'শহরের উষ্ণতম দিনে'র গল্পসংখ্যা চৌদ্দ। ভিন্ন ভিন্ন ঘরানার চৌদ্দটি গল্প পড়তে পড়তে পাঠক হারাবেন এক গল্পের শহরে, যে শহরের এক একটি গলি এক এক রকম আবেগের গল্প বলে। সেই অলিগলি ধরে হাঁটতে হাঁটতে পাঠক কখনো হেসে উঠবেন নিজের অজান্তেই, আবার কখনো একান্ত বেদনাবোধে ভিজে উঠবে তার চোখ। কোথাও পাঠক খুঁজে পাবেন রহস্যের ধোঁয়াশা, কখনো ভয়ের শিহরণে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে, কখনো আবার গভীর এক বিষণ্ণতায় পাঠক হারাতে চাইবেন এই শহরের অচেনা, অথচ খুব আপন এই গলিপথে।
আমি তাসনিয়া আহমেদ - পেশায় চিকিৎসক, নেশায় লেখক। এমবিবিএস পাস করেছি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ থেকে। মেডিকেলে পড়ার সময়ই লেখক হিসেবে প্রথম আত্মপ্রকাশ করি ২০১৭ সালের বইমেলায় একটি গল্প সংকলনে গল্প প্রকাশের মাধ্যমে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘বয়স যখন ষোলোই সঠিক’। এরপর একে একে লিখে গেছি আরো বেশ কিছু গল্প আর উপন্যাস। বর্তমানে আমার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থের সংখ্যা চার এবং উপন্যাস সংখ্যা এক। এক সময় লেখক হবার কথা ভাবতে পারতাম না সত্যি, তবে এখন মাঝেমধ্যে স্বপ্ন দেখি, আমার লেখা বইয়ের টাওয়ার আকাশ-সমান উঁচু হোক! আর তাই, চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সেবা করাই এখন আমার একমাত্র উদ্দেশ্য নয়; সেই সাথে লিখে যেতে চাই - ভালোবাসার গল্প, মানুষের গল্প আর বেঁচে থাকার গল্প।
গতবছর সতীর্থ থেকে ক্রাউন সাইজের পিচ্চি এই বইটা কিনেছিলাম ভালোমন্দ কোনকিছু না ভেবেই। নতুন লেখক লেখিকাদের বই পড়া আমার কাছে একরকম অ্যাডভেঞ্চারের মতো। নতুন কিছু আবিষ্কার করার মতো। মাঝে মধ্যে এই অ্যাডভেঞ্চার কিন্তু বেশ রোমাঞ্চকর হয়। তাই প্রতিনিয়ত ছুটে চলি নতুন অ্যাডভেঞ্চারের নেশায়।
'শহরের উষ্ণতম দিনে' দিয়ে শুরু করেছিলাম 'তাসনিয়া আহমেদ' নামক অ্যাডভেঞ্চার। বলাই বাহুল্য, অ্যাডভেঞ্চারের সম্পূর্ণ সময়টা মন্দ কাটে নি। প্রথম গল্প 'পাঁচতলা' পড়েই গল্পগুলোর একটা বৈশিষ্ট্য প্রকট হয়ে ধরা দিয়েছে আমার চোখে। আর তা হচ্ছে গল্পের ভবিষ্যৎ পাঠকের হাতে ছেড়ে দেওয়া। ছোট গল্পের ক্ষেত্রে এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় লাগে।
কিছু গল্প পেয়েছি যেগুলো সত্যিকারের স্বার্থক ছোটগল্প হিসেবে আমার কাছে ধরা পড়েছে। যেমন : একদিন, জলপদ্ম, তর্জনী (আমার মতে শ্রেষ্ঠ গল্প), ঠিকানা। আবার কিছু গল্প পড়ে বেশ বিরক্তও হইছি। যেমন বইটির নামগল্প 'শহরের উষ্ণতম দিনে', 'প্রথমবার', 'অধরা'(সবচেয়ে বেশি বিরক্তিকর ছিল)। কিছু গল্প ছিল টিপিক্যাল। তবে স্বীকার করতেই হবে লেখিকার লেখার হাত ভীষণ ভালো। লেখিকার জন্য এই ক্ষুদ্র পাঠকের পক্ষ থেকে শুভকামনা রইলো। আশা করি বাংলা সাহিত্যে তার নিজের অ্যাডভেঞ্চারটুকুও তার মনের মতো সুন্দর হবে।
'আঠারোই জুন' 'শহরের উষ্ণতম দিনে' 'অধরা' 'নয়ন' 'প্রথমবার' 'অপেক্ষা কিংবা মায়াবতীদের গল্প' শুনতে চাইলো। 'তর্জনী' মেপে 'একদিন' 'জলপদ্ম' হাতে 'ঠিকানা' বরাবর 'পুতুল' ভবনের 'পাঁচতলা' পৌঁছালাম। চেষ্টা তদবিরে 'মতিন সাহেবের একদিন' জুটলো, তিনি গল্প শোনাবেন 'শান' বাঁধানো পুকুর ঘাটে।
বইয়ে থাকা গল্পের শিরোনাম দিয়ে ছোট্ট একটি গল্প বলার চেষ্টা করলাম৷ হাহা! আমার এই চেষ্টা সফল না হলেও গল্পকারের চেষ্টা সফল হয়েছে। ভিন্ন স্বাদের, ভিন্ন ঢঙের মোট ১৪টি গল্প দিয়ে পুরোটা সময় বেশ মাতিয়ে রেখেছিলেন।
শহরের উষ্ণতম বিকেলে হাতে তুলে নিয়েছিলাম 'শহরের উষ্ণতম দিনে' বইটি৷ নাম শুনলে মনে হয় যেন রোমান্টিক উপন্যাস। প্রথম চমকটা এখানেই৷ এটি রোমান্টিক কোনো উপন্যাস নয়৷ একক গল্প সংকলন। অবশ্য প্রচ্ছদেই এটি উল্লেখ ছিল। ১১০ পৃষ্ঠার বইয়ে মোট ১৪টি গল্প৷ তাই গল্পগুলোও বেশ ছোট ছোট৷ তবে আনন্দের বিষয় হলো, প্রত্যেকটি গল্প তৃপ্তিদায়ক। নির্দিষ্ট কোনো জনরায় আটকে থাকেনি৷ হরর, সুপারন্যাচারাল, মিস্ট্রি, রিভেঞ্জ, থ্রিলার, রোমান্টিক, স্যোশাল, ট্র্যাজেডি জনরাগুলোর সরব উপস্থিতি ছিল। সেইসাথে কাহিনি, চরিত্র, বর্ণনার ভাবভঙ্গি ও উপস্থাপনায় ছিল বৈচিত্র। অসাধারণ লেখনশৈলী আর শব্দ-বাক্যের পরিমিত ব্যবহার ভীষণরকম মুগ্ধ করেছে।
আমার কাছে মনে হয়, সাহিত্যের সবচাইতে কঠিনতম শাখা হচ্ছে ছোটগল্প। অল্প কথায়, স্বল্প পরিসরে একটি গল্প লেখা সহজ ব্যাপার নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটা 'ডু অর ডাই' পরিবেশ তৈরি করে৷ কেননা একজন লেখক হয়তো অনেক সময় নিয়ে, অনেক ভেবেচিন্তে লেখেন। একটা থিম, একটা নির্দিষ্ট ঘটনা, একটা বিশেষ বার্তা তুলে ধরতে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন৷ উপন্যাসের মতো এসকল ছোটগল্পে খুব বেশি বিস্তারিত তথ্য উল্লেখের সুযোগ থাকে না৷ কিন্তু পাঠক যখন একটানা পড়ে যায় গল্পগুলো, অতি অল্প সময়েই একেকটা গল্প শেষ হয়ে যায়। ঠিকভাবে কানেক্টেড হওয়ার সময় পর্যন্ত পাওয়া যায় না৷ গভীরে প্রবেশ করা যায় না। গল্পে থাকা সূক্ষ্ম পয়েন্টগুলোও মিস হয়ে যায়। আমি এমন অসংখ্য পাঠক দেখেছি, যারা পড়া শেষে কিছু বুঝতে না পারলেও এক গল্প পুনরায় পড়ার আগ্রহ বোধ করে না। পড়লেও তৎক্ষনাৎ সেই চেষ্টা দেখা যায় না৷ তাই পাঠক অবধি পৌঁছানোর পূর্বেই একজন গল্পকারকে বেশ সতর্ক থাকতে হয়৷ সংযত কারণেই ছোটগল্প লেখা তাই খুব শক্ত কাজ৷ আর এ কাজটিই অত্যন্ত যত্ন সহকারে এবং সুনিপুণভাবে করেছেন লেখিকা তাসনিয়া আহমেদ। তিনি প্রকৃতপক্ষেই প্রশংসার দাবিদার।
বইয়ের কোন গল্প কেমন ছিল তার বিস্তারিত বর্ণনায় যাবো না। হাতের পাঁচটি আঙুল যেমন সমান হয় না, তেমনি একটি বইয়ের সবগুলো গল্পের মান ও আবেদন একরকম আশা করা বৃথা৷ তবে গল্পগ্রন্থের বেলায় আমার এক ধরনের প্রত্যাশা থাকে৷ যেমন মোট গল্পসংখ্যার অর্ধেকও যদি মনে ধরে, তাতেই আমার সন্তুষ্টি। সেই হিসাবে বইয়ের সব গল্পই ভালো লেগেছে। তবে 'ঠিকানা', 'তর্জনী', 'পুতুল', 'পাঁচতলা', 'প্রথমবার', 'আঠারোই জুন' এবং 'নয়ন' এই ৭টি গল্পকে পছন্দের বিচারে এগিয়ে রাখবো৷
বইয়ের বানান, সম্পাদনা, প্রিন্টিং এবং বাঁধাই সন্তোষজনক। প্রচ্ছদটাও নজরকাড়া। তবে অলংকরণ আরও ভালো হতে পারতো। সবমিলিয়ে গল্পগ্রন্থটি বেশ উপভোগ্য ছিল৷ যারা ছোটগল্প পড়তে ভালোবাসেন, তাদের জন্য "শহরের উষ্ণতম দিনে" বইটি সাজেস্ট করব। হ্যাপি রিডিং। .
বই : শহরের উষ্ণতম দিনে লেখক : তাসনিয়া আহমেদ প্রচ্ছদ : সানজিদা স্বর্ণা অলংকরণ : তাসনিম তাহসিন তনু ধরন : গল্পগ্রন্থ প্রকাশনী : সতীর্থ প্রকাশনা পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১১০ মলাট মূল্য : ২১০ টাকা
বইয়ের নামঃ শহরের উষ্ণতম দিনে লেখকঃ তাসনিয়া আহমেদ রেটিংঃ 🥰🥰🥰🥰.৮
★সারসংক্ষেপঃ ———————— "শেষ হয়েও হলো না শেষ" যাকে আমরা সকলেই এক কথায় বলি ছোটগল্প। "শেষ হয়ে ও হলো না শেষ " বলার কারণ গল্পের সমাপ্তি মূহুর্ত মনকে সান্ত্বনা দেয় না, মনে হয় সামনে কি হবে তা জানলে বেশ হতো। আমার কাছে তাই ছোটগল্প জীবনের মতো ই লাগে। জীবনে সব গল্প ছোট গল্প শেষ হয়েও যেন শেষ হয় না। যাই হোক, 'শহরের উষ্ণতম দিনে" বইটি মূলত লেখকের একক গল্প সংকলন এর বই। এতে রয়েছে ১৪ টি ছোট গল্প। নিচে ১৪ টি গল্পেরই ছোট করে কিছু লাইন লিখে দিলাম।
১।পাঁচতলাঃ —————— নিধিকে একটা সিএনজি ডেকে বাসায় পাঠালো আদনান। অন্ধকার হয়ে এসেছে। তার নিজেরও এখন বাসায় ফিরতে হবে। কি মনে করে নিচ থেকে হঠাৎ ওপরে তাকালো আদনান। বিল্ডিং এর সবকটা ফ্লোরে আলো জ্বলছে।এমনকী,পাঁচতলাতেও!!সে অনেকক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। যে ফ্লোরে কেউ যায় না,যে ফ্লোর থেকেও কেউ বের হয় না;সেই ফ্লোরে কেন আলো জ্বলবে?????...........
২। একদিনঃ ——————— "এরপরের অংশটুকু গল্পের মতো লাগবে আপনার কাছে।আমাদের বাড়ির সামনে বেশ খানিকটা খোলা জায়গা আছে। বাবা সেইখানে গাছটাছ লাগিয়েছিলেন।একটা কদম গাছ আছে। এক একটা বর্ষা যায়,কখনো সেটায় ফুল আসে না বাবার খুব দুঃখ ছিলো,নিজের হাতে লাগানো কদম গাছের ফুল দেখে যেতে পারলেন না। এই গল্পটা বিয়ের পর একদিন মিলিকে বলেছিলাম। মিলি হাসতে হাসতে বলেছিলে,'এই গাছ আর আমি একসাথে মা হবো। আমারও একটা বাবু হবে,এই গাছে ও ফুল আসবে।" পরশু অফিস থেকে বাসায় গেছি, হঠাৎ মিলি বললো,একবার টেস্ট করাবে।.........
৩।শানঃ ————— সে হেসেই উড়িয়ে দিলো।বললো,"আর বিয়া বইসা কও করবি?আমার ও আর শখ নাই।যেমনে চলতেসে চলতে দে। অখন বিয়া বইলে বহুত ভেজাল আছে। বিয়া করন কি মুখের কথা নি? আর ঘরে বউ রাইখা তরে বিয়া করলে লোকে কি কইবো?" জাহেদার মাথায় অবশ্য ধরলো না যে,বিয়ে করলে লোকে কি বলবে আর বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্কটা লোকের সামনে এলে লোকে কি বলবে এই দুই ব্যাপারের মধ্যে কোনটা বেশি গুরুতর????........
৪।অপেক্ষা কিংবা মায়াবতীদের গল্পঃ ——————————————————— "ওরা আজকেও ঝগড়া করছে জানো?" মশারী টানাতে টানাতে বলেন শরীফা। "আজক��ও একই অবস্থা? " হাসনাত জিজ্ঞেস করেন। "হ্যাঁ,কি অবস্থা বলো তো! ছোট এই টুকু একটা বাচ্চা। বাবা মা এইভাবে ঝগড়া করলে ওর মনটা ছোট হয়ে থাকে না?" "আমরা ও তো ঝগড়া করেছি একসময়। আমাদের ছেলেমেয়েরাও তো ছোট ছিল তখন।" "হ্যাঁ করেছি,মানি। ছয়মাসে দুয়েকদিন তো ঝগড়া হতেই পারে,তাই বলে প্রতিদিন? এই ভাবে?...........
৫।পুতুলঃ ————— " গল্প বলছিলাম ওকে।" "কোন গল্প?" "সেদিন রাতে আমাকে যে গল্পটা বলে ঘুম পাড়িয়েছিলে,দুইটা ইঁদুরের গল্প,ওই গল্পটা।" ফারহানা আদর করে মেয়ের চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বললো,"আচ্ছা, বলো গল্প। আমি যাই। ক্ষুধা পেয়েছে? কিছু খাও মামনি?" "এখন না,সন্ধ্যাবেলা খাবো।" "আচ্ছা মা," বলে ফারহানা উঠলো। বের হয়ে কিছুদূর গিয়ে ফারহানা আবার ফিরে এলো। নওশীনের বিছানায় ফোনটা ফেলে এসেছে সে দরজার কাছে যেতেই আবার থমকে গেলো সে। ভেতর থেকে হাসির শব্দ আসছে। এবারও দুটো কণ্ঠস্বর। এর মধ্যে একটা নওশীনের। আরেকটা কণ্ঠস্বর কার??.........
