যখন অপশক্তির হাতে জীবনীশক্তি পরাস্ত হতে আরম্ভ করে, যখন অশরীরী অপদেবতার হিংস্র থাবা গ্রাস করতে থাকে একের পর এক গ্রাম, তালুক, শহর, -- ঠিক তখনই কোনও না কোনও উপায়ে সেখানে আবির্ভূত হন পিশাচের যম, অপশক্তির সাক্ষাৎ শমন কালীপদ মুখুজ্জে ওরফে কালীগুণীন। তারপর নিজের অসামান্য তন্ত্রবিদ্যার শক্তি, তীক্ষ্ণ মেধা এবং উপস্থিত বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে বের করে ফেলেন চতুর ও ধূর্ত প্রেতাত্মার বধের উপায়। সেই কালীগুণীনের রোমহর্ষক, গায়ে কাঁটা দেওয়া ছয়টি উপন্যাসিকা নিয়ে “কালীগুণীন ও ছয় রহস্য”।
আপনি একটু কষ্ট করে যদি এই বইয়ের রিভিউ গুলা পড়েন তাহলেই বুঝতে পারবেন এইটা কত খ্যাতি অর্জন করেছে বাজারে । পঁয়ত্রিশ জনের রেটিং এর চিতা-ভাগ ই চারটা তারা দিয়েছেন । তাদের কাছে কালীগুণীন খুব ই ভালো লেগেছে ।এমনকি তারা কালিগুণীনের ভক্তও হয়ে গেছে । এখন মানুষের পছন্দ অপছন্দের তো ঠিক ঠিকানা নাই তাই না ? সুতরাং তাদের আক্রমণ না করাই শ্রেয় । ওসব বাদ দেই আমরা বরং কালীপদ মুখার্জী তে আসি। এই লোক একটা তান্ত্রিক; তয় সে আদারে বাদারে ঘুরা জংলী তান্ত্রিক না, রীতিমত ভদ্রলোক গোছের সংসার করা তান্ত্রিক । গ্রামগঞ্জের লোকজনের যখন প্রেতের যন্ত্রণায় মাথা নষ্ট হয়ে যাইতেছে তখন আমাগো গুণীন ভায়া খুব নাটকীয় ভাবে ঘটনাস্থলে এন্ট্রি নেন । তারপর শুরু করেন ভূতের উপর অমানুষিক অত্যাচার । অত্যাচারের প্রথম ধাপ - পরিচয় প্রদান । অতৃপ্ত আত্মারা যখন মনযোগ দিয়া কাউকে ভয় দেখাচ্ছে বা তার প্রাণ নিয়া ছিনিমিনি খেলার চেষ্টা করছে ঠিক তখনি কোথা থেকে যেন এই লোক আইসা এমনভাবে নিজের পরিচয় দেওয়া শুরু করে যে পারলে প্রেত নিজেই বিরক্ত হয়া সরে পড়ে । কষ্ট করে তাড়ানোর জন্য মন্ত্র পড়াও লাগে না । ‘’আমি ব্রাহ্মণ ,নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস সুন্দরবন রায়দীঘড়া’’ একই ডায়লগ প্রত্যেকটা গল্পে একইরকম একটা চাঞ্চল্যকর মুহূর্তে তিনি একই এস্টাইলে ডেলিভারি দিয়া শুধু ভূতপ্রেতদের না পাঠককেও সমান তালে পীড়ন করেছেন । চারটা গল্পের পড়ার পর আমার অবস্থা অনেকটা এরকম যে ‘’হ ভাই আপনে বামুন, আপনার নাম কালীপদ, আপনি সুন্দরবনের কোন একটা জায়গায় থাকেন এখন ভূত তাড়ায়া আবার সুন্দরবনে যায়া মধু সংগ্রহ করেন গা যান ‘’ ( এইটা নিয়ে যদি সিনেমা বানানো হয় ডিরেক্টার সাহেব কালীগুণীনের একই ডায়লগ বারবার দেওয়ার ঝামেলায় না গিয়ে তারে একটা আইডি কার্ড বানায়া গলায় ঝুলাইয়া দিতো নিশ্চিত)
বেশিরভাগ গল্পে কেউ না কেউ তন্ত্র মন্ত্রের সাধনা করতে যেয়ে গ্রামের মানুষদের কাছে ধরা পড়ে তারপর হেভি ঠ্যাঙানি খেয়ে হয় মরে যায় নাইলে অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে ।বাধ্য হয়ে মৃত্যুর পর প্রতিহিংসাপরায়ণ আত্মা গ্রামের মানুষদের ভয় দেখানো শুরু করে । আর তখনি আমাদের এই ‘’গরীবের তারানাথ’’ এসে তাদের রক্ষা করেন । মাঝেমধ্যে সস্তা ধরনের অতি রঞ্জিত রক্তপাত করা হয়েছে যেমন - পা টেনে ছিঁড়ে ফেলা , শরীর কেটে টুকরাটুকরা করা , শিয়ালের মাথা কেটে সাধনা ,গরু ছাগল থেকে শুরু আরো নানা ধরনের অবলা জীবজন্তু তুচ্ছ কারণে মেরে ফেলা ইত্যাদি সিত্যাদি … আমি বলবো না যে এই বইটি পড়বেন না বরং আমি আরো রেকমেন্ড করতেছি । না না , সত্যি পড়েন । আমি নিজে অর্থ , সময় , ধৈর্য্য অপচয় করে দুনিয়ার লস খেয়ে চূড়ান্ত হতাশ হয়েছি । হতাশ আমি একা হবো কেন তার চাইতে আরো কয়েকজনরে নিয়েই হই । দশে মিলে হই হতাশ , নাহি জিতি নাহি ছাড়ি দীর্ঘশ্বাস । কি আর বলবো ! ঠাকুমারঝুলির শাঁকচুন্নির এপিসোড টা দেখছেন না? ঐখানে শাঁকচুন্নি কে তাড়ানোর জন্য যে হলুদ পোড়া সর্ষেওয়ালা তান্ত্রিক উপস্থিত হন তিনি এই কালীগুণীনের চাইতে অধিক আতংক সৃষ্টিকারী । আমি অনেক চেষ্টা করেও এই বই আমারে কে পড়তে বলছিলো মনে করতে পারলাম না , নইলে তার নামে আমি মামলা করে দিতাম । লেখকের ঠিকানা থাকলে এই বই কুরিয়ার করে পাঠায় দিয়ে বলতাম ‘’দুইশো তেইশ পৃষ্ঠার রহস্য ফহস্য লেখছেন ভালো করছেন এখন কষ্ট করে পুরা বই টা পড়েন আর আমারে ভয় পেয়ে রোমাঞ্চিত হয়ে দেখান ‘’ এইটা যদি ভৌতিক রহস্যের কাহিনী হয় এবং কালীগুণীনরে তান্ত্রিক হিসেবে বিশ্বাস করেন তাইলে তারানাথ তো মনের দুঃখে তন্ত্রমন্ত্রর ধান্দা বাদ দিয়া বলাকা সিনেমেহলের সামনে ব্ল্যাকে টিকিট বেচা শুরু করবে নাইলে কাঁচাবাজারে আলু,পেঁয়াজ ,পটল, কুমড়া, লাউ নিয়া বসবে । কি কি যে লিখেছেন ভদ্রলোক ! এইসব এক বছরের আবুরে শুনাইলেও সে পরম শান্তিতে ঘুমায় পড়বে । ভয় লাগে না কিছু না যত্তসব ; আমার অবশ্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে । আমি আর ভূত টুত তন্ত্রফন্ত্র হাবিজাবি পড়তেছি না । আমার এই বছরে ভয় পাওয়ার কোটা শেষ, আর ভয় পাওয়ার চেষ্টা করে ফায়দা নাই । এরপর যদি নিতান্তই ভয় পাইতে ইচ্ছা করে তাহলে না হয় ঐ মহেশের মহাযাত্রা , ভূষন্ডির মাঠে, ভুলোর ছলনা , মোক্তার ভূত , হরির হোটেল …প্রভৃতি রিভাইজ করে ভয় পাইয়া নিবো । না , কোন তারা টারা আমি দিচ্ছি না । আমার প্রত্যেকটা তারা সেকেন্ডে ধৈর্য্য প্রসব করে । এই তারা আমি দরকার হইলে ইস্টিফেন মেয়ারের ট্যুইলাইটে ডোনেট করে দিবো কিন্তু এখানে আর কোন অপচয় না। বইয়ের কভার টা দেখছেন ! হেহ! মন খারাপ অবস্থায় কিছুক্ষণ কভারের দিকে তাকায় থাকলে এমনিই হাসি চলে আসে ।
