প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত এ ভূখণ্ডের সাহিত্যে ও শিল্পে নর-নারীর দেহচেতনার কথা চলে এসেছে অবাধে, অবলীলায়। মহাভারত থেকে মেঘদূত, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন থেকে পদ্মাবতী কিংবা আধুনিক সাহিত্যাঙ্গনে বুদ্ধদেব বসুর ‘রাত ভ'রে বৃষ্টি’ বা সৈয়দ শামসুল হকের ‘খেলা রাম খেলে যা’ - এ সকল সাহিত্যেই দেহচেতনার কথা আছে। কিন্তু দেহচেতনার ব্যাখ্যা বিবর্তনীয় দৃষ্টিতে দেখার ক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্যে 'অপুংসক'ই সম্ভবত প্রথম উপন্যাস।
এ যুগের সমাজ, সভ্যতা ও আধুনিক নগরায়নের মাঝেও জৈবিক চেতনা আদিমতম ধারাতেই প্রবাহমান। সভ্যতার আবরণে এ চেতনাকে অবদমন করার বৃথা চেষ্টা সভ্যতার কৃত্রিমতার মুখোশ উন্মোচন করে চলছে ঘর থেকে ঘরে, সমাজ থেকে সমাজে। সেই সত্য অকপটে তুলে ধরেছেন লেখক তাঁর প্রথম বাংলা উপন্যাস 'অপুংসক'-এ।
অপুংসক এক দম্পতির (অনুভব ও কাজল) গল্প, আরো ভালো করে বলতে গেলে অনুভবের নিজের শরীরকে খুঁজে ফেরার গল্প। সে খুঁজে ফেরে কেন কাজলের সবকিছু ভাল লাগলেও তার আহ্বানে শরীর সাড়া দেয় না; তার চেয়ে স্বমেহনেই সে সুখ পায়। একে একে সে প্রশ্ন তুলতে থাকে সমাজ সভ্যতা সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান নিয়ে - এগুলো আমাদের প্রাকৃতিক শরীরের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? সে নিজেই সকল প্রশ্নের উত্তর দেয়। অনুভবের শরীরকে খোঁজার এই মনস্তাত্ত্বিক ভ্রমণের গল্পই 'অপুংসক'।
বইটি সম্পর্কিত অন্যান্য তথ্যঃ প্রচ্ছদঃ রাজীব দত্ত মূল্যঃ ৪০০ টাকা প্রাপ্তিস্থানঃ চৈতন্য প্রকাশনীর অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ রকমারি অনলাইন শপ বাতিঘর ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট। ....... *কেবলমাত্র প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য
১ "অনুভবকে স্নানঘরে হস্তমৈথুনরত দেখে ফেলার পর থেকে কাজল তার সঙ্গে কথা বন্ধ করে দিয়েছে।" উপন্যাসের শুরুটা এই বাক্য দিয়ে। যেখানে উপন্যাসের প্রধান চরিত্র অনুভব আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে তার স্ত্রী কাজলের শরীরের প্রতি। যাকে সে ভালোবাসে কিন্তু স্ত্রী'র যৌন আহ্বানে তার শরীর সাড়া দেয় না, শরীর জাগে না। বরং তার শরীর জাগে পর্ণ অথবা চটি গল্পে। অভ্যস্ত হয়ে পড়ে স্বমেহনে; যা সুখ দেয় তাকে।
