হানিমুন কাটাতে কার্ডিফে এসেছে নবদম্পতি- আবরার ও লিজা। কিন্তু বিদেশের মাটিতে পা রাখতেই শুরু হয়েছে একের পর এক বিপদ। হানিমুন স্যুইটে পাওয়া গেলো লিসেনিং বাগ। হোটেল ম্যানেজারের আচরণ সন্দেহজনক। জার্মান স্পাইরা ঘুরছে আশে পাশেই। গোলকধাঁধার চক্করে পড়ে নবদম্পতির মধুচন্দ্রিমা রূপ নিলো দুঃস্বপ্নে।
বাঁচার জন্য জানতে হবে তিনটি প্রশ্নের উত্তর। এক: মৃত্যুর পূর্বে হিটলার গোপন বৈঠকে বসে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? দুই: একাত্তরে কেরানীগঞ্জের মাস্টারবাড়িতে পাওয়া সেই শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির লাশের পরিচয় কী? তিন: ত্রিশ বছর যাবত কোন রহস্য বুকে লুকিয়ে রেখেছে কার্ডিফ শহর?
প্রশ্নগুলোর উত্তর লুকনো আছে খুব চেনা এক পাজলের অন্তরালে- “মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া”। সমাধানের জন্য যেতে হবে কার্ডিফ সাগরের গভীরে অবস্থিত ফ্ল্যাটহোম দ্বীপে। কিন্তু কীভাবে যাবে ওরা? সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। চারিদিকে ওঁত পেতে আছে অচেনা শত্রু। এদিকে আবহাওয়া বার্তা জানাচ্ছে- কার্ডিফের দিকে ধেয়ে আসছে এক প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়!
নাজিম উদ দৌলার জন্ম ১৯৯০ সালের ৪ নভেম্বর নানাবাড়ি কেরানীগঞ্জে। পৈত্রিক নিবাস যশোর জেলায় হলেও বেড়ে উঠেছেন ঢাকার আলো বাতাসের মাঝে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ থেকে বিবিএ ও এমবিএ শেষ করে বেশ কয়েক বছর বিজ্ঞাপনী সংস্থায় চাকরি করেছেন।বর্তমানে দেশের প্রথম সারির প্রডাকশন হাউজ আলফা আই-এ ক্রিয়েটিভ ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন। লেখালেখির চর্চা অনেক দিনের। দীর্ঘসময় ধরে লিখছেন ব্লগ, ফেসবুক সহ বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফর্মে। ২০১২ সালে প্রথম গল্প “কবি” প্রকাশিত হয় কালান্তর সাহিত্য সাময়িকীতে। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৫-তে প্রকাশিত হয় তার প্রথম থ্রিলার উপন্যাস “ইনকারনেশন”। একই বছর আগস্টে প্রকাশিত হিস্টোরিক্যাল থ্রিলার “ব্লাডস্টোন” তাকে এনে দেয় বিপুল পাঠকপ্রিয়তা। এ পর্যন্ত ৬টি থ্রিলার উপন্যাস ও ৩টি গল্পগ্রন্থ লিখেছেন তিনি। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট লেখায় মনোনিবেশ করেছেন। সাম্প্রতিককালে তার চিত্রনাট্যে নির্মিত "সুড়ঙ্গ" সিনেমাটি ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। শান, অপারেশন সুন্দরবন, দামাল, বুকের মধ্যে আগুন, দ্যা সাইলেন্স, লটারি-এর মতো বেশি কিছু আলোচিত সিনেমা ও ওয়েব সিরিজের চিত্রনাট্য লিখেছেন তিনি। অবসর সময় কাটে বইপড়ে, মুভি দেখে আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে। সদালাপী, হাসি খুশি আর মিশুক স্বভাবের এই মানুষটি স্বপ্ন দেখেন একটি সুন্দর বাংলাদেশের, যেখানে প্রত্যেকটি এক হয়ে মানুষ দেশ গড়ার কাজে মন দেবে।
“Memories are dangerous things. You turn them over and over, until you know every touch and corner, but still you'll find an edge to cut you.” ― Mark Lawrence, Prince of Thorns - মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া - ১৯৭১ সালে জার্মানির হোরেসবার্গ কারাগার পরিদর্শন করতে আসেন আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের এক প্রতিনিধি দল। সে সময়ে কানাঘুষা শোনা যেত সেই কারাগারে চলছে বেশ কিছু অমানবিক কার্যক্রম। সেই পরিদর্শন কালেই এক সাংবাদিক জানতে পারেন ভয়াবহ এক সত্য।
আবরার, তার স্ত্রী লিজাকে নিয়ে ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে আসেন হানিমুন পালন করতে। কিন্তু হানিমুনে আসার পরপরই এই নবদম্পতি পড়েন বেশ কিছু ঝামেলায়। তারা বুঝতে পারেন নানা ধরণের লোকজন তাদের নানাভাবে পিছু নিয়েছে।
এখন জার্মানির হোরেসবার্গ কারাগার পরিদর্শন করতে গিয়ে সেই সাংবাদিক কি জানতে পেরেছিলেন? তার সাথে কার্ডিফে আসা নবদম্পতি আর কার্ডিফের ফ্ল্যাটহোম আইল্যান্ডের কি সম্পর্ক? তা জানতে হলে পড়তে হবে লেখক নাজিম উদ দৌলার অ্যাকশন ঘরানার সাসপেন্স থ্রিলার "মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া"। - "মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া" বইটি মূলত অ্যাকশন ঘরানার থ্রিলার বই। কাহিনীর প্রায় পুরোটাই বিদেশের নানা প্রান্তে সংঘঠিত হয়েছে যার মূলে ছিল কার্ডিফ শহর। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ আমলের একটি ছোট ঘটনাও জড়িয়ে গেছে কাহিনীর সাথে। "মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া" উপন্যাসের কাহিনী প্রথমদিকে বেশ সাদামাটা লাগলেও কাহিনী আগানোর সাথে সাথে রহস্য ঘনীভূত হতে থাকে। শেষদিকে অবশ্য বেশকিছু টুইস্ট গল্পে ভালোই গতি এনে দেয়।
"মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া" বইয়ের একটি প্লাস পয়েন্ট এর লেখনী, বেশ আরামদায়ক লেখনীর কারণে কাহিনী বুঝতে তেমন সমস্যা হয় না। তবে বইয়ের প্লট এবং লেখনীর তুলনায় গল্পের চরিত্রায়ন বেশ দুর্বল মনে হলো। বইয়ের কোন চরিত্রই তেমন মনে ধরলো না, উপরন্তু প্রোটাগনিস্ট এবং আরো কিছু চরিত্রের কিছু কিছু কার্যক্রম একবারে অবাস্তব মনে হলো।
"মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া" গল্পে বিশেষভাবে কার্ডিফ শহরের বর্ণনা এবং গল্পের প্রয়োজনমত ম্যাপ দেওয়া ভালো লেগেছে, বোঝাই যাচ্ছে লেখক এ ব্যাপারে বেশ সময় নিয়ে রিসার্চ করেছেন। এছাড়াও লেখক প্রাকৃতিক দুর্যোগের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তাও বেশ ভালোভাবে ফুটে উঠেছে। তবে গল্পে কিছু জায়গায় তথ্যগত ভুল দেখলাম যেগুলোর কয়েকটা "গল্পের খাতিরে" এড়িয়ে যাওয়া ছিল বেশ কষ্টকর। "মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া" বইটি অনেকটা সিনেম্যাটিক স্টাইলের গল্প বলে কিছু জায়গায় অতি নাটুকেপনা ছিল, যা তেমন একটা ভালো লাগেনি।
"মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া" বইয়ের প্রোডাকশনের দিকে তাকালে বইয়ের বাঁধাই, কাগজ দামের তুলনায় ভালোই। প্রচ্ছদও খারাপ না গল্পের কাহিনী অনুসারে। বইয়ের প্রথমদিকে বানান ভুল বা প্রিন্টিং মিস্টেক চোখে পড়লেও যতই শেষের দিকে গিয়েছি, বানান ভুলের পরিমান ততই কমে এসেছে।
এক কথায়, বিদেশের পটভূমিতে বেশ অন্যরকম এক সাসপেন্স থ্রিলার হচ্ছে "মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া"। যারা এধরণের অ্যাকশন ঘরানার সাসপেন্স থ্রিলার পছন্দ করেন তারা বইটি পড়ে দেখতে পারেন।
শুরুটা চমকপ্রদ ছিল। গল্পটাও ছিল ভালো। তবুও ১০০ পৃষ্টার পর থেকে কেন জানি স্রেফ পড়েই গেছি,কিছু ইমাজিন করতে পারছিলাম না আর। সমস্যাটা প্লটে নাকি আমিই নিতে পারছিলাম না কে জানে! তাছাড়া পড়ার সময় একটা প্লটহোল বারবার খোঁচাচ্ছিল। এটাও একটা কারণ হতে পারে। সব মিলিয়ে রেটিংটা তিন তারকার একটু বেশি আবার চার তারকার একটু কম।
ধুন্ধুমার বলে একটি বিশেষ্য শব্দ আছে। যার বিশেষণ করতে গেলে—মারকাট বিষয়গুলোর সমন্বয়ে একটি ভালো গল্পের উপস্থাপনার প্রয়োজন পড়ে। শুধু মারদাঙ্গার দৃশ্যপট দেখিয়ে তো আর পুরো কাহিনি টানা সম্ভব নয়। ঠিক তেমনই একটি গল্প নিয়ে লেখা লেখক নাজিম উদ দৌলার ❛মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া❜।
দেশের স্বার্থে দুই দেশের দুই অকুতোভয় যোদ্ধার প্রাণপণ লড়াই, সত্য উদ্ঘাটন আর রহস্য সমাধানে ভিন্ন তিন বাবা-ছেলের নির্ভীক জয়ের গল্প এবং ভালোবাসার পরিপূর্ণ সমাপ্তিতে রঞ্জিত পুরো ❛মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া❜ উপন্যাসের কাহিনি। প্রত্যেক ক্রিয়ার একটি বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে। উক্ত উপন্যাসে সেই বিপরীত ক্রিয়ার বিস্তর প্রতিক্রিয়া আছে। অতিরঞ্জিত এমন অনেক কিছুর দেখা এই কাহিনির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে। যা অভাবনীয় হলেও ভাবতে বাধ্য।
❛মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া❜ উপন্যাসকে আমি যে-কোনো হলিউড অ্যাকশন থ্রিলার সিনেমার সাথে নির্দ্বিধায় তুলনা দিব। যেখানে দেশ রক্ষার জন্য এমন কিছু হিরোয়িক কাজকারবার দৃশ্যায়ন তুলে ধরা হয়; যা কেবল কোনো সিনেমায় দেখানো সম্ভব। লেখক হয়তো সেই অনুযায়ী পুরো গল্পটি লিখেছেন। ভবিষ্যতে যদি এই উপন্যাস নির্ভর করে কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়; প্রযোজক যে বড়োসড়ো লাভের অংকের দেখা পাবেন তার ধারণা কিঞ্চিৎ দেওয়া যায়। তবে অ্যাকশন সিনেমা নিয়ে অভিজ্ঞ কোনো পরিচালকের হাতে এই উপন্যাসের ভার তুলে দেওয়া দরকার।
যাহোক, বইয়ের প্রসঙ্গে আসা যাক। কাহিনির শুরুটা ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর, পশ্চিম জার্মানির হোনাসপার্গ মিলিটারি প্রিজন দুর্গ থেকে। দুর্গ হলেও সেটা এখন রহস্যময় এক কারাগার ব্যতীত আর কিচ্ছু নয়। এই পরিচিতি লাভ করার পেছনে আছে মর্মান্তিক এক ইতিহাস। সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এই কারাগারের কয়েদিদের ওপর চালানো হয় নির্মম অত্যাচার। তেমনই এক অত্যাচারের লেজ ধরে দেশ-বিদেশের বড়ো বড়ো বার্তা সংস্থা ও নিউজ নেটওয়ার্কের প্রতিনিধি সম্বলিত দশ জনের একটি দল উক্ত দুর্গে এসে উপস্থিত হয়। তাদের উদ্দেশ্যে—এই কারাগারে আসলে কী হচ্ছে তা পুরো পৃথিবীর সামনে তুলে ধরা। কিন্তু কাজটা যতটা সহজ ভেবেছে ততটা না। সেই দলের একজন ডিপিএ-এর সাংবাদিক মার্টিন ফিশার। যিনি এসেছেন তার প্রিয় বন্ধু লিওন উলরিখের বার্তা পেয়ে। কিন্তু কারাগারে গোপন এক কক্ষে লুকিয়ে অত্যাচার করা বন্ধুকে দেখে মার্টিন স্তব্ধ হয়ে পড়ে। কী হয়েছিল তার সাথে আর কেন-ই বা হিটলারের মতাদর্শে চলা বুন্দেরওয়্যার মিলিটারিরা তার ওপর এমন নৃশংস অত্যাচার করল—জেনে নিল সবটুকু।
কিন্তু কী সেই সত্য? যার জন্য এত অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে উলরিখকে?
