কেমন হয় তাদের চাওয়া, যাদের হারানোর কিছু নেই? এমনই তিন ড্রাইভার আশকার, জিনারুল আর মজিদ- যারা জীবন থেকে ছিনিয়ে নেওয়া আর জীবন থেকে ভিক্ষা পাওয়ার দোলাচালে ভুগতে ভুগতে জড়িয়ে যায় এক একটা অদ্ভুত অপরাধে। যেই অপরাধ পরোক্ষভাবে প্রকাশ করে দিতে পারে এক রাষ্ট্রীয় ক্ষত, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের এক প্রাচীন হুমকি। এক কাদা মাখা পদচ্ছাপ খুঁজতে খুঁজতে স্ফিয়েতাও নেমে পড়ে এই চোরাবালিতে। সব পদচ্ছাপ এসে মিলিত হয় এক 'প্রাচীন বড় গাছের' নিচে। এই ত্রিভুজের তিন কোণের যেখানে সমাপ্তি সেখানেই শুরু ম্যাডাম পার্সিফোনির গর্ব মাখানো চিতকার- এই উপমহাদেশে আমরা তাই আনবো যা আজ থেকে তিন হাজার বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা আনতে পারেনি। যেন জগ স পাজলের এক একটা খন্ডাংশ জোড়া লাগানোর তোড়জোড়, কিন্তু কেন? এই ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি প্রকৃতপক্ষে এক বিরাটাকার ষড়ভুজের ভগ্নাংশ মাত্র।
তিনজন প্রান্তিক গোছের মানুষ। দুজন ড্রাইভার আরেকজন হেলপার। তিনজনই মেসে একই রুমে থাকে। লোভে পড়ে ড্রাগের ডেলিভারি দেয়া শুরু করল দুজন। জড়িয়ে পড়ল কাঁচা টাকার নেশায়। কিন্তু লোভে পাপ পাপে মৃত্যু। মৃত্যুর হাত থেকে বাচলেও জড়িয়ে গেল আরেক গ্যাঞ্জামে, এবার যোগ দিল তৃতীয়জনও। কিন্তু মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মত হঠাৎ-ই অর্থপ্রাপ্তি হল ওদের। লোভে পড়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠল তিনজন। কি লেখা আছে ওদের কপালে? কোথায় গিয়ে থামবে ওরা?
সুলেখক জুবায়ের আলমের নতুন বই ত্রিভুজের তিন কোনের সমষ্টি। পড়ে শেষ করলাম কেবল। তিনজন বন্ধুর লোভ-লালসার আখ্যান এই বইটা। বেশ দ্রুতগতির কাহিনী। লেখনশৈলী বরাবরের মতই ঝরঝরে। জুবায়ের আলমের যে জিনিসটা আমার ভালো লাগে সেটা হল শূন্য থেকে কাহিনীর সৃষ্টি করে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, সেইসাথে সাসপেন্স বজায় রাখা। এই বইয়েও সেটাই করেছেন তিনি। আরেকটা ব্যাপার, গল্পের মাঝখানে মূল চরিত্রদের ডেভেলপ প্লাস পরিণতি দেখানো। এটা পাঠকদের জন্য দারুণ একটা ব্যাপার। এবার কাহিনীর ব্যাপারে আসি, কাহিনী আহামরি কিছুই মনে হয়নি। সাদামাটা একটা গল্প, তিনজন বন্ধুর টাকা পয়সা, নারী, জাগতিক লোভ এগুলোর পিছনে দৌড়ে বেড়ানো, এই-ই কাহিনী। কাহিনীটা বিশেষ হয়ে উঠেছে লেখনশৈলী, ছোটছোট অধ্যায়ভিত্তিক সাসপেন্স আর লেখকের স্বাভাবিক রসবোধের কারণে। কোনো টুইস্ট নাই, পরিণতি জানাই ছিল। উল্টো শেষটা ধোঁয়াশা(সিক্যুয়েলের আভাস)। বইটা পুরোটা সময়-ই উপভোগ করবেন পাঠকরা। এবার নেগেটিভ কথা বলি, পুরো বইয়ে-ই নাম বিভ্রাট লক্ষ করেছি। বিশেষ করে ১১ নম্বর অধ্যায়ে পুরোটাতে নাম বিভ্রাট (আশকার হয়ে গেছে জিনারুল, জিনারুল হয়ে গেছে আশকার)। এছাড়াও বেশকিছু বানানভুল ছিল-ই। এডিটের সময় খেয়াল রাখা উচিত ছিল এসব।
ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি জুবায়ের আলম বুকস্ট্রিট পৃষ্টা: ২০৬
রেটিং তিন দশমিক পাঁচ। বর্তমানে দেশীয় থ্রিলার লেখকদের মধ্যে অল্প যে ক'জনের লেখায় চমৎকার ভাষাশৈলী ও শব্দচয়ন লক্ষ করা যায়, জুবায়ের আলম তাদের মধ্যে অন্যতম। 'ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি'তেও সেই পরিপক্কতার ছাপ দৃশ্যমান। তবে 'শব্দযাত্রা লেখক সংঘ' কিংবা 'প্রায়শ্চিত্ত প্রকল্প'র তুলনায় তার এই তৃতীয় উপন্যাস কিছুটা পিছিয়ে থাকবে সাদামাটা স্টোরিলাইনের জন্য কিংবা উল্লেখযোগ্য প্লট সিকোয়েন্সের অভাবে। আর শেষের দিকে একটু তাড়াহুড়োই করে ফেলেছেন লেখক। যাই হোক, জুবায়ের আলমের লেখা পড়ে হতাশ হইনি এখনো পর্যন্ত, ভবিষ্যতেও হতে হবে না আশা করি।
"Whatever can go wrong, will go wrong." - Murphy's Law - ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি - ঢাকা শহরের মেস বাড়ির এক রুমে থাকেন তিনজন মেসমেট আশকার, জিনারুল ও মজিদ। তাদের তিনজনই ড্রাইভিং পেশার সাথে যুক্ত। আশকার ট্রাক চালক আর জিনারুল প্রাইভেট কার চালক হলেও মজিদ ড্রাইভিং শিখছে। তিনজন মানুষই তাদের স্বপ্নের পথে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎই তাদের স্বপ্নপূরণের পথে এসে যায় এক বিরাট সুযোগ। আর সেই সুযোগ এর সদ্ব্যবহার করতে গিয়ে তারা তিনজনই পরে যায় বিপদে। এখন কি সেই সুযোগ আর কেনই বা তারা বিপদের মধ্যে পরে তা জানার জন্য পড়তে হবে লেখক জুবায়ের আলম এর ক্রাইম থ্রিলারধর্মী উপন্যাস "ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি"। - "ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি" লেখক জুবায়ের আলম এর লেখা তৃতীয় উপন্যাস। লেখকের এর আগের দুইটি উপন্যাস পড়া থাকায় বইটির ব্যাপারে একটু উচ্চাশা ছিল, সে হিসেবে বইটা শেষ করার পরে কিছুটা হতাশাজনক লাগলো। বইয়ের লেখনশৈলী লেখকের আগের বইয়ের মতোই, তবে বইয়ের প্লট একেবারেই ফ্লাট মনে হলো। মাঝে মধ্যে কিছু টুইস্ট সেটাকে খুব একটা আকর্ষণীয় করতে পারেনি। বরঞ্চ কাহিনির বেশ কিছু স্থানে তাড়াহুড়োর ছাপ ছিল স্পষ্ট।
"ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি" বইটির লেখার স্টাইলের কারণে পড়া গেলেও কোন চরিত্রই তেমন একটা মনে দাগ কাটতে পারেনি, হয়তো তাদের কৃতকর্মের জন্যই। বইয়ের সংলাপ এবং হিউমারের প্রয়োগ অবশ্য বেশ ভালোই লাগলো। প্রথম দিকে বইয়ের কাহিনি বেশ ইন্টারেস্টিং লাগলেও বইয়ের শেষভাগ একটু বেশিই সিনেম্যাটিক হয়ে গেছে, এতটা সিনেম্যাটিক এন্ডিং অন্তত আমি আশা করিনি। বইটিতে লেখকের আগের বই "প্রায়শ্চিত্ত প্রকল্প" এর কিছু এস্টার এগ ছিল, সেই হিসেবে বইটিকে "প্রায়শ্চিত্ত প্রকল্প" এর স্পিন অফ ও বলা যায়, যে ব্যাপারটি ভালো লেগেছে।
"ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি" বইয়ের টেকনিক্যাল দিকে তাকালে বইয়ের বাঁধাই, কাগজ ভালোই ছিলো। প্রচ্ছদও মোটামুটি চলনসই, খারাপ না। তবে বেশ কিছু বানান ভুল, প্রিন্টিং মিস্টেক আর চরিত্রের নাম অদল-বদল চোখে পড়লো। সবমিলিয়ে আরেকটু ভালোভাবে সম্পাদনা করা যেত হয়তো বইটিকে। সামনের সংস্করণ বের হলে প্রকাশনীটি এ দিক গুলোতে নজর দেবেন আশা করি।
এক কথায়, উপন্যাস হিসেবে "ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি" তে যে মানের গল্প আশা করেছিলাম তা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। লেখকের "প্রায়শ্চিত্ত প্রকল্প" এবং "শব্দযাত্রা লেখক সংঘ" পড়ার কারণে লেখকের ক্যাপাবিলিটি সম্পর্কে বেশ ভালোই ধারনা আছে। আশা করি লেখক সামনে "প্রায়শ্চিত্ত প্রকল্প" বা "শব্দযাত্রা লেখক সংঘ" এর মানের দুর্দান্ত কোন উপন্যাস পাঠকদের উপহার দিবেন।
বর্তমান সময়ে ৩ জনের লেখনী আমার অনেক ভালো লাগে তার মধ্যে একজন জুবায়ের আলম। প্রচারবিমুখী এই লেখকের সকল বই আমার কাছে আন্ডাররেটেড মনে হয়। গল্পটা তিনজন ড্রাইভারের,গল্পটা ব্যাস্ত শহরে নাম না জানা তিনজন মানুষের যারা একটু সুখের জন্য কাজ করে যায়। সৎভাবে সুখ পেতে গেলে অপেক্ষা করতে হবে যুগের পর যুগ কিন্তু অসৎ পথে সেটা পেতে বেশি দেরী হবে না। তারা কি পারবে শেষ পর্যন্ত সুখী হতে? সেই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য বইটা পড়তে হবে। সাদামাটা প্লট দারুণ লেখনীতে ফুটে উঠেছে। ছিলো না মাথা ঘুরানো কোনো টুইস্ট ছিলো না সেখানে আছে দুঃখ,বিষাদ, বিশ্বাসঘাতকতার আখ্যান। ভালো লেগেছে পড়ে বইটা।
It's like dominions effect, falling on and on until the end. Care for characters is very evident. For over the top drama during the end cutting a star. But, different region's voice used with efficiency. I would have reduced swears. But, they were relatable mostly.
Plot is small, but storytelling keeps it going nicely. A suspense thriller well done.
কাহিনি সংক্ষেপঃ আশকার, জিনারুল ও মজিদ তিনজনই মনমোহন মেসের এক রুমের বাসিন্দা। আশকার একজন ট্রাকচালক, জিনারুল চালায় এক ব্যাঙ্ক কর্মকর্তার গাড়ি আর মজিদ এখনো ড্রাইভারি শিখছে। সাদাসিধে এই তিনজন মানুষের জীবন বদলে যেতে শুরু করলো যখন আশকার আর মজিদ রহস্যময়ী ম্যাডাম পার্সিফোনির একটা কাজ হাতে নিলো। টুকটাক ড্রাগ ট্রান্সপোর্ট আশকার আগেও করেছে। কিন্তু এবারের যাত্রায় আশকার আর মজিদ পড়ে গেলো ভয়াবহ বিপদে। আর এই বিপদ জিনারুলকেও ছাড়লো না।
প্রায় বিশ লাখ টাকা আর মানুষের খণ্ডবিখণ্ড শরীর দিয়ে ভর্তি একটা বস্তা আশকার, জিনারুল আর মজিদকে ওদের চিরাচরিত সাধারণ জীবনের বাইরে এক অন্য জীবনকে দেখালো। লোভে পাপ, আর পাপে শান্তি। সর্বগ্রাসী লোভ এই ত্রিমূর্তিকে একের পর এক অপরাধের সাথে জড়িয়ে ফেলতে শুরু করলো। খুন আর ডাকাতি যেন ওদের একদম পেছনেই ওঁত পেতে ছিলো।
ম্যাডাম পার্সিফোনির বাড়ির আয়নায় দেখা সাদা বটগাছের জলছাপ আসলে কিসের চিহ্ন বহন করছে? তাঁর ডানহাত লার্মিস পাগলের মতো খুঁজে চলেছে বিশ্বাসঘাতকদের। বারিধারার রহস্যময় এক বিল্ডিংয়ে আসলে কি চলছে? এমন কি সত্য লুকানো আছে যা প্রকাশ পেলে উন্মুক্ত হয়ে যাবে রাষ্ট্রের এক পুরোনো ক্ষতমুখ? সিআইডি অফিসার স্ফিয়েতাও নাছোড়বান্দা হয়ে গেছে অপরাধীদের পাকড়াও করার জন্য। তার ভাগ্যেই বা কি আছে?
