নেভাদার এক র্যাঞ্চে বেড়াতে গিয়ে নতুন রহস্যের জালে জড়িয়ে গেল অয়ন-জিমি। প্রথম রাতেই আগুন লাগল গোলাঘরে, ওদের মাথায় বাড়ি দিয়ে পালিয়ে গেল এক মুখোশধারী লোক। বাধ্য হলো ওরা তদন্তে নামতে। জানল, পুরো র্যাঞ্চ জুড়ে চলছে পানির হাহাকার, আর তা নিয়েই নোংরা ষড়যন্ত্রে মেতেছে কেউ। সেই ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করতে গিয়ে মস্ত বিপদে পড়ল দু’বন্ধু। হাড়ে হাড়ে বুঝল, জল নিয়ে রহস্য মানেই জলের মত সোজা নয়। কখনও কখনও তা পাথরের চেয়েও কঠিন হতে পারে।
প্রায় পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর পর 'তিন গোয়েন্দা' সিরিজের সেই অতিপ্রিয় র্যাঞ্চ-কেন্দ্রিক রহস্য অ্যাডভেঞ্চারগুলির ('রেসের ঘোড়া', 'হারানো উপত্যকা', 'মৃত্যুখনি' ইত্যাদি) মতো একটা কিশোর রহস্যরোমাঞ্চ উপন্যাস পড়লাম; এবারে এসময়ের অতিপ্রিয় 'অয়ন-জিমি' সিরিজে, অয়ন-জিমিদের সঙ্গে নেভাদায় এক র্যাঞ্চে বেড়াতে গিয়ে জটিল রহস্যের মুখোমুখি হয়ে। ইসমাইল আরমানের আরামদায়ক সুলেখনিতে আর গল্পের মসৃণ গতিশীলতায় রকিব হাসানের সেই আশির দশকের ক্লাসিক তিন গোয়েন্দা কাহিনিগুলো পড়ার নস্টালজিক আনন্দ ও আমেজ পুরোপুরি আস্বাদন করা যায়, এ বইতেও তার বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম নেই।
বলা যায় এক নিঃশ্বাসেই একবসায় পড়ে শেষ করেছি অয়ন-জিমি সিরিজের সর্বশেষ প্রকাশিত কিশোর থ্রিলার 'জল টলমল'। কথাটা সিরিজের আগের দুর্দান্ত বইগুলোর ক্ষেত্রেও সমান ভাবে প্রযোজ্য, বলাই বাহুল্য। অতিরিক্ত জটিল কোনো ঘটনাক্রম নয়, সমাধানও যে একদম মাথা আউলায় দেয়ার মতো তাও বলা যাবে না, যদিও কালপ্রিটরা ঠিক কী কারণে এত কিছু ঘটাচ্ছিল সে উত্তর বেশ খানিকটা অপ্রত্যাশিতই ছিল... কিছুটা প্রেডিক্টেবল কিছুটা আনপ্রেডিক্টেবিলিটি আর অনেকটুকু বইয়ের ওয়েস্টার্ন ধাঁচের রোমাঞ্চকর র্যাঞ্চ-পাহাড়-জঙ্গল-বুনো প্রান্তর পরিবেশে অয়নদের রহস্য-অ্যাডভেঞ্চার সব মিলিয়ে গল্পটা অন্যরকম সুস্বাদু উপাদেয় করে তুলেছিল আমার কাছে। অবশ্য একথাটাও বোধকরি অসাধারণ সিরিজটির অধিকাংশ রহস্যকাহিনির ক্ষেত্রেই খাটে: বই থেকে বইতে রহস্য-কাঠামো, উপস্থাপন ও প্রেক্ষাপটের এতোটা ভিন্নতা তথা বৈচিত্র্য আমি তাবৎ বড় বড় লেখকের বড়দের জন্য লেখা দেশি-বিদেশি রহস্য-থ্রিলার সিরিজেও খুব কমই পেয়েছি। একারণে ১৭-১৮টা কাহিনি পরেও অয়ন-জিমি সিরিজ এখনো একেবারেই গতানুগতিক বা একঘেয়ে হয়ে পড়েনি, বরং উল্টোটাই, একটা বই শেষ করেই পরেরটা হাতে তুলে নেয়ায় একমুহূর্ত দেরি সয় না, লেখক নতুন কোন আবহে পরবর্তী রহস্যকে উপস্থাপন করবেন তা দেখার জন্য।
বইয়ের কমতির উল্লেখ করলে দুই প্রতিবেশি চিরশত্রু পরিবারে হুট করে কনভেনিয়েন্টলি প্রেম ভালোবাসা ঢুকে গিয়ে তা দিয়েই অসম্ভব একটা সমস্যার হিন্দি/বাংলা সিনেমা মার্কা বহুলপ্রচলিত "হ্যাপি এন্ডিং" সমাপ্তি একদম সস্তা দরের সমাধান হয়ে গেছে আমার মতে। জমজমাট একটা আগাগোড়া ইন্টারেস্টিং প্লটের বই তথা সিরিজে এধরনের ওভারইউজড পিওর ক্লিশে ব্যবহার খুবই অপছন্দ হয়েছে, যথেষ্ট বিরক্ত হয়েছি। এছাড়া ছোট্ট একটা কারেকশন হচ্ছে যেমনটা উল্লেখ আছে জল টলমল-এ প্রথম অয়নরা নেভাদায় আসেনি, তার আগে হ্যারোভিলের রহস্য পটভূমিও নেভাদা অঙ্গরাজ্যেই ছিল।
