যাঁরা সময়কে দেখতে পান তাঁরা জানেন কাগার (কান্তিক গাঙ্গুলি) মামার বাড়ির দেশ হেঁসেহার বড়ই গোলমেলে জায়গা । সেখানে কোন ঘটনাটা বাস্তবের আর কোন ঘটনাটা স্বপ্ন ( আজকাল বলে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি), তা বোঝা ভার। এমনিতে হেঁসেহারে আছে অনেক কিছু। মনোরম প্রকৃতি, রহস্যময় ইতিহাস, কৃতি বিজ্ঞানী, ঋদ্ধ গ্রন্থাগার আর এক চিরকিশোর হেরম্ব। কিন্তু থাকলে কী হবে, মানুষজন তার মর্ম বুঝলে তো! তারা তো চলে অদৃশ্য কারও বলে দেওয়া নিয়মে। সহজ হাসি দেখলে রাগ করে, ছুটে চলে অর্থহীন আর ফিসফাস করে মুখস্ত কথাগুলো। ফলে প্রথমেই হেরম্বকে নিয়ে এমন গবেষণা হল, সবাইকে টপকে চুল দাড়ি পেকে সে বেচারা বুড়ো হয়ে গেল। সেসময় জানা গেল হেরম্ব স্মৃতি হারিয়ে ভুলে গেছে প্রাচীন সভ্যতা থেকে বংশ পরম্পরায় পাওয়া এক অমূল্য গুপ্তধনের কথা। ব্যাস খোঁজ খোঁজ। সেখানেও মুশকিল। হেরম্বর হেঁয়ালিতে বলা আছে সেই গুপ্তধন আবার ছোটরা ছাড়া কেউ উদ্ধার করতে পারবে না। এমন সময় গুপ্তধন উদ্ধারের জন্য কারা যেন বুদ্ধিমান ছোট ছেলে বলে অপহরণ করে নিয়ে গেল বগা মানে বন্ধন গায়েন কে।
জন্ম ৫ই ডিসেম্বর, ১৯৭৯ হুগলী জেলার পাউনান গ্রামে। প্রথম ছোটগল্প 'হবি' প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে 'দেশ' পত্রিকায়। ২০১৫ তে প্রথম উপন্যাস 'হানাবাড়ির জাভাস্ক্রিপ্ট' শারদীয় আনন্দমেলা। পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলার প্রকাশিত কিশোর কিশোরীদের জন্য লেখা রহস্য-এডভেঞ্চার, অদ্ভুত-মজা কিংবা ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলো জনপ্রিয় হয়েছে। গদ্যসাহিত্যের জন্য ২০১৯ সালে পেয়েছেন ' পৌলোমী সেনগুপ্ত পুরস্কার'। পেশায় ইলেকট্রনিক্স ও টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার দেবাশিস একটি তাপ বিদ্যুৎ উৎপাদন সংস্থায় কর্মরত।
"কেন যে বড়রা বিশ্বাস করে না যে গল্পের বই বলে আলাদা কিছু হয় না। পড়ার বইয়ে বড়রা গল্পগুলো কেটেছেঁটে বাদ দিয়ে বোরিং করে লেখে ছোটদের ঘুম পাড়াবে বলে, ভাবে ছোটদেরও বোধহয় বড়দের মতো ঘুম না আসার সমস্যা!"
সে এক জটিল ব্যাপার। পেরুর জঙ্গল থেকে আসা হেরম্ব হেমব্রম ওরফে হেরম্বকর্তার ধাঁধায় মোড়া গুপ্তধন আছে হেঁসেহারে, যা খুললেই ম্যাজিক হবে। সেখানে কেউ হাসতে পারে না, হাসলেই লোকে হুমকি দিয়ে যায়। হেরম্বকর্তার গুপ্তধন খুঁজে বার করতে বাজার থেকে প্রচুর ধার করে ডাকাতের দল খুলেছে গোটা-গোপাল, বোলতাপিসির কাছে টাকা, বারুদ গানগুলির কাছে বন্দুক, বোম-ভোলের কাছে পেটো(ইনি বোমা রেখে ভুলে যান)। সেই গ্যাঙর গ্যাং-এর মধ্যে একমাত্র সে-ই আস্ত, বাকিরা কেউ কানকাটা কর্ণ, নাককাটা নকুল, পা-কাটা পাপাই। আরো আছে, "চুল কেটে চলে এসেছিস গ্যাঙর গ্যাং-এ চাকরি করবি বলে? আবার নাম বলছিস চুলকাটা চঞ্চল? কী ব্যাকগ্রাউন্ড তোর? ক'টা লাশ ফেলেছিস?" "মারপিট করতে পারি।" "এটা কোনও কোয়ালিফিকেশন হল? মারপিট এখন সবাই করে সোশ্যাল মিডিয়ায়।"
কিন্তু দল খুললেই তো আর হয় না, বুদ্ধি পাবে কোথায়! তাই কাগা ওরফে কান্তিক গাঙ্গুলির নেইমামাকে ধরে মাসিক কিস্তিতে বুদ্ধি ধার করে ছোট বাচ্চাদের গুপ্তধন খোঁজার ট্রেনিংয়ের দায়িত্ব দেয়। আর তাদেরই খপ্পরে পড়ে আমাদের বগা, অর্থাৎ মানুষপুরের বন্ধন গায়েন।
নিজের বুদ্ধিতে সেখান থেকে পালিয়ে বেচারা পড়ল হেঁসেহারের চক্করে। সেখানে রাত্রে লাইব্রেরি খোলা দেখে বগার মনে প্রশ্ন জাগে, মানুষপুরে তো দিনেও লোক বই পড়তে যায় না, এখানে রাত্রে পড়ে?
