দ্রুত স্ফীতমান নগর শুধু পরিধির দরিদ্রজনের ধানী জমিই গিলে ফেলছে না, তার সর্বগ্রাসী ক্ষুধার আগুনে দগ্ধ হচ্ছে নিম্নবিত্ত জীবনের স্বপ্ন-সাধ ভালোবাসা। ঢাকার উপকণ্ঠে নতুন আবাসভূমি গড়ে ওঠার পটভূমিকায় এ উপন্যাসের নির্বিবাদী নায়ক আবুল কালাম নিজেকে হঠাৎ আবিস্কার করে সকল লোভ-লালসা, শঠতা-নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি। বিশাল ক্যানভাসে অজস্র চরিত্রের মানবিক আবেগ-অনুভূতির দ্বন্ধ-মুখরতার ভেতর দিয়ে আমরা পেয়ে যাই সমকালীন বাস্তবতার অনুপম প্রতিচ্ছবি।
ঔপন্যাসিক মঞ্জু সরকার তাঁর তীক্ষ্ম জীবনদৃষ্টি, দরদি অথচ নির্মোহ মন ও গভীর শিল্পবোধের আরেক পরিচয় মেলে ধরেছেন 'আবাসভূমি' উপন্যাসে, যোগ করেছেন তাঁর সৃজনশীলতার নতুন মাত্রা।
১১৫ পৃষ্টার 'আবাসভূমি' ১৯৯৪ সালে সেরা কথাসাহিত্য হিসেবে ফিলিপস পুরস্কার লাভ করে। পরবর্তীতে উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ড রচিত হয় এবং 'প্লাবন' নামে তা প্রকাশিত হয়। বর্তমান পরিবর্তিত 'আবাসভূমি' উভয় খণ্ডের একত্রিত ও পরিমার্জিত রূপ।
মঞ্জু সরকার (Manju Sarkar) বাংলাদেশের বিশিষ্ট কথাশিল্পী, গল্পকার ও উপন্যাসিক। মঞ্জু সরকারের জন্ম ১ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৩, রংপুরে। একাডেমিক শিক্ষা রংপুরের কৈলাশ রঞ্জন হাই স্কুল ও কারমাইকেল কলেজে। পেশাগত জীবনে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের প্রকাশনা কর্মকর্তা হিসেবে স্বেচ্ছা অবসর গ্রহণের পর, দৈনিক আমার দেশ এবং দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে দশ বছর সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে স্বাধীন ও সার্বক্ষণিক লেখক। গল্প, উপন্যাস ছাড়াও বেশ কিছু শিশু-কিশোর গ্রন্থের প্রণেতা। এ যাবত প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা অর্ধ শতাধিক। কথাসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন বাংলা একাডেমি, ফিলিপস, আলাওল, বগুড়া লেখক চক্র ও ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার। শিশু-কিশোর গ্রন্থের জন্য পেয়েছেন অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার। ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রাম’-এর অনারারি ফেলোশিপ প্রাপ্তি উপলক্ষে তিনমাস রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: অবিনাশী আয়োজন, উচ্ছেদ উচ্ছেদ খেলা, রূপান্তরের গল্পগাথা, মঙ্গকালের মানুষ, তমস, নগ্ন আগন্তুক, প্রতিমা উপাখ্যান।