৬।জলপদ্মঃ ——————— সাধ কইরা ভেজালে পড়তে যাইস না। দুইবেলা প্যাট ভইরা খাইতে পাবি, মাথার উপরে ছাদ পাবি, শাড়ি আলতা সোনো পাউডার পাবি,.......! মাইয়া মাইনষের আর লাগে কি?" মেয়েটা প্রথমবারের মতো মুখ তুলে তাকালো। তার গায়ের রঙ শ্যামলা,মুখটা গোল ধরনের, চোখগুলি কালো,মাথাভর্তি খোলা চুল। আহমারি সুন্দরী না,কিন্তু বড় মায়াবী। চুমকী ছোট এক নিঃশ্বাস ফেললো। এই মায়ায় আজকে পাপের ছায়া পড়বে।...........।পাপ শুধু মেয়েদের হয়। চুমকী একটা ছোট টুল নিয়ে মেয়েটার সামনে বসলো। জিজ্ঞেস করলো,"নাম কি তর???"..................
৭।মতিন সাহেবের একদিনঃ —————————————— মতিন সাহেব মুখে বললেন, "দেখেন,আমার কাছে থাকলে তো আমি দিয়েই দিতাম। আপনার সার্টিফিকেট আটকে রেখে আমার কী লাভ?" মনে মনে বললেন,"আরে গাধার বাচ্চা! এই বুদ্ধি নিয়া অনার্স পাস করসো? তোমারে তো সার্টিফিকেট দেওয়াই উচিত না! দুই একটা নোট বের করে দেখাও,সার্টিফিকেট দিয়ে দেই। ঝামেলা শেষ!" হাসানুল বান্না নামের ছেলেটা কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। মতিন সাহেবের চা শেষ হওয়া পর্যন্ত সে অপেক্ষা করলো। তারপর বললো,"দেখুন,আমি রংপুর থেকে এখানে আসছি এই একটা সার্টিফিকেটেট জন্য। এখানে আমার থাকার কোনো জায়গা তো এখন আর নেই। আপনি যদি কাইন্ডলি.........."
৮।তর্জনীঃ —————— নীরবতা ভাঙলো আজিজা৷ সে এসে চা-নাস্তা দিয়ে গেলো। আমি জামাল উদ্দীন সাহেবকে বললাম, "প্লিজ একটু কিছু মুখে দিন।" প্রকৃতি স্বাভাবিকতা খোঁজে। আমাদের চোখ ও স্বাভাবিকতায় অভ্যস্ত। স্বাভাবিক থেকে এদিক ওদিক হলেই চোখ সেখানে আটকে যায়। আমিও বারবার না চাইতেই ভদ্রলোকের তর্জনীর জায়গাটায় তাকাচ্ছি। নিজের কাছেই বিব্রত লাগছে। তিনি লক্ষ্য করলে কী অস্বস্তিকর একটা ব্যাপার হবে! চা খেতে খেতে তিনি বললেন," তোমার বাবা যে তার ক্যারিয়ার শুরু করেন সার্কাসে কাজ করে, সেইটা কি তুমি জানো?".................
৯।অধরাঃ —————— সাতকাপ চা খেয়ে গলা জ্বলছে। প্রেম গ্যাস্ট্রিকের ব্যথার পরোক্ষ কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে- এই উপলব্ধি নিয়ে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস টাইপ করছিলাম,পেছন থেকে আমাকে তিথি আপু ডাকলেন। "এই আরিফ,শোন তো!" তিথি আপু আমার নাম ধরে ডেকেছেন,এই আনন্দে আমার মরে যেতে ইচ্ছা করলো। মনের ভেতর কেউ একজন দুই হাত উপরে তুলে নাচতে নাচতে বলছে,"তিথি আপু আমার নাম জানেন!"
মনের ভেতরের নাচানাচিকে পরে পাত্তা দেয়া যাবে,এখন আমি খুব স্বাভাবিক ভাবে বললাম," জ্বী আপু।"..........
১০।নয়নঃ —————— খাওয়া দাওয়ার পরে আমি একটু উশখুশ করছি,কখন সেই জিনিস দেখানো হবে! বাবুল সাহেব বললেন, "দেখানোর জিনিস না আসলে। একটা শব্দ শোনা যায়। এখন শুনতে পারবেন না। রাত যতো গভীর হয় ততো বেশি শোনা যায়।" আমি বললাম, " কতো রাত?" "এই মনে করেন সাড়ে এগারোটা বারোটার দিকে শুরু হয়,কান্দনের শব্দ। প্রথমে অল্প অল্প শুনা যায়। আস্তে আস্তে বাড়ে। ভোরের আগে আগে তো একদম চিক্কুর দেয়। তখন কানে আঙ্গুল দিয়া ও থাকন যায় না।" "কে এমন করে কাঁদে?"........
১১।ঠিকানাঃ ——————— " কেমন দেখায় বিষয় টা?" "আমাকে তাহলে কোথায় থাকতে বলছিস?" ছেলেটা হাত কচলাতে কচলাতে বলে,"কাছাকাছি একটা জায়গা আছে,টাকার বিনিময়ে থাকা যায়। তোমার বয়সী অনেকই থাকে ওখানে। আপাতত কিছুদিন থাকলে ওখানে,পরে এইদিকের ঝামেলা চুকেবুকে গেলে আমি তোমাকে নিয়ে এলাম আবার।" অরুণিমা ফিরে গেল অনেক আগের একটা দিনে। তার বাবা তাকে এসে বলছেন,"তোকে মামাবাড়ি পাঠিয়ে দেবো।" ইতিহাস কি সুন্দর করে নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে!অরুনিমা আবার অবাক হলো। সে ছেলেকে ডেকে কাছে বসিয়ে বললো,"তোরা ইস্কুল কলেজে সারাজীবন ঠিকানা লিখে এসেছিস না? আমি লিখতে গেলে আটকপ যেতাম জানিস????....................
১২।প্রথমবারঃ ———————— "ইয়ে, তন্বী,তুই আজকে বিকেলে একটু রেডি হয়ে থাকিস।" আমি জিজ্ঞেস করলাম,"কোথাও যাবো?" "না,মানে, তোকে দেখতপ আসবে।" আমি আর কথা বাড়ালাম না। আগেও লক্ষ্য করেছি, বাবা এই প্রসঙ্গে খোলাখুলি কথা বলতে ইতস্তত করেন। এই এক যন্ত্রণা হয়েছে আমার। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর থেকে সপ্তাহে অন্তত একবার এই "বিকেলে রেডি হয়ে থাকিস" কথাটা আমাকে শুনতেই হয়৷ কিছু করার নেই আমার। লেখাপড়া শেখানো দায়িত্ব ছিলো,বাবা-মা সেই দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন উনাদের দায়িত্ব আমাকে পার করা। আবহমান বাংলার পিতা মাতা জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছেন আমার বাবা-মা;কন্যাদায় তাদের জীবনের বড় দায়!....................
১৩।আঠারোই জুনঃ —————————— "কোনো সুইসাইড নোট রেখে গেছিলেন উনি?" "কিচ্ছু না। সেদিন রাতে অনেকদিন পর খুব স্বাভাবিকভাবে আমার সাথে গল্প করলো। অনেকদিন পর একটা রাত গেলো যেদিন ঝগড়া হলো না। আমি শান্তিতে ঘুমালম। ঘুম থেকে উঠে দেখি ও পাশে নাই। উঠে ড্রইংরুমে আসতেই দেখি ও সোফায় শুয়ে ঘুমাচ্ছে। মেঝেতে ছড়ানো অনেকগুলে স্লিপিং পিলের ফয়েল। আমার মাথা কাজ করছিলে না। একটা অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হবে সেই বোধটা ও ছিলো না...........।
১৪।শহরের উষ্ণতম দিনেঃ —————————————— " তাহলে ব্যাপারটা কী? কোনো কারণে তুমি বিয়েতে রাজি নও?" আমার গলার কাছে কথাটা এসে আটকে গেলো। আমি কিছুতেই অনিন্দ্যর কথাটা উনাকপ বলতে পারলাম না৷ বললাম,"আমি আসলে এখন বিয়ে করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। হঠাৎ করেই সবকিছু হয়ে গেলো তো, আমি এখনো ব্যাপারগুলির সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছি না। আমার একটু সময় দরকার।" আমার অপর প্রান্তে কিছু ক্ষণ চুপ রইলো। এরপর বললো,"আচ্ছা, আমি বুঝতে পেরেছি বিষয়টা।সমস্যা নেই।তোমার যত সময় প্রয়োজন তুমি নিতে পারো। ঠিক আছে, আগামীকাল দেখা হবে তাহলে।" কেউ একজন বিয়ে করতে আসবে আগামীকাল,সে আজকে এতো সাধারণভাবে বলছে,আগামীকাল দেখা হবে,ভাবতেই আমার হাসি পেলো।কিন্তু এখন সিরিয়াস বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছে, হাসা ঠিক হবে না।......
★পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ ————————— আমি সাধারণত গল্প সংকলন বা ছোট গল্প পড়ি না অতো। আমার কখন ও আগ্রহ হয় না পড়ার। এই বইটা যখন অবসরে দেখি তখন আমার কভার টা অসম্ভব পছন্দ হয়। আমার আবার বইয়ের কভার এর প্রতি আগ্রহ অনেক। স্বভাবতই এই বইয়ের কভার ও আমাকে আকর্ষণ করে। কিন্তু গল্পসংকলন এর বই দেখে আর কিনি নি। আমার ধারণা ছিল পড়া হবে না কিনলে। আমার জন্মদিন এ কাকতালীয় ভাবেই আমাকে আমার ফ্রেন্ড বইটি উপহার হিসেবে দেয়। আর আমি পেয়ে একটু একটু করে গল্প গুলো পড়ি।
এবং আমি নিজেই অবাক হই যে আমার আসলে প্রতিটা গল্প অনেক ভালো লাগসে। প্রতিটা গল্পতেই বাস্তবের স্পষ্ট ছাপ আছে। আমার মতে বউটিতে সব ধরনের জনরা ছোট গল্প আছে। হরর, থ্রিল,ফেনটাসি,রোমেন্স, সাইকোলজিক্যাল থ্রিল,বাস্তবিক সব জনরা ই বিদ্যমান। আমার কাছে প্রতিটি গল্পই ভালো লাগসে। ইমোশনপর ছড়াছড়ি বটে। কিছু গল্প পড়ে খুব দুঃখ লাগল, কিছু গল্প পড়ে হাসি পেয়েছি, কিছু গল্প পড়ে ভয় ও পেয়েছি। সব ধরনের জনরার ছোয়া লেখকের গল্পে পাওয়া যায়। আমার খুব ভালো লেগেছে একদিন, শহরের উষ্ণতম দিন,ঠিকানা, প্রথমবার,নয়ন, তর্জনী। এটা লেখিকার দ্বিতীয় বই। সামনে এরকম বই আরো পাবো আশা করি। শুভ কামনা। ❤️
লেখিকা তাসনিয়া আহমেদের ২য় বই 'শহরের উষ্ণতম দিনে'। এটি একটি গল্পসংকলন। বইটিতে মোট ১৪টি গল্প আছে। রোমান্টিক, সামাজিক, ভৌতিক, সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার সব ধরনের গল্পের স্বাদ পাবেন বইটিতে। এক একটা গল্প এক একরকম। সবগুলো গল্পই খুব সুন্দর, আলাদা করে বলার মত নেই যে এই গল্পটা অনেক ভালো কিন্বা এই গল্পটা ভালো লাগে নাই।
লেখিকার লেখনিতে অন্যরকম একটা টান আছে, পড়া শুরু করলে আপনি শেষ করেই উঠবেন। খুব সুন্দর ও সহজ করে গল্প গুলো লিখেছেন।
প্রচ্ছদের জন্য বইটা আরো আকর্ষণীয় লাগে। সতীর্থ প্রকাশনীর এই বইয়ের প্রডাকশনও ভালো হয়েছে।
লেখিকার লেখার ধরন আসলে খুব কম্ফোর্টিং। যা ই পড়েছি উনার, ভাল লাগে বেশিরভাগটাই। পাঠক জীবনের সাথে গল্পগুলোকে রিলেট করতে পারে। আমি যেমন অনেকাংশেই পেরেছি। জীবন, সমাজ বাস্তবতা, হাসি কান্না, প্রেম বন্ধুত্ব এই নিয়েই গল্প গুলো। আর কিছু গল্প বেশ গা ছমছমে। খু্ব ভাল লাগলো - তর্জনী, অধরা, নয়ন,প্রথমবার,পাঁচতলা গল্প গুলো। বাকিগুলোও নিজস্ব জায়গা থেকে সুন্দর।
❝সতীর্থ প্রকাশনার প্রথম চারজন লেখকের একজন তাসনিয়া আহমেদ। তাঁর লেখা প্রথম গল্পগ্রন্থ 'বয়স যখন ষোলোই সঠিক' অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯ এ সতীর্থ প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় সতীর্থ প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে লেখিকার দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ 'শহরের উষ্ণতম দিনে'।❞
➲ আখ্যান—
'শহরের উষ্ণতম দিনে'র গল্পসংখ্যা চৌদ্দ। ভিন্ন ভিন্ন ঘরানার চৌদ্দটি গল্প পড়তে পড়তে পাঠক হারাবেন এক গল্পের শহরে, যে শহরের এক একটি গলি এক এক রকম আবেগের গল্প বলে। সেই অলিগলি ধরে হাঁটতে হাঁটতে পাঠক কখনো হেসে উঠবেন নিজের অজান্তেই, আবার কখনো একান্ত বেদনাবোধে ভিজে উঠবে তার চোখ। কোথাও পাঠক খুঁজে পাবেন রহস্যের ধোঁয়াশা, কখনো ভয়ের শিহরণে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে, কখনো আবার গভীর এক বিষণ্ণতায় পাঠক হারাতে চাইবেন এই শহরের অচেনা, অথচ খুব আপন এই গলিপথে।
➤ পাঠ প্রতিক্রিয়া ও পর্যালোচনা—
গল্প সংকলন খুব কম পড়া হয়, গল্প ছোট থাকে তাই হয়ত। তবে সতীর্থ প্রকাশনা থেকে ❝শহরের উষ্ণতম দিনে❞ গল্প সংকলন পড়ার যে সুযোগ পেয়েছি সেটা হাতছাড়া করতে চাইনি। ১৪টি গল্পের সমন্বয়ে এই সংকলন সাজানো হয়েছে, শুধু এক ঘরনা নির্ভর ছিল সেটা হয়নি দেখে ভালো লাগছে। অনেকে নাম দেখে ভাবতে পারেন রোম্যান্টিক গল্পে ঠাঁসা সেটা ভুল ধারণা। কারণ প্রথম গল্প শুরু হয়েছে সাইকোলজিক্যাল গল্পের মাধ্যমে।
পার্সোনালি বেশি ভালো লেগেছে যে গল্পগুলো সেগুলা হচ্ছে ❝শান❞, ❝জলপদ্ম❞ এবং ❝ঠিকানা।❞ বাকিগুলো ভালো তবে এই তিনটা মাস্টরিড। ট্রাজেডি বা জীবনের আখ্যান আপনাকে ভালোভাবে শিখাবে একইসাথে লিখনী সাবলীল এবং বর্ণনাভঙ্গি দারুন আকৃষ্ট করবে। আমি ১৪টা গল্পের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিচ্ছি যাতে পাঠকদের বুঝতে সুবিধা হয় তবে অবশ্যই স্পয়লার ফ্রি—
● পাঁচতলা
সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের সাথে আমরা বেশ পরিচিত যদি সেই গল্পের সাথে টাইম লুপের মতই কোন অস্বাভাবিক ঘটনা যুক্ত করে দেওয়া হয় সেক্ষেত্রে সদ্য চাকরি পাওয়া আদনানের অবস্থা কেমন হবে বলে ভেবে নিচ্ছেন?
● একদিন
সাগর ও মিলির গড়ে উঠা ভালোবাসার সাথে একটি কদম গাছের সম্পর্ক ঠিক কতটুকু গুরুত্ববহন করে? সেই সুখকর স্মৃতিটা কি হতে পারে? গল্পটা নাহয় তন্ময় আপনাদের শুনাবে।
● শান
রেললাইনে বসে ডিম বিক্রি করে স্বামীপরিত্যক্তা জাহেদা; ঘরে পাঁচ বছর বয়সী প্যারালাইজড মেয়ে নিয়ে তার সংসার। তার আশা-ভরসা এবং শেষ সম্বল মেয়ে জমিলা। সোলেমান নামে এক যক্ষ্মারোগী এখন জাহেদার রাতের সঙ্গী যদিও সেটা সমাজস্বীকৃত নয়। প্রতিবেশী আলেয়ার মা একদিন জাহেদাকে একটা বাসায় রান্নার কাজ দেয়, মন থেকে না চাইলেও অনিচ্ছাসত্ত্বে কাজটা করতে রাজি হয় জাহেদা! এরপর?
