ধর্ষণ—জগতের ঘৃণ্যতম অপরাধগুলির মধ্যে একটি। অসহায় নারী শরীরের উপর পৈশাচিক অত্যাচারের মাধ্যমে বর্বর আনন্দলাভের মধ্যে দিয়ে নিজের যৌন কামনার তৃপ্তি ঘটায় ধর্ষক। শেষ করে দেয় একটা জীবন, একটা স্বপ্ন,একটা সম্ভাবনা কখনো বা একটা তরতাজা প্রাণ। ধর্ষকের মনস্তত্ত্বিক বিশ্লেষণ করার চেষ্টা হয়েছে বহু। নারী শরীরের প্রতি যৌন লালসাই এর একমাত্র কারন নয়, ধর্ষকের পাশবিক মনোবৃত্তিই এর জন্য দায়ী। আর এই পাশবিকতার জন্ম সমাজের এক নিকষ কালো কুধারনার গহ্বর থেকে— মেয়ে মানেই দুর্বল। তাই ধর্ষনের পরে আঙুল ওঠে ধর্ষিতার দিকে,তার পোশাকের দিকে,তার সময়জ্ঞানের দিকে। এইরকমই এক পেক্ষাপটে এক ধর্ষিতার শেষ হয়ে যাওয়া স্বপ্ন, থেমে যাওয়া হৃৎস্পন্দনের কাহিনী —“সূর্যোদয়ের আগে”।
উপন্যাসটি শুরু হয় প্রিয়ম ও ঝোরা নামক দুটি ছেলে মেয়েকে কেন্দ্র করে। নতুন ফ্ল্যাটের লিফটে একদিন শান্তশিষ্ট প্রিয়মের দেখা হয় এক চঞ্চল অস্থির ও প্রাণবন্ত একটি মেয়ে ঝোরার সাথে। একই ফ্ল্যাটে বাসিন্দা হওয়া দরুন বারবার দেখা হতে থাকে প্রিয়ম ঝোরার, এবং ঘটনাক্রমে তারা কাছাকাছি আসতে থাকে। কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর তাই কালের নিয়মে প্রিয়মের কাজের জায়গায় যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসে এবং তাদের মধ্যে এক দূরত্বের সৃষ্টি হয়। এবং এই দূরত্বে থাকাকালীন কঠিন ঝোরা যে কোনদিনও কোন ছেলেকে মন দেবে না বলে ঠিক করে ফেলেছিল সে প্রেমে পড়ে যায় প্রিয়মের এবং প্রিয়ম সেই লিফটে দেখার দেখা দিন থেকেই ঝোরার প্রতি পাগল ছিল। সব ঠিক চলছিল সেই কঠিন ঝোরার মধ্য থেকে প্রিয়ম এক কোমল শ্রীময়ীকে খুঁজে বার করেছিল, সূর্যোদয়ের সময় তাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই যে বললাম সময় বড় নিষ্ঠুর, তাই নিজের জন্মদিনের রাতে ঝোরাকে ধর্ষণ হতে হয়। এবং প্রিয়ম সেই সময় ঝোরার সাথে থেকেও কোনোভাবে তাকে ধর্ষকদের হাত থেকে বাঁচাতে পারে না। কি হবে বা তাদের ভবিষ্যৎ? ঝোরা কি সুস্থ হবে কোনদিনও নাকি সারা জীবন সে প্রিয়মের থেকে বহু দূরে চলে যাবে? প্রিয়ম কি কোনদিনও তার ভয়ে কাটিয়ে ধর্ষকদের শাস্তি দিতে পারবে? ধর্ষকরা কি আদৌ শাস্তি পাবে ?নাকি আবার ক্ষমতা তাদের বাঁচিয়ে দেবে, সেটা জানতে হলে সম্পূর্ণ উপন্যাসটি পড়তে হবে। এই গেল উপন্যাসের কথা, এবার আসা যাক উপন্যাসটি পড়ে আমার কেমন লাগলো, আমরা কত সহজেই মেয়েদেরকে বাজে বা চরিত্রহীন বলে দাগিয়ে দিতে পারি। কিন্তু সেই মেয়েটির ভেতরে বা সেই মেয়েটি অতীতে কি কি জিনিস সম্মুখীন হয়েছে তা হয়তো কেউই কখনো ভেবে দেখি না। ভালোবাসা এমন একটা জিনিস যেটা পেলে মরুভূমির মধ্যেও গাছ বিকশিত হতে বাধ্য। এবং ধর্ষণ যে কি বড় সামাজিক অবক্ষয় তা শুধু ধর্ষিতা ও ধর্ষিতার বাড়ির লোক ছাড়া কেউ হয়তো সেভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। আমার কোন প্রথম কোন লেখিকা ধর্ষকদের মনস্তত্ব কি তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন এই উপন্যাসটিতে। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে অনেক জায়গায় ভীষণ ভালো লেগেছে আমার এবং অনেক জায়গায় নিশংসতা করে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে যায় অনেক সময় কাঁদতে কাঁদতে বইয়ের পাতা ভিজে গেছে। এক অসামান্য সৃষ্টি লেখিকার আমি বলব দয়া করে একবার বইটা পড়ুন।