মোহিনীকে চেনেন? বিষ্ণু যে রূপের আশ্রয় নিয়ে অসুরদের কাছ থেকে অমৃত সরিয়ে নিয়েছিলেন, তার কথা বলছি না আমি। তবে এই মোহিনীর শরীরেও পুরুষের মধ্যে আছে এক নারী। এই মোহিনীও জড়িয়ে পড়েছে বহু শতাব্দীর এক মন্থনের সঙ্গে— যার থেকে উঠতে পারত অমৃত, কিন্তু পাওয়া গেছিল হলাহল। সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে, তাই না? আচ্ছা বেশ। সোজা ভাষায় লিখি তাহলে। শ্রীপর্ণা সেই শ্রেণির মানুষ যাদের আমরা হিজড়ে বলি। সে পড়াশোনা করে সসম্মানে বাঁচতে চেয়েছিল। সমাজ তাকে সে সুযোগ দেয়নি। সে বাধ্য হয়েছিল সেই বিশেষ পাড়ায় এসে 'তারই মতো' অন্য মানুষদের সঙ্গে রুজির সন্ধানে। সেখানেও টেকেনি সে। অবশেষে, নিজের নতুন নাম 'মোহিনী' আর সামান্য কিছু অর্থ সঙ্গে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল। তারপর এসে পৌঁছোল নবদ্বীপে। আর সেখানেই সে জড়িয়ে গেল প্রায় পাঁচ শতাব্দী পুরোনো এক রহস্যের সঙ্গে। তারপর কী হল?
এই বইয়ের ভালো দিক কী-কী? ১) বইটি আপনি পড়া শুরু করলে শেষ না হওয়া অবধি থামতে পারবেন না। ২) বাঙালিকে সবচেয়ে বেশি তাড়িত করে যেক'টি বিষয়, তাদের মধ্যে সর্বপ্রধান জিনিসটিই প্রকারন্তরে এই বইয়ের উপজীব্য। বইটা পড়ার পর আপনিও সেই রহস্যভেদ করতে আগ্রহী হবেন। ৩) প্রাসঙ্গিক তথ্য প্রদানে লেখক বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেননি। ফলে বইটা পড়তে গিয়ে অনেক কিছু আরও বিস্তৃতভাবে জানতে ইচ্ছে করে— যা যেকোনো ভালো বইয়ের বিশেষত্ব। ৪) বইয়ের ছাপা, বানান এবং লে-আউট বেশ ভালো। তবে সংলাপ বোঝাতে একইসঙ্গে ঊর্ধ্বকমা এবং এম-ড্যাশ ব্যবহার বিসদৃশ ঠেকল। এই বইয়ের খারাপ দিক কী-কী? প্রথমত, তথ্যগুলো মূল কাহিনির অংশ না বানিয়ে তথ্যসূত্র সহ অ্যাপেন্ডিক্স আকারে দিলে ভালো হত। তাতে ছাত্র ও গবেষকেরা উপকৃত হতেন। আবার শুধু গল্পের টানে যাঁরা লেখাটা পড়তে চাইবেন, তাঁরা বেশি উপভোগ করবেন। দ্বিতীয়ত, থ্রিলার লিখতে হলে শুধু ছোটো-ছোটো বাক্য যথেষ্ট নয়। সম্পূর্ণ লেখাটিকে একটি নির্দিষ্ট লয় ও তালে চালিত না করলে লেখার গতি নষ্ট হয়ে যায়। লেখক তাঁর পরবর্তী প্রয়াসে এই গতির ব্যাপারটা মাথায় রাখলে ভালো হয়। তৃতীয়ত, বড়ো বেশি সমাপতন ঘটেছে ঘটনাক্রমে। তাতে কাহিনির গতি কমেনি, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যতা কমেছে। তবু বলব, তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধি এই নতুন প্রটাগনিস্টের মেধা ও উদ্যম এবং এই বইয়ের ভাঁজে-ভাঁজে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস বইটিকে স্পেশাল করে তুলেছে। সম্ভব হলে বইটি পড়তেই পারেন। খারাপ লাগবে না বলেই আমার ধারণা। অলমিতি।
বই - মোহিনী মন্থন লেখক - সৌরভ আঢ্য প্রকাশক - ট্রামলাইন থ্রিলার প্রচ্ছদ - সৌম্য আঢ্য বিনিম়য় - ১৬০ ভারতীয় মুদ্রা
