো সে বই টানা অসম্ভব। শেষ করতেই পারা গেল না। বাড়তি বিরক্তি হিসেবে আছে লেখার শুরুতেই লেখকের বাগাড়ম্বর--এটা কোনভাবেই প্রচলিত থ্রিলার না, ফিলসফিক্যাল উপন্যাস, ইত্যাদি ইত্যাদি। এখনকার লেখকেরা কি সব পাঠককে ছাগল ভাবেন, নাকি পাঠকেরা আসলেই ছাগল, কে জানে!
সময় উপাখ্যানের পরে এই আরেকটা সিরিজের জন্য মনে হচ্ছে অপেক্ষার প্রহর গুনতে হবে। সুখের কথা ' বিখন্ডিত ' বইটি প্রায় হাতের কাছে। খুব শীঘ্রই পড়ে ফেলতে পারব। 'মিসির আলি ' দারুণ পছন্দের একটা চরিত্র। সেই হিসেবে 'মিসির আলি' আর জ্যাক সাহেবের খেল দেখতেই হচ্ছে।
বইয়ের নাম : শব্দজাল লেখক : রবিন জামান খান। জনরা : সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার প্রকাশনী : নালন্দা প্রকাশনী প্রচ্ছদ : শেখ মাহমুদ ইসলাম মিজু। প্রকাশকাল : সেপ্টেম্বর ২০২০ পৃষ্টা সংখ্যা : ১৫৮ পেজ প্রচ্ছদ মূল্য :৩০০ টাকা ।।
কাহিনী সংক্ষেপ ::
হ্যাপি নিউ ইয়ার।
বছরের শুরুর প্রথম রাত। থার্টি ফাস্ট নাইট এর প্রথম লগ্নেই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ধরা পরে জগৎ কুখ্যাত এক আন্তর্জাতিক অপরাধী আব্দুল্লাহ আল ফাত্তাহ ওরফে অ্যালবার্ট ফাত্তাহ্। যাকে একই সাথে ডাকা হয় ডেমোলিশন এক্সপার্ট বা মাস্টার ডি নামেও।
নতুন বছরের প্রথম দিনেই উদ্বোধন হবে ঢাকা সিটি রেল প্রকল্প। উপস্থিত থাকবেন তিনটি দেশের রাষ্টপ্রধানগন। এমতো অবস্থায় ফাত্তাহ পুলিশ বুরো অব স্পোশাল ইনভেস্ট্রিগেশনকে জানায় যে সে ঢাকার বুকে ফিট করে রেখেছে দুইটি ভয়াবহ বোম্ব। যা কিনা উরিয়ে দিবে পুরো ঢাকা সিটি।
পুলিশ বুরো অব স্পেশাল ইনভেস্ট্রিগেশন এর মাথায় হাত। পিবিএসআই প্রধান আতিকুর আলম ডাক দিলেন তার বন্ধু প্রফেসর জাকারিয়া আহমেদ। যিনি একাডেমীক নন-একাডেমীক জগৎ এ প্রফেসর জ্যাক নামে পরিচিত।
আন্তর্জাতিক এই ক্রিমিনাল এর সম্মুখীন হলেন প্রফেসর জ্যাক। প্রফেসর বুঝতে পারলেন সময় খুবই কম কেননা রাত পোহালেই বোম্ব ব্লাস্ট। প্রফেসর কে নেয়া হলো ইনভেস্টিগেট রুমে, কোন অস্ত্র কিনবা টর্চার নয় একমাত্র অস্ত্র কথা। প্রফেসরকে অ্যালবার্ট ফাত্তার এর কথোপকথনে তাকে বের করে আনতে হবে বোম এর খোঁজ না হয় কাল সকালেই বুম!
পাঠ প্রতিক্রিয়া ::
সুলেখক রবিন জামান খান থ্রিলার জগতে একজন অন্যতম ব্যাক্তিত্ব। বিগত বছর গুলোতে লেখক থ্রিলার প্রেমিদের হাতে দিয়ে এসেছেন "২৫শে মার্চ","সপ্তরিপু","ব্ল্যাক বুদ্ধা" এর মতো জনপ্রিয় হিস্ট্রোরিক্যাল থ্রিলার। এবার পাঠকদের চমকে দিয়ে তিনি এনেছেন সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার "শব্দজাল"। নতুন জনরার বই, নতুন গল্প, নতুন চরিত্রে। অর্থাৎ জনরা পরিবর্তনে লেখক প্রমাণ করতে পরেছেন তার সাফলতা। অনেক সময় দেখেছি চলমান জনরা থেকে নতুন জনরায় লিখতে গিয়ে লেখকরা কিছুটা লেখাচূত্য হয়। কিন্তু রবিন জামান খান এখানে শতভাগ সফল। কেননা তার আগের বই গুলো যে ভাবে আমাকে টেনেছে এটাও ঠিক একি ভাবেই টেনেছে। মাত্র একদিনে বইটা শেষ করলেও রিভিউ লিখতে সময় লাগলো, ব্যক্তিগত কারনে।
এবার বলি গল্পের কথা, "শব্দজাল" একটি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার তা ইতোমধ্যে পাঠকরা জেনেছেন। এখানে একজন আন্তর্জাতিক কুখ্যাত অপরাধীকে ধরার পর তার সাথে অবসর প্রাপ্ত একজন প্রফেসর এর কথোপকথনের মধ্যদিয়ে এগিয়েছে গল্প। অপরাধী ধরা খেয়ে ভিত না হয়ে প্রফেসর এর সাথে আত্মবিশ্বাস নিয়ে যে মাইন্ড গেম টা খেলেছে এবং প্রফেসর নিজেও যেভাবে তা মোকাবেলা করেছে তা ছিলো দেখার মতো। এখানে কোন অস্ত্র নেই। কথার পিস্টে কথা এভাবেই এগিয়েছে। প্রফেসরকে বের করে আনতে হবে বোম এর হদিস। সো এই জায়গা টা আমার ভালো লাগার কেন্দ্র বিন্দু। যেভাবে প্রফেসর বিভিন্ন টেকনিক ইউজ করেন, এবং ফাত্তার গল্প বলা ইত্যাদি সবকিছুই ভালো ছিলো।
পুরো বইটাতে একটি টেনশন কাজ করছিলো যেন কিছু না ছুঁটে যায় আমার কিংবা তার পর কি হবে, কি হবে। তাই শতভাগ মনোগত এর সাথে বইটা শেষ করে আবারো প্রমাণ পেলাম ধৈর্য্যের ফল দারুণ কিছু।
পাঠক হিসাবে আমরা পেলাম নতুন একটা চরিত্র প্রফেসর জ্যাক। প্রফেসর সাহেব এর ব্যাক্তিত্ববোধ, তার বুদ্ধিমত্তা, তার এগিয়ে চলা এবং তার সিগার খাওয়া ইত্যাদি ভালোই লেগেছে। এই চরিত্র টা নিয়ে রবিন জামান খান আগাতে চান আরো সামনে, এই সিরিজ এর পরবর্তী বই "বিখন্ডিত"। সেই জন্য অবশ্যই শুভকামনা এবং পাঠকরা অপেক্ষায় থাকলো প্রফেসর জ্যাক এর কাজ থেকে আবার নতুন কিছু পাওয়ার।
নালন্দা প্রকাশনীর ব্যানারে প্রকাশনী হওয়া "শব্দজাল" বইটির প্রচ্ছদ করেছেন শেখ মাহমুদ ইসলাম মিজু। ক্লাসিক ধাচে প্রচ্ছদটি সুন্দর হলেও অনেক চিন্তা করে গল্পের সাথে মিল খুঁজতে আমি ব্যার্থ। সেই তুলনায় কলকাতা থেকে প্রকাশিতব্য বইটির প্রচ্ছদ করেছেন আমাদের দেশের সজল চৌধুরী ভাই তার প্রচ্ছদটার মিল রয়েছে।
১৫৮ পেজ এর ক্রিম কালার এর পৃষ্টা চোখের জন্য আরাম দায়ক ছিলো। দুচারটা ছোট খাটো বানান ভুল ছাড়া তেমন বানান ভুল চোখে পরেনি।
সুতরাং অভার অল "শব্দজাল" বইটি আমার কাছে যথেষ্ট পরিমাণ ভালো লেগেছে এবং রেটিং হিসাবে চার দশমিক পাঁচ দিলাম। গুডরিডস এ পাঁচ তারকা।
আমাকে বইটি প্রেজেন্ট করেছেন Homaira Yeasmin Himuআপু তাকে ধন্যবাদ এবং তিনি নিজেও বইটি পরে জানিয়েছেন আমাকে যে ভালো লেগেছে।
সো আমার কথা না আগ্রহী পাঠকরা পড়তে পারেন রবিন জামান খান এর সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার উপন্যাস "শব্দজাল"।
ঢাকার বুকে হঠাৎ করেই ধরা পড়ল এক দুর্ধর্ষ অপরাধী। যাকে খুঁজছে ইন্টারপোল, এফবিআই সহ বিশ্বের তাবৎ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। হঠাৎ করেই অপরাধী দিয়ে বসল একটা অসম্ভব প্রস্তাব: তাকে ছেড়ে না দিলে বোমায় উড়ে যাবে ঢাকা শহর। কোথায় লুকানো রয়েছে বোমা সেটা বের করার দায়িত্ব পড়ল নামকরা এক সাইকোলজির প্রফেসরের কাঁধে। তিনি কি পার���েন বোমার খোঁজ বের করতে? নাকি জয় হবে সন্ত্রাসীর, সন্ত্রাসীর উদ্দেশ্য-ই বা কি?
সুলেখক রবিন জামান খানের সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার শব্দজাল। তবে সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার না বলে সাইকোলজিক্যাল মাইন্ড গেম থ্রিলার বলা চলে বইটাকে। পুরো বইয়েই ছিল মাইন্ডগেমের ছড়াছড়ি। অপরাধী ও প্রফেসর উভয়েই সমানে পাল্লা দিয়ে খেলেছে মাইন্ডগেম। বইয়ের প্রথম বিশ পার্সেন্ট ছিল কাহিনীর সেটআপ। এরপর বাকি অংশ কেটেছে ইন্টারোগেশন রুমেই। অপরাধী শুনিয়েছে অপরাধী হয়ে ওঠার গা শিউরে ওঠা গল্প, তাকে কথার জালে আটকে তথ্য বের করার চেষ্টা করেছেন প্রফেসর। অধ্যায়গুলো ছিল একেকটা খন্ড যুদ্ধ। কখনো প্রফেসর জয়ী কখনো আবার অপরাধী। শেষ হাসি কার সেটা বই পড়েই জানতে হবে। নিঃসন্দেহে অনন্য একটা স্টাইলে লেখা বই। এরকম প্যাটার্নে মানে শুধুই জিজ্ঞাসাবাদের ওপর ভিত্তি করে কিছু পূর্বে লেখা হয়নি বলেই জানি। বইয়ে সবথেকে স্পেশাল ছিল প্রফেসরের বুদ্ধির খেলা। আর সত্যি বলতে অপরাধীর মোটিভ একটু খাপছাড়া লাগল কেন যেন। তবে তাকে সবশেষে কিভাবে আটকাবে সেটা মাঝখানেই ধারণা করে ফেলেছিলাম 😎। বইয়ে তেমন মেজর টুইস্ট নেই, তবে সাসপেন্স রয়েছে, লেখনশৈলী বলাই বাহুল্য চমৎকার। শব্দজাল রবিন জামান খান নালন্দা পৃষ্টা: ১৬০ মুদ্রিত মূল্য: ৩০০
দারুণ! শেষের দিকে এসে সময় নিয়ে প্রফেসরের কাজটা দারুণ লেগেছে। এছাড়া আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স হিসেবে "মিসির আলি"র আইডিয়া ভালো লেগেছে। রবিন জামান খানের আরেকটি ক্লাসি উপন্যাস!
বইটা সম্বন্ধে আমাকে কেউ যদি বলতো পুরো বইটি এক রাতের ঘটনা এবং ইন্টারোগেশন রুমে পৃথিবীর এক কুখ্যাত ক্রিমিনাল অ্যালবার্ট ফাত্তাহ আর দেশী এক প্রখ্যাত সাইকোলজিস্ট এর মাঝে ভাষাগত স্নায়ুযুদ্ধ নিয়েই পুরোটা গল্প, তাহলে বোধহয় বইটি আমি আরও আগেই তুলে নিতাম।
সরাসরি বইটির ভালোদিক বলতে গেলে বলতে হবে বেশ ওয়েল প্ল্যানড পুরো লেখাটা। ছোট পরিসরের এই গল্পে এক রাতের টানটান আমেজ পুরোটা সময় ধরে পাওয়া গেছে। ছিল হলিউডি সিনেমার মতো কল্পনাযোগ্য একটি দৃশ্যপট। বইয়ের শেষ দিকে মিসির আলী কথা উল্লেখ ছিল আমার জন্য বিশাল পাওয়া। যদিও বইয়ের চরিত্র হিসেবে না দেখিয়ে মিসির আলীকে অতীতের সত্যিকার এক চরিত্র হিসেবে ট্রিবিউট দিলেই বরং আরও জমতো আমার মতে। একটা ইউনিভার্স ইউনিভার্স ভাইব আসতো। এরপর শেষে এসে কথোপকথনের ফাঁকফোকর ধরে সব সুতো মেলানোর ব্যাপারটাও ছিল চমকপ্রদ। আর ছিল একটা বড় কিছুর পূর্বাভাস। যদিও শুরুতেই লেখক জানিয়ে দিয়েছেন এটি মূল সিরিয়াল ঘটনার প্রোলগ। আসল কাহিনী শুরু হবে সিরিজের দ্বিতীয় বই (বিখন্ডিত) হতে।
আমার অল্প কিছু বিষয় চোখেও লেগেছে অবশ্য, এই যেমন মূল চরিত্র, প্রফেসর জাকারিয়া আহমেদ চরিত্রটি বেশ ডেকোরেটেড জেন্টেলম্যান হিসেবে গড়ে তুলেছেন লেখক, যিনি বেশ আভিজাত্যপূর্ণ এবং প্রযুক্তির সংস্পর্শে থাকা মানুষ। তো এই ডেকোরেটেড করতে গিয়ে বারবার ঘুরিয়েফিরিয়ে চরিত্রটার কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হচ্ছিল। যেটা অতি বর্ণণায় কিছুটা বিরক্তই লাগছিল। পুরো বইয়ের প্রায় অর্ধেক অংশই ভণিতা। একটা আবহ সৃষ্টি করতে অবশ্যই এর দরকার ছিল, কিন্তু এটাও বেশি হয়ে গিয়েছে। সাইকোলজিক্যাল অতি কচকচানি না থাকাটা ভালোই, তবে সাইকোলজির চাইতে প্রযুক্তির খেলই বেশি দেখা গেল শেষে এসে, যেটায় কিছুটা হতাশ হয়েছি সাথে এগুলো বেশ অনেকগুলো প্লটহোল উন্মুক্ত করে দেয়।
সব মিলিয়ে টানটান একটা উত্তেজনায় শেষ হয়েছে বইটি। সার্থকতাই বেশি বলা চলে। বেশ প্রমিজিং একটা সিরিজ হতে চলেছে বলে আমি আশাবাদী।
কাহিনী সংক্ষেপঃ নববর্ষের দিন নববর্ষ উদযাপন ছাড়াও একটা বিশেষ অনুষ্ঠান হওয়ার কথা। একারণে কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ অনেক লোকজন এসেছে। নিরাপত্তার কোন কমতি নেই কোথাও। এমন সময় নববর্ষের ঠিক আগের দিন কাকতালীয় ভাবেই বিমানবন্দরে এক আন্তর্জাতিক কুখ্যাত অপরাধী ধরা পরে। সে জানিয়ে দেয় তাকে মুক্তি দেয়া না হলে নববর্ষের দিন অনেক মানুষ মারা যাবে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজনের আরো বেশি বিপদের কারণ হলো হাতে সময় মাত্র কয়েক ঘন্টা, তার উপর এই অপরাধীকে কোন শারিরীক বা মানসিক টর্চার করে তার মুখ খোলা যাবে না। শুধুই সময় নষ্ট হবে। ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধের জন্য একমাত্র ভরসা তখন সাইকোলজির একজন রিটায়ার্ড প্রফেসর। প্রফেসর যদি এই লোকের মুখ খোলাতে পারেন এই কয়েক ঘন্টার মাঝে, তাহলেই এতগুলা মানুষের জীবন বাচানো যাবে।
রিভিউঃ সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার আগে কখনো পড়িনি। এটাই প্রথম। কোন ধরনের টর্চার, হুমকি কোন কিছুই না করে একজন প্রফেসরকে তথ্য বের করতে হবে। তার উপর প্রফেসর সাইকোলজির শাখায় ঢাকায় সবচেয়ে ভালো হলেও এধরনের অপরাধীর কাছ থেকে তথ্য বের করার কাজ কখনো করেনি। একজন ভয়ংকর অপরাধীর সাথে সারা রাত বিভিন্ন ধরনের কথা বলতে হবে। যেনতেন কথা না, অনেক থিওরি ধরে স্টেপ বাই স্টেপ আগাতে হবে, যেন সে বাধ্য হয় নিজে থেকে কথা বলতে। শুরু থেকেই আমার মনে হচ্ছিল, ইন্টারোগেশন রুমটা ক্রিমিনাল এর চেয়ে বেশি মানসিক চাপে রেখেছে প্রফেসরকে, কারণ সে এই বিষয়ে নতুন। তার উপর ক্রিমিনাল নিজেও চেষ্টা করে যাচ্ছে প্রফেসরকে উত্তেজিত করে দিয়ে তার কাজ ভন্ডুল করে দিতে। তারপরেও তার বিচক্ষণতা, প্রযুক্তির সাহায্যের কারণে সে যতই মানসিক চাপে থাকুক তার কাজ করে যাচ্ছিল।শেষ মুহূর্তের টুইস্টটা না থাকলে আসলে গল্পটা অনেক সহজেই শেষ হয়ে যেত। শেষদিকে এসে প্রফেসর প্রযুক্তির সাহায্যে এত দ্রুত পরিবারের তথ্য বের করাটা প্রথমে কিছুটা অলৌকিকই লেগেছিল। যেই কুখ্যাত অপরাধীর ইতিহাস কেউ বের করতে পারেনি, সেখানে একজন প্রফেসর বের করে ফেলবে? পরে অবশ্য প্রফেসর এর মুখের কথাতেই জানা যায় এত দ্রুত বের করে ফেলার কারণ। বইটা ভালো লেগেছে, সিরিজের পরবর্তী বইয়ের অপেক্ষায় থাকলাম।
বইটি পড়তে পড়তে যখন মোটামুটি উদাস হয়ে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ বজ্রপাতের মত গল্পে চলে আসা মোড়গুলোতে এই বাক্যটাই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল!