কিন্তু তবুও স্ত্রী'র প্রতি ভালবাসা থেকেই হোক, আর সংসারের দায়বদ্ধতা থেকেই হোক অনুভব বুঝতে চেষ্টা করে নিজের দুর্বলতা। নিজের সমস্যা, তার সমাধানে মরিয়া হয়ে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে বিবিধ মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের সাহায্যে। কিন্তু কোন হাইপোথেসিসেই ঠিকমত বুঝা হয়ে উঠে না নিজের সমস্যা শেষ পর্যন্ত। কখনও নিজেকে মনে হয় বিকৃতকামী অর্থাৎ স্বাভাবিক যৌনতায় অনাগ্রহী আবার কখনও অন্যকিছু। কিন্তু একরাতে হোটেলে আচমকাই শরীর মন্থনে জড়ায় কলগার্ল জিনিয়া'র সাথে, স্বামী-স্ত্রী'র বিশ্বস্ততা ভেঙ্গে দিয়ে। যে ব্যাপারটাকে নিজের প্রতি এক্সপেরিমেন্ট হিসেবেই ধরে নেয় অনুভব এবং বুঝে উঠে নিজেকে; আবিষ্কার করে যে সে এখনও পূর্বের মতোই সক্ষম শুধু কাজলের প্রতিই তার শরীর জাগে না। তারপর হোটেলের ঘটনাবলী নিয়ে কাজলের কাছে যখন ধরা পরে এবং সব কিছু স্বীকার করে ঠিক এই জায়গাটাতেই শুরু হয় গল্পের মূল ট্রাজেডির। সেদিন থেকেই কাজল আলাদা করে ফেলে নিজের বিছানা। শোবার ঘর ছেড়ে আশ্রয় নেয় অতিথি ঘরে। পরিস্থিতিটা বুঝানোর জন্যে উপন্যাস থেকে quote করছি: .............. "ব্লোজব? ব্লোজবই বলো। সমস্যা নাই," অনুভবকে থামিয়ে দিয়ে বলল কাজল। অনুভব আবার শুরু করল। "হ্যাঁ, তুমি যখন ব্লোজব দিতে চাইলে তখন আমার ওটা থেমে গেলে আমার মনে হয়েছিল আমি বোধ হয় পার্ভার্ট হয়ে গিয়েছি। আমি কেবল মাস্টারবেশনেই সুখ পাই।তাই একটা কলগার্ল ডেকেছিলাম।আমি দেখতে চেয়েছিলাম..." "তা কী দেখলে?" "দেখলাম আমি ..." "বলো।" "দেখলাম আমি এখনও ... আছি," অনুভব বলল। সে আর বলতে পারছিল না। স্ত্রীর কাছে এসব বলা যায় না। "তুমি আর প্রশ্ন করো না প্লিজ।" "মেয়েটা কেমন ছিল? আমার চেয়ে সুন্দরী ছিল নিশ্চয়ই?" "আমি বললাম তো, প্লিজ প্রশ্ন করো না।" কাজল থামল না। "বলো, আমার চেয়ে সুন্দরী ছিল সে? সেই বেশ্যাটা। "তারপর আবার অনুভবকে খোঁচা দিয়ে বলল, "ওহ, তাকে তো আবার বেশ্যা বলা যাবে না,কলগার্ল বলতে হবে।" অনুভব বুঝতে পারছে না তার কী বলা উচিত। সে এখন শাঁখের করাতে অবস্থান করছে। হ্যাঁ, না, দুটো উত্তরেরই নঞর্থক অর্থ করা সম্ভব কাজলের পক্ষে। সে সত্যটাই বলল, "না, সে কোনোভাবেই তোমার কাছাকাছিও ছিল না।" "তারপরও তোমার ওটা ইরেক্ট হলো, তাই তো?" "হ্যাঁ, হলো," এবার একটু রেগেই বলল অনুভব। "তার মানে তোমার ওটার সমস্যা কেবল আমার ক্ষেত্রেই? আমি ব্লোজব দিতে চাইলেও ওটা জাগে না। আর কোথাকার কোন বেশ্যা স্যরি কলগার্লের সংস্পর্শেও..."