শুরু থেকেই উপন্যাস হিসেবে "আবাসভূমি" খুব একটা ভালো লাগছিলো না। এটা যেহেতু লেখক মঞ্জু সরকারের ছদ্ম আত্মজীবনী, তাই উপন্যাসের চিন্তা বাদ দিয়ে শুধু আত্মজীবনী হিসেবেই পড়লাম। বইয়ের প্লট গড়ে উঠেছে গ্রামে যেয়ে লেখকের বাড়ি করা আর সেখানে ঘটা নানান প্রতিকূল ঘটনাকে ঘিরে। ঘটনার সময়কাল বিগত শতাব্দীর সত্তর ও আশির দশক। বদ্ধ গ্রামব্যবস্থা শিল্পায়নের চাপে কীভাবে উন্মুক্ত হয়ে গেলো, মানুষজন জমি কিনে গ্রামে যেয়ে বসতি স্থাপন করায় সেখানের পুরো সামাজিক সংগঠন কীভাবে পরিবর্তিত হোলো, কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা কীভাবে ধীরে ধীরে শিল্পভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তিত হোলো (বা হচ্ছে), কালো টাকার মালিকরা কীভাবে টাকার জোরে সমাজের দখল নিয়ে নিলো, মূল্যবোধের অবক্ষয় কীভাবে সূচিত হোলো "আবাসভূমি " তার এক জীবন্ত দলিল (সমাজকর্মের ছাত্র হওয়ায় এসব নিয়ে আমার আগ্রহ এমনিতেই বেশি।) লেখক যেহেতু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে লিখেছেন, তাই সেটা বিশ্বস্ত হয়ে উঠেছে। নায়ক কালাম (আদতে লেখক) ছাপোষা মধ্যবিত্ত। সে বিপদ এড়াতে চায়, সমঝোতা করে চলতে চায়, হঠাৎ হঠাৎ জ্বলে উঠলেও সময়মতো নিভে যায়, স্বপ্ন দেখতে চায় আর নিজের নিয়তি প্রায় নির্বিবাদে মেনে নেয়। বিবাহিত পুরুষের বিবাহ বহির্ভূত স্বাভাবিক যৌনচিন্তা ও ফ্যান্টাসিও লেখক সহজভাবে তুলে ধরেছেন। কেউ "আবাসভূমি" পড়লে তার প্রতি পরামর্শ থাকবে বইটা উপন্যাস হিসেবে না পড়ে আত্মজীবনী বা স্মৃতিগদ্য হিসেবে পড়তে।
জীবনযাপনের সাধারণ, স্বাভাবিক ও অতি চেনা বয়ান। পড়ার সময় বারবার মনে হচ্ছিল, এ আখ্যান সত্যি না হয়ে যায় না! অনেক পরে জানতে পেরেছিলাম লেখক নিজের জীবনের একটি অধ্যায়কেই বইয়ের পাতায় তুলে ধরেছেন। আর তা রাখঢাক ছাড়া অনাড়ম্বরভাবে। সবমিলিয়ে আহামরি কিছু না হলেও ‘আবাসভূমি’র পাঠানুভূতি স্মরনীয় হয়ে আছে পাঠের আজ প্রায় তিন বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও।
শহর বিস্তৃত হওয়ার গল্প। শহর বিস্তৃত হওয়ার সময় এক ছাপোষা মানুষের নিজের ঘর বানানোর স্বপ্ন। সেখানে কত রকম বাধা, চক্রান্ত, মানুষের লোভ ও অপরকে উৎখাত করার গল্প। অসাধারণ কিছু না। কোনো ঈদ সংখ্যার উপন্যাস হলে মানিয়ে যেতো। হয়ত তেমনই ছিল। তবে শহর সম্প্রসারনের প্রেক্ষাপটটা ভালো।
সরকারি অফিসের কেরানি নিম্নমধ্যবিত্ত কালাম ও তার পরিবার ঢাকায় খরচে কুলিয়ে উঠতে না পেরে জমানো কিছু টাকা এবং ধারের টাকা দিয়ে ঢাকার কাছেই একগ্রামে জায়গা কিনে বাড়ি করে। সেই বাড়িতে ওঠার পরই শুরু হয় যত বিপত্তি।দালাল,স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা,অশিক্ষিত,হিংসুটে প্রতিবেশি আর অভাব সব মিলিয়ে বিষিয়ে দেয় তাদের জীবন এবং নিজের বাড়িতে থাকার স্বপ্ন। সাবলীল ভাষায় লেখা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জীবন সংগ্রামের নিত্য কাহিনী।