ভারতের প্রথম প্রামাণ্য ম্যাপ আঁকিয়ে রেনেলের ঐতিহাসিক অভিযান। ঘনঘোর জঙ্গলে ঘেরা সেই বাংলায় নদীপথ ছাড়া গতি নেই। সম্বল বলতে ভাঙা বজরা, কিছু সেপাই আর অনুন্নত সেকেলে কম্পাস। সন্ন্যাসী, ফকির বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছে প্রবলভাবে, তাদের তরোয়ালের ঘায়ে হাত কেটে ঝুলে গেল, তবু কি দমানো গেল সাহেবকে...
তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১২ জুলাই, ১৯৭৮ নদিয়ার কৃষ্ণনগরে। কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজিতে এম এ। পেশা শিক্ষকতা। মায়ের গলায় শোনা রবীন্দ্রনাথের গানই সমস্ত নন্দন চর্চার প্রেরণা। গল্প প্রকাশিত হয়েছে দেশ, আনন্দবাজার পত্রিকা, সানন্দা ছাড়াও অনেক উল্লেখযোগ্য পত্রিকায়। ২০০৭ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় 'প্রতিদ্বন্দ্বী' গল্পটি লিখে বৃহত্তর আত্মপ্রকাশ। ১৪১৮ শারদীয় দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত 'মায়াকাচ' উপন্যাসটি পাঠকদের মূল্যায়নে 'সেরা উপন্যাস' হিসেবে পেয়েছে 'বর্ণপরিচয় সাহিত্য সম্মান ২০১১'।
যারা বিসিএস দিয়েছেন বা কখনো দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন তারা সবাই জেমস রেনেলের নাম জানেন। যারা জানেন না তাদের অবগতির জন্য বলছি তিনি হচ্ছেন ভারতবর্ষের প্রথম মানচিত্র অঙ্কনকারী।
১৭৬৪ সালে শুরু হওয়া এই কাজের জন্য তিনি চষে বেরিয়েছিলেন নদী, খাল, বিল, পাহাড়, জঙ্গল, জনপদ। মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পরেছিলেন সন্ন্যাসীবিদ্রোহীদের সাথে। এখানে শুধু রেনেল সাহেবের কাজ নয় সেই সাথে উঠে এসেছে সেই সময়কার ভারতবর্ষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও রেনেল সাহেবের ব্যক্তিগত অনেক বিষয়াদি।
জেমস রেনেল (James Rennell) নামক এক সাহেব ভারতের প্রথম প্রামাণ্য ম্যাপ আঁকিয়ে হিসেবে ইতিহাসে পরিচিত। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেতনভুক কর্মচারী হিসেবে সেই জেমস রেনেল কীভাবে সার্ভেয়িং-এর মাধ্যমে এই বাংলা প্রদেশের ম্যাপ আঁকার অভিযান সম্পন্ন করেছিলেন তারই কাহিনি ব্যক্ত করে আলোচ্য বইটি।
মূল চরিত্র রেনেলের "ম্যাপ আঁকিয়ে" কাজের সুবাদে বইটির নাম কেন "কম্পাসওয়ালা" হল তা প্রথমেই বোঝা যায়। এর আলাদা কোন পরোক্ষ তাৎপর্য নেই। রেনেলকেই এখানে কম্পাসওয়ালা বলে অভিহিত করেছেন লেখক, যেহেতু ম্যাপ ড্রাফটিং-এর কাজে কম্পাস একটি গুরুত্বপূর্ণ ইন্সট্রুমেন্ট।
কাহিনির পটভূমিকা পলাশীর যুদ্ধের কিছু পরের। বাংলা তথা বিহার প্রদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতির উত্তপ্ত অবস্থা এবং সন্ন্যাসী বিদ্রোহের বিপদজনক পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়ার তরফ থেকে বাংলা প্রদেশের বদ্বীপ অঞ্চল, নদীনালা ইত্যাদির সার্ভে করতে নামেন জেমস রেনেল। সম্বল বলতে একটি ভাঙাচোরা দুর্বল বজরা এবং সামান্য কিছু সেপাই-লস্কর। এই সামান্য সম্বলেই পাহাড়প্রমাণ কাজে সামিল হন রেনেল। এরপরেই সম্পূর্ণ যাত্রাপথে প্রচুর চরিত্রের আসা যাওয়া লেগে থাকে রেনেলের আশেপাশে। বেশিরভাগ চরিত্রের চলে যাওয়াই একেকটি শোচনীয় পরিণতি। কিন্তু ভাগ্যের জোরে রেনেল টিকে থাকেন বারংবার। সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ আঘাত শরীরে নিয়েও ফিরে আসেন আবার, নিজের অভীষ্ট সিদ্ধির প্রবল বাসনায়। তাকে যে তৈরী করতেই হবে বাংলার ম্যাপ।
মূল কাহিনির সারসংক্ষেপ এটুকুই। সমস্ত বই জুড়েই রেনেলের সার্ভে করার গতিপথের ধারাবাহিক বিবরণ রয়েছে এবং তারই মাঝেমাঝে রয়েছে আনুষঙ্গিক কিছু ঘটনা। এরই সঙ্গে রেনেলের নিজস্ব ভাবভঙ্গি, এদেশীয়দের প্রতি সহমর্মিতা পোষণ, ব্রিটিশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিরুপ মনোভাব পোষণ করে স্বজাতির সাথে মানসিক দ্বন্দ্বে ভোগা - এসবেরও বিবরণ রয়েছে।