রবিন জামান খানের সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার 'শব্দজাল' পড়ছিলাম। এয়ারপোর্টে রোগী সেজে পালানোর সময় ধরা পড়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল ও বম্বিং এক্সপার্ট আল ফাত্তাহ। ইন্টারপোলের হাতে পরদিন তুলে দেওয়ার কথা তাকে। এ সময় মুখ খুললো আল ফাত্তাহ। ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ দু'টি স্থানে সে বোমা পেতেছে। কাল সকালে ধ্বংস হয়ে যাবে ঢাকা শহর, সাথে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ-ও। কেবল তাকে চলে যেতে দিলেই বোমাগুলোর অস্তিত্ব জানাবে ফাত্তাহ। কোনো টর্চার করে বা লোভ দেখিয়ে তাকে ক্র্যাক করা যাবে না। ছেড়ে দিলেই যে সত্যি কথাটা বলবে এই টপ টেরর তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই৷ তার কাছ তথ্য আদায়ের তবে উপায় কী?
কাজটা করতে পারেন কেবল একজনই। গভীর রাতে সরকারি গাড়ি এসে থামল স্বেচ্ছা অবসরে থাকা সাইকোলজির প্রফেসর জাকারিয়ার বাড়ির সামনে। মনস্তত্ত্ব আর কথার খেলাই কেবল পারবে আল ফাত্তাহ'র মুখ থেকে সত্যিটা বের করে আনতে।
শব্দের জাল বিছালেন প্রফেসর। মুখোমুখি দুই পাকা খেলুড়ে। সময় মাত্র এক রাত!
সপ্তরিপু বা ২৫ শে মার্চে লেখক রবিন জামান খানকে যেভাবে পেয়েছি, শব্দজাল নিঃসন্দেহে তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই বইটা একনাগাড়ে পড়ে যেতে পারিনি, বরং দার্শনিক চিন্তায় কিছুটা হারিয়ে যাচ্ছিলাম। শব্দের জাল বুনতে প্রফেসর যে সময়টা নিচ্ছিলেন, তাতেই মনে হচ্ছিল বইয়ের বেশিরভাগ অংশ পেরিয়ে গেল৷
তবে লেখক নিজেও যে প্রফেসরের মতোই পাঠকের মনস্তত্ত্বকে ধরতে পারেন তাও বুঝতে পারছিলাম। একজন মানুষের দানব হয়ে ওঠার গল্পটা ঠিকই তিনি পড়তে বাধ্য করেছেন। ফাত্তাহ'র জন্য ঘৃণাটা ধরে রেখেও তার প্রতি সহানুভূতি তৈরী করেছেন। এতে সে অর্থে থ্রিল কম ছিল, তবে প্রফেসর আর আল ফাত্তাহ 'র পুরো কথোপকথনের সময়টায় যে টানটান উত্তেজনাটা কাজ করছিল বাতাসে, সেটা পুরোপুরি পাঠকের মনে ঢুকিয়ে দিতে পেরেছেন৷ যে মুহুর্তে ভাবছিলাম সবটাই কেমন যেন সহজে মিলে গেল, তখনই টুইস্টের বোমাগুলো ফাটালেন লেখক!
আল ফাত্তাহ'র অপরাধী হয়ে ওঠার গল্পটা লেখককে খুব যত্ন নিয়ে লিখেছেন তাতে সন্দেহ নেই। তার শারীরিক বর্ণনার মাধ্যমে একজন সন্ত্রাসীর ভয়ংকর হিংস্রতাটা ফুটে উঠেছে। এয়ারপোর্টে ধরা পড়ার অংশটা আরেকটু বিশদ বিবরণ দিলে বেশ হত। গালফ ওয়ার, নাইন-ইলেভেন, আমেরিকার রাজনীতি এবং রাজনীতির জন্যই ধর্মকে ব্যবহার করার পেছনে যে ইতিহাস তা ফাত্তাহ'র বয়ানে জেনেছি। আমেরিকান রিড টেকনিকের ব্যবহার করা উপন্যাস বাংলাদেশে বোধহয় প্রথম। তথ্যগত ভুল ছিল কিছু, মুদ্রণপ্রমাদও ছিল। আশা করি সেসব পরের সংস্করণে সংশোধন করা হবে।
মিসির আলীর জন্য যে ট্রিবিউটটা দিলেন লেখক সেটাও দারুণ লেগেছে। প্রফেসরের চরিত্রের অনেক রহস্য রয়েই গেল। তার অতীত-জীবন সম্পর্কে আমরা আরো জানতে পারব এই সিরিজের পরের বইগুলোতে।
রবিন জামান খানের সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস শব্দজাল পড়ে ফেললাম। বইটা সম্পর্কে আমার প্রতিক্রিয়া মিশ্র। তবে তার আগে একটা কথা বলে নিচ্ছি। সপ্তরিপু, ২৫শে মার্চ, ব্ল্যাকবুদ্ধা ইত্যাদি বইগুলোর লেখক রবিন জামান খান আর শব্দজালের লেখক রবিন জামান খানের মাঝে বিস্তর ফারাক। বইটা পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে লেখক এখানে নিজেকে নতুনভাবে গড়তে চেষ্টা করেছেন এবং হয়ত আগামীতে তিনি নিজেকে আরও নতুনভাবে পাঠকদের সামনে হাজির করবার চেষ্টা করবেন। যদি লেখকের মনোবাঞ্ছা এটিই হয়ে থাকে, তবে তাকে স্বাগত জানাই। চেষ্টা অনেকাংশেই সফল হয়েছে, পুরোপুরি নয়। এবার প্রতিক্রিয়ায় আসি। একটু বড় হতে পারে। আশা করি সবাই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
কুখ্যাত আন্তর্জাতিক অপরাধী অ্যালবার্ট ফাত্তাহ নিতান্তই ভাগ্যের ফেরে কিংবা হাস্যকর এক পরিস্থিতিতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধরা পড়ে গেল। তাকে রাতের মধ্যে ছেড়ে দেয়া না হলে ঢাকাশহরের নতুন বছর শুরু হবে ধ্বংসস্তুপের মাঝে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর দিশেহারা অবস্থা। এমন সমস্যা থেকে তাদের উদ্ধার করতে আসবে কে?
একজনকে পাওয়া গেল। দীর্ঘদিন স্বেচ্ছাবসরে থাকবার পর তাকে তার বাড়ি থেকে এসকর্ট করে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো। সময় মাত্র একরাত। একরাতের মাঝেই ফাত্তাহর সাথে কথোপকথন আর শব্দের মারপ্যাঁচে সাইকোলজিস্ট প্রফেসর জাকারিয়া আহমেদকে ছিনিয়ে আনতে হবে বিজয়মাল্য। ভালো, খারাপ, জিজ্ঞাসা সবকিছু মিলিয়েই আলোচনা করি।
১) গল্পের নাম শব্দজাল। কথা কিংবা শব্দের মারপ্যাঁচ বেশ ভালোই খেলা হয়েছে। তবে এখানে একটা কথা বলব। রবিন জামান খানের আগের বইগুলো যেমন একটানে পড়ে গিয়েছি, এই বইটা আমি সেভাবে পড়তে পারিনি। বেশ কিছু জায়গায় আমাকে আটকাতে হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে বড় বড় বাক্যের বিশেষ ব্যবহার। বইটিতে বড় বড় বাক্য, অপ্রচলিত শব্দ যেগুলো আমরা সাধারণ জীবনে কথোপকথনে খুব একটা ব্যবহার করি না, তা ব্যবহার করা হয়েছে। তবে একটা কথা মানতেই হবে। এমন গল্প হাতে নিয়ে বসলে ভাণ্ডারে নতুন কিছু শব্দ জমা হয়। এজন্য লেখককে বিশেষ ধন্যবাদ। তবে আশা করি সামনের বইগুলোতে তিনি এমন বৈঠকি শব্দের ব্যবহারে একটু পরিমিত ভাব দেখাবেন।
২) গল্পের খুবই চমৎকার একটা অংশ ছিল অ্যালবার্ট ফাত্তাহর এয়ারপোর্টে ধরা পড়বার জায়গাটা। এখানে বর্ণনা আরও একটু বিশদাকারে হবার দরকার ছিল বলে মনে করি। যে সর্বদা রোগী সেজেই একদেশ থেকে আরেকদেশে ট্র্যানজিট পার হয়ে ভ্রমণ করছে, তার ধরা পড়বার ঘটনাটা কেমন যেন সাদামাটাভাবে দেখানো হয়েছে। তাছাড়া বিমানবন্দরে একজন সন্ত্রাসী, যাকে সারা দুনিয়া খুঁজছে, তাকে নিয়ে বের হবার সময় যেমন সতর্কতা দেখানো উচিত ছিল, তা দেখানো হয়নি।
৩) পাঠকদের মাঝে টেনশন তৈরির কাজটা লেখক তৈরি করতে পেরেছেন ভালোভাবেই। অ্যালবার্ট ফাত্তাহ আর প্রফেসর জাকারিয়া, দুটো চরিত্রই তৈরি করা হয়েছে নিপুণতার সাথে। তবে আমার ব্যক্তিগতভাবে কেন যেন মনে হয়েছে অপ্রয়োজনীয় বর্ণনা একটু বেশিই দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে গল্প শুরু হতে হতে যেভাবে দৃশ্যপট তৈরি করা হয়েছে, ততক্ষণে বইয়ের প্রায় ৪০-৫০ পৃষ্ঠা শেষ। ও হ্যা, আরেকটা কথা। জাকারিয়াকে রাজি করার জন্য তার বন্ধু যেভাবে সরকারি ফাইলের অনুমোদন করিয়ে দেবার কথা বলে টোপ দিয়েছিল, সেটা ভালো লাগেনি। কেমন যেন ক্ষমতার অপব্যবহার বলে মনে হয়েছে। ব্যক্তিগত মতামত।
৪) প্রফেসর জাকারিয়া ফাত্তাহর ঘরে প্রবেশ করবার পর থেকে ঘটনা যেভাবে শুরু হয়েছে, তা ভালো লেগেছে। ইস্পাতকঠিন একজন অপরাধীর সামনে নিজেকে শান্ত রেখে প্রমাণ করতে আসা প্রফেসর জাকারিয়া বেশ কয়েকবারই কথার তালে তালে হারিয়ে গিয়েছেন, মেরুদণ্ড বয়ে গিয়েছে শীতল স্রোত। এমনকি প্রশ্ন করবার পর নিজেও ভয় পেয়ে গিয়েছেন যে এই প্রশ্নটা করলে হিতে বিপরীত হবার সম্ভাবনা আছে কিনা। সেক্ষেত্রে বোঝা যায় একজন লিঙ্গুইস্ট হিসেবে প্রফেসর জাকারিয়া খুব বেশি পারঙ্গম নন। তাকে খেলতে হবে ফাত্তাহর মনন নিয়েই। তবে যতবারই ফাইট ব্যাক করেছেন, ফাত্তাহকে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে টক্করটা সমানে সমানেই হতে যাচ্ছে। এই ব্যাপারটা ভালো লেগেছে। আবেগ, মনস্তত্ত্ব, কথার মারপ্যাঁচ, অতীত রোমন্থন, পারস্পরিক সহমর্মিতা, একে অন্যকে সমীহ এবং কঠোর রসিকতা- ইত্যাদি মিলিয়ে কথোপকথনটা উপভোগ্য। তবে কেন যেন মনে হয়েছে বর্ণনাভঙ্গি একটু আড়ষ্ট। আবারও নিজেকে প্রশ্ন করতে হয়, কেন পুরোনো রবিন জামান খানকে খুঁজে পাচ্ছি না? গড়বড়টা আসলে কোথায়?
