কবিদের গদ্য বিষয়ে আমার ধারণা অতি সুউচ্চ। সেই ধারণার প্রতি বিশ্বাস রেখে সেদিন বাতিঘর থেকে এই লাল টুকটুকে বইটা নিলাম। ভ্রমণকাহিনী ভালো লাগে আমার। এটা সেই ধরনের লেখা যেখানে বিভিন্ন সম্মেলনে যাওয়ার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি যুক্ত হয় নতুন দেশ দেখার উন্মাদনা। মহাদেব সাহার লন্ডনযাত্রা এটাই প্রথম না হলেও যে সুন্দর বাড়িটিতে তিনি সেবার গিয়ে থাকলেন তা যে তাঁর খুব ভালো লেগেছিল তা বাড়িটি নিয়ে মুগ্ধতা প্রকাশে স্পষ্ট। চমৎকার প্রাকৃতিক পরিবেশ আর সবুজের মাঝখানে নিরিবিলি বাড়ির বিবরণে আমারও ইচ্ছে করছিল একদম একাকী এমন শান্তির একটা জীবন অন্তত দিন কয়েকের জন্য কাটাতে। লঞ্চে বাস করা নি:সঙ্গ ডিকির কাহিনী পড়ে মনটা দ্রবীভূত হয়। আমাদের দেশেও নৌকায় বাস করে এমন অনেক পরিবার আছে। ভাসমান পরিবার নিয়ে তারা যাযাবরের মতো এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু ডিকির জায়গা একটি পুরনো লঞ্চ, একটি নির্দিষ্ট স্থানে। সেখানে বছরের পর বছর সে একা থাকে, নিরিবিলি সংসার করে একা! এমন একটা জীবনের পেছনের গল্প জানতে ইচ্ছে করে, ইচ্ছে করে জানতে জগৎ-সংসারের প্রতি এই নিস্পৃহতার কারণ। কিছুদিন থাকার পরেই ঢাকার জন্য মন আনচান করে ওঠা কবির সাথে আমি নিজের মিল খুঁজে পাই। আমি দূরে কোথাও যাইনি খুব। কিন্তু একবার দিন দশেকের জন্য কলকাতা গিয়ে পরে মনে হয়েছিল একবার বাংলাদেশকে যদি ছুঁয়ে আসা যেত! এই স্বভাবের জন্য নিজের স্বস্তিকর জায়গা থেকে অন্য কোথাও বেশিদিন গিয়ে থাকতে পারি না। বইটি যতটা না ভ্রমণকাহিনী তার চেয়েও বেশি স্মৃতিকথা আর কবির নিজস্ব ভাবনার কথা। বিলেতের সাথে মিলিয়ে সাংস্কৃতিক পার্থক্যের প্রতি অনেকটাই দৃষ্টি দিয়েছেন লেখক। তাঁর ব্যক্তিগত দর্শন এবং মনোভাব সম্পর্কে একটা চমৎকার ধারণা হয়ে যায় বইটি পড়লে। তবে ভ্রমণের বিবরণ আরেকটু বেশি থাকলে বইটা আরো প্রাণবন্ত হত। আর ছাপার কিছু ভুল রয়েছে যেটা বিরক্তিকর। এইসব বাদ দিলেও মহাদেব সাহাকে চেনার জন্য বইটি পড়া যেতে পারে, মন্দ সময় কাটবে না।