অদ্ভুত এক গুণীন কালীপদ মুখুজ্জে। ওরফে কালীগুণীন। চেহারায় অদ্ভুত কাঠিন্যে। কিন্তু চোখে খুঁজে পাওয়া যায় আশ্রয়, নিরাপত্তা। ভূত, প্রেত, অশুভ শক্তির জম। মন্ত্র, সাধনা, বিজ্ঞান দিয়ে তিনি শাস্তি দিয়ে থাকেন অশুভশক্তি বা সত্ত্বাদের। কিন্তু এগুলো কোনটাই এই ডাকসাইটে গুনীনের মূল অস্ত্র নয়। তার মূল অস্ত্র হল বিচক্ষণতা।
এই বইয়ে উঠে এসেছে ছয়টি রহস্য বা ছয়টি অপশক্তির গল্প। যেগুলো কালীগুণীন সমাধান করেছে। রহস্যগুলো হল, কানাওয়ালার ফাঁদ, নেত্রপানির বিভীষিকা, চন্দ্রপিশাচ রহস্য, রক্তগন্ধা রহস্য, হোগলামারীর নরঘাতক ও আপাই। ব্রিটিশ গ্রামীন ভারতের বা কলকাতার আশেপাশের গ্রামের প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে গল্পগুলোর প্লট। প্রত্যেকগল্পেই কালগ্রাসী অশুভ শক্তি গ্রামগুলোকে আক্রমন করে আর সেখানে কাকতালীয় বা কোনো না কোনোভাবে হাজির হন কালীগুনীন। এরপর সমাধান করেন সেই অপদেবতার রহস্য ও বিতাড়িত করেন এদেরকে।
গল্পগুলোর প্লট সাধারণ ভূতের গল্পগুলোর মতোই। তবুও গল্পগুলো আর দশটা গল্প থেকে আলাদা। কারণ হচ্ছে কালীগুণীন। বেশ চার্মিং একজন গুণীন সে। সবথেকে যেটা মনে ধরেছে তা হল, কালীগুনীনের উপস্থিত বুদ্ধি যুক্তি ও বিচক্ষণতা দিয়ে রহস্যের খোঁজ করা ও সমাধান করার পদ্ধতি। সে আর দশটা গুনীনের মত মন্ত্র বা জাদুর ওপর নির্ভর করে না। বুদ্ধিও খাটায়। এটা দেখেই কালীগুনীনের ভক্ত বনে গেছি।
গল্পগুলোয় হালকা ভারতীয় মিথলজির ছোয়া ছিল। এছাড়া বেশ গ্রিপিং ও ফাস্ট পেসড। আশা করি লেখক সৌমিক দে পরবর্তীতে এই কালীগুণীনকে নিয়ে আরো কাজ করবেন। দুই বাংলার হরর প্রেমীদের জন্য মাস্টরিড একটা বই।
কালীপদ মুখুজ্জে ওরফে কালীগুণীন। নিবাস রায় দিঘরা। রহস্য সন্ধানী গোয়েন্দা সুলভ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে শত্রু কে ঘায়েল। এটাই কালীপদ বাবুর জনপ্রিয়তার অন্যতম অংশ।
তারানাথ তান্ত্রিকের প্রভাব বেশ ভালভাবেই রয়েছে বাংলা ভাষার অতিপ্রাকৃত গল্পের লেখকদের ভেতরে। এটাও তার বাইরে নয়। অনেকদিন পর মনে হলো তারানাথ তান্ত্রিক গল্পের ফিল পেলাম। লেখাও হয়েছে ঐ আদলেই।
মজাদার ৬ টি গল্প, খানিকটা একই থিমে লেখা, শুরুতে পিশাচের উপদ্রব, গ্রামবাসীদের সংকট আর সেই সংকটের সমাধানে আবির্ভাব কালীগুণীনের।
সম্পূর্ণ বৈঠকি চালে বলা গল্পগুলো পড়তে বেশ ভালোই লাগলো। প্রাচীন বাংলার বিভিন্ন প্রচলিত ভূতপ্রেত নিয়ে গল্পগুলোর নায়ক কালীপদ গুণীন। প্রচণ্ড শক্তিমান কোন অশুভ শক্তির আবিরভাবে যখনই কোন জনপদ পর্যুদস্ত, তখনই সেখানে হাজির নায়ক কালীগুণীন। ভাল দিক বলতে কালীগুণীন সুকৌশলে, সমস্যার মূল অনুসন্ধান করে অশুভ রাক্ষসের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করেন; দুমদাম বাজি পটকার মতন মন্ত্র ঝেড়ে বসেন না। লেখক গল্পের সেটাপ হিসেবে গ্রামবাংলাকে বেছে নিয়েছেন, আমার মতে বাংলা ভাষার যাবতীয় ভৌতিক অলৌকিক রচনার জন্য গ্রামের চেয়ে ভাল কোন জায়গা হয় না। অমাবস্যা, বাঁশবন, শ্মশান এসবের ছত্রছায়া পেলেই আমার মনে মনে একটু ভৌতিক গল্পের আবহ তৈরি হয়েই যায়। তবে লেখক কিছু বর্ণনায় তাড়াহুড়ো করেছেন, আবার কিছু অংশ দীর্ঘ না করলেও হয়তো হতো।
গল্পে ভাষার মিষ্টতা, অসাধারণ বচনভঙ্গী , সাবলীল ও স্পষ্ট থাকায় আমার কাছে বেশি আর্কষণ কেড়েছে।
ঝড়বাদলার রাতে লোডশেডিং-এর পর বা শীতের নিঃশব্দের রাতে পড়লে গায়ে কাঁটা দিয়েও উঠতে পারে।
বছরতিনেক আগে মূলত ভূতভুতুম গ্রুপে 'ব্যোমকেশ সূর্য বক্সী' নামের এক ভদ্রলোকের লেখা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। মানুষটি যে-সব গল্প লিখতেন সেগুলো ভালো-মন্দ-র লেভেল ছাপিয়ে দস্তুরমতো তাক-লাগানো স্তরে পৌঁছে যেত। গ্রুপে ও গ্রুপের বাইরে সেই গল্পগুলোর জনপ্রিয়তা ছিল ঈর্ষণীয়। তবে গল্পগুলোর দুটো বৈশিষ্ট্য আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছিল। প্রথমত, গল্পগুলোর ন্যারেটিভ ছিল সেকেলে বৈঠকী গল্পের অনুরূপ। অথচ বাক্যগঠনে ও গড়নে সেগুলো ছিল ঘোর আধুনিক, বিশেষত ফেসবুকে নিমজ্জিত পাঠকদের জন্য একেবারে যথাযথ। পুরাতন ও নবীনের এই সমন্বয়টি আমার দুর্দান্ত লেগেছিল। দ্বিতীয়ত, বাহ্যিক কাঠামোর দিক দিয়ে এই গল্পগুলোর সঙ্গে তারানাথ তান্ত্রিকের কিছুটা সাদৃশ্য আছে। এতে কোনো গ্রাম বা লোকালয়ে একটা অলৌকিক সংকট তৈরি হয়। সেখানে হয় অযাচিতভাবে, নয়তো আমন্ত্রিত হয়ে এসে পৌঁছোন কালীপদ মুখুজ্জে, নিবাস রায়দীঘড়া। তারপর তাঁর প্রজ্ঞা ও সাহসের সংযোগ ঘটে অপশক্তিটিকে পরাস্ত করে। কিন্তু এই গল্পগুলোর মধ্যে একটা গার্হস্থ্য রস ও ধার আছে যা তারানাথের দর্শন ও কিছুটা নির্মোহ কার্যক্রমের সঙ্গে মেলে না। বরং মনে হয়, শতাধিক বর্ষ আগের বাংলার পটভূমিতে লেখা হলেও ষড়রিপু-শাসিত আজকের সমাজের জন্যই একেবারে মানানসই রূপে ও শক্তিতে আবির্ভূত হয়েছেন এই বিপত্তারণ। সেই গল্পগুলো গ্রুপে ও গ্রুপের বাইরে বহু অক্ষম অনুকরণের জন্ম দিয়েছিল। তবে জেনুইন জিনিসের ছ'টি বাছাই-করা নিদর্শন স্থান পেল এই ঝকঝকে বইয়ে। তারা হল~ ১) কানাওলার ফাঁদ ২) নেত্রপাণির বিভীষিকা ৩) চন্দ্রপিশাচ রহস্য ৪) রক্তগন্ধা রহস্য ৫) হোগলামারির নরঘাতক ৬) আপাই এই গল্পগুলো বহুলপঠিত, প্রশংসিত এবং চর্চিত। তাই তাদের সারসংক্ষেপ আর আলাদা করে পরিবেশন করছি না। আমার নিজের গল্পগুলো নতুন করে পড়তে গিয়ে মনে হল যে এতে কালীগুণিনের চরিত্র নয়, বরং অলৌকিক বিপদের বিভিন্ন উৎসই পাঠকের কাছে বেশি কৌতূহলোদ্দীপক। সেজন্যই, চারদিকে এত পরিমাণে 'তান্ত্রিক হরর'-এর উৎকট উপস্থিতির মধ্যেও এই বই বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে। বিপদের এই 'বৈচিত্র্য' এবং তার মোকাবিলায় কালীগুণিনের নানা বুদ্ধিদীপ্ত কৌশলই এই গল্পগুলোর মুখ্য আকর্ষণ। সৌমিক পাঠকের নাড়ি বুঝে লিখতে জানেন। তাঁর এই লেখনীকে যথাসাধ্য সঙ্গত করেছে বিভা পাবলিকেশন। তাই বানানগত শুদ্ধতা ও মুদ্রণের পারিপাট্যর দিক দিয়েও এই বই আর পাঁচটা ধর্-তন্ত্র-মার্-পাঠক বইয়ের থেকে বেশ কিছুটা উন্নত হয়ে উঠতে পেরেছে। লেখককে শুভেচ্ছা জানাই। তাঁর পরবর্তী বইটি পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।