ওদিকে জীবনের একমাত্র প্রেম সালেহাকে খুঁজতে দীর্ঘ পাঁচ বছর পর রাজশাহীতে গিয়ে কিসের মুখোমুখি হলো জিনারুল? ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবাকে ভালো করে তোলার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পথ চলছে মজিদ। আর মিডল ইস্টে থাকা নিজের প্রেমিকা লিলি'র বাহুডোরে বাঁধা পড়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে আশকার। এই ত্রিমূর্তির মনস্কামনা পূরণের জন্য চাই টাকা। অনেক টাকা। আর এই টাকাই টেনে আনলো সর্বনাশ।
লোভ, প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা আর গোপন এক সত্যের উপাখ্যানের শুরু বলা যায় 'ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি'-কে; যা একইসাথে একটা বিশালাকার ষড়ভুজের একটা অংশও।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ 'প্রায়শ্চিত্ত প্রকল্প' ও 'শব্দযাত্রা লেখক সংঘ' খ্যাত তরুণ লেখক জুবায়ের আলমের লেখা আমার ভালোই লাগে। কিন্তু যতোটা আশা নিয়ে তাঁর তৃতীয় উপন্যাস 'ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি' শুরু করেছিলাম, ততোটা আশা পূর্ণ হয়নি। লোভ থেকে পাপ, আর সেই পাপের ফলে সর্বনাশ - এটাই এই ক্রাইম থ্রিলারের মূল উপজীব্য। কাহিনির শুরুটা বেশ চমৎকার ছিলো। কিন্তু শেষটা খুব একটা ভালো লাগেনি আমার কাছে। হয়তো এই বইয়ের সিকুয়েল আসবে। উদিত হওয়া অনেক প্রশ্নের উত্তর হয়তো সেখানে পাওয়া যাবে। যেহেতু লেখক নিজেই বলেছেন 'ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি' মূলত একটা বিশালাকার ষড়ভুজের অংশ। তাই আশায় থাকা যেতেই পারে। থাকলামও।
জুবায়ের আলমের গল্প বলার ধরণ আমার কাছে ভালো লেগেছে তাঁর পূর্ববর্তী দুটো বইয়ের মতোই। ধীর-স্থিরতা ছিলো বর্ণনাভঙ্গিতে। প্রচুর আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার আছে এই বইয়ে। তবে সবই বোধগম্য হয়েছে, কোন সমস্যা হয়নি। কিছু কিছু জায়গায় তিনি চমকে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। আর এই ব্যাপারটা ভালোই লেগেছে আমার কাছে। তবে 'ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি'-এর পুরো কাহিনিপট বিবেচনা করে আমি বলবো, আরো ইন্টারেস্টিং হতে পারতো উপন্যাসটা। এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত অভিমত।
বেশ কিছু জায়গায় শব্দে 'য়' আর 'ই' বিষয়ক সমস্যা খেয়াল করেছি। যাই-কে যায় লেখা হয়েছে দুই-এক জায়গায়। ছোটখাটো বেশ কিছু টাইপিং মিসটেকও ছিলো। তথ্যগত একটা ভুল চোখে পড়েছে। আর তা হলো, এখানে এক চরিত্রকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ডার্বি সিগারেট টানতে দেখা গেছে। আসলে ওই সময়ে ডার্বি সিগারেট অ্যাভেইলেবল ছিলো না। বরং ব্রিস্টল পাওয়া যেতো ওই সময়। চোখে পড়লো, তাই ব্যাপারটা পাঠকদের সাথে শেয়ার করলাম। এটা যে মারাত্মক কোন ঝামেলার সৃষ্টি করবে বইটা পড়তে গিয়ে, তা কিন্তু না।
সজল চৌধুরী'র করা প্রচ্ছদটা বেশ ভালো লেগেছে। বুক স্ট্রিট-এর বাঁধাই আর কাগজের মানও ভালো ছিলো।
এই লোকের শব্দযাত্রা লেখক সংঘ পড়ে ভালো মজা পাইছিলাম । মানে একটা ভাব আসছিলো লেখার মধ্যে । ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি দুই সমকোণে তা পাইলাম না । কেমন যেন ম্যাড়ম্যাড়া লাগলো । তিন ডেরাইভার লোভে পড়ে অবৈধ উপায়ে পয়সা উপার্জন করতে গিয়া একের পর এক খুন করে কিংবা করতে বাধ্য হয় । বইটায় ‘’লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’’ জাতীয় শিক্ষণীয় কোন একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে . অবশ্য প্রাইমারী লেভেলের বেশিরভাগ বোর্ডের বইয়ের পেছনে খুঁজলে এরকম বার্তা পাওয়া যাবে । এতো বড় উপন্যাস লিখে জ্যামিতিক স্টাইলে তথ্য সরবরাহ করার দরকার ছিলো কি ?