লাইব্রেরি থেকে সোজা থানার রাস্তা। সেখানে মহা ভীতু বড়বাবু ও কে চিনি একাই জেগে, বাকিরা টেনে ঘুমোচ্ছে, দিনরাত মোবাইলে কথা বলে বলে বড়বাবুর ঘাড় একদিকে হেলে গেছে, কিছুতেই সোজা হয় না।বগা যখন হাজির হয়, বাইরে তখন শিরিশিরে হাওয়া দিচ্ছে, গাছের পাতা কিলবিল করে কাঁপছে, বোমা হারিয়ে মিসিং ডায়েরি লেখাতে আসা বোম-বোলে লক-আপের ভেতর নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে আর বড়বাবু ভয়ে কেঁপেই মরছেন।
সত্যিই কি এসব হয়েছে নাকি স্বপ্ন দেখেছে বগা? তাহলে কিছু চরিত্র ধরা দেয় আর কিছু চরিত্র অবাস্তব হয় কী করে? নাকি বগার সামনে অদ্ভুত স্বপ্নজটের গোলকধাঁধা তৈরি করেছেন গোমড়ামুখো দুর্বাসাদমন সুগন্ধি? নেইমামা কি সত্যিই আছেন, নাকি তিনি কানামামা? তিনবছর বয়সে যখন দু'জনেরই আধো আধো বুলি ফুটেছে, একজন পুকুরে ডুবে মারা যায়। যেহেতু যমজ ভাই, তাই বলা মুশকিল কে মারা গেছে, কে-ই বা বেঁচে আছে! কাগা-বগা কি পারবে হেরম্বকর্তার হেঁয়ালির জট ছাড়াতে?
সুতরাং আরেকবার কাগা-বগার হাত ধরে চলে যাই সেই জগতে যেখানে সত্যি-মিথ্যে গুলিয়ে যায়, রহস্য আর মায়াজালে আটকে পড়ি, নির্মল আনন্দ আর উদ্ভট মজায় মেতে উঠি। বন্ধুত্ব পাতাই হাবুল হাতির ছেলে হালুয়ার সাথে, যাকে ফাঁক পেলেই সবাই পড়িয়ে দিচ্ছে। আর সে মরিয়া হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে এমন একজন বন্ধু যে তাকে সাবধান করে দেবে কেউ পড়াতে এলেই, তার মতে, "আসলে পড়া ব্যাপারটা যেন কেমন-কেমন, যা জানতে চাই ঠিক তার উল্টো। কবে থেকে ভাবছি হেঁসেহারের কুল গাছের বনে কোন গাছের কুল খেতে চমৎকার বই পড়ে জেনে নেব। তা নয়, সব লেখা আছে, 'ফল খাওয়ার সময় সেটা ধুয়ে নেবে', 'হাত ধুয়ে খাবে', 'খেয়ে মুখ ধোবে', আরে বাবা আগে কী ফল খাব, সেটা বল। কোন ফলটা খেতে ভালো উপর থেকে দেখে কী করে চিনবো?.. জানিনা কোন ক্লাসের পড়ায় এসব আছে। আমায় বুঝি সবসময়েই একটা মিষ্টি কুল পেতে গিয়ে দশটা টক কুল চেখে মরতে হবে!"
আজ যেখানে ছোটদের জন্য ছোটদের মতো করে লেখার ধারা প্রায় লুপ্ত হতে বসেছে, সেখানে দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো হাতে গোণা কয়েকজন লেখককে ধন্যবাদ নিয়মিতভাবে ছোটদের জন্য এই আশ্চর্য জগৎ এঁকে যাওয়ার জন্য।
"...তাল গাছ থেকে সড়সড় করে কারো নেমে আসার শব্দ। ভয়ে জড়সড় হয়ে দু'জনে দেখলাম, আমাদের সামনে একজন বডিবিল্ডারের মতো তাগড়াই লোক দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় কোঁকড়া, ঝাঁকড়া চুল। বিরাট কানঢাকা গোঁফ। কোমরে গামছা বাঁধা। আমার আর চিনতে বাকি রইল না।একানড়ে!
আমি স্ট্যাচু হয়ে বললাম," আমি নড়িনি! হালুয়াও নড়েনি। আপনি একা নড়তে পারেন!"
কোন গল্প পড়া শুরু করলে সেটা মাঝপথে ছেড়ে দেবার অভ্যাস নেই (একমাত্র চেতন ভকতের রেভেলিউশন ২০ ২০ মাঝপথে ছেড়ে দিয়েছিলাম)। এই গল্পের ক্ষেত্রে মনে হচ্ছিল হয়ত মাঝপথেই ছেড়ে দিতে হবে, কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে শেষ করেছি। শুরুটা খারাপ হয়নি। স্বপ্নের শুরু স্বপ্নের চরিত্র গুলো, ঘটনার বর্ননা খারাপ লাগছিল না। বিশেষ করে চরিত্রের নাম গুলো আমায় বেশ আকর্ষন করছিল। কিন্তু গল্প যত এগোল, লেখার বাঁধুনি তত কম হতে লাগল। খুব খারাপ একটা লেখা। এক তারা দেবার ও ইচ্ছা ছিল না।