পরের কাহিনি অতীত ছেড়ে বর্তমানে চলে আসে। হানিমুন কাটাতে কার্ডিফে এসেছে নবদম্পতি—আবরার ও লিজা। কিন্তু বিদেশের মাটিতে পা রাখতেই শুরু হয় একের পর এক বিপদ। হানিমুন স্যুইটে লিসেনিং বাগ থেকে হোটেল ম্যানেজারের সন্দেহজনক আচরণ। জার্মান স্পাইরা ঘুরছে আশেপাশে। মধুচন্দ্রিমা কাটাতে এসে এমন এক দুঃস্বপ্নে ঘুরপাক খাবে বুঝতে পারেনি নবদম্পতি! কিন্তু কাহিনি কী? এর সাথে ফ্ল্যাটহোম দ্বীপের অজানা সেই রহস্যের সম্পর্কে নেই তো? কী কারণে এত সবকিছু ঘটে চলছে একসাথে? জানতে হলে পারি দিতে হবে অতীতে। বিশ্বযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ এবং আবরার-এর জন্মেরও আগে।
──
❛মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া❜ উপন্যাসের কাহিনি বেশ দ্রুতগতির। যা বইটির ইতিবাচক দিকের একটি। এক বসায় এই বই খুব আরামে শেষ করা যায়। এর পেছনে অন্যতম দুটো কারণ হিসেবে উল্লেখ করব—লেখকের সাব��ীল লিখনপদ্ধতি এবং মেদ শূন্য কাহিনির ব্যাপ্তি। গল্পের প্রয়োজনে লেখক বেশ কিছু সহায়ক কাহিনির জন্ম যেমন দিয়েছেন তেমনই চরিত্রের অতীত কথনেরও। উক্ত অংশগুলো উপন্যাসের ভাজে ভাজে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুরো প্রেজেন্টেশনের কথা বললে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই উপন্যাস একেবারে হুকড করে রাখবে। যারা ইতিহাসের কয়েকটি ঘটনার সাথে বর্তমান কাহিনির রোমাঞ্চকর মারকাট মিশ্রণে লেখা থ্রিলার পড়তে পছন্দ করেন—তারা উক্ত উপন্যাসটি নির্দ্বিধায় পড়তে পারেন। ইতিবাচক দিকের আরও একটি বিষয় হচ্ছে লেখক খুব সহজ এবং বাস্তবতার মিশেলে অতীত অংশ এবং কার্ডিফ শহরের বর্ণনা দিয়েছেন। যেন লেখক সেই শহরের বাসিন্দা এবং অতীতের ঘটনাগুলোর নীরব সাক্ষী।
যদিও বিষয়টি তিনি ধীরে ধীরে না দেখিয়ে অর্থাৎ জায়গাগুলোতে না গিয়ে শুধু সংলাপের মাধ্যমে গড়পড়তা ভঙ্গিতে বর্ণনা করেছেন। তবে সেটা সহজ ভাবে। অন্যান্য উপন্যাসের ক্ষেত্রে দেখা যায়—প্রায় লেখক যখন যে-ই স্থানে যায় সেই স্থানের বর্ণনা দেয়; উক্ত উপন্যাসে লেখক এই ধারা বজায় না রেখে নিজের মতো করে পূর্বে বর্ণনা তারপরে করণীয় কাজটি করেছেন। এই দিকটি ভালোই মনো হলো কারণ ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায় এমন অনেক সময় (গল্প অনুযায়ী) লেখক যে-ই স্থানে চরিত্রকে নিয়ে যান; খুব বিস্তারিত বর্ণনার সাহায্য উপস্থাপন করতে থাকেন; যা একটা সময় বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ❛মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া❜ উপন্যাসে এমন বিরক্তি বা ভ্রুকুঞ্চন পড়ার মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। একটা ঘটনা শেষ হতে-ই আরেকটি ঘটনার সূত্রপাত হয়।
উক্ত উপন্যাসে লেখক রহস্য সমাধানের জন্য একটি বুদ্ধিদীপ্ত খেলা খেলেছেন। যা মূলত এই উপন্যাসের সকল সমস্যা সমাধানের চাবিকাঠি। অনেকটা ট্রেজার হান্ট টাইপ। যদিও এই ট্রেজার ভয়ানক জিনিস। যার সূত্রপাত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। এই বিষয়টি তৈরি নিয়ে লেখক নিজের মতো করে সংজ্ঞা দিয়েছেন। কারণটি গ্রহণযোগ্য। কারণ বিশ্বযুদ্ধে যে আসলেই কী কী হয়েছে তার অনেক কিছুই আমাদের অজানা। এমন অনেক বিষয় মিথ হিসেবে ঘুরপাক খায় আজও। চরিত্রায়নের কথা বললে, মনে দাগ কাটে তেমন কোনো চরিত্রের সাথে খাপ খাওয়াতে পারিনি। এই জায়গায় লেখক আরেকটু রয়েসয়ে এগিয়ে যেতে পারতেন। তবে সংলাপগুলো ভালো ছিল। প্রথমদিকের সংলাপ বিশেষ করে বর্তমান সময়ের আবরার আর লিজার কথোপকথন খুবই গতানুগতিক। যা সচারাচর শুনতে আমরা অভ্যস্ত। শেষেও যে সংলাপে নতুনত্ব কিছু ছিল তেমন না; তবুও গল্প অনুযায়ী ঠিকঠাক।
নেতিবাচক দিক নিয়ে আলোচনা করলে অতিরঞ্জিত সার্ভাইভাল আর অ্যাকশন দৃশ্যের কথা অবশ্যই আসবে। তাই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে আমি পুরো দৃশ্যায়নকে একটি সিনেমা হিসেবে ভেবে নিয়েছি। পুরো গল্পটাই তেমনই, বাস্তবতা বলতে ওই মুক্তিযুদ্ধের সাবপ্লট আর বিশ্বযুদ্ধের গোপন একটি ষড়যন্ত্র মাত্র। তাই খুব আশা নিয়ে এই বই না পড়া ভালো। সময়টুকু উপভোগ করার জন্য এমন বই মাঝেমধ্যে পড়তে ভালো লাগে। লেখকের বর্ণনা শৈলী প্রাঞ্জল হওয়াতে এসব কিছু নিয়ে অভিযোগ করার কিছু থাকে না। যদি না আপনি সবকিছুতে লজিক খোঁজেন আর অতি মাত্রার খুঁতখুঁতে না হয়ে থাকেন তবেই।
──
বইয়ের প্রোডাকশন নিয়ে বললে অভ্যন্তরীণে বানান ভুলের বন্যা বয়ে গেছে কার্ডিফ শহরের মতো। কিছু জায়গায় সম্পাদনার অভাব লক্ষণীয়। বিশেষ করে সংলাপে। মার্ক করিনি, কম গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো তাই এড়িয়ে গেলাম। প্রচ্ছদে নতুনত্ব আছে, ভালো লেগেছে। বাদবাকি সব ঠিকঠাক।
যারা অ্যাকশন থ্রিলার আর টুইস্টের ধাক্কা পছন্দ করেন তাদের জন্য—অবশ্যই পাঠ্য। এই বই কিনবেন, পড়বেন আর উপভোগ করবেন।
≣∣≣ বই : মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া • নাজিম উদ দৌলা ≣∣≣ জনরা : অ্যাকশন থ্রিলার ≣∣≣ প্রথম প্রকাশ : সেপ্টেম্বর ২০২০ ≣∣≣ প্রচ্ছদ : জ্যোতিষ হালদার ≣∣≣ প্রকাশনা : আদী প্রকাশনী ≣∣≣ মুদ্রিত মূল্য : ৩৮৫ টাকা মাত্র ≣∣≣ পৃষ্ঠা : ২৮৭
কাহিনি সংক্ষেপঃ ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে হানিমুন কাটাতে এসেছে বাঙালি দম্পতি আবরার ও লিজা৷ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার কার্ডিফের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও বিলাসবহুল হোটেল ভোকো সেইন্ট ডেভিড'স-এ উঠেছে তারা। সদ্যবিবাহিত দম্পতিদের হানিমুন যেভাবে কাটে, সেভাবেই কার্ডিফের দিনগুলো কাটছিলো আবরার ও লিজার। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন অস্বাভাবিক হতে শুরু করলো চারপাশের অনেক কিছুই। ওদের হানিমুন স্যুইটে পাওয়া গেলো লিসেনিং বাগ৷ কেউ যেন আড়ি পেতে শোনার চেষ্টা করছে ওদের কথোপকথন। এদিকে কালো পোষাক পরিহিত কিছু রহস্যময় লোক সারাক্ষণ অনুসরণ করে চলেছে আবরার ও লিজাকে, তারা যেখানে যাচ্ছে সেখানেই। হোটেলের ম্যানেজার জগজিৎ সিংয়ের আচরণও কেমন যেন ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। লোকটার ভাবগতিক দেখলেই মনে হবে বাঙালিদের সে একদমই পছন্দ করে না।
আবরার ও লিজাকে ঘিরে যখন এসব অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে চলেছে, তখন লিজা আরো একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলো। আবরার কেন যেন কার্ডিফের অদূরে অবস্থিত ফ্ল্যাটহোম দ্বীপে যাওয়ার জন্য একরকম মরিয়া হয়ে উঠেছে। ফ্ল্যাটহোম দ্বীপের বহু পুরোনো লাইটহাউজ খুবই বিখ্যাত। কিন্তু ওয়েলস সরকার ইদানীং সেখানে ট্যুরিস্ট পাঠানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে নিরাপত্তা সংক্রান্ত কারণ দেখিয়ে। এতো কিছুর পরেও আবরারকে নিরস্ত করা যাচ্ছে না। সে চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে ফ্ল্যাটহোম দ্বীপে যাওয়ার জন্য।
আবরারের মৃত বাবা আযহার আহমেদের ডায়েরিতে এমন কি আছে যা পড়ার পর মাথা খারাপ হওয়ার মতো অবস্থা হয়ে গিয়েছিলো লিজার? ফ্ল্যাটহোম দ্বীপে অবস্থিত লাইটহাউজের ইনচার্জ এডওয়ার্ড ফ্লেচার হঠাৎ চমকে উঠলেন কেন আবরারকে দেখে? হানিমুনে এসে প্রেমের বানে ভেসে যেতে যাওয়া লিজার কাছে হঠাৎ করেই আবরারকে সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ বলে মনে হতে লাগলো৷ দ্বিধার জালে আটকা পড়ে গেলো মেয়েটা।
এদিকে আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে হিটলারের আদর্শ বুকে ধারণ করা নিও-নাৎসি এক সংগঠন। কার্ডিফের রাস্তায় হেঁটেচলে বেড়াচ্ছে তারা। কিসের আশায়? মৃত্যুর ঠিক কিছু সময় আগে ফুয়েরার অ্যাডলফ হিটলার একটা মিটিং ডেকেছিলেন। কি এজেন্ডা ছিলো সেই মিটিংয়ের? ১৯৭১ সালের ১৪-ই ডিসেম্বর, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক প্রাক্কালে ভয়ঙ্কর একটা ঘটনা ঘটে গিয়েছিলো কেরানীগঞ্জের ক্রুশনগর গ্রামের মাস্টারবাড়িতে। সেখানে আবিস্কৃত হয়েছিলো অজ্ঞাতনামা একজন শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির লাশ। এসবের সাথে আজকের এই আধুনিক সময়ে আবরার ও লিজার সাথে ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক ঘটনাগুলোর সম্পর্কই বা কোথায়?