সমষ্টি যাই হোক মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। বরং একটু সাহিত্যের মধ্যে ত্রিভুজ কী করে দেখি। আমাদের চাহিদা অসীম কিন্তু পূরণের যোগান সীমিত। কারো কাছে দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন জোগাড়-ই বিলাসিতা, আবার কেউ ভ্যাকেশনে সুইজারল্যান্ড যেতে না পারাটা অভাব। খেটে খাওয়া মানুষগুলোর চাহিদা অল্প কিন্তু স্বপ্ন বিশাল। সেই বিশালতা হয়তো একটা নিজের ব্যবসা কিংবা প্রেয়সীর সাথে ঘর করার মতো বাসনাও হতে পারে। আশকার, জিনারুল, মজিদ এদের ত্রিভুজের তিনটা কোণ হিসেবে ধরা যায়। তিনজনেই ড্রাইভার। এদের মধ্যে অনুজ মজিদ হবু ড্রাইভার। আপাতত ওস্তাদ বায়ে প্লাস্টিক, তথা হেল্পারিতেই আছে। মনমোহন মেসের ১০৩ নাম্বার রুমে তিনজনের বসবাস। বিয়ার আর সিগারেট খেয়ে আড্ডা, নিজেদের স্বপ্ন নিয়ে কথা বলে তাদের দিন গুজরান মন্দ হচ্ছিল না। কিন্তু ঐযে তৃতীয় রিপু! একটু ভালো থাকার আশাতেই হয়তো এই রিপুর আগমন। আশকারের ইচ্ছা টাকা জমিয়ে কাতার পাড়ি দিবে। মজিদ চায় অসুস্থ বাবাকে চিকিৎসা করাবে, ব্যবসা করবে, ঢাকায় ভালো জীবন কাটাবে। জিনারুল চায় একটা ছোট ব্যবসা ধরবে এরপর নেশাখোর ভাইয়ের অ ত্যা চার থেকে মুক্ত করে এনে সুখের ঘর বাঁধবে সালেহার সাথে। এই স্বপ্নগুলো পূরণের একমাত্র হাতিয়ার টাকা। স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে তাই তারা জড়িয়ে যায় অদ্ভুত এক অ প রা ধে। একটা মিথ্যে যেমন দশটা মিথ্যের জন্ম দেয়, তেমনি একটা অপ রাধ থেকে অনেকগুলো অপ রাধের শাখা-প্রশাখা বের হয়। তাদেরও তাই হলো। পার্সেল ডেলিভারির মতো সোজা কাজ যার ভেতরের ব্যাপার কী নিজেরাও জানে না এমন কর্ম সারতে গিয়ে একদিন বিপদে পড়ে গেলো আশকার আর মজিদ। সে বিপদের ❛কোল্যাটেরাল ড্যামেজ❜ হিসেবে একজনকে সরিয়ে দিতে হবে। সেখানেই ঘটনাক্রমে জ���়িয়ে যায় জিনারুল। হ ত্যা, টাকা চু রি থেকে শুরু করে এটিএম মেশিনের আপাতদৃষ্টিতে মনে হওয়া ডাকাতি এবং খু নে র ঘটনা ঘটে যায়। তদন্তে নামে ঘাড়েল অফিসার মিস স্ফিয়েতা। তৈয়ব, একজন সৎ, আজেবাজে অভ্যাসহীন পুরুষ। পরিবারের প্রিয় বড়ভাই সে। এটিএম মেশিনের সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করে মোটামুটি নির্ভেজাল জীবন কাটায়। কিন্তু এত সরল তো জীবন না। তার জীবনেও সামনে অমানিশা আসবে সেটা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেনি সে। বারিধারায় কী এমন হয় যেখানে বাংলাদেশীদের প্রবেশ নেই! ম্যাডাম পার্সিফোনির রহস্য কী? তার সাথে বটগাছ কিংবা এত তোড়জোড় নিরাপত্তার সম্পর্ক কোথায়, যার জন্য জাতীয় পর্যায়ের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে? আগত নির্বাচন এবং অজানা এই রহস্যের মেলবন্ধন কোথায় জানা নেই। যে লোভের বশে এতগুলো অপ রাধ হলো দিনশেষে কি আশকার, মজিদ কিংবা জিনারুলের কাছে সব ফিকে হয়ে যাবে? পুরো ঘটনা একটা গোলকধাঁধার মতো হয়ে যাচ্ছে। ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি কি তবে বিরাটাকার এক ষড়ভুজের অংশ মাত্র?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
জুবায়ের আলম আমার অন্যতম পছন্দের একজন লেখক। লেখকের দুটো উপন্যাস এবং একটি গল্প সংকলন পড়েছি। উপন্যাস দুটো ভালোলাগার পারদে একটু উপরের দিকেই আছে। আমি পছন্দের থ্রিলারের সাজেশন পেলে এই দুটো উপন্যাস সাজেশন করি। লেখকের তৃতীয় উপন্যাস ❝ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি❞ সেই আশা থেকেই নেয়া। এবং দুঃখজনক হলেও সত্য আশায় গুড়েবালি! প্রথম দুটো লেখায় যে ভালোলাগা ছিল এখানে এসে তার অনেকটাই কেমন ম্লান হয়ে গেল। উপন্যাসের প্লট শুরু থেকে আসলে ধরতে পারিনি। স্মা গ লিং, পাশের দেশের দৈরাত্ব অথবা দেশীয় রাজনীতির ব্যাপার স্যাপার লাগছিল। এরপর দেখলাম না ব্যাপার অন্য। চোর পুলিশ খুঁজার ঘটনা অ প রা ধ সংগঠনের পরে হলেও এরপর তারা দৃশ্যপট থেকে টাটা বাই। মূল তিনজন তথা আশকার, মজিদ আর জিনারুলের ঘটনা দিয়েই প্রায় পুরো উপন্যাস ঠাসা। আসলে পুলিশ কীসের পিছে ছুটছে সেটাই ক্লিয়ার না। সাধারণ অপেশাদার আসামীদের খুঁজতে এমন লেজে গোবরে দশা ছিল। গল্প এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু খেই পাচ্ছিলাম না। কেন হুট করেই কিছু হওয়ার আগে জিনারুলকে খুঁজবে (পড়ে যদিও কিছু কারণ ছিল, তবে সেটা যথেষ্ঠ লাগেনি। কারণ ঘটনা অনেক আগের। এরপরেও তাকে খুঁজে বেরানোর কারণ স্পষ্ট নয়)? এরপর হুট করেই ভারতীয় প্রাধান্য পাওয়া সেই বিশেষ জায়গার কথা এবং অস্পষ্ট ব্যাখ্যাগুলো মাথায় ঢুকছিল না। উপন্যাসের মূল ঘটনা ব্যাখ্যাহীন রেখেই গল্প শেষ করে দিয়েছেন লেখক। কেমন ছড়ানো ছিটানো ব্যাপার লাগলো। যদিও শেষ দিকে ত্রিভুজের তিন কোণ সব এক জায়গায় এসে পড়ে এবং অকল্পনীয় এক টুইস্ট ছিল তবুও সেটা উপন্যাসকে ভালো লাগতে সাহায্য করেনি। ঐটুক জায়গা পড়ে অবাক হয়েছি অবশ্যই। বটগাছের তথ্য বা ব্যাখ্যা লেখক দায়সারা ভাবে দিয়েছেন। ইঙ্গিত ছিল পরের খন্ড আসবে। সেখানে না পাওয়া প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে।
উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে লেখক অনেক ভিন্নভাবে সাজাতে চেয়েছেন কিন্তু আমার মনে হয় সেক্ষেত্রে সফল হননি। মূল তিন চরিত্রদের আম আদমি ধরনের বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন, তবে তাদের একসময় কেমন খেই হারিয়ে গিয়েছিল। সেটা কি শুধু প্রমাণ করতে যে, অন্যায়, অসৎ পথে অর্জিত সবকিছুর বিনাশ হয়। কেউ সুখী হতে পারে না এতে? স্ফিয়েতা চরিত্রকে লেখক একেবারেই সময় দেননি। একটু আধটু দৃশ্যপটে হাজির হয়ে আবার উধাও। তাকে যেভাবে শুরুতে দেখাবো হয়েছিল এরপর এরকম মিলিয়ে যাওয়াটা পছন্দ হয়নি। পার্সিফোনিকে নিয়ে অনেক ধোঁয়াশা তৈরি করেছেন যার সিংহভাগ ই বুঝে আসেনি।
শুন্য আশা নিয়ে পড়লে হয়তো ভালো লাগতে পারে। তবে আগের লেখা মাথায় রেখে আশা নিয়ে পড়তে গেলেই মরীচিকার অনুভূতি হবে।
প্রোডাকশন:
বুক স্ট্রিটের বইয়ের প্রোডাকশন আমার বেশ পছন্দের। তবে এই বইটা তে তাদের সিগনেচার ব্যাপার ছিল না মনে হলো। প্রচ্ছদ আমার তেমন ভালো লাগেনি। বাঁধাই সুন্দর হলেও সম্পাদনার ঘাটতি ছিল। সম্বোধন, নাম কিছু স্থানে ওলট পালট হয়ে গেছিল। আশকারের অংশে জিনারুল কে দিয়ে চালিয়ে দিয়েছে। আবার ই/য় এর কিছু সমস্যা ছিল।
লোভ মানুষের জীবন তছনছ করে দিতে পারে। একটু বাড়তি সুখের জন্য একটু বেশি কষ্ট না করে বাঁকা পথের আশ্রয় নিতে গেলে যদি হাতে তাজা র ক্ত লাগে তবে সেই পথ বেশিদিন সুখের থাকে না। একদিন না একদিন ফাঁস হয়ে ওঠে। প্রকৃতি কাউকে হয়তো ছাড় একটু বেশি দিয়ে দিতে পারে, কিন্তু কখনো ছেড়ে দেয় না।
গল্পের শুরু ভাল ছিল। স্লো স্টার্টিং হলেও, আস্তে আস্তে কাহিনী জমেছে ভালই। শেষটা অনেক বেশী প্রেডিক্টেবল আর নাটকীয় ছিল। তাড়াহুড়া করে শেষ করেছেন লেখক। চরিত্রের পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে। আই মিন দুনিয়াটা গোল হতে পারে, বাট সরু টানেল না যে একদিক দিয়ে সব চরিত্র ঢুকলেই অন্যদিকে এসে সবাইকে এক প্ল্যাটফর্মে এনে মিলনমেলার আয়োজন করতে হবে। এই ব্যাপারটা বড্ড শিশুতোষ লেগেছে। আশকার, জিনারুল, মজিদ, স্ফিয়েতা, পার্সিফোনি, সালেহা.....সব একইদিনে একই স্থানে একইসাথে! এছাড়া, স্ফিয়েতা কে দাবি করা হয়েছে একজন এসপি হিসেবে৷ আবার সে নাকি তরুনী, অবিবাহিত। আমার দেশীয় প্রেক্ষাপটে একজন অফিসার এসপি পর্যন্ত হতে হতে বয়স হয় মিনিমাম ৪২/৪৩। এইটুকু একজন দেশীয় রাইটার হিসেবে মাথায় থাকা উচিৎ বলে মনে করি। এরকম ছোটখাটো আরও অনেক ব্যাপার বইটা পড়ার সময় চোখে পড়েছে। টু-স্টারের বেশি ডিজার্ভ করেনা বইটা।
This entire review has been hidden because of spoilers.
মানুষ কেন অপরাধ করে? এর দুইটি কারণ হতে পারে। এক. লোভ আর দুই. প্রতিশোধ প্রবণতা। প্রতিশোধ সবাই নিতে পারে না। কারো সাহসে কুলোয় না, আবার অনেকে প্রতিশোধের নেশায় দিশা হারিয়ে ফেলে। এমন প্রতিশোধের নেশায় মত্ত মানুষ হিংস্র মানুষের চেয়েও ভয়ংকর। তাদের চোখের তারায় জ্বলে ওঠা আগুনে সব যেন ছাইভস্ম হয়ে যায়। সেই আগুনে প্রতিপক্ষ যেমন পুড়ে, তেমনি পুড়তে হয় নিজেকে।
আর লোভ? সে বড়ো ভয়ংকর জিনিস। কথায় আছে, লোভে পাপ পাপে মৃত্যু। লোভ পাপকে ডেকে আনে। সেই পাপে মৃত্যু অনিবার্য হয়ে পড়ে। সমাজের উচ্চবর্গীয় মানুষ থেকে শুরু করে নিম্নবর্গীয় মানুষ, সবাই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে লোভের কারণে। আর এই পাপ যখন সীমা ছড়িয়ে যায়, তখন থেকেই শুরু হয় শেষের যাত্রা।
▪️কাহিনি সংক্ষেপ :
জিনারুল, মজিদ আর আশকার তিনজনই ড্রাইভার। তাদের জীবনে হারানোর কিছু নেই। তবে আছে ফেলে আসা জীবনের ছায়া। জীবনের এক পর্যায়ে এসে খুব দ্রুত উপরে ওঠার ইচ্ছা জাগে। লোভে পড়ে হোক, বা সংক্ষিপ্ত উপায়ে হোক; এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলে। সেই চেষ্টা তাদের জীবনে এনে দিলো এক অভিশাপ। লক্ষ লক্ষ টাকার হাতছানি অগ্রাহ্য করতে পারল না কেউই। ফলে জড়িয়ে যেতে হলো এমন এক অপরাধে, যার পরিণতি ভয়াবহ। মৃত্যু তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাদের। ওরা কি বাঁচতে পারবে?
