কায়েস আহমেদ বিভাগোত্তর বাংলাদেশের শক্তিশালী কথাশিল্পী। তাঁর জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৫ মার্চ; পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার শ্রীরামপুর থানার বড়তাজপুর গ্রামে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়ো। তাঁর মাতার নাম ওলিউন্নেসা, পিতার নাম শেখ কামাল উদ্দীন আহমেদ। দেশভাগ ও পিতার চাকরিবদলের সূত্রে তাঁর পরিবার ঢাকায় আগমন করে এবং বসবাস আরম্ভ করে। কায়েস আহমেদ ১৯৬৪ সালে ম্যাট্রিক এবং ১৯৬৮ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন; অতঃপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙলা বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু অনার্স শেষবর্ষে থাকা অবস্থায় তাঁর পড়ায় ছেদ পড়ে।
কলেজে আই.এ পড়ার সময় তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় ‘পূর্বদেশ’-এ। দৈনিক ‘গণকন্ঠ’ ও ‘সংবাদ’-এ তিনি সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছেন। তবে কায়েস আহমেদের আজীবন পেশা ছিল শিক্ষকতা। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে বাংলার শিক্ষক ছিলেন। বিয়ে করেন ১৯৮৩ সালে। একমাত্র পুত্রের নাম অনীক আহমেদ। ১৯৯০ সালে তিনি হুমায়ুন কবীর স্মৃতি পুরস্কার লাভ করেন। কায়েস আহমেদ ১৪ জুন, ১৯৯২ সালে আত্মহত্যা করেন।
কায়েস আহমেদের গল্প স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি মনোযোগ দাবী করে এবং পাঠক যখন মনোযোগ দিয়ে গল্পের শরীরে প্রবেশ করে তখন দেখতে পায় একটা স্বচ্ছ পুকুরের গায়ে পড়ে আছে সর, জলের গভীরে কী আছে তা পাঠককেই খুঁজে বের করতে হবে, পুকুরটা কায়েস কেটেছেন ঠিকই কিন্তু পুকুরের জলে ভেসে থাকা পাতার দায় নিতে তিনি রাজি নন মোটেও।
কায়েসের গল্পের অ্যাপ্রোচ একদমই ভিন্ন। বারবার ন্যারেটর চেইঞ্জ করে গল্পের আড়ালে কায়েস যেন তৈরি করেছেন একটা গোলকধাঁধা। সে'ই গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়ার যে ম্যাপ তাও আঁকা হয়েছে এতো চমৎকারভাবে যেন প্রতিটি লাইনিং দেখা যায় স্পষ্টভাবে।
কায়েসের ডিটেলিং মনোমুগ্ধকর। প্রকৃতির বর্ণনায় কায়েস মাস্টার যেমন তিনি মাস্টার একজন মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বোধের মধ্যে ডুব দিয়ে পুরো সমাজ ব্যবস্থাকে হুটহাট থাপ্পড় মারতে। ভালগার কিংবা যেসব কথা ভদ্রমুখে বলা যায় না, কায়েস সেসব কথাকে গল্পের প্রয়োজনে এনেছেন সহজাতভাবে, কোথাও কোথাও তাঁর এই অ্যাপ্রোচ আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথা। কায়েসের গল্পের জগতে কাফকাকেও খুঁজে পাওয়া যায় সাবলীলভাবে আর এই জগতে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে মনে হয় কুয়াশায় ঢাকা শূন্যতার মাঝে ডুবে যাওয়া ভালো।
কায়েস আহমেদ গল্প বলেন নগ্ন বিস্তৃত খোলাখুলিভাবে। খুঁতহীন সুনিপুণ বিস্তারিত বর্ণনা। রেখে যান অজস্র প্রশ্নবোধক চিহ্ন। সঙ্গে উত্তরগুলোও। সন্দেহাতীতভাবে ত্রুটিহীন। পাঠককে দিতে পারেন দারুণ টক্কর।
পড়লাম তার সৃষ্ট অন্ধ তীরন্দাজ। সূচীপত্রে গল্প কয়েকটা। দু’টো গল্প বোধহয় বেশিই ভালোলাগলো। মনে হলো স্বপ্নের মত ঘোরলাগা লেখা। ফ্যাসিনেটিং, ফ্যাসিনেটিং, ফ্যাসিনেটিং..
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আমার সবথেকে প্রিয় লেখকদের একজন। ইলিয়াসের "সংস্কৃতির ভাঙা সেতু" পড়ার সময় কায়েস আহমেদের নাম জানতে পারলাম। প্রিয় লেখক যখন কোন একজন লেখকের প্রশংসা করেন তখন ধরেই নিতে হয় যে তিনি ভাল লেখেন। কিন্তু এতটা যে ভাল লেখেন সেটা আশাতীত।
সাহিত্যে জীবনের গল্প থাকে। পূর্ববঙ্গের অধিবাসীরা ঐতিহাসিকভাবেই ধনী নয়। ধনতন্ত্রের বিকাশও এখানে অল্পদিনের। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই আমি যখন পূর্ববঙ্গের সাহিত্য পড়ব নিম্নবিত্ত খেটে খাওয়া মানুষের গল্পই আশা করব। মুষ্টিমেয় আলালের ঘরের দুলালের আকাশ-কুসুম ফ্যান্টাসি আশা করব না। কায়েস আহমেদ নিম্নবিত্ত খেটে খাওয়া মানুষের মর্মে ঢুকেছেন, তাদের সাথে দিনযাপন করেছেন, খুব কাছে থেকে তাদের জীবনের গল্প বলেছেন। এবং এগুলোর সাথে কিছু কিছু গল্পে জাদুবাস্তবতা তো উপরি পাওনা। সব মিলিয়ে প্রথম কায়েস আহমেদ পাঠের অভিজ্ঞতা অসাধারণ।