কালীগুণিন ও ছয় রহস্য >> সৌমিক দে >> বিভা >> মুদ্রিত মুল্য : ২২২ (দুইয়ে দুইয়ে চার হয়। আরও দুই লাগিয়ে ছয়। তাইকি ছয় রহস্য?) . কানাওলার ফাঁদ নেরত্রপাণির বিভীষিকা চন্দ্রপিশাচ রহস্য রক্তগন্ধা রহস্য হোগলামারির নরঘাতক আপাই . শেষের নভেলাটি বাদ দিলে, বাকি পাঁচটি গল্পের কাঠামো একদম এক - ১. স্থান - একটি অজপাড়া গাঁ, কাল - ব্রিটিশ শাসনাধীন বাংলা, পাত্র - জনৈক সূত্রধর যিনি ঠাকুরদা বা জ্যাঠামহাশয়ের ধাঁচে গল্পের আসরে আমাদের গল্প বলছেন। ২. গল্পের প্রথম ছয় পাতার মধ্যেই আবির্ভাব হবে গল্পের খলনায়ক/নায়িকার, এবং পরের পাঁচ পাতার মধ্যেই তাঁরা মৃত্যুলাভ করবে কোন অভিশপ্ত সময় বা অপঘাতে এবং প্রাপ্ত হবে প্রেতযোনিতে। ৩. শুরু হবে প্রেতলীলা। গ্রামের লোক একে একে মরতে শুরু করবেন বীভৎস ভাবে। গ্রামবাসীরা কোন এক স্থানীয় গুণিন বা ওঝার দ্বারস্থ হবেন, তাঁদের সমস্যা নিয়ে। খুব চেষ্টা করেও, সেই "প্রাথমিক চিকিৎসক" নিজেই পঞ্চত্বপ্রাপ্তি লাভ করবেন, রোগের হাতে। অবশ্য, অভিশপ্ত হত্যায় পঞ্চত্বলাভ হয় কি? ৪. প্রাথমিক চিকিৎসার এরূপ হাল দেখে, কেউ গাঁ ছেড়ে পালাবে। বাকিরা ঘরবাড়ি ব্যারিকেড করে দাঁতকামড়ে পড়ে থাকবেন। প্রাণ যায় যাক, ভিটেমাটি আগে। হয়ত স্বপ্নেও বা আমাদের নায়ক দেখা দিয়ে এনাদের আশ্বস্ত করে থাকবেন - "সম্ভবামি যুগে যুগে" রূপে। ৪. তা, কাহিনীর দুই তৃতীয়াংশ এরূপ মৃত্যুলীলা চলার পর এই বহু আকাঙ্ক্ষিত লাইনটি আসবে - "ব্রাহ্মণ। নাম- কালীপদ মুখুজ্যে। নিবাস- রায়দীঘড়া"। "নাম তো সুনা হি হোগা" স্টাইলে এন্ট্রি নেবেন উদ্ধারকরতা। ইনিই তিনি। "তারানাথ Lite" বলা যাবে কি? ৫. নায়ক বেশ অমায়িক। রোগ বলে দিলেও, উপাচারের বিধি-বিধান সম্পর্কে তিনি তখনি সিদ্ধান্তে আসতে পারেন না। কিছু যেন একটা স্মৃতির আড়ালে থেকে যায় তাঁর, অবস্থার রূপ মেপে নিতে তাঁর আরও একটু সময় লাগে। এবং স্পষ্টবাকে সেটা জানানও দেন তাঁর অসহায় ভক্তদের। ৬. বাকি উপাচারের অবলম্বন হয়ে আসে/আসেন কোন এক "ছোট পার্শ্বচরিত্র", যার সাধারণ সম্পর্কহীন কথা থেকে মারণকাঠি টেনে আনেন কালীগুণিন। এরপর নিজের অমায়িক চরিত্র অনুযায়ী, তিনি শতকণ্ঠে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সেই Hint-প্রদানকারী, স্বভাবে নির্মল ব্যাক্তিকে। ৭. ব্যাস, এবারে চাবিকাঠি পাওয়া গেছে। কিন্তু আমাদের গল্পের প্রতিদ্বন্দ্বী যথেষ্ট শঠ। তা ঘি-বের করতে তাই স্বভাবতই প্রয়োগ হবে বক্র অঙ্গুলীর। এরূপে নটে গাছটি ফাইনালি মুরাবে। . উপরের একঘেয়ে গল্পের গঠনে আড়ষ্ট না হলে যা উল্লেখযোগ্য বা উপভোগ করা যেতে পারে - ক. ফেলে আসা গ্রামবাংলার শৈলীতে কথকতা "ভানো নাগবে", যদি আপনি বর্ণসংস্থাপনের ভুলগুলি এড়িয়ে যান। খ. পৌরাণিক বা লোকধারা উৎসের উল্লেখ থাকলেও, তা নিয়ে কচকচানি নেই। ইনফ-ডাম্পিং-এর পথে না গিয়ে গল্পের ঘটনাপ্রবাহ (পড়ুন : পরের বৈশিষ্টসুলভ খুন)- চিত্রণেই কলম চালিয়েছেন লেখক। গ. এরূপ দ্রুতমতি গল্পে চরিত্রায়ন খোঁজা বৃথা। তাই একমাত্রিক কাগুজে চরিত্রদের স্রোতে গা-ভাসাতে পারলেই ভালো। ঘ. পাঠক যদি অন্ধকার পরিবেশে, লন্ঠন বা হারিকেনের টিমটিমে আলোয়, কাঁথামুড়ি দিয়ে পুরানো গ্রামকেন্দ্রিক ভৌতিক কাহিনীর আবেশ চান, তাহলে এই গল্পগুলি আপনার ভালো লাগতে পারে। ঙ. যারা নতুন গল্পপড়া শুরু করছেন তাঁদের কাছে এই ভৌতিক কাহিনীগুলি Recommend করা যেতে পা��ে, ছোট মুখরোচক জলখাবার হিসেবে। তবে বিরিয়ানির স্বাদ পাবেন না। শেষের নভেলাটি যদিও কিছুটা হলেও সেই ঘাটতি পূরণ করেছে। চ. গল্পগুলি ওয়ানটাইম রিড। এক "রক্তগন্ধা" বাদে, বাকি গল্পের সমস্যার সমাধানে যা ইন্ধন লেগেছে তা নেহাতই শিশুসুলভ। spoiler দিতে ইচ্ছুক নই বলে এটুকুই বললাম এখানে। ছ. বইটির প্রচ্ছদ যথাযত না হলেও, গল্পগুলির অলঙ্করণ সত্যিই সুন্দর। . এসত্তেও বইটি হয়ত কেনা যায় এর শেষ নভেলাটির জন্যে। বাকি কাহিনীগুলি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এই আখ্যান - ভয়, মানবিকতা, লোকধারা, বিজ্ঞান, ছড়ার মিশেলে লেখকের সম্ভাব্য শক্তির দিকনির্দেশ দিতে সক্ষ���। এই কাহিনীটির কারণেই বইটি মনে থেকে যেতে পারে পাঠকের। হাতে পেলে পড়ে ফেলতে পারেন।
সব মিলিয়ে পুরোনো আমলের ভুত প্রেতের গল্পের সাথে তন্ত্র মন্ত্র মিশিয়ে লেখা গল্পগুলো। ভালোই। সাড়ে তিন তারা রেটিং দিলাম। ছোটবেলার ভুতের গল্পের স্বাদ পেতে চাইলে পড়ে ফেলতে পারেন।
ছোটবেলায় যতগাছিক ভুতের গল্প শুনিচি তার সিংহভাগই ছিল আমার সেজো মামী মার কাছ থেকে শোনা । তার প্রত্যেকটা গল্পই ছিল রোমহর্ষক। গল্প শুনে আর বাড়ি আসতি পারতাম না। মামীমাকে অথবা অন্য কাউকে পৌছাই দিয়ে যাতি হতো । তো যা কচ্ছিলাম, এই বইয়ের প্রত্যেকটা গল্পই যেন আমার সেই মামীমার ছাঁচে ঢালা। প্রত্যেকটা গল্প পড়িছি আর মামী মাকে ভীষণ মিস করিচি ।