তারপর সময় যত অতিবাহিত হয় মধ্যকার দূরত্বও বাড়তে থাকে সেই সঙ্গে; সমদ্রুতিতে। হারিয়ে যেতে থাকে সুখের সময়। বাড়তে থাকে মন্দ সময়ের বিস্তৃতি। একসময় সব কিছু শেষ করে চিরতরে দূরে যেতে চাওয়া। কিন্তু আসলেই কি আর যাওয়া হয়ে উঠে? থাক। সেটা আর আমি না বলি। তারপর হঠাৎ করে কাহিনীর মোড় ঘুরে যাওয়া,সত্যি এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি, ভাবনার বাহিরের অনেক কিছুরই সামনে আসা। তারপর এক সুন্দর পরিসমাপ্তি। কিন্তু কাহিনীর শেষ তো হয়, হরানো সুখ কি আর ফিরে আসে? -সেটাও থাক সাসপেন্স হিসেবেই।
২. আমার কাছে উপন্যাসের সবচেয়ে ভাল লাগার ব্যাপারটা হলো এর নাম। 'অপুংসক' শব্দটা আমার প্রথম শুনা। আর সেটাও তো স্বাভাবিকই। কারন এ তো কোন অভিধানিক শব্দ নয়, তবে উপন্যাসে লেখক তার সৃষ্ট চরিত্রের মাধ্যমে অপুংসক-এর একটা অর্থ তথা সংজ্ঞা বলিয়ে নিয়েছেন। 'অপুংসক' এর পাঠক যথাসময়ে সেটা জানতে পারবেন।
৩. এবার আসি 'অপুংসক' এর বিষয়বস্তুর দিকে।আর তা হলো যৌনতা। যৌনতার বিভিন্ন দিককে লেখক বিবর্তনীয় হাইপোথেসিসের আতশ কাচের নিচে রেখে বুঝানোর চেষ্টা করেছেন, তার উপন্যাসের প্রধান চরিত্র অনুভবের মনোজগতে। এখন আসি তবে উপন্যাসটির ধরনের ব্যাপারটায়। সেটা বলতে গেলে আমার কাছে 'অপুংসক' কে মনে হয়েছে মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ধর্মী। তবে একজন মানুষের জীবনের একটা সময়ের পরস্থিতির চিত্র আঁকতে যেয়ে উপন্যাসে প্রেম, বিরহ, থ্রিলার, এ্যাডভেঞ্চার ইত্যাদি সমাবেশ ঘটিয়েছেন লেখক। তাছাড়া বাংলাদেশের সমসাময়িক কয়েকটা ঘটনাও উঠে এসেছে এতে। "The novelist is an explorer of existence" যদি হয়, তবে আমার মনে হয় 'অপুংসক' এর লেখক সন্ন্যাসী রতন সফল সে-দিক দিয়ে।
৪. উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে এর অনেকগুলো অংশই আমার অসম্ভব ভালো লেগেছে; আমাকে ভাবিয়েছে। সব যে আমার ধারণার সাথে মিলেছে এমন নয়। সবগুলো ব্যাপারে যে আমি লেখকের সাথে ১০০% একমত তাও নয় ।কিন্তু তবুও লেখাগুলো আমাকে চিন্তার খোরাক যুগিয়েছে। আমি এর অল্প কয়েকটা অংশ রেন্ডমলি কোট করছি: "প্রতিটা সম্পর্কের ক্ষেত্রেই কিছুটা দূরত্ব কাম্য বলে মনে হয় অনুভবের। মা বাবা ভাই বোন আর স্ত্রী-সন্তানই হোক, নৈকট্য নয় বরং কিছুটা দূরত্বই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে। প্রতিটি পূর্ণবয়স্ক মানুষেরই নিজস্ব জগৎ রয়েছে, সেখানে তার ভাবনা তার দর্শন একান্তই নিজস্ব। পৃথিবীতে হাজারটা প্রতিষ্ঠিত দর্শন থাকতে পারে, কিন্তু একজন ব্যাক্তি-মানুষ তার কোন একটা দর্শনে পুরোপুরি বিশ্বাসী হতে পারে না। সে বিভিন্ন দর্শন থেকে টুকরো টুকরো নিয়ে এবং তার সঙ্গে নিজস্ব ভাবনা মিলিয়ে একটা নিজস্ব দর্শন তৈরি করে। ফলে প্রতিটা ব্যক্তিই আলাদা। বাণী বসুর একটা লাইন তার খুব পছন্দ - ‘মানুষের লসাগু হয়, কিন্তু মানুষ মূলত মৌলিক।’ পৃথিবীতে যদি সাত বিলিয়ন মানুষ থাকে, তাহলে জীবন দর্শনও রয়েছে সাত বিলিয়ন। যখন দুজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ দিনের পর দিন পাশাপাশি থাকে, তখন তাদের মধ্যে দর্শনের বিভেদ শুরু হয়। আর তাতেই নষ্ট হয় সম্পর্ক, সে-সম্পর্ক যত কাছেরই হোক।"
"শরীরের নিশ্চয়ই কোন ব্যাকরণ আছে। তার বাইরে শরীর যেতে পারে না। আমরা সমাজে সভ্যতায় সংস্কৃতিতে যত আধুনিকই হই না কেন, যতই প্রাকৃতিকতা থেকে সরে আসি না কেন, শরীরটা এখনও রয়ে গিয়েছে তার আদিম প্রাকৃতিক অবস্থানে। শরীরের মধ্যে সভ্যতার চাষ হয় না, সংস্কৃতির শস্য ধরে না, শরীর থেকে যায় শরীরের ব্যাকরণে। সে-ব্যাকরণের সন্ধিতে নিপাতনে সিদ্ধ বলে কিছু নেই, সবকিছুই চলে গাণিতিক অনিবার্যতায়।"
"অনুভবের শোবার ঘরের বারান্দা থেকে ঠিক নিচে একটা কাঁঠাল চারা বেড়ে উঠেছে। দালানের কার্নিশ থেকে পড়া আলোয় দেখা যাচ্ছে সেটার পাতায় ফোঁটা ফোঁটা জল জমছে এবং জল একটু বেশি জমলেই পাতাটা নুয়ে গিয়ে সবটুকু জল একেবারে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে। অনুভব আজকাল সবকিছুতেই নিজেকে খুঁজে পায়। তার কাছে মনে হলো তার এবং কাজলের সম্পর্কটাও ঠিক ঐ কাঁঠাল পাতাগুলোর মতো। সেখানে দৈনন্দিনতা ও গতানুগতিকতা জমে জমে ভারী হয়েছে, তারপর একদিন নুয়ে পড়েছে; তাদেরকে আর ধরে রাখতে পারেনি।" "কাঠাল চারাটিকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল ওটা কেউ রোপন করেনি।......। কোন ফ্লাটের বাসিন্দা হয়তো জানালা দিয়ে কাঁঠালের বীজ ছুঁড়ে দিয়েছিল অথবা কোন শিশু কাঁঠাল খেতে গিয়ে তার হাত থেকে বীজ পড়ে গিয়ে তাতে চারা গজিয়েছে। বাড়ির দারোয়ান চারাটিকে নাদুস-নুদুস দেখে ওটার চারপাশে বেড়া দিয়ে দিয়েছে। অনুভবের কাছে মনে হলো, দম্পতিরাও তাদের সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে এভাবে বেড়া দেয়। সেই বেড়ার নাম সন্তান। বেড়াটা পুরোনো হয়ে গেলে আবার নতুন করে বেড়া দিতে হয়, এভাবে যতদিন পর্যন্ত না সম্পর্কটা এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছায় যে তখন আর আটকানোর প্রয়োজন হয় না, একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।"
