( প্রায় পুরোটাই আমার ব্যক্তিগত স্মৃতির রোমন্থন বলা যায়, You may ignore )
বইটা ভাটি অঞ্চল, সেখানকার মানুষের কুসংস্কার, মানুষের জীবনের সরলতা এবং অসহায়তা নিয়ে লিখা।
আমার নানা বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভাটি অঞ্চলে। আমার জীবনের সবচেয়ে স্বর্ণালী সময়টা হয়তো আমার শৈশব আর কৈশরের নানা বাড়ির স্মৃতি। নানা বাড়িতে তখন ইলেক্ট্রিসিটি ছিলো না, রাত হলেই আকাশ বোঝাই হয়ে যেতো নক্ষত্র দিয়ে, উঠানে বসে নানুর কোলে মাথা রেখে মুড়ি খেতাম আর আকাশের দিকে তাকিয়ে খালাম্মা, নানু, মামাদের কথা শুনতাম, কতো সময় সেখানেই ঘুমিয়ে গিয়েছি সেখানে, পরের দিন ঘুম থেকে উঠে দেখি বিছানায়।
ভাটি অঞ্চল যারা দেখেন নি, তাদেরকে এর সৌন্দর্য বলে বোঝানো সম্ভব না। বর্ষাকালে একেকটা গ্রাম একেকটা দ্বীপের মতো হয়ে যায়, গ্রামের চারদিকে পানি, অথৈ পানি, পানির সাথে ভেসে আসে ভেজা বাতাস, খালি গায়ে দাঁড়িয়ে থাকলে মনে হয় শরীর ভিজে যাচ্ছে, সেই পানির বাতাসে থাকে নানা রকম গন্ধ, সেই গন্ধ আমি এখনো খুজি, পাই না, হয়ত পাবো না কখনো আর।
ভাটি অঞ্চলে প্রায় প্রতিটা বাড়িতে একটা করে নৌকা থাকে, যেসব নৌকা নিয়ে গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই ভোরে বের হয়ে যান, মাছ ধরে নিয়ে আসেন, সেই মাছ কুটে রান্না করে হয় সকালের নাস্তা, তারপর খেতে খেতে হয় প্রায় দুপুর, আমার বড় মামার সাথে আমার ইচা (ছোট চিংড়ি) মাছ মারার স্মৃতি এখনো মনে আছে, আমার বড়ো মামা ভালো ইচা মাছ মারতে পারতো, সে মাছ মারতো ৫ মিনিট, কিন্তু নৌকা নিয়ে ঘুরতো ৩০ মিনিট, পানির দিকে তাকিয়ে থেকে কী যেনো খুজতেন, যখনই খুঁজে পেতেন, তখনই নৌকা থেকে গলা সমান পানিতে নেমে ঠেলা জাল দিয়ে ২ মিনিটের মাঝে অনেক মাছ ধরে ফেলতেন, দুই ঘন্টায় অনেক মাছ ধরে অর্ধেক বিক্রি করে বাকি অর্ধেক মামা নিয়ে আসতো বাসায়, সেই মাছ এক ঘন্টার ব্যবধানে চলে যেতো আমার পেটে, মামির হাতের রান্না করা সে মাছের স্বাদ আমার মুখে এখনো লেগে আছে, হয়তো আজীবন লেগে থাকবে। তারপর গ্রামের মানুষ যায় বাজারে/গঞ্জে। নৌকা দিয়ে, আহা! সেই নৌকা ভ্রমনের মতো সুন্দর কিছু আমার জীবনে খুব বেশি আসেনি। কিছুক্ষন পর পর শাপলা ফুল, কচুরিপনার মাঝ দিয়ে নৌকা চলে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে যেতাম, বাতাসে ভরে যেতো পুরো বুক, মাথার উপরের ঝলসানো রোদকে মলিন করে দিতো সে বাতাস, তখন নৌকার অন্য সবাই বলে উঠতো, বাবু বস বস পরে যাবা, আমি শুনেও না শোনার ভান করতাম। মাঝে মাঝে জেলেরা তাদের নৌকায় ভাড়ায় যাত্রী নিতো, এগুলোতে টাকা কম লাগতো কারণ এগুলোতে ইঞ্জিন ছিলো না, সময় বেশি লাগতো, মাঝে মাঝে মামা বাজার করে এইসব নৌকায় উঠতেন, এই নৌকা দিয়ে বাসায় ফেরাটা ছিলো আরো মধুর, ছোট নৌকা, দুলে দুলে যায়, হাত বাড়ালেই পানি ছোঁয়া যায়, পানিতে আঙ্গুল ডুবিয়ে নানা রকম খেলা করা যায়, চাইলে দুই একটা শাপলাও তুলে ফেলা যায়, সবচেয়ে বড়ো শান্তি-ইঞ্জিনের জন্ত্রনাদায়ক শব্দটা থাকে না, হাওরের মাঝখানে ভেজা বাতাসের ঝাপটায় দাঁড় বাওয়া বা পালতোলা নৌকায় বসে বসে শুধু দাঁড় বাওয়ার শব্দ আর পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দের যে ছন্দ বাজতে থাকে, সেই শব্দের মাঝে মোহগ্রস্থ হয়ে থাকার অনুভূতি খুব কম শহুরে মানুষ পেয়েছে বা পাবে। বাজার থেকে সবজি কিনে নিয়ে ফিরে আসতাম দুপুরের শেষে, রান্না করে খেতে খেতে প্রায় বিকেল, সন্ধার পর নামতো গাঢ় অন্ধকার, সাথে ঝিঝি পোকা, পানি আর বাতাসের শব্দের সাথে আকাশ ভরা নক্ষত্র নেমে আসতো পৃথিবীর বুকে। সন্ধ্যা নামার একটু পরেই পুরো গ্রাম ডুবে যেতো ঘুমে।
এই ছিলো আমার দেখা ভাটি অঞ্চল। হুমায়ূন আহমেদ ভাটি অঞ্চলের আরেকটি দিক দেখিয়েছেন, সেখানকার মানুষের কুসংস্কার, বিশ্বাস, সরলতা ফুটিয়ে তুলেছেন তার এই গল্পে। ভাটি অঞ্চলের মানুষরা আসলেই অনেক দিক দিয়ে পিছিয়ে আছে। আমার নানা বাড়ির সেই গ্রামে এখনো ৫ টি ছেলে/মেয়ে পাওয়া যাবে না, যারা স্নাতক পাশ।
এই গল্পে মনিরুজ্জামান কে সাপে কাটে এবং একদিনের ব্যবধানে লেখক মনিরুজ্জামানের ব্যক্তিগত জীবনের অনেক অনুভূতি, ভালোবাসা ফুটিয়ে তুলেছেন। অতি সাধারণ গ্রাম্য একজন মানুষের জীবনের চাওয়া-পাওয়া, আকাঙ্খা, প্রাপ্তি এবং জীবন মৃত্যুর সংযোগকে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন তার গল্পে।