তো মামীমার জন্যি হোক কিংবা লেখকের কেরামতি হোক প্রত্যেকটা গল্পই বেশ পছন্দ হয়েচে। লেখক বেশ জম্পেশ গল্প লিখিচেন বটে। সবচেয়ে যেটা পছন্দ হয়েচে তা হলো লেখকের গল্প বলার ঢং। ভাষা ছিল প্রাঞ্জল কিছুটা গ্রাম্য স্টাইলে। বিশেষ করে এ ভাষায় কথা কতি আমারো ভীষণ ভালো লাগে।
লেখকের আরো একখান বই (কালিগুনিনের কিস্তিমাত, মানে ২ নাম্বার পর্ব) যোগাড় করিচি। এখন মহা ধুমধামে লাগব আরকি। দেখা যাক এখান ঠিক মতোন মনে ধরে কিনা।
“The charm of horror only tempts the strong” ― Jean Lorrain - "কালীগুণীন ও ছয় রহস্য - কালীপদ মুখুজ্জে, রায়দীঘড়ায় বসবাস করা এক ব্রাহ্মণ গুণিন। তাকে ঘিরে ছয়টি অকাল্ট ঘরানার রহস্য গল্প নিয়ে লেখা হয়েছে "কালীগুণীন ও ছয় রহস্য"। বইটি প্রথমে ভারতের বিভা পাবলিকেশন্স এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের চিরকুট প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। - কানাওয়ালার ফাঁদ : নেকড়েমারি নামক এক এলাকায় হারাণ বাগদী নামের এক ব্যক্তির কানাওলা নামের এক সত্তায় পরিণত হওয়া এবং কালিগুণীনের সে সত্তাকে মোকাবেলা করা নিয়ে গল্প। কালীগুণীন এর সূচনা গল্প এটিই। বাকি গল্পগুলো থেকে এটিকে কিছুটা দুর্বল লাগলো। - নেত্রপাণির বিভীষিকা : নেত্রপাণি, সুন্দরবনের কাছের এক অঞ্চল। সেখানে গিয়ে আখড়া গাড়লো দুইজন তান্ত্রিক - ভৈরোনাথ ও কালকেতু এবং ভৈরবী মাতঙ্গী। জমিদার ত্রিবিনেন্দ রায়চৌধুরী তাঁর লোকজন কে নিয়ে তাদের নিকেশ করেন। এর একশো বছর পরে আবারো জেগে উঠে তাদের প্রেত। ঘটনাচক্রে তাদের দেখা হয়ে যায় কালীগুণীন এর সাথে। এই গল্পটি ভালো লেগেছে, বিশেষ করে নানা ধরনের অতিপ্রাকৃতিক প্রাণীর ব্যবহার। শেষের টুইস্টটাও চমকপ্রদ ছিল। - চন্দ্রপিশাচ রহস্য : হিজলপোতা পরগণায় বাস করে সূদন এবং তার স্ত্রী ক্ষনা। তাদের বাবা মধুসুধন বিখ্যাত ওঝা। এক রাত্রে বাসবানন্দ নামের এক সাধু আসে তাদের কুটিরে। তার কাছ থেকেই বিলুপ্ত এক জিনিষের দেখা পায় তারা। নানা ঘটনাচক্রে এ ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন কালীগুণীন। এই গল্পটি ভালো ছিল, বিশেষ করে উপস্থিত বুদ্ধি এবং মহাভারতের কানেকশনটা। - রক্তগন্ধা রহস্য : চন্ডীতলা তালুক, বিহার প্রদেশের কাছের এক পাহাড়ি অঞ্চল। সেখানে বাস করতো মৈনাক চাটুজ্যে। সেখানেই নানা ধরনের অদ্ভুত কাজ কারবারে ব্যস্ত থাকতো সে। কিন্তু তার এক বড় কাজের আগেই তালুকবাসীরা বাঁধা দেয় তাকে। এ কারণে তালুকের নানা গ্রাম এক রাতের ভিতরে মাটির নিচে পিষে যেতে থাকে। সে তালুকে থাকা এক লোকের ভাইয়ের পরিচিত হওয়ায় সেখানে হাজির হন কালীগুণীন । এ গল্পটার শেষ টা বেশ ইন্টারেস্টিং। - হোগলামারির নরঘাতক : জীবনান্দ এবং মহানন্দ দুই ভাই, হোগলামারি নামক এক এলাকায় ছোটখাট জমিদারী সামাল দেয়। তাদের ছেলে শিবার সাথে পরিচয় হলো সুলতার। কিন্তু কিছুদিন পড়ে এক ভয়াবহ সত্য আবিষ্কার করলো সে। এর প্রেক্ষাপটে শুরু হলো ভয়াবহ কায়দায় খুন। জীবনান্দ ডেকে পাঠালেন তার সাথে এক কেসে পরিচিত হওয়া কালীগুণীনকে। এই গল্পটাও কিছুটা টিপিক্যাল মনে হলো, যদিও গ্রাম্য রাজনীতি এবং ধর্মান্ধতার বিষয়গুলো বেশ ভালোই লাগলো। - এবার আসি আমার দৃষ্টিতে সংকলনের সেরা গল্প "আপাই" তে। সাদা ধোঁয়ার মত এক প্রানী আতংক ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে কালীগুণীনের গুরুর এলাকায়, তার বিহিত করতেই অনেক বছর পড়ে সেই এলাকায় আসেন তিনি। শুরু থেকে শেষ, পুরোটাই দারুন লাগলো এই গল্পের। এক পর্যায়ে হররের সাথে সাই ফাই কনসেপ্টও মিশে গিয়ে গিয়েছে এতে। ওভার অল দুর্দান্ত এক গল্প। - এক কথায়, তারানাথ তান্ত্রিকের পরে এ ধরনের অকাল্ট হরর/থ্রিলার নিয়ে অনেকদিন পরে একটি দারুন বই পড়লাম। পিরিওডিক্যাল প্লট বলে আগের দিনের ভাষায় ব্যবহার এবং লেখনীও চমৎকার লাগলো।"কালীগুণীন ও ছয় রহস্য" বইটির প্রোডাকশন ভালোই লাগলো। প্রচ্ছদ এবং ভিতরের অলংকরণও দারুন। যারা হরর বিশেষ করে তারানাথ তান্ত্রিকের মতো গ্রামবাংলার হরর পড়তে চান তারা বইটি পড়ে দেখতে পারেন।
ফেসবুক,গুডরিডসে মোটামুটি ভালো রিভিউ দেখে বইটা কিনেছিলাম। কিন্তু পড়ে পুরোপুরিই হতাশ। বইয়ে মোট ছয়টা গল্প আছে। প্রথম চারটে জঘন্য। মনে হচ্ছিল গল্প নয়,এ যেন বাচ্চাদের কার্টুন চলছে। পঞ্চম গল্পটা মোটামুটি চলে। বইয়ের শেষ গল্পের শুরুটা দারুণ ছিল,আমিও আশায় বুক বাঁধলাম, এইবার বুঝি টাকাটা উশুল হবে... কিন্তু শুরুটা যত ভালো,গল্পের শেষটা ততোটাই খারাপ। টাইমট্রাভেল,হরর এলিমেন্ট সহ আরো হাবিজাবি মিলিয়ে একটা জগাখিচুড়ি পাকানো হয়েছে যেন।
লেখক সৌমিক সেনের লেখনী নিয়ে কিছু না বললেই নয়, সম্ভবত এটা উনার প্রথম বই। শুরুর গল্পগুলোতে সেটা স্পষ্টতই টের পাচ্ছিলাম। খাপছাড়া লেখনী, ভীষণ সিনেম্যাটিক প্লট,কালীগুণীনের কার্যকলাপ...সবকিছু মিলিয়ে এ যেন বাচ্চাদের গল্পের অ্যানিমেটেড চিত্রায়ন। অবশ্য শেষের গল্পে লেখক চেষ্টা করেছিলেন ভালো কিছু দেওয়ার। কিন্তু ঘুরেফিরে হতাশই হতে হলো।
বইটির রিভিউ সেই মাপের বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। কেউ বলছে অসাধারণ, আবার কেউ বলছে পাতে তোলার অযোগ্য! একই বইয়ের এমন রিভিউ ভাগ্যিস আমি বই শেষ করার পরে পড়েছি। নাহলে যে কি হতো!