৫) ফাত্তাহর নিষ্ঠুর শৈশব, আমেরিকার মাটিতে তৈরি হওয়া নতুন জীবন, গালফ ওয়্যারের সময় মার্কিন অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থা, ওসামা বিন লাদেনের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলা এবং তদপরবর্তী মার্কিন মুলুকে মুসলিম কম্যুনিটির ওপর কড়াকড়ি ইত্যাদি সমস্যাগুলো নিয়ে হালকা করে কিছুটা লেখা হয়েছে। কাহিনীর সাথে সামঞ্জস্য এবং রিলেশন থাকার কারণে মনে করি এই সময়টায় কী হয়েছিল, এট�� নিয়ে আরেকটু বড় করে লেখা যেত।
৬) বেশ বড় একটা তথ্যগত ভুল পেয়েছি। রাজীব গান্ধীকে বলা হয়েছে ভারতের প্রেসিডেন্ট। রাজীব গান্ধী ১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ভারতের ষষ্ঠ "প্রধানমন্ত্রী" হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রাইম মিনিস্টার এবং প্রেসিডেন্টের মাঝে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে বলে মনে করি। আর তাকে কোন বোমা দিয়ে সুইসাইড স্কোয়াডের আততায়ীরা হত্যা করেছিল, তা নিয়েও অনেক কন্সপিরেসি থিওরি আছে। আনট্রেসেবল প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে, এটা মানতে কিছুটা নারাজ আমি। কথাগুলো এই কারণে বললাম কারণ এটা পলিটিক্যাল ফ্যাক্ট। ফিকশন নয়।
৭) গল্পের মূল টুইস্ট এন্ড টার্ন শুরু হয় শেষ ৩৫ পৃষ্ঠায়। মিথ্যে বলব না, আমি একদম গল্পে বুঁদ হয়ে গিয়েছিলাম। ফাত্তাহ একবার চাল দিচ্ছে তো প্রফেসর একবার চাল দিচ্ছে। সত্য মিথ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত ঘটনা বের করতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হয়। আবেগের খেলা চলে। দ্বন্দ্বের খেলা চলে। ফাত্তাহ কেন ঢাকা শহরে বোমাবাজির জন্য এসেছিল, এটাও জানা যায়। কিছুটা অপরিণত ম���টিভ লাগলেও পরে মনে হয়েছে, ব্যক্তিগত আক্রোশের আসলে কোনো লজিক থাকে না। কে কখন কেন কীভাবে কার ওপর তার প্রতিহিংসা মেটাবে, তা জানা দুষ্কর। এক্ষেত্রে শব্দজাল সার্থক।
৮) মিসির আলীকে দেয়া ট্রিবিউট ভালো লেগেছে। তবে আশা করছি সামনে প্রফেসরের স্ত্রী জেসমিনের অতীতটাও পটভূমিতে পাব। মিসির আলীর উত্থান কীভাবে হলো, কেন হলো এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অজানাই হয়ে আছে।
টুকিটাকিঃ
বইয়ের বাঁধাই এবং পৃষ্ঠা খুবই ভালো মানের ছিল।
তবে বেশ কিছু জায়গায় টাইপো আছে।
শেখ মাহমুদ ইসলাম মিজুর করা প্রচ্ছদ খুব একটা ভালো লাগেনি। গল্পের সাথে রিলেটেবল না।
ফাইনাল ভারডিক্টঃ
রেকমেন্ডেড উইথ থ্রি স্টার। তবে আরও ৫০ পৃষ্ঠা বাড়ালে বইটির প্রতি জাস্টিস হতো বলে মনে করি।
পাশাপাশি দুটো টাইমলাইনে গল্পের সামঞ্জ্যস্যতায় উপন্যাস লিখে পাঠকদের মন জয় করা রবিন জামান খানের শব্দজাল অপরাপর বইগুলো থেকে আলাদা। এখানে লেখক নিজেকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন আমাদের সামনে। যাত্রাটা ভালোই লেগেছে। পরবর্তী বইয়ের অপেক্ষায় থাকলাম। প্রফেসর জাকারিয়ার জন্য শুভকামনা। মিসির আলীকে আবারও চাই।
রবিন জামান খান ভাইয়ের লেখা মনে হয় বছর দুয়েক পর পড়লাম। পড়ে যা বুঝলাম, যদিও তার লেখা আগেও ভালো ছিলো তবে এখন আরো অনেক উন্নতি হয়েছে।
আর প্লট নিয়ে যা বলবো তা হলো, একদমই ইউনিক একটা প্লটে উপন্যাস লিখেছেন উনি। সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার আগে পড়া হলেও এই রকম প্লটের কোন লেখা আমার পড়া হয়নি। ইউনিক এই প্লটটা আমাকে দারুণ অবাক করেছে। সেই সাথে লেখায় কোন ফ্ল চোখে পড়েনি। যদিও বইয়ের তিন-চতুর্থাংশে যে উত্তেজনা ছিলো শেষে এসে সেটা বাড়ার বদলে কমে গিয়েছে বলে মনে হয়েছে। আর খারাপ লাগা/খাপছাড়া দিক একটাই মনে হয়েছে। সেটা হলো, মিসির আলির কথার টোন। মিসির আলি চলতি ভাষায় কথা বলেন এটা ঠিক, তবে আমার যদ্দুর মনে পড়ে তিনি গ্রাম্য টোনে কথা বলতেন না। এটা বাদে বইয়ের কোন অংশ আমার কাছে রিমার্কেবল ভাবে দূর্বল মনে হয়নি।
সর্বোপরি বইটা বেশ ভালো এবং যারা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার পছন্দ করেন তাদের জন্য মাস্ট রিড।
এমন কিছু যে হবে ভাবতেই পারিনি! এতো বুদ্ধিমত্তার খেলা এই উপন্যাসে:' রবিন জামান খানের ইতিহাসআশ্রিত থ্রিলার পড়েছি শুধু, লেখকের যে সাইকোলজি থ্রিলার লেখারও যোগ্যতা আছে এবং সেটা অভিনব,ভাবতেই পারিনি! নির্দ্বিধায় ইনি একজন রত্ন! ভালো ছিলো উপন্যাসটা!
শুরুর দিকে পড়তে খুব বোরিং লাগছিলো। তারপর বইয়ের এক তৃতীয়াংশ শেষ হতেই আসল থ্রিল পেলাম। সেই রেশ ছিল বইয়ের শেষ অব্দি। সিরিজের পরের বই বিখন্ডিত পড়ার আগ্রহ বোধ করছি।
নিউ ইয়ারের রাতে ঢাকা এয়ারপোর্টে ধরা পড়ল এক ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী অ্যালবার্ট ফাত্তাহ্ যাকে ধরার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সকল দেশের গোয়েন্দা সংস্থা প্রচেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হচ্ছিল। নিউ ইয়ারের রাতে ঢাকা শহরের ছন্দপতন ঘটাতে বোমা সেট করে রাখে ফাত্তাহ্ যার খোঁজ বের করতেই এই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীর মুখোমুখি হতে হয় সাইকোলজির প্রফেসর জ্যাক- কে। দুজনেই দুজনের ওপর মাইন্ড গেইম খেলতে থাকে। প্রফেসর তার কথা বলার কৌশল আর প্রযুক্তির সাহায্য সৃষ্টি করে শব্দজাল। বইটা দুর্দান্ত লেগেছে। সাসপেন্স ছিল। লেখকের গল্প বলার ধরন বেশ লেগেছে। রবিন জামানের বইসকলের মধ্যে পড়া এটাই প্রথম উপন্যাস এবং বেশ ভালোভাবেই মন জয় করেছে।
লেখকের সাথে আমি একমত, বইটাকে সিরিজের মূল বই না বলে সিরিজের প্রলোগ বলা ই উপযুক্ত। বিশ্ব সাহিত্যে প্রলোগ এর বহুল ব্যবহার থাকলেও আমাদের দেশে তেমন একটা নেই। এর মাধ্যমে মূল চরিত্র সম্পর্কে পাঠকের মনে ভালো একটা ধারনা সৃষ্টি করা যায়। এই বইটা দিয়ে জ্যাক চরিত্র সম্পর্কে বেশ ভালো একটা আগ্রহ তৈরি করেছে। যা সিরিজের পরর্বতী বই পড়ার জন্য পাঠকে টানবে। বইটা বেশ গতিশীল ছিল। সর্বোপরি ভালো একটা সময় কেটেছে।
বর্ষশেষের রাতে একরকম ঘটনাচক্রে ধরা পড়ল ভয়ংকর অপরাধী অ্যালবার্ট ফাত্তা। কিন্তু ইন্টারপোলের হাতে তাকে তুলে দেওয়ার আগে সে জানাল এক মারাত্মক তথ্য। পরদিন হতে চলা অনুষ্ঠানের কথা মাথায় রেখে সে দু'খানা বোমা ফিট করেছে। তাদের অবস্থান সে তখনই জানাবে, যখন তাকে আলাদা বিমানে পালিয়ে যেতে দেওয়া হবে। তাহলে উপায়? তার কাছ থেকে বোমার অবস্থান বের করার কি কোনো উপায় আছে? নাকি তাকে ছেড়েই দিতে হবে? তা না হলে গোটা ঢাকা তো ধ্বংসস্তূপ হয়ে যাবে পরদিন! একরকম মরিয়া হয়ে প্রশাসন সাহায্য নিল এক অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকের। তিনি, মানে প্রফেসর জ্যাক ঠিক করলেন, ফাত্তা'র সঙ্গে তিনি কথা বলবেন। একটা ঘরে দু'জন মানুষের মধ্যে কথা হবে। সঙ্গে থাকবে চুরুট আর কফি। তারপর কী হল? জ্যাকের শব্দজালে কি ধরা পড়ল ফাত্তা?
সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের আসল আকর্ষণ কোথায়? অপরাধী আর রহস্যভেদীর মধ্যে যে মানসিক টানাপোড়েন চলে— সেটিই এমন লেখার হৃৎপিণ্ড। আলোচ্য উপন্যাসে আমরা সেটির সপ্রাণ উপস্থিতি অনুভব করেছি বারবার। মিথ্যে থেকে সত্যিকে আলাদা করে নেওয়া হয়েছে একটু-একটু করে। দুই যুযুধানেরই কখনও জিত হয়েছে, আর কখনও হয়েছে হার। তারই মধ্য দিয়ে ইঞ্চি-ইঞ্চি করে সমাধানের দিকে এগিয়ে গেছি আমরা। লেখার শেষে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে পাঠককে এও বুঝিয়ে দেওয়া যে বুদ্ধির খেলাটা উপন্যাসে শুরু হয়েছে ঠিকই, তবে শেষটা তাতেই হয়নি। শেষ... এখনও শুরুই হয়নি। বইটা আনপুটডাউনেবল। একেবারে টানা পড়ে শেষ করতে হয়েছে। অনেক কিছু প্রেডিক্টেবল হওয়া সত্বেও এই যে শেষ অবধি ছুটিয়ে নিয়ে যাওয়া, এখানেই লেখক কামাল করেছেন। শুধু কিছু অসম্ভাব্যতা, আর গল্পটা শেষ করেও কোনো ক্লোজার না দেওয়ার জন্য রেগেমেগে একটি তারা খসালাম।
বইটির মুদ্রণ ভালো। বানানের ব্যাপারেও যত্ন দেখা গেছে। তবে এমন একটি উপন্যাসে কিছু অলংকরণ থাকলে ব্যাপারটা আরও জমে যেত। সিরিজের পরবর্তী বই 'বিখণ্ডিত'-র অপেক্ষায় রইলাম।
বইঃ শব্দজাল লেখকঃ রবিন জামান খান প্রকাশকঃ নালন্দা প্রকাশকালঃ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ঘরানাঃ সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার প্রচ্ছদঃ শেখ মাহমুদ ইসলাম মিজু পৃষ্ঠাঃ ১৫৮ মুদ্রিত ���ূল্যঃ ৩০০ টাকা ফরম্যাটঃ হার্ডকভার
কাহিনি সংক্ষেপঃ ঢাকা, থার্টিফার্স্ট নাইট। পুরো শহর সেজেছে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে। সবাই যখন উল্লাসে মাতোয়ারা, ঠিক তখনই ঘটে গেলো অভাবনীয় এক ঘটনা। এয়ারপোর্টে ধরা পড়লো কুখ্যাত টেরোরিস্ট আব্দুল্লাহ আল ফাত্তাহ ওরফে অ্যালবার্ট ফাত্তাহ, যে কিনা সারা পৃথিবীর প্রথম সারির বম্ব স্পেশালিস্টদের একজন। যাকে একই সাথে ডাকা হয় ডেমোলিশন এক্সপার্ট বা মাস্টার ডি নামেও।
ধরা পড়ার পরেই অ্যালবার্ট ফাত্তাহ ভয়ঙ্কর এক তথ্য দিলো৷ নতুন বছরের শুরুতেই ঢাকায় উদ্বোধন করা হবে সিটি রেল প্রজেক্ট। সেই সাথে সরকার পর্যায়ে সম্পাদিত হবে আরো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। সেই উপলক্ষে তিন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানগণ অবস্থান করছেন ঢাকায়। আর এসব আয়োজন থামাতেই ঢাকার বুকে ভয়াবহ দুটো বম্ব ব্লাস্টের পরিকল্পনা করেছে ফাত্তাহ। অজানা দুটো স্থানে প্ল্যান্ট করা হয়ে গেছে বম্ব। সেগুলো ফাটা এখন শুধুমাত্র কিছু সময়ের ব্যাপার৷
অ্যালবার্ট ফাত্তাহকে নিয়মানুযায়ী ইন্টারপোলের হাতে তুলে দেয়ার আগেই পুলিশ ব্যুরো অব স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন (পিবিএসআই)-এর কাছে অদ্ভুত এক শর্ত দিলো সে৷ ছেড়ে দিতে হবে তাকে। আর তা না করা হলে ফাটবে বম্ব। মারা যাবে অসংখ্য মানুষ। ঠিক এমনই এক নাজুক সিচুয়েশবে পিবিএসআই চিফ৷ আতিকুল আলম সাহায্য চাইলেন স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়া একজন সাইকোলজির প্রফেসরের কাছে, যাঁর নাম জাকারিয়া আহমেদ ওরফে প্রফেসর জ্যাক।
প্রফেসর জ্যাক বুঝলেন, হাতে সময় খুব কম। এর মাঝেই যেভাবেই হোক টেরোরিস্ট অ্যালবার্ট ফাত্তাহ'র কাছ থেকে বের করতে হবে বম্বের হদিস। ইন্টারোগেশন রুমে শুরু হলো প্রফেসর ও ফাত্তাহ'র মধ্যেকার জটিল কথোপকথন। শব্দের মারপ্যাঁচে বারংবার সৃষ্টি হলো শব্দজাল। প্রফেসর জ্যাক কি পারবেন অ্যালবার্ট ফাত্তাহকে ভাঙতে? নাকি ব্যর্থ হবেন শোচনীয় ভাবে?