ত্রিশ বছর ধরে কার্ডিফ শহর নিজের ভেতরে লুকিয়ে রেখেছে এমন এক ভয়ঙ্কর সত্য, যা অযোগ্য কারো হাতে পড়লে হুমকির মুখে পড়ে যাবে কোটি কোটি মানুষের জীবন। নির্ভেজাল ও আনন্দময় এক হানিমুন কাটাতে কার্ডিফে এসে আবরার ও লিজাকে যে কতোকিছুর মুখোমুখি হতে হবে সেই ভয়ঙ্কর সত্যের জন্য, তা হয়তো তারা নিজেরাও জানতো না। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো এদিকে আবার কার্ডিফ শহরের দিকে ধেয়ে আসছে ভয়াবহ এক ঘূর্ণিঝড়। হানিমুন কাটাতে এসে জীবন বাঁচানোই কঠিন হয়ে পড়লো আবরার ও লিজার জন্য।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় থ্রিলার লেখক নাজিম উদ দৌলা তাঁর পাঠকদের কাছে পরিচিত 'ইনকারনেশন', 'ব্লাডস্টোন', 'ব্রিজরক্ষক' ও 'মহাযাত্রা'-এর মতো বইগুলোর জন্য। ইদানীং তিনি মনোনিবেশ করেছেন মুভির স্ক্রিপ্ট লেখালেখির দিকেও। কাজী আনোয়ার হোসেনের বিখ্যাত এসপিওনাজ এজেন্ট মাসুদ রানা বিষয়ক মুভির স্ক্রিপ্টও লিখেছেন নাজিম উদ দৌলা। বেশ অনেকদিন পর তাঁর কাছ থেকে পাঠক পেলো আরো একটা থ্রিলার 'মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া'। যদিও বইটা আরো আগেই আদী প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু বছরের শেষদিকে এসে প্রকাশিত হলো।
'মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া'-এর কাহিনি আবর্তিত হয়েছে ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে হানিমুন কাটাতে আসা সদ্যবিবাহিত দম্পতি আবরার ও লিজার সাথে ঘটে যাওয়া একের পর এক উত্তেজনাকর ঘটনাকে কেন্দ্র করে৷ নিখাদ থ্রিলার। কিন্তু এর সাথে আবার লেখক যুক্ত করেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সামান্য কিছু অংশকে। কাহিনি এগিয়ে গেছে নিজস্ব গতিতেই। কোন তাড়াহুড়ার ছাপ পাইনি নাজিম উদ দৌলার লেখায়। আস্তে আস্তে আবরার ও লিজাকে দিয়ে তিনি খুলিয়েছেন পুরোনো এক রহস্যের জট। দ্রুতগতির এই থ্রিলার উপন্যাসে যেমন ছিলো সাসপেন্স ও মিস্ট্রি, তেমনই দেখা পেয়েছি ধুন্ধুমার অ্যাকশনের। বেশ ভালো লেগেছে ব্যাপারটা। আরো একটা জিনিস ভালো লেগেছে, আর তা হলো কার্ডিফ শহর ও এর আশেপাশের এলাকার বর্ণনা। বেশ জীবন্ত লাগছিলো আমার কাছে বর্ণনাগুলো যখন বইটা পড়ছিলাম।
'মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া' উপন্যাসটা আমার কাছে অনেকাংশেই সিনেম্যাটিক লেগেছে। মাঝেমাঝে কল্পনায় এর কাহিনি কোন অ্যাকশন মুভির সিনগুলোর মতো প্লে হচ্ছিলো৷ থ্রিলার উপন্যাস হিসেবে বইটা সার্থক বলে মনে করি আমি। এবার একটা খটকার ব্যাপারে বলি। লন্ডনে জীবনের অনেকটা সময় কাটানো লিজা যখন আবরারের কাছে লাইটহাউজ ও এর কাজ সম্পর্কে জানতে চেয়েছে, তখন আমি একটু অবাক হয়েছি। লজিক্যালি আমার কাছে মনে হয়, লিজার জানার কথা ছিলো লাইটহাউজ মূলত কি কাজ করে। ইভেন, লাইটহাউজ শব্দটা যারা জানে তাদের জানা থাকার কথা এটার এক্স্যাক্ট কাজ কি। খটকা বলতে এই একটাই ছিলো।
এবার আসি ভুল বানানের ব্যাপারে। বেশ কিছু ভুল বানানের দেখা পেয়েছি 'মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া'-তে। নিরস্ত (নিরুৎসাহিত করা) করা-কে নিরস্ত্র, প্রতিপত্তি-কে পতিপত্তি, পাহারা-কে পাহাড়া, পরবর্তী-কে পরবর্তি, পরা (পরিধান করা)-কে পড়া ও বেরিয়ে (বের হয়ে) আসা-কে বেড়িয়ে আসা লিখতে দেখেছি। কিছু টাইপিং মিসটেকও খেয়াল করেছি৷ আশা করবো বইটার পরবর্তী এডিশনে এই ভুলগুলো আর থাকবে না।
জ্যোতিষ হালদারের করা প্রচ্ছদটা চমৎকার লেগেছে আমার কাছে। বইটার বাঁধাই আর কাগজের মান নিয়েও আমি সন্তুষ্ট।
থ্রিলারপ্রেমীরা, যারা এখনো 'মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া' পড়েননি চাইলে পড়ে ফেলতে পারেন।
গত বছরের অন্যতম হাইপড থ্রিলার মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া পড়ে ফেললাম। আরও আগেই পড়ে শেষ করে ফেলার কথা ছিল, কিন্তু ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত হয়ে যাবার কারণে অর্ধেক পড়ে আর পড়া হয়নি। শেষমেশ তাই বলতে হয়, নতুন বছরের প্রথম বই পড়া শেষ করলাম মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া দিয়েই। কথা একটু বেশি বলব বইটা নিয়ে। যা যা বলব, সবই ব্যক্তিগত মতামত। প্রথমত আসি কন্টেন্টের ব্যাপারে। মিস্ট্রি থ্রিলার বলতে পারেন বইটাকে। অ্যাকশন থ্রিলারও বলা যায়। আবার পাজল সল্ভিং এর একটা আভাস পেলেও শেষমেশ সেটা হয়ে ওঠেনি। মারকাটারি অ্যাকশন দিয়েই বইটা শেষ হলো। অথচ আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় এখানে পাজলটা খুবই চমৎকার একটা ভূমিকা পালন করতে পারতো। লেখক কেন সেদিকে গেলেন না, এটা আমার জানা নেই। হানিমুন কাপলের ভালোবাসাবাসি আছে, খুনসুটি আছে, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার একটি খণ্ডযুদ্ধ আছে, ১৯৪৫ সালে জার্মান বাহিনীর অত্যাচারের কথা আছে, ইতিহাস আছে, আর আছে চেরি অন দ্য টপের মতো শেষের ঘূর্ণিঝড়ের আগমন। তবে মনে হয় এখানে প্রাকৃতিক ডিজ্যাস্ট্রাস এলিমেন্ট আনবার কোনো দরকার ছিল না। ছিমছামভাবে ২২০-২৩০ পৃষ্ঠার মাঝেই বইটা শেষ করা যেত। তা করবার মতো সব এলিমেন্টও উপস্থিত ছিল বইতে।
দ্বিতীয়ত আসি মেসেজের ব্যাপারে। তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ পাঠকদের উদ্দেশ্যে এখানে দেয়া হয়েছে কিনা, তা সম্পর্কে আমি নিশ্চিত নই। কোনো পাঠক পেয়ে থাকলে চমৎকার। আমি তেমন কিছু পাইনি।
তৃতীয়ত, যদি লেখকের আগের কোনো কাজের সাথে তুলনা করতে যাই, আগের বই একটাই পড়া হয়েছে। তা হচ্ছে ব্লাডস্টোন। ব্লাডস্টোনকে কি মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া ক্রস করতে পেরেছে? মনে হয় না। লেখক কোনো এক জায়গায় বলেছিলেন এই বইটা লেখার সময় তিনি তিনটে স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ করছিলেন (আমি ভুলও হতে পারি। তবে এমন একটা কমেন্ট ফেসবুকে দেখেছিলাম বোধহয়)। হয়ত সেভাবে মন দিতে পারেননি বা তার স্টাইলটাই এমন হয়ে গিয়েছে। কারণ বইটিতে সিনেম্যাটিক এলিমেন্ট অত্যন্ত প্রবল এবং ড্রামানির্ভর। পড়তে পড়তে আমার নিজেরও মনে হয়েছে আমি কোনো চলচ্চিত্রেরই স্ক্রিপ্ট পড়ছি। উপন্যাসের ক্ষেত্রে এমন মনে হওয়াটা আমার কাছে খুব একটা ইতিবাচক মনে হয় না। দুটো আলাদা সত্ত্বা। তবে এখানে লেখকের একটা বিষয়কে আমি সাধুবাদ দেব। আর তা হচ্ছে স্টোরিটেলিং। একঘেয়ে কিছু সময়কেও তিনি চমৎকার স্টোরিটেলিং-এর মাধ্যমে পাঠপ্রিয় করে তুলেছেন। এজন্য তাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। তবে স্টোরিটেলিং-এর জন্য গল্পের ড্রামাটিক এলিমেন্টগুলোর খুব একটা হেরফের হয় না। যেমন, আযহার ও তার স্ত্রীর ফান্টা খাওয়া নিয়ে লিখিত চ্যাপ্টারগুলো। স্টোরিটেলিং চমৎকার কিন্তু মনে হয়নি আমি কোনো উপন্যাস পড়ছি। সিনেমার স্ক্রিপ্টই মনে হয়েছে। বেশ কিছু জায়গায় অনাবশ্যক নাটকীয়তা মনে হয়েছে, যার কোনো দরকার ছিল না।
চতুর্থত আসি বানান ও ভাষার ব্যাপারে। বেশ কিছু বানান ভুল পেয়েছি প্রথমদিকে। তবে কিছু সময় পর তা সহনীয় হয়ে গিয়েছে। প এর নিচে র-ফলার ব্যবহারের প্রমাদটা বেশ ভুগিয়েছে। তাছাড়া কয়েক জায়গায় কনভার্সেশনের সময়কার বর্ণনা খুব আড়ষ্ট লেগেছে। অ্যাঞ্জেলিনা ঝড় ধেয়ে আসবার পর যেসব বর্ণনা দেয়া হয়েছিল প্রকৃতির, তা বেশ ভালো লেগেছে। ঝড়েই ক্ষান্ত হননি লেখক। সাথে এনেছেন সুনামিকেও। তবে এখানে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। এমন ঝড়ো আবহাওয়ায় ভাড়াটে সৈন্যরা হেলিকপ্টার নিয়ে পানির দশ ফুট নিচে চলে যাওয়া একটা হোটেলে এমন মারপিট করতে আসার রিস্ক কেন নেবে? স্রেফ মোটা অঙ্কের টাকার জন্য? সিনেমা বা অন্যান্য গল্প পড়ে যতটুকু জেনেছি, এমন আবহাওয়ায় সাধারণত এমন হাই স্টেকিং রিস্কি অপারেশনে কেউ আসে না প্রকৃতির বৈরিতার জন্য। আর এমন নয় যে তারা ঘূর্ণিঝড় অ্যাঞ্জেলিনার কথা জানতো না। জেনেই এসেছে হোটেলে। এই ব্যাপারটা বেশ খুঁতখুঁত করেছে মনে।
পঞ্চমত, নতুন জেনেছি জার্মানির কিছু ইতিহাস। কার্ডিফ শহরের বর্ণনা, ফ্ল্যাটহোম ও আশেপাশের দ্বীপ, রাস্তাঘাট ইত্যাদি আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো পড়ে ম���ে হয়েছে যে লেখক ভালো হোমওয়ার্ক করেই এরপর বর্ণনায় মন দিয়েছেন। ওয়েল ডান! প্রচ্ছদ অসাধারণ লেগেছে। কাগজের মানও বেশ। বাইন্ডিংও চমৎকার। শেষ কবে এমন প্রোডাকশনের একটা বই হাতে নিয়েছিলাম, তা মনে পড়ে না। সেক্ষেত্রে মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়ার প্রোডাকশন ৫ তারা দেয়ার মতো।
এবার আসি কিছু খটকার বিষয়ে। বেশ জটিল কিছু প্রশ্ন মাথায় এসেছে বইটা পড়তে গিয়ে- ১) আবরার আহমেদ কোনো স্পাই নয়, এজেন্ট নয়, প্রশিক্ষিত সেনাও নয়। সাধারণ জিম ইন্সট্রাকটর। স্রেফ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নিজে নিজে অনুশীলন করে কার্ডিফ শহরে এসে এভাবে গোলাগুলি, মারপিট করাটা আজব লেগেছে। জার্মান ইন্টেলিজেন্স, মার্সেনারি কেউই তার কাছে তেমন একটা পাত্তা পায়নি। শেষমেশ নাটের গুরুর কাছে একটু কুপোকাত হতে হয়েছে। ২) আবরারের বাবা কীভাবে জানলো তার ছেলে বড় হয়ে "হাজারবার" তার ডায়েরি পড়লেই পাজলের সমাধান করতে পারবে? এটাকে নেহাত কষ্টকল্প ছাড়া আর কিছু মানতে আমি নারাজ। ৩) লালুর মোটিভ আমি মেনে নিলাম। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, লালুর কানেকশন তৈরি বা উত্থানটা কীভাবে হলো, তা সম্পর্কে খুব সংক্ষেপে বলে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অথচ গল্পের সেরা টার্নিং পয়েন্ট ছিল এটাই। ৪) গল্পের এক সময়ে এসে জানা যায়, ফ্ল্যাটহোম দ্বীপের লাইটহাউজে আবরারের বাবা তার জন্য "কিছু" একটা রেখে গিয়েছেন। আবরার পাজল সলভ করে সেটা আর জায়গামতো পায়নি। তার আগেই জিনিসটার ব্যবস্থা করা হয়ে গিয়েছে। আবরারের বাবা সবকিছু সমাধান করেও ছেলেকে কেন ফ্ল্যাটহোম দ্বীপে যাওয়া আটকালেন না, যেখানে তিনি জানতেন লাইটহাউজে আবরারের জন্য কিছু নেই? সেখানে গেলে ক্ষতি ছাড়া আর কিছু হওয়া সম্ভব না? আবরারের ওপর তিনি চোখ তো রেখেছিলেন বটেই!