● অপেক্ষা কিংবা মায়াবতীদের গল্প
মায়াবতীরা ঠিক কেমন হয়? পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে তাদের স্বাধীনতা কতটুকু নাকি সমাজের ভয়ে মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকা তাদের কম্য! জানতে হলে তো পড়তে হবে। পড়ুন দুই মায়াবতীর গল্প ও জানুন তাদের অপেক্ষার কারণ।
● পুতুল
গা ছমছম করাতে চাইছেন? তাহলে এই গল্পটা আপনার জন্য। অপু ও ফারহানা মেয়ে নওশীন, ঘটনাসূত্রে একটা ভুডু পুতুল খুঁজে পায় সে। ফারহানার পুতুলকে ঠিক পছন্দ না হলেও বাবা-মেয়ে দুই'জনে বেশ আনন্দিত এতে। কিন্তু এই আনন্দ কতটুকু মজা দিয়েছিল তাদের?
● জলপদ্ম
পেটের খিদা মানুষকে দিয়ে করায় না এমন কোন কাজ হয়ত দুনিয়াতে নেই। বলছিলাম চুমকী নামের এক অবলার কথা যার ঠাঁই কোন এক পতিতা পল্লীতে। কি হয়েছিল তার আর কিভাবে সে দুনিয়ার বুকে গড়ে উঠা নরকে এসে উপস্থিত হয়েছে? তার সাথে বকুলের কি সম্পর্ক? দারুন স্টোরিটেলিং ট্রাজেডিক গল্পটা পাঠককে ঘোরে নিয়ে যাবে অনায়াসে।
● মতিন সাহেবের একদিন
গল্পটা শিক্ষা দেয় অনেক কিছুর, মতিন সাহেবের মত ব্যাক্তিদের জন্য সমাজে ভুগতে হয় অনেক শিক্ষার্থীকে। চাকরির প্রয়োজনে হাসানুল বান্না সার্টিফিকেট তুলতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হতে হয় মতিন সাহেবের কাছ থেকে। মতিন সাহেব কি করেছিলেন বান্না ছেলেটার সাথে আর সেটার পরিণাম কী?
● তর্জনী
ছোটখাটো একটা রুদ্ধশ্বাস গল্প পড়তে চাইলে তর্জনী এক্ষেত্রে উপযুক্ত বটে। নাইফ থ্রোয়িং খেলা আর বন্ধুত্বের মধ্যখানে শীতল যুদ্ধের পরিণাম কতটা খারাপ লাগা বহন করছে না পড়ে জানতে চাওয়াটা বরং অন্যায় হবে।
● অধরা
❝নিয়মের বাহিরে মানুষ যেতে পারে না।❞
বাস্তবতার পৃষ্ঠতলে জীবন্ত চাপা পড়ে থাকে এমন অনেক অধরা কাহিনি জানা-অজানার উর্ধে। মোহ থেকে প্রেমের সৃষ্টি এবং সেই প্রেম, ভালোলাগার গণ্ডি পেরিয়ে আসে ভালোবাসা। তবে সব ভালোবাসা কি পরিপূর্ণতা পায়?
● নয়ন
❝পাপ বাপকেও ছাড়ে না।❞
বাবুল সাহেব নিজের বাড়িতে অন্ধকার রাতে কান্নার আওয়াজ শুনতে পায়। কে কান্না করে; নাকি পুরোটাই উনার ভ্রম সেটা জানার জন্য পড়তে হবে আপনাকে আধিভৌতিক প্রায়শ্চিত্তের গল্পটা।
● ঠিকানা
একটা মানুষের শেষ ঠিকানা কোথায় বলতে পারেন? জীবনে ঠিক কতবার একটা মানুষকে ঠিকানা পরিবর্তন করতে হয় সেটা জানেন? আপনি হয়তো যতদূর ভেবেছেন তার চাইতেও বেশি ভাবনা লুকিয়ে আছে এই গল্পের অন্তরালে। একটা বড় উপন্যাস পড়ে আপনি যতটা পরিতৃপ্তি পাবেন তার চাইতেও বেশি পাবেন শুধুমাত্র এই গল্পটা পড়ে।
একটা চরিত্র আর যদি সেটা হয় মেয়ে তাহলে দুনিয়া বুঝানোর জন্য হয়ত এর চাইতে বেশিকিছুর প্রয়োজন হয় না। আমি শুধু পড়ে গিয়েছি আর অনুভব করেছি। কিছুই বলতে চাই না, তবুও বলবো এই গল্প ❝মাস্টরিড❞ কারণ ব্যাথাটা আমাক��� ভীষণ ব্যথিত করেছে।
● প্রথমবার
পিউর রোমান্টিক গল্প পড়তে চাইলে এই গল্পটা আপনার জন্য। গল্পটা পড়বেন আর মুচকি মুচকি হাসবেন, মন যাদের ভালো থাকবে তাদের দিগুণ ভালো হয়ে যাবে। যাদের মন খারাপ তারা নাহয় তন্বী ও মুনিরের কথোপকথন পড়ে মন ভালো করবেন!
● আঠারোই জুন
❝স্ত্রীকে খুন করতে চায় স্বামী।❞
কি ভেবেছেন রোম্যান্টিক থ্রিলার! যদি বলি আধিভৌতিক বা পুরোপুরি গা শিউরে উঠানোর মতো ঘটনা এই গল্পে জড়িয়ে রয়েছে তখন ব্যাপারটা কেমন হবে। কেন স্বামী স্ত্রীকে খুন করতে চাইছে? সাইকিয়াট্রিস্টের প্রয়োজনও বা কেন? রহস্য কী?
● শহরের উষ্ণতম দিনে
❝একটা কঠিন সম্পর্ক আর সাড়ে দশটার বাস!❞
কম্পলিকেটেড রিলেশনশিপের সাথে আমরা কমবেশ সবাই পরিচিত, ঠিক সেইরকম একটা গল্পে উঠে এসেছে এইখানে। অনিন্দ্য ও নীতুর ভালোবাসার এই দুষ্টু মিষ্টি সংগ্রামের স্রোত কোথায় গিয়ে থামবে?
আশা করছি গল্পগুলো সম্পর্কে সাময়িক ধারনা জন্মেছে মনে। সংকলনের পৃষ্ঠা সংখ্যা ১০৮ তাই এক বসাতে ভালো সব গল্প শেষ করে ফেলতে পারবেন।
বইটির দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ করেছেন প্রচ্ছদকার সানজিদা স্বর্ণা।
এই বইয়ে প্রতি গল্পের শুরুতে স্কেচ ব্যাবহার করা হয়েছে গল্পের সাথে পাঠকের সামঞ্জস্যতা স্থাপন করার জন্য। কাহিনি পড়ার পূর্বে স্কেচ দেখে অনেক কিছুই সহজে আন্দাজ করে নিতে পারবে আপনার ভাবুক পাঠক মন। স্কেচ এঁকেছেন তাহসিন তাসনিম তনু।
গল্পগুলো চলনসই বলা যায় কিন্তু আহামরি তেমন কোনো গল্প পাইনি। সংকলনের প্রথম গল্পটা আর 'ঠিকানা' গল্পটা সবথেকে বেশি ভালো লেগেছে। তবে লেখিকার গল্প বলার ধরনটা বেশ গোছানো লেগেছে।
"শহরের উষ্ণতম দিনে", এই লাইনটা আমার অতি প্রিয় ব্যান্ড "মহীনের ঘোড়াগুলি"র একটি গানের লাইন । এই বইয়ের কভারটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে, কেন জানি দেখেই মনে হয়েছিল সিলেটের কোন একটা রাস্তা । সিলেট কেন ? বলতে পারছি না । পরে দেখি, লেখিকা " তাসনিয়া আহমেদ", সিলেট ওসমানী মেডিকেল থেকে পাস করেছেন । মজার কো ইনসিডেন্স ! বইটিতে গল্প সংখ্যা চৌদ্দ । প্রতিটি গল্প আলাদা ধাঁচের, আলাদা ঢঙের । কিছু গল্প খুব বেশী পছন্দ হয়েছে, সেগুলো নিয়েই আজকের রিভিউ । "তাসনিম তাহসিন অনু" বইটির ভেতরে স্কেচিং করেছেন । খুব সাদামাটা অথচ সুন্দর স্কেচিং বইটিকে আরো সুন্দর করেছে । বইটির একটি অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, কোন পাতা ফাঁকা নেই । ডান পাতায় গল্পের নাম তো বা পাতা থেকেই গল্প শুরু ৷ ফন্ট আর মার্জিন স্টাইলও বিশেষ আলাদা ।
"একদিন" গল্পটা খুব মায়াবী একটা গল্প, ভালোবাসার গল্প । আমাদের চারপাশেই মানুষের মধ্যে কতো আশা ভরসা আর স্বপ্নভঙ্গের গান বেজে চলে নিয়মিত । তবুও আবার স্বপ্ন দেখে মানুষ, ভালোবাসে আর অপেক্ষা করে সুন্দর দিনের ৷ এই গল্পটাও ঠিক তেমন ৷ "শান" গল্পটি নির্মম বাস্তবতার, একই সাথে মানুষের চরিত্রের ভালো আর মন্দ দিকটা ফুটিয়ে তুলেছেন লেখিকা ৷ প্রচন্ড রাগ এবং অসহায়ত্ব বোধ হয় এইসব গল্প পড়লে ৷ "মতিন সাহেবের একদিন" গল্পটা বেশ মজার, বিশেষ করে আমরা যারা ভার্সিটির রেজিস্টার অফিসে গিয়ে নাকানি চোবানি খাই, তারা খুব ভালো রিলেট করতে পারবেন । সবচেয়ে পছন্দ হয়েছে "তর্জনী" গল্পটা । চমৎকার প্লট, টান টান লেখা । যদিও সহজেই অনুমান করা যাচ্ছিল, তবু পড়তে খুবই ভালো লেগেছে ৷ "ঠিকানা" গল্পটিও একই রকম, ইজিলি প্রেডিক্টেবল কিন্ত সুখপাঠ্য ।
বাকি গল্পগুলোও সাধারণ জীবনের অংশবিশেষ, প্রেম বাৎসল্য এবং দাম্পত্যের ৷ প্রতিটি লেখাই সহজ সরল ভাষায় লেখা ৷ লেখিকার প্রথম বই "বয়স যখন ষোলোই সঠিক" পড়া হয়নি । আশা করছি, খুব দ্রুতই তার তৃতীয় বই বেরোবে এবং তখন একসাথে প্রথম আর দ্বিতীয় বই দুটি পড়ে ফেলবো ৷
১৪ টি ছোট গল্পের সংকলন বইটি।প্রতিটি গল্প একদম ভালো না লাগলেও খারাপ লাগেনি পড়তে।কিন্তু কিছু কিছু গল্প ছিলো অনেক বেশি সুন্দর।আমার পছন্দের গল্পটি হলো একদম শেষের গল্পটি। যার নামে বইটা "শহরের উষ্ণতম দিনে" আর "মহীনের ঘোড়াগুলি"র গান তো সবসময় সুন্দর কিন্তু এই গানটা আমার অনেক বেশি প্রিয়।
১৪ টি ভিন্ন স্বাদের গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে বইটি। ভৌতিক,রহস্য, সামাজিক, অতিপ্রাকৃত কিংবা রোমান্টিক প্রায় সব বিভাগের গল্পই স্থান পেয়েছে বইটিতে। এতসব বিভাগ স্পর্শ করেও লেখিকা প্রতিটা গল্প উপস্থানের ক্ষেত্রে স্বতস্ফূর্ততার পরিচয় দিয়েছেন। যাই হোক, তবুও এরমধ্যে কিছু গল্প খুব ভালো লেগেছে, কিছু একটু কম ভালো লেগেছে। তাই প্রতিটা গল্প নিয়ে অল্প লাইনে নিজস্ব অভিমত প্রকাশ করছি।
শান: বর্তমান সমাজের অতি পরিচিত স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে প্লট সাজানো হয়েছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক দমে পড়ে ফেলার মত গল্প এটি। ভালো লেগেছে অনেক। গল্পের ভিতরে চমৎকার বার্তাও দেওয়া হয়েছে।
পুতুল: গল্পের শুরুতে স্কেচ দেখেই অনেকটা আন্দাজ করা যায়, গল্পটা ভূতুড়ে হবে। হয়েছেও তাই। পুরো গল্প জুড়ে গা শিরশিরে ভাবটা আশা করি শেষে এসে আতংকে রূপ নিবে।
জলপদ্ম: এটাতেও সমাজের অন্যতম বাস্তব চিত্র দেখানো হয়েছে। জীবনঘনিষ্ঠ গল্পটি উপস্থাপনে লেখিকা বেশ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। শেষটাতে ভালো লাগার অনুভূতির সাথে মনটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠে। এই মিশ্র অনুভূতির স্বাদ দিতে পারায় গল্পটা আরো ভালো লেগেছে।
প্রথমবার: রোমান্টিক ঘরানার এই গল্পটি পড়ার পর একরাশ মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়েছে মনে। যদিও শুরুটাতে একটু বিরক্তিকর লেগেছিল,কিন্তু ওটা অল্প সময়ের জন্যই।
পাঁচতলা: ছোটবেলায় একটা কলেজের ম্যাগাজিনে ফোর ডাইমেনশনাল ওয়ার্ল্ড নিয়ে একটা ছোট গল্প পড়ে গা টা কেমন ছমছম করে উঠেছিল। এরপর কিশোর বয়সে রাকিব হাসানের "বিদেশী জাদুকর " উপন্যাসটি পড়েও একি অনুভূতি হয়েছিল!আর বড় হয়ে এই পাঁচতলা গল্পটি পড়েও আমি সেই গা ছমছমে অনুভূতি আবার পেয়েছি। ভালো ছিল গল্পটা।
মতিন সাহেবের একদিন: বাস্তবিক গল্প। যদিও গল্পের শেষটা নাটকীয় ছিল, আর বাস্তবে হয়তো এরকম খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু শেষটা পড়ে মনে আশা জাগে, ইশ! এভাবে যদি সব ঠিক হয়ে যেত!
নয়ন: অতিপ্রাকৃত গল্প। শুরু থেকে ভালো লাগলেও শেষে এসে একটু কম ভালো লেগেছে। কেন যেন মনে হয়েছে, গল্পে কোন মশলা পরিমাণে একটু কম পড়েছে। তবে সর্বোপরি, গল্প সুন্দর।
ঠিকানা: মনে-প্রাণে অদ্ভুত বিষণ্ণতা ছুঁয়ে যায় গল্পটি পড়ে। সেইসাথে চাপা ক্ষোভও ছড়িয়ে পড়ে,মনের অলিগলিতে আবেগী কিছু প্রশ্ন উত্তরের পথ খুঁজে যেন।আচ্ছা, কেন এত স্বার্থপর হয়ে পড়ে আপনজন? তাহলে কি এই মায়া,এই সংসার- সবি মিথ্যে হয়ে যাবে একদিন?
