'আমার ধারণা হল আমি বোবা মেয়ে বিয়ে করেছি এবং তার কর্তা বলেই আমাকে এসব কথা শুনিয়ে শুনিয়ে বলে। তখন থেকেই আমি নৃপেন কে ঘৃণা করতে আরম্ভ করলাম, মনে করতে লাগলাম, নৃপেন একটা বাজারের খানকি বিয়ে করেছে। একমাত্র খানকিরাই অত বেশি হাসে, কথা বলে এবং ভঙ্গি করে। প্রতিশোধ নেবার তীব্র ইচ্ছে মনের ভেতর ফণা করে জেগে উঠত। কিন্তু আমার ইচ্ছে অনিচ্ছের কতটুকু দাম! প্রেম কিংবা ঘৃণার পক্ষে বিপক্ষে কিছু করার ক্ষমতা আমার ছিল না। '
বাবা-মায়ের ভিটেমাটি রক্ষার্থে একপ্রকার নিরুপায় হয়ে লেখক মোক্তার সাহেবের বোবা মেয়ে বিয়ে করেন। লেখকের বউ বোবা এতে তার প্রতি যে যথেষ্ঠ ঘৃণা রয়েছে তা কিন্তু নয়। তবে তারও ইচ্ছে হতো কিন্নরকণ্ঠের কোনো নারীর সঙ্গ লাভ, যার ভালোবাসা তাকে নিংড়ে দিবে। যার কণ্ঠের বাণী শ্রবণে হৃদয়খানি শীতল হয়ে যাবে।
'একরাতে বোবা স্ত্রীকে হারমোনিয়ামে গান গাওয়ার অক্লান্ত চেষ্টা করা দেখে লেখকের মায়া হয় স্ত্রীর প্রতি। ঊনসত্তরে আসাদের মৃত্যুর পর বাড়ির সামনে দিয়ে মিছিল চলে যাবার সময়,
'আচানক বোবা বউ জানালাসমান লাফিয়ে 'বাংলা' অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে উচ্চারণ করল। তার মুখ দিয়ে গলগল রক্ত বেরিয়ে আসে। তারপর মেঝেয় সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে থাকে। ভেতরে কী একটা বোধ হয় ছিড়ে গেছে। আমি মেঝের ছোপ ছোপ টাটকা লালরক্তের দিকে তাকাই, অচেতন বউটির দিকে তাকাই। মন ফুড়েঁই একটা প্রশ্ন জাগে __কোন রক্ত বেশি লাল। শহীদ আসাদের __না আমার বোবা বউয়ের?'
উপন্যাসটি মূলত ৬৯-এর গণ–অভ্যুত্থানের সামাজিক, পারিবারিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রচিত। মেদহীন ঝরঝরে বাক্যে সহজবোধ্য ভাষায় মাত্র ৩৮ পেজে 'ওঙ্কার' রুপক উপন্যাসটি রচিত হয়েছে।
হিন্দু-পুরাণ মতে, 'ওঙ্কার' শব্দের মানে হলো 'আদি ধ্বনি' বা সকল ধ্বনির মূল।
সামান্য ৩৮ পেজের উপন্যাসের মাহাত্ম্য যে কতটা সামান্য দুটি লাইন অনুধাবন করলেই বোঝা যায়,
"গোটা বাংলাদেশের এক প্রসব বেদনা ফড়িয়ে পড়েছে।
মানুষের বুকফাটা চিৎকারে ধ্বনিত হচ্ছে নবজন্মের আকুতি।"
বাংলা সাহিত্যে খুব স্বল্প পরিমাণে মেটাফোর রচিত হয়েছে। তার সিংহভাগ আবার কবিতায়। কিন্তু মেটাফরিকাল সফল উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে খুব কম রচিত হয়েছে। বিশ্বসাহিত্যে রূপকধর্মী উপন্যাস রয়েছে অঢেল। বাংলা সাহিত্যে শওকত ওসমানের 'কৃতদাসের হাসি' ও অন্যান্য উপন্যাস রচিত হয়েছে রুপক অর্থে।
'ওঙ্কার' উপন্যাস লেখার পেছনে লেখকের ব্যাক্তিগত জীবনে দারুণ একটা ঘটনা রয়েছে।
এই ঘটনার কথা হুমায়ূন আহমেদ বয়ান করেছেন। তাঁরা আনিস সাবেতের বোনের বিয়েতে কুমিল্লা গিয়েছিলেন। সেখানে আনিস সাবেত ছফা’র কোন একটি লেখার সমালোচনা করলে তিনি ভীষণ রকম খেপে যান। আনিস সাবেত তাঁর মতে অটল থাকার কারণে ছফা ঢাকার উদ্দেশ্যে রাতের বেলা ওঁদের ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। তখন রাত এত গড়িয়েছিল যে রাস্তায় কোন গাড়ি ছিল না। ফলে ছফা কাকা কুমিল্লা থেকে হেঁটে ঢাকা চলে এসেছিলেন। তাতে ছফা পা ফুলে গিয়েছিল। তাঁর জ্বর এসে গিয়েছিল। বেশকিছু দিন পর ভয়ে ভয়ে আনিস সাবেত ছফা কাকার কাছে ক্ষমা চাইতে গেলে তিনি বলেছিলেন, সারা রাস্তা হেঁটে আসার কারণে তাঁর মাথায় একটি উপন্যাসের ধারণা মাথায় এসে গিয়েছে। রাগ করে না এলে এ ধারণাটা আসত না। হুমায়ূন আহমেদের কথায় যে উপন্যাসের গল্পটি তাঁর মাথায় এসেছিল তার নাম ‘ওঙ্কার’।
আমার পড়া আহমদ ছফার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস 'ওঙ্কার'।
আহা ছফা! লেখার কি ভাব-ভঙ্গি!