আরও অনেক অনেক প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তাই এখানেই ক্ষান্ত দিলাম। বইটা ভালো, সেটা মানতেই হচ্ছে। তবে ওয়াও ফ্যাক্টর বলতে একটা কথা থাকে। তা মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়ায় পাইনি। চমৎকার স্টোরিটেলিং-এর বদৌলতে বইটা উৎরে গিয়েছে।
মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া - নাজিম উদ দৌলা ↓ কাহিনীসংক্ষেপ বলে লেখা বড়ো করতে চাচ্ছি না। সরাসরি পাঠপ্রতিক্রিয়ায় চলে যাই। সত্যি বলতে, প্রথমদিকে সাংঘাতিক বিরক্তিকর লাগছিল বইটা। জার্মান স্পাইকে করে প্রথম গুলির শব্দ কেউই শুনলো না? মানে, হু ইজ আবরার? রগচটা অ্যাকশন ফিগার। বিদেশে বেড়াতে গিয়ে দুর্দান্ত অ্যাকশন করে বেড়াচ্ছে। সিরিয়াসলি! হলিউডের মুভি এটা? একটা বইয়ের মোটামুটি অর্ধেকই যদি চরিত্রের উপর এতো বিরক্তি নিয়ে পড়তে হয়, তাহলে কেমন লাগে? তার উপর আছে ট্যুর গাইডের মতো খুঁটিনাটি সব বর্ণনা। এরপর ডায়েরির অংশ এলো। এখান থেকেই মনোযোগ পাই ভালো করে। রুদ্ধশ্বাস এই যাত্রায় একে একে আসে থ করে দেওয়ার মতো কিছু বাঁক। শুরুর দিকে যে বিরক্তি ছিল, ধীরে ধীরে তার যথাযথ ব্যাখ্যা পেতে শুরু করায় ততক্ষণে বিরক্তি কেটে গিয়ে ভালো লাগার শুরু হয়েছে। শেষ করার পর বুঝতে পারলাম, চমৎকার একটা বই শেষ করেছি। সুন্দর বর্ণনা, লেখার ধরন, গোছানো প্লট, সমাপ্তি সব মিলিয়ে বলা যায়, বেশ খেটেখুটে লেখা এই বই। ইতিহাস নিয়ে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন, তাও বেশ প্রশংসনীয়। সামগ্রিকভাবে তৃপ্তি দেওয়ার মতো একটি বই।
এবার যে কথাগুলো বলবো, এগুলো না পড়লেও চলবে। স্পয়লার থাকতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে দীর্ঘ অ্যাকশন সিন আমার পছন্দ নয়। মুভি হলে আলাদা কথা, কিন্তু বইতে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জুড়ে লেখা অ্যাকশন সিন পড়ায় কোনো আগ্রহ কাজ করে না। শেষে ওরকম দম বন্ধ করা অবস্থায় এসে অ্যাকশন সিনগুলো যেন আরও বাগড়া সৃষ্টি করছিল। ফলে স্কিপ করে করে পড়ে শেষ করেছি। ডায়েরির অংশটা পড়তে গিয়ে আমার নিজেরই বিশ্বাস হয়নি, এটা কোনো পাগলের লেখা। সেখানে এতো বছর ধরে এতো মানুষ পড়েও কিছুই ধারণা করতে পারলো না দেখে অবাক হয়েছি। কোড ব্রেকিং অংশটা পড়তে যতোটা ভালো লাগছিল, গভীরভাবে ভাবতে গিয়ে ততোটাই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। অনেক কিছুই স্রেফ নিয়তির সাথে জুয়া খেলার মতো মনে হয়েছে। চরিত্রগুলোর ট্রান্সফর্মেশনও কিছু কিছু জায়গায় অতিরঞ্জিত মনে হয়েছে। মানে, এত্ত দুর্দান্ত কেন সবাই? এতো টাকা খরচ করে, এতো সময় নিয়ে একটা মানুষের পেছনে লেগে থাকা সত্ত্বেও কিছুই বের করতে পারেনি। ওদিকে সে কী অবলীলাক্রমেই না অন্যের জায়গা দখল করে বসে আছে! যার জায়গা দখল করেছে, তার কি কোনো অতীত ছিল না? সেই অতীতে কোনো মানুষ ছিল না? পরিচিতির এটা বাদ দিলেও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। অতো বড় একটা হোটেলের ম্যানেজার সে। অথচ তার চলাফেরা, কথা বলার ধরন কিংবা অঙ্গভঙ্গি সবকিছু অন্য একটা মানুষ দুম করে নকল করে কীভাবে?
শেষে শুধু এটুকুই বলবো যে, গল্পটা ভালো লেগেছে আমার। অনায়াসেই দুর্দান্ত একটা অ্যাকশন থ্রিলার মুভি বানানো যাবে। দীর্ঘদিন বাংলা থ্রিলার থেকে দূরে ছিলাম। ফ্যান্টাসি নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম মাঝে। এখন বাংলা থ্রিলার পড়তে গিয়ে দেখছি, দারুণ সব লেখা হচ্ছে। নাজিম উদ দৌলার লেখার ধরন অসাধারণ। খুব সুন্দর ভিজুয়াল তৈরি করতে পারে। জ্যোতিষ হালদারের করা প্রচ্ছটাও খারাপ লাগেনি। বাঁধাই ও কাগজের কথা বিচার করলে মূল্যটাও যথাযথই আছে।
৩ স্টার। . নামকরা বিদেশি রাইটারের লেখা আমি যে স্কেলে বিচার করব, দেশি রাইটারদের বই আমি সেই স্কেলে বিচার করব না। দেশি রাইটারদের প্রতি সফট কর্নার বেশি থাকবে। . প্রথম দিকে কাহিনির গতি উঠতে বেশি সময় নিয়েছে। আবরারের বাবার ডায়েরির বিষয়টা আসার আগপর্যন্ত বইটির গতি অনেক স্লো মনে হয়েছে আমার কাছে। প্রথম ৮০ পৃষ্ঠার পরে আর তেমন সমস্যা নেই। যাদের বিনোদনধর্মী থ্রিলার পছন্দ, তারা বইটি পড়ে দেখতে পারেন। আশা করি, ভাল লাগবে।
বিয়ের পর হানিমুন করতে কার্ডিফ শহরে পৌছালো নব দম্পতি। অবাক হয়ে আবিষ্কার করলো নিয়মিত তাদেরকে ফলো করে যাচ্ছে কারা যেন! হামলার শিকারও হতে হলো। কিন্তু কেন? প্রথমবারের মত এই শহরে আসতে না আসতেই শত্রু বনে গেল কারা? প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে ঘুরে আসতে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়টায়। আবার চোখ রাখতে হবে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধেও৷ ভিন্ন ভিন্ন দেশের উত্তাল দুই সময়কে সাথে নিয়েই উদঘাটিত হবে এই রহস্য।
অত্যন্ত বিরক্তিকর এবং সময় নষ্ট টাইপ বই। এমনকি রিভিউটা যে লিখছি এই সময়টাও নষ্টই হচ্ছে!!
বইয়ের ভালো দিক!!
এই বইটার একমাত্র ভালো দিক এর প্লট। প্লটটা নিঃসন্দেহে প্রমিজিং ছিল। কিন্তু সেটার এক্সিকিউশান অত্যন্ত নিম্নমানের বাংলা সিনেমা টাইপ হয়ে গিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের শেষ ইচ্ছা, সেই ইচ্ছে পূরণের হাতিয়ার বাংলাদেশে চলে আসা, সেটারও ৩০ বছর পর আবার এখনকার সময়ের রহস্য। সব মিলিয়ে ভালো কিছুই হওয়ার ছিল। এছাড়া বইয়ের গল্প বোঝার স্বার্থে বেশকিছু চিত্র দেয়া হয়েছে। এই ব্যাপারটাও ভালো লেগেছে।
বইয়ের খারাপ দিক।
কোনটা রেখে কোনটা বলবো ভাই!! প্রথমে লিখনশৈলীর কথাই বলি। মনে হচ্ছিল যেন লেখক আদৌ কি ধরণের বই লিখছেন সেটা নিয়ে কনফিউজড। মানে শুরুর ১০০ পাতা বলতে গেলে কার্ডিফ শহর আর এর হোটেলের বর্ণনা দিয়েই চালিয়ে দেয়া হয়েছে। কাহিনী শুরু হওয়ার পর দেখি আর আগায় না! মনে হচ্ছিল কোনো ট্যুর গাইড পড়তেছি!!
সবচেয়ে বিরক্তিকর ব্যাপার যেটা সেটা হলো বইয়ের কোনো চরিত্রকে এক মুহুর্তের জন্যও মনে ধরেনি। তাদের কথাবার্তা, আচার আচরণ সবটাই মনে হচ্ছিল লেখক করছেন। চরিত্ররা না। লেখক আলাদা চরিত্র সৃষ্টি করেছেন কিন্তু তাতে আলাদা প্রাণ দেননি। বরং নিজেই ঢুকে গিয়েছেন সবগুলা চরিত্রের মাঝে!! এই ব্যাপারটা কি আপনাদের চোখে পড়ে? আমার মাঝে মাঝে কিছু বইয়ে খুব চোখে লাগে। মনে হয় যেন চরিত্রদের কথা বা গল্প নয়, লেখকের মনের কথাগুলাই পড়ছি। বইয়ের প্রতিটা চরিত্রের প্রতিটা কর্মকান্ড বড্ড মেকি মেকি লেগেছে।
এরপর আসে ইনফো ডাম্পিং। বেশকিছু বই লেখক পড়েছেন এই বইটা লিখতে গিয়ে। সে সব বই থেকে আহোরিত জ্ঞানের সবটাই ঢেলে দিয়েছেন এখানে। গল্পের সিচুয়েশন কি ডিমান্ড করে তা লক্ষ্য ন��� রেখেই দিয়ে গিয়েছেন একের পর পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির বর্ণনা। যখন গল্পে মনে হচ্ছিল একটু টানটান পরিস্থিতির তৈরী হচ্ছে (যেটা কি না আবার একদমই রেয়ার কেইস), তখনি লেখকের মনে হয়েছে, "যাই একটু জ্ঞান ঝেড়ে আসি!!"