তর্জনী: প্লট ভালো লেগেছে।।অন্যরকম ছিল।।শুরুটুকু পড়ে যদিও আঁচ করা যায় কার সা���ে ঘটেছে, কিন্তু কিভাবে ঘটেছে তা জানার আগ্রহ মনোযোগ ধরে রাখে গল্পের শেষ পর্যন্ত। নিঃসন্দেহে গল্পটা অনেক ভালো ছিল।
একদিন: প্রকৃত ভালোবাসা কোন একদিনের পাওয়া সুখবরে খুশি যেমন হয় তেমনি সুখবরটি না পেলেও কখনোই ভালোবাসার অপমান করে না। বেশ ভালো লেগেছে।
অধরা: সত্যি বলতে, গল্পটা আমার ভালো লাগে নি তেমন একটা। প্লট কমন মনে হয়েছে। তবে অনেক সাবলীলভাবে লিখে গিয়েছেন। শেষটাও বাস্তব���ার আশ্রয়ে নির্মিত ছিল।
আঠারোই জুন: পৃথিবীতে অনেক রহস্যময় ঘটনা ঘটে। তেমনি এক রহস্যঘেরা প্লটে নির্মিত। শেষটা আসলেই অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল।। পড়ে অনেক চমৎকৃত হয়েছি। সবচেয়ে বড় কথা, পুরো গল্পে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভালো টুইস্ট ছিল।
অপেক্ষা কিংবা মায়াবতীর গল্প: দুই প্রজন্মের কাহিনীতে গল্পটার মায়া বেড়েছে বহুগুণ। ভালো লেগেছে অনেক।
শহরের উষ্ণতম দিনে: শেষ গল্প হিসেবে আরো একটু সুন্দর গল্প আশা করেছিলাম। কারণ আগের ভালো ভালো গল্পগুলি পড়ে আশার পারদ যেন একটু বেশিই বেড়ে গিয়েছিলো। কিন্তু এই গল্পটি তেমন একটা ভালো অনুভূতি দিতে পারে নি। প্লটটাও সাদামাটা মনে হয়েছে। তবে মানুষ হিসেবে সবার পছন্দের তারতম্য থাকবেই। আমার ভালো লাগে নি, হয়তো আপনাদের ভালো লাগবে।
যাই হোক, ছোট গল্পের কথা মনে এলেই কানে প্রতিধ্বনিত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সোনারতরীর সেই লাইনটুকু; "অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে শেষ হইয়াও হইলো না শেষ।"
আর তাসনিয়া আহমেদের এই বইয়ে লেখা প্রতিটি ছোট গল্পের শেষটুকু পড়েই মনে হয়েছে "শেষ হইয়াও হইলো না শেষ!"
সুতরাং এইদিক বিবেচনায়, উপরে কিছু জায়গায় বর্ণিত ছোট ছোট সমালোচনাগুলি স্বত্ত্বেও গল্পকার পুরোটাই সফল বলা যায়। আশা করি, তিনি সামনে আরো বড়-বিস্তৃত প্লটে লিখবেন, উনার উপন্যাসের অপেক্ষায় রইলাম।
আর সবশেষে একটা কথা না বললেই নয়; পুরো বইয়ে বানানের ব্যাপারে যত্ন নেওয়া হয়েছে। কোন ভুল বানান অন্তত আমার চোখে পড়ে নি। সেইসাথে বইয়ের পৃষ্ঠাগুলিও ভালো মানের ছিল। প্রচ্ছদটাও ভালো লেগেছে।
সুতরাং,আর দেরি কেন? ঝটপট পড়ে ফেলুন সদ্য প্রকাশিত বইটি। হ্যাপি রিডিং
বইঃ শহরের উষ্ণতম দিনে। লেখকঃতাসনিয়া আহমেদ। একক গল্প সংকলন। পারসোনাল রেটিংসঃ৪/৫
রিভিউঃ শহরের উষ্ণতম দিনে লেখকের দ্বিতীয় মৌলিক বই।বইটার প্রচ্ছদ খুবই আকর্ষনীয়।সেটার দিকে আকৃষ্ট হয়েই কেনা।যদিও কেনার পর ভুল করেছি বলে মনে হয় নি।আকারে ছোট এই সুখপাঠ্য বইটি কয়েকঘন্টায় শেষ করা গেলেও আমি একটু ধীরেসুস্থেই এগিয়েছি।বইটিতে ১৪ টি একক গল্প রয়েছে।সবগুলো গল্পই ভালো বলা যায় তবে আমার সবগুলো ভালো লাগেনি।এটা নিতান্তই আমার পছন্দের দিক থেকে অবশ্যই।আমি সবগুলো গল্পের একটা ওবারল রিভিউ লিখে শেষ করছি এই পোস্ট।
১)পাঁচতলাঃঅতিপ্রাকৃত গল্প।পড়ার সময় একটু আধটু ভয় কাজ করতে পারে তবে শেষটা আরো অন্যরকম হলেও পারতো। আমার একটু বেশি অতিপ্রাকৃত মনে হয়েছে।
২)একদিনঃআমার ভালো লাগার তালিকার প্রথম বই।হাসি-কান্না আর কিছু আক্ষেপের মিশেলে দারুণ লেগেছে।পড়ার সময় আপনার মুখে এক চিলতে হাসি আর বিষন্নতা আসবে মাস্ট💞।
৩)শানঃচরিত্রগুলো আমার পছন্দ না তবে লেখক খুব ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।আমার এই টাইপ গল্পগুলো পড়তে গেলে কেমন ঘেন্না আর বিতিকিচ্ছিরি লাগে তবুও গল্পটা রেলওয়ের আশে পাশের বস্তিগুলোর একটা ধারণা আপনাকে দিবে।আর গল্পের নাম কেন শান সেটা শেষে গিয়ে বুঝতে পারবেন।
৪)অপেক্ষা কিংবা মায়াবতীদের গল্পঃপারিবারিক স্বামী-স্ত্রী বেসড গল্প।দুজন কাপল।প্রথমদিকে একটু অন্যরকম হলেও শেষটা সুন্দর আর মাঝখানটা💞।
৫)পুতুলঃঅতিপ্রাকৃত গল্প।ছোটবেলার একটা সিনেমার কথা মনে পরেছে।
৬)জলপদ্মঃমনুষ্যত্ব খুব দামি একটা জিনিস আর অভাব মানুষকে দিশেহারা করে ফেলে।এই দুটো লাইনই যথেষ্ট এই গল্পের জন্য তবুও বলে রাখি গল্পটা বেশ ভালো আর তার শেষটাও।
৭)মতিন সাহেবের একদিনঃ আই থিংক বইয়ের বেস্ট গল্পের পুরস্কার পাবে এই গল্পটি তাই স্পয়লার করলাম না।
৮)তর্জনীঃবইয়ের বেস্ট গল্পগুলোতে এটা অনায়াসে স্থান পাওয়ার যোগ্যতা রাখে।চমৎকার লেগেছে আমার কাছে।বিশ্বাসঘাতকতা যে কত মধুর সম্পর্কের ইতি ঘটাতে পারে তার ইয়ত্তা নেই।
৯)অধরাঃপারসোনাল বেস্ট💞।অনেক হেসেছি পড়ার সময়😄।ইসলাম ধর্ম এরকম বিয়েকে উৎসাহিত করলেও আমাদের সমাজটা এখনো ভালবাসাগুলোর পূর্ণতা দিতে পারে না🙂।স্পয়লার হয়ে গেলো😔।
১০)নয়নঃঅতিপ্রাকৃত।রাতের বেলা একলা রুমে পড়লে ভয় লাগবে।মনে হবে খাটের নিচ থেকে এই বুঝি বেরিয়ে এলো।তবে লোভে পাপ পাপে মৃত্যু এটার ভালো উদাহরণ এই গল্প।
১১)ঠিকানাঃগল্পটা বেশ সুন্দর। মন ছোঁয়ার মতো।ব্যাস এতটুকুই।চোখে জলও আসতে পারে ইউ নেবার নো।
১২)প্রথমবারঃভালবাসা পবিত্র। আর যদি সেটা হয় হালাল সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তাহলে সেটা স্বর্গীয়।পুরো গল্প জুড়ে হাসি লেগে থাকা স্বাভাবিক ব্যাপার💞।
১৩)আঠারোই জুনঃআরেকটা অতিপ্রাকৃত গল্প।গল্পের মূল চরিত্র ডাক্তারের চেম্বারে যান চেক-আপ করাতে। স্কিৎজোফেনিয়া রোগে আক্রান্ত বলে মনে করেন ডাক্তার সাহেব।কিন্তু আদৌ কি চরিত্রটি ডাক্তারের চেম্বারে গিয়েছিল? না গেলে কেন ডাক্তার সাহেব লোকটিকে স্কিৎজোফেনিয়ায় আক্রান্ত বলবেন? পড়ুন।পড়লেই খোলাসা হবে ইন শা আল্লাহ।
১৪) শহরের উষ্ণতম দিনেঃবইয়ের শেষ গল্প।পারসোনালি বলতে গেলে আমার এই গল্পটি একটুও ভালো লাগে নি।প্রচ্ছদ গল্পটা আরেকটু অন্ন রকম হলে মন্দ হতো না কিন্তু লেখক সেদিকে নজর দেননি।তবে গল্পটির ভাষা সুন্দর।কি হবে? কি হবে? এরকম একটা জিজ্ঞাসা মনের মধ্যে চলতে থাকবে পড়ার সময় পাঠকের।এই গল্পটা আমার ভালো লাগলে রেটিংসে আরো (.৫) বাড়িয়ে দিতাম😴।
তো ওবারল একটা সুখপাঠ্য বই।টিবিআরে রাখার মতো রাখতে পারেন।তবে লেখককে নিয়ে বলতে গেলে বলবো উনার নতুন বইগুলো আমি অলরেডি টিবিআরে রেখে দিয়েছি💞।
বয়ঃসন্ধির প্রারম্ভে গান-বাজনার ভক্ত থাকলেও বর্তমানে গানের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই আমার। তবে মহীনের ঘোড়াগুলি'র গানের এই দুটো লাইন বেশ ভালো লাগল, লাইন দুটো যেন স্বার্থক সমাপ্তি টানল ‘শহরের উষ্ণতম দিনে’ বইটায়। বইটাকে এক কথায় বলা চলে জীবনের প্রতিচ্ছবি। বিরহ, ট্র্যাজেডি, ভালোবাসা, অপ্রাপ্তি, পরাবাস্তবতা এবং মানসিক দ্বন্দ্ব ও অসুস্থতা- এক কথায়, মানবমনের প্রতিটা অধ্যায় যেন বইয়ে ইতিউতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। চৌদ্দটা গল্পই বেশ উপভোগ করেছি, কোনো গল্প-ই বিরক্তিকর লাগেনি। কিছু কিছু গল্পের গভীরতা দারুণভাবে স্পর্শ করেছে আমায়। পাঁচতলা এবং শান- এই গল্প দুটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ঠেকেছে। লেখনশৈলী বেশ সাবলীল, পঠনকালের পুরোটা বেশ উপভোগ্য ছিল। পরিশেষে, প্রতিটা গল্পই ভিন্নধর্মী এবং প্রশান্তি প্রদানকারী। লেখিকার ভবিষ্যতের বইগুলোর অপেক্ষায় রইলাম।
শহরের উষ্ণতম দিনে'র গল্পসংখ্যা চৌদ্দ। বইটি লেখিকা তাসনিয়া আহমেদ-এর একক গল্প সংকলন এবং দ্বিতীয় বই হিসেবে উনার প্রশংসা করতে হয়। সামান্য কিছু বানান ভুল ছাড়া আমার কাছে বইটির আর কোন সমস্যা চোখে পড়েনি। ভীষণ সহজপাঠ্য এবং সুখপাঠ্য একটি বই। প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন ঘরানার চৌদ্দটি গল্প নিয়ে সাজানো বইটি পড়তে পড়তেই পাঠক হারাবেন এক গল্পের শহরে, যে শহরের এক একটি গলি এক এক রকম আবেগের গল্প বলে শোনাবে। সেইসব অলিগলি ধরে হাঁটতে হাঁটতেই পাঠক হারাবেন, আবার কখনো হেসে উঠবেন ন��জের মনের অজান্তেই, কখনো একান্ত বেদনাবোধে ভিজে উঠবে তার চোখ, আবার হঠাৎই পাঠক কোথাও খুঁজে পাবেন রহস্যের নিগূঢ় ধোয়াশা, কখনোবা ভয়ের শিহরণে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে, কখনোবা গভীর এক বিষন্নতায় পাঠক হারাতে চাইবেন এই শহরের অচেনা, অথচ খুব আপন এক গলিপথ ধরে। পাঠকের প্রতি তাই শহরের উষ্ণতম দিনে'র উষ্ণ এবং উদার আমন্ত্রণ জানিয়ে দিতে চাই। 🍂
১. পাঁচতলাঃ লিফটে উঠার সময় যদি দেখেন বাটনগুলিতে গড়বড় আছে কিন্তু সমস্যা কোথায় বুঝতে পারছেন না। মনের ভিতর খচখচানি শুরু হবে না? এমন অস্বস্তি নিয়ে আদনানের অফিসের প্রথম দিন শুরু হয়। তার মনের খুঁতখুতে ভাব প্রকট হয় ৪র্থ তলায় লিফট কখনো থামেনা এটা খেয়াল করার পর। গল্পের প্লট, স্টোরি বিল্ডআপটা ভাল লেগেছে। সাইকোলজিক্যাল এই গল্পের শেষটুকু লেখিকা রহস্য রেখে পাঠককে তার ইচ্ছে মত ভাবার সুযোগ রেখেছেন।
২. একদিনঃ হসপিটালে বসে দুইজন অচেনা মানুষের কথোপকথন নিয়ে গল্পটি। সিনেমার গল্পের মত প্রেম দিয়ে শুরু হয়েছিল অদ্ভুত সুখী দম্পতি সাগর ও মিলির। স্ত্রীর জন্য অসম্ভব মায়া মমতায় ঘেরা এই সুন্দর গল্পটি। আমাদের জীবনের সুখ দুঃখের গল্পের মাঝেই তো আমরা বেঁচে থাকি। থাক না এমন আনন্দ বেদনার মূহুর্ত গুলো অজানা। লেখিকা একজন চিকিৎসক হওয়ায় তার অভিজ্ঞতা দারুণ ভাবে গল্পে রূপ দিয়েছেন। গল্পটি আপনার মনে দাগ কেটে যাবার মত।
৩.শানঃ 'পৃথিবীতে সব বাচ্চা কেঁদে জানান দেয় তার উপস্থিতি, কিন্তু জমিলা নামের মেয়েটি কাঁদলো একদিন পর। জন্ম থেকেই সে শুধু দুটি অনুভূতি প্রকাশ করতে জানে, হাসি এবং কান্না।' ট্রেনে কাটা পড়ে স্বামীহারা জাহেদার সাথে সোলেমানের সম্পর্ক সমাজস্বীকৃত নয়। ক্ষুধার জ্বালা, মেয়ের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের জন্য সোলেমানের কাছে নিজের সর্বস্ব বিসর্জন দেয়া মমতাময়ী জাহেদার আদর্শ মা হয়ে উঠার মর্মস্পর্শী গল্প এটি। এই গল্পের বুনট যেমন শক্তপোক্ত তেমনি আমাদের সমাজের বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে লেখা আপনার হৃদয় ছুয়ে যাবে।
৪.অপেক্ষা কিংবা মায়াবীদের গল্পঃ দুটি ভিন্ন বয়সের দম্পতিদের প্রাত্যহিক জীবনের দর্পণ এই গল্পটি। দাম্পত্য জীবনের সামান্য ঠুকাঠুকি থেকে ঝগড়াঝাটিগুলা নিজেদের সম্পর্কে, পরিবারের সন্তানের উপর কতটা বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে তার ইঙ্গিত দিয়েছেন লেখিকা। জীবন সংসারে অশান্তি এড়াতে সময়ের সাথে সাথে দুজন পরিণত মানুষের বোঝাপড়াটা সবচেয়ে বেশি জরুরি কারণ আপনার সঙ্গী মেয়েটাকে🔸 জীবনের সব জটিলতাকে সহজভাবে নেয়ার অসীম ক্ষমতা দিয়ে সৃষ্টিকর্তা পাঠিয়েছেন।🔸
৫.পুতুলঃ বাসার বাথরুমের ওপরের স্টোররুমে রাখা একটা বক্স থেকে একটা অদ্ভুত পুতুল পেয়ে খুশি হয়ে গেলো ছয় বছরের নওশীন। পুতুলটার একটা নামও দিয়ে দিলো 'পিন্টু'। এরপরই শুরু হলো রক্তহীম করা সব কাহিনি। এই গল্পের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল লেখিকার দুর্দান্ত স্টোরিটেলিং এবং পুরো গল্পে ভয়ের রেশ টেনে ধরে রাখা। তবে শেষের টুইস্টটা প্রেডিক্টেবল ছিল।