যাই হোক, বইটা দুর্দান্ত এমন বলবো না। আবার তিন তারা দেয়ার অযোগ্য এমন ও না। টিপিকাল তান্ত্রিক এর মতো শুধুই তান্ত্রিক না একই কলীগুনিন বা কালীপদ মুখুজ্জে। একটু তান্ত্রিক, একটু যেন অনুসন্ধানী, আর অনেকটা মানবিক।
শেষ গল্পটার জন্য সাড়ে তিন দেয়া গেল, নাহলে ৩ দিতাম। লেখার ধরণের কারণেই সম্ভবত, হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ার মত কিছু পাওয়া যায়নি। তারানাথ তান্ত্রিকের সাথে তুলনা করে লাভ নেই, বিভূতিবাবু আর তারাদাসবাবু সোনার কলম নিয়ে জন্মেছিলেন, ওরকম এক শতাব্দীতে আসে না, তবে সিরিয়াস হরর লিখতে গিয়ে ভাষাটা কিশোরসুলভ হলে ব্যাপারটা বেখাপ্পা হয়ে যায়। তবে গল্পের ভূতপ্রেতগুলো নতুন ধরণের, গল্পগুলোও আমার ভাল লেগেছে, যে যা-ই বলুক, লাইট রিডিংয়ের জন্য ভাল। শুধু একটা বিষয়, লেখকের মাথায় মনে হয় জেমস বন্ডের পোকা আছে, সেজন্য ৬টা গল্পেই "বন্ড, জেমস বন্ড" স্টাইলে "ব্রাহ্মণ, কালীপদ মুখুজ্জে" ডায়ালগটা জুড়ে দিয়েছেন। লেখকের উদ্দেশ্য হয়তো ছিল একটা নাটকীয়তা আনা, কিন্তু সেটা ২-১টা গল্পে হলে চলতো, ৬ বারই একই ডায়ালগ দেয়াতে শেষ দু'বার খ্যাক খ্যাক করে হেসেই ফেলেছি। বইয়ের প্রচ্ছদটাও সেজন্য দায়ী, গুণীনের বদলে কালীপদকে মার্ভেল কমিকসের গুণ্ডার মত লাগছিল। ভাষা নিয়ে আরেকটু কাজ করলে আর এই মুদ্রাদোষগুলো কাটাতে পারলে ভবিষ্যতে ভাল কিছু আশা করা যায়।
নেকড়েমারি গ্রামে নেমে এসেছে আতঙ্ক। একের পর এক মানুষ খুন হচ্ছে। পুরো গ্রামে থমথমে পরিবেশ। কীসের অভিশাপ নেমেছে বুঝতে পারলেও পরিত্রাণের উপায় জানা নেই গ্রামবাসীর। তখনই ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন কালীপদ মুখুজ্জে। জাতে ব্রাহ্মণ, পেশায় গুণীন। ঋজু দেহ, পরনে ধপধপে সাদা ধুতি আর কামিজ। কালী গুণীন উদ্ধার করেন গ্রামবাসীদের। যতটা না তার মন্ত্র তন্ত্রের বলে, তারচেয়ে বেশি বুদ্ধির জোরে। বুদ্ধির খেলাতেই তিনি হারিয়ে দেন খারাপ শক্তিকে।
'কালীগুণীন ও ছয় রহস্য' বইটি ছয়টি দুর্দান্ত অতিপ্রাকৃত গল্পের সমন্বয়ে। প্রথম গল্প 'কানাওলার ফাঁদ'-এ কালীগুণীনের আবির্ভাব। আরও রয়েছে 'নেত্রপাণির বিভীষিকা', 'চন্দ্রপিশাচ রহস্য', 'রক্তগন্ধা রহস্য', 'হোগলামারির নরঘাতক' এবং 'আপাই'। ওপার বাংলার পর এদেশেও বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। ... ... ... পাঠ প্রতিক্রিয়া : পড়ার সময় মনে হচ্ছিল যেন ঠাকুরমার ঝুলির গল্প পড়ছি। ভাষাগত বৈচিত্র্য সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন করেছেন লেখক। গল্পের প্লটগুলো গ্রাম ভিত্তিক, সাথে পৌরাণিক কাহিনীর মিশেল। গল্পের প্লটগুলো দুর্দান্ত। তবে সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর যেই ব্যাপারটা তা হল কালীগুণীনের বুদ্ধিমত্তা। অপশক্তির বিরুদ্ধে বুদ্ধি দিয়ে যেভাবে সমস্যার সমাধান করেছেন, তার তুলনা নেই। এজন্য লেখকের প্রশংসা করতেই হয়। গল্পগুলো দারুণ উপভোগ্য। তবে অসাধারণ প্লটগুলোও কিছুটা একঘেঁয়ে মনে হয়েছে। প্রতিটি গল্পের শুরু একই ধাঁচে। একেকটা গ্রাম আক্রান্ত হয়। একের পর এক মানুষ মরতে শুরু করে। তারপর হুট করে সেখানে হাজির হয় কালীগুণীন। ঠিক যেন নায়িকাকে বাঁচাতে বাংলা সিনেমার নায়কের আবির্ভাবের মতন। তবে এটা বলতেও বাঁধা নেই, তার ঘটনা স্থলে উপস্থিত হবার রোমাঞ্চটুকু লেখক দারুণ ফুটিয়েছেন। আর শেষ গল্প 'আপাই' এর বেলায় একটা কথাই বলা যায়, জেতার জন্য শেষ বলে চার রান দরকার ছিল। লেখক ছয় মেরে জিতিয়েছেন।
অনেকের মনেই প্রশ্ন আসবে, বইটা কতটা ভয় পাওয়াতে সক্ষম ? আমি বলবো ভয় লাগার মতো না, তবে পড়ে বেশ মজা পেয়েছি।অনেকেই বলেছে খারাপ বা শিশুসুলভ, আমার তো অত খারাপ লাগেনি কই। যাই হোক, প্রথমেই বলতে চাই, লেখকের গল্প বলার ধরনটা খুবই ভালো লেগেছে, যেনো লেখক আমাকে উদ্দেশ্য করেই বলছেন কথাগুলো। ভাষা সহজবোধ্য, সুন্দর হয়েছে। কালীগুনীনের চরিত্রটা খুবই ভালো লেগেছে, বার বার কৃষ্ণানন্দ আগম বাগীশের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। আমি তো লেখকের ফ্যান হয়ে গিয়েছি। বইটাতে মোট ৬টা গল্প আছে - ১) কানাওয়ালার ফাঁদ ২)নেত্রপাণির বিভীষিকা ৩)চন্দ্রপিশাচ রহস্য ৪)রক্তগন্ধা রহস্য ৫) হোগলামারির নরখাতক ৬)আপাই
প্রতিটা গল্পই কমবেশি ভালোই। ছোটো ছোটো গল্প, চট করে পড়ে ফেলা যায়। আর কালীগুনীনের তীক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তা আপনাকে মুগ্ধ করবেই। গল্পগুলো আগেকার দিনে যেসব ভূতের কথা প্রচলিত ছিল, বলতে গেলে তাদের নিয়েই, যেমন -বিদেহী আত্মা কানাওয়ালা, পিশাচ আপাই, চন্দ্র পিশাচ এসব নিয়েই। সব মিলিয়ে বইটি বেশ উপভোগ্য।
* আপাই গল্পটি pocketFM অ্যাপে অডিও স্টোরি হিসাবে আছে, কেউ চাইলে শুনতে পারেন।
-কে আপনি? - ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস রায়দীঘড়া।
ব্যস, কালী গুণীন চলে এসেছেন, এবার যাবতীয় আধিভৌতিক সমস্যার শেষ। ছয়টা গল্প রীতিমতো খাঁটি রসগোল্লার মতো তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করলাম। কতদিন পরে এত তৃপ্তি নিয়ে অকৃত্রিম ভূত প্রেতের গল্প পড়লাম, জানি না। লেখক গল্প বলার ঢং, ভাষা, সময়কাল সবকিছুই এত ভালো ছিল যে মনে হচ্ছিলো তারাশঙ্কর বা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলের কোন বই পড়ছি। একেবারে মাটির গন্ধ মেশানো গল্প আর একেক রকমের পিশাচের কাণ্ডকারখানা পড়ে গা শিউরে উঠেছে। এমন বই পড়ে ভয় পেয়েও আনন্দ লাগে।