কিন্তু এখানেই লুকিয়ে রয়েছে বইটির প্রতি এক মিশ্র অনুভূতি হওয়ার জায়গা। সার্ভের কাজের ধারাবাহিক বিবরণের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে রেনেলের নিজের একটি জার্নাল ইন্টারনেটে এভেলেবল রয়েছে, "The journals of Major James Rennell, first surveyor-general of India" নামে। সেটিতে কেবল সার্ভের কাজের ধারাবাহিক বিবরণ, পথে কী কী বিপদ-আপদ বা উল্লেখযোগ্য কী হল এবং প্রতিটা ক্ষেত্রে রেনেল কী করলেন তার বিবরণই অফিশিয়াল পদ্ধতিতে লিপিবদ্ধ করা আছে। এই জার্নালে রেনেলের ব্যক্তিগত ভাবনার সেরকম কোন ইনপুট নেই এবং সেটা কোন অফিশিয়াল ডকুমেন্টে না থাকাই স্বাভাবিক। আলোচ্য বইটিতে রেনেলের কাজের গতিপথের কাঠামো উক্ত জার্নালের তথ্য থেকেই অনুবাদ করে নেওয়া হয়েছে সেটা বোঝা গেলেও, বাকি সমস্ত এলিমেন্ট অর্থাৎ ব্যক্তি রেনেলের ভাবনাচিন্তা, উদারমনস্কতা এগুলির অবতারণা কীভাবে বা কোথা থেকে এল সেই বিষয়ে একটা অস্পষ্টতা রয়ে যায় কারণ বইটির শেষে তথ্যসূত্র হিসেবে কী কী ব্যবহার করা হয়েছে তার কোন মেনশনিং নেই।
আবার এটাও সত্যি যে এই এলিমেন্টগুলির অবতারণা না করলে বইটি কোনদিনই একটি উপন্যাস হয়ে উঠতো না। তা কেবল একটি নীরস অফিশিয়াল ডকুমেন্টের বাংলা অনুবাদ হয়ে রয়ে যেত।
রেনেলের একমাত্রিক "too good to be true" গোছের নিপাট ভালোমানুষী চরিত্রায়ণ এবং মাঝেমাঝেই "ইংরেজরা কি কেবল লুটেরা, আমরা কি সবাই বাজে?" জাতীয় উক্তিগুলিকে কিছুক্ষণের জন্য একপাশে সরিয়ে রাখলেও এই বইয়ের থেকে আহরণ করতে পারা যাবে এমন বিষয়ের কমতি নেই। বইটি সেই সময়ের একটি স্পষ্ট এটমস্ফিয়ার তৈরী করতে সক্ষম। তা প্রাকৃতিক হোক কি রাজনৈতিক, দুইভাবেই ব্যক্ত করতে সক্ষম। সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ব্যাপারে গ্রাউন্ড লেভেলে জনসাধারণের এবং ইংরেজ কর্তাদের দৃষ্টিভঙ্গির তফাৎ কোথায় তারও একটা ধারণা পাওয়া যায় এই কাহিনি থেকে। এর সাথে জিওগ্রাফিক্যাল সার্ভেয়িং-এর কাজ সেই সময়ে কতটা কষ্টসাধ্য ছিল তা তো জানা যায়ই। এই জানার মূল্য পাঠকের নিজস্ব জানার-শেখার পরিসীমাকে বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই।
এই বইটিকে কোনভাবেই থ্রিলিং অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি ভেবে পড়া যাবে না। হতাশ হতে হবে। কারণ, বইয়ের অনেক অংশেই যাত্রাপথের নীরস তথ্য দিয়ে সাজানো। ইতিহাস তথা ভূগোলের ব্যাপারে জানার ক্ষেত্রে উৎসাহী পাঠক এবং যাদের গদ্যের কাব্যময়তা ভালো লাগে তাদের জন্যই এই বইটি। গতিময়, টানটান ঐতিহাসিক অভিযান আশা করে পড়তে শুরু করলে ইনফো-ডাম্পিংয়ের মুখোমুখি হতে হবে। এটা এই বইয়ের দোষ না। রেনেলের কাজই ছিল ইনফরমেশন আহরণ করা, তাই তার বিষয়ে লিখিত আখ্যানেও সার্ভে সংক্রান্ত ইনফরমেশন থাকবে এটাই স্বাভাবিক।
বইটিতে অলংকরণ না থাকলেও তিনটি ম্যাপের ছবি রয়েছে, যা খুব একটা স্পষ্টভাবে ছাপা নয় (হতে পারে এটাই বেস্ট পসিবল আউটপুট) যদিও। তবুও বইয়ের থিমের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক। শুরুর দিকে বেশ অনেকগুলি মুদ্রণ প্রমাদ রয়েছে যা শুধরে নেওয়া আবশ্যক পরবর্তী এডিশনে।
শেষে এটুকুই বলার যে নানারকমের উপাদান মিশিয়ে এটি একটি অন্যধারার বই। ইতিহাস (এবং ভূগোল) অনুসন্ধিৎসু পাঠকেদের ক্ষেত্রে একবার পড়ে দেখার মতোন। সামগ্রিকভাবে বললে বইটি বেশ ভালোই।
Kudos to the author for this historical/ biographical fiction for shedding light on a seldom explored side of history- cartography, however, it read more like history than fiction and the balance felt a bit off to me. But apart from it, a good addition to the limited number of Bangla historical fiction.