৬.জলপদ্মঃ ভয়ংকর টানাটানির সংসারে যদি একবেলা খাবার জোগাড় করে সেটা দুবেলা ভাগ করে খাওয়া হয় কতটাই না অসহায় লাগবে একজন বাবার জন্য। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কষ্ট হচ্ছে ভাতের কষ্ট, তবুও বাবা তার মেয়েকে দূরে পাঠাতে রাজি হয়না। অভুক্ত ছোট ভাইবোনের দিকে তাকিয়ে চুমকি একদিন পাড়ি দিলো শহরে। পেটের জ্বালার কাছে হেরে গিয়ে জন্ম নিলো এক নতুন জলপদ্মের। পতিতাবৃত্তি করা এই জলপদ্মই একদিন সাহস করে আরেকটি বকুল ফুলের জীবনে পাপের ছাপ পড়তে দেয় না। এই গল্পে অসহায় মানুষের জীবন সংগ্রাম ও কিছু অসাধারণ সংলাপ আপনাকে বিষন্ন করে রাখবে।
৭.মতিন সাহেবের একদিনঃ টিনশেডের ঘরে জীবন কাটিয়ে দেয়া আর টেনেটুনে সংসার চালানোর মত কষ্ট করা মতিন সাহেবের মত আয়েশী কেরানির দ্বারা সম্ভব না। সার্টিফিকেট আটকে বছরে বছরে বিশাল ইনকামের সুযোগ হাতছাড়া করার মত বোকা নন তিনি। গল্পটি খুব সাদামাটা হলেও আমাদের সরকারি অফিস আদালতের কার্যক্রমের রূপচিত্র দারুণ ভাবে ফুটে উঠেছে। তবে গল্পের শেষের নাটকীয়তা অন্যরকম হলেই বরং ভালো হতো।
৮.তর্জনীঃ এই গল্পটি পড়তে গিয়ে থ্রি কমরেডস বইয়ের কথা মনে পড়ে গেলো। দুই বন্ধুর গোল্ডেন সার্কাসে বিপদজনক খেলা দেখিয়ে তুমুল জনপ্রিয়তা পাবার গল্পের সাথে আছে ঈর্ষা, বিশ্বাসঘাতকতা, আক্ষেপ অনুতাপের ছোঁয়া। গল্পের কাহিনি আর স্টোরিটেলিং দুটোই বেশ ভাল লেগেছে। বন্ধুত্ব একবার ছিঁড়ে গেলে পৃথিবীর সমস্ত সুতো দিয়েও রিপু করা যায় না।
৯.অধরাঃ সিনিয়র জুনিয়রের আবেগ অনূভুতি আর অসম প্রেম নিয়ে গল্পটি। গল্পটি মূলত উঠতি বয়সীদের ক্যাম্পাস লাইফে সিনিয়রের উপর ক্রাশ খাওয়া আর তাদের সম্পর্ক বাস্তব রূপ দিতে না পারার দুঃখ কষ্টের কথা বলে। গল্পের প্লট আর চরিত্রায়ন কোনটাই তেমন ভালো লাগেনি। তবে কয়েকটি দারুণ লাইন আছে গল্পে_🔸হলুদ শাড়ীতে ফুলের গয়না পরা নিজের সবচেয়ে পছন্দের মানুষটিকে দেখা সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতাগুলির একটা।🔸
১০.নয়নঃ একটা ঘরের মধ্যে অদ্ভুত বিশ্রী পচে যাওয়া মাংসের গন্ধ, জানালা দরজা বন্ধ। এরপর যদি খাটের নীচ থেকে কান্নার শব্দ আসে কেমন লাগবে আপনার? বাবুল সাহেবের কথোপকথনে পুরো গল্পটি ভাল মতই এগিয়েছে। গল্পের প্লটটা ভালো ছিল,তবে নয়নের চরিত্রায়নের মাধ্যমে ভয়ের রেশ এতটা না থাকায় গল্পের এক্সিকিউশন দূর্বল লেগেছে।
১১.ঠিকানাঃ এই গল্পে অরণিমা দাশ অরু নামের একটি মেয়ের জীবনের বর্ণনায় আমাদের সমাজে মেয়েদের অস্তিত্বের প্রশ্ন তুলেছেন লেখিকা। জন্ম থেকে মা হারা অরুণিমার নিজের বাসায় ঠাই হয় না সৎমায়ের সংসারের পূর্ণতা দিতে। মামার বাসায় বড় হয়ে একদিন বিয়ে হয় বুনিয়াদি পরিবারে। পরবর্তীতে আলাদা হয়ে স্বামীর সাথে একতালা বাড়ীটাই ছিল তার সবচেয়ে আপন জায়গা। কিন্তু এটাই কি তার আসল ঠিকানা নাকি পরপারে পাড়ি দিয়ে প্রথমবারের মত একটা স্থায়ী ঠিকানা পাবে অরুণিমা? লেখিকা এক লাইনেই অসাধারণ এই গল্পটির সারমর্ম টেনেছেন__🔸জন্মের পরপর যে মেয়ের মা মরে যায় আর বাবা আরেকটা বিয়ে করে,সেই মেয়ের সারাজীবন কাঁদতে কাঁদতেই যায়।🔸
১২.প্রথমবারঃ এক বিকেলে মেয়ে দেখতে এসে দুলাখ একটাকা দেনমোহরে গোবেচারা টাইপ মুনিরের সাথে তন্বীর বিয়ে হয়ে যায়। যারা নতুন প্রেমে পড়েছে বা পড়ার সম্ভবনা আছে তাদের গল্পটি হয়ত ভাল লাগবে। গল্পটি একেবারেই সাদামাটা লেগেছে।
১৩.আঠারোই জুনঃ গল্পটি সৌম আর তাসনুভা নামের অতি সাধারণ দম্পতির। ছাপোষা চাকরিজীবী সৌমের চার-পাঁচ মাস ধরে গলা টিপে বা চাকু পেটে বিঁধিয়ে তার বউকে খুন করে ফেলতে ইচ্ছে হয়। তার ধারণা তাসনুভা পরকীয়ায় আসক্ত। কিন্তু সৌমের জন্য তাসনুভার কান্নায় কোন খাদ ছিল না কারন কান্নার সময় মানুষ প্রকৃতির বিশুদ্ধতম অনুভূতি প্রকাশ করে। গল্পটির বিল্ডআপ, প্লট দুদিক দিয়েই ভাল ছিল। গল্পের শেষটা যেমন বিষাদে মোড়ানো তেমনি ছিল অপ্রত্যাশিত।
১৪.শহরের উষ্ণতম দিনেঃ আগামীকাল নীতুর বিয়ে তবে তার প্রেমিক অনিন্দ্যর সাথে নয়। বাবা বিয়ে ঠিক করেছেন অন্য ছেলের সাথে। বাবার প্রতি অসম্ভব মায়া কাজ করলেও প্রেমের টানে ভিন্ন ধর্মের বেকার একটি ছেলের সাথে জীবন শুরুর কাহিনি নিয়ে গল্পটি। গল্পের এত সুন্দর নাম আর শেষ গল্প হওয়ায় প্রত্যাশা ছিল অনেক কিন্তু পড়ার পর অনুভূতি হয়েছে ❌তীরে এসে তরী ডুবলো।
সম্পাদনাঃ সতীর্থের এই বইয়ে বানান ভুল বলতে গেলে নাই বললেই চলে। যারা বানান ভুলের আতংকে থাকেন তাদের জন্য অবশ্যই ভাল দিক। রোমান্টিক কয়েকটা গল্প ছাড়া বইটা পড়ে ভালই লেগেছে। লেখিকার লেখনশৈলী চমৎকার আর গল্পের গ্রিপ টেনে ধরে রাখার দক্ষতা চোখে পড়ার মত।
বইয়ের টাইটেল আর প্রচ্ছদ দেখে মনে হয়েছিল নিখাদ প্রেমের ছোটগল্প হবে হয়তো, আসলে এটা বিভিন্ন ধরণের গল্পের সংকলন, ফ্ল্যাপের পিছনে লেখা ছিল যদিও, কেনার সময় খেয়াল করি নাই।
বইঃ শহরের উষ্ণতম দিনে লেখকঃ তাসনিয়া আহমেদ রেটিংঃ ⭐⭐⭐⭐⭐
ছোটগল্প পড়তে আমার বরাবরই বেশ ভালো লাগে। দৈর্ঘ্যে ক্ষুদ্র হওয়ায় যখন ইচ্ছে তখনই পড়ে ফেলা যায়। ছোটগল্প পড়ার পর যে 'শেষ হইয়াও হইল না শেষ' টাইপ অনূভুতি হয় সেটাও আমার বড্ড পছন্দের। তাছাড়া, এধরনের গল্প রিডার্স ব্লক কাটাতেও সাহায্য করে।
'শহরের উষ্ণতম দিনে' লেখিকার একক গল্প সংকলন, যার গল্পসংখ্যা চৌদ্দ।বইয়ের নাম এবং প্রচ্ছদ দেখে রোমান্টিক ঘরানার মনে হলেও, আদতে তা নয়। প্যারাসাইকোলজিক্যাল,রোমান্টিক,হরর,থ্রিলার ইত্যাদি ঘরানার গল্প রয়েছে বইটিতে।।ভিন্ন ভিন্ন ঘরানার এই চৌদ্দটি গল্প পড়তে গিয়ে আপনি কখনো হেসে উঠবেন নিজের অজান্তেই, কখনো একান্ত বেদনাবোধে ভিজে উঠবে আপনার চোখ,কোথাও আপনি খুঁজে পাবেন রহস্যের ধোঁয়াশা,কখনো ভয়ের শিহরণে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে,কখনো আবার গভীর এক বিষ্ণণ্ণতায় আপনি হারাবেন অচেনা এক শহরে।
'শহরের উষ্ণতম দিনে' লেখিকার দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ। বইটির প্রায় সবগুলো গল্পই আমার বেশ ভালো লেগেছে। তবে এই ভালোলাগার দৌড়ে এগিয়ে থাকবে 'পাঁচতলা', 'জলপদ্ম', এবং 'অধরা' গল্প তিনটি। আশা করি,লেখিকা আগামী দিনগুলোতেও আমাদের এমনসব অসাধারণ গল্প উপহার দেবেন। তাঁর জন্য রইল অনেক শুভকামনা।
ছোটগল্পের রিভিউ লেখা বেশ কঠিন কাজ! তাই,আমি চৌদ্দটি গল্পেরই টুকরো কিছু অংশ তুলে ধরার চেষ্টা করছি,যাতে করে আপনাদের মাঝে এই অসাধারণ বইটির অসাধারণ গল্পগুলোর বিষয়ে কিছুটা ধারণা জন্মাতে পারে ।
১)পাঁচতলাঃ ------------------
অন্ধকার হয়ে এসেছে। আদনানের এখন বাসায় ফিরতে হবে। কী মনে করে নিচ থেকে হঠাৎ উপরে তাকালো আদনান। বিল্ডিংয়ের সব কটা ফ্লোরে আলো জ্বলছে। এমনকি,পাঁচতলাতেও! যে ফ্লোরে কেউ যায় না,যে ফ্লোর থেকে কেউ বেরও হয় না,সেই ফ্লোরে কেন আলো জ্বলবে???.....
২)একদিনঃ ----------------
আমি দুইদিকে মাথা নেড়ে না করলাম,আমি আর বসতে পারবো না। মানুষের প্রচন্ড আনন্দ এবং প্রচন্ড কষ্টের মুহূর্তে আমার নিজেকে খুব বেশি অসহায় লাগে। উঠে দাঁড়িয়ে উল্টোদিকে ঘুরে দেখি আমার চোখে পানি চলে এসেছে। জোরে পা চালিয়ে হাঁটতে হবে এখন।গল্পটার শেষটা জানা হলো না।সব গল্পের শেষ জানতে হয় না।....
৩)শানঃ ----------
বাতি জ্বেলে চমকে ওঠে জাহেদা।জমিলার বিছানায় অত রক্ত কেন?কোমরের নিচ থেকে অনেক রক্ত,সেই রক্তে পুরোটা বিছানা ভিজে গেছে। দৌঁড়ে গিয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে সে।মেয়েটা কাঁদছে।.....
৪)অপেক্ষা কিংবা মায়াবতীদের গল্পঃ --------------------------------------------------- "ওরা ঝগড়া করছে জানো?" মশারি টানাতে টানাতে বলেন শরিফা। "আজকেও একই অবস্থা?" হাসনাত জিজ্ঞেস করেন। "হ্যাঁ,কি অবস্থা বলো তো!ছোট্ট এইটুকু একটা বাচ্চা। বাবা-মা এইভাবে ঝগড়া করলে ওর মনটা ছোট হয়ে থাকে না?" "আমরাও তো ঝগড়া করেছি একসময়। আমাদের ছেলে-মেয়েরাও তো ছোট ছিল তখন।" "হ্যাঁ করেছি,মানি। ছয়মাসে দুয়েকদিন তো ঝগড়া হতেই পারে, তাই বলে প্রতিদিন? এভাবে?...
৫)পুতুলঃ ------------- ফারহানার ঘুম ভাঙলো কলিংবেলের শব্দে।অপু বাসায় ফিরেছে। দরজা খুলতে গিয়ে সে দেখল, নওশীন সোফায় বসে আছে। তার পাশে সেই পুতুলটা রাখা।এই পুতুলটাকে সে নিজের হাতে দুপুরবেলা স্টোররুমে ফেলে এসেছে।পুতুলটার কোনোভাবেই এখানে আসার কথা না,কারণ নওশীন ছিটকিনির নাগাল পায় না। তাহলে??....
৬)জলপদ্মঃ ----------------- মেয়েটার কোনো ভাবান্তর নেই। হাঁটুতে মুখ গুঁজেই থেকে থেকে কেঁপে উঠতে থাকে। মেঘের মতো একরাশ চুল মেয়েটার,পুরোটা পিঠ ঢেকে আছে চুলে। এই পিঠ দুদিন পরেই হয়ে যাবে বারোয়ারী। চুল সরালেই দেখা যাবে অনেকরকম নখের আঁচড়।মেয়েটার নিজের বলে আর কিছুই থাকবে না। ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে যায় চুমকি।....
৭)মতিন সাহেবের একদিনঃ
মতিন সাহেন মুখে বললেন,"দেখেন,আমার কাছে থাকলে তো আমি দিয়েই দিতাম।আপনার সার্টিফিকেট আটকে রেখে আমার কী লাভ?" মনে মনে বললেন , "আরে গাধার বাচ্চা! এই বুদ্ধি নিয়া অনার্স পাস করসো?তোমারে তো সার্টিফিকেট দেয়াই উচিত না! দুই একটা নোট বের করে দেখাও,সার্টিফিকেট দিয়ে দেই। ঝামেলা শেষ!" হাসানুল বান্না নামের ছেলেটা বললো,"দেখুন,আমি রংপুর থেকে এখানে আসছি এই একটা সার্টিফিকেটের জন্য,আমার এখানে থাকার কোনো জায়গাও নেই।আপনি যদি কাইন্ডলি....."
৮)তর্জনীঃ ---------------
নীরবতা ভাঙ্গলো আজিজা।সে এসে চা-নাস্তা দিয়ে গেলো। আমি জামালউদ্দীন সাহেবকে বললাম,"প্লিজ একটু কিছু মুখে দিন।" প্রকৃতি স্বাভাবিকতা খোঁজে। আমাদের চোখও স্বাভাবিকতায় অভ্যস্ত। একটুখানি হেরফের হলেই চোখ সেখানে আটকে যায়। আমিও বারবার না চাইতেই ভদ্রলোকের তর্জনীর জায়গাটায় তাকাচ্ছি। চা খেতে খেতে তিনি বললেন,"তোমার বাবা যে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু করেন সার্কাসে কাজ করে,তা কি তুমি জানো?".....
৯)অধরাঃ -------------
সাত কাপ চা খেয়ে গলা জ্বলছে। প্রেম গ্যাস্ট্রিকের ব্যথার পরোক্ষ কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে - এই উপলব্ধি নিয়ে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস টাইপ করছিলাম,পেছন থেকে তিথি আপু আমাকে ডাকলেন। "এই আরিফ,শোন তো!" তিথি আপু আমার নাম ধরে ডেকেছেন,এই আনন্দে আমার মরে যেতে ইচ্ছা করলো। মনের ভেতর কেউ একজন নাচতে নাচতে বলছে,"তিথি আপু আমার নাম জানেন!" মনের নাচানাচিকে পাত্তা না দিয়ে আমি খুব স্বাভাবিক স্বরে বললাম, "জ্বী আপু!"......