সংলাপ? ভাই রে ভাই এমন ক্রিঞ্জ টাইপ রোমান্টিক বর্ণনা বা ডায়ালগ ইলিয়াস কাঞ্চন আমলের বাংলা মুভিতেও দেখছি কি না সন্দেহ!! শুধু রোমান্টিক অংশে না, গোটা বইটাই বাংলা সিনেমা ফেইল টাইপ সংলাপে ভর্তি।
একশন সিকুয়েন্স যে কয়টা ছিল সবগুলাই একেবারে ফিল্মি। প্রচুর ডিটেইলড অথচ মনে দাগ কাটে না।
প্লটহোল, মিস ইনফরমেশন?? গাদা গাদা। কয়টার কথা বলবো? অভাব নাই। টুইস্ট গুলা সব হাওয়া থেকে এসে জুড়ে বসেছে টাইপ লেগেছে। সব মিলিয়ে ভীষণ বিরক্ত হয়েছি।
লেখকের কাছে অনুরোধ, বই লেখার সময়ে নিজের স্ক্রিপ্ট রাইটার সত্ত্বাটাকে দূরে সড়িয়ে রাখবেন। তাহলে আশা করি দারুণ প্লটকে ভিন্নভাবে কাজে লাগাতে পারবেন।
ব্যক্তিগত রেটিং: ০২/১০ ( কিছুদিন আগে আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে নামের একটা বই পড়েছিলাম। ওইটাও জঘন্য। তবে কি না ছোট সাইজের বই হওয়ায় মেজাজ বেশী খারাপ হয় নাই। কিন্তু ব্যস্ততার এই সময়ে ৩০০ পাতার একটা বই যদি আগাগোড়াই খারাপ লাগে, তাহলে এর পিছনে নষ্ট হওয়া সময়টা ভীষণ পীড়াদায়ক লাগে)
পাঠক প্রতিক্রিয়াঃ শেষ করলাম মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া। দিনটা কেমন যাবে সেটা নাকি সকালের রোদ দেখলে বোঝা যায় আর বইটা কেমন হবে সেটা আমার মতে প্রথম অধ্যায় থেকে বোঝা যায়। এই বইয়েও সেটা হয়েছে। প্রথম থেকে টানটান অবস্থা। ইতিহাসের অনেক কিছু আছে বইয়ের শেষে গিয়ে দেখলাম লেখক বেশ কিছু বই পড়েছে সেটার লিস্ট দিয়েছেন। বইয়ে টুইস্ট থাকা ভালো, আমাদের দেশের পাঠকরা টুইস্ট খুব পছন্দ করে। কিন্তু এই বইয়ে ভাইরে ভাই টুইস্ট উপরে টুইস্ট। এই মনে করবেন এইটা সত্যি একটু পড়ে মনে হবে কেউ আপনার কানে কানে বলতেছে “কেসা লাগা মেরা মাজাক”। বইয়ে শেষ টুইস্ট পড়ে আমি একটু সময় নিয়েছে কি দিয়ে কি হইলো। সব কিছু মিলিয়ে ভালো ছিলো।
নেগেটিভ দিকঃ ৯১ পেজে এ ১২ জানুয়ারি ১৯৯০ এ শারমিন প্রেগনেন্ট হয়। কিন্তু তাঁরা যখন কার্ডিফে যায় তখন সে ২ মাসের গর্ভবতী। আমার যানা মতে ৩ মাসের ভিতরে ফ্লাই করতে নিষেধ করা হয়, তার উপরে উনারা কার্ডিফে গিয়ে যে ভাবে উঁচা নিচা থেকে শুরু করে সাগর ভ্রমণ করেন এইটা হইলে একজন গর্ভবতী মা'র সাথে যায় না। আর ১৯৯০ সালের দিকেত এমনটা ভাবায় যায় না। এইখানে কিছুটা বাস্তব সম্মত করতে পারত লেখক। ১০১ পাতাঃ বলা হয়েছে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন ১৯৯০ সালে হয়েছে। কিন্তু আমার জানামতে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এ হয়েছে। লেখক হয়ত পরের সংস্করণ এইটা নিয়ে ভেবে দেখবেন যদি আমি ভুল না হই।
মিথ্যা তুমি দশ পিপড়া। লাই ইউ টেন অ্যান্ট। Lieutenant। নামের শুরু থেকেই কারিশমা। প্লটটা অসাধারণ। আমার ব্যক্তিগতভাবে বাঙালি চরিত্রদের বিশ্ব বিচরণ খুবই ভালো লাগে। এখানে লেখক তা করেছেন। ওয়েলস দেশটির প্রতি বিশেষ টান কখনো ছিল না। তবে এই বইতে কার্ডিফের রাস্তা, সৈকত, কার্ডিফ থেকে সোয়ানসির ট্রেন যাত্রা পুরোটা উপভোগ করেছি। তবে বইটিকে ভ্রমণকাহিনী ভাবলে ভুল করবে। মারদাঙ্গা অ্যাকশন আছে। সাস্পেন্স আছে। মাথা নষ্ট টুইস্ট আছে। মুক্তিযুদ্ধ আমলের একটা ছোট্ট অংশ আছে। সব মিলিয়ে অত্যন্ত উপভোগ্য একটি বই।
বাংলা থ্রিলার বইয়ের ফ্ল্যাপের লেখাগুলো পড়তে আমার খুব বিরক্ত লাগে। অল্প কয়েকটা বাক্যের মধ্যেই একগাদা রহস্য আর প্রশ্ন যেন ঠেসে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় সেখানে। অনেকটা 'এই ঘটনার সাথে ওই ঘটনার কি কোনো সম্পর্ক আছে?' 'অমুক কি কাজটা শেষ করতে পারবে?' 'জানতে হলে পড়তে হবে' ইত্যাদি ধরণের ব্যাপার। এই বইটাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে ফ্ল্যাপ পড়ার পরের বিরক্তিটা নিমেষেই চলে গেলো যখন বইটা শুরু করলাম।
গল্পের শুরুটাই এতো ইন্টারেস্টিং যে পরে আস্তে ধীরে কাহিনী এগোলেও পড়তে খারাপ লাগছিলো না। বরং আমার মনে হয়েছে ঠিক যতটুকু সময় নিয়ে গল্প বলা দরকার লেখক ঠিক ততটুকুই সময় নিয়েছেন। শেষের দিকে অনেকগুলো টুইস্ট আর খানিকটা নাটুকেপনা দিয়ে শেষ হয়েছে গল্পের। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিলো যেন কোনো হলিউড মুভি থেকে হঠাৎ টুপ করে এসে পরেছি বাংলা সিনেমার জগতে :3
কাহিনী সংক্ষেপ এখানে বলছি না, আমি ব্যক্তিগত ভাবে বই সম্পর্কে কিছু না জেনে গল্পের ভেতর ঢুকে পরতে পছন্দ করি। থ্রিলার পড়তে ভালো লাগলে, নিঃসন্দেহে পড়ে ফেলতে পারেন বইটি। কার্ডিফের সমুদ্র উপকূলে সময়টা আশা করি খারাপ কাটবে না।
(আমি রিভিউ লিখতে পারি না, কিন্তু সারারাত জেগে যখন ভোর ৬:৩০টার সময় কোনো বই শেষ করি, তখন সেই বই সম্পর্কে দুই এক বাক্য না লিখে ঘুমাতেও কেমন অপরাধবোধ হয় :'3)
নাজিম ভাইর লেখনী স্মুথ, অবলীলায় পড়ে ফেলা যায় পাতার পর পাতা। বইটি লিখতে যেয়ে ভৌগলিক অবস্থান নিয়ে পড়াশোনা করার পাশাপাশি অ্যাটম বোমা, ম্যানহাটন প্রজেক্ট, বায়োলোজিক্যাল ওয়েপন, সোভিয়েত রেড আর্মির ভুবনবিখ্যাত(?) কর্মকাণ্ড, সেল্টিক কালচার, ওয়েলস-এর কালচারাল ফেস্টিভ্যাল সহ আরও নানা বিষয়ে পড়াশুনা করেছেন তিনি, বই পড়লেই বোঝা যায়। কাহিনির সাথে কাহিনির মেলবন্ধনের কায়দাটা ভালো লেগেছে।
এতকিছুর পরও বইয়ে তিনতারা কেন! প্রথমত, বইটির কোনো চরিত্র-ই আমার মনে দাগ কাটেনি। এত কিছুর পরও যেন চরিত্রগুলো ঠিকঠাক পোর্ট্রে করা হয়নি, এরকম কিছু অনুভূত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বইয়ে বানান ভুল, টাইপোর সংখ্যা বেশ। যত্রযত্র 'র' আর 'ড়' এর বিড়ম্বনা আমাকে বিরক্ত করেছে।
তৃতীয়ত, কিছু বাক্য কেমন যেন দ্বন্দের সৃষ্টি করেছে এবং নাজিম ভাইর সাথে যাচ্ছে না বলে মনে হয়েছে। একটা উদাহরণ দেই, 'আবরারের মতো গুগল ম্যাপ ব্যবহার করতে শিখে গেছে লিজা।' লিজা যেখানে ইংল্যান্ডে অধ্যয়নরত এই যুগের মেয়ে, সেখানে এই বাক্য পুরোপুরি নিরর্থক।
দারুণ! দারুণ! এক্সিলেন্ট একটা থ্রিলার! শুরু থেকে টানটান উত্তেজনা ছিলো একদম শেষ পর্যন্ত। আমার তো খু���ই ভালো লেগেছে! নাজিম ভাইয়ের লেখার সাথে আগেই পরিচয় আছে ব্লাডস্টোন, স্কারলেট ইনকারনেশন ইত্যাদি বইয়ের মাধ্যমে। উনার লেখার একটা কমন ব্যাপার হচ্ছে বইয়ের তিন ভাগের দুই ভাগ সময় আপনার মাথা খারাপ হয়ে যাবে অজস্র পরস্পর সম্পর্কহীন বিষয় দেখতে দেখতে। আর ভাববেন এসবের মধ্যে মিলটা আসলে কোথায়। বইয়ের শেষ ভাবে এসে একটু একটু করে মিলে যেতে থাকবে। আর শেষদিকে এসে কাহিনী মোর ঘুরানো একটা টুইস্ট আপনাকে প্রচন্ড এক ধাক্কা দেবে!