মাত্র একটা রাত। খুব অল্প সময়। টিক টক টিক টক টক টিক টক... কাউন্টডাউন চলছে।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ এই সময়ের অন্যতম পাঠকপ্রিয় লেখক রবিন জামান খান মূলত পরিচিত '২৫শে মার্চ', 'সপ্তরিপু' ও 'ব্ল্যাক বুদ্ধা' এই তিনটা হিস্টোরিক্যাল থ্রিলার উপন্যাসের জন্য। বিপুল পাঠকপ্রিয়তা পাওয়া তাঁর এই হিস্টোরিক্যাল থ্রিলার গুলো জনপ্রিয় হয়েছে পাশের দেশ ইন্ডিয়ার কলকাতাতেও। এবার রবিন জামান খান তাঁর লেখার ঘরানা হিসেবে বেছে নিয়েছেন সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার-কে। সুসংবদ্ধ সিরিজ হিসেবে লেখার পরিকল্পনার প্রথম পূর্ণাঙ্গ রূপ হিসেবে তিনি পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছেন 'শব্দজাল'।
'শব্দজাল' পুরোপুরি একটা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার। একজন মোস্ট ওয়ান্টেড টেরোরিস্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পর যখন ভয় না পেয়ে অথোরিটির সাথে রীতিমতো মাইন্ডগেম খেলা শুরু করে, তখনই সাহায্য নেয়া হয় সাইকোলজির এক প্রফেসরের৷ চলমান মাইন্ডগেমটা লাভ করে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মাত্রা। পুরো উপন্যাস জুড়ে মূখ্যত একটা ব্যাপারই বারবার উঠে এসেছে। আর তা হলো প্রফেসরের সাথে টেরোরিস্ট ফাত্তাহ'র এই চিত্তাকর্ষক মাইন্ডগেম৷ কথার পৃষ্ঠে কথা, প্রশ্নের পর প্রশ্ন, গল্পের অলিগলি আর সত্য-মিথ্যায় মেশানো চমৎকার এক প্যারাডক্স রবিন জামান খানের 'শব্দজাল'।
বইটা পড়া শুরু করার পর সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ঘরানা প্রেমী পাঠকরা চাইলে এক বসাতেই শেষ করে ফেলতে পারবেন এটা। স্টেপ বাই স্টেপ একদম নিজস্ব একটা গতিতে এগিয়েছে এর কাহিনি। চাপা একটা টেনশন কাজ করেছে বইটা পড়ার সময়। ফাত্তাহ'র সাথে প্রফেসরের কথোপকথন পড়তে পড়তে কাহিনির সাথে বেশ ভালো রকম একাত্ম হয়ে গিয়েছিলাম। উপভোগ্য ছিলো ইন্টারোগেশন সিকোয়েন্স। পাশাপাশি এফবিআই-এর রিড টেকনিকের মতো চমকপ্রদ ইন্টারোগেশন টেকনিক সম্পর্কে বেশ ভালো একটা ধারণা লাভ করেছি বইটা থেকে। প্রফেসর জ্যাকের বুদ্ধিদীপ্ত আচরণ ও অ্যালবার্ট ফাত্তাহ'র ভয়াবহ অতীতের কম্বিনেশন বেশ উপভোগ করেছি। আর 'শব্দজাল'-এর শেষটা যে আসলে শেষ না, বরং শুরু সেটা জানতে পেরেও ভালো লেগেছে। সিরিজের পরবর্তী বই 'বিখন্ডিত'-এর অপেক্ষা এর মধ্যে দিয়েই শুরু হয়ে গেলো।
সুলেখক রবিন জামান খানের লেখার ধরণ বরাবরের মতোই চিত্তাকর্ষক ছিলো। ধীরে ধীরে শব্দের জাল বুনে নামের মতোই একদম চমৎকার ভাবে সমাপ্তি টেনেছেন তিনি 'শব্দজাল'-এর। সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হিসেবে বইটাকে আমি সফল বলবো।
ছোটখাটো কিছু টাইপিং মিসটেক ছিলো। বিশেষ করে 'আধিদৈবিক' শব্দটাকে একটা জায়গায় 'অধিদৈনিক' লেখা হয়েছে। এছাড়া বইয়ের শুরুতে September বানানটাকে Septembor ও ব্যাক কভারে Shobdojal-কে Shodhojal লেখা হয়েছে। আশা করি পরবর্তী এডিশনে এই ভুল গুলো ঠিক করে নেয়া হবে৷
শেখ মাহমুদ ইসলাম মিজু'র করা প্রচ্ছদটা মোটামুটি ভালোই লেগেছে। আগ্রহীরা চাইলে পড়ে ফেলতে পারেন 'শব্দজাল'।
বাংলাদেশী লেখক রবিন জামান খানের লেখা প্রথম সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ‘শব্দজাল’। তিনি বহুদিন ধরেই থ্রিলার লেখার সাথে জড়িত। রবিন জামান খানকে আমার বিশেষ পছন্দ এজন্য যে, আমি তার থেকে ক্লাসিক থ্রিলার আর সাসপেন্স সিনেমা দেখা শিখেছি।
আগেই বলি, আমি কোন ভালো খারাপ আলোচনা পছন্দ করিনা। তাই সেসব করিওনা। আমি বরং ভাবার চেষ্টা করি লেখার বিশ্লেষণের মাত্রাকে। কিন্তু থ্রিলার জনরাটাই এরকম যে, এখানে ঘটনার প্রবাহ মাত্রাই অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয় ওঠে। এখানেও সেরকমটা দেখি যে, একজন আন্তর্জাতিক কুখ্যাত সন্ত্রাসী ধরা পরেছে এবং তার থেকে এক রাতের বের করে আনতে হবে বোমার পরিকল্পনা। এখানে গুরুত্বপূর্ন বিষয় এটা যে, আলবার্ট ফাত্তাহ নামের সেই কুখ্যাত সন্ত্রাসীর বর্ণনা। ফিকশনটির মুল ঘটনা প্রবাহ নির্ধারণ করা হয়েছে ফাত্তাহের চরিত্র কিংবা কর্মকান্ডের উপর। সে হিসেবে ফাত্তাহের ছবি ফুটিয়ে তোলাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং বলেই আমার মনে হয়।
রবিন জামান খান এখানে একটা দারুণ খেলা খেলেছেন। শুধুমাত্র ফাত্তাহ (কুখ্যাত সন্ত্রাসী) এর চেহারার বর্ণনা দিতে তিনি খরচ করেছে সাড়ে আটশত শব্দ! আমি নিউজ পেপারে এই শব্দের একটা লেখা দিলে সেইটা সাপ্লিমেন্টের লিড স্টোরি হয়ে যেত। এই বিশাল বর্ণনা যে খুব বেশি সুখকর তাও কিন্তু নয়। এই বিভিৎস বর্ণনা শেষে মুল গল্পে মোড় নেয়ার জন্য একটা ডায়ালগ ব্যবহার করা হয়েছে। যিনি ফাত্তাহর সাথে কথা বলতে এসেছেন তার দিকে ছুড়ে দেয়া ফাত্তাহর মন্তব্য- ‘কখনো পাত্রী দেখতে গেছেন?’ রসাত্মক এই বাক্য দুর্দান্তভাবে মুল গল্পকে প্রভাবিত করেছে।
ফাত্তাহর বিখ্যাত রসায়নবিদ হওয়া থেকে কুখ্যাত হওয়ার বর্ণনা দেখে আমার ডিসটোপিয়ান এক সমাজের কথা মনে করায়। আমার বেশ পছন্দের নেটফ্লিক্সের একটা সিরিজ ‘গুল’ (ghoul) কে নিয়ে আমি আবারো ভাবি। সেখানে রাধিকা আপ��ের চরি���্রে থাকা নিদা তার বাবাকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেয়ার সময় ভাবে, ‘সন্ত্রাস কখনো বাইরে থেকে আসে না; বরং সন্ত্রাস হয় আমাদের কাছের কেউ। হয়তোবা তারা আমাদেরই বাবা কিংবা ভাই’। আমি ফাত্তাহের চরিত্রে সেরকম একটা চিত্র দেখি বারবার।
এর বাইরেও আমি ফাত্তাহের চরিত্র দ্বারা সমাজের সাথে একজন মানুষের দারুণ দ্বান্দ্বিক বিরোধ দেখতে পাই। সমাজের কথা ভেবে অমানষিক কষ্টে জর্জরিত হয়ে যখন সে মুক্তি পায় তখন সেই ইস্যুকে ধরেই সমাজ তাকে দোষারোপ করে এবং সে পাঁচ বছরের কারাদন্ড পায়। জেল থেকে বেরিয়ে সমাজ তার দিকে তাকিয়ে যখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলো তখনই সেই দর্পনে ফাত্তাহর সাথে পাঠকও দেখছিলো ব্যক্তির সাথে সমাজের দ্বন্দ্বের এক অপরিসীম যাত্রা।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এখানে উল্লেখ করা যায়। ধর্মের নামে সন্ত্রাসবাদ করা যে স্রেফ একটা ইস্যু সেটি এখানে একাধিকবার ফাত্তহর বয়ানে বলা হয়েছে। আমরা শব্দজাল পড়ার সময় থ্রিলার জনরার বৈশিষ্ট্যের বাইরে দারুণ কিছু ব্যাপার ফুটে উঠতে দেখি যা লেখক খুব সচেতন ভাবে না ঢুকিয়ে দিলে এতটা ভালো ছবি অংকন করা সম্ভব নয়। সেদিকে রবিন জামান খানের শব্দজাল বইটি নিছক কোন সাইকো থ্রিলার নয়।
এখানে মিসির আলী চরিত্রের একটা ট্রিবিউট দেয়া হয়েছে। ব্যাপারটা একই সাথে দারুণ এবং ইউনিক। কারণ আমাদের বইগুলোতে অন্য লেখকদের চরিত্র কিংবা কাজ নিয়ে সেভাবে সম্মান জানানো হয় না। তার উপর দেশি লেখকদের নিয়ে তো নয়ই। সেদিন দেশি এক ক্রাইম থ্রিলার পড়তে দিয়ে দেখলাম আলফ্রেড হিচককের নাম এক দু’বার নেয়া হলো। কিন্তু এভাবে গল্পের মধ্যে আনুষাঙ্গিক একটা বিষয়ে দেশী লেখকের আরেকটি রহস্যময় চরিত্র ঢুকিয়ে দেয়াটা আমার খুব দারুণ লেগেছে। কিছুটা ঈর্ষণীয় বটে। এখানে দেখানো হয় মিসির আলীর স্বভাবসুলভ ভাবে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন। মুশকিল হলো, আমি মিসির আলীর ১৪টা উপন্যাস পড়েছি। আমার মনে পড়ে না, মিসির আলী আসলে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন কিনা! হয়তোবা আমি ভুলে গেছি।
বইটির আর দুটো বৈশিষ্ট্য দেখিয়ে লেখাটা শেষ করি। থ্রিলারে সাসপেন্স বলে একটা ব্যাপার আছে। যদিও অনেকে এটাকে থ্রিলারের একটি সাব জনরা হিসেবেই বলে থাকে। কিন্তু থ্রিলারের পরতে পরতে এটা থাকে। রবিন জামান খানের লেখা শব্দজাল পড়তে গিয়ে প্রথম একশো পৃষ্ঠায় আমি সেরকম ভাবে সাসপেন্সের দেখা পাইনা। তবে এখানে দুটো ব্যাপার আছে। একটি হলো, ক্রাইম থ্রিলারগুলোতে প্রচুর দ্রুত ঘটনা বাঁক নিতে পারে। কিন্তু সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারগুলোতে ঘটনা সামনে এগুনোটাই মুখ্য হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে ক্রাইম থ্রিলারের সাসপেন্স এবং সাইকো থ্রিলারের সাসপেন্সের মাত্র এক রকম হবে না। ব্যাপারটা উদাহরণ দিয়ে ভাবা যেতে পারে। বাংলা ভাষার থ্রিলার লেখক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের ট্রিলজি ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি’ পড়তে গিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে একই রকম অনুভূতি পেয়েছিলাম। ৭০-৮০ পেজের পর আমি প্রথম সাসপেন্সের ধাক্কাটা খেয়েছিলাম। গল্পের শেষের দিকে যখন একাধিক সাসপেন্স এসে ভর করে তখন গল্পটা অনেক বেশিই শক্তিশালী হয়ে যায়। আমার কাছে মনে হয় রবিন জামান খানের গল্পের ক্ষেত্রেও সেরকমটা ঘটেছে। এটাই যদি আরেকটু আন্তর্জাতিকভাবে দেখি, তাহলে ২০০৩ সালে জেমস মঙ্গল্ডের বানানো ‘আইডেনটিটি’ সিনেমার কথা মনে পরে যায়। একটা দুর্ধর্ষ ক্রাইম থ্রিলারে একের পর এক খুন চলতে থাকে। আপনি যাকে সাসপেক্ট ভাববেন সেই খুন হয়। একটা সময় এমন এসে দাঁড়ায় যে গল্পের শেষ কিভাবে হবে তার ধারণা আপনার থাকে না। কিন্তু গল্প শেষে বুঝতে পারি এটা যত না ক্রাইম থ্রিলার তারচে বেশি সাইকো থ্রিলিং রয়েছে। শেষে ডাবল ধামাকার মত ওভারল্যাপ করেছে ‘শব্দজাল’ বইটিতেও।
আর দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো, পুরো বইয়ের গল্পটা শেষ হয়েছে এক রাতের মধ্যে। মানে গল্পটা শুরু হতে দেখি থার্টি ফার্স্ট নাইটের অগ্রমুখে। তেমনি গল্পটা শেষ হতে দেখা যায় নতুন বছরের ভোরের আলো ফুটতে ফুটতে। ফোর্থ ডাইমেনশন সময়ের কত বেশি শক্তি তা খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পারি ঘটনার গতির মাধ্যমে।
রবিন জামান খান এটিকে সিরিজ আকারে লেখার ঘোষণা দিয়ে দ্বিতীয় বইটির নাম প্রকাশ করেছেন ‘বিখন্ডিত’। শব্দজাল বইটি বাংলাদেশ থেকে বের করেছে ‘নালন্দা’ এবং ভারত থেকে বের করেছে ‘বুক-ই-কার্ট পাবলিশিং’। আর হ্যাঁ, বাংলাদেশী প্রচ্ছদটাও দারুণ সাইকোলজিক্যাল ভাইব তৈরী করেছে। ভালো বই সময় থাকলে পড়ে ফেলতে পারেন। একটা ভালো বই নিয়ে হৈ চৈ করতে দোষ কী!
Breath is trapped in the Punch of words
The first psychological thriller written by Bangladeshi writer Robin Zaman Khan is 'Shabdajal'. He has been involved in writing thrillers for a long time. I especially like Robin Zaman Khan because I have learned to watch classic thrillers and suspense movies from him.
As I said before, I don't like any good or bad discussion. So don't do that. I rather try to think about the level of writing analysis. But the thriller genre is such that the flow of events becomes very important here. Here, too, I see that an internationally notorious terrorist has been captured and a bomb plot must be hatched overnight. The important thing here is the description of that notorious terrorist named Albert Fattah. The main event flow of the fiction is determined by the character or actions of Fattah. As such, I think it is quite challenging to paint a picture of Fattah.
Robin Zaman Khan has played a great game here. He has spent eight hundred and fifty words just to describe the face of Fattah (the infamous terrorist)! If I had written an article with this word in the newspaper, it would have been the lead story of the supplement. This huge description is not very pleasing. At the end of this horrific narrative, a dialogue is used to take a turn in the main story. Fattah's remarks to the person who came to talk to Fattah - 'Have you ever been to see a bride?'
Seeing Fattah's description of being infamous from being a famous chemist reminds me of a dystopian society. I'm thinking again about my favourite Netflix series called 'Ghoul'. There, Nida, who plays the role of Radhika Apte, thinks while handing over her father to the police, ‘Terror never comes from outside; Rather, terrorism is someone close to us. Maybe they are our father or brother. I see such a picture in the character of Fattah again and again.
Beyond this, I also see a man’s great dialectical conflict with society by the character of Fattah. When he was released after suffering from inhuman hardships, the society blamed him for the issue and he was sentenced to five years in prison. Just as the society was looking at him after his release from prison and turning his face away, the reader was also watching in that mirror with Fattah the boundless journey of the society's conflict with the individual.
Another important point can be mentioned here. Terrorism in the name of religion is just an issue, it has been said more than once in Fattah's statement. When we read the book, we see some great things coming out of the thriller genre feature that it is not possible to draw such a good picture without the writer inserting it in a very conscious way. On the other hand, Robin Zaman Khan's book called Shabdjal is not just a psycho-thriller.
Here is a tribute to the character of Misir Ali. The thing is great and unique at the same time. Because our books do not respect the character or work of other writers in that way. Not with local writers. I read a local crime thriller that day and saw Alfred Hitchcock's name mentioned once or twice. But in this way, I like to insert another mysterious character of a local writer in an incidental subject in the story. Shown here is Misir Ali naturally speaking the regional language. The problem is, I've read 14 of Misir Ali's novels. I don't remember if Misir Ali actually spoke the regional language. Maybe I forgot!
