'সেই সত্য যা রচিবে তুমি, ঘটে যা তা সব সত্য নহে। কবি, তব মনোভূমি রামের জনমস্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো। '- রবিঠাকুর
মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ ইব্রাহিমের স্মৃতিকথা 'ফেলে আসা দিনগুলো'। বইটির লেখক চল্লিশের দশকে অন্য বাঙালি মুসলমানের মতো পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে তার রাজনৈতিক সহকর্মী হিসেবে শাহ আজিজুর রহমান, ফজলুল কাদের চৌধুরী, শেখ মুজিবুর রহমানকে পেয়েছিলেন। যদিও মোহাম্মদ ইব্রাহিম নাজিমুদ্দীন উপদলের রাজনীতি করতেন। অন্যদিকে, শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সোহরাওয়ার্দীপন্থি। পাকিস্তান সৃষ্টির পর মুসলিম লীগের দখল চলে যায় নাজিমুদ্দীন উপদলের হাতে। একপ্রকার কোণঠাসা ও বিতাড়িত হয়ে সোহরাওয়ার্দীপন্থিরা প্রতিষ্ঠা করেন আওয়াম তথা জনগণের মুসলিম লীগ। যা পরবর্তীতে আওয়ামী নামধারণ করে।
কট্টর মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ ইব্রাহিম তার বিরোধীদের অনেকের তীব্র সমালোচনা করেছেন। পেরিয়েছেন শালীনতার সীমা। তবু নাজিমুদ্দীনের অনুসারী হয়েও শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উদার হৃদয়, কর্মীবান্ধব মানসিকতা ও মহত্ত্বের গুণগান গেয়েছেন।
খাজা নাজিমুদ্দীনকে বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা যথেষ্ট ঘৃণার চোখে দেখে। মোহাম্মদ ইব্রাহিমও স্বীকার করেছেন ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে ভাষা নিয়ে হঠাৎ বক্তব্য দেওয়া নাজিমুদ্দীনের উচিত হয়নি। এমনকি ইস্যুটি তখন আলোচনায় ছিল না। প্রধানমন্ত্রী নাজিম তার কথার মাধ্যমে ভাষার প্রশ্ন সামনে আনেন। শত দোষ সত্ত্বেও খাজা নাজিমুদ্দীন অত্যন্ত শরিফ আদমি ছিলেন তা উল্লেখ করেছেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম। তিনি নাজিমুদ্দীনকে নিয়ে লিখেছেন,
'মোহন মিয়া তখন প্রদেশ মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক। আমরা কয়েকজন মিলে তাঁর কাছে একদিন গেলাম কিছু ব্যবসায়িক সুবিধা পাওয়ার আশায়। তিনি আমাদের নিয়ে নাজিমুদ্দীন সাহেবের কাছে গেলেন। মোহন মিয়া খোলাখুলিভাবে তাঁকে বললেন, এসব ছেলেরা পাকিস্তান আন্দোলন করেছে। আন্দোলনের জন্য তাদের কেরিয়ারও অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এখন সময় এসেছে এদের জন্য আমাদের কিছু করার। আমরা যদি এদের লাইসেন্স ইস্যু করি তবে এরা তা বেঁচে কিছু উপার্জন করতে পারবে। নাজিমুদ্দীন সাহেব সব শুনে বেশ কঠোর কণ্ঠেই বললেন, ‘হাম ইয়ে লোগোকো কাভি লাইসেন্স নেহি দেয়েঙ্গে। জো সহিমানোমে বিজনেস করতে হ্যায় স্রেফ উনহি লোগোকো লাইসেন্স মিলেগা। পলেটিক্যাল ওয়ার্ককারসকে লাইসেন্স দেনেকা মতবল হোগা কে উনহে চোর ও বদমাশ বানায়া যায়ে। হাম ইনহে বরবাদ করনা নেহি চাহতে হ্যায়। আগর ইয়ে সারকারী নকরী করনা চাহতে হ্যায় হাম নকরীকা বন্দোবস্ত কর দেয়েঙ্গে। হাম জানতে হ্যায় কে ইয়ে লোগ পাকিস্তানকো লিয়ে বহুত কাম কিয়া, মুসলিম লীগকে কহনে পর কোরবানী দি। হাম ইনকো ইজ্জত করতে হ্যায়। ইয়ে হামারা কউমকা সরমায়া হ্যায়। '
