ব্লার্ব থেকে: এই আশ্চর্য বইটি পড়তে পড়তে একুশ শতকের মানুষকে যা স্তম্ভিত করে দেয় তা এর অমোঘ আধুনিকতা। সময়ের ঢেউকে অতিক্রম করে আবহমান মানুষের প্রকৃতি নির্ধারণের জন্য এ এক যন্ত্রণাক্ত, নির্জন তপশ্চর্যা, সাড়ে তিনশ বছর পরেও যার মূল্য এতটুকু কমেনি।
ভলতের এই বইয়ের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন সেই শিল্পগুণ যা ফ্রান্সের রুচি তৈরিতে সাহায্য করেছে, ফরাসি মনকে শিখিয়েছে পরিমিতি। শুধু লা ফঁতেন, রুসো, গ্যেয়েটে, কান্ট, শোপেনহাওয়ার, নীৎসে বা আঁন্দ্রে জিদ নয়, এই অন্তরদৃষ্টিময় সজীব ও সুষম বাক্যগুলি যুগে যুগে সাধারণ মানুষকেও আলোকিত করেছে।
অনেকের মতে, এটি চিন্ময় গুহ-র শ্রেষ্ঠ অনুবাদ কর্ম।
Librarian Note: There is more than one author in the Goodreads database with this name. This profile may contain books from multiple authors of this name.
François VI, duc de la Rochefoucauld, prince de Marcillac (French: [fʁɑ̃swa d(ə) la ʁɔʃfuko]; 15 September 1613 – 17 March 1680) was a noted French author of maxims and memoirs. It is said that his world-view was clear-eyed and urbane, and that he neither condemned human conduct nor sentimentally celebrated it. Born in Paris on the Rue des Petits Champs, at a time when the royal court was vacillating between aiding the nobility and threatening it, he was considered an exemplar of the accomplished 17th-century nobleman. Until 1650, he bore the title of Prince de Marcillac.
ছোট্ট একটা বই। পড়তে এক ঘন্টার মতো লাগে মাক্সিমগুলো। অথচ ভাবনাগুলো সারাজীবনের। মানুষের চিরাচরিত আচরণগুলো আসলে একই। নাহলে প্রায় ৪০০ বছর আগের উপলব্ধিগুলোর বেশিরভাগই কী করে এই যুগেও খাপে খাপে মিলে যায়? প্রযুক্তি-বিজ্ঞান যতই আগাক না কেন, আদিম সত্তাটা আসলে অস্বীকার করা যায় না মানুষের।
কিছু কিছু ম্যাক্সিম সত্যিই স্তব্ধ হয়ে ভাবতে বাধ্য করে। আবার কিছু কিছু ম্যাক্সিম এর অগভীরতা সস্তা ইনফ্লুয়েন্সারদের কথা মনে করিয়ে দেয়। বেশিরভাগই খুব বুদ্ধিদীপ্ত পর্যবেক্ষণ।
অনুবাদের কারনে কয়েকটা ম্যাক্সিমের মূল বিষয়টা বোধগম্য হয়নি বলে মনে হয়েছে। অনুবাদক দু এক জায়গায় অপ্রচলিত বাংলা শব্দ ব্যবহার করেছেন৷ তবে মোটের উপর বেশ সুখপাঠ্য লেগেছে ।
বইটাতে মানবমনের এমন কিছু অস্বস্তিকর দিককে তুলে ধরা হয়েছে যা নিয়ে আমরা ভাবি না বা ভাবতে চাই না।