Let me finish by showing two more features of the book. There is a thing called suspense in thrillers. Although many call it a sub-genre of a thriller. But it stays with the thriller. When I read the Shabdajal written by Robin Zaman Khan, I did not see such suspense in the first hundred pages. But there are two things. One is that crime thrillers can take a lot of quick turns. But in psychological thrillers, events become the main thing. In that case, the suspense of crime thriller and the suspense of psycho-thriller will not be the same. The matter can be considered with examples. I personally felt the same way when I read the Bengali language thriller writer Mohammad Nazim Uddin's trilogy 'Rabindranath Ekhane Kawkhono Khete Ashenoni' (Rabindranath never came here to eat). After 60-70 pages, I ate the first suspense push. Towards the end of the story, when multiple suspensions come and go, the story becomes much stronger. I think the same thing happened with Robin Zaman Khan's story.
If we look at it a little more internationally, then the movie 'Identity' made by James Mangold in 2003 comes to mind. One murder after another continues in a formidable crime thriller. Anyone you think is a suspect is murdered. There comes a time when you have no idea how the story will end. But at the end of the story, I realize that there is more psycho thrilling than a crime thriller. In the end, like a double bang, it overlaps in the book 'Shabdjal' as well.
And the second feature is that the story of the whole book ended in one night. I mean, from the beginning of the story, I see Thirty First Night ahead. Similarly, the end of the story can be seen in the light of the dawn of the new year. We can understand very well how much energy the fourth dimension time has through the speed of events.
Robin Zaman Khan has announced to write it in the form of a series and has published the name of the second book 'Bikhandito'. Shabdajal has brought out the book 'Nalanda' from Bangladesh and 'Book-e-Kart Publishing' from India. And yes, the Bangladeshi cover has also created a great psychological vibe. You can read a good book if you have time. What's wrong with shouting about a good book!
শব্দজাল জনরা: সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার লেখক : রবিন জামান খান প্রকাশক : নালন্দা প্রচ্ছদ : শেখ মাহমুদ ইসলাম মিজু পৃষ্টা: ১৫৮ মুদ্রিত মূল্য: ৩০০ টাকা
কাহিনী সংক��ষেপ:
বছর শুরুর প্রারম্ভে একাধিক উপলক্ষ্যকে সামনে রেখে যখন উৎসবের আমেজে সেজেছে পুরো শহর এমন সময় আন্তর্জাতিকভাবে কুখ্যাত এক অপরাধী নিতান্ত আকস্মিকভাবে ধরা পড়লো এয়ারপোর্টে। ধরা পড়েই সে জানালো তাকে ছেড়ে দেওয়া না হলে বছরের প্রথমদিন ঘটবে এমন এক ঘটনা, যার ফলে প্রাণ হারাবে লক্ষাধিক মানুষ। একদিকে ইন্টারপোলসহ বিশ্বের বড়-বড় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর চাপ, অন্যদিকে কুখ্যাত এই অপরাধীর বিশেষ প্রস্তাবের কূটচালে প্রশাসন যখন দিশেহারা এমন সময় জটপাকানো এই ঘটনার দায়িত্ব এসে পড়ে দীর্ঘদিন যাবৎ স্বেচ্ছা-অবসরে থাকা সাইকোলজির এক প্রফেসরের ওপরে। জটিল ও প্রাণঘাতী এই ষড়যন্ত্রের স্বরূপ উদঘাটনের জন্যে প্রফেসরের একমাত্র অস্ত্র তার বুদ্ধিমত্তা, হাতে সময় মাত্র এক রাত। প্রফেসর কি পারবে কুখ্যাত এই অপরাধীকে নিজের বুদ্ধিমত্তার জালে বন্দি করে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ বাঁচাতে...?
জবাব জানতে পড়ুন ২৫শে মার্চ, সপ্তরিপু, ব্ল্যাকবুদ্ধা’র মতো উপন্যাস দিয়ে বাংলাদেশ ও কলকাতায় পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করা লেখক রবিন জামান খানের সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার সিরিজের প্রথম উপন্যাস ‘শব্দজাল’- যেখানে ধীশক্তি আর শব্দের খেলায় ফুঁটে উঠেছে মানবমনের বিচিত্র এক অন্ধকার উপাখ্যান।
পাঠ্য প্রতিক্রিয়া:
একটা ভালো বই পড়ার পর সেইটা রিভিউ না করা পর্যন্ত মনটা উসখুঁস করে৷ রবিন ভাইয়ের শব্দ জাল পড়ার পর মনে হল বাহ অনেক দিন পর সুস্বাদু কোন বই হজম করলাম। বইটা কার কেমন লাগবে জানি না৷ তবে আমাকে প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত টেনেছে৷ রবিন ভাইয়ের লেখার একটা মাধুর্য আছে। আছে চুম্বকের মত পাঠক কে বইয়ের পাতায় বন্দী করার ক্ষমতা। সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কি শব্দজালে করলেন?
প্রশ্ন যখন করেছি তখন এর উত্তর তো বইয়ের পাতা খুঁড়ে বের করতেই হয়৷ সব কিছু বাদও যদি দেই এই বইয়ের তত্ত্ব কথা, ফিলোসফি আমায় একেবারে কাঁত করে দিয়েছে৷ এরপর স্লো বিল্ড আপ করে গল্পের গভীরে ঢুকিয়ে মোচড় দেবার মত সাসপেন্স সত্যি আমাকে ভাবিয়েছে৷
সবচেয়ে যে জিনিষটা ভালো লেগেছে লেখকের নিজে কে ভেঙ্গে নতুন করে গড়ার খেলাটা। রবিন জামান মানেই হিস্টোরিক্যাল ফিকশন এই ধারনা থেকে পাঠক কে বের করে নতুন কিছু দেবার প্রয়াসে তিনি শতভাগ সফল হয়েছেন৷ প্রাঞ্জল বর্ণনা আর শব্দের ক্ষুরধার প্রয়োগ রবিন ভাইয়ের মূল অস্ত্রও বলতে হবে৷ একেবারে বুক ১ থেকে লেখকের সাথে এই অধম পাঠকের যাত্রা। আমার চোখে দেখা বাংলাদেশের অন্যতম পরিশ্রমী লেখক। প্রতি বইতে উন্নতির ধারা বজায় রেখে নিজেকে নিয়ে গেছেন তিনি অন্য লেভেলে৷
ক্রিমিনাল সাইকোলজি, ইন্টোগোরেশন টেকনিক আর মস্তিকের সাথে শব্দের খেলার সুতো ছড়িয়ে দিয়ে লাগাম শেষ পর্যন্ত নিজের হাতে রাখা, এরপর সেইটা কে প্রপার একটা ফিনিশিং দেওয়া কম কষ্টের কাজ নয়৷ বুঝা যায় এই বই লিখতে লেখকের অনেক তথ্য জোগাড় করতে হয়েছে৷ অনেক পড়াশোনা করতে হয়েছে৷
শব্দ জাল মনস্তাত্ত্বিক জগৎতে বেশ ভালো কড়া নাড়ে। অপরাধি ও প্রফেসর দু'জনেই সমান তালে শব্দের ধ্রুমজাল তৈরি করার চেষ্টা করেছে। কে হবে সফল৷ আলবার্ট ফাত্তাহ'র অপরাধি হয়ে উঠার গল্পটি যে কেউ কে গা শিউরে দিবে৷ প্রফেসর চেষ্টা করেছে শব্দের জাল বিছিয়ে তথ্য বের করে আনা৷ গল্পের যত গভীরে আমি গিয়েছি ততই ভিজ্যুয়ালাইজ করা শুরু করেছি৷ শুধু জিজ্ঞাসাবাদের উপর ভিত্তি করে গোটা গল্প টেনে নেওয়া যাওয়া অনেক জটিল। এরপরও গল্পটিতে লেখকের বেশ ভালো গ্রিপ ছিল৷
আমি ব্যক্তিগত ভাবে মুগ্ধ হয়েছি শব্দ জাল পড়ে৷ মুগ্ধতার রেশ এত সহজে কাটবে না৷ গল্পটি কে শুধু একটা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হিসাবে দেখলে আহামরি কিছু মনে হবে না৷ তবে এর তত্ত্ব কথা আর রাইটিং স্টাইল সত্যিই অন্য রকম৷ এই রকম অন্য রকম কাজ করার সাহস যে জুগিয়েছেন তাকে সাধুবাদ না জানালেই নয়। এই রকম পার্টানের গল্প আরও আসুক৷ এক ধরনের গদবাঁধা নিয়মে বাঁধা না পড়ুক আমাদের মৌলিক থ্রিলার৷
পাঠ্যপ্রতিক্রিয়া পর্ব শেষে আমি সব সময় চেষ্টা করি প্রোডাকশন কোয়ালিটি নিয়ে৷ কিছু বলতে৷ নালন্দা প্রোডাকশন সব সময়ই ভালো হয়। কাগজের মান থেকে বাইন্ডিং, প্রচ্ছদ সব কিছুতেই যত্মের ছাপ ছিল৷ তবে এডিটিংটা ভালো ভাবে করলে বোধ হয় টাইপো মিসটেক কম হতো। তবে এ গুলো মেজর কোন ইস্যু নয়৷ পরের এডিশনে ঠিক করা যাবে৷
তো এই ছিল আমার রিভিউ৷ শব্দের জালের জন্য আমার শুভ কামনা রইলো৷ পাঠল প্রিয়তা পাক বইটি৷
“For in spite of language, in spite of intelligence and intuition and sympathy, one can never really communicate anything to anybody.” ― Aldous Huxley - শব্দজাল - প্রফেসর জাকারিয়া আহমেদ, একজন অবসরপ্রাপ্ত সাইকোলজিস্ট। বছরের শেষ দিনে তার স্বভাবজাত মেডিটেশনে ব্যস্ত। হঠাৎ আসা এক ফোন কলের কারনে মেডিটেশন শেষ না করেই তাকে ছুটতে হয় "পিবিএসআই" (পুলিশ ব্যুরো অফ স্পেশাল ইনভিস্টিগেশন) এ।
অ্যালবার্ট ফাত্তাহ, একজন আন্তর্জাতিক মানের ডেমোলিশন এক্সপার্ট। নববর্ষের আগের রাতে সে ধরা পরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে। ধরা পড়ার পরে পুলিশের কাছে সে জানায় বিস্ফোরক এক তথ্য যা শুনে তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়।
নববর্ষের আগের সেই রাতে প্রফেসর জাকারিয়া এবং আন্তর্জাতিক অপরাধী অ্যালবার্ট ফাত্তাহ এর ভিতরে শুরু হয় কথোপকথন। এখন অ্যালবার্ট ফাত্তাহ কি বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছে পুলিশকে? প্রফেসর জাকারিয়া কি পারবে অ্যালবার্ট ফাত্তাহ এর কাছ থেকে আসল তথ্য বের করতে? তা জানতে হলে পড়তে হবে লেখক রবিন জামান খানের সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ঘরানার বই "শব্দজাল"। - "শব্দজাল" কে বলা যায় বাংলা ভাষায় একটি নতুন ধরণের সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার সিরিজের প্রথম বই। তাই প্রথমেই আমরা গল্পের প্রোটাগনিস্ট ড.জাকারিয়া আহমেদ সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যাই। বইটা একটু ধীর গতিতে শুরু হয়, কিন্তু ৫০ পেইজের পরে কাহিনী গতি পায় যা বজায় থাকে শেষ পর্যন্ত। সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হিসেবে শেষদিকের টানটান উত্তেজনার দিক থেকে বইটি স্বার্থক।
"শব্দজাল" সম্পর্কে আমার প্রতিক্রিয়া খানিকটা মিশ্র। গল্পের ন্যারেশন কিছু জায়গায় সিনেম্যাটিক লাগলেও সবমিলিয়ে বেশ ভালো ছিল। এই রকম গল্পের একটা শক্তিশালী দিক এর সংলাপ, সেটিতেও মোটামুটি উতরে গেছে বইটি। কিছু অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহার ছিল বইতে, তবে তা কাহিনী বুঝতে বাধার সৃষ্টি করেনি। বইয়ের অন্যতম দারুন দিক জাকারিয়া এবং ফাত্তাহ এর কথার মারপ্যাঁচ এবং তাদের মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্ব। তবে বইটি যে জায়গায় একটু হতাশ করলো তা হচ্ছে তথ্যগত ভুল। বেশ কিছু বড়-ছোট তথ্যগত ভুল দেখতে পেলাম বইতে, যা থাকা উচিত ছিল না। বই প্রকাশের আগে সম্পাদনার সময় সেদিকগুলোতে আরেকটু খেয়াল রাখা উচিত ছিল মনে হয়।
"শব্দজাল" বইয়ের প্রধান চরিত্রে মূলত ছিলেন দুইজন, প্রফেসর জাকারিয়া আহমেদ এবং অ্যালবার্ট ফাত্তাহ। চরিত্রের দিক থেকে প্রফেসর জাকারিয়াকে সবদিক থেকে ছাপিয়ে গেছে অ্যালবার্ট ফাত্তাহ। দারুন এই চরিত্রের ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে সংলাপ- সবকিছুই বেশ ভালো লাগলো। এর তুলনায় প্রফেসর জাকারিয়ার কথাবার্তা এবং কাজকর্ম কিছু জায়গায় অসংলগ্ন মনে হলো। কাহিনীর প্রয়োজনের বেশ কিছু ইন্টারোগেশন টেকনিক এবং সাইকোলজিক্যাল টার্মস এন্ড কন্ডিশন এসেছে, যা বুঝতে তেমন একটা অসুবিধা হয়নি। তবে বইয়ের শেষ অংশ সম্পর্কেও আমার প্রতিক্রিয়া মিশ্র, মনে হয়েছে কিছু ব্যাপার ওভারড���ন করা হয়েছে।
"শব্দজাল" বইয়ের কারিগরি দিকে তাকালে বইয়ের বাধাই, পেইজের মান এবং সেটাপ বেশ ভালো, পড়তে আরাম পাওয়া যায়। বইয়ের যে দিকটা আমার একেবারেই ভালো লাগেনি তা হচ্ছে বইটির প্রচ্ছদ। অনেক ভেবেও আমি বইয়ের কাহিনীর সাথে প্রচ্ছদের তেমন একটা তাৎপর্য পেলাম না। বইয়ের সম্পাদনার ক্ষেত্রে এর প্রুফ রিডিং এর ব্যাপারেও আরো জোড় দেয়া উচিত ছিল। বইতে ডজনের উপরে টাইপো দেখতে পেলাম যা ভালোভাবে প্রুফ রিড করলে অন্তত ৮০ ভাগ কমে যেত আমার মতে। বইটির যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে সে তুলনায় পাঠকেরা আরো কম টাইপো এবং প্রিন্টিং মিসটেক থাকা বই ডিজার্ভ করে। আশা করি প্রকাশনীটি ব্যাপারগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে।
এক কথায়, বাংলা ভাষায় এ ধরণের ইন্টারোগেশন ভিত্তিক সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার আমার কাছে বেশ নতুন। লেখকের আগের বইগুলো পড়ার ফলে যে ধরণের এক্সপেক্টেশন ছিল তা সম্পূর্ণ পূরণ না হলেও নতুন ধরণের বাংলা থ্রিলার হিসেবে একবার পড়াই যায়। আমার আশা থাকবে সিরিজের পরবর্তী বইগুলোতে লেখক আমাদের এর চেয়েও দুর্দান্ত মানের গল্প উপহার দিবেন।
নিউ ইয়ারের রাতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধরা পড়ে এক কুখ্যাত আন্তর্জাতিক অপরাধী আলবার্ট ফাত্তাহ। সে নববর্ষের বিভিন্ন উদযাপন এবং তিন দেশের প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে আয়োজিত কয়েকটি অনুষ্ঠান বানচাল করার উদ্দেশ্যে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালানোর পরিকল্পনা করেছিল। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় বোমা সেট করে রাখে। এতে করে শহরের লক্ষাধিক মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়ে। ধরা পড়ার পর সে পুলিশকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য জটিল এক শর্ত দেয়।
অন্যদিকে পুরো শহরকে বাঁচানোর পুরো দায়িত্বটা চলে আসে রিটায়ার্ড প্রফেসর জাকারিয়া আহমেদের উপর। তাকে যেভাবেই হোক ফাত্তাহর কাছ থেকে কথা আদায় করে নিতে হবে এবং সেটার জন্য তার সময় ছিল শুধু সেই রাতটুকুই।
প্রশ্ন হলো এমন অবস্থায় ফাত্তাহকে জিজ্ঞেসাবাদের জন্য কেন একজন সাইকোলজির প্রফেসর কে ডাকা হলো?