কালীপদ মুখুজ্জের চরিত্রটা আমার খুবই ভালো লেগেছে। এরকম হাসিখুশি, প্রাণখোলা বিনয়ী তান্ত্রিকের সাথে আগে কখনো পরিচয় হয়নি। আশা করি লেখক কালীগুণীনকে নিয়ে আরো কিছু বই লিখবেন। এত সুন্দর একটা বই লেখার জন্য লেখকের প্রতি টুপি খোলা অভিনন্দন রইলো।
পাঠপ্রতিক্রিয়া : কালীগুণীন ও ছয় রহস্য লেখক : সৌমিক দে
মজাদার ৬ টি গল্প, খানিকটা একই theme এ লেখা, শুরুতে পিশাচের উপদ্রব, গ্রামবাসীদের সংকট আর সেই সংকটের সমাধানে আবির্ভাব কালীগুণীনের। তবু ৩ টি গল্প নিয়ে আলাদা করে বলতে হয়, নেত্রপাণির বিভীষিকা. বাংলায় পিশাচ গুনীণ নিয়ে এরকম humorous গল্প আমার প্রথম পড়া। চা নিয়ে লেখকের একটা আলাদা emotion আছে কি, জানার অপেক্ষায় থাকলাম। 😊 রক্তগন্ধা রহস্য. পাঠক কল্পনাও করতে পারবে না, হত্যাকারী কে!! আপাই. ওস্তাদের মার শেষ রাতের মতোই probably বই এর best গল্পটি জায়গা পেয়েছে বইয়ের একদম শেষে। অসামান্য উপায়ে শেষ হয়েছে এই গল্প।
Over all বইয়ের প্রচ্ছদে না গিয়ে গল্প গুলো পড়ুন। Undoubtedly ভালো লাগবে।
- ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস সোঁদরবনের (সুন্দরবন) রায়দীঘড়া।
ওপার বাংলার লেখক সৌমিক দে'র 'কালীগুণীন ও ছয় রহস্য' বইটা মোট ছয়টা অতিপ্রাকৃত ও ভৌতিক গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে। মূল চরিত্র কালীপদ মুখুজ্জে একজন পিশাচসিদ্ধ তান্ত্রিক যিনি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে অসহায় মানুষদের মুক্ত করেন এসবের কবল থেকে। গল্পগুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করছি। সাথে জুড়ে দিলাম নিজের পাঠ প্রতিক্রিয়াও।
কানাওলার ফাঁদঃ কানাওলা হচ্ছে একধরণের প্রেত৷ প্রতারণা বা বঞ্চনার শিকার হয়ে যারা অপঘাতে মরে, তারাই হয় কানাওলা। নেকড়েমারি গ্রামের মানুষজন এমনই এক ভয়ঙ্কর ও ধূর্ত প্রেতের খপ্পরে পড়লো। একের পর এক মানুষকে সেই প্রেত নিকেশ করতে লাগলো। পুরো নেকড়েমারিকে চিতায় না তোলা পর্যন্ত যেন সে থামবেই না। এমনই এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে গ্রামে পা রাখলেন ব্রাহ্মণ গুণীন কালীপদ মুখুজ্জে ওরফে কালীগুণীন। ভয়ানক চতুর প্রেত কানাওলাকে হয় তাঁকে থামাতে হবে নয় সত্যিই একদিন শ্মশানে পরিণত হবে নেকড়েমারি।
কালীগুণীন বিষয়ক সৌমিক দে'র প্রথম কাহিনি 'কানাওলার ফাঁদ'। এই বইয়েরও প্রথম গল্প এটা। একটানা পড়ে গেছি গল্পটা। বেশ ভালো লেগেছে আমার কাছে।
নেত্রপাণির বিভীষিকাঃ সুন্দরবনের কোলঘেঁষে নেত্রপাণি তালুক। এই তালুকের জমিদার মহেন্দ্র রায়চৌধুরী ও তাঁর তালুকের লোকজন পড়লো ভয়ঙ্কর এক বিপদে। দুজন পিশাচসিদ্ধ তান্ত্রিক ভৈরোনাথ ও কালকেতু এবং ভৈরবী মাতঙ্গীর প্রেত নিষ্ঠুরভাবে খুন করতে লাগলো মানুষকে। থেঁতলানো লাশগুলোকে বিকৃত অবস্থায় ফেলে যেতে লাগলো যত্রতত্র। কোথায় থেকে উদয় হয়েছে এই তিন প্রেত, কেউ জানেনা। এদিকে জামাইষষ্ঠীর দিন ঘনিয়ে আসছে। জমিদার মহেন্দ্র মশাইয়ের জামাই এই দুর্দিনেও নেত্রপাণিতে আসছে। তাকে কি বাঁচতে দেবে এই প্রাচীণ তিন প্রেত?
হরর আর ফ্যান্টাসি মিলিয়ে দারুন একটা গল্প 'নেত্রপাণির বিভীষিকা'। ভয়ের পরিবেশ বেশ ভালোমতোই সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন লেখক এখানে। এই গল্পে দারুন একটা টুইস্ট আছে যা পাঠককে গল্পটা শেষ করার ব্যাপারে আরো আগ্রহী করে তুলবে।
রক্তগন্ধা রহস্যঃ এবারের গল্পের পটভূমি পাহাড়ি অঞ্চলের কয়েকটা গ্রাম। রাতের আঁধারে অশরীরী দ্বারা এক-দুইঘর মানুষের ক্ষতির গল্প তো অনেক শুনেছি আমরা। তাই বলে কখনো কি পুরো একটা জনপদ মাটিতে মিশিয়ে দেয়ার গল্প শুনেছি? ঠিক এমনটাই ঘটে চলেছে গতো কয়েকদিন যাবত। প্রবল ঝড়-ঝাপটার রূপ নিয়ে সুবিশাল এক আতঙ্ক এসে উপস্থিত হয় রাতের আঁধারে। মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে থাকে একের পর এক গ্রাম। কেন এমন হচ্ছে এমনটা কেউ-ই জোর দিয়ে বলতে পারেনা। কালীগুণীন যখন রহস্য সমাধানে এগিয়ে এলেন, এর ভয়াবহতা টের পেয়ে নিজেই সন্দিগ্ধ হয়ে পড়লেন। সত্যিই কি এতোবড় একটা অতিপ্রাকৃত বিপদ থেকে তিনি এই পাহাড়ি মানুষগুলোকে রক্ষা করতে পারবেন?
গল্পটা সুবিশাল একটা প্লটের ওপর লেখা। এর সাথে ভৌতিক বিষয়াদি যেমন জড়িত ছিলো তেমনি ছিলো পৌরাণিক গল্পগাথার মিশেলও। মোটামুটি ভালো লেগেছে আমার কাছে 'রক্তগন্ধা রহস্য'।
আপাইঃ কলকাতা থেকে বেশ দূরের এক গ্রামে এক রাতে ভয়ানক এক অতিপ্রাকৃত বিভীষিকা এসে হানা দিলো। ভাটার মতো জ্বলতে থাকা দুই চোখ, বড় বড় নখর ও শ্বদন্তযুক্ত এই অশরীরী নারীমূর্তির সারা শরীর ঝলসানো। সে যখন হানা দেয়, চারপাশ ভরে ওঠে তীক্ষ্ণ পোড়া গন্ধে। গরু, ছাগল, কুকুর, বিড়াল তো সে খায়ই বাদ দিচ্ছেনা জ্বলজ্যান্ত মানুষও। নরমাংসভোজী এই ভয়ঙ্কর এই পিশাচিনীর নাম আপাই। তার ভয়াবহ জিঘাংসার সামনে অসহায় হয়ে পড়লো গ্রামের লোকজন। পুরোনো রেলস্টেশনের পাশের বাংলোর দোতলার রহস্য কি? বাংলোর পাশের মাটির নিচ থেকে তামার কিলক তোলার পর থেকেই শুরু হলো এসব। শেষমেষ আসতেই হলো কালীগুণীনকে। আবিস্কৃত হলো ভয়াবহ এক ইতিহাস, যা একই সাথে হৃদয় মুচড়ে দেয়ার মতোও।
বইয়ের শেষ কাহিনি 'আপাই'। পড়তে গিয়ে ভয়ের উপকরণ যেমন পেয়েছি, কেমন যেন একটা মন খারাপ করা অনুভূতিও হয়েছে। হরর গল্পটা খুবই হৃদয়ছোঁয়া। ভালো লেগেছে। বেশ ভালো লেগেছে।
এই চারটা গল্প ছাড়াও হিজলপোঁতা গ্রামের ভয়াবহ দুই প্রেতের আনাগোনা নিয়ে লেখা গল্প 'চন্দ্রপিশাচ রহস্য' ও কাঁচা মাংসখেকো পিশাচিনীর গল্প 'হোগলামারির নরঘাতক'-ও স্থান পেয়েছে এই বইয়ে। কমবেশি ভালোই ছিলো গল্পদুটো।