প্রথমেই যেটা না বললে খুব অপরাধ হবে সেটা হল, এই বইটির প্রচ্ছদ ও নামাঙ্কন এতটাই চমৎকার ও আকর্ষনীয় যে বইপোকারা সেটি কিনতে একপ্রকার বাধ্যই হবেন। সৌম্য আঢ্য মহাশয়ের অসামান্য প্রতিভার ফলস্বরূপ বইটার প্রচ্ছদ কে একটা অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। এবার তো আপনি আমার মতোই বই কিনে ফেললেন দর্শনদারির প্রভাবে এবার একটু গুনবিচারিতেও আসা যাক।
গল্পের শুরুতেই পাঠকের সাথে পরিচয় হয় তৃতীয় লিঙ্গের একটি বৈপ্লবিক চরিত্র মোহিনীর সাথে। যে চেয়েছিল আর পাঁচটা মানুষের মতো পড়াশোনা করে মাথা তুলে বাঁচতে। কিন্তু রক্ষনশীল সমাজ তাকে সেই সুযোগটুকু দেয়নি। ভাগ্যের ফেরে তাকে কিন্নর খোলে স্থান পেতে হয়। সেখানেই শ্রীপর্ণার নবপরিচয় ঘটে মোহিনী রূপে। কিন্তু সেখানেও তার স্বাধীনচেতা উন্নত মানসিকতার জন্য বাকি কিন্নরদের সাথে বিবাদ বাঁধে, ফলস্বরূপ নিজেকে সেই সমাজ থেকে অপসারিত করে মোহিনী। এরপর ভাগ্যের চাকা তাকে ঘোরাতে ঘোরাতে নিয়ে আসে যুগপুরুষ শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মস্থান নবদ্বীপে। ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর অন্তর্ধান রহস্য ও ওনারই লেখা ন্যায় শাস্ত্রের পাণ্ডুলিপির একটা পৃষ্ঠা এই হল গল্পের মূল বিষয়বস্তু। বর্তমানে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটে পরপর দুটো খুন এবং মোহিনীর ক্রমাগত সেই রহস্যের জালে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। লেখকের সাবলীল লেখনিশক্তিতে গল্পের সমস্ত চরিত্র জীবন্ত হয়ে ওঠে। গল্পের প্লট এক কথায় অসাধারণ ও অসামান্য। নবপ্রজন্মের কোনও লেখক এইরকম বিতর্কিত বিষয় নিয়ে কলম ধরে যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন তা ভূয়সী প্রশংসার দাবি রাখেন। যেকোনও ভালো বইয়ের বিশেষত্ব হল প্লটের প্রাসঙ্গিক তথ্য প্রদান করা, পাঠককে গল্পের গভীরে প্রবেশ করাতে এর গুরুত্ব অপরিসীম। তৎকালীন নবদ্বীপ সমাজ ও মহাপ্রভুর অন্তর্ধান নিয়ে যে যুক্তিসঙ্গত তথ্য দেওয়া হয়েছে তা যথেষ্ট প্রশংসনীয়। আমার ব্যক্তিগত মত অনুযায়ী থ্রিলার লেখার একটা নির্দিষ্ট ধরন থাকে, এবার এতো তথ্যপূর্ন লেখার জন্য কোথাও যেন লেখার ধরনের সেই তাল কেটে গেছে এবং তার ফলে সামান্য লেখার গতিতে প্রভাব ফেলেছে। আরেকটা জিনিসের ওপর আলোকপাত করতে চাই, সেটা হল চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা। গল্পের প্লট অনুযায়ী মোহিনী ছোটবেলাতেই পড়াশোনা ছেড়ে দেয়, স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে যে তার মহাভারত সম্পর্কে এতো জ্ঞান আসে কিভাবে। এছাড়াও যখন তখন গুগল ঘেঁটে এতো গুরুত্বপূর্ন তথ্য খুঁজে পাচ্ছে এবং সেই ইংরিজি নিবন্ধের অন্তর্নিহিত অর্থ উদ্ধার করছে যেটা কিনা তার তদন্তে অনেক সাহায্য করছে। এই বিষয়গুলিকে একটু অন্যভাবে উপস্থাপনা করলে আমার মনে হয় ব্যাপারটা আরও গ্রহণযোগ্যতা পেত।