শারীরিক বা মানসিক কোনোভাবেই পরাস্থ করা যাচ্ছে না তাকে। জীবনের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন বিভীষিকাময় ঘটনার কারণে ফাত্তাহর শরীরের বেশ কিছু টিস্যু ও নার্ভ অকেজো হয়ে গিয়েছে। তাই শারিরীক নির্যাতন করে কোনো লাভ হবেনা। মুখ বিভিন্ন ক্ষতচিত্ন, নষ্ট এক চোখে ভয়ঙ্কর রকমের অভিব্যক্তি, গলায় ফাঁসের মোটা ক্ষত- সবকিছু মিলিয়ে তার চেহারা বিভৎস রকমের ভয়ঙ্কর। কোনোভাবেই যখন তথ্য বের করা সম্ভব হচ্ছেনা তখন বাধ্য হয়ে পুলিশের ডাকতে হয় প্রফেসর জাকারিয়াকে। প্রফেসর সাইকোলজির মাধ্যমে শুরু করেন ইন্টারোগেশনের নামে ফাত্তাহর সাথে মাইন্ড গেইম। এখান থেকেই শুরু হবে শব্দের খেলা। কথা দিয়ে তৈরি হবে একটা বড় জাল, শেষ পর্যন্ত কে সেই জালে আঁটকা পড়বে? . . . এত নিখুঁত বর্ণনা। ফাত্তাহর এতো সুন্দর বর্ণনা লেখক দিয়েছেন, যেন মনে হচ্ছিলো আমার চোখের সামনে বিভৎস চেহারাটা দেখতে পাচ্ছি। প্রফেসর চরিত্রটা আরো দারুণ। তার চরিত্রটা আমার কাছে দূর্দান্ত লেগেছে। তার চিন্তাভাবনা, অভিব্যক্তি, ব্যক্তিত্ব সবকিছুই ছিলো অসাধারণ। অতিরিক্ত কোনো সংলাপ নেই, নেই কোনো অতিরঞ্জিত বর্ণনাও, টুইস্টে ভরপুর।
শব্দজাল খুব সম্ভবত আমার পড়া প্রথম বাংলা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার। গল্পের বর্ণনা চমৎকার। কোথাও কোনোরকম তাড়াহুড়ো করা হয়নি, একদম ধীরে ধীরে গল্প সামনের দিকে এগিয়েছে। অ্যালবার্ট ফাত্তাহ আর প্রফেসর জাকারিয়া, দুটো চরিত্রই তৈরি করা হয়েছে নিপুণতার সাথে।
পুরো ব্যাপারটাই মনস্তাত্ত্বিক খেলা। সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারে কোনো মারামারি নেই, এখানে চরিত্রগুলোর মানসিক অবস্থার উপর জোর দেওয়া হয়, তাদের মনের ভেতরে কী চলে সেটা দেখা হয়।
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুধু মুগ্ধ হয়ে পড়বে। বইটি পড়লে আপনার চোখের সামনে সব কিছু জীবন্ত হয়ে ধরা পড়বে। ফাত্তাহর উপর চালানো শারীরিক নির্যাতনের বর্ণনা একটু বেশিই জীবন্ত ছিল।এখানে যেমন ফাত্তাহর অতীত নিয়ে বলা হচ্ছিল, তখন আপনার মনে হবে কেউ আসলে সন্ত্রাসী হয়ে জন্মায় না, পরিস্থিতি ও সমাজব্যবস্থা তাকে সন্ত্রাসী করে তোলে। কী নিদারুণ কষ্টেই না কেটেছে তার অতীত। আর দুর্বলতা, এটাই অনেক সময় মানুষের শক্তির কারণ হয়, আবার এই দুর্বলতার উপর ভর করেই মানুষ নিজের বিপদ ডেকে আনে।
প্লটটা অনেকের কাছেই খুব সাদামাটা লাগতে পারে৷ তবে এই বইয়ের মূল আকর্ষণ গল্প নয়, বরং সংলাপ আর চরিত্রে।
বইটিতে মিসির আলীকে ট্রিবিউটও জানানো হয়েছে। মনে হচ্ছে, মিসির আলীর পর আমরা আরো একজন প্রফেসর পাচ্ছি। প্রফেসর জাকারিয়া ওরফে জ্যাকের মাইন্ড গেমের আমরা আবারও পড়তে পারবো সিরিজের পরবর্তী বই 'বিখন্ডিত'তে।
"নতুন বছর শুরুর রাতে হযরত শাহজালাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে আন্তর্জাতিক ভাবে কুখ্যাত অপরাধী অ্যালবার্ট ফাত্তাহ আকস্মিকভাবে ধরা পরে গেলো। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হলো আন্তর্জাতিক চাপ, অপরাধীকে হস্তান্তর করতে হবে ইন্টারপোলের কাছে। টালমাটাল এই সময় ভয়ংকর একটা গল্প শোনালো ফাত্তাহ। শহরের গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থানে স্বয়ংক্রিয় করে রাখা হয়েছে কিছু হাইলি পোটেন্ট এক্সপ্লোসিভ! যা শহরটির ভীত নাড়িয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। ফাত্তাহ প্রস্তাব দিলো, আজ রাতের মধ্যেই তাকে ছেড়ে দেয়া না হলে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ওই সব এলাকায় ঘটবে স্মরণকালের ভয়াবহতম বিস্ফোরণ। একদিকে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপে সরকার আর আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যখন দিশেহারা তখন রহস্য উদঘাটনের দায়িত্ব এসে পড়ে দীর্ঘদিন স্বেচ্ছা-অবসরে থাকা সাইকোলজির এক প্রফেসরের উপর। হাতে সময় মাত্র এক রাত! প্রফেসর কি পারবে ফাত্তাহ'র বোনা জাল ছিড়ে হাজারও নিরপরাধ মানুষের জীবন বাঁচাতে?
জবাব মিলবে রবিন জামান খানের প্রথম সাইকোলজিকাল থ্রিলার 'শব্দজাল'এ - যেখানে ধীশক্তি আর শব্দের খেলায় ফুঁটে উঠেছে মানব মনের বিচিত্র এক অন্ধকার উপাখ্যান।"
রবিন জামান খানের লেখনী নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। কিছু মানুষের জন্মই হয় সুন্দর সুন্দর গল্পের পশরা সাজিয়ে বসার জন্য, লেখক তাঁদেরই একজন।'শব্দজাল' খুলে বসলে তাই তন্ময় হয়ে গল্পটা শোনা ছাড়া আপনার আর কিছু করার থাকে না! গল্পের শুরুতেই তিনি সাইকোলজির এক অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসরকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর ডেমোলিশন এক্সপার্ট এর সামনে দাড় করিয়ে দিয়েছেন। এক বুদ্ধিমত্তা ছাড়া তাঁর কোনো হাতিয়ার নেই, পক্ষান্তরে অ্যান্টাগোনিস্ট পৃথিবীর সবচেয়ে চালাক আর হিংস্র মস্তিষ্ক! যার কাছে এক রাতেই ঢাকা শহরকে উড়িয়ে দেয়া সামান্য একটা কূটচালের অংশ মাত্র। সদ্য স্থাপিত 'পিবিএসআই'এর হেডকোয়ার্টারে গভীর রাতে শুরু হয় দুই ক্ষুরধার মস্তিষ্কের লড়াই। এ যুদ্ধ যেমন অগণিত অসহায় মানুষকে বাঁচানোর তেমনি সময়ের বিরুদ্ধে জয় লাভের। যুক্তির এই সাপলুডু খেলায় প্রফেসরের কাছে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় সমস্ত চাল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচে যেন সবাই। কিন্তু আসলেই কি তাই? সত্যি আর হাইপোথিসিসের দোলাচলে প্রফেসরের কাছে হঠাৎ করেই ধরা দেয় মুল র��স্য! তারপর??? ভালো আর মন্দের যুদ্ধ সৃষ্টিলগ্ন থেকে চলে এলেও এবার অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়ে যায় একটা শহরের ভবিষ্যৎ। লড়াই যখন সমানে সমানে তখন যুক্তির এই যুগলবন্দী কে জিতবে - তা নিয়েই 'শব্দজাল।'
পাঠক, ঝটপট সিটবেল্ট বেঁধে নিন। কারন এরপর লেখক যা নিয়ে হাজির হবেন তার জন্য আপনি তৈরি নন! টুইস্টের দুনিয়ায় আপনাকে স্বাগতম।
'বাতিঘর' থেকে ২৫শে মার্চ, সপ্ত রিপু কিংবা ব্ল্যাক বুদ্ধা'য় রবিন জামান খান আগেই জাত চিনিয়েছেন। হিস্টোরিকাল থ্রিলার জনরায় তাকে 'মাস্টার' বললে বাড়িয়ে বলা হবে না নিশ্চয়ই। মনের দিক দিয়ে অসম্ভব ভালো এই মানুষটি সাহিত্যের প্রতি কতোটা ডেডিকেটেট তা লিখে বোঝানো যাবে না। বইটি নিয়ে আগ্রহ বাড়িয়ে দেবার একটা বড় কারণ ছিলো এটিও। 'শব্দজাল' সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী উপন্যাস হয়েও সেই আগ্রহের মর্যাদা রাখতে পেরেছে দেখে ভালো লেগেছে। কমফোর্ট জোনের বাহিরে গিয়ে ভিন্নধর্মী কিছু লেখা সব লেখকের জন্যেই কঠিন। লেখক এতেও বেশ ভালোভাবেই উৎরে গেছেন।
আগেই বলেছি , গল্প বলার ধরণে রবিন জামান খানের জুড়ি নেই। প্রাঞ্জল বর্ণনা আর সাবলীল শব্দ গঠন আপনাকে মুগ্ধ করতে বাধ্য। এছাড়া প্রথম থেকেই লেখক খুব যত্ন করে গল্পটা বুঝিয়ে বলেছেন। শুরুটা তাই কিছুটা ধীর মনে হলেও পরে কাহিনী গতি পেতে সময় নেয়নি। লেখকের 'ডাই হার্ড ফ্যান' না হলেও তাই বইটি টানা পড়ে যেতে কারোই সমস্যা হবার কথা নয়।
দেশীয় প্রেক্ষাপটে 'ইন্টারোগেশন রুম ড্রামা' নেই বললেই চলে। সেখানে পুরো বইটি লেখক একটা রুমের ভেতরে যাস্ট কিছু কথাকে ভিত্তি করে এগিয়ে নিয়েছেন। এটা অবশ্যই লেখকের মুন্সিয়ানা প্রমাণ করে। এছাড়াও মব সাইকোলজি, ইন্টারোগেশন রুমের পরিবেশ, প্রশ্ন করার ধরণ, রিড টেকনিক, অপরাধীর মনস্তাত্ত্বিকতা - ইত্যাদি সব কিছুর পেছনে রবিন জামান খানের কঠোর হোমওয়ার্ক চোখে পড়ে।
চরিত্র গঠন ‘শব্দজাল’এ লেখকের প্রধান কৃতিত্ব। প্রফেসর জাকারিয়া আহমেদ সাইকোলজিকাল চরিত্র হলেও হুমায়ুন আহমেদের লেখনীতে অমর হয়ে যাওয়া মিছির আলী কিংবা শরিফুল হাসানের আহমেদ করিমের সাথে পার্থক্য মূলত তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আর জীবনধারায়। লেখায় প্রফেসর জাকারিয়া কিংবা অ্যালবার্ট ফাত্তাহ সমান সময় আর মনোযোগ পেলেও প্রায় ক্ষেত্রেই ফাত্তাহ প্রফেসর থেকে এগিয়ে থেকেছে। বাংলা সাহিত্যে এই চলটা বিরল। বইটিতে আমার সবচেয়ে পছন্দের অংশ কিন্তু এটাই। বাজি ধরে বলতে পারি, আপনি বহুদিন এরকম দুর্ধর্ষ অ্যান্টাগোনিস্ট দেখেননি। প্রফেসর জাকারিয়া আহমেদ গল্পের প্রয়োজনেই স্মার্ট। উচ্চ শিক্ষিত, গ্যাজেট ফ্রিক আর প্রযুক্তি নির্ভর। আসন্ন বিপদ আঁচ করে গৃহকর্মীদের ঢাকা ছেড়ে গ্রামে পৌঁছে দেয়া একই সাথে তাঁর চরিত্রের দায়িত্বশীলতা আর মানবিক দিক সামনে আনে। জুনিয়ার অফিসার আফসার বা বন্ধু আতিকুল আলমের সাথে কথোপকথনে যেমন সামাজিক দিকটি প্রকাশ পেয়েছে তেমনই অ্যান্টাগোনিস্টের সাথে শব্দখেলায় প্রফেসরের চারিত্রিক দৃঢ়তা কারোই চোখ এড়ানোর কথা না। অন্যদিকে ফাত্তাহ প্রচুর সম্পদের মালিক হয়েও অহংকারী, পৃথিবীর নিকৃষ্টতম মস্তিষ্কের একজন। তার বলার ভঙ্গি থেকে শারীরিক ভাষা সবকিছুই নিষ্ঠুর, দাম্ভিক, উচ্চাভিলাষী। গোপন কোন স্বার্থ উদ্ধারে যেখানে একটা পুরো শহর উড়িয়ে দিতে সে প্রস্তুত সেখানে পরিবারের প্রতি তার ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা আর দশ জনের মতোই স্বার্থহীন, অসাধারণ। নিঃসন্দেহে ব্যালান্স কারেক্টারাইজেশনের চমৎকার উদাহরণ হয়ে থাকবে 'শব্দজাল।' তাই শুধু ট্রিলজি না, প্রফেসর জাকারিয়া কে নিয়ে পুড়ো সিরিজ চাই!