লা রোশফুকো ষোড়শ শতাব্দীর একজন ফরাসি চিন্তক। তাঁর অনেক লেখাজোখা আছে। মেমোয়ার চিটিপত্র ও ম্যাক্সিম।এরমধ্যে ছোট ছোট এক বা দুই লাইনের ম্যাক্সিমগুলো বেশ জনপ্রিয়। তার পরবর্তী অনেক থিংকারই তার দ্বারা প্রভাবিত হইছেন।
ম্যাক্সিমগুলোতে অনেকগুলি ইনসাইট পাওয়া যায়। তিনি মুলত মানুষের ভেতরের দিকটাতেই বেশি ফোকাস করেছেন। মানুষের আচার আচরণ, ঈর্ষা, ক্ষোভ, কৃতজ্ঞতা, অকৃতজ্ঞতা, অহং, প্রেম, নারী ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরেছেন এক দুই লাইনের ম্যাক্সিমগুলোতে।
গ্রেট থিংকার নাকি তারাই যারা নিজের সময়ে থেকে অন্য সময়কে নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারে, উপলব্ধি করতে পারে। সেই হিসেবে লা রোশফুকো একজন গ্রেট থিংকার৷ তার অনেক চিন্তাই বর্তমানের সাথে রেলেভেন্ট (তা এই কারণে বোধহয়, মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলো সব সময়, সব কালেই একই রকম ছিল।) আর অনেক চিন্তাই সেই বুনো আদিম জান্তব। লা রোশফুকো লিখেছিলেন চারশ বছর আগে। কিছু কিছু চিন্তা বর্তমান তো করেই ভবিষ্যতের পাঠককেও আলোড়িত করবে আর কিছু চিন্তা দিনে দিনে ক্লিশে হতে থাকবে৷
বিশেষ করে প্রেম আর নারী বিষয়ে তার চিন্তাগুলো অত্যন্ত বিরক্তিকর। মনে হল ইনি তো চারশ বছর আগেরই, অমনই তো লিখবেন। নিচে পছন্দের কয়েকটা তুলে দেই।
"সত্যিই যদি আমরা নির্দোষ হতাম, অন্যের দোষ দেখিয়ে অতটা উল্লসিত হতাম না।"
ওই যে, হিউম্যান মাইন্ড সবসময় প্যাটার্ন খুঁজে। আমি একা নই। আমার মতো বা আমার থেকেও বড় পাপী এই দুনিয়ায় আছে। এক ধরনের ভ্যালিডেশন পাওয়া।
"আন্তরিকতা মানে হৃদয়ের উন্মেষ, যা অত্যন্ত দুর্লভ। বেশিরভাগ সময় যা দেখা যায় তা হল অন্যের বিশ্বাস অর্জনের জন্য একধরণের সুক্ষ্ম চালাকি।"
একটা লেখায় পড়েছিলাম, কাউরে ভোগাস কোনোকিছু বিশ্বাস করানোর জন্য নিজের লজ্জাজনক কিছু বলে ফেলার মতো চালাকি আর হয় না। তাতে করে অপর লোকটা ভাবে লোকটা মিশুক, আন্তরিক আর নিজের প্রতি সৎ।
"বোকা লোকদের সাহচর্য ছাড়া বুদ্ধিমানেরা প্রায়ই বিব্রত বোধ করে।"
বাঙালি সাধারণত অলস জাতি। যেকোনো কিছুতেই বাঙালির আলসেমি। খাইতে আলসেমি, ঘুমাইতে আলসেমি, কাজ করতে আলসেমি। কয়দিন আগে এক ক্লাসমেটের কথা শুনে বেশ অবাক হয়েছিলাম, তার নাকি লুইসগিরি করতে আর ভালো লাগে না। টায়ার্ড লাগে। অবাক হয়েছিলাম এই কারণে বাঙালি যে লুইস হওয়ার অসীম ক্ষমতা নিয়ে জন্মায় সেটাতেও আলসেমি ভর করেছে। কিন্তু একটা জায়গায় বাঙালি কখনো টায়ার্ড হয় না। জ্ঞান বিতরণ করা। যত যাই হয়ে যাক, যত কাজই থাকুক, জ্ঞান দেওয়ার সুযোগ থাকলে বাঙালি মানে আমরা সেটা কখনো হাতছাড়া করিনা। বুদ্ধিমানেরা তো বটেই, বোকা লোকগুলাও তারচেয়ে অধিক বোকা কাউকে খুঁজে চলে কোন ছুতোয় জ্ঞান দেয়া যায় সেটার জন্য।