সৌমিক দে'র 'কালীগুণীন ও ছয় রহস্য' বইটার গল্পগুলো পুরোপুরি ব্রিটিশ ভারত অধ্যুষিত সময়ের গ্রামকেন্দ্রিক সব পটভূমি নিয়ে লেখা। যে কারণে ছোটবেলা গ্রামের বাড়িতে কাঁথার নিচে শুয়ে হারিকেনের আলোয় পড়া ভূতের গল্প পড়ার একটা অনুভূতি হচ্ছিলো। বিভূতিভূষণ ও তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের তারানাথ তান্ত্রিক পড়ার সময়েও প্রায় কাছাকাছি একটা পাঠানুভূতি হয়েছিলো আমার। সৌমিক দে'র কাছ থেকে কালীগুণীন বিষয়ক আরো লেখা পাবো ভবিষ্যতে, এমনটাই আশা।
চিরকুট প্রকাশনীকে ধন্যবাদ ওপার বাংলার পাঠকপ্রিয় এই বইটা এপার বাংলায় প্রকাশ করার জন্য। বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটি নিয়ে আমি সন্তুষ্ট।
তারানাথ তান্ত্রিকের প্রভাব বেশ ভালভাবেই রয়েছে বাংলা ভাষার অতিপ্রাকৃত গল্পের লেখকদের ভেতরে। এটাও তার বাইরে নয়। ছয়টি বড় গল্প। প্রচণ্ড শক্তিমান কোন অশুভ শক্তির আবিরভাবে যখনই কোন জনপদ পর্যুদস্ত, তখনই সেখানে হাজির নায়ক কালীগুণীন। ভাল দিক বলতে কালীগুণীন সুকৌশলে, সমস্যার মূল অনুসন্ধান করে অশুভ রাক্ষসের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করেন; দুমদাম বাজি পটকার মতন মন্ত্র ঝেড়ে বসেন না। লেখক গল্পের সেটাপ হিসেবে গ্রামবাংলাকে বেছে নিয়েছেন, আমার মতে বাংলা ভাষার যাবতীয় ভৌতিক অলৌকিক রচনার জন্য গ্রামের চেয়ে ভাল কোন জায়গা হয় না। অমাবস্যা, বাঁশবন, শ্মশান এসবের ছত্রছায়া পেলেই আমার মনে মনে একটু ভৌতিক গল্পের আবহ তৈরি হয়েই যায়। তবে লেখক কিছু বর্ণনায় তাড়াহুড়ো করেছেন, আবার কিছু অংশ দীর্ঘ না করলেও হয়ত হত। কিছু বিবৃতি একটু খাপছাড়া। আর ভৌতিক চরিত্র ও ঘটনার বর্ননা একটু যেন বেশিই 'explosive'। আমি ৩.৫ দিতে পারি।
প্রথম পাঁচটা গল্পের প্যাটার্ন অনেকটাই সেইম এবং ক্ষেত্রবিশেষে খুবই সিনেম্যাটিক। নাহলে এটা ফাইভ স্টারের বই। শেষের গল্পটা নিঃসন্দেহে বইয়ের সেরা গল্প। লেখক সবগুলো বইয়েই আবহ তৈরী করেছেন অত্যন্ত চমৎকারভাবে। তবে আমার কাছে ভায়োলেন্স টু মাচ মনে হয়েছে। আবারো সেই সিনেম্যাটিক প্রসঙ্গটি আসবে। অতিরিক্ত সিনেম্যাটিক। এছাড়া বাকিসব ঠিকঠাক।
আর হ্যাঁ, আমি তারানাথ তান্ত্রিক পড়িনি। পড়লেও এই বই নিয়ে আমার অন্তত মতামত বদলাতো না। বিভূতি বাবুর চাঁদের পাহাড় পড়েছি এবং বিশ্বাস করি এমন কিছু লেখা অন্যকারো পক্ষে সম্ভবনা কোনোদিন। তাই বলে কেউ এডভেঞ্চার থ্রিলার লিখলেই চাঁদের পাহাড়ের সাথে তুলনা করা শুরু করবোনা। হ্যাপী রিডিং...
আগে একসময় ছিল যা পেতাম তাই পড়তাম। এখন লেখকের লেখনী ভালো না হলে সে লেখা মন ভরায় না। আর এটা তো অতিরিক্ত খাজাস্য খাজা লেখা। এমন বই পড়তে বসা মানে রবিবার দিনটা নষ্ট করা। পরবর্তীতে আর একটু ভালো লেখকের বই পড়ার দিকে মন দিতে হবে।
এই বইয়ে আছে কালীগুণীনের ছয়টি গল্প। কালীগুণীনের সাথে আগে পরিচয় ছিল না তবে যা বুঝলাম এই ছয়টি গল্পের বাইরেও লেখকের কালীগুণীনকে নিয়ে লেখা আরও গল্প আছে।
গুণীন বলতে ওঝা বা গণৎকার টাইপের কিছুই বুঝতাম, আভিধানিক অর্থ অন্তত তাই ই। তবে কালী গুণীন তো ঠিক তা নন। বরং কালীগুণীনকে তন্ত্র সাধক সাধু পুরুষ হিসেবেই চিত্রিত করা হয়েছে। নিজের সাধনালবদ্ধ শক্তি দিয়ে তিনি প্রেতশক্তির অপচ্ছায়া থেকে মানুষ কে বাঁচান। এটা তার পেশা বলে মনে হয় না, বরং নেশা বা প্যাশন বা দায়বদ্ধতা টাইপের কিছু হবে। কেননা কালীগুণীনের বাস সুন্দরবনের আবাদে রায়দীঘড়া তালুকে, কালীগুণীন বা কালীপদ মুখুজ্জে নিজেই একজন জমিদার।
এই বইয়ের প্রথম পাঁচটি গল্পে তেমন বৈচিত্র্য নেই। কাহিনীর পটভূমি হয় সুন্দরবন অথবা পুরুলিয়া কিংবা ঝাড়খন্ড বাংলার সীমান্তের পাহাড়ি কোন স্থানে। জায়গাগুলো দূর্গম, তখনো বিদ্যুৎহীন অজপাড়া গাঁ। কোন অপঘাতে মারা যাওয়া মানুষ মৃত্যুর পর হয়ে যায় কোন ভয়ংকর প্রেতশক্তি। অথবা কেউ নিজেই ভয়ংকর কোন অশুভ সাধনা শেষে অপঘাতে মরে আরও ভয়াবহ কোন পিশাচে পরিণত হয়। কিন্তু পার্থিব লোভ লালসা জিঘাংসা তারা ছাড়তে পারে না। তাই ফিরে ফিরে আসে বারবার কেড়ে নেয় প্রাণ। হয়তো একজন লো প্রোফাইল তান্ত্রিক চেষ্টা করেন প্রেত তাড়াতে, তবে ব্যর্থ হন এবং প্রায়শই প্রাণ হারান। এমন অবস্থায় মানুষ যখন সব আশা ছেড়ে দিচ্ছে তখন রায়দীঘড়া বরাবর কারো পত্র পেয়েই হোক বা কাকতালীয় ভাবে হোক চলে আসেন অসহায় মানুষের মসীহা, প্রায় সুপারম্যান কালীগুণীন, এসে পরিচয় দেন ব্রাহ্মণ, কালীপদ মুখুজ্জে, নিবাস রায়দীঘড়া। অতঃপর দুষ্টের দলন এবং শিষ্টের পালন। এই পাঁচটি গল্প পড়ে যখন একঘেয়েমিতে ভুগছিলাম তখন পড়লাম শেষ গল্প আপাই। এর শুরুও যদিও আগের গল্পগুলোর মতোই ভয়াবহ, শেষটা সুন্দর এবং মায়াময়। আপাই শেষে থাকায় এবং পড়ায় কালীগুণীনকে একেবারে উড়িয়ে দিতে পারছি না যদিও তবু কালীগুণীনকে নিয়ে কিছু অস্পষ্টতা আছে সেগুলো ও বলা দরকার।
আপাই গল্পে লেখক বললেন কালীগুণীনের উচ্চতা ছয় হাতের ও বেশি, তার মানে তো নয় ফুটের ও ওপরে! এটা ছেড়ে দিলাম, কিন্তু কালীগুণীন কোন সময়ের মানুষ।তিনি আসলে কোন সময়ের কোন বয়সের লোক তাও স্পষ্ট নয়। বৃটিশ আমলেও তার দেখা পাই, তখনও তাকে তরুণ বলে মনে হয় না আবার গত শতকের আশি কি নব্বই দশকেও তাকে বৃদ্ধ বলেও মনে হয় না। তিনি রায়দীঘড়ার জমিদার তখনও, এই সময়ের বহু আগেই তো জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি ঘটে গেছে। গল্পপগুলোতে গল্প কথকের পরিচয় আমরা শুুুরুর দিকের গল্প গুলোয় পাই না, পাই একেবারে শেষ গল্পতে।
গল্প কথকের সাথে কালীগুণীনের পরিচয় আপাই গল্পে, তিনি এ যুগের ডাক্তার তবু গল্পের ভাষা আরো পুরোনো ধাঁচের। ঘটনাস্থলে না থেকেও তিনি গল্পগুলো আমাদের বলে যান। এইরকম কিছু অসামঞ্জস্যতা থাকার পরও কালীগুণীনকে নিয়ে আমি আশাবাদী। আগামীতে কালীগুণীনের আরও ভালো ভালো গল্প পড়ার আশায় রইলাম।