একটু ইতিহাস,একটু সাসপেন্স,একটু থ্রিল,প্রচুর টুইস্ট আর প্রচুর অ্যাকশন।নাজিম উদ দৌলার মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়াকে এভাবেই ব্যখ্যা করতে হয়।
কাহিনী সংক্ষেপ: হানিমুনে কার্ডিফে বেড়াতে আসে আবরার আর লিজা দম্পতি।কার্ডিফে নামার পর থেকেই তারা লক্ষ্য করে কয়েকজন মানুষ তাদের উপর সার্বক্ষনিক নজর রাখছে।হোটেল ম্যানেজারের ব্যবহারও তেমন সুবিধাজনক নয়।এদিকে লিজার চোখে আবরারেরও পরিবর্তন ধরা পড়ছে।যেন হানিমুনে নয়,কোনো এক সিক্রেট মিশনে নেমেছে আবরার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের আগে হিটলার তার সেনাসদস্যদের নিয়ে একটি বৈঠকে বসেন।কি উদ্দেশ্য ছিল সেই গোপন মিটিংয়ের? বছরের পর বছর ধরে নিও-নাৎসী বাহিনী কি খুঁজে বেড়াচ্ছে? একাত্তরের যুদ্ধের শেষদিকেই বা ঢাকার কেরানীগঞ্জের ক্রুশনগর গ্রামে কি লুকিয়ে রাখা হয়েছিল? এত্তোসব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে নাজিম উদ দৌলার হিস্টোরিকাল এ্যাকশন থ্রিলার ‘মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া’য়।
পাঠ প্রতিক্রিয়া: সবকিছু বিচার করলে সত্যি বলতে বইটা আমার অতোটা ভালো লাগেনি।বলা যায়,মোটামুটি ভালোলাগা আর ভালোলাগার মাঝামাঝি। বইয়ের ভালো দিক নিয়ে যদি বলি তাহলে বলা যায়,একসময় বইয়ের গতি বেশ বেড়ে গিয়েছিল।টানা পড়ে গিয়েছি অনবরত। লেখককে যারা চেনেন,তারা নিশ্চয়ই জানেন নাজিম উদ দৌলা বেশ পরিপক্ব লেখক।সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটার তিনি।সেই হিসেবে লেখনশৈলী নিয়ে হতাশ হতে হয়নি।বরং আমোদিতই হয়েছি।খুবই সাবলীল লেখা।পড়তে আরাম লাগে।আর আটকাতে হয় না। বইটা লেখার জন্য লেখক বেশ পরিশ্রম করেছেন বলে বোঝা যাচ্ছে।সেটাকে ভালো চোখেই দেখেছি। কোড ব্রেকিংটাও ভালো লেগেছে অনেক।যেভাবে সাজিয়েছেন আর যেভাবে উত্তরটা দেখিয়েছেন...ভালো লেগেছে। শেষ দিকে প্রচুর টুইস্ট দিয়েছেন লেখক।টুইস্টগুলো আমার খারাপ লাগেনি।তবে হালকা প্রেডিক্টও করতে পেরেছিলাম।
এবার বলা যাক,যে বিষয়গুলো ভালো লাগেনি। প্রথমত বইয়ের প্রথম দেড়শো পৃষ্ঠা একদমই বোরিং।বই শুরু করলে শেষ না করে উঠতে মন চায় না,আবার কৌতুহলের বশে হোক কিংবা ভালো কিছু পাওয়ার আশায় হোক, টানা পড়ে গেছি বইটা।শেষে দেড়শো পৃষ্ঠা পার হয়ে মনে হলো যে,না এবার একটু ভালো লাগছে পড়তে।ইতিহাস নির্ভর অধ্যায় দুটো পড়তে বেশি ভালো লেগেছে।কিন্তু বইয়ের স্টার্টিং এতোটা বোরিং হবে ভাবিনি।আবরারের সন্দেহজনক আচরণ,লিজার সন্দেহ,তাদের প্রেম-ভালোবাসা আর খানিকটা রহস্যের আভাস দিয়ে গল্প এগোচ্ছিল। যে ব্যাপারটা নিয়ে একটু বেশিই বিরক্ত হয়েছি তা হলো কার্ডিফের দর্শনীয় স্থান,দ্বীপ,হোটেল,রাস্তাঘাটের ডিটেইলড্ বর্ণনা।আমার মতে এগুলো কমিয়ে লিখলে লেখার গতি প্রথম থেকেই ভারসাম্যে থাকতো।আর বিরক্তও হতে হতো না। থ্রিলারকে টুরিস্ট গাইড টাইপ কিছু বানানোর প্রয়োজন দেখি না।বর্ণনা অনেক জায়গায়ই বাড়িয়ে করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে।এতে শুধু বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যাই বেড়েছে।কার্ডিফ আর দর্শনীয় স্থানগুলোর বর্ণনা পড়তে পড়তে সত্যিই বিরক্ত লাগছিল। তারপর আসি অ্যাকশনে।স্ক্রিপ্ট রাইটার হওয়ার সুবাদে লেখক খুব ভালো অ্যাকশন বর্ণনা করতে পারেন।অস্বাভাবিক না।কিন্তু থ্রিলার বইয়ে পাতার পর পাতা অ্যাকশন বর্ণনা করাটা বই পড়ায় চরম বিরক্তি সৃষ্টি করছিল।কারণ আমার মতে মারকাটারি অ্যাকশন সিনেমাতেই বেশি মানায়। শেষদিকে এ্যাকশন পড়ার সময় নজরই দেইনি কি হচ্ছে না হচ্ছে। আরেকটা বিষয় বাজে লেগেছে।রহস্য যখন উন্মোচন হচ্ছে তখন লেখক হোটেলের গঠনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন।সত্যি বলতে অ্যাকশন পর্বের জন্যে সেটা প্রয়োজন ছিল।কিন্তু কথার মাঝখানে একটা হোটেলের বর্ণনা কিংবা মানবতাবাদী বর্ণনা পড়তে নিশ্চয়ই ভালো লাগবে না। আরো কিছু ব্যাপার আছে,যেগুলো মানতে পারিনি।স্পয়লার হওয়ার ভয়ে বলছি না। যাই হোক,সবমিলিয়ে বইটাকে মোটামুটি ভালোই বলতে হয়।
চরিত্রায়ণ: প্রথম দেড়শো(প্রায়) পৃষ্ঠা জুড়েই আবরার আর লিজাকে নিয়ে লেখা।কাজেই বুঝতে পারছেন,চরিত্রায়ণ খারাপ হয়নি।প্রধান চরিত্র হিসেবে ধরলেও লিজার চেয়ে আবরারের প্রতি লেখক বেশি দৃষ্টি দিয়েছেন।সেই হিসেবে আবরার চরিত্র হিসেবে পারফেক্টই। লিজা,জগজিৎ,ফিশার এদের কাউকেই আমার চরিত্র হিসেবে তেমন শক্তিশালী মনে হয়নি।তবে আযহার আহমেদ চরিত্রটিও মোটামুটি ভালোই হয়েছে।
আর পছন্দের হিসেব করলে আবরারকে মোটামুটি ভালো লেগেছে।আর কারো প্রতিই তেমন আকর্ষণ অনুভব করিনি।তবে প্রিয় চরিত্র বলতে কিছু পাইনি বইয়ে।
প্রোডাকশন: বইয়ের প্রোডাকশন যাস্ট ওয়াও।বাঁধাই,পৃষ্ঠা,প্রচ্ছদ সবই দারুণ হয়েছে।প্রচ্ছদটাকে সিম্পলের মধ্যো গর্জিয়াস বলা যায়।লেখক গল্পের মাঝে বেশকিছু ম্যাপ ও ছবি ব্যবহার করেছেন।সেগুলোও ভালো ছিল।প্রোডাকশন আমাকে বেশ মুগ্ধ করেছে।
যারা নাজিম উদ দৌলার লেখা পছন্দ করেন,তারা চাইলে বইটা পড়তে পারেন।খারাপ দিকগুলো যাদের সহ্য করার ক্ষমতা আছে বলে মনে হয় তারাও চাইলে পড়তে পারেন।আর টুইস্ট পছন্দ করলেও এই বইটা ভালো লাগতে পারে,বাকি সব বাদ বিবেচনায়।কিন্তু অ্যাকশন ভালো না লাগলে এই বইটা না পড়াই ভালো হবে।রিকমেন্ড করছি না।
বইয়ের শুরুটা নবদম্পতির হানিমুন ট্রিপ নিয়ে। সুন্দর এবং ডিটেইল লেখনীতে নবদম্পতি আবরার আর লিজার সাথে চলে গেলাম কার্ডিফ, উঠে পড়লাম বিখ্যাত এক হোটেলে। কিন্তু হায়, হোটেলের ম্যানেজারের অদ্ভুত আচরন আর ফ্ল্যাটহোম নামের সেমি রেস্ট্রিকটেড একটা দ্বীপে যাওয়ার জন্য আবরারের জেদ এই দুই মিলিয়ে হানিমুন ট্রিপ টা কেমন যেন একটু থ্রীলিং হয়ে গেলো। একটা পক্ষ কোনভাবেই আবরারকে ঐ দ্বীপে যেতে দিবেনা, ঐদিকে আবরার ঐ দ্বীপে যাবেই। আবরার যেখানেই যায়, সেখানেই তাকে ফলো করা কিংবা দ্বীপে যাওয়ার ব্যাপারে সব যায়গা থেকেই অসহযোগিতা সব মিলিয়ে কার্ডিফের আকাশে তখন কালো মেঘের ঘনঘটা। পাঠক হিসেবে আমি জানতে পারলাম কার্ডিফ সাগরে সৃষ্টি হয়েছে প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ের। তারপর? তারপর ঘূর্ণিঝড়ের ঢেউ কার্ডিফ উপকূলে আছড়ে পড়ার আগেই একের পর এক টুইস্ট আছড়ে পড়া শুরু করলো বইয়ের প্রতিটি পাতায়। একটা নিরীহ হানিমুন ট্রিপ হয়ে গেলো হিস্টরিকাল থ্রিলার, একশন আর পাজল সলভিং এর অনন্য এক জগত। পাতায় পাতায় আমি পৌছে গেলাম কখনো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জার্মানি, কখনো ১৯৭১ এর কেরানিগঞ্জের মাস্টারবাড়ি আবার কখনো সেই রহস্যময় ফ্ল্য��টহোম দ্বীপ। আর একটা সময় খুজে পেলাম দীর্ঘদিন লুকিয়ে থাকা লেফটেন্যান্ট কে! পাঠক হিসেবে আমার কাছে মিথ্যা তুমি দশ পিপড়াকে একটা কম্পলিট প্যাকেজ মনে হয়েছে। একশন, রোমান্স সাসপেন্সের সাথে মাথা ঘুড়িয়ে দেওয়া সব পাজল আর টুইস্টের ধাক্কা। থ্রিলার পাঠকরা বই পয়ারার সময় গেস করতে ভালোবাসে, আরো বেশি ভালোবাসে সেই গেস ভুল প্রমান হতে দেখলে। এই বইতে আমার করা অনেকগুলো অনুমান ই ভুল প্রমান হয়েছে। খুব ছোট ছোট বাক্যে লেখা বইটা আসলে শেষ হওয়ার আগে হাত থেকে নামানো খুব কঠিন একটা কাজ। বানানে তেমন কোন ভুল চোখে পরেনি। প্রডাকশন কোয়ালিটি অনেক ভালো, বিশেষ করে কাভার টা এক টুকরো ভালোবাসা ! আমাকে মুগ্ধ করেছে কার্ডিফ নিয়ে করা লেখকের বিশাল রিসার্চ। মনে হচ্ছিলো আসলেই কার্ডিফের রাস্তায় ঘুরছি। একটা থ্রিলারের নায়ক ডালভাত খাওয়া টাইপ হবে না, তার কনফিডেন্স ভালো থাকবে এইটাই স্বাভাবিক। এই বইটায় আবরারের কনফিডেন্স আর ঠান্ডা নার্ভ একটু বেশি হলেও আমি ব্যাপারটা উপভোগ করেছি তাই একে বড় ধরনের কোন খুত বলতে পারছি না। উল্টা একের পর এক ধুমধাম টুইস্ট গুলা বইএর ছোটখাটো প্লটহোলগুলাকে একদম পার্ফেক্টলি কাভার আপ করেছে। বইতে কার্ডিফ পুলিসের কোন উপস্থিতি পাইনি, আতসি কাচ দিয়ে খুজলে সম্ভবত এইটাই একমাত্র একটা খটকা আমার। পরিশেষে, আমার নাজিম উদ দৌলা ভাইয়ের প্রথম পড়া উপন্যাস এটা। ছোটগল্পগুলো পড়ে মনে মনে উনাকে টুইস্ট মাস্টার মেনে নিয়েছিলাম, তবে মিথ্যা তুমি দশ পিপড়া পড়ে এটা প্রকাশ্যেই স্বীকার করছি। তীব্র আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকলাম উনার পরবর্তী বইয়ের। পাঠক, যারা এই লকডাউনে ঘরে বসে বসে বোরড হচ্ছেন, তারা কিন্তু চাইলেই আবরার আর লিজার সাথে কার্ডিফ ঘুরে আসতে পারেন। লকডাউনে এর চেয়ে বেটার এডভেঞ্চার খুব সহজে আর কোথাও পাবেন বলে মনে হচ্ছে না৷!
সিটি অফ কার্ডিফকে স্বর্গের শহর বলা হয়। সেখানেই হানিমুন করতে পৌঁছেগেছে ওরা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেখানে রঙধনু হয়ে আবেশে জড়িয়ে যায়। তোলার মত সাদামেঘেরা খই হয়ে ফুঁড়ে ফুঁটে৷ কিন্তু এখানে এসেই কাল হল আরবার আর তাঁর ওয়াইফ লিজার। মৃত্যু তাঁদের আলিঙ্গন করতে চায়। বাঁচতে চায় তাঁরা। মৃত্যু যেখানে শ্রেয়তর সেখান থেকে বাঁচতে তিনটা প্রশ্নের উত্তর জানতে হবে। ১/ মৃত্যুর পূর্বে হিটলার গোপন বৈঠকে কি সিন্ধান্ত নিয়েছিলেন? ২/ মুক্তিযুদ্ধের সময় কেরানি গঞ্জে পাওয়া শেতাঙ্গ ব্যাক্তির আইডেন্টিটি কি? ৩/ ৩০ বছর ধরে কোন অজানা রহস্য লুকিয়ে আছে কার্ডিফ শহরে?
প্রশ্নগুলোর জাদুকরী উওরগুলো খুঁজতে হলে যেতে হবে সাগরের তলদেশে অবস্হিত ফ্ল্যাটহোম দ্বীপ পঞ্জিতে। কিন্তু সেটা কিভাবে পসিবল? সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বাইরে বের হতে। তাঁর সঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তরের থেকে সর্তক বার্তা আসছে - ঘূর্নিঝড়ে তেড়েফুঁড়ে আসছে কার্ডিফেরই দিকে। যতটা সম্ভব স্পয়লারমুক্ত কাহিনী বলার ট্রাই করলাম এবার দেখি বইটা কেমন লেগেছে পড়তে গিয়ে?