"এই বহুব্রীহি যখন বড় হবে এবং তার সন্তানাদি হবে, তখন অনুভব ও কাজল বেঁচে থাকলেও সেইসব সন্তানদের কাছে তাদের পৌঁছানোর সহজ সুযোগ থাকবে না। অনুভবের ঠাকুরদা এবং ঠাকুরমা তার নাতিদের শৈশবে সর্বদা কাছে পেয়ে যে সুখ লাভ করতেন, অনুভবের বাবা সেটা পারছেন না, এবং অনুভব নিজেও পারবে না। নাতি-সংস্পর্শে বা নাতির আদর-ভালোবাসায় তার ঠাকুরদার শরীরে যে সুখের হরমোনগুলো নিঃসরণ হতো, অনুভবের বাবার সেগুলো হচ্ছে না। ফলে তার ঠাকুরদার চেয়ে তার বাবার সুখের মাত্রা কখনোই ওপরে উঠবে না। তাঁকে সুখের জন্য বেছে নিতে হয়েছে অন্য কোনো পথ। আবার অনুভবের বাবা বিলে একটা আইড় বা বোয়াল মাছ ধরে যে সুখ লাভ করতেন বা করেন, সেই সুখটা অনুভব পায়নি। শহুরে পরিবেশে সেরকম সুখের বড় সংকট। তাই অনুভবকে বা তার মতো কোটি কোটি শহুরে মানুষকে সুখ খুঁজতে হচ্ছে অন্য কিছুতে, যা খুবই কৃত্রিম এবং যার বেশিরভাগটাই যৌনতা নির্ভর। তারা মেয়েদের ক্লিভেজ বের করা সিনেমা দেখছে, দুধের সাধ ঘোলে মিটাতে তারা টেলিভিশনে স্টেডিয়ামে খেলা দেখছে। কিন্তু দেখা গেল ওতে তাদের মন ভরছে না; নিজ হাতে মাছ ধরার যে সুখ কিংবা পাড়ার লোকদের সঙ্গে মিলে হাডুডু খেলার যে সুখ, নারীর ক্লিভেজ দেখে তা পাওয়া যাচ্ছে না। সুতরাং নারীকে ন্যাংটা করে দেখাও। তাতেও মাছ ধরার মতো সুখ পাওয়া গেল না? তাহলে এবার পর্ন তৈরি করো। পর্ন দেখে স্বমেহন করো। সাধারণ পর্ণে হচ্ছে না? হার্ডকোর, ব্লোজব, এ্যানাল, টিন, ইনসেস্ট, ইত্যাদি ইত্যাদি পর্ন করো। ওয়ান-নাইট-স্ট্যান্ডের মতো যৌনসর্বস্ব খেলায় মাতো। অর্জিতে যোগদান করো। বিডিএসম, থ্রিসাম, ওপেন রিলেশনশিপ, ইত্যাদি ইত্যাদি যৌনতায় দ্বারস্থ হও। কিন্তু হায়! কিছুতেই নিজ হাতে মাছ ধরার সুখ পাওয়া গেল না, হাডুডু খেলার সুখ পাওয়া গেল না। সুখ খুঁজে খুঁজে আমরা হয়রান ও ক্লান্ত হয়ে পড়লাম, অবসাদগ্রস্ত হলাম। সুখ আমাদের অধরাই থেকে গেল। আমরা থামলাম না। সুখ পাইনি তো কী, আমাদের দুঃখের জন্য আমরা একে অন্যকে দোষারোপ করতে শুরু করলাম। আর তার ফলাফল হলো আমরা পরস্পর থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে থাকলাম।"
"যারা প্রেম ও কামকে আলাদা করে, তারাই বরং গুলিয়ে ফেলে। অনুভবের মতে কাম ও প্রোমের মধ্যে কোনোই পার্থক্য নেই, দুটোই অনুভুতি।"
"অনুভবের মতে ব্যায়াম হলো সভ্যতার অভিশাপে শরীরে জমা মেদ থেকে মুক্তির পথ অন্বেষণ, পক্ষান্তরে কায়িক শ্রম হলো কাঙ্ক্ষিত মুক্তি। প্রকৃতিতে বাস করা একটা প্রাণীও পাওয়া যাবে না, যেটা স্থূল। কোন কোন প্রাণী এক ঋতুতে মেদ জমায় বটে, তবে সেটা প্রয়োজনাতিরিক্ত নয়, অন্য ঋতুতে খরচ করার লক্ষ্যে।"