পরিশেষে বলি, "মোহিনী মন্থন" একটি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার কাহিনী। সমাজে নিজের জায়গা পেতে ও বিপদের মানুষের পাশে দাড়িয়ে মোহিনী যেভাবে লড়াই করে গেছে সেই জন্য লেখকের কলমকে অনেক ধন্যবাদ। এই বইয়ের প্রতিটি পাতা য় লুকিয়ে আছে নির্মম ইতিহাস যা কিনা লেখক তার বিশ্লেষণী ক্ষমতার দ্বারা জীবন্ত করে তুলেছেন। বিতর্কিত বিষয়বস্তু কাটাছেঁড়া করে চমৎকার উপন্যাসিকা পরিবেশনের জন্য লেখকে কুর্নিশ জানাই। এভাবেই বাংলা সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ করুন। ধন্যবাদান্তে - অর্পণ
সর্বপ্রথমেই লেখককে সশ্রদ্ধ কুর্নিশ জানাই এরকম বিতর্কিত বিষয় নিয়ে এতো সাহসিকতার সাথে সুনিপুণভাবে কলম ধরার জন্য। গল্পের শুরুতেই পাঠকের সাথে পরিচয় হয় তৃতীয় লিঙ্গের এক প্রতিনিধি মোহিনীর সাথে। বিধি বাম হওয়ার কারনে শ্রীপর্ণা হয়ে উঠল মোহিনী। ভাগ্যের ফেরে প্রথমে রক্ষণশীল সমাজ ও পরে তৃতীয় লিঙ্গের সমাজ থেকে বিতাড়িত হয়ে সে এসে পৌঁছোয় যুগপুরুষ শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মস্থান নবদ্বীপে। ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ করে উড়িষ্যার বুকে পুরী ধামে রহস্যময় অন্তর্ধান ঘটে মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য দেবের। সেই রহস্যময় ঘটনার উল্লেখ আছে এক গোপন পাণ্ডুলিপিতে,যার সন্ধান পাওয়া যাবে একটি ধাঁধার সমাধানে। এই রহস্যকে কেন্দ্র করে ঘনীভূত হয়েছে এক মৃত্যুজাল যাতে সেই নির্মম ইতিহাস প্রকাশিত না হতে পারে। সমাজের হাজারো গঞ্জনা যাকে বারবার মাটিতে মিশিয়ে দিতে চেয়েছে সেই মোহিনীর এক বৈপ্লবিক চরিত্রের সুনিপুণ বর্ণনার জন্য লেখককে বিশেষভাবে কুর্নিশ জানাই। উপন্যাসটি���ে একাধারে যেমন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বর্তমান যুগের তৃতীয় লিঙ্গের সমাজের একটা বাস্তব করুণ চিত্র , তাদের ক্ষমতা, তাদের আরাধ্য দেবতা বহুচরা দেবী ও ইরবানের কথা এবং কিছু পৌরানিক গল্প, তেমনি অন্যদিকে রহস্য, ধাঁধা, অপরাধ.. সব মিলিয়ে এটি একটি উপভোগ্য থ্রিলার কাহিনী। উপন্যাসটির একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নবদ্বীপ , মায়াপুরের ইতিহাস , সেই সময়কার বৈষ্ণব ধর্মের ইতিহাস , পুরীর কথা। বহু তথ্যসমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও উপন্যাসটির উত্তেজনা কোনো অংশেই কম বলে মনে হয়নি। লেখক তার বিশ্লেষণী ক্ষমতার মাধ্যমে ইতিহাসকে যেভাবে বেশ যুক্তিপূর্ণ ভাবে সকলের সামনে তুলে ধরেছেন তা অবশ্যপাঠ্য। পড়তে শুরু করলে শেষ না করে থামা যায়না। লেখককে শ্রদ্ধা জানিয়ে মোহিনীর ফেরার অপেক্ষায় রইলাম।
বই review কে কিছুজন art এর পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, আমি শুধুই আমার মতামত জানাচ্ছি।