যাইহোক, বিরক্তিকর ক্লিশে টুকু উপেক্ষা করলে বাদবাকি পুরোটাই ক্ষীর। উপভোগ্যতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে এটা জেনে যে অয়ন-জিমিদের এবারের এই অ্যাডভেঞ্চারটি সম্পূর্ণ মৌলিক লেখা! বাংলাদেশে বসে একজন বাংলাদেশী লেখকের পক্ষে কী করে আমেরিকার নেভাদার পটভূমিতে এমন পাহাড়-প্রান্তর-ক্ষেত-খামারময় নিখাঁদ ওয়েস্টার্ন অ্যাটমোস্ফিয়ার অনায়াসসাধ্যতার সাথে লেখায় তুলে আনা সম্ভব, যা পাঠকের কল্পনার চোখে মুভির মতো ভিজুয়ালাইজ করতে বিন্দুমাত্র সমস্যা হয় না, আমার মাথাতেই আসে না। অবশ্য সম্ভবত এজন্যই আমি লেখক নই।
গত দুই সপ্তাহে মন্ত্রমুগ্ধের মতো একদম প্রথম থেকে একের পর এক একটানা ১৮টা কাহিনি পড়ে প্রকাশিত সকল অয়ন-জিমি গল্প-উপন্যাস জল টলমল-এর মাধ্যমে আজকে শেষ করে ফেলেছি। এইটা কিছু হইলো? আগামী উপন্যাস 'রহস্যবাড়ি' কবে বের হবে তাও জানা নেই... এখন আর কী পড়ব? অন্য কিছু তো পড়তে ইচ্ছা করতেছে না। ড্যাম ইট! এতো দ্রুত সব পড়ে শেষ করা উচিত হয় নাই।
এক শোয়াতে শেষ করে ফেললাম। মোটামুটি ঘন্টা দুয়েকের মত লাগলো। প্রথম অধ্যায়ে শুরু হয়ে শেষ অধ্যায়ে গিয়ে যবনিকা নামলো যে রহস্যের, সেটা বেশ আনপ্রেডিক্টেবলই ছিল। ওয়েস্টার্ন পরিবেশ, হালকা-পাতলা অ্যাকশন, অয়নের ম্যাকগাইভারসুলভ ইম্প্রোভাইজেশন, - সব মিলিয়ে বেশ উপভোগ্য ছিল কিশোরোপযোগী মৌলিক কিশোর থ্রিলার জল টলমল। আফসোস একটাই, পড়ার সময় মনে হয় 'বয়সটা যদি আর কয়েক বছর কম হতো!'
'জল টলমল' মূলত সেবা প্রকাশনীর অয়ন-জিমি সিরিজের একটা গল্প। গল্পের জনরা অবশ্যই গোয়েন্দা কাহিনী। কিশোর থ্রিলার হিসেবে অয়ন-জিমির বয়সও বেশ কম এটুকুও বোধগম্য।
কাহিনী-সংক্ষেপ
অয়ন আর জিমি দুই বন্ধু মূলত বেড়াতে যায় নেভাদার একটা র্যাঞ্চে। সেই র্যাঞ্চের মালিক অয়নের বাবার বন্ধু মিস্টার হারপার। পুরো বইয়ের ঘটনাটা এই র্যাঞ্চকে ঘিরেই। র্যাঞ্চে হঠাৎ করেই পানির মোটর নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পানির চরম অভাবের সৃষ্টি হয়। আবার পানির অভাবের সাথেই হঠাৎ করেই গোলাঘরে আগুন দেয় কেউ, সে রাতেই অয়ন জিমির মাথায় বাড়ি দিয়ে কেউ একজন পালিয়ে যায়।
তার মানে ঘটনা আসলে তিনটে- ১- অয়ন-জিমির মাথায় কেউ আঘাত করে পালিয়ে যায় ২- পুরো র্যাঞ্চে পানির চরম অভাব ৩- গোলাঘরে আগুন দেয় কেউ
এই তিন ঘটনার তদন্ত করতে শুরু করে দেয় অয়ন জিমি আর সুতার জট ছাড়াতে ছাড়াতে কেঁচো খুড়তে বের হয় কেউটে। সেটা কী? উত্তর জানতে হলে পড়তে হবে!
অন্যমত
বইয়ের প্লট হিসেবে এটা দুর্দান্ত একটা প্লট। তবে এই প্লটের ওপর আরো ভালভাবে গল্পটা লেখা যেত। বেশ কিছু জায়গাতে আমার মনে হয়েছে, লেখক লিখতে গিয়ে অনেক বেশি তাড়াহুড়ো করে ফেলেছেন। যেহেতু এটা একটা থ্রিলার গল্প, বেশ কিছু জায়গাতে আরো বেশি বর্ণনার দাবি ছিল। এতে গল্পটা জমে উঠত। কিন্তু লেখক কেন জানি, ক্লাইম্যাক্সের জায়গাগুলোতেও অনেক বেশি সাদামাটা বর্ণনা দিয়েছেন। যারা অহেতুক বর্ণনার চাইতে কাহিনী পড়তে ভালবাসেন, তাঁদের অবশ্যি খুব বেশি সমস্যা হবে না। বরং খুশিই হবেন!
বইটা পরিসরে খুবই ছোট। যে কেউ চাইলে একদিনে পড়ে ফেলতে পারেন। কিন্তু লেখার ধরণ একটু বেশিই কিশোরসুলভ , লেখক আরো ভালভাবে লিখতে পারতেন!