বানান, শব্দ চয়ণ, অক্ষর বিন্যাস নিয়ে লেখক অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখেন। অ্যালাইনমেন্ট, প্যারাগ্রাফ, পেজ-সেটআপ বরাবরের মতোই পারফেক্ট ছিলো। বিরাম চিহ্নের ব্যবহারে কোথাও আধিক্য চোখে পরেনি। বইটিতে কঠিন শব্দের প্রাচুর্য যেমন নেই তেমনি অযথা সংলাপ পড়ার গতিকে কমিয়ে দেয়নি। শব্দ দিয়েই লেখক যখন পুরো গল্প সাজিয়েছেন তখন সংলাপ আর বর্ণনা আলাদা করে লেখা জরুরী ছিলো। লেখক এ কাজটিও যথেষ্ট স্বার্থকতার সাথে করেছেন।
মানসম্পন্ন বাঁধাই, উন্নত কাগজ, পরিচিত ফন্ট, ঝকঝকে প্রিন্ট সহ বইটি বেশ আকর্ষণীয়। হাতে নিয়ে প্রিমিয়াম একটা ভাব পাওয়া যায়। হালের প্রিন্টিং সেনসেশন চিরকুট, বুকস্ট্রিট কিংবা বিবলিওফাইল'এর বইগুলোর চেয়ে'শব্দজাল'এর মান কোনো অংশেই কম মনে হয়নি। লেখকের আগের বইগুলোর তুলনায়'শব্দজাল'এর পৃষ্ঠা কম হওয়ায় গল্পটা ভালো লেগে গেলে পাঠক এক বসায় বইটি শেষ করতে পারবেন।
খারাপ লাগা অংশটা ছোট্ট। 'শব্দজাল'এর প্রচ্ছদ আরও কিছুটা আকর্ষণীয় করা যেতো মনেহয়। যদিও এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত, তারপরেও। নালন্দা থেকে লেখকের প্রথম উপন্যাস জন্যই হয়তো প্রত্যাশা একটু বেশি ছিলো। প্রচ্ছদকার চেষ্টা করেছেন প্রচ্ছদে মনস্তাত্ত্বিক একটা আবহ তৈরি করতে কিন্তু লেখকের আর দশটা বই'এর মাঝে পাঠক কেনো প্রথমেই 'শব্দজাল' তুলে নেবেন; এমন কাজ মনে হয়নি। আমি বরং ভারতের 'বুককার্ট' থেকে প্রকাশিতব্য 'শব্দজাল'এ কুশল ভট্টাচার্যের আঁকা'ই এগিয়ে রাখবো। এছাড়া, অধ্যায়ের শুরুতেই ব্যবহৃত ইলাস্ট্রেশনটা বেশ নিন্মমানের মনে হয়েছে। প্রচ্ছদকার শেখ মাহমুদ ইসলাম মিজুর কাছে পরবর্তীতে আরও ডিটেইল, তাৎপর্যপূর্ণ কাজ আশা করছি।
যারা পরিচিত ঘরনার বাহিরে পড়তে ভালবাসেন, ভালো আর মন্দের যুগলবন্দী ভালো লাগে তাঁদের নিঃসন্দেহে 'শব্দজাল' পছন্দ হবে। সত্যি বলতে, বইটি পড়ে একবারের জন্যেও মনে হয়নি এটা লেখকের এক্সপেরিমেন্টাল কাজ। ভিন্নধর্মী প্লট আর অসাধারন লেখনীর জন্য 'শব্দজাল' অবশ্যই অনেকের প্রিয় বইয়ের তালিকায় থাকবে। আমি অবশ্যই সিরিজের পরবর্তী উপন্যাস 'বিখণ্ডিত'এর অপেক্ষায় থাকবো।
নালন্দা প্রকাশনীর ব্যানারে 'শব্দজাল' বেড়িয়েছে এ মাসেই। ১৫৮ পৃষ্ঠার বইটির মুদ্রিত মূল্য ৩০০ টাকা মাত্র। আগ্রহী পাঠকরা প্রায় সব প্রতিষ্ঠিত বুকস্টোর থেকে আকর্ষণীয় ছাড়ে পেয়ে যাবেন বইটি। আর যারা ঘরে বসে কিনতে আগ্রহী - Book Street, Rokomari, Bookers, Bibidho সহ অনেক অনলাইন বুকশপ তো রয়েছেই। ধন্যবাদ সবাইকে।
রেটিংঃ ৪.৫/৫
সর্বোচ্চ সতর্ক থাকুন। প্রয়োজন ছাড়া বাহিরে না বের হবেননা। বাহিরে মাক্স ব্যবহার করুন।
একজন আন্তর্জাতিক টেরোরিস্ট ধরা পড়ে ঢাকায়। দেশে বোমা হামলা করার পরিকল্পনা ছিল তার। বিস্ফোরক স্থাপন করে দেশ থেকে পালিয়ে যাবার সময় দুর্ভাগ্যক্রমে ধরা পড়ে। যখন পুলিশ জানতে পারে তার পরিকল্পনা, বেশ বিপাকে পড়ে যায় তারা। কারণ এই অপরাধী এমনিতেই ভয়াবহ দুর্ধর্ষ, তার উপর বিশেষ কারণে কোন ধরনের শারীরিক যন্ত্রণা অনুভব করে না সে। টরচার করে তথ্য আদায় করা তাই প্রায় অসম্ভব। বাকী থাকে তার মনের মধ্যে ঢুকে হামলার পরিকল্পনার আদ্যোপান্ত খুঁজে বের করা। ডাক পড়ে দেশ-সেরা সাইকোলজিস্ট প্রফেসর জাকারিয়া আহমেদের। শুরু হয় দুই শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।
সত্যি বলতে বইটা পড়তে গিয়ে একেক পর্যায়ে একেক রকম অনুভূতি ছিল আমার। শুরুতে আমার একঘেয়ে লাগা শুরু করেছে। কারণ বর্ণনা দিয়ে বই শুরু, ঘটনা দিয়ে ���য়। বর্ণনাও যে খুব আগ্রহোদ্দীপক তা নয়। প্রফেসর সাহেব ধ্যান করছেন, তিনি এমন করতে ভালোবাসেন, অমন করতে পছন্দ করেন না ইত্যাদি। চরিত্রের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছিল পাঠককে। কিন্তু খুবই ধীর প্রক্রিয়ায়। বইয়ের শুরুতেই গল্পের ভেতর পাঠককে টেনে না ধরতে পারলে অনেক সময় আগ্রহ হারায় পাঠক। যা হোক, প্রথম ২০ পৃষ্ঠার পর ঘটনা আস্তে আস্তে ইন্টারেস্টিং হতে শুরু করে। ৫০ পৃষ্ঠার দিকে গিয়ে উত্তেজনা দানা বাঁধতে শুরু করে। সেই পারদ বেড়ে বেড়ে তুঙ্গে চলে যায় ৮০-৯০ পৃষ্ঠার দিকে। এই সময়টাতে আমি গল্পে ডুবে ছিলাম। ‘এই চ্যাপ্টারটা পড়ে একটু বিরতি নেব’ ভেবেও বইয়ে সেঁটে থাকা হয়, উঠে যাওয়া যায় না গল্প ছেড়ে, এমন একটা সময় ছিল। কিন্তু তারপর আস্তে আস্তে সেই পারদ কমতে থাকে। ১২০ পৃষ্ঠা, গল্প প্রায় শেষ, সবকিছুর সুখ সমাপ্তি, এই সময়টাতে ভীষণ বিরক্ত ও হতাশ ছিলাম। এত সোজা? বেশি ভ্যাতভ্যাতে হয়ে গেল ব্যাপারটা! বাকী ৪০ পৃষ্ঠা পড়ব নাকি রেখে দেব, সেটাও ভেবেছি এক সময়। কিন্তু না, এরপর আবার সেই তুঙ্গে ওঠা পারদ, গল্পের ভেতর গল্প, টুইস্টের ভেতর টুইস্ট, সাইকোলজিক্যাল অ্যানালেসিস, পুরো বইয়ে ফেলে রাখা টোপগুলোর বর্ণনা, দুর্দান্ত! অসাধারণভাবে শেষ হয় বইটি। তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছিলাম অবশেষে।
সব মিলিয়ে বেশ স্বার্থক একটা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার। ভালো একটা বই। মোটামুটি পেজ টার্নার ক্যাটাগরিতে ফেলা যায়। শেষে এসে যেভাবে ঘটনাগুলো সাজানো হয়েছে, মুগ্ধ হয়েছি তাতে। বইটা ভেবে চিন্তে, প্লট তৈরি করে লেখা। তাই আইডিয়ার এক্সিকিউশান বেশ ভালোমতো হয়েছে।
তবে একটা ব্যক্তিগত অভিমত জানিয়ে রাখি। যে বিষয়টা ভালো লাগেনি (লেখকের অন্যান্য বইতেও ব্যাপারটা আছে), তা হলো সিনেমাটিক ন্যারেশন। গল্পের চরিত্রগুলো বাস্তবের মানুষের মতো আচরণ করছিল না, করছিল সিনেমার চরিত্রের মতো। ভিজুয়ালাইজেশনে এত বেশি জোর দেওয়া হয়েছে যে রীতিমতো দৃষ্টিকটু পর্যায়ে চলে গেছে তা। যেমন এন্টাগনিস্ট অকারণে এত বেশি হাসছিল যে মেকি মনে হয়েছে। এ ধরণের সিনেম্যাটিক বর্ণনা অন্যদের কেমন লাগে জানি না, আমার কাছে ভালো লাগে না। সিনেমা যখন দেখতে বসি আমরা, চরিত্রগুলো যত ভালোই অভিনয় করুক, সারাক্ষণ এই বিষয়টা ফুটে ওঠে যে তারা ‘অভিনয়’ করছে। এই মেকি সেটআপে দর্শকরা অভ্যস্ত, অভিনেতারা অভ্যস্ত। কিন্তু বইয়ে আমরা, পাঠকরা এর চেয়ে বেশি কিছু চাই। আমরা চাই চরিত্রগুলো বাস্তবের মতো আচরণ করুক। নাটকীয়তাকেও বাস্তবের আদলে দেখতে চাই আমরা। লেখার ধরণে যে ‘স্ক্রিপ্ট রাইটিং’ ভাবটা ফুটে উঠেছে, সেটা পছন্দ হয়নি আমার। এই ধরনের ন্যারেটিভস আমার মতে বইয়ের জন্য অনুপযুক্ত, স্ক্রিপ্ট রাইটিং এর জন্য পার্ফেক্ট। এটা আমার মতামত, অন্য পাঠকরা কী ভাবেন, জানাতে পারেন। এখানে কি লেখকের আরও কাজ করার সুযোগ আছে না এই ন্যারেটিভই যথেষ্ট বলে মনে করেন?
টুকটাক টাইপো ছিল, তেমন কিছু না। তবে দুয়েক জায়গায় এনওয়াইপিডি (NYPD) কে এনএপিডি বলা হয়েছে। বইয়ের বাঁধাই, প্রচ্ছদ চমৎকার ছিল। বোধহয় পৃষ্ঠা সংখ্যার তুলনায় দামও কিঞ্চিৎ বেশি পড়েছে এজন্য।
সর্বোপরি থ্রিলারপ্রেমী যে কাউকে সাজেস্ট করব বইটি। হার্ডকোর থ্রিলারে সাইকোলজির প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে। শেষটা প্রেডিক্ট করা যায়নি কোনভাবেই। রহস্যের জট ছাড়ানোটা দারুণ উপভোগ্য। এক বসায় পড়ে ফেলার মতো বই।
ব্যক্তিগত রেটিং-৩.৫
একটা বিশেষ কারণে চার না দিয়ে সারে তিন দিয়েছি। গুডরিডসের হিসেবে চারই থাকবে যদিও। এবার সেই প্রসঙ্গে কিছুটা খটকা প্রকাশ করব। মূল রিভিউ এখানেই শেষ। যারা বইটা পড়েননি, তারা এই লেজটুকু কিছুতেই পড়তে যাবেন না।
১। চশমায় থাকা প্রযুক্তিটি পুরো অ্যানালাইসিসকে ঠুনকো করে দিয়েছে। এমন একটা চশমা যেটা ব্রেন থেকে সরাসরি কমাণ্ড নেয়, নিজে নিজে ডিপ ওয়েব ও ডার্ক ওয়েব ঘাঁটতে পারে (ডার্ক ওয়েব ঘাঁটে মানলাম, যেহেতু ডিপ ওয়েবও ঘাঁটে পারে, এয়ারপোর্টের সার্ভারে নকল ডেটা রেখে আসতে পারে, তাই হ্যাকও নিশ্চয়ই করতে পারে।), নিজে নিজে নিঁখুত আর্টিফিশিয়াল ইমেজ তৈরি করতে পারে, এমন হাই-টেক, সুপার ডিভাইস সাথে নিয়ে কেস সলভ করা না করা সমান। বিশ্বের প্রথম সারির গোয়েন্দা সংস্থার কাছেও এত ভালো প্রযুক্তি আছে কিনা সন্দেহ! আমি শুরুতে ভেবেছিলাম ডিডাকশন থেকে সাইকোলজিস্ট সাহেব সব অনুমান করছে। পরে দেখি তার চশমায় এই ধরনের ব্যাটম্যানীয় প্রযুক্তি। তাছাড়া রাতের বেলা সারাক্ষণ কফিরঙা চশমা পরে থাকলেও তো সন্দেহ হবার কথা অন্যদের। এই জায়গায় মার খেয়ে গেছে বইটা।
২। সাইকোলজিস্ট ভদ্রলোক এন্টাগনিস্টের গল্প থেকে সত্য মিথ্যা যেভাবে আলাদা করলেন কোন রকম ডিডাকশন বা বিহেভিয়র প্যাটার্ন অ্যানালেসিস ছাড়া, সেটা সোজা কথায় অসম্ভব। এমনটা বাস্তবে ঘটবে না কোন ভাবেই। ফিকশন হিসেবে মেনে নেওয়া যায়, তবু কিছুটা ‘অ্যানালেটিক’ অ্যাপ্রোচে এগোলে ভালো হতো।
৩। প্রফেসর যদি ‘রিড টেকনিক’ হোক্স হিসেবে ব্যবহার করেন, অর্থাৎ তিনি জেনে থাকেন যে তার টেকনিক আসলে এন্টাগনিস্টকে বোকা বানানোর জন্য প্রয়োগ করা হয়েছে, তাহলে যখন এন্টাগনিস্ট সংকেত লিখে বুঝালো যে সে ধরে ফেলেছে ব্যাপারটা, তখন প্রফেসর এন্টাগনিস্টের চোখের আড়ালে, পুলিশের সামনে ‘ওহ শিট, সর্বনাশ হয়ে গেছে’ বলে দৌড় দেবার কারণ কী? কলিগদের সামনে তো তার অভিনয় করার দরকার নেই!