"মহৎ লোকেদের বিশেষত্বই হল অল্প কথায় বেশি বলতে পারা। অন্যদিকে সাধারণ লোকেরা বেশি বলে থাকে, তাই আর কিছুই বলা হয়ে উঠে না।"
এটা প্রায়সময় লক্ষ্য করি। যারা বেশি কথা বলে প্রায়সময় তারা কিছুই বলে না। সামারাইজ করতে গেলে তাদের কথায় আর কিছু পাই না।
"যেরকম তাড়াহুড়ো করে লোকে কৃতজ্ঞতা থেকে মুক্ত হতে চায় তা প্রায় অকৃতজ্ঞতারই নামান্তর"
সুনীল বোধহয় বিষয়টা খুব ভালো উপলব্ধি করতে পারছিলেন। "কৃতজ্ঞতা একটা বিষম বোঝা। অনেকেই সারাজীবন এই বোঝা বহনে অক্ষম, তাই উপকারী ব্যক্তির শত্রুতা করে তারা স্বস্তিবোধ করে।"
"মনের সংকীর্ণতা থেকে গোয়ার্তুমির জন্ম। আমরা যা দেখতে পাই না তা সহজে বিশ্বাস করতে চাই না।"
প্রেম নিয়ে একটা লেখা ভালো লাগছে, "অন্যের মুখে প্রেমের কথা না শুনলে অনেক লোক কোনদিনই প্রেমে পড়তো না।"
ব্যক্তিজীবনে লা রোশফুকো ছিলেন রাজপুরুষ ও সেনাপতি। তাঁর খ্যাতি ছিল পাশ্চাত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মরালিস্ট ও প্রথম ক্ল্যাসিক মনস্তাত্ত্বিক হিসেবে।
স্বয়ং ভলতের মাক্সিম পড়ে লিখেছিলেন, 'খুব তাড়াতাড়ি বইটি পড়ে ফেললাম। তিনি অভ্যাস করালেন চিন্তা করতে, এবং ভাবনাচিন্তাগুলিতে এক সজীব, সুষম ও সংক্ষিপ্ত বাগবন্ধে ধরে রাখতে। এই গুণ ইউরোপে রেনেসাঁসের পর তাঁর আগে আর কারুর ছিল না।'
১৬৬৫ সালে মাক্সিম-এর প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় লা রোশফুকো লিখেছিলেন, 'এ হল মনুষ্যহৃদয়ের এক আলেখ্য। এগুলি সবাইকে খুশি করবে না কারণ, এগুলি বড় বেশি বাস্তব, এগুলি তত তোষামুদে নয়।'
আলেকজান্ডার পোপ এগুলিকে 'witty lies' বলে গাল দিলেও তার Essay on Man বইতে লা রোশফুকোর উক্তি ব্যবহার না করে পারেননি। তাঁর ছাত্রদের লা রাশফুকোর গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিতেন এমানুয়েল কান্ট, গ্যোয়েটের সংগ্রহে মাক্সিম ছিল। শোপেনহাওয়ার রোশফুকোর মন্তব্যগুলিকে আধুনিক বলে অভিহিত করেছেন। আর নীৎসে মনে করেছেন, 'লা রোশফুকো মনোবিজ্ঞানের সেই গুরু, যিনি অন্ধকারেও লক্ষ্যভেদ করতে পারেন।'
বলা বাহুল্য, তাঁর এমন অকপট, নির্মম সত্যবচনে অনেকে অস্বস্তিতে পড়েছিলেন। তিন শতাব্দী পেরিয়েও রোশফুকোর মাক্সিমগুলি সমান প্রাসঙ্গিক ও সত্যনিষ্ঠ।