তায়েব ছেলেটা এটিএম বুথে চাকরি করে। বাবাকে হারানো ছেলেটার কাঁধে এখন পুরো পরিবারের ভরণ পোষণের দায়িত্ব। দায়িত্ব পালনের পিছপা হতে চায় না সে। ভাই-বোনদের পাশে দাঁড়িয়ে, মাকে সাহায্য করে নিজের জীবন রাঙাতে চায়। সব চাইলেই কি পাওয়া যায়? কোনো এক অন্ধকার রাতে তায়েবের সব স্বপ্ন আলো হারিয়ে ফেলার মতো করেই হারিয়ে গেল। হারিয়ে গেল তায়েব নিজেও।
ওদিকে কেউ একজন খুঁজছে জিনারুলকে। বাইকে চেপে দুমড়ানো মোচড়ানো এক ছবি নিয়ে খুঁজে ফেরা। কিন্তু পাওয়া যায় না কিছুতেই। ঢাকা শহরে কোটি মানুষের বাস। সবার মাঝ থেকে একজনকে খুঁজে বের করা কেবল কঠিন-ই নয়, অসম্ভবের নামান্তর। কে সে? কে���-ই বা খুঁজছে জিনারুলকে? তার লক্ষ্য কি পূরণ হবে?
এটিএম বুথে ডাকাতির কেস নিয়ে বেশ চিন্তিত সিআইডি অফিসার স্ফিয়েতা। যে করেই হোক এর সমাধান করতে হবে। অবশেষে মিলল সমাধান। সামান্য একটি ক্লু আর একজন অপরাধী নিয়ে স্ফিয়েতা হানা দিলো অপরাধীদের রাজ্যে। যে রাজ্যে আছে পার্সিফোনি নামের এই অঘোষিত রাণী। কে এই পার্সিফোনি? কেনই বা দেশের উপরমহল এড়িয়ে যেতে চাচ্ছে? স্ফিয়েতা কি পারবে এ রহস্য সমাধান করতে?
জীবনের সব গতিপথ এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়। সেই বিন্দুতে এসে জিনারুল, মজিদ কিংবা আশকার খুঁজছে জীবনের মানে। স্ফিয়েতা খুঁজছে তার লক্ষ্য। আর ম্যাডাম পার্সিফোনি খুঁজছে তিন হাজার পূর্বের কোনো এক হারিয়ে যাওয়া রহস্যের খণ্ড। এরপর?
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
আমি লেখক জুবায়ের আলমের অনেক বড়ো ভক্ত। তাঁর "শব্দযাত্রা লেখক সংঘ" ও "প্রায়শ্চিত্ত প্রকল্প" পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। শূণ্য প্রত্যাশা নিয়ে শুরু করা বই দু'টো যেভাবে মুগ্ধ করেছিল, তার কতটা পূরণ করতে পারল "ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি"? এই প্রশ্ন এলে বেশ হতাশ-ই হয়। বইটি খারাপ, বলব না। তবে আগের দু'টোর তুলনায় বেশ সাদামাটা। প্রত্যাশাও তেমন পূরণ করতে পারেনি।
"ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি" উপন্যাসের শুরুটা আকর্ষণীয়। সেই আকর্ষণ লেখক টেনে নিয়ে গিয়েছেন পুরোটা সময়েই। লেখকের লেখায় একটা বিশেষ দিক আছে। অন্যরা যেমন শুরুতে টুইস্ট দিয়ে পাঠককে আটকে রাখে, জুবায়ের আলম একটি একটু করে গল্পের সুতো ছাড়েন। তার গল্পের সাথে সাথে টুইস্ট বাড়তে থাকে। কাহিনি তরতরিয়ে এগিয়ে যায়। লেখকের সাবলীল লেখা আমার বেশ পছন্দের। সাথে শব্দচয়ন আর গল্পের মাধুর্যতা বেশ আকর্ষণীয়। তার ব্যতিক্রম হয়নি এই বইটিতেও।
"ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি" উপন্যাসের প্লট দুর্বল মনে হয়েছে আমার কাছে। লেখকের লেখনীর কারণে পড়া গেলেও প্লট তেমন একটা মুগ্ধ করতে পারেনি। কিছু জায়গায় বর্ণনা খাপছাড়া মনে হয়েছে। গল্পের খাতিরে বইয়ে আসা কিছু দৃশ্য বেশ সিনেমাটিক লাগছিল। কিছু জায়গায় তাড়াহুড়োর ছাপ স্পষ্ট। হয়ত আরও ভালো করা যেত।
"ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি" উপন্যাসে লেখক বেশ কিছু আঞ্চলিক ভাষার অবতারণা করেছিলেন। প্রমিত ভাষা বর্জন করে অশালীন ভাষার ব্যবহার ছিল বইটিতে। গল্পের খাতিরে সেগুলো প্রয়োজন ছিল মনে হয়েছে। লেখক অবশ্য ভূমিকাতে এসবের জন্য ক্ষমাও চেয়েছেন।
লেখকের লেখায় সমাজের দুর্বলতার অনেক দিক উঠে আসে। সমাজের সাথে রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেও লেখক তার লেখার মাধ্যমে আঘাত করেন। গল্পের গভীরে থাকা উপহাসগুলো হয়তো দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়। আবার কখনো কখনো মনে হয়, এমন দিনের শেষ হবে কবে?
