একের পর এক দুর্ঘটনা কি নেহাৎ দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে অন্য কারো হাত আছে? স্যোমদ্যুতি কে? ভৈরবের সাধনা শেষ অবধি সফল হল? এমন নানান প্রশ্ন নিয়ে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে শিহরণ জাগানো থ্রিলার, অসামান্য রহস্য উপন্যাস। যৌথ কলমে দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য, অরিন্দম দেবনাথ, রাজীবকুমার সাহা, পুষ্পেন মণ্ডল, সুদীপ চ্যাটার্জি, কিশোর ঘোষাল।
তন্ত্র নিয়ে এই মুহূর্তে বাংলায় যে পরিমাণে লেখালেখি হচ্ছে তা আক্ষরিক অর্থেই অভূতপূর্ব। কিছুটা সেই ধারায়, আর কিছুটা আধুনিক টেকনো-থ্রিলারের ধাঁচে লেখা হয়েছে এই যৌথ উপন্যাসটি। এর ঘটনাক্রম শুরু হয় ব্রহ্মপুত্রের বুকে এক ভয়াবহ নাশকতা দিয়ে। শেষও হয় তার কাছের এক বিন্দুতে। মাঝের যাত্রাপথটুকু, বিশেষত তার স্তরে-স্তরে উন্মোচিত নানা রহস্য আর অ্যাকশন— এই নিয়েই গড়ে উঠেছে উপন্যাসটি।
এই উপন্যাসের ভালো দিক কী? প্রথমত, খুব যত্ন নিয়ে টিমওয়ার্ক করে লেখা হয়েছে এটি। ফলে উপন্যাসের কোনো স্তরেই মনে হয়নি যে সম্পূর্ণ অন্য কারও অন্য কোনো লেখা পড়ছি। হ্যাঁ, চরিত্রায়নে সামান্য বদল হয়েছে কোথাও-কোথাও। কিন্তু প্রথম অধ্যায়ের প্রাক্ -কথন থেকে ত্রয়োদশ অধ্যায়ের উপসংহার— এই সম্পূর্ণ পর্যায়টি যে একটিই লেখার নানা অংশ, তা ছাড়া অন্য কিছু ভাবার অবকাশই পাইনি এখানে। সুধী পাঠকেরা জানেন, সাম্প্রতিক কালে একটি বৃহৎ প্রকাশনার উদ্যোগে প্রকাশিত এমন দু'টি যৌথ উপন্যাস এই নিরিখে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। সেজন্যই এই বিশেষ প্রয়াসটি আমার খুব ভালো লাগল। দ্বিতীয়ত, কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে একটি অলীক বিশ্বাস এবং একটি অপবিজ্ঞান। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, লেখাটা সাজানোয় কিন্তু গাঁজাখুরি এলোমেলো ভাবনার লেশমাত্র পাইনি— যেমনটা থাকে হালের "ধর তন্ত্র মার পাঠক" বেস্টসেলারগুলোতে। কঠোর যুক্তির শৃঙ্খলায় বদ্ধ হয়েছে বলেই পিশাচের লাফালাফি বা কাটামুন্ডুর অট্টহাসির বদলে এই উপন্যাসে পেয়েছি রাজনীতি, বিশ্বাস এবং সন্ত্রাস মিলিয়ে লেখা একটি থ্রিলার। তৃতীয়ত, এতে যৌনতার বাড়াবাড়ি না থাকলেও বিষয়ানুগ প্রাপ্তমনস্ক উপাদান রয়েছে যথাযথ মাত্রায়। সবক'জন লেখক এই বিষয়টি সমান দক্ষতায় সামলাতে পারেননি। তাই কেউ এটি এড়িয়েই গেছেন। আবার কেউ ভালোবাসাকেই করেছেন সেই অধ্যায়ের চালিকা শক্তি। তবে এটা যে 'বড়োদের' লেখা— তা সুচারুভাবেই বোঝানো হয়েছে।
এই উপন্যাসের খারাপ দিক কী? ১) শেষ অধ্যায়টা সবকিছু মেলাতে গিয়ে বড়ো তাড়াহুড়ো করে ফেলল। নাম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ওখানে কিছু অংশ গুলিয়ে গেছে। ওই অধ্যায় আরেকটু বড়ো করে, আরও ধীরে রহস্যের উন্মোচন ঘটালে, সর্বোপরি অপবিজ্ঞান বাদ দিয়ে অ্যাকশনটা দেখালে সবচেয়ে ভালো লাগত। ২) যুক্তি আর প্রযুক্তি নিয়েই এগোচ্ছিলেন আমাদের প্রটাগনিস্টরা। এক উইজ-কিডের হাত ধরে আমরাও সেই অনুসন্ধানে অংশ নিচ্ছিলাম। সেই কাহিনিতে হঠাৎ ডেউস এক্স মাখিনা স্টাইলে একটি অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন চরিত্রকে আমদানি করা এবং তাঁকে দিয়ে নানা অং-বং করানো— এ একেবারেই ভালো লাগেনি। ৩) উদ্ভিদবিজ্ঞান ও অমরত্বের বৈজ্ঞানিক ভিত্তিটি নিয়ে আরেকটু আলোচনা প্রত্যাশিত ছিল।
তবু বলব, এ একেবারে সলিড টানটান থ্রিলার। এর কাল্ট তথা অকাল্ট ব্যাপার উপেক্ষা করেও একে উপভোগ করা যায়। এটিই এই যৌথ উপন্যাসের সার্থকতা। সুযোগ পেলেই পড়ে ফেলুন!