দর্শন, মানব সভ্যতার বিবর্তন আর সেই বিবর্তন থেকে সৃষ্ট নগর জীবনে লালিত মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাকে কেন্দ্র করে চমৎকার ধারাবাহিকতার মাধ্যমে এগিয়েছে ঘটনা প্রবাহ। লেখকের লেখনীর গুন এবং এর সাথে আকস্মিক crime suspense যুক্ত হয়ে পাঠকের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিতে পেরেছে তাতে সন্দেহ নাই। বড় লেখকের ভালো উপন্যাসের মতই এই উপন্যাসটির প্রতি পাঠকের অনুভূতির প্রকাশ হলো- "আমি ছাড়ি তো সে আমাকে ছাড়ে না"। আগ্রহী পাঠককে একাগ্রচিত্তে পঠনে নিবিষ্ট রাখতে ও দ্রুততম সময়ে পাঠ সম্পন্ন করার তাগাদা দিতে এবং পঠন পরবর্তী উল্লেখযোগ্য সময় ব্যাপী অনুভূতিতে এর প্রতিক্রিয়া ধরে রাখার মাপকাঠিতে উপন্যাসটি সার্থক। রসনাবিলাসী পাঠকের জন্য বলা যায় এটি একটি সুস্বাদু পুষ্টিকর খাবার বিধায় দ্রুত গলধঃকরণের তাড়না থাকবে এবং পরিপাক শেষে আহরণকৃত মূল্যবান পুষ্টিগুণ শরীরকে পরিপুষ্ট করে তুলবে। তবে নিবেদিত পাঠক হিসেবে লেখকের গদ্যের গাঁথুনি দেখে মনে হয়েছে নিছক কথা সাহিত্যিক হিসেবে নয় বরং বিজ্ঞানমনস্ক সাহিত্যিক হিসেবে লেখকের সম্ভাবনা অগ্রগণ্য। প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস হিসেবে 'অপুংসককে' এক কথায় বলতে হবে অসাধারণ।
বইটা চৈতন্য প্রকাশনি না বের করলে ভালো একটা গল্প মিস করতাম। যদিও ভালো গল্পের চাইতে প্রথম থেকেই ভিন্নভাবে নির্মাণকার্যে লেখক তার চরিতগুলোকে যে গুরুত্ব দিয়েছেন তাতে মুগ্ধ হবার মতোই৷ শুরুতে পড়তে গিয়ে এতো বড় হোঁচট খেতে হবে যে, পাঠক আর সামনের দিকে এগুবেন কিনা ভাবতে বসবেন। নিস্তরঙ্গ বৈবাহিক জীবন যেথায় প্রেম নেই, ভালোবাসা নাই, আছে শুধু অভ্যাস তেমনটা এই গল্পের শুরুর ঢং। তবে এটাও বলবো এই ঢং এ পা পিছলে গেলে আর এগুতে পারবেন নাহ। প্রকৃতি(নারী) এবং পুরুষের যে মিলন তার পরিধি ক্রমশ এক বৈদিক পাখির খোঁজে ঘুরে বেড়ায় হেথায়। কিন্তু কোথাও খুঁজে পায়না সেই ভালোবাসাকে।
উপন্যাস এ লেখক এতো পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন ঘটনা, অনুঘটনা, চরিত্র, সংলাপ নিয়ে যে তাতে স্পষ্ট বুঝতে পারা যায় অসংখ্য বার অসংখ্য অসঙ্গতি সংশোধনের ভিতর দিয়ে গিয়েছে। এ কথার উল্লেখ না করলেও পারতাম, যেখানে লেখক তার কৃতজ্ঞতা পত্রে তার উল্লেখ করেছেন সৎভাবেই।