১০)নয়নঃ ---------------
আমি তাকাবো না তাকাবো না করেও চাদরটা একটু তুলে খাটের নিচে উঁকি দিলাম। খাটের নিচে অন্ধকার, সেই অন্ধকারের মধ্যেও জমাটবাঁধা অন্ধকার হয়ে এককোণায় একটা অস্পষ্ট অবয়ব। হাঁটুতে মুখ গুঁজে একটা বাচ্চা ছেলে বসে আছে। পচা মাংসের গন্ধ আরো তীব্র হলো, বহু পুরোনো শ্যাওলা পচা গন্ধও পেলাম। আবছা অবয়বটা একটু নড়লো। মাথা তুলে তাকিয়ে সে কিছু একটা বললো।আমি এবার স্পষ্ট শুনতে পেয়েছি। সে বলেছে, "আমি নয়ন।".....
১১)ঠিকানাঃ -------------------
অরুণিমার মুখাগ্নি করলো মেজো ছেলেই। বড় ছেলে আসতে পারবে না।সূর্য যখন মাথার ঠিক উপরে,তখন তার চিতা জ্বললো। ধোঁয়ার একটা কুন্ডলী হয়ে অরুণিমা মিলেয়ে গেলো আকাশে। আমি দেখছি আর ভাবছি, মেয়েটা শেষ পর্যন্ত একটা ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে!
১২)প্রথমবারঃ --------------------
আমাদের কথোপকথ�� এখানেই শেষ হলো। সেদিন রাতে দুই লাখ এক টাকা দেনমোহর ধার্য করে আমাদের বিবাহকার্য সমাধা হলো। আমি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। এতো সহজ ব্যাপারটা? এই চিনি না জানি না মানুষটা এখন আমার জীবনসঙ্গী? এই মানুষটার সাথে আমার সারাজীবন কাটাতে হবে? আমার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিলো না ব্যাপারটা। গাধামানবের উচিত ছিলো আমাকে সহজ করার জন্য দুই একটা কথা বলা। তেমন কিছু না করে সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে নিজের পায়ের পাতা দেখতে থাকলো।....
১৩)আঠারোই জুনঃ ----------------------------
"আমি স্বপ্নে দেখি সৌম্য আমাকে মার্ডার করে ফেলছে!" আলিফ অবাক হলো। সৌম্য বলেছিল তার বউকে তার মেরে ফেলতে ইচ্ছা করে। তার বউ আবার একই জিনিস স্বপ্ন দেখছে। কাকতালীয়?...
১৪)শহরের উষ্ণতম দিনেঃ
অনিন্দ্য হঠাৎ 'মহীনের ঘোড়াগুলি'র সেই গানটা গেয়ে উঠলো, "শহরের উষ্ণতম দিনে, পিচগলা রোদ্দুরে, বৃষ্টির বিশ্বাস, তোমায় দিলাম আজ..." কী আশ্চর্য! তার গান শেষ হওয়ামাত্র আকাশ অন্ধকার হয়ে ঝড় শুরু হলো। ঠান্ডা বাতাসে গা জুড়িয়ে যাওয়ার পর সত্যি সত্যি বৃষ্টি নামলো। রিকশাওয়ালা হুড তুলে দিলো। প্লাস্টিকের পর্দাঘেরা রিকশায় অনিন্দ্য আমাকে প্রথমবারের মতো চুমু খেলো। ইশ!আমার চোখে পানি চলে এসেছে কেন? পার্লারের মহিলা আমাকে বললো, "কাঁদবেন না,কাঁদলে মেইক আপ নষ্ট হয়ে যাবে।"
বই : শহরের উষ্ণতম দিনে লেখক : তাসনিয়া আহমেদ প্রচ্ছদ : সানজিদা স্বর্ণা ধরণ : একক গল্প সংকলন প্রকাশনী : সতীর্থ পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১১০ মলাট মূল্য : ২১০ টাকা প্রকাশকাল : নভেম্বর, ২০২০
গল্পগুলো কি রোমান্টিক জনরার? লেখকের সাথে মিলিয়ে বলবো, না। গল্পগুলো জীবনের। গল্পগুলো বাস্তবতার। এখানে হরর, থ্রিলার, সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার, রোমান্টিক সামাজিক সব জনরার গল্পই আছে।
গল্পগুলোর সারাংশ এরকম - পাঁচতলা - আদনানের নতুন অফিস বিল্ডিং-এর ছয়তলায়। প্রথম দিন লিফটে করে উঠতে গিয়েই সে আবিষ্কার করলো লিফটে "ফোর" বাটনটি নেই। অর্থাৎ লিফটে করে পাঁচতলায় যাওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই। কিছুদিন অফিস করার পর সে আরও খেয়াল করলো লিফট কখনো পাঁচতলায় থামে না। পাঁচতলা থেকে কেউ লিফটে ওঠেও না। অবাক হয় আদনান। খুঁজে বের করে পাঁচতলার সিঁড়ি। কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে পাঁচতলায় উঠতে গিয়ে আরও অবাক হয়। পাঁচতলার দিকে সিঁড়ি উঠে গেছে ঠিকই, কিন্তু পাঁচতলার ফ্লোরে পৌঁছানোর ঠিক আগে দেয়াল বরাবর সিমেন্ট দিয়ে ঢোকার মুখটা বন্ধ। অনেক ভেবে পাঁচতলা নিয়ে আর মাথা না ঘামানোর সিদ্ধান্ত নেয় আদনান। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। আদনান সত্যিই আর পাঁচতলা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। থাকুক কিছু ব্যাপার অজানা। নতুন অফিসে ভালোই সময় কাটতে থাকে আদনানের। কিন্তু একদিন অফিস শেষে বের হওয়ার সময় হঠাৎ লিফট থেমে যায় পাঁচতলায়। খুলে যায় লিফটের দরজা। তারপর...!
একদিন - এই গল্পটার কোন সংক্ষেপ নেই। শুধু এতোটুকু বলি, গল্পটা পড়তে পড়তে কোনো এক অজানা কারণে চোখের কোণে জল চলে এসেছিলো।
শান - গভীর রাত। জমিলাকে ঘুম পাড়িয়ে দেবার পরে বেড়ার ফাঁক থেকে দা-টা বের করে নিয়ে তাতে শান দিতে বসে জাহেদা। তার মাথার ভেতর ট্রেনের হুইসেলের শব্দ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
অপেক্ষা কিংবা মায়াবতীদের গল্প - আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে মায়াবতীরা ক্যামন হয়? আমি বলবো, মায়াবতীরা অভিমানী হয় মায়াবতীরা অভিযোগ করে মায়াবতীরা আক্ষেপ করে মায়াবতীরা রাগ করে মায়াবতীরা অপেক্ষা করে মায়াবতীরা ভালোবাসে হ্যাঁ, মায়াবতীরা এমনই হয়।।
পুতুল - দুপুরবেলা নওশীন ঘুমিয়ে পড়লে ফারহানা তার ঘরে ঢুকলো। মেয়েটা কি নিশ্চিন্তেই না ঘুমাচ্ছে! পাশে পুতুলটা রাখা। ফারহানার মনে হলো, পুতুলটা ঠিক তার দিকেই তাকিয়ে আছে। তার অস্বস্তি হতে লাগলো। সে জোর করে পুতুলটার দিক থেকে চোখ সরালো। ফারহানা এগিয়ে গিয়ে খুব সাবধানে পুতুলটা হাতে তুলে নিলো। অদ্ভুত একটা শিহরণ খেলে গেলো তার শরীরে। কেন যেন মনে হলো, এর মধ্যে অশুভ কিছু একটা আছে। সে স্টোররুমের দরজা খুলে পুতুলটাকে ভেতরে রেখে বাইরে থেকে দরজা আটকে দিলো। কিন্তু...!
জলপদ্ম - পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় কষ্ট হচ্ছে ভাতের কষ্ট। এই এক ভাতের জন্য এতো সংগ্রাম। এই এক ভাতের জন্য এতো ঝামেলা। ক্ষুধা না পেলে, ভাতের দরকার না হলে এইসব ঝামেলা কখনো হতো না। এই ভাতই সব নষ্টের মূল। আসলে বেঁচে থাকার চেয়ে চিরন্তন এবং আদিম লড়াই আর কিছু নেই।
মতিন সাহেবের একদিন - এই গল্পের সেই ছেলেটির মাঝে আমি নিজেকে দেখেছি, আমার সহপাঠীদের দেখেছি। গল্পটা পড়ে আমার এই শহরের মতিন সাহেবদের একটা প্রশ্ন করতে খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো, "একদিনতো বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে; সেদিন কি জবাব দেবেন?"
তর্জনী - বাবার মৃত্যুর দু'বছর পর তার বন্ধু পরিচয়ে বাড়িতে এলেন জামাল উদ্দীন। আমি তাকে চিনি না। বাবা কখনো তার সম্পর্কে কিছু বলেননি আমাদের। ভদ্রলোক সালাম দিয়ে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। সালামের উত্তর দিয়ে হাত মেলানোর জন্য হাত বাড়াতেই ভদ্রলোকের হাতের দিকে আমার চোখ আটকে গেলো। তার ডান হাতে মোট আঙুল চারটা। ডানহাতের তর্জনীটা নেই!
অধরা - তিথি আপুকে আমি প্রথম দেখি ভার্সিটিতে ক্লাস শুরু করার সপ্তম দিনে। জুনিয়র আসার পরপর ভার্সিটির ক্লাবগুলির কাজকর্ম বেড়ে যায়। ক্লাবের সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর জন্য বর্তমান সদস্যরা উঠেপড়ে লাগে। তিথি আপুর সাথে আমার প্রথম দেখা হয় ফটোগ্রাফি ক্লাবের পরিচয় সন্ধ্যায়। আমি এবং আমার মতো কিছু ভ্যাবলা জুনিয়র, যাদের ফটোগ্রাফি সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই, তাদেরকে তিথি আপু একঘণ্টার ডেমো দিলেন। সেই ডেমো খেয়ে বাকিরা উনার ভক্ত হয়ে গেলো আর আমি উনার প্রেমে পড়ে গেলাম। এরপর...!
নয়ন - হঠাৎ অস্পষ্ট একটা শব্দ শুনলাম। চমকে বাবুল সাহেবের দিকে তাকালাম। উনি একটা কষ্টের হাসি হেসে খাটের নিচে ইশারা করলেন। আমি তাকাবো না তাকাবো না করেও চাদরটা একটু তুলে খাটের নিচে উঁকি দিলাম। খাটের নিচে অন্ধকার, সেই অন্ধকারের মধ্যেও জমাটবাঁধা অন্ধকার হয়ে এককোণায় একটা অস্পষ্ট অবয়ব। হাঁটুতে মুখ গুঁজে একটা বাচ্চা ছেলে বসে আছে। পচা মাংসের গন্ধ আরো তীব্র হলো। আবছা অবয়বটা মাথা তুলে তাকিয়ে কিছু একটা বললো। আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম, সে বললো, "আমি নয়ন।"
ঠিকানা - অরুণিমার মুখাগ্নি করলো তার মেজো ছেলে। বড় ছেলে আসতে পারেনি। চিতা জ্বলছে। ধোঁয়ার কুন্ডুলি হয়ে অরুণিমা একটু একটু করে আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে। আমি দূর থেকে দেখছি আর ভাবছি, মেয়েটা শেষ পর্যন্ত একটা ঠিকানা খুঁজে পেলো!
প্রথমবার - স্পয়লার দিবো না। একটা অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের গল্প। ভালো লাগতে বাধ্য।
আঠারোই জুন - "গত কয়েকদিন ধরে আমার ওয়াইফকে আমার খুন করে ফেলতে ইচ্ছা করে।" আলিফ সোজা হয়ে বসলো। রোগীর চোখের দিকে তাকিয়ে শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলো, "ঠিক কতোদিন ধরে আপনার খুন করার ইচ্ছাটা হচ্ছে?" "ধরেন চার-পাঁচ মাস।" "শুধু উনাকেই খুন করতে ইচ্ছা করে, না আরো কাউকেও ইচ্ছা করে?" "শুধু ওকেই। আর কাউকে খুন করতে ইচ্ছা করে না। আপনি জানেন তো, আমি কারো সাতে-পাঁচে থাকা মানুষ না। আমার কেন কাউকে খুন করতে ইচ্ছা করবে? নিজের ওয়াইফকে খুন করতে চাই, এইটা ভেবেই আমার মরে যেতে ইচ্ছা করে।"
শহরের উষ্ণতম দিনে - জীবনের ছোট্ট একটা অধ্যায়ের প্রতিফলন মাত্র!