দুই বিপরীত মেরু, প্রযুক্তি ও তন্ত্রের এক ভয়াল দ্বৈরথ..ব্রহ্মপুত্রের বুকে... "- বিশ্বাস করবেন কি? যদি বলি আমি নিজেই একজন অঘোরপন্থী সাধক ? -দুঃখিত। কথাটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আপনি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী। সে ক্ষেত্রে আপনি কেমন করে...... " যুগ বদলে নতুন মানুষ, নতুন আলো এলেও সেই আলোর তলাতেই থাকে অন্ধকার। -- কখনো খনি দুর্ঘটনা, কখনো নৌকাডুবি, কখনো ট্রেনক্র্যাশ... নিছকই কিছু মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নাকি লোকচক্ষুর আড়ালে অভিনীত হয়ে চলেছে কোনো শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহাসিক চক্রান্ত?? গণহত্যা নাকি নরবলি?? -- মাইকোহেটেরোট্রফিক গোত্রের অনেক উদ্ভিদই পুষ্টির জন্য অন্য প্রাণীর উপর নির্ভরশীল। কিন্তু মৃতভোজী অর্কিড হওয়া কি সম্ভব?? আর হলেও তার সাথে দুর্ঘটনাগুলির কি সম্পর্ক?? -- ফেসবুক... বন্ধু খুঁজে পাওয়ার জায়গা। সমমনস্ক মানুষের সাথে আলোচনা ও আড্ডার ঠেক। কিন্তু এখানেও পাতা অজস্র ফাঁদ।
কি মনে হচ্ছে?? কোনো খিচুড়ি?? সাধারণত এত সব বিষয় এবং ৭ ভিন্ন লেখনী থাকলে খিচুড়ি হওয়ার ভয় থাকেই। কিন্তু দক্ষ ৭ কলমের ধারে কোনো সামান্য অলৌকিক তান্ত্রিক কাহিনী নয় এই যৌথ উপন্যাস। চিরস্থায়ী, অতিপ্রাকৃত অন্ধকারের জগতে টেনে নিয়ে যাওয়া এক রোমাঞ্চকর আখ্যান, যেখানে দুই বিপরীত মেরু, প্রযুক্তি আর তন্ত্রের অনুগামীরা মুখোমুখি হবে এক বিধ্বংসী যুদ্ধে।
একবছর আগে প্রকাশিত এই যৌথ উপন্যাসের খোঁজ আমি ফেসবুকের সাজেশন থেকেই পাই। সাধারণত আমার অলৌকিকের প্রতি ইন্টারেস্ট থেকেই বইটি অর্ডার করি এবং পড়ার পর বুঝতে পারি যে কোন সাধারণ অলৌকিক কাহিনী এটি নয়। শুধু গল্প পড়ার মতো নয় রীতিমতো প্রত্যেকটি শব্দ বুঝে না পড়লে এই উপন্যাসের আসল স্বাদ থেকে বঞ্চিতই থাকতে হয়। শুধু তন্ত্র নয় প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব....সবকিছুই যথাযথ পরিমাণে রয়েছে এই মিশ্রণে। কোন বইয়ের রিভিউ লেখার সাধ্য আমার নেই শুধুমাত্র ধন্যবাদ জানাতে চাই এই ৭ দক্ষ কলমের আধিকারিক লেখককে এবং জয়ঢাক প্রকাশনীকে। অঘোরী (যৌথ উপন্যাস) কলমেঃ দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য, অরিন্দম দেবনাথ, কৃষ্ণেন্দু দেব, পুষ্পেন মণ্ডল, সুদীপ চ্যাটার্জী, কিশোর ঘোষাল ও রাজীবকুমার সাহা জয়ঢাক প্রকাশন