লেখকের প্রকাশিত ৩২৩টি এবং জীবৎকালে অপ্র��াশিত ৩৭টি মাক্সিম রয়েছে বইটিতে।
ভালো লাগা কিছু মাক্সিম—
'সত্যিকারের প্রেমের সঙ্গে ভূতের খুব মিল আছে। সকলেই ওদুটোর কথা বলে, কিন্তু প্রায় কেউই দেখেনি।'
'স্বার্থান্বেষীরা সব ভাষায় কথা বলতে পারে, সব ধরনের লোকের ভূমিকায় অভিনয় করতে পারে, এমনকী উদাসীন লোকের ভূমিকায়।'
'দর্শনের কাছে অতীত ও ভবিষ্যৎ দুঃখ সহজেই পরাভূত হয়। কিন্তু বর্তমান দুঃখকে সে ঠেকাতে পারে না।'
'মানুষ নিজেকে যতটা সুখী কিংবা অসুখী ভাবে ততটা সে কখনোই নয়।'
'আন্তরিকতা মানে হৃদয়ের উন্মেষ, যা অত্যন্ত দুর্লভ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যা দেখা যায় তা হল অন্যের বিশ্বাস অর্জন করার জন্য এক ধরনের সূক্ষ্ম চালাকি।'
'আগুনের মতো প্রেমও অনবরত নাড়াচাড়া ছাড়া টিঁকতে পারে না। তাই আশা বা আশঙ্কা কোনোটাই না থাকলে সে মরে যায়।'
'লোকে যাকে বন্ধুত্ব বলে আসলে তা এক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠ যেখানে পারস্পরিক স্বার্থের দিকে লক্ষ রেখে সুযোগ-সুবি আদান-প্রদান হয়। শেষ পর্যন্ত, এটা কেবল একটা ব্যবসা যেখা আত্মাভিমানই সর্বদা মুনাফার দিকটা ঠিক করে।'
'তাঁরা যে আর খুব খারাপ উদাহরণ নন এই সান্ত্বনাটুকু পাওয়ার জন্যই বৃদ্ধেরা অমন লম্বাচওড়া উপদেশ দিতে ভালবাসেন।'
'দমকা হাওয়ায় যেমন মোমবাতি নিভে যায় কিন্তু আগুন ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি অনুপস্থিতি অগভীর আবেগকে কমিয়ে দিলেও গভীর অনুভূতিকে বাড়িয়ে দেয়।'
'যাদের আমরা বিরক্তিকর মনে করি প্রায়শই তাদের আমরা ক্ষমা করে দিই। কিন্তু আমাদের যারা বিরক্তিকর মনে করে তাদের আমরা কখনো ক্ষমা করতে পারি না।'
'শুধুমাত্র যুক্তি দিয়ে যখন আমরা কিছু পেতে চাই, তাতে কখনো কোনো সত্যিকারের আকুলতা থাকে না।'
'চুপ করে থাকব না মনে করে কথা বললে কথা বলাটা অসম্ভব কঠিন হয়ে ওঠে।'
- সবচেয়ে নির্লজ্জ আবেগগুলিকে নিয়েও মাঝে মাঝে আমরা বড়াই করতে ছাড়ি না। কিন্তু ঈর্ষার মতো একটি ক্ষীণ ও লজ্জাজনক আবেগের কথা স্বীকার করতে আমাদের সাহসে কুলোয় না।
- সত্যিই যদি আমরা নির্দোষ হতাম, অন্যের দোষ দেখিয়ে অতটা উল্লসিত হতাম না।
- নিজেরা অহঙ্কারী না হলে অন্যের অহঙ্কার নিয়ে আমরা অভিযোগ করতাম না।
- চালাক হতে চাইলে আর অনেক সময় চালাক হওয়া হয়ে ওঠে না।
- যে মনে করে গোটা পৃথিবীকে বাদ দিয়ে শুধু নিজেকে নিয়েই থাকা সম্ভব, সে বিরাট ভুল করে। কিন্তু যে ভাবে তাকে বাদ দিয়ে কারুর চলবে না সে আরো বড় ভুল করে।