মোহিনী একজন বৃহন্নলা, নিজের অস্তিত্ব সংকট থেকে বেরিয়ে গল্পের ফেরে সে কোনোভাবে জড়িয়ে পড়ে চৈতন্য অন্তর্ধান রহস্য এবং সেই বিষয়ে লেখা এক পুঁথির অন্তর্ধান রহস্যের সাথে। মোটামুটি এই হল গল্পের plot। ছোট ছোট কিছু part এ লেখা এই গল্প এগিয়ে চলেছে বেশ ভালো গতিতেই। সেখানে জগন্নাথ মন্দিরের detailed বর্ণনা, কিছু রোমাঞ্চকর মুহুর্তকে লেখক দারুণ ভাবে তৈরী করেছেন। কথোপকথনের মাধ্যমে সমাজে বৃহন্নলাদের অবস্থা সম্পর্কে জানানোতেও লেখকের মুনশিয়ানা দেখার মতো। কিন্তু তার সাথেই অন্তর্ধান রহস্যের সম্পর্কেই ৪-৫ পাতা টানা লেখা গল্পকে কোথাও গিয়ে একটু slow করেছে। মনে প্রশ্ন জাগে, গল্প অনুযায়ী মোহিনী অনেক ছোটবেলাতেই পড়াশোনা ছেড়ে দেয়, আর 'টোল' এ থাকার সময়ে খুব বেশি বই সে পড়েনি, সেখানে মহাভারত সম্পর্কে এত knowledge তার আসে কোথা থেকে! মোহিনী internet ঘাটতেও সিদ্ধহস্ত, কথায় কথায় সে Google খোলে কিছু জানতে হলে। খুব ভালো ব্যাপার, কিন্তু English একটা article পড়ে সেখান থেকে synthesis টাও এত ভালো করতে পারে সে, যা তার investigation এ help করে! বুঝি, নিঃসন্দেহে character টি prodigy level এর কেউ হতেই পারে! তবে মোহিনীর যখন এতগুলো contacts, একজন সিধুজ্যাঠা level এর কেউ থাকতেই পারতো যে এই information গুলো মোহিনী কে দিয়ে দিত!!
যাক, বইটি সুমুদ্রিত। প্রচ্ছদটি ও খুব সুন্দর, ভেতরের অলংকরণ গুলোও ভালো।
লেখক hint দিয়েছেন এর পরেও মোহিনী ফিরবে। আমি অপেক্ষা করবো।
তৃতীয় লিঙ্গের একজন প্রতিনিধি মোহিনী প্রতিবাদ করল অন্যায়ের। তাদের সমাজ থেকে একরকম বিতাড়িত হয়ে ভাগ্যের পরিহাসে এসে পৌছালো নবদ্বীপে। চৈতন্যর জন্মস্থান থেকে পুরী যাত্রা, স্বভাবতই লেখার মধ্যে এসেছেন জগন্নাথ এবং সচল জগন্নাথ-উভয়েই। কিন্তু এই ধর্মীয় পরিবেশেও অন্তর্ধানের ভ্রুকুটি, যা থেকে শেষমেষ খুন। সেই প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে মোহিনী। সমাজের হাজারো গঞ্জনা যাকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে চেয়েছে বারবার, নিজের পিত্রালয়েও যার স্থান হয়নি, আত্মহত্যা করার কথাও যাকে ভাবতে হয়েছে, তার এক অনন্য রূপের খোঁজ নিয়েছেন লেখক। সাথে পেয়েছেন অর্চিষ্মানবাবুকে। গল্পের প্রতিটি পর্যায়ে রয়েছে রহস্য।আর সেই রহস্যের মাঝে উঠে এসেছে চৈতন্য গবেষক জয়দেব মুখোপাধ্যায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যুর কথাও। এই বইটি একটি কাল্পনিক উপন্যাসরূপে উপস্থাপিত হলেও যে ইতিহাসের সাহায্য নেওয়া হয়েছে, তাকে কল্পনা বলে উড়িয়ে দিতে আমি রাজি নই। সৌম্য আঢ্যের অসাধারণ প্রচ্ছদ আমায় মুগ্ধ করেছে। প্রথমদিকে বানান ও স্পেসিং-এর কিছু ভুল রয়েছে, যা পরবর্তী মুদ্রণে শুধরে নিতে হবে। সর্বোপরি, এই সামান্য ভুল-ত্রুটিগুলো অবশ্যই মার্জনীয়। এই বইটি পাঠকদের ভালো লাগবে বলেই আমার মনে হয়েছে।