যারা পড়েছেন বইটি, তারা এ বিষয়গুলো সম্পর্কে অভিমত জানাতে পারেন।
প্রফেসর জাকারিয়া আহমেদ। নিভৃতচারী এই দুর্দান্ত সাইকোলজিস্ট নিজেকে সমাজ থেকে আড়াল করে রাখেন। সেই আড়াল থেকে অবশ্য প্রফেসর জ্যাক এক রকম বাধ্য হয়ে বেরিয়ে আসেন। কারণ আব্দুল্লাহ আল ফাত্তাহ। ধুরন্ধর আন্তর্জাতিক এই বোমারু ধরা পড়ে গেছেন।
ঢাকা শহরে প্রধানমন্ত্রী এবং তিন রাষ্ট্রের প্রধান সহ অনেকেই অবস্থান করছেন ঐতিহাসিক এক উদ্বোধনের। এর মধ্যে বাধ সেধেছে অ্যালবার্ট ফাত্তাহ। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন বোমাবাজী করার কারণে ইন্টারপোলের টপ ওয়ান্টেডদের মধ্যে অন্যতম ফাত্তাহ। ধরা পড়ার পরও সঙ্গত কারণে তাকে শারীরিক নির্যাতন কিংবা ড্রাগ দিয়ে কথা বের করা সম্ভব নয়, খুব সঙ্গত কারণে।
উদ্ভুত পরিস্থিতিতে অ্যালবার্ট ফাত্তাহ এর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য বের করতে না পারলে শ্রেফ উড়ে যাবে ঢাকা, সেই উদ্বোধনের দিনেই। পিবিএসআই এর মত সবচেয়ে দক্ষ প্রতিষ্ঠানের পক্ষেও কাজটি করা প্রায় অসম্ভব। ফাত্তাহ এর থেকে তথ্য উদ্ধার করতে পারবেন সম্ভবত শুধু একজন। প্রফেসর জ্যাক। এইসব ইনফো জোগাড় করতে হবে প্রফেসরকে অনেকটা গল্পচ্ছলে। হাতে আছে শুধু একটি রাত। পুরো ঢাকা শহরের ভাগ্য নির্ভর করছে ইন্টারোগেশনের সেই রুমে, যেখানে কথাবার্তার দ্বৈরথে প্রফেসর জ্যাককে চ্যাকমেইট করতে হবে ফাত্তাহকে।
রবিন জামান খানের '২৫ শে মার্চ' এবং 'সপ্তরিপু' পড়েছি আগে। সময় উপাখ্যান সিরিজের প্রথম বই সপ্তরিপু আমার কাছে দুর্দান্ত লেগেছিলো। প্রফেসর জ্যাক সিরিজ - ১ এর মধ্য দিয়ে এক মানব মনস্তাত্ত্বিক ভ্রমণ শেষ করলাম। লেখকের বই এমনিতেই বেশ টানটান, ফাস্ট রিড। এছাড়া ধারাবাহিকভাবে ভালো লিখতে পারেন রবিন জামান খান। 'শব্দজাল' সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারে লেখক হিউম্যান সাইকোলজীর বিভিন্ন গহীন দিক দেখিয়েছেন। প্রফেসর জ্যাক বনাম মিস্টার 'ডি' এর কথোপকথনই যথেষ্ঠ পাঠককে শে�� পর্যন্ত আগ্রহী করে রাখার জন্য।
বইটির যে বিষয়টি অপেক্ষাকৃত কম ভালো লেগেছে সেটি হলো প্রযুক্তির অতি বর্ণনা। প্রযুক্তিগত যেসব বিষয় রেগুলার থ্রিলার পাঠকদের জানা তার এত বিবরণ আমার কাছে এই গ্রন্থের একটি পিছিয়ে থাকা দিক মনে হয়েছে। তবে যে কায়দায় উক্ত নভেল লিখা তার উপর অনায়াসেই অল্প বাজেটের মুভি নির্মাণ করা যায়। নাকি অলরেডি নির্মিত হয়ে গেছে? আমি মুভি-টিভি সিরিজ কম দেখা মানুষ। কারো জানা থাকলে দয়া করে বলবেন। প্রফেসর জ্যাক সিরিজের দ্বিতীয় আখ্যান 'বিখন্ডিত' সংগ্রহে আছে আমার। ভালো লেগেছে লেখক হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত এক চরিত্রকে নড দেয়াটা।
হাতে আছে মাত্র এক রাত। জাকারিয়া আহমেদকে অ্যালবার্ট ফাত্তাহ এর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য বের করতেই হবে। যে কারণে ফাত্তাহের জন্য ইন্টারোগেশন রুমে প্রফেসর জ্যাক বুনে চলেছেন শব্দজাল।
বই রিভিউ
নাম : শব্দজাল লেখক : রবিন জামান খান প্রথম প্রকাশ : সেপ্টেম্বর ২০২০ প্রকাশনা : নালন্দা প্রচ্ছদ : শেখ মাহমুদ ইসলাম মিজু জনরা : সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, ভায়োলেন্স বাদে মানুষের সবচেয়ে আদীম হাতিয়ার কি? খুব ভালো মত ভাবলে পেয়ে যাবেন। এক হলো শব্দ আরেকটা সময়। গল্পের সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং পার্ট ছিল শুধু শব্দের জাল বিস্তার করে দুইজন মানুষ এর কথোপোকথন। ইনটেন্স , থ্রিলিং কিন্তু যাস্ট কনভার্সেশন। শব্দের ধুম্রজাল দিয়ে লেখক অসাধারণ এক প্লট সাজিয়েছেন যার দারুণ একটা এক্সিকিউশন ছিল সময়।
বই : শব্দজাল লেখা : রবিন জামান খান জনরা : সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার প্রকাশনী : নালন্দা পৃষ্ঠা : ১৫৮ মুদ্রিত মূল্য : ৩০০ টাকা
গল্পবাঁক ------------------ বছর শুরুর প্রারম্ভে একাধিক উপলক্ষ্যকে সামনে রেখে যখন উৎসবের আমেজে সেজেছে পুরো শহর এমন সময় আন্তর্জাতিকভাবে কুখ্যাত এক অপরাধী নিতান্ত আকস্মিকভাবে ধরা পড়লো এয়ারপোর্টে। ধরা পড়েই সে জানালো তাকে ছেড়ে দেওয়া না হলে বছরের প্রথমদিন ঘটবে এমন এক ঘটনা, যার ফলে প্রাণ হারাবে লক্ষাধিক মানুষ। একদিকে ইন্টারপোলসহ বিশ্বের বড়-বড় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর চাপ, অন্যদিকে কুখ্যাত এই অপরাধীর বিশেষ প্রস্তাবের কূটচালে প্রশাসন যখন দিশেহারা এমন সময় জটপাকানো এই ঘটনার দায়িত্ব এসে পড়ে দীর্ঘদিন যাবৎ স্বেচ্ছা-অবসরে থাকা সাইকোলজির এক প্রফেসরের ওপরে। জটিল ও প্রাণঘাতী এই ষড়যন্ত্রের স্বরূপ উদঘাটনের জন্যে প্রফেসরের একমাত্র অস্ত্র তার বুদ্ধিমত্তা, হাতে সময় মাত্র এক রাত। প্রফেসর কি পারবে কুখ্যাত এই অপরাধীকে নিজের বুদ্ধিমত্তার জালে বন্দি করে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ বাঁচাতে?
বইয়ের ভালো-মন্দ -------------------------------- ● ভালো দিক
আমি মনে করি একটা মানসম্মত সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের অন্যতম দরকারী পয়েন্ট হল লেখকের শব্দ ও বাক্যের প্রায়োগিক দিক, গল্পের চরিত্রগুলোর ডেভেলপমেন্ট এবং আকর্ষণীয় প্লট। শুরুতেই 'শব্দজাল' বইটির প্লট নিয়ে আলোচনা করা যাক। একজন কুখ্যাত অপরাধী ; নিতান্ত দুর্ভাগ্যবশত ধরা পড়েছে এয়ারপোর্টে। এরপর জিজ্ঞাসাবাদের বেলায় সে এমন এক তথ্য দিল যা দেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। কোনোপ্রকার শারীরিক টর্চার বা অস্ত্রের সম্মুখে তার ভেতর থেকে কথা আদায় করা যাবে না - এটা বুঝতে পেরে স্রেফ শব্দের জালে তাকে আটকে আসল সত্যটা উদ্ধারে এগিয়ে এলেন এক প্রফেসর। কে এই প্রফেসর? এখানেই লেখকের ক্যারেক্টারাইজেশনের প্রতিভা পাওয়া যায়। প্রফেসর জ্যাক একে তো মূখ্য চরিত্র, তার ওপর 'শব্দজাল' সিরিজের প্রথম বই এটা। তাই প্রফেসর চরিত্রটি পাকাপোক্তভাবে পাঠকমনে গেঁথে না দিতে পারলে পাঠক সিরিজের পরবর্তী বই পড়তে স্বভাবতই অনাগ্রহ দেখাবে। আর সম্ভবত এজন্যই বইয়ের শুরুতে প্রফেসর চরিত্রটিকে বেশ খানিকটা স্ক্রিনটাইম দিয়ে নিয়েছেন লেখক। একজন যুক্তিবাদী মানুষ, যার কাছে ভাষা এবং সময় দুটোই সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ; যে কিনা সর্বদা নিজের জগতেই ডুবে থাকেন - গল্প যত সামনে এগিয়েছে প্রফেসর চরিত্রটি যেন বাস্তবে তত বেশি উপলব্ধি করতে পেরেছি। প্রফেসরের সমান্তরালে গল্পের আরেকটি মূখ্য চরিত্র ফাত্তাহকেও বেশ ভালোভাবে তৈরি করেছেন লেখক। সফলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন একজন ইন্টারন্যাশনাল অপরাধীর জীবনবোধ, মানসিক টানাপোড়েন এবং দূর্দান্ত চিন্তাকৌশল। প্রফেসর এবং ফাত্তাহ - দুটি চরিত্রকেই যথেষ্ট সময় দিয়েছেন লেখক। ফলপ্রসু মূখ্য দুই চরিত্র ই যথেষ্ট বাস্তবসম্মত হয়ে উঠেছে গল্পে। আর এটা আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। মূলত গল্পের শেষ পাতা অবধি দুজনের কাউকেই ছোট করে দেখানো হয়নি। এছাড়া ভালো লাগার দিকের কথা বলতে হলে বলবো প্রফেসরের যুক্তির বিপক্ষে ফাত্তাহ'র পাল্টা কাউন্টার আমাকে স্রেফ মুগ্ধ করেছে। দুই প্রতিদ্বন্দীর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধটা বেশ উপভোগ করেছি আমি।প্রফেসর চরিত্রটি সবার কেন্দ্রবিন্দু হলেও ফাত্তাহ চরিত্রটি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে বেশি আকর্ষণ করেছে। এছাড়া প্রফেসরের ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষতার অংশটা একটু সিনেম্যাটিক হলেও মোটামুটি ভালোই লেগেছে। মিসির আলীর প্রতি ট্রিবিউটটা বেশ উপভোগ করেছি।
● মন্দ দিক
'শব্দজাল' বইটার মন্দ দিকের কথা বলতে হলে বলবো বইয়ের শুরুর দিকে ভাষাশৈলী খুব একটা মানসম্মত লাগেনি আমার কাছে। যেমন এক জায়গায় আছে 'নিজের কাঁধ ডলল প্রফেসর'। এখানে 'ডলল' শব্দটা যে কারও চোখে বিঁধবে। সমার্থক অন্য কোনো শ্রুতিমধুর শব্দ ব্যবহার করা ই যেত। যদিও শুরুর দিকে এরকম কিছু ত্রুটি পেয়েছি তবে গল্পে যত সামনে এগিয়েছে লেখকের শব্দশৈলী আরও নিখুঁত হয়েছে। আরেকটা ব্যাপার, এয়ারপোর্টে ফাত্তাহ'র ভিআইপি টার্মিনাল ব্যবহার করার বিষয়টা কেমন যেন বেখাপ্পা লেগেছে। ভিআইপি টার্মিনাল তো ইমার্জেন্সী রোগীর জন্য নয়। যাহোক, নালন্দার প্রোডাকশন বেশ ভালো হয়েছে। প্রচ্ছদ, পৃষ্ঠা, বাঁধাই সব ঠিকঠাক ই ছিল তবে সচরাচর অন্যান্য বইয়ের পৃষ্ঠা নম্বর যেমন পৃষ্ঠার নিচের দিকে সেন্টার পজিশনে থাকে কিন্তু এই বইটিতে পৃষ্ঠা নম্বর দেওয়া হয়েছে পৃষ্ঠার উপরের দিকে। এই বিষয়টিতে অভ্যস্ত হতে কিছুটা সময় লেগেছে আমার। আর বুকমার্ক হিসেবে বইয়ের ভিতরে যে ফিতাটা দেওয়া হয় সেটার অভাববোধ করেছি। টুকটাক কিছু বানান ভুলও চোখে পড়েছে।
সব মিলিয়ে এই ছিল রবিন জামান খান'র 'শব্দজাল'।
শেষের কথা ----------------------- রবিন জামান খানের ভক্ত হয়ে পড়েছি তার 'সপ্ত রিপু' বইটির মাধ্যমে। ইতিমধ্যেই বাংলা মৌলিক থ্রিলারে একাধিক মাস্টারপিস যোগ করেছেন তিনি। সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার জনরায় 'শব্দজাল' তার প্রথম কাজ। আর প্রথম কাজ হিসেবে তিনি বেশ সফল বলতেই হবে। বইটা মোটাদাগে ভালো লেগেছে না বলে উপায় নেই। বিশেষত প্লট টা আমাকে চুম্বকের মত আকর্ষণ করেছে। এর সাথে যোগ হয়েছে লেখকের চমৎকার লেখনশৈলী। সব মিলিয়ে পাঠক চাইলে বইটা পড়ে দেখতে পারেন। আশা করি ভালো লাগবে। আর হ্যাঁ, 'শব্দজাল' সিরিজের দ্বিতীয় বইয়ের ঘোষণাও এই বইটিতেই দেওয়া আছে। পরের বইয়ের নাম 'বিখন্ডিত'। পরবর্তী বইয়ের জন্য লেখককে অগ্রীম শুভকামনা।
3.5/5 নাজিমউদ্দিনের মতো টান টান উত্তেজনা না পেলেও গোছানো একটা থ্রিলার। এক রাতের গল্প নিয়ে ১৬০ পাতার বই বানানোর ধারণাটা ভালো লেগেছে। ক্ষুদ্র স্পয়লার: বইটাতে মিসির আলী চলে আসবে Deus ex machina হিসেবে। কেমনে আসবে বলব না।
মূলত বিখণ্ডিত বইটা হাতে পাওয়ায় আগের কাহিনী জানতে প্রফেসর জ্যাক সিরিজের প্রথম বইটা পড়া শুরু করি। ভালই লাগবে।
সাইকোলজি এবং থ্রিলার দুটোই আমার বেশ পছন্দের বিষয়। সে হিসেবে এই বইয়ের প্রতি উচ্চাশা জন্মে গিয়েছিলো। সেখানে হতাশ হয়েছি। থ্রিলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশই থাকে সমাপ্তিতে। এই সমাপ্তিটাই পছন্দ হয়নি। তবে কিছু জায়গায় লেখক বেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এই বই নিয়ে মুভি বানালে দারুণ লাগতো দেখতে!
রবিন ভাইয়ের ২৫ শে মার্চ বইটি পড়ার পর ভালো লেগেছিলো। সেজন্য শব্দজাল আর বিখন্ডিত দেখা মাত্র কিনে আনি বাতিঘর থেকে। শব্দজাল শেষ করলাম। বলতেই হবে অনেক ইউনিক প্লট এর বইটি। কোনো ইঁদুর-বিড়াল দৌড় ছিলো না। প্রফেসর জ্যাক আর অপরাধীর মাইন্ড গেম দারুণ ছিলো৷ কেউ কারো থেকে কম যায় না। মাত্র এক রাতের গল্পে ছিলো টান টান উত্তেজনা, টুইস্ট এ ভরপুর বইটি। বইটিতে ঐতিহাসিক যুদ্ধের কথা উল্লেখ আছে। যেটাকে ধরে ভালো মোটিভ দাড় করিয়েছেন লেখক অপরাধীর। অপরাধীর অপরাধ জগতের পা রাখার পিছনের গল্প ও দারুণ ছিলো। লেখনশৈলী চমৎকার রবিন ভাইয়ের সেজন্যই দেখা মাত্রই বই দুটো নিয়েছি।
মিসির আলির প্রতি ট্রিবিউটটা ভালো লেগেছে। কিন্তু মিসির আলির টোন মোটেও আঞ্চলিক ছিলো না। উনি চলিত ভাষায় কথা বলতেন। সেজন্য আঞ্চলিক ভাষা দেখে দৃষ্টিকটু লেগেছে। তৃতীয় মুদ্রণেও বইয়ে অনেক বানান ভুল ছিলো। যা অনেক বিরক্তিকর।