বৈচিত্র্যহীনতার উপস্থিতি দারুনভাবে ভুগিয়েছে পুরো ২৪০ পৃষ্ঠা জুড়েই। তারানাথ তান্ত্রিক আর অলাতচক্র পড়ে অনেক আগ্রহ নিয়ে শুরু করেছিলাম কিন্ত যারপরনাই হতাশ। কানাওলা, রক্তগন্ধা আর আপাই যা একটু ব্যতিক্রম মনে হয়েছে কিন্ত সবগুলো গল্পেই প্লট একই রকম। কেউ একজন ব্ল্যাক ম্যাজিক করবে, মানুষের মাথা, হাড় গোড় দিয়ে, তার পর গায়ের লোক তাকে মেরে ফেলবে, সে পিশাচ হবে, মানুষদের ধরে ধরে খুন করবে। এতটা ভায়োলেন্স ছাড়াও শিড়দাড়া বেয়ে ভয়ের স্রোত নামিয়ে দেওয়া যায় । কালীপদ মুখুজ্জের এনট্রান্সটা বেশ চমকপ্রদ এবং তার পিশাচদের বোকা বানানোর কায়দাটা যা এনজয় করেছি৷ পটেনশিয়াল ছিল, কিন্ত প্রতিটি গল্পেই জোর করে ভয়ের উদ্ভব ঘটাতে গিয়ে তান্ত্রিকতার ভয়ংকর রুপটি আর ফুটে ওঠেনি।
কালীগুণীন ও ছয় রহস্য লেখকঃ সৌমিক দে প্রকাশনীঃ বিভা প্রকাশনী
সুন্দরবন এলাকার রায়দীঘড়া গ্রামের ডাকসাইটে জমিদার কালীপদ মুখার্জি, আঞ্চলিক উচ্চারণে কালীপদ মুখজ্জে, আবার অনেকের কাছে কালীগুণীন। শুধু জমিদার নন তিনি, অতিপ্রাকৃত সমস্যায় ভুগতে থাকা মানুষের জন্য তিনি ত্রাণকর্তা। অঘোরী তান্ত্রিক হংসী তান্ত্রিকের শিষ্য তিনি। কালীগুণীন ও ছয় রহস্য বইটি কালীপদ মুখার্জির জীবনের ছয়টা ভিন্ন ভিন্ন ঘটনাকে তুলে ধরেছে। প্রতিটায় তিনি অশুভ শক্তিকে হারিয়ে শুভ শক্তিকে করেছেন জয়যুক্ত।
কালীগুণীন ও ছয় রহস্য বইয়ের গল্পগুলোয় ভালো লাগার জিনিস হয়েছে কালীপদ মুখজ্জে শুধুমাত্র তন্ত্রমন্ত্রের উপর নির্ভরশীল না থেকে তারসাথে বুদ্ধির সমাবেশ ঘটিয়ে অতিপ্রাকৃত সমস্যার সমাধান করেছেন। পাশাপাশি কয়েকটা গল্পে হিন্দুধর্মের পুরাণের কিছু বিষয় লেখক নিয়ে এসছেন যেগুলো গল্পে খানিকটা বৈচিত্র্য নিয়ে এসেছে। তবে ভালোলাগার ব্যাপারগুলো এইখানেই শেষ। এরপরে রয়েছে হতাশার গল্প।
হতাশ হবার কারণগুলো এক এক করে পর্যালোচনা করছি। প্রথম কারণ, প্রতিটি গল্পের বেশ কিছু অংশ মিলে যাওয়া কিংবা প্লটের মিল। কালীগুণীন ও ছয় রহস্য বইয়ের প্রায় প্রতিটি গল্পের শুরুতে দেখবেন কোন এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামের মানুষ কোন প্রকার অতিপ্রাকৃত সমস্যায় জর্জরিত। তারপর সেই এলাকার মানুষজন এলাকার পরিচিত বিখ্যাত কোন তান্ত্রিক কিংবা ওঝার কাছে গিয়ে সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য ধর্ণা দেয়। সেই ব্যক্তিটিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রেতযোনির খারাপ আত্মার নিকট বেঘোরে ভয়ানকভাবে মারা পরবেন। এরপরেই মঞ্চে আসবেন কালীপদ মুখজ্জে। বারবার এক জিনিস দেখতে কার ভালো লাগে বলুন দেখি। দ্বিতীয় কারণ, গল্পে কালীপদ মুখজ্জের প্রবেশ। প্রায় প্রতিটা গল্পে এন্ট্রির সাথে সাথে রীতিমতো একখানা ডায়লগ। "ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখজ্জে। নিবাস রায়দীঘড়া।" প্রথমবার ডায়লগটা পড়ার পর মনে মনে বলেছিলাম, 'আরে খাইসে! এ দেখি সেই স্টাইলিশ ক্যারেক্টার!' কিন্তু বারবার ডায়লগটা পড়তে পড়তে কেমন জানি জোর করে ঢুকানো টাইপের মত লাগছিলো। এ যেন এমন এক পাঞ্চলাইন যেটায় কোন আবেদন নেই। তৃতীয় এবং সর্বশেষ কারণ, সময়কাল এবং তথ্য নিয়ে ঝামেলা। বইয়ের গল্পগুলো পড়লে আপনার মনে হবে ১৮৮০ থেকে ১৯২০ এই সময়ের পটভূমিতে গল্পগুলো লেখা হয়েছে(অন্ততপক্ষে আমার এটাই মনে হয়েছে)। কেননা নেত্রপাণির আতঙ্ক গল্পে কালীপদের স্ত্রী মন্দাকিনীর চাপাতা দেখে না চিনতে পারার ব্যবহারে স্পষ্ট মনে হয়েছে যে উল্লেখিত সময়কালের পটভূমিতে গল্পগুলো লেখা। কিন্তু আপাই গল্পের শেষে আপনার এই ভুল ভাঙ্গবে। এই গল্পে টাইম ট্রাভেল করে ৩০ বছর আগে ���িয়ে একটা সমস্যার সমাধান করে কালীপদ মুখজ্জে। তখন এক জায়গায় রেডিওতে শুনতে পায় আমেরিকা কিউবায় পণ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তো ব্যাপারটা গোলমালে ভরে গেল না? আমেরিকা কিউবার উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ১৯৬০/১৯৬২তে, সেখানে এর কাছাকাছি সময়ে মন্দাকিনী চাপাতা চিনতে পারলো না। আবার কালীপদ মুখার্জি নাকি জমিদার, তো জমিদারি প্রথা তো সেই ১৯৫১ সালেই ভারত থেকে উঠে গিয়েছে। তাহলে সে জমিদার হয় কি করে?
সব মিলিয়ে ৫ এর মধ্যে আমি কালীগুণীন ও ছয় রহস্য বইকে আমি ৩ দিব। বইটা কোন রকমে চলে আরকি।
This entire review has been hidden because of spoilers.
রিভিউ এর র'ও লিখতে পারি না আমি। যা লিখি, মানে যদি লিখি তা হলো পড়া শেষে তাৎক্ষণিক মনের অবস্থাটা।
ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস রায়দীঘড়া। কালীগুণীন মশাইয়ের ভক্ত হয়ে গিয়েছি। তার প্রতিটা এন্ট্রিই ছিলো চরম সাসপেন্সের মুহুর্তে। সহজ সাবলীল ভাষায় কাহিনী এগিয়ে গেলেও কিছুটা আঞ্চলিক টান সৃষ্টির চেষ্টাটা চোখে লেগেছে। তাও যদি পুরো বইতেই থাকতো তাও নাহয় হতো, খণ্ড খণ্ড কিছু সংলাপে এরকম উচ্চারণে হোঁচট খেতে হয়েছিলো কিছুটা। তবে একটা তারা কাটা যাবার মতো কিছু নয় তা। কালীগুণীনের আরো অভিযানের অপেক্ষায় রইলাম।
এযাবৎকালের যতগুলো ভৌতিক উপন্যাস পড়েছি এর ভেতর সবচেয়ে ভয়ানক আর লোমহর্ষক উপন্যাস হচ্ছে কালীগুণিন ও ছয় রহস্য নামের এই বইটি। তন্ত্রসাধনা, হরর আর রহস্যের এক অপূর্ব মিশেলে বইটিকে করেছে অদম্য। ছয়টি গল্পগুলো সত্যিই একেকটাকে ছাড়িয়ে যাবার মতো, বিশেষ করে রাতের বেলায় পড়ার সময় বেশ ভয় পেয়েছি। আর এখানেই বলতে গেলে লেখকের স্বার্থকতা।