একদিকে টান টান উত্তেজনার সুপ্রসন্ন থ্রিলার ভয়ানক অভিজ্ঞতা দিয়েছে। অন্যদিকে এনে দিয়েছে সুপ্রশান্তি। কন্সপিরেসি থ্রিলার জনরা আমার খুবই পছন্দের। কিন্তু এরকম লেখা বই নেই বললেই চলে৷ যা আছে তা পড়ার যোগ্য না বললেই চলে। কিন্তু এই গল্পটা যখন শুরু হয়; গল্পের প্লট মস্তিষ্ককেই এমন ভাবে আঁচড়ে ধরে। শেষ না হওয়া পর্যন্ত ছাড়ে না। বইয়ের চরিত্রগুলো ডানা মেলে উঁড়ে বেড়ায় গাঙচিল ঝাঁকের মত। চোখে ফোঁটে উঠে কার্ডিফ শহরের প্রকৃতির রূপ। নিয়ে যায় হিস্ট্রির অজানা এক অধ্যায়ে, এটাকেই পুনরুদ্ধার করে এনে পৌঁছে দেয় বাস্তবে। যাঁকে বলে বর্তমানে বসে অতীতকেই খুঁজে আনা৷ এরকম এডভেঞ্চার, রোমাঞ্চকর অনুভূতির কারসাজিতে সত্যিই অভিভূত হয়েছি। আর টুইস্টের কথা কি বলবো? একদম ১৮০ ডিগ্রি মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে। লেখক নাজিম উদ দৌলার জন্যে শুভকামনা রইল৷। এই রকম বই আরও চাইবো তার কাছে।
আবরার সাধাসিধে একজন বাঙালি যুবক। ঘটনাচক্রে প্রেম হয়ে যায় ধনীর দুলালী, লন্ডনপ্রবাসী মেয়ে লিজার সাথে। দুজনের বিয়ে হয় এবং দুজনে মিলে কার্ডিফে হানিমুর করতে আসে। শুরুতে খুব সাধারণ এক দম্পতির হানিমুনের গল্প বলে মনে হলেও, আস্তে আস্তে তা ঘটনাবহুল হয়ে ওঠে। যেমন: হোটেল কামড়াতে একটা আড়ি পাতার যন্ত্র খুঁজে পায় আবরার, হোটেল ম্যানেজার অদ্ভুত আচরন করে তাদের সাথে, কয়েকটা লোক তাদের অনুসরণ করতে থাকে, ওরা একটা দ্বীপে যেতে চায় কিন্তু পদে পদে বাঁধা পায়। এরপর আবরারের স্ত্রী খুঁজে পায় একটা পুরনো ডায়েরি এবং সবকিছু জলের মতো পরিস্কার হয় তার সামনে। এরপর গল্পের বাকিটা আর বলতে গেলে স্পয়লার হয়ে যাবে, তাই আর বাড়লাম না।
ওভারল পুরো উপন্যাসটা এক কথায় অনবদ্য! যেন একটা রোলার কোস্টার রাইড চললো! সারাক্ষণই উত্তেজনা, পাতা উলটে যাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম এরপর না জানি কি হয়! নাজিম উদ দৌলা ভাইকে ধন্যবাদ এমন চমৎকার একটা থ্রিলার লেখার জন্য।
গতকাল হাতে পেয়েছি "মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া"। সুন্দর ছাপানো প্রচ্ছদ, টেকসই বাঁধাই, বেশি কোয়ালিটির সম্পন্ন বই। রাতেই পড়তে বসে গেলাম। ইচ্ছে ছিলো ঘন্টা দুয়েক পড়ে রেখে দিবো, আবার শুক্রবারে গিয়ে পড়বো। কিন্তু বই কাহিনী এতোটাই গ্রিপিং যে হাত থেকে রাখতে পারলাম না। সারাক্ষণ শুধু "এর পর কি হয়" "এর পর কি হয়" এই রকম টেনশন বিল্ড আপ হচ্ছিলো। ভোর ৫টার দিকে বইটা শেষ হলো। কী যে শান্তি লাগছিলো বলে বুঝাতে পারবো না! এত চমৎকার গল্প আর চমৎকার কাহিনী বিন্যাসের মৌলিক থ্রিলার বই বাংলাদেশে খুব কমই হয়েছে। ধন্যবাদ নাজিম উদ দৌলাকে আমাদের এমন একটা বই পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।
নাম শুনেই মোটামুটি সবার একটা ধারণা হয়ে যাই এই বই লেফটেনেন্ট কে নিয়ে|
কথা হল কে এই লেফটেনেন্ট ? কি এই লেফটেনেন্ট ?
কি,কে,কেন বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর নিয়ে এগিয়েছে গল্প, শুরুতে কিছুটা স্লো লাগলেও গল্প মোটামুটি গতিশীল তবে শেষে মনে হয়েছে জোর করে পৃষ্ঠা বাড়িয়েছেন লেখক| একশন সিন গুলা অনুভব করতে কষ্ট হচ্ছিলো কিছুটা,সাসপেন্স আর থ্রিল মোটাম��টি বেশ আছে!!
মাস্ট রিড না তবে সময় থাকলে পড়ে দেখতে পারেন!!!
ওহ আচ্ছা আরেকটা বিষয় : জোর করে দেশপ্রেম শব্দটাকে বেশি ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন বলে মনে হল 😐
গল্পটা শুরু হয় ১৯৭১ সালে, জার্মানির এক জেলখানায়। জেলখানা পরিদর্শনে আসা এক সাংবাদিক তার বন্ধুকে খুঁজে পায় কয়েদীদের মাঝে। সেই কয়েদীকে আটকে রেখে টর্চার করা হচ্ছে একটা কিছু নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অপরাধে। তার মুখ থেকে জানা যায় যে সেই বিশেষ বস্তুটা সে বাংলাদেশে লুকিয়ে রেখে এসেছে।
এরপর আমরা চলে আসি বর্তমান সময়ে যেখানে আবরার আর লিজা, এক বাঙালি দম্পতি হানিমুনে এসেছে ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে। নিরীহ দম্পতি একের পর এক বিপদে পড়ছে। চারপাশে সবাই অদ্ভুদ আচরণ করছে। অচেনা লোক সব জায়গায় তাদের অনুসরণ করছে। আবরারের আচরণও সন্দেহজনক, সে কার্ডিফ সাগরের ফ্ল্যাটহোম দ্বীপে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে!
এরই মধ্যে লিজা একদিন আবরারের সুটকেসে খুঁজে পায় এক পুরনো ডায়েরি। ডায়েরিটা পড়েই বুঝতে পারে এতদিন আসলে সে যা কিছু ভেবে এসেছে, সবই ভুল। সে আবিষ্কার করে ১৯৯০ সালের এক অন্যরকম গল্প। গল্পটা জানার পর আবরার আর লিজার জীবনে সব কিছু বদলে যায়। আর সেখান থেকেই শুরু হয় একের পর এক রহস্য।
এদিকে আবহাওয়া বার্তায় জানা যায় কার্ডিফের দিকে ধেয়ে আসছে এক শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়ংকার ঘূর্ণীঝড়। এরই মধ্যে আবরারকে একবার সেই দ্বীপে যেতেই হবে! আর পালানোর উপায়ও নেই। চারিদিকে অচেনা শত্রু জাল পেতেছে। সিচুয়েশন যখন বিশালাকার ধারণ করে, তখনই এক হোটেলের ছাদে শুরু হয় ত্রিমুখী ফাইনাল ফাইট!
আমার বিশ্লেষণ:
নাজিম উদ দৌলার সবগুলো বই আমি পড়েছি। একেকটা একেক রকম লেগেছে আমার। ভালো, মোটামুটি, এক্সিলেন্ট- সব ধরনের অনুভূতিই হয়েছে। কিন্তু এই বইটা একদমই অন্য লেভেলে চলে গেছে বলে মনে হয়েছে আমার। লেখক নাজিম উদ দৌলা নিঃসন্দেহে নিজেকে ছাড়িয়ে গেছে মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া'য়।
যা কিছু ভালো লেগেছে:
- বইটা সাংঘাতিক লেভেলের ফাস্ট পেসড। মনে হলো যেন একটা রোলার কোস্টার রাইড শেষ করলাম। গল্প সারাক্ষণই প্রোগ্রেসিভ ছিলো। কোথাও ঝুলে যায়নি। নাজিম আগের বইগুলোর মধ্যে শুধু মহাযাত্রায় এটা পেয়েছিলাম। আমি এটা খুবই এনজয় করেছি। - বইয়ের টুইস্টের কথা আর কী বলবো? এখন আর নাজিম উদ দৌলার লেখায় টুইস্ট প্রেডিক্ট করতে চেষ্টা করি না। এতবার ছ্যাকা খেয়েছি জীবনে। এখন সেই চেষ্টা বাদ দিয়েছি। এই বইতে টুইস্ট কাকে বলে, কত প্রকার এবং কী কী- সব দেখিয়ে দিয়েছে লেখক। - ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টে এই বইতে নাজিম উদ দৌলা বেস্ট কাজ করেছে সো ফার। আবরার ক্যারেকটা মনে ধরেছে। আর হোটেল ম্যানেজার পাঞ্জাবির ক্যারেকটারটা জোস। আরও দুটো ক্যারেক্টার ভালো লেগেছে। কিন্তু কিছুই বলতে পারছি না, স্পয়লার হয়ে যাবে নয়তো। - হিস্টোরিক্যাল কন্সপিরেসি নিয়ে অনেক বই পড়েছি। এই বইটার স্টোরির বিন্যাস একেবারে মন ভরিয়ে দিয়েছে। ইতিহাসের বিশদ বর্ণনা নাই। একদম ক্রিসপ, ঠিক যতটুকু দরকার ততটুকুই ছিলো। - এই বইয়ের সবচেয়ে ভালোলাগার ব্যাপার হচ্ছে বইটির ফিনিশিং! শেষে চারিদিকের বিশাল তান্ডবের মাঝে একটা গ্রান্ড ফিনিশিং পেয়ে মন ভরে গেছে।
খানিকটা মন্দলাগা:
- এই বইতে নাজিম উদ দৌলার অন্যান্য যত বই পড়েছি আমি, তার তুলনায় বানান ভুল কম। তারপরও, বানান সমস্যা পেয়েছি কিছু জায়গায়। কিছু কিছু কমন বানান ভুল পেয়েছি যা ভুল হওয়ার কথা না কারো। প্রুফে এইগুলা ধরা পড়ে যাওয়া উচিত ছিলো। কিছু দৃশ্যে এই কারণে দৃষ্টি আটকেছে। - লিজার ক্যারেকটারের ব্যাকগ্রাউন্ড আর অ্যাক্টিভিটিজ কিছু ক্ষেত্রে সাংঘার্ষিক লেগেছে আমার কাছে। অক্সফোর্ডে পড়া একটা আধুনিক মন মানসিকতার মেয়ে কিন্তু বেশ বোল্ড হওয়ার কথা। সেখানে লিজাকে অনেক দৃশ্যে চিরায়ত বাংলার নারীর মতই লেগেছে। আমার মনে হয় এই জায়গায় লেখকের কাজ করার স্কোপ ছিলো। - একটা প্রশ্ন থেকে গিয়েছে বই শেষ করার পরও। আবরারের মতো সাধারণ একটা ছেলে এমন অসাধ্য সাধন করে বসলো? লেখক যদিও বেশ বিশ্বাসযোগ্য ভাবেই লিখেছেন। তবুও একটু খচখচানি থেকে গেছে।
এছাড়া, এই বইতে খারাপ লাগার মতো কিছুই নেই। বইটা থ্রিলারপ্রেমীদের জন্য হাইলি রিকমেন্ডেড। যারা হলিউডের ধুম ধারাক্কা অ্যাকশন থ্রিলার সিনেমা দেখে অভ্যস্ত কিংবা জেমস রোলিন্সের হাই-অ্যাড্রেনাইল বই পড়তে ভালোবাসে, তারা এই বইটা বেশ ভালোই উপভোগ করবেন বলে আমার ধারণা।
পাঠ প্রতিক্রিয়া: মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া বইটি আদতে একটি অ্যাকশন থ্রিলার। এর আগে লেখকের 'মহাযাত্রা' বইটি পড়া ছিল। বইতে বেশ কিছু অসঙ্গতি থাকলেও মোটের ওপর খুব একটা খারাপ লাগেনি। এই বইটা পড়েও ঠিক একই অনুভূতি। এভারেজ বই। খুব ভালো বলবো না; আবার একদমই বাজেও না। যাদের অ্যাকশন পছন্দ তারা পড়তেই পারেন বইটা।
যাই হোক, বইটা ' মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া' ( lieutenant) কে কেন্দ্র করেই। তবে এই লেফটেন্যান্ট এর হাত , পা ,মাথা কিছুই নেই। একদমই আলাদা ধরনের এক লেফটেন্যান্ট ইনি। বইয়ের প্লট সিম্পল হলেও বেশ ঘটনাবহুল। প্রথমদিকে একটু বিরক্ত বোধ হলেও পরে সেটা কেটে গেছে। তবে পড়ার সময় বই পড়ছি বলে মনে হয় নি কারণ পুরো বইটাই যেন একটা টিপিক্যাল হলিউডি অ্যাকশন সিনেমা।