বইটা শেষ করে হতাশ হয়েছি। লেখক শুরু থেকে যে আকর্ষণ ধরে রেখেছিলেন, শেষটা সেভাবে করতে পারেননি। মাঝে কিছু টুইস্ট দিলেও সেগুলো আগেই ধরা যাচ্ছিল। হয়ত সে কারণেই আকর্ষণ ধীরে ধীরে কমেছে। লেখকের সব বইয়েই শেষটা ধোঁয়াশা ঘেরা হয়। শেষ হয়েও যেন কোনো কিছুর অপূর্ণতা ঘিরে ধরে। মনে হয় লেখক চাইলেই এর সিক্যুয়েল আনা সম্ভব। লেখক চাইলেই "ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি" উপন্যাসের সিক্যুয়াল আনা যায়। লেখক কি চাইবেন? অনেক প্রশ্নের উত্তর যে জানা বাকি।
▪️চরিত্রায়ন :
লেখকের চরিত্রায়ন আমার বেশ লাগে। লেখক যেভাবে চরিত্র ডেভেলপ করেন, তা প্রশংসা করার মতোই। তার উপন্যাসে প্রতিটি চরিত্রই গুরুত্বপূর্ণ। যে চরিত্র যতক্ষণ সুযোগ পায়, ততক্ষণ তারই ভূমিকা বেশি। চরিত্রগুলোর ব্যাকস্টোরি গঠনেও লেখক মুন্সিয়ানা দেখান বেশ ভালোভাবেই।
মজিদ, জিনারুল, আশকার উপন্যাসের প্রধান চরিত্র। এদের ছাড়াও ছোটোখাটো সব চরিত্র নিজ গুণে গুণান্বিত। সবাই উপন্যাসকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
তবে "ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি" বইটির হতাশাজনক বিষয় হচ্ছে কোনো চরিত্র মনে দাগ কাটতে পারেনি। নিয়মিত চরিত্র হিসেবেই মনে হয়েছে। প্রধান কিংবা আকর্ষণীয় চরিত্র হিসেবে মনে রাখার মতো কেউ নেই। হয়ত তাদের কৃতকর্মের জন্য অথবা গল্পের খাতিরে।
▪️বানান ও সম্পাদনা :
বানান ভুলের আধিক্য না থাকলেও বেশ কিছু প্রচলিত বানানে ভুল ছিল। কিছু মুদ্রণ প্রমাদ, অনেক জায়গায় ভুল উপমার ব্যবহার সম্পাদনার ঘাটতিকেই মনে করিয়ে দেয়। বই প্রকাশনীর পূর্বে প্রকাশনীর আরও যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন।
▪️প্রচ্ছদ ও বাঁধাই :
প্রচ্ছদ চলনসই। বেশ ভালোই লেগেছে। গল্পের সাথে ঠিক মনে হয়েছে। বুক স্ট্রিটের বইয়ের বাঁধাই নিয়ে অভিযোগ করার অবকাশ নেই। কাগজের মানও মোটামুটি ভালো ছিল।
▪️পরিশেষে, ঢাকা শহরে সকাল আসবে রোজ। সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এভাবেই তরুণেরা ভিড় জমাবে এখানে। কাউকে না ফেরানো এই শহরের কোন এক ভাঁজে হয়ত তাদের জায়গাও হয়ে যাবে। তাদের চোখে থাকবে অনেক স্বপ্ন। অনেক আশা। আশার জ্বলন্ত আগুনকে রঙ বেরঙের আলো ভেবে জোনাকি পোকাদের মত তারাও ঝাপ দেবে আগুনে। কেউ বেঁচে ফিরবে, কেউ হারিয়ে যাবে আজিমপুর কাঁচাবাজারের সামনে বসা অন্ধ ফকিরটার মত। কিন্তু তাদের ভিড়ে আশকার, জিনারুল আর মজিদকে হয়ত আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
সামান্য একটু সুখের সন্ধানে গিয়ে ভয়াবহ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে সমাজের নিচুস্তরের তিন জন মানুষ। ভাগ্য বিড়ম্বিত এই তিন মানুষ এবং এদের আশেপাশে থাকা আরো কিছু চরিত্র নিয়ে মূলত বইয়ের গল্প এগিয়ে গিয়েছে।
যতোটুকু ভালো লেগেছে
জুবায়ের আলম এর চমৎকার লেখার সাথে আমার আগেই পরিচয় হয়েছে। এই বইটার লিখনশৈলীও ছিল বরাবরের মতোই দুর্দান্ত। চমৎকার সব শব্দ এবং উপমার ব্যবহার যেকোনো ধরনের গল্পকেই তড়তড়িয়ে পড়ে যেতে উদ্ভুদ্ধ করবে। একটা অতি সাধারণ ঘটনা থেকে গল্পে বেশ দারুণ একটা টার্নস এনেছেন লেখক। এই ব্যাপারটা ভালো লেগেছে। এছাড়াও একদম গ্রাম্য মানুষগুলার মুখে যেমন ভাষা থাকার কথা, তেমনি আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের ব্যাপারটাও ভালো লেগেছে। এই তো!! আর ভালো লাগার মতো কিছু পেলাম না বইয়ে।
মন্দ লাগার অসংখ্য সব কারন
বইটা শেষ করার পর প্রথম যে কথাটি আমার মাথায় যে কথাটা এসেছে, তা হলো এই বইটাতে লেখক আসলে কি লিখতে চেয়েছেন বা কি উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন? খুবই সাদামাটা প্লট আর অনুমেয় ঘটনাপ্রবাহ নিয়েই গল্প এগিয়ে যায়। কিন্তু লিখনশৈলীর দরুণ সেগুলো কোন সমস্যা বলে মনে হচ্ছিল না। মাঝে কিছু অতি নাটয়কীতার কারণে কারেক্টার ডেভেলপমেন্টটাও ঠিকমতো ফুঁটে উঠেনি। কিন্তু শেষে এসে সব কিছু একেবারে তারপর পাকিয়ে ফেলেছেন। শেষ অংকের প্রতিটা ঘটনাবলীর কোনো ধরনের যৌক্তিকতাই আমি খুঁজে পাইনি। মনে হচ্ছিলো