পাঠ প্রতিক্রিয়া: তাসনিয়া আহমেদ'র দ্বিতীয় ছোট গল্��ের বই "��হরের উষ্ণতম দিনে"। ১৪টি গল্প নিয়ে রচিত বইটি নামে রোম্যান্টিক মনে হলেও গল্পগুলো শুধু রোম্যান্টিক নয়। কয়েকটা অতিপ্রাকৃত। বাকিগুলো এক একটা বাস্তবতা। মানবজীবনের বিভিন্ন অধ্যায় গল্পের মধ্যে দিয়ে দেখানো হয়েছে।
বইটা এক কথায় চমৎকার। একেবারে দশে দশ। গল্পগুলোর উপস্থাপন খুবই ম্যাচিউর। মনেই হয়নি লেখক মাত্র দ্বিতীয় বই লিখেছেন। লেখক চাইলেই এখানের কয়েকটা গল্পকে টেনে উপন্যাসে রূপ দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটা করেননি। ব্যপারটা ভালো লেগেছে।
বইতে অতিরঞ্জিত করে কোনকিছু দেখানো হয়নি। এই বইয়ের গল্পগুলো এতোটাই বাস্তব যে পড়ার সময় এর কোন কোন গল্পে নিজেকে খুঁজে পাবেন অথবা পাবেন আপনার প্রিয় মানুষটিকে। কোন বিরক্তি বা ক্লান্তি ছাড়াই একবসায় শেষ হয়ে যাবে "শহরের উষ্ণতম দিনে"।
সতীর্থ প্রকাশনীর কোন বই আগে পড়িনি। এটাই প্রথম। বইয়ের প্রোডাকশন দেখার মতো। পৃষ্ঠা, বইয়ের বাঁধাই বেশ ভালো। সবথেকে ভালো লেগেছে যেটা তা হলো বানান। মাত্র ১টা ভুল বানান খুঁজে পেয়েছি। আরেকটা বানান ভুল আছে, তবে সেটা ইচ্ছাকৃত ছিলো পরে বুঝেছি। আরেকটা জায়গায় শুধু দাঁড়ি'র (।) পরে স্পেস দেয়া হয়নি। লেখার মধ্যে এছাড়া আর কোন ভুল খুঁজে পাইনি।
আর প্রচ্ছদ! একরকম বলা যায় বইটা আমি শুধু প্রচ্ছদ আর বইয়ের নাম দেখেই কিনেছি। এই বইয়ের গল্পগুলোর মতো করে বইয়ের প্রচ��ছদেও ডুবে যাওয়া যায়।
লেখিকার অন্য কোন লেখা পড়া হয়েছে কিনা মনে করতে পারছি না। সে হিসেবে এটি লেখিকার প্রথম বই যেটা পড়লাম। ছোট্ট ছোট্ট গল্পগুলো পড়তে খারাপ লাগে নি। লেখনী সহজপাঠ্য। তবে লম্বা সময়ের জন্য লেখাগুলো দাগ কাটে না। পড়লাম, ভাল লাগলো, ভুলে গেলাম এরকম একটা ব্যাপার। গল্পগুলোর প্লট গতানুগতিক হলেও লেখনীর জোরে উৎরে গেছে। ভবিষ্যতে আরও ভাল লেখা পড়ার আশা রাখি। বইয়ের অলংকরণ, প্রচ্ছদ ভাল লেগেছে।
শহরের উষ্ণতম দিনে মোট ১৪ টি ছোট গল্প আছে। বইটি বইমেলা থেকে কিনি এইবার। বইটি কেনার পর হঠাৎ খেয়াল হয় এটাতো গল্প সংকলন। আমার ছোট গল্প পড়ে কেন যেন মন ভরে না কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে গল্পগুলো বেশ ভালো লেগেছে। লেখিকার লেখনশৈলী বেশ সুন্দর এবং গোছানো। নিচে সংক্ষেপে গল্পগুলো বর্ণনা করার চেষ্টা করলাম।
১) পাঁচতলা: আদনান নতুন একটি চাকরি পেল। আদনান খেয়াল করলো তার নতুন অফিসের বিল্ডিং এ লিফট বাটনে চার নেই। একদিন সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠার সময় সে দেখে পাঁচ তলা পুরোটা সিমেন্ট দিয়ে আটকানো কিন্তু সে এই বন্ধ জায়গার জানালার সামনে এক অবয়ব দেখতে পেয়েছিলো , অদ্ভুত ব্যাপারটা তাকে ঘোর চিন্তার মধ্যে ডুবিয়ে দিলো। একদিন সে বছরের পর বছর বন্ধ হয়ে থাকা পাঁচ তলার বন্ধ জায়গাটিতে নিজেকে আবিষ্কার করলো। এই বন্ধ জায়গায় সে প্রায় অসম্ভব এক ভৌতিক ঘটনার সম্মুখীন হলো। বেশ উপভোগ্য ছিল এই গল্পটি, হঠাৎ শেষে এইরকম কিছু আশা করিনি।
২) একদিন: তন্ময় তার রিপোর্ট নিতে হাসপাতালে গেল যেখানে অপরিকল্পিতভাবে তার সাগর নামের এক ব্যক্তির সাথে পরিচয় হলো। লোকটি তাকে জানালো যে সে খুবই নার্ভাস কারণ আজ তার স্ত্রীর প্রেগন্যান্সি টেস্টের রিপোর্ট দিবে। সাগর ও তার স্ত্রী দশ বছর ধরে নিঃসন্তান যার কারণে রিপোর্টটি খুলে দেখার সাহস পাচ্ছে না সাগর। তাদের দম্পতি জীবনের শুরু হওয়ার গল্প তন্ময়কে সে বলতে লাগল যা খুবই আবেগাপ্লুত।
৩) শান: গল্পটি একজন মা ও তার প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে। জাহেদা ট্রেন স্টেশনে ডিম বিক্রি করে রোজগার করে। তার কন্যা সন্তান জমিলা প্রতিবন্ধী। মেয়েকে নিয়ে এক বস্তিতে তার বসবাস। একদিন তার পরিচিত এক মহিলার কাজ করতে গিয়ে তার রাত হয়ে যায়, জমিলাকে রেখে সাধারণত সে কোথাও যায় না। বাসায় ফিরে সে দেখে তার মেয়েকে কেউ ধর্ষন করে পালিয়ে গিয়েছে, তার পরিচিত একজনকে সন্দেহ হয়। সে অপেক্ষা করতে থাকে সে মানুষটির আসার, যদি সে দোষী প্রমাণিত হয় তাহলে তার জন্য অপেক্ষা করছে শাস্তি।
৪) অপেক্ষা কিংবা মায়াবতীদের গল্প: একই বিন্ডিং এ থাকা পাশাপাশি দুটো বৈবাহিক জীবনের অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে যেখানে হাসনাত ও শরীফার বহু বছরের সংসার এবং অনেক প্রতিকূলতা কাটিয়ে তারা একসঙ্গে জীবনযাপন করছে। অন্যদিকে আলিফ ও মোহনার পারস্পরিক বোঝাপড়া শূন্যের কোঠায়। এক রাতে আলিফ মোহনার গায়ে হাত তোলে এবং শরীফা তাদের সমঝোতা করে দেয়। গল্পগুলোর মধ্যে এই গল্পটি একদমই ভালো লাগেনি। পরপর এতো ভালো গল্প পড়ার পর এই গল্প পড়ে হতাশ হয়েছি বলতে গেলে।
৫) পুতুল: কিছুদিন হলো ফারহানা ও অপু নতুন বাসায় শিফট হয়। তাদের ছোট মেয়ে নওশীন এক বাক্সের ভেতরে উদ্ভট দেখতে একটি পুতুল পায় যার নাম সে দেয় পিন্টু। কিছু দিন পর ফারহানা খেয়াল করলো এই পুতুলের মধ্যে অশুভ শক্তির উৎস রয়েছে। বারবার পুতুলটিকে ফেলে দেওয়ার পরও কেমন করে যেন পুতুলটি আবারও তাদের বাসায় ফেরত আসে।
৬)জলপদ্ম: গল্পটি চুমকিকে নিয়ে। পতিতালয়ে তার মতোই একজনের সাথে দেখা হয় যার নাম বকুল। বকুল তার নিজের নামও কিন্তু কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে সেই বকুল। এখন সে চুমকি নামেই পরিচিত। সমাজকে নিয়ে তার নানা মনোভাব গল্পে ফুটে উঠেছে। খুবই সুন্দর ছিল এই গল্পটি।
৭) মতিন সাহেবের একদিন: মোটা লোক মতিন সাহেব যেমন খাবার খেতে পারদর্শী ঠিক ছাত্রদের থেকে আগেভাগে সার্টিফিকেট দেওয়ার বদলে ঘুষ নেওয়াতে পারদর্শী। এই নিয়ে সে বেশ গর্ব করেন কিন্তু একদিন তার গর্ব অনুশোচনায় রূপ নেয়। সেই দিনই হলো মতিন সাহেবের একদিন, হয়তো খুব জলদি সে মৃত্যুবরণ করবে।
৮) তর্জনী: হঠাৎ একদিন বন্ধু জামাল তার মৃত বন্ধু কামরুলের ছেলেকে তাদের শৈশবের গল্প শোনাতে আসে। কামরুল সার্কাসে কাজ করতো শুনে তার ছেলে খুবই অবাক হয় , কেননা বাবা তাদের কখনো এটা শেয়ার করেনি। জামালকে দেখে কামরুলের ছেলে একটু অবাকই হয় কারণ লোকটির এক আঙ্গুল কাটা। এই কাটা আঙ্গুলের পেছনে রয়েছে বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনী যা বলতেই জামাল তার বন্ধুর বাড়িতে এসেছে।
৯) অধরা: সমাজে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয় বলেই অনেকের স্বপ্ন, ইচ্ছা, ভালো লাগা অধরাই থেকে যায়। ঠিক যেমন তিথি ও তার চার বছর জুনিয়র আরিফের। আরিফ ও তিথি একজন আরেকজনকে পছন্দ করলেও তারা খুব ভালো করেই জানে তাদের রাস্তা কখনো এক হবে না।
১০) নয়ন: বাবুল সাহেবের পাপবোধ থেকে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাওয়ার কারণ নয়ন। নয়ন তার কাছেরই কেউ যাকে সম্পত্তির লোভে বাবুল সাহেব খুন করে বলে ধরে নেওয়া যায়। হঠাৎ নয়নের অস্তিত্ব আশেপাশে পেতে শুরু করে বাবুল সাহেব। শুধু তাই না নয়নের অস্তিত্ব আরো মানুষ টের পায়।
১১) ঠিকানা: মামার বাড়িতে আশ্রিত অরুনিমা বিয়ে হওয়ার পর মনে করে এখন হয়তো তার স্থায়ী ঠিকানা পাওয়া গেল। কিন্তু স্বামী মারা যাওয়ার পর, সন্তানেরা বড় হওয়ার পর তার জায়গা হয় বৃদ্ধাশ্রমে। ছোটবেলা থেকে বৃদ্ধ বয়সে এসেও অরুনিমা নিজের স্থায়ী ঠিকানা তৈরি করতে পারেনি। অবশেষে অরুনিমার ভাগ্যে জোটে তার বহু অপেক্ষিত ঠিকানা। গল্পটা খুবই সুন্দর আর বিষাদময়।
১২) প্রথমবার: তন্বী ও মুনিরের কিছুদিন হলো বিয়ে হয়েছে। মুনিরের তন্বীর প্রতি ও তন��বীর মুনিরের প্রতি প্রথম দেখা হওয়া থেকে শুরু করে বিয়ের পর দু'জনের প্রতি দু'জনের মনোভাবকে কেন্দ্র করে গল্পটি।
১৩) আঠারোই জুন: সাইক্রেটিস্ট আলিফের কাছে সৌম্য আসে তার মানসিক সমস্যা নিয়ে। তার সমস্যা তার বউ তাসনুভাকে নিয়ে। তাসনুভারকে সে ইদানিং সন্দেহ করে এবং সে আলিফকে জানায় যে তার তাসনুভাকে খুন করতে ইচ্ছে হয়। আলিফ তাকে কিছু ঔষধ দেয় এবং বলে আগামীতে যেন তাসনুভাকে সৌম্য সাথে নিয়ে আসে। তাদের দেখা করার নিযুক্ত তারিখের আগেই তাসনুভা আসে আলিফের কাছে এবং এরপর যা শুনতে পায় তা থেকে আলিফের মাথা খারাপ হওয়ার যোগাড়।
১৪) শহরের উষ্ণতম দিনে: আগামীকাল নিতুর বিয়ে। যদিও সে অনিন্দ্যকে ভালোবাসে কিন্তু ধর্মের বিশাল ব্যবধান তাদের দুজনকে আলাদা হতে বাধ্য করছে। ফোনালাপে অনিন্দ্য নিতুকে প্রস্তাব দেয় কাল বিয়ে না করে তার সাথে বান্দরবান ঘুরে আসতে। যদিও এই ঘুরে আসা অর্থ নিতুর বিয়ে ভেঙে যাওয়া আর হয়তো পরিবারের সাথে সম্পর্কের ছেদ হওয়া। শেষে নিতু যায় কিনা এই নিয়েই গল্পটি। শেষ গল্প হিসেবে আরেকটু ভালো হতে পারতো তবে মোট বলতে গেলে বেশ উপভোগ্য।
'শহরের উষ্ণতম দিনে'র গল্পসংখ্যা চৌদ্দ। ভিন্ন ভিন্ন ঘরানার চৌদ্দটি গল্প পড়তে পড়তে পাঠক হারাবেন এক গল্পের শহরে, যে শহরের এক একটি গলি এক এক রকম আবেগের গল্প বলে। সেই অলিগলি ধরে হাঁটতে হাঁটতে পাঠক কখনো হেসে উঠবেন নিজের অজান্তেই, আবার কখনো একান্ত বেদনাবোধে ভিজে উঠবে তার চোখ। কোথাও পাঠক খুঁজে পাবেন রহস্যের ধোঁয়াশা, কখনো ভয়ের শিহরণে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে, কখনো আবার গভীর এক বিষণ্ণতায় পাঠক হারাতে চাইবেন এই শহরের অচেনা, অথচ খুব আপন এই গলিপথে।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ অত্যন্ত সুন্দর প্রচ্ছদ এর বইটি হাতে নিলেই ভালোলাগা কাজ করে। আর মাথায় আসে মহীনের ঘোড়াগুলির "তোমায় দিলাম"। শহরের উষ্ণতম দিনে এই নামটা ই আমাকে এই বই এর প্রতি বেশী আকৃষ্ট করেছে৷ অনেক দিন আগে হাতে আসলে�� বইটি পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এর জন্য পড়া হয়ে উঠছিলো না৷ আজ বইটি পড়ে বেশ ভালো সময় ই পার করেছি বলতে হবে। বিভিন্ন ধরনের আলাদা ১৪ টি গল্পের এই একক ছোটগল্প সংকলন টি পুরোটা সময় উপভোগ করেছি। বিরক্তি কাজ করেনি৷ বই এর ভেতরের প্রত্যেকটা গল্পের আলাদা ইলাস্ট্রেশন গুলো বেশী ভালো লেগেছে৷ সিম্পল ইলাস্ট্রেশন গুলো অনেক সুন্দর। যেহেতু ছোট গল্প সংকলন স্বাভাবিকভাবেই গল্পের শেষে আরেকটু থাকলে ভালো হতো টাইপ ফিলিং কাজ করবে। তাসনিয়া আহমেদ এর পড়া প্রথম বই এটি। লেখিকার স্টোরিটেলিং প্রশংসার দাবীদার। প্রত্যেকটি গল্পের স্টোরিটেলিং, গল্প পড়ার পরের প্রতিক্রিয়া দেয়ার চেষ্টা করেছি। কয়েকটা গল্প আছে না পড়লেই নয় সেই গল্পগুলোর জন্য হলেও বইটি সংগ্রহ করা উচিত। রহস্য, ভৌতিক, অতিপ্রাকৃত, সমকালীন, রোমান্টিক সব ধরনের গল্পের মিশ্রণ "শহরের উষ্ণতম দিনে"।
১. পাঁচতলা গল্পটা মোটামুটি লেগেছে, শেষটা তে সারপ্রাইজিং এলিমেন্ট আরো স্ট্রং আশা করেছিলাম। তবে গল্পটা পড়ে মজা পেয়েছি। গল্প বলার ধরণ সুন্দর। "মন সহজে অনিয়ম নিতে পারে না যেখানে খুঁত, সেখানেই বারবার চোখ আটকে যায়৷" সব মানুষের ক্ষেত্রে না ঘটলেও, বেশীরভাগ মানুষের বেলায় এই লাইনটা চির সত্য।
২. একদিন অদ্ভুত সুন্দর এই গল্প, এই ছোট গল্পে বছরের পর বছরের ভালোবাসা আছে। গল্পের গাঁথুনি অনেক শক্ত৷ সিনেম্যাটিক হলেও একটুও বিরক্ত লাগবে না৷ মানুষের প্রচন্ড আনন্দ এবং প্রচন্ড কষ্টের মুহুর্তে নিজেকে খুব বেশি অসহায় লাগে৷ এই লাইনটা আমার সাথে খুব বেশী মিলে। গল্পে আরেকটা অন্যতম পছন্দের লাইন 'এই গাছ আর আমি একসাথে মা হবো। আমারো একটা বাবু হবে, এই গাছেও ফুল আসবে'।
৩. শান এই গল্পটা মর্মান্তিক, স্পর্শকাতর, সুন্দর গল্প, গল্প বলার ধরন ও চমৎকার। ভালো একটা মেসেজ আছে গল্পে। যেহেতু দুখী গল্প সেহেতু পড়ে মন খারাপ হবে। তবে "যত বড় শোকই হোক না কেন, তা একসময় থামে, কিন্ত পেটের ক্ষুধা কখনো থামেনা। সময় ও থেমে থাকেনা৷"
৪. অপেক্ষা কিংবা মায়াবতীদের গল্প পাশাপাশি দুইটা ফ্ল্যাটের দুই পরিবারের গল্প, ১ম পরিবার থেকে ২য় পরিবারে বেশ সুন্দর ভাবে ঢুকে গেছেন লেখিকা। বেশ সাবলীল একটা শিক্ষনীয় গল্প। পড়ে বেশ মজা লেগেছে৷ স্টোরিটেলিং সুন্দর।
৫. পুতুল এই গল্পটা গা ছমছম করা, একটা ভুডু পুতুল কে কেন্দ্র করে তিন সদস্যের পরিবারের গল্প। স্টোরিটেলিং গল্পে আটকে রাখবে, এটা কেনো হলো, এর রহস্য কি এসব জানার জন্য৷ বেশ ভালো লেগেছে গল্পটা৷ তবে আরো ভালো লেখার সুযোগ ছিল হয়ত।
৬. জলপদ্ম পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় কষ্ট হচ্ছে ভাতের কষ্ট। এই এক ভাতের জন্য এতো সংগ্রাম। এই এক ভাতের জন্য এতো ঝামেলা৷ ক্ষুধা না পেলে, ভাতের দরকার না এই ঝামেলা কখনো হতো না। গল্পটা ভাতের কষ্টে ভোগা চুমকির, এই নাম তার না, তবে গল্পটা এই নামের পেছনের। একটা পতিতা পল্লির গল্প। যথারীতি সুন্দর গল্প।
৭. মতিন সাহেবের একদিন মতিন সাহেবের গল্পটা আমাদের মত ছাত্রদের সাথে ঘটে। স্কুল, কলেজ,ভার্সিটি তে আমরা সাধারণ শিক্ষার্থী রা এসব এর শিকার হয়েই থাকি। গল্পটা সাধারণ কিন্তু উপস্থাপন সুন্দর।
৮. তর্জনী গল্পটা দুই বন্ধুর, কিন্ত এর মাঝে আছে যথেষ্ট সাসপেন্স, নাইফ থ্রোয়িং এর মত খেলার রুদ্ধশ্বাস বিবরণ। বিশ্বাসঘাতকতা আছে গল্পে, আছে বহুবছরের অজানা তথ্য৷ ভালোই লেগেছে গল্পটা পড়তে৷
৯. অধরা অধরা নামের স্বার্থকতা গল্পে বিদ্যমান কারণ "নিয়মের বাইরে মানুষ যেতে পারেনা" গল্পটা এক অসামঞ্জস্য প্রেমের, শব্দটার ব্যাবহার কতটুকু ঠিক তা পড়লে বুঝা যাবে৷ দুর্দান্ত গল্প অধরা৷
১০. নয়ন আধিভৌতিক এই গল্পটা প্রায়শ্চিত্ত এর। পাপ বাপকেও ছাড়েনা কথাটার যথাযথ উদাহরণ এই গল্পটি৷ তবে কেমন জানি খাপছাড়া। অন্যগুলোর চেয়ে এটা একটু কম স্ট্রং মনে হয়েছে। তবে গল্পের মূল ভিত্তি টা সুন্দর।
১১. ঠিকানা মন খারাপ করা গল্প আমি এভয়েড করে চলি,সবসময় পারিনা অবশ্য৷ এই গল্পটা অমন ই৷ গলা ধরে আসছিলো। আমাদের ঠিকানা টা আসলে কি? কিছু মেয়েরা কখনো কোথাও স্থায়ী না, গল্পের অরুণিমার কাহিনী টা ও অমন। শৈশব থেকে চামড়া ঝুলে যাওয়ার বয়স পর্যন্ত ঠিকানাবিহীন এক নারীর কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। বই এর সবচেয়ে পছন্দের গল্প এটি৷
১২. প্রথমবার এই গল্পটাও সুন্দর কিন্ত এর স্টোরিটেলিং কিছুটা বোরিং মনে হয়েছে৷ অপ্রোয়জনীয় বিবরণ ছিলো। তবে গল্পের কিছু কিছু লাইন পড়ে বেশ মজা পেয়েছি। যাদের এরেঞ্জ ম্যারেজ করার ইচ্ছা তারা এ গল্প পড়ে অনেক বেশী অনুপ্রাণিত হবেন চোখ বন্ধ করে বলতে পারি।
১৩. আঠারোই জুন গল্পটা আমি আগে কোথাও পড়েছি, সম্ভবত ফেসবুকেই, মাথায় আসছে না৷ আগে পড়ার দরুন লাইন বাই লাইন মাথায় চলে আসছিলো। তবে মজার ব্যাপার আগের মতই ভালো লাগা কাজ করেছে৷ আমি জানি শেষে কি হবে তাও পড়ে মজা পাচ্ছিলাম৷ খুব সুন্দর স্টোরিটেলিং।
১৪. শহরের উষ্ণতম দিনে রোমান্টিক এই গল্পটা কোনো প্রকার কারণ খোঁজা ছাড়া পড়লে বেশ উপভোগ্য। প্রতিটি সংলাপ যথেষ্ট মজার। কমপ্লিকেটেড এক প্রেম কাহিনী। বেশ সাবলিল গল্প বলার ধরণ। সাদামাটা এক গল্প।
যাদের ছোটগল্প পছন্দ বা যারা রিডার্স ব্লকে আছেন তাদের জন্য "শহরের উষ্ণতম দিনে" একটি ভালো অপশন।
১৪ টি ছোটোগল্পের সমন্বয়ে সৃষ্টি এই বইটিকে একটি আদর্শ গল্পের বই বলা যায়। গভীর বিশ্লেষণে না যেয়ে কনসাইজলি একটা রিভিউ দেওয়ার চেষ্টা করি।
লেখিকার স্টোরিটেলিং চমৎকার, হুমায়ূনীধারা প্রকটভাবে বিদ্যমান। 'হুমায়ূনীধারা' কে পজিটিভ বা নেগেটিভভাবে শুরুতেই নেবার দরকার নেই। কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবেই হুমায়ূন আহমেদের মতো সহজ সরল ভঙ্গিতে লিখতে ভালোবাসেন, তাঁর জন্য অবশ্যই এটা সাফল্যের ব্যাপার। কারণ তিনি যে লক্ষ্যে এগিয়েছেন, সেটাতে তিনি সক্ষম। কয়জনই আর পুরোপুরিভাবে যা চাইছেন তার প্রতিফলন ঘটাতে পারেন?
