অন্যদের কথা বাদ, নিজের কথা বলি। এই শতকের শুরুর দিকের কথা। হুমায়ূন আহমেদ অপসাহিত্য রচনা করেন এবং তার লেখায় সার পদার্থ কিছুই নেই এ কথা সর্বমহলে চাউর হয়ে গেছে। নিকৃষ্টমানের পাঠক বোঝাতে "হুমায়ূন মিলনের পাঠক" কথাটা প্রচলিত ছিলো।সে সময় হুমায়ূন এর লেখা পড়লেও বুক ফুলিয়ে বলার বিন্দুমাত্র সুযোগ ছিলো না। এসব অপপ্রচারের সবটাই কিন্তু "অপ" ছিলো না।লেখক নিজে অনেকটা দায়ী ছিলেন এমন ভাবমূর্তি গড়ে ওঠার পেছনে। অজস্র আজেবাজে লেখা লিখেছেন তিনি। একসময় তার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলাম। তার ছোটগল্প, মিসির আলীর "বৃহন্নলা" বা "আমি এবং আমরা" পড়ে হঠাৎ টনক নড়ে।আরে! হুমায়ূন এগুলোও লিখতেন নাকি?!!
খুঁজে খুঁজে তার সব লেখা পড়তে শুরু করলাম। লেখক মারা গেলেন।তার রচিত সাহিত্যকে তার মৃত্যুর পরও "তরল, অপসাহিত্য, মূল্যহীন, ছাইপাঁশ " বলে প্রায় সবাই দায় এড়িয়ে গেলেন। আরেকদল স্তুতিকারী হুমায়ূনকে প্রায় দেবতা বানিয়ে ফেললেন। গঠনমূলক আলোচনার বাইরেই রয়ে গেলো তার সাহিত্য। এই পরিস্থিতিতে মোহাম্মদ আজম লিখেছেন "হুমায়ূন আহমেদ পাঠপদ্ধতি ও তাৎপর্য "।হুমায়ূন সাহিত্যের মূল প্রবণতাগুলো শনাক্ত করেছেন লেখক।কোনো প্রতিষ্ঠিত বর্গের বাইরে থেকে হুমায়ূন কীভাবে গল্প লিখতেন, খুব অল্প কথায় সংলাপের মাধ্যমে কীভাবে গল্পের পরিবেশ ও পরিস্থিতি সৃষ্টি করতেন তিনি সে বিষয়ক আলোচনা অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ হুমায়ূন এর ক্যানভাসে যেভাবে ধরা পড়েছে, তার লেখার মওলানা চরিত্র, নারী চরিত্রদের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা, ভাটি অঞ্চলকে জীবন্তভাবে উপস্থাপনের অধ্যায়গুলো অসাধারণ। হুমায়ূন এর লেখা আমার অত্যন্ত প্রিয় দুটি উপন্যাস "প্রিয়তমেষু " আর "এই বসন্তে" -এর লাইন ধরে ধরে মোহাম্মদ আজম যেভাবে ঘটনার সার্বিক পরিবেশ আর চরিত্রদের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব বিশ্লেষণ করেছেন তা এককথায় অনবদ্য( আমার মতো গুডরিডস এর শৌখিন রিভিউদাতাদের জন্য বইটা অবশ্যপাঠ্য।)
"হুমায়ূন আহমেদ পাঠপদ্ধতি ও তাৎপর্য" হুমায়ূন এর সেরা লেখাগুলোর মতোই সুখপাঠ্য ও অন্তর্ভেদী। খুব আনন্দ নিয়ে পড়েছি। মোহাম্মদ আজমের সব বক্তব্যের সাথে একমত হতে পারিনি, হওয়া সম্ভবও নয়। কিন্তু তিনি হুমায়ূন কে নিয়ে সিরিয়াস সমালোচনা সাহিত্য রচনা করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ সম্পাদন করেছেন। হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে চরম নিন্দা বা পরম স্তুতির বদলে এমন গঠনমূলক সাহিত্য রচনা হওয়া আরো প্রয়োজন।
হুমায়ুন আহমেদ কে নিয়ে লেখা এই বই হুমায়ন আহমেদের লেখার মতোই সুখপাঠ্য। হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে নানান ছ্যাবলামি হয়।হয় দেবতা নয় অসুর এমন স্টেরিওটাইপ থেকে বেরিয়ে হুমায়ুন আহমেদের সাহিত্য কর্মের সেরিয়াস আলোচনার শুরু করায় মোহাম্মদ আজম সাহেব কে ধন্যবাদ। সব কথার সাথে একমত না হলেও, আজম সাহেবের বিশ্লেষণ পদ্ধতি মুগ্ধ করবার মতো।তাঁর লেখা প্রাঞ্জল কিন্তু যুক্তিসম্মত। বঙ্গদেশে সুস্থ হুমায়ুন চর্চার প্রথম পদক্ষেপ বলা যেতে পারে উক্ত গ্রন্থ কে। হুমায়ুন সাহিত্য নিয়ে হোক কলরব, পুনরায়!
বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ একটি বহুলপঠিত এবং জনপ্রিয় নাম। হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তা প্রায় প্রবাদপ্রতিম। দুই বাংলাতেই তাঁর অনেক জনপ্রিয়তা রয়েছে এখনো। কিন্তু, কেবল একজন জনপ্রিয় লেখকই কি তিনি? জনপ্রিয় মানেই সস্তা, এমন একটা ধারণা অনেকের মধ্যে আছে৷ যে সাহিত্য সাধারণে বুঝে না, সেটাই সেরা কিংবা গভীর এমন একটা ধারণাও অনেকের মধ্যে প্রচলিত আছে। আবার হুমায়ূন এর সাহিত্যের বাড়া কিছু নেই, এমন দাবিও করে থাকেন তাঁর পাঁড় ভক্ত কেউ কেউ। এইসব নানান প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য হুমায়ূন সাহিত্য নিয়ে যে বিশ্লেষণ কিংবা গভীর পাঠ দরকার, সেটারই আসলে খুব অভাব ছিল এতদিন। দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো কিংবা হুমায়ূনকে আকাশে তোলা বা মাটিতে নামানো এরকম কোন কিছুই এই বইয়ের উদ্দেশ্য বলে আমার মনে হয়নি। লেখক চেয়েছেন হুমায়ূন এবং তাঁর রচনার একটা তাৎপর্যপূর্ণ মূল্যায়ন। আর সেইদিক থেকেই মোহাম্মদ আজম রচিত এই বইটি একটা গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন আধুনিক বাংলা সাহিত্যে। হুমায়ূনীয় রীতি অনুকরণ করে পরবর্তীতে অনেক লেখকই লিখতে চেয়েছেন। কিন্তু তাঁরা হুমায়ূনের ধারেকাছে যেতে পারেননি। আপাতদৃষ্টিতে সাবলীল এবং সরল ভাষার ব্যবহারকারী হুমায়ূন এর বিশেষত্বটা তাহলে কোথায়? সেটারই উত্তর খুঁজেছেন লেখক। ঢাকাভিত্তিক মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবন অঙ্কনে হুমায়ূনের প্রতিভা ছিল বিরল। একই সাথে একটা নিজস্ব দর্শন ছিল তাঁর গ্রামবাংলাকে দেখার। হুমায়ূনের ভাষা অত্যন্ত সরেস, তাই খুব বেশি না ভেবেও লেখাগুলো পড়ে ফেলা যায়, যা তাঁর জনপ্রিয়তার মূল কারণ বলেই আমার মনে হয়। কিন্তু গল্পের ভেতর আরো কিছু তিনি বলতে চেয়েছেন কিনা, এবং তাঁর দর্শন যে তিনি ছড়িয়ে গেছেন খুব সূক্ষ্ণভাবে সেটা বোঝার জন্যই পাঠপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বইটির লেখক বেশ কিছু স্বল্প আলোচিত উপন্যাস যেমন ফেরা, এই বসন্তে ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে এর বিশেষত্বটুকু উদঘাটন করতে চেয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। আলোচনা রয়েছে সেগুলো নিয়েও। এছাড়াও চলচ্চিত্র এবং উপন্যাস-এই দুইয়ের সাযুজ্য এবং রূপান্তর, সেগুলোর সার্থকতা এ নিয়েও বেশ দীর্ঘ আলোচনা করেছেন তিনি। কিছু জায়গায় পুনরাবৃত্তি রয়েছে, না থাকলে আরো ভালো লাগত। হুমায়ূন মানসে নারীজীবন, সংযোজনের এই দ্বিতীয় প্রবন্ধটি আমার আলাদা করে নজর কেড়েছে। হুমায়ূন পড়ার সময় আমি বারবারই এই বিষয়টিতে একজন মানুষ এবং নারী হিসেবে অস্বস্তি বোধ করেছি। লেখকের সাথে ভাবনাটা মিলে যাওয়ায় ভালো লাগল। হুমায়ূন আহমেদ আমাদের একজন গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক। তাঁর বই নিয়ে সস্তা আবেগের চাইতে এরকম মূল্যবান আলোচনা এবং সমালোচনা আরো হওয়া উচিত বলেই মনে করি আমি। তাহলেই আমাদের সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের সঠিক এবং শক্ত স্থান নির্ধারিত হবে যা হয়তো টিকে থাকবে যুগের পর যুগ।