এবার বইটার ভালো মন্দ দিক গুলো একটু দেখে নেওয়া যাক #পজিটিভ পয়েন্ট: ১. বইয়ের প্লট বেশ সাদামাটা হলেও বেশ উপভোগ্য ছিল। প্রচুর ঘটনা বইটিকে উৎরে যেতে সাহায্য করেছে। ২. লেখনশৈলী বেশ সাবলীল। ঝরঝরে লেখা। পড়তে কোনো অসুবিধা হয় না। ৩. বেশ কিছু ছবি ও ম্যাপের ( ঠিক ম্যাপ না , জায়গার নকশা বলা যেতে পারে) উপস্থিতি বইটাকে সুন্দর ও উপভোগ্য করে তুলেছে। ঘটনা গুলো কোথায় কিভাবে ঘটছে তা কল্পনা করতে সুবিধা হয়েছে। ৫. কার্ডিফ এবং আশপাশের অঞ্চলের বর্ণনা বেশ সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন লেখক। আঞ্চলিক উৎসবের বর্ণনাও বেশ প্রাণবন্ত ছিল। বইটাকে কার্ডিফ শহরের একটা ছোট টুরিস্ট গাইড বলতে পারেন। ৬. বইতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের বর্ণনা লেখক খুব সুন্দর দিয়েছেন। মনে হয় যেন চোখের সামনে ঘটছে ঘটনাগুলি। ৭. শেষের দিকে ছোট ছোট টুইস্ট গুলো বইয়ের এন্ডিংটা সুন্দর করে তুলেছে।
#নেগেটিভ পয়েন্ট: ১. বইয়ের কাহিনী শুরুতে খুব ধীরগতির। প্রায় ১৫০+ পৃষ্ঠা পর্যন্ত যা ঘটছে তার কারণ জানা না থাকায় বিরক্তির উদ্রেক হয়। পরে ডাইরির অংশটুকু আসার পরে সব ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়। তবুও স্টোরি বিল্ডিংএ একটু বেশি সময় চলে গেছে । ২. চরিত্রায়নে আরেকটু জোর দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। কোনো চরিত্রই মনে দাগ কাটতে পারে নি। ৩. প্রোটাগনিস্ট গরীব ঘর থেকে আসা। কিন্তু তার হাব ভাবে তা একদমই মনে হয় নি।( এটা তেমন মেজর পয়েন্ট না) ৪. আবরার এক জার্মান স্প���ই কে গুলি করে, কিন্তু সেটা নিয়ে পরে কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। বইয়ের প্রায় অর্ধেকের বেশি সময় কী ঘটছে তার কারণ জানা যায় না। তাই কেউ এত টাকা পয়সা খরচ করে দুজন নব দম্পতির ওপর কেন নজর রাখে তা পরিষ্কার না হওয়ায় বিরক্তি আসতে পারে। ৫. ১৮৯ পৃষ্টায় বলা হয়েছে আবরার এর বাবার ডায়রি তার বাবার মৃত্যুর পর অনেকেই এমনকি শত্রুপক্ষের লোকেরাও পড়েছে। সেক্ষেত্রে এত কম সময় এত হাতবদল হয়েও কি করে সেটা আবার আবরার এর নানির কাছে ফিরে আসে তা পরিষ্কার না। ৬. যে বায়ো ওয়েপন এর কথা বলা আছে তার কার্যপদ্ধতি ক্লিয়ার না। নির্দিষ্ট এলাকায় কি করে সেটা ছড়াবে তার ব্যাখ্যা ঠিক মত নেই কারণ সেই জীবাণু ছোঁয়াচে হলে কখনোই টা নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না । ৭. বইতে শেষের দিকে প্রফেশনাল মার্সেনারিদের দেখা পাওয়া যায়। কিন্তু দেখা যায় গালিব সাহেবই তাদের স্ট্র্যাটেজি প্লাস অ্যাকশন ঠিক করে দেন। সোজা বাংলায় তিনিই লিডার। ( এইটা কি করে সম্ভব বুঝি নাই। তিনি কি এইসব অবস্থায় আগেও অনেকবার পড়েছেন?? ) । আর মার্সেনারিরা প্রফেশনাল হলে তাদের এত কমান্ড দেওয়ার প্রয়োজন কেন? তারা কি নিজের বিচারবুদ্ধিতে শত্রুর মোকাবিলা করতে পারে না? ৮. আবরার কে অতিরিক্ত হিরোইক বানানো হয়েছে। যে বন্দুক পায় তাই চালাতে জানে।( আগে কখনো না এই পরিস্থিতিতে না পড়েও।) ৯. শেষ দিকে ' লেফট্যানেন্ট ' কে আবরারের থেকে নিয়ে চলে গেল তার ভালো ব্যাখ্যা দেওয়া নেই। এই জায়গাটায় আরেকটু সময় দিলে ভালো হতো। ১০. আবরার এর লিজার মধ্যেকার ঝগড়া ( ডায়রির কারণে) যার জন্য লিজা আবরার কে প্রতারক ইত্যাদি ইত্যাদি বলে। এই জায়গাটা অতিরিক্ত লেগেছে।
সবমিলিয়ে বইটা খারাপ না। বেশি ভাবনা চিন্তা না করে পড়তে চাইলে বেশ উপভোগ্য একটা বই। চোখের সামনে একটা হলিউডি মুভি দেখছেন বলে মনে হবে।
জ্যোতিষ হালদারের করা প্রচ্ছদটা বেশ ভালো। নীল রংটা সুন্দর মানিয়েছে। বইটার বাঁধাই, কভার , পৃষ্ঠা বেশ চমৎকার ছিল। পড়তে কোনো অসুবিধা হয় নি। বুকিকার্ট প্রথম থেকেই বেশ ভালো কাজ করেছে। আশা করি ভবিষ্যতে আরো সুন্দর সুন্দর বই তাদের থেকে উপহার পাবো।
This entire review has been hidden because of spoilers.
নাজিম উদ দৌলা ভাইয়ের অনবদ্য এক মৌলিক থ্রিলার মিথ্যা-তুমি-দশ-পিপড়া। আবরার ও লিজা নামক দুই দম্পতি কার্ডিফে যায় হানিমুনে। হানিমুনের জন্য কার্ডিফ সত্যিই একটা অনবদ্য জায়গা। তারা ঘুরে দেখতে থাকে কার্ডিফের উল্লেখযোগ্য সব স্থানগুলো। তবে তারা যে হোটেলে উঠেছিল সে হোটেলের ম্যানেজার আচরণ সন্দেহজনক। সে সব সময় তাদেরকে অনুসরণ করতো। এমন কি তাদের রুমে লিসেনিং বাগ ও পেয়েছে তারা ।আবার কালো কোট পরা কয়েকজন লোক তাদের অনুসরণ করতো । লিজা বুঝতে পারে না কেন তাদেরকে অনুসরণ করছে তারা। একসময় আবরার ধরে ফেলে তাদের একজনকে। তবে ধরার কাজটা এতটা সহজ ছিল না । অনেক লড়াইয়ের পর তাদের একজনকে ধরতে সক্ষম হয় আবরার এবং জানতে পারে সে নাৎসী বাহিনীর সদস্য । জার্মানির এক সেনাবাহিনীর সদস্য কেন তাকে অনুসরণ করবে? কার্ডিফে এদিকে আবরার ব্যাকুল হয়ে আছে ফ্ল্যাটহোম দ্বীপে যাওয়ার জন্য । কি আছে ঐ দ্বীপে? কেন এত আকুল হয়ে আছে আবরার ঐ দ্বীপে যাওয়ার জন্য ?আর ওইদিকে একদিন লিজা আবরারের ব্যাগ থেকে তার বাবার একটি ডায়েরি পায় । ডায়েরি পড়ে সে হতভম্ব । কে আবরার ? আবরারের আসল পরিচয় কি? সে কি সত্যিই তাকে ভালবাসে নাকি ঠকিয়েছে ? অনেক প্রশ্ন উঁকি দেয় তার মাঝে আর এর সাথে হোটেল ম্যানেজারের অস্বাভাবিক আচরণ তো রয়েছেই। জার্মান বাহিনী কেন তাকে অনুসরণ করেছিল? ট্রিনিটি এর কার্ডিফ প্রতিনিধি মিস্টার ফ্লেচার কেন তার সাথে বাজে ব্যবহার করেছিল? বাঙালি এক যুবকের সাথে জার্মানির নাৎসি বাহিনীর কিসের সম্পর্ক ?কেন তারা তাকে অনুসরণ করবে ? এমনই নানা রহস্যের জটের মাধ্যমে সাজিয়ে তোলা হয়েছে থ্রিলারটিকে। সকল কাহিনীর বর্ণনা অতি নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। পড়ে মনে হচ্ছিল আমি সেই ঘটনাগুলোর প্রত্যক্ষদর্শী । এককথায় দারুন একটা থ্রিলার ছিল এটি।
পড়লাম। মূলত বইয়ের নামটা আকর্ষণ করেছে আমাকে। এমন আকর্ষণীয় নামের কারণেই বইয়ের প্রতি টান ছিলো এবং পড়ে নামের মর্ম উদ্ধার করে বেশ পুলকিতই হয়েছি।
থ্রিলার জনরা পছন্দের আমার। এতটাই পছন্দ যে বর্তমান থ্রিলার ছাড়া পড়িই না। এই বইটা শুরু করার পর থেকেই উৎকণ্ঠায় কেটেছে সময় যে কখন শেষ হবে! আমি সাহস করে শুরু করেছি– আর গল্পের গতি এবং প্লট, লেখকের বর্ণনার ধারা আমাকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়েছে।
গল্পে হিটলারের কিছুটা ছোঁয়া আছে, সেইসাথে আরো আছে আমাদের মুক্তিযোদ্ধার ইতিহাসের ছোঁয়াও। কেমন জানি অন্যান্য থ্রিলার বইয়ের থেকে ভিন্নতর একটা গল্প। ভিন্নতা তো সবাই পছন্দ করে, কিন্তু ভিন্নতা তৈরি করতে পারেই বা কজন! গতানুগতিক ধারার বাহিরে গিয়ে এমন ভিন্নতায় লিখিত বইকে আমি সফল বই হিসেবেই বলতে চাই। সে হিসেবে লেখকও স্বার্থক, তার থেকে এমন দারুণ বই আরো প্রত্যাশা করতেই পারি! পরিশেষে লেখককে ধন্যবাদ।
নাজিম উদ দৌলার বেশ কয়েকটা বই আগেও পড়েছি। তাই এক্সপেক্টেশন বেশি ছিলো। পড়ার শুরু দিকে মনে হচ্ছিলো রোমান্টিক হানিমুনের গল্প, ধুর পড়ে ঠিক মজা পাচ্ছি না। আস্তে আস্তে ঘটনা যখন ঘটা শুরু করলো মনোভাব বদলে গেলো। প্রথমেই হোটেল রুমে আবরার বাগ খুঁজে পাওয়ায় ভেবে নিলাম আবরার বুঝি স্পাই, স্ত্রীর কাছে লুকাতে চাচ্ছে ব্যাপরাটা। [পাঠকের মনের জল্পনা কল্পনা আরকি!] না পাঠক, আগেই বলে দেই, এমন কিছু আশা করবেন না। স্পাই থ্রিলার ধাঁচের কাছাকাছি বই হলেও মূল চরিত্র আবরার কোনো স্পাই না। তাহলে রহস্যটা কোথায়? আছে আছে, রহস্যের বেড়াজাল ভালো ভাবেই আষ্টেপৃষ্ঠে রাখবে পাঠককে। লেখকের লেখার স্টাইল ভালো। গল্প সাজিয়েছে সুন্দর ভাবে। হালকা মেজাজে শুরু করা গল্প ধীরে ধীরে গভীরে নিয়ে গেছেন, তারপর একে একে জট ছাড়িয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র নিয়ে টুইস্টও দিয়েছেন।
যেটা ভালো লাগেনি তা হলো হলিউড মুভি মার্কা এ্যাকশন দৃশ্য। আর মনে হয়েছে লেখক মাসুদ রানা পড়ে সেটার আবর্তনে আটকে গেছেন। ওয়েলসের মত একটা শহরে বাংলাদেশী পর্যটক বন্দুক নিয়ে কয়েকজনকে তাড়া করছে, কয়েক রাউন্ড ফায়ার করছে, একটার পর একটা গাড়ি ক্র্যাশ করছে- অথচ কোনো রিপোর্ট হলো না, পুলিশ টেরও পেলোনা! আবার আরেক সিনে অনেক গুলো হেলিকপ্টার নিয়ে যে ফাইটিং সিন দেখানো হলো তাতেও ইউকে'র দেশ ওয়েলসের পুলিশের টনক নড়লো না! বড়ই বেখাপ্পা যুক্তি।
বইটা অবশ্যই রেকমেন্ড করবো। মৌলিক থ্রিলারে এমন দারুণ একটা বই না পড়লে ভালো কিছুর অপ্রাপ্তি থেকে যাবে।