লেখকের অদ্বিতীয় রচনা 'সাংস্কৃতিকী'-র পরিপূরক হিসেবেই পাঠ্য এই শীর্ণকায় বইটিতে নিম্নলিখিত ক'টি প্রবন্ধ আছে~ ১. জাতি, সংস্কৃতি ও সাহিত্য; ২. বাঙ্গালীর ইতিবৃত্ত: জাতি গঠনে; ৩. গৌড়বঙ্গ; ৪. প্রাচীন বঙ্গের পুষ্করণা-জনপদ; ৫. পরিচ্ছদের ইতিহাস আলোচনা; ৬. শত বৎসর পূর্বেকার বাঙ্গালী জীবনের ছবি; * রঙিন চিত্রসূচি: যাদের উল্লেখ ষষ্ঠ অধ্যায়ে করা হয়েছিল। সংক্ষিপ্ত পরিসরেও এই লেখাগুলো ইতিহাসচেতনা এবং গভীর গবেষণার ফল ধরে রেখেছে— সেও একেবারে সহজ ভাষায়, সাধারণ পাঠকের উপযোগী আকারেই। বঙ্গমনীষার অসামান্য নিদর্শন এই বইটি এপার বাংলায় এখন আদৌ পাওয়া যায় কি না, তা জানি না। ওপারে কবি প্রকাশনী বইটিকে হার্ডকভারে ছেপেছেন অবশ্য। এই ধরনের বহু অমূল্য রতন দীর্ঘদিন অমুদ্রিত থাকার ফলে যাতে আমাদের মনন ও চিন্তন থেকে একেবারেই হারিয়ে না যায়, সে-জন্য প্রকাশকেরা উদ্যোগী না হলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। ইতিমধ্যে, যদি কোনোভাবে এই ছোট্ট বইটি জোগাড় করতে পারেন, তা হলে অতি অবশ্যই সেটিকে পড়বেন। এইসব বই পড়া না হলে আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনা সম্পূর্ণ হওয়া তো দূরের কথা, আদৌ গড়ে ওঠে কি না সেই নিয়েই সংশয় থেকে যায়।
যে জন গোষ্ঠী বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষা রুপে বা ঘরের ভাষা রূপে ব্যবহার করে সেই জনসমষ্টিই 'বাঙ্গালী জাতি'। সহস্র বছর আগে থেকে, প্রাচীন ও মধ্য যুগের ভারতের ভাবধারায় বাঙ্গলা দেশ, বাঙ্গালী ভাষাভাষী জনসমষ্টি এদেশের জলবায়ুতে দেশের উপযোগী বিশেষ জীবন যাত্রার পদ্ধতি অবলম্বন করে আসছে এবং এদেশের সংস্কৃতি বহন করে চলেছে।
সংস্কৃতি যে কোন সমাজ বা জাতির একটি প্রতিফলন। একটা জাতি চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে তার সংস্কৃতির বিলুপ্তি ঘটলে। সংস্কৃতি একটি জাতির ধারক ও বাহক।
সমাজতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব ও ভাষাতত্ত্ববিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ' বাঙ্গালী সংস্কৃতি ' বইটাতে শুধু আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করেন নাই, তিনি বাঙালি জাতি তাদের সংস্কৃতি ও সাহিত্যের সাথে সাথে বাঙালির ইতিহাস ও জাতি গঠন, প্রাচীন বঙ্গদেশ ও জনপদ নিয়ে আলোচনার সাথে সাথে আলোচনা করেছেন শত বৎসরের বাঙালি জীবনের ছবি নিয়ে। সাথে দেওয়া আছে রঙিন বেশ কিছু ছবি। যেহেতু প্রবন্ধ তাই প্রথম দিকে একটু কঠিন মনে হলেও প্রতিটি বিষয়ে সহজ করে লেখা। চমৎকার একটা বই তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
সংস্কৃতি সমাজের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যভাবে বলা যায় সংস্কৃতি হলো সমাজের একটি প্রতিফলন। সংস্কৃতি বিলুপ্ত হলে হারিয়ে হয়ে যেতে পারে একটি জাতি। সংস্কৃতি না থাকার ফলে মৃত্যু হতে পারে একটা দেশেরও। বর্তমানে বাংলা ভাষাভাষী জনসংখ্যার অস্তিত্ব আছে, কিন্তু সর্বজনীন বাঙালি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি খুঁজে পাওয়া যায় না। সাংস্কৃতিক সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য, এইসব বই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ পাঠকদের জন্য উপযুক্ত ভাবে সরল ভাষায় উপস্থাপিত এই বই এককথায় অবশ্যপাঠ্য।