গুরু দত্তের পিয়াসা ছবির জিনহে নাজ হ্যায় হিন্দ পার গানটির যুৎসই সুর কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলেন না শচীন কত্তা। চিন্তিত মুখে পায়চারি করছেন। পাঞ্জাবি হাওয়াই গীটারবাদক হাজারা সিং ও উদ্বিগ্ন মুখে অপেক্ষারত। সেসময়ই ঘটল এক অঘটন। প্লেকট্রামটা সজোরে আছড়ে পড়ল গিটারের উপর। সঙ্গে সঙ্গে সুর খুঁজে পেলেন শচীন দেববর্মণ। সৃষ্টি হল পিয়াসার আরেক কালজয়ী গান। একটা গানের পেছনে কত ইতিহাস, কত গল্পই না লুকিয়ে থাকে৷ লেখক-সাংবাদিক প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত তাঁর পছন্দের গান, রাগের পেছনের গল্প খুঁজেছেন, ঢুঁড়েছেন ইতিহাস। আর সহজ ভাষায় লিপিবদ্ধ করেছেন পাঠকদের জন্য। সঙ্গীতপ্রেমী পাঠকদের জন্য এই বইটি একটি চমৎকার উপহার। রাজস্থানের বিখ্যাত লোকসংগীত কেসারিয়া বালাম। এই গানের পেছনেও রয়েছে কিংবদন্তি। ঢোলা আর মারুর করুণপ্রেম কাহিনীই গান সৃষ্টির আদিতে। সেই ঢোলা মারুর কাহিনী যেমন চমকপ্রদ তেমনি তানসেন আর দরবারি কানাড়া কিংবা তানসেনের মৃত্যুর পরে কোন ধর্মমতে হবে তাঁর অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া তা নিয়ে সৃষ্ট কোন্দল, এইসব গল্পও কম রোমাঞ্চকর নয়। রাগ মালহারে যে বৃষ্টি নামত এতো রীতিমতো কিংবদন্তি। কিংবদন্তি হয়ে রয়েছে মাস্টার মদন নামে এক বিস্ময়বালকের জীবনকাহিনীও। অসম্ভব প্রতিভাবান এই কিশোর গায়ক পারিবারিক অথবা প্রতিদ্বন্দ্বীদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মারা যান মাত্র ১৪ বছর বয়সে। অনেক বছর পরে জগজিৎ সিং তাঁর গজলের সংকলনে মাস্টার মদনের দুটি গজল সংরক্ষণ করেন। কেবল রাগাশ্রয়ী সংগীতই নয়, উঠে এসেছে বলিউডের নানা শ্রুতিমধুর গানের কথাও, যার স্রষ্টাদের হয়তো আজ আমরা আর সেইভাবে চিনি না। সত্যজিৎ রায়ের ছবির সংগীতও আলোচিত হয়েছে বইটিতে। জানতে পারলাম উৎপলেন্দু চক্রবর্তীর দ্য মিউজিক অফ সত্যজিৎ রায় ডকুমেন্টারির কথা। বইটি পড়তে পড়তে নানা গানের কথা জানছিলাম আর ইউটিউবে খুঁজে খুঁজে সেসব শুনেও আসছিলাম অল্প স্বল্প। সারাংশ ছবির দুটি গান এত হৃদয় নিংড়ানো যে মেঘলা আকাশের মতোই গানগুলো খুব সহজে মন খারাপ করিয়ে দেয়। সারাংশ ছবির সুরকার অজিত বর্মণকে পরবর্তীতে কেউ মনে রাখেনি, অথচ ছবিটা ভারতীয় ছবি হিসেবে অস্কারেও গিয়েছিল। এমনি নানা গানের পেছনের কথা উঠে এসেছে টুকটুক করে ছোট্ট বইটিতে। এক বসায় পড়ে ফেলা যায়, পড়ে একটা তৃপ্তির ঢেঁকুরও তোলা যায় তবে সহজেই স্মৃতি থেকে মুছে যায় না। রেশ রেখে যায় সাথে আগ্রহ জাগিয়ে যায় এমন আরো অনেক গল্প জানবার, অনেক গান শোনবার এবং দেখবারও।
"গানে ভুবন ভরিয়ে দেবে/ ভেবেছিল একটি পাখি, হঠাৎ বুকে বিঁধল যে তির, স্বপ্ন দেখা হল ফাঁকি..." সিনেমা, উত্তম কুমার, শ্যামল মিত্র... সবাইকে, সবকিছু ছাপিয়ে এই লাইনগুলো বাঙালির সঙ্গে থেকে গেছে। আর থেকে গেছে গান। রেকর্ডের কালো চাকতি থেকে কানে লাগানো হেডফোন হয়ে আমাদের দিনরাত্রি ভরিয়ে তুলেছেন গায়কেরা। অথচ গন্ধর্বলোকের সংকেত বহনকারী ওই শব্দ আর ছন্দ যাঁরা পরিবেশন করেন, তাঁদের আমরা কতটা চিনি? তাঁদের সৃষ্টির প্রাচুর্য সম্বন্ধেই বা আমরা কতটা ওয়াকিবহাল? ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস ও পরম্পরা নিয়ে লেখা হয়েছে বহু বই। কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের 'কুদরত রঙ্গিবিরঙ্গি' ও 'মজলিশ', অমিয়নাথ সান্যালের লেখাজোখা, বহু শিল্পীর স্মৃতিকথায় ছড়িয়ে আছে সেইসব আখ্যানমালা আর তথ্য। তবু, এ এমনই এক বিষয় যাকে নিয়ে কথা ফুরোতে চায় না। সেজন্যই সুলেখক ও সাংবাদিক প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত ফেসবুকে ছোট্ট ছোট্ট লেখায় তুলে এনেছিলেন তাঁর ভালোবাসার ও ভাবনার মধ্যে ধকধক করে চলা কিছু গান, গল্প, আর গানের গল্পকে। তেমন চৌত্রিশটি লেখা নিয়ে গড়ে উঠেছে এই বই।
দেবজ্যোতি মিশ্রের প্রাককথন এবং লেখকের উপক্রমণিকা পেরোলেই আমরা ঢুকে পড়ি গানের মহলে। মেঝেতে পাতা তাকিয়ায় শরীর এলিয়ে দিই। ভেসে আসে হালকা সুর আর জর্দার গন্ধ। শুরু হয় গল্প।
শুধু কি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কথাই আছে এখানে? মোটেই না! আছে পাশ্চাত্য নানা সুর ও কাজ। আছে চলচ্চিত্রের পাখোয়াজ। আছে সাধনার ভিত্তি হয়ে থাকা অনলস রেওয়জ। আছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার আওয়াজ। তাই সত্যজিতের সিনেমায় বহুশ্রুত হয়েও বিস্মৃত শিল্পীর দীর্ঘশ্বাস মিশে যায় বিষক্রিয়ায় নিভন্ত চাইল্ড প্রডিজির চোখের জলে। মৌলবাদীর পাথর একাকার হয়ে যায় বাইক থেকে ছুটে আসা বুলেটে। চলতেই থাকে গন্ধর্বলোকের চাবিকাঠি লুকিয়ে রাখার দানবীয় চেষ্টা। তবু, সব কিছুর মধ্য দিয়েও বয়ে যায় সুরের নদী। আমরা অন্যকে খুঁজে পাই গানের ওপারে। দু'পাতা থেকে দশ পাতা— এই হল এই লেখাগুলোর দৈর্ঘ্য। তাতে আছে ধর্মের হানাহানি, ঈর্ষাকাতরের ষড়যন্ত্র, অজস্র বঞ্চনা আর হাহাকার। আছে ভুলে যাওয়া, ভুলিয়ে দেওয়া ইতিহাস। আছে সিনেমার অলীক ভুবন। আছে বিশ্বাসের কুহক। আছে মায়া! এই শেষ উপাদানটির কথাই বড়ো বেশি করে মনে হয় লেখাগুলো পড়তে গিয়ে। পাঠকের সঙ্গে এত নরম, এত অনুচ্চ, অথচ এত গভীর সম্পর্ক স্থাপন করতে গেলে ওই জিনিসটিই লাগে সবচেয়ে বেশি করে। তাতেই আসে প্রকৃত সিদ্ধি। সেজন্যই আজাদ হিন্দ ফৌজের মিলিটারি মার্চ সঙের তাল মিশে যায় দরবারি কানাড়ার সরগমে। পুত্রশোকে ব্যথাতুর নজরুলের গান থেকে আমরা পৌঁছোই জিঙ্গল বেল-এর গল্পে। চলতেই থাকে গল্প আর গানের এই অদ্ভুত যুগলবন্দি।
যেকোনো সঙ্গীতপ্রেমীর অবশ্যপাঠ্য এই বইটি। তবে তিনটি বিষয় নিয়ে ক্ষোভ রয়ে গেল~ ১) বইয়ে বানানের ব্যাপারে কোনো রীতি অনুসরণ করা হয়েছে বলে মনে হয়নি। গণেশ-এর মূর্ধন্য ণ লোপ পায়, আবার অতৎসম শব্দ (দরবারি, জোহরাবাই)-তে দীর্ঘ ঈ জ্বলজ্বল করে— এ কেমন প্রুফচেকিং! ২) 'কুদরত রঙ্গিবিরঙ্গি' দেশ-এ প্রকাশের সময় তার প্রতিটি লেখায় উপস্থিত ছিল বিমল দাসের করা অবিস্মরণীয় অলংকরণ। গল্প আর গান জীবন্ত হয়ে উঠেছিল সেই অলংকরণের সান্নিধ্যে। এখানে চৌত্রিশটি লেখার মধ্যে অন্তত কয়েকটিতে সংশ্লিষ্ট শিল্পীর স্কেচ এবং বাকিগুলোতে মোটিফ থাকা দরকার ছিল। প্রকাশক এই ব্যাপারটাকে এমন উপেক্ষা করেছেন দেখে ব্যথিত হলাম। ৩) আনন্দ আর পত্রলেখার ক্যাটালগ জুড়ে দিলে যা পাওয়া যাবে সেই মাপের বইয়ের এমন দাম! মানছি যে সঙ্গীত অমূল্য। কিন্তু বইয়ের মূল্য এমন হলে তো চাপের ব্যাপার। তবে এগুলো ব্যক্তিগত গজগজানি। আসল কথা তো আগেই বলেছি। যদি গান ভালোবাসেন, তবে লেখকের এই আসরটিকে কোনোমতেই উপেক্ষা করবেন না। বরং বইটা নিন, আরাম করে আধশোয়া হোন, তারপর পড়তে শুরু করুন। গান ভুলে যাবেন। তবে এই অভিজ্ঞতা ভুলবেন না!