তবে অনিচ্ছাকৃতভাবে হলে,তখন তাকে প্রভাবিত এবং নেতিবাচক অর্থে বলা যায়। আমি যতটুকু জানি এই লেখিকা এভাবেই ভালোবাসেন লিখতে, সুতরাং এটিকে ত্রুটি হিসেবে চিহ্নিত করছি না।
তবে ব্যক্তিগত মতামত, নিজস্ব সৃজনশীলতার ধারা সৃষ্টি করতে পারলে তিনি আরও চমৎকার লিখতে পারবেন।
.
১৪ টি গল্পের মধ্যে সবগুলো গল্পই ভীষণ ভালো লেগেছে, একথা বলবো না। প্রথম গল্পটা পড়ে অত একটা ভালো লাগে নি। সিকুয়েন্সিং এর ক্ষেত্রে আরেকটু মনোযোগী হওয়া দরকার ছিলো। অনেকটা সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর কিংবা বাংলা রচনার মতো। স্যাররা যেমন শুরু আর শেষ দিয়ে উত্তরপত্র জাজ করেন, আমার মনে হয় ছোটো গল্পগ্রন্থ ও খানিকটা এমন।
প্রথম গল্পটা পড়ে পাঠক ভেতরে পড়তে আগ্রহী হবেন, আর শেষ গল্পটা পড়ে মুগ্ধ হয়ে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকবেন। সেদিক থেকে চিন্তা করলে বইয়ের গল্পগুলিকে রি-অ্যারেন্জ করলে আরও চমৎকার হতো।
কিছু কিছু গল্প অত্যন্ত ভালো লেগেছে। স্টেপিং(Stepping) অর্থাৎ এক ঘটনা থেকে আরেক ঘটনায় খুব সূক্ষ্মভাবে লাফ দিতে লেখিকা সক্ষম হয়েছেন। কোথাও খাপছাড়া মনে হয়নি।
আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে 'তর্জনী', 'শান' আর 'ঠিকানা' নামের তিনটি গল্প। বাকিগুলোও সুন্দর, তাই সবগুলোকে ধরে ধরে পজিশনিং করলাম না। তবে এই তিনটি গল্প এতই সুন্দর যে শুধু এদের জন্য বইটা কিনলে/সংগ্রহ করলেও তা বৃথা হবে না।
(প্রচ্ছদটাও ভীষণ সুন্দর!)
ডাক্তার লেখিকার জন্য শুভকামনা রইলো। সামনে আরও ভালো কিছুর প্রত্যাশায় রইলাম।
নতুন লেখক হিসেবে তার লেখা খারাপ না তবে অনেক যে ভালো তাও না। আমি বইটি প্রথম দেখেছিলাম ইনস্টাগ্রামে এবং বইটির প্রচ্ছদ দেখেই এটার প্রেমে পড়ে যাই। বইটিতে মোট ১৪টি ছোট গল্প। প্রতিটির রেটিং নিচে দেয়া হলো:
প্রচ্ছদ দেখেই কিনে ফেলেছিলাম , বইয়ের ভেতর সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না,তবে পড়ার পর প্রচুর খুশি হয়েছিলাম এটা ভেবে, " আরেকটা ভালো বই আজ আমার সংগ্রহে আসলো ।"
লেখিকা এই বইয়ে চৌদ্দটি গল্পই অসাধারণ লিখেছেন, প্রত্যেকটাই ছিলো আলাদা আলাদা গোছের , ভিন্নধর্মী। প্রথম থেকে শেষ অবধি সব গল্পই সমান মনোযোগ আদায় করে নিয়েছে আমার ...
আমার একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে৷ আমি সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত বই বা গল্পটা হাতে আসতেই শুরু করিনা। একটু অপেক্ষা করি। ছোটবেলায় কিংবা এখনো তিন গোয়েন্দা সিরিজে জিনা আছে, এমন গল্পটি আমি সবার শেষে পড়ি এবং পড়তে পড়তে বারবার খেয়াল করি কত পেইজ বাকি থাকল! অপ্রত্যাশিত ভাবে তাসনিয়া আহমেদের দুটো বই ঈদের আগের দিন হাতে এসে পৌঁছানোর সাথে সাথে আমি প্রথমেই দুটোর মধ্যে বেশি যেটা পড়বার আগ্রহ, দুইশো তেরোর গল্প, শুরু করলাম না। শুরু করলাম, শহরের উষ্ণতম দিনে। লেখিকার ছোট গল্পের সাথে আমি আগেই পরিচিত। কেবল বয়স যখন ষোলোই সঠিক দিয়ে নয়, ফেসবুকে নানান গ্রুপে বা স্ট্যাটাসে তার লেখা আমি সবসময়ই পড়ি। আমি তাই আগ্রহ নিয়ে পড়তে শুরু করলাম, কারণ জানা আছে আগ্রহ ধরে রাখার কলাকৌশল তাসনিয়ার ভালোই জানা আছে। হতাশ হলাম না। বরং লেখনশৈলীতে বয়স যখন ষোলোই সঠিক এর চাইতে আরো বেশি মুন্সীয়ানা দেখতে পেলাম। মোট ১৪টা গল্প নিয়ে সাজানো এই বইটিতে লেখিকা সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক নানা দিক ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। এতে হরর গল্প যেমন আছে, তেমনি আছে মিষ্টি রোমান্টিক গল্প। আবার আছে সমাজের রূঢ় বাস্তবতার তীব্র ছবি। প্রতিটি গল্প বলাতে লেখিকার মায়া এবং অনুভূতি খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন তিনি৷ কিছু কিছু লাইনে কেন যেন আমি হুমায়ূন আহমেদের ছায়া এখনো দেখতে পাই। প্রথম বইয়ের চাইতে অনেক কম হলেও সেটা একটু একটু এখনো যেন রয়ে গেছে। বিশেষত, হুট করে বলে ফেলা হাস্যরসাত্মক বা জীবনমুখী কোন লাইনের ক্ষেত্রে বিষয়টা বেশ চোখে পড়ে। সম্ভবত তা লেখিকা ইচ্ছে করে করেন না, হয়ে যায়। তবে আমার ধারণা ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ নতুন একটা তাসনিয়া আহমেদীয় লেখনশৈলী আমরা পাব, যা লেখিকাকে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছেও একজন যথার্থ শিল্পী হিসেবে উপস্থাপিত করবে ৷ কারণ, তার দেখার চোখ, লেখার হাত এবং হৃদয় আছে৷ এবার আসি সবচেয়ে ভালো লাগার গল্পগুলোতে। বইটিতে ১৪টি গল্পের মধ্যে সবগুলোই যে খুব অভিনব ভাবনার তা নয়। কিছু কিছু জানা ঘটনা, যা চিরন্তন সমাজসমস্যা, তাও নতুনভাবে উঠে এসেছে। শান, মতিন সাহেবের একদিন কিংবা জলপদ্ম গল্পগুলো তেমন। ভালো লেগেছে এই সাহসী লেখাগুলো। পাত্র-পাত্রীর আলাদা কথার মাধ্যমে প্রথমবার ও বেশ ভালো লেগেছে। যদিও শহরের উষ্ণতম দিনে এর এন্ডিংটা একটু কষ্টকল্পনা মনে হয়েছে। আরেকটি গল্প, পুতুল, যেটিতে লেখিকা আলোকপাত করেছেন কালো যাদুর দিকে, সেটিও বেশ লেগেছে। এমন ছোট গল্প আরো আসুক। তবে যে গল্পটি আমাকে মুগ্ধ করেছে সবচেয়ে বেশি এবং আমি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছি, যে তাসনিয়া আহমেদ আর যাই হোক, ঝোঁকের বশে লিখতে আসেননি, আঁটঘাট বেঁধেই এসেছেন, সেটি হচ্ছে তর্জনী। এই গল্পটি পড়তে গিয়ে রীতিমতো আমি সত্যজিৎ রায়ের ছোটগল্পের ফিল পেয়েছি। অসাধারণ! এবার একটু প্রকাশনার ব্যাপারে আসি। নতুন হিসেবে সতীর্থ প্রকাশনার বই বাঁধাই, ছাপার মান অসম্ভব উন্নত। এমনটা তারা ধরে রাখলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রুচিশীল প্রকাশনা সংস্থা হিসেবে প্রথমা, ইউ পি এল, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, পাঠক সমাবেশ ইত্যাদির পাশাপাশি বসার ক্ষমতা তারা রাখে। অনুরোধ করব, অনুবাদ, থ্রিলার, মৌলিকের পাশাপাশি, ক্লাসিক, নন-ফিকশন এর দিকেও নজর দিতে। পাঠক রেঞ্জ বাড়বে তাতে। ব্যস, অনেক বকবকানি হল। শহরের উষ্ণতম কোন বিকেলে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে এই গল্পগ্রন্থখানায় হারিয়ে গেলে বিকেলটুকু বেশ ভালোই কাটবে, এটুকু বলতে পারি।
ছোট ছোট একক গল্প,কিছু অমিমাংসিত অতিপ্রাকৃত বিষয়, কিছু প্রকৃতির প্রতিশোধ, কিছু মিস্টি প্রেমের গল্প আর কিছু প্রকাশ না করেও গভীর ভালোবাসার বন্ধন - এক টানে পরে শেষ করেছি। সাবলীলভাবে বলে যাওয়া গল্প গুলোয় রয়েছে পাঠক কে ধরে রাখার খমতা। সুন্দর বই।
"এই শহরে আমার একটা প্রিয় জায়গা আছে। ভয়ংকর মন খারাপের দিনগুলিতে আমি সেইখানে গিয়ে বসে থাকি,থাকতে হয়। এইটা নিয়ম। আজকে আমি সেই জায়গাটায় যাবো। কারণ নিয়মের বাইরে মানুষ যেতে পারে না"⠀ -অধরা⠀ ⠀ "শহরের উষ্ণতম দিনে" বইটা নাম দেখেই কেনা। বইটিতে রয়েছে ১৪ ছোট গল্প। ছোট গল্প পড়ার আনন্দ হলো বই হাতে নিয়ে যেকোনো একটা গল্প পড়া শুরু করা যায়। তাছাড়া ছোট গল্প পড়ে 'শেষ হইয়াও হইলো না শেষ' যে অনুভূতিটা হয় ( অদ্ভুত শোনালেও সত্যি) তা আমার অসম্ভব প্রিয়। এছাড়াও আমার মতে ছোট গল্প রিডার্স ব্লক কাটাতেও সাহায্য করে। ⠀ যাই হোক, শুধুমাত্র বইয়ের নাম দেখে কেনাতে হতাশ হতে হয় নি। বইয়ের ১৪টি গল্পই কমবেশি ভালো লেগেছে বলা যায়। তবে 'পাঁচতলা' ও 'অধরা' এ দুটি গল্প বেশি ভালো লেগেছে। আমি ভৌতিক গল্প তেমন পছন্দ করি না তবে 'পাঁচতলা' গল্পটি ভালো লেগেছে পড়ে। ⠀ আর একটা না বললেই নয়, লেখকের উৎসর্গপত্র ও বইয়ের প্রচ্ছদ দুটোই খুবই সুন্দর হয়েছে। ⠀ ⠀ নতুন লেখকদের বই ও ছোট গল্প পড়তে যারা পছন্দ করেন তারা পড়ে দেখতে পারেন "শহরের উষ্ণতম দিনে"। ১১০ পৃষ্ঠার একটি বই। এক বসাতেই শেষ করতে পারবেন। আশা করি ভালো লাগবে। ⠀