আইয়ুব খানের সমালোচক মোহাম্মদ ইব্রাহিম নিজের চোখের সামনে তার দল মুসলিম লীগকে ভেঙে তিন টুকরো হয়ে যেতে দেখেছেন। যদিও আইয়ুব কনভেনশন মুসলিম লীগের নেতা সবুর খান, ফজলুল কাদের চৌধুরী, ফরিদ আহমদের সাথে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।।
আওয়ামী লীগকে তিনি যতটা ঘৃণা করতেন তারচাইতে ঢের বেশি ঘৃণা করতেন শেখ মুজিবুর রহমানকে। ছয়দফা দাবি উত্থাপনের জন্য বইয়ের পাতায় পাতায় তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি বিষ উগড়ে দিয়েছেন।
একাত্তরে তার সুসম্পর্ক ছিল পাকিস্তানি হানাদারদের সাথে। তিনি একাত্তরের নিজের দালালির দীর্ঘ বিবরণ দিয়েছেন। সবুর খান, ফরিদ আহমদ ইত্যাদির সাথে মিলে পাকিস্তানি হানাদারদের 'হাত থেকে' কত বাঙালির 'প্রাণ রক্ষা' করছেন তার বর্ণনা বইতে দিয়েছেন। বিশেষ করে তিনি কীভাবে অধ্যাপক আহমদ শরীফকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাত থেকে বাঁচিয়েছেন তা পড়ার মতোই ঘটনা। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ পরবর্তীতে মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে একখানা বই উৎসর্গ করেন অধ্যাপক আহমদ শরীফ।
পুরাে বইয়ের একবারও 'মুক্তিযুদ্ধ' ও 'মুক্তিযোদ্ধা' - শব্দদ্বয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সারা বইতে 'গেরিলা' হিসেবে উল্লেখ করেছেন! পাকিস্তানকে খেদমত করার লক্ষ্য একাত্তরের উপনির্বাচনে বিনা ভোটেই ফেনী থেকে এমএনএ নির্বাচিত হন। যদিও দেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ার কারণে একদিনের জন্যেও সংসদে তার বসা হয়নি।
ষোলোই ডিসেম্বরের পর বাংলাদেশের বিজয়ে দিশেহারা হয়ে যান মোহাম্মদ ইব্রাহিম, সবুর খান, শাহ আজিজুর রহমানের মতো পাকিস্তানি দালালেরা। বাইরে থাকলে মুক্তিযোদ্ধারা দালালদের খতম করে দেবে - এই ভয়ে জান বাঁচাতে তারা জেলে চলে যায়। জেলে গিয়েও অসুবিধা হয়নি। রাজার হালে ছিলেন। মোহাম্মদ ইব্রাহিমের আত্মীয় ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র সচিব। তাই সহজেই ডিভিশন পেয়ে যান। সেখানেই বাকি পাকিস্তানপন্থি যেমন: সবুর খান, শাহ আজিজ, ফজলুল কাদের চৌধুরী, অধ্যাপক হাসান জামান, সৈয়দ সাজ্জাদ প্রমুখের সাথে দেখা হয়। সরকার তখন সবকয়টি পাকিস্তানপন্থি দালালকে একসাথে রেখেছিল।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বেশিদিন কারাবন্দি থাকতে হয়নি মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে। ফেনীর আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। সেখানকার আওয়ামী লীগের এমপি এবিএম মূসা আদালতে নিজে এসে একাত্তরের দালাল মোহাম্মদ ইব্রাহিমের পক্ষ নেন। তাই খুব সহজেই মামলা ডিসমিস।
পাকিস্তানিদের গণহত্যাকে অস্বীকার করেছেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের গ্রহণ করেননি, প্রকাশ্যে দালালি করেছেন এবং তা সগর্বে পাতার পর পাতা জুড়ে লিখেছেন। তবুও পাকিস্তানপন্থি মোহাম্মদ ইব্রাহিমের বইটি পড়ুন। বিজয়ীর সব বয়ান সত্য হয় না। আবার, পরাজিত শক্তির সকল দাবি মিথ্যা নয়। প্রকৃত সত্য বুঝতে চাইলে দুটোই পড়া দরকার ও জানা উচিত।
মোহাম্মদ ইব্রাহিমের গদ্য অত্যন্ত ঝরঝরে। তিনি খুব ভালো করে জানেন ঘটনাকে কতখানি 'রঙ মিশিয়ে' বললে পাঠক আকৃষ্ট হবে। একবসায় পড়ার মতো বই মোহাম্মদ ইব্রাহিমের 'ফেলে আসা দিনগুলো'। যেখানে একজন স্বঘোষিত পাকিস্তানি দালাল নিজেকে উন্মোচিত করেছে।