লেখকের হাতে ক্ষমতা আছে বলে লেখক চরিত্র গুলোকে দিয়ে যা খুশি তাইই করিয়ে নিচ্ছেন! এর বাইরে আবার তিন হাজার বছরের পুরোনো কি সব ব্যাপার স্যাপার তুলে এনেছেন। সিন্ধুসভা, বোধী��ৃক্ষ, চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র সহ হাংকি পাংকি বহুত কথা লিখে ফেলেছেন শেষ কয়েক পাতায়, যেগুলোর একটারও কোনো ব্যাখ্যা না দিয়েই বইটা শেষ করে দিয়েছেন। এই প্রসঙ্গগুলো গল্পে আসারই বা কি দরকার ছিল, তাও বুঝি নাই। শেষ দুই চ্যাপ্টার তো আক্ষরিক অর্থেই মাথার উপ্রে দিয়ে গেছে 😑! কই থেকে কি লিখলো, কি আনলো, কেনো লিখলো তার কিছুই বুঝতে পারি নাই। মনে হচ্ছে একটা গল্প লিখতে লেখক হঠাৎ করে ভুলে গেছেন, কি লিখছিলেন! তাই নিজের মনের এলোমেলো, বিক্ষিপ্ত চিন্তাভাবনা গুলোকে শেষ কয়েকটা পাতায় জোড়া লাগিয়ে কোনোমতে বইটা ছাপিয়ে দিয়েছেন!! এমন কি লেখকের যদি কোনো সিক্যুয়েলও বের করার প্ল্যান থেকে থাকে, তবুও বলবো এভাবে কোন বই শেষ করার কোনো মানে হয় না।
ব্যক্তিগত রেটিং: ০৪/১০ (সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো ভূমিকা পড়ে মনে হয়েছে যে লেখক নিজেই এ বইটা নিয়ে কনফিডেন্ট ছিলেন না। তারপরেও কেনো আধাখেঁচড়া একটা গল্পকে বই হিসাবে বের করতে হবে?)
প্রোডাকশন: বুক স্ট্রিটের গতানুগতিক প্রোডাকশন। তবে বইটায় সম্পাদনার কোন বালাই নেই। বেশ কয়েক জায়গায় চরিত্রের নাম ওলট পালট হওয়া থেকে বানান ভুল বা শব্দ মিসিং এর মত ব্যাপারগুলোও বেশ বিরক্তির উদ্রেক করেছে। প্রচ্ছদটাও ভালো লাগেনি।
আজকাল বিশদ রিভিউ লিখতে আলসেমি লাগে। তাই অল্প কথায় সারি। প্রায়শ্চিত্ত প্রকল্পের সুবাদে জুবায়ের আলমের লেখা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, সে সময় কেন যেন বইটা শেষ করা হয়নি। তবে লেখার স্টাইলটা ছিল চোখে পড়ার মতো সহজ। বুকস্ট্রিট থেকে তার ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি ও আমার অনূদিত ফ্রম হেয়ার টু ইটার্নিটি একই দিনে প্রকাশ পায়। তখন বইটির কয়েক পাতা পড়ে বেশ মনে ধরে যায়। তিন আপাত মূল্যহীন মানুষের গল্প এটি; এমন অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন আপনার-আমার চোখের সামনে দিয়ে আসা-যাওয়া করে। কিন্তু হঠাৎ দৃশ্যপট পালটে যায়। বিরাট এক চক্রান্তের ঘুঁটি হয়ে যায় তারা নিজের অজান্তেই। কিন্তু সমাজের উপরতলার লোকদের কি আর ভুলের মাশুল দিতে হয়? লেখক উপন্যাসটাকে বিরাটাকার ষড়ভুজের ভগ্নাংশ বলে দাবি করেছেন, যার সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত। মূল প্লটের পাশাপাশি আরেকটা যে প্লট আছে তা অনেকটাই অমীমাংসিত (যার শুরুটা সম্ভবত প্রায়শ্চিত্ত প্রকল্পে, আর ষড়ভুজের বাকি অংশ তো এখনও আসেনি)। লেখার স্টাইল দুর্দান্ত, হিউমারের ব্যবহারও ছিল পরিমিত, অ্যাটিপিকাল রেফারেন্সের ব্যবহারে বেশ চমৎকৃত হয়েছি; লেখকের কল্পনাশক্তি কাবিলে তারিফ। শুরুতে লেখক সম্ভবত সাহসী বই লেখা নিয়ে একটা কথা বলেছিলেন (বইটা এই মুহূর্তে সাথে না থাকায় মনে পড়ছে না), বেশ স্পর্শকাতর একটা টপিক নিঃসন্দেহে, তবে পরবর্তী বইতে এর গভীরে এক্সপ্লোর করতে পারলে ব্যাপারটা দুঃসাহসিক হবে বলে আমার ধারণা।
রেটিংঃ ৪/৫ (একটু উনিশ-বিশ হতে পারে, রাউন্ড আপ করে দিলাম)
আমার পড়া লেখকের প্রথম বই। শুনেছিলাম ওনার গল্প বলার ধরন নাকি খুবই ভালো। মজার ব্যপার বইটা পড়ার পর আমারো তাই মনে হয়েছে। দারুন বর্ননাভঙ্গি! একটা নরমাল প্লটের বই অনেক সময় গল্প বলার ধরনের জন্য অসাধারণ হয়ে উঠে। এই বইটাও ঠিক সেরকম। তবে এমন না যে বইটা আমার প্রত্যাশা ছাড়িয়ে গিয়েছে। বইটা আমার বেশ ভালো লেগেছে। আমি বেশ উপভোগ করেছি। লেখকের বাকি বইগুলো পড়ার অপেক্ষায় এখন।😊
অন্য ধাঁচের গল্প। শুরুর দিকে পড়তে অত ইন্টারেস্ট না পেলেও শেষটা ভালো ছিল। তিনটা মানুষের তিন রকম জীবনের perspective থেকে গল্পটা খুব সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করা হয়। আবার পুরো গল্পটাকে শেষে একটা বড় ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে portray করার ব্যাপারটাও সুন্দর ছিল।