অনুভব, কাজল, বহুব্রীহি, মহিবুল, জিনিয়া এবং অনুপমাকে নিয়ে শেষাবধি আবর্তিত এই উপন্যাস একটা সাইকোলজিক্যাল এনালাইসিস ও বটে। সন্দেহ সন্তাপ অসংখ্য অসঙ্গতি অনুভবের চরিত্রের সঙ্গে সর্বদাই বিনয়ী সহাবস্থান নিয়েছে। এক্সপেরিমেন্টাল কাজ হিসেবে বিষয় বৈচিত্র্যতায় ভাল সুযোগ পেয়েছে চরিত্র তুলে ধরতে গিয়ে।
অনুভব নিজের কৃতকর্মের দায় নিয়ে তার প্রায়শ্চিত্ত করেছে সবটুকু দিয়েই৷ হাই টেকনোলজি সম্পর্কিত যে অনুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ এবং বর্ননা পেলাম যার শেষ হলো বিটকয়েন দিয়ে, তারও যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যায়।
গল্পের নায়ক শেষ জীবন গ্রামে কাটাতে চায় বলে শহরের কাছেই একটা গ্রামে জমি কিনে বাড়ি করে। প্রকৃতি পর্যায়ের বর্ননা এবং চরিত্রের আত্মোপলব্ধি যেন আমার আপনার মনের আকুতি জানান দিচ্ছে এমনই মনে হলো।
গ্রামীন জনগোষ্ঠী ও সামাজিক পটভূমি খুব চমৎকার ভাবে উঠে এসেছে। নির্ভেজাল আন্তরিকতা ও বিদেশ বিভূঁই নিয়ে আমাদের গ্রামীণ সমাজের অতি উচ্চাকাঙ্খা উঠে এসেছে কিছুটা দৃশ্যকল্পে। সদা বিরাজমান সম্প্রীতি নিয়ে রামযাত্রা আয়োজনের আশাও দেখা দিলো অনুভব মিস্ত্রির কন্ঠে।
সন্ন্যাসী রতন সাহেবের প্রথম বাংলা উপন্যাস হিসেবে চমৎকার। আরও লিখুন এমন ভিন্ন এবং আধুনিকতা কে সাথে নিয়ে এমন প্রকৃতিপ্রেমী অনুভব মিস্ত্রি মতো বা অন্য কোন চরিত্র নিয়ে। শুভকামনা।
০১. “অপুংসক” - বাংলা সাহিত্যে নতুন একটি উপন্যাসের নামের বাইরে বড় পরিচয় বাংলা শব্দভান্ডারে যুক্ত হওয়া নতুন একটি শব্দ।
দুইশত আটচল্লিশ পাতার লেখাগুলো পড়ার সময় বুঁদ হয়েছিলাম। প্রতিটা লাইনের শেষ করার আগেই মাথায় ঘুরপাক করছিল, এর পরের লাইনে কি আছে?
অনেক গল্প-উপন্যাস পড়েছি। বিভিন্ন স্বাদের, বিভিন্ন বর্ননায়। নতুন শব্দের মতই এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট ও সম্পূর্ণ নতুন।
০২. এই দুইশত আটচল্লিশ পাতা পড়তে গিয়ে নানাবিধ সমস্যায় পরতে হয়েছে। গত দুইদিন অফিসের কাজ চাঙ্গে উঠছে। এই যে একটু আগে সকাল পেরিয়ে দুপুর বারোটায় পড়া শেষ হলো। এ পর্যন্ত অফিসের কাজ ছিল বন্ধ। এখন কাজে বসতে হবে, কিন্তু গত দুইদিন যে একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম, সেটা এখনো যায় নি। তাই যারা এই বইটি পড়বেন, বুঝেশুনে পড়বেন। বেশি কাজ থাকলে রিক্স নিবেন না। পরে কাজের বিশাল ব্যাঘাত ঘটার সম্ভাবনা প্রবল।
গ্রাম ও প্রকৃতি বিষয়ক বর্ণনার প্রেমে পড়েছিলাম। উপন্যাস টা একটু ভিন্ন ঘরনার সবার কাছে বোধগম্য নাও হতে পারে। তবে গল্প বিবেচনায় বাংলা লেখায় নতুনত্ব নিয়ে এসেছে।