পরিবহন ধর্মঘটে শহরে আটকা পড়লো মঞ্জু। এয়ার কন্ডিশন্ড ওই বাস কাউন্টারে কাকতালীয়ভাবে দেখা হয়ে গেলো প্রিয়ন্তির সঙ্গে। গল্পে গল্পে ওরা ফিরে গেলো ঠিক বাইশটি বছর পেছনে। কি ছিল ওদের অতীতে? জানতে হলে বসে পড়ুন উপন্যাসটি হাতে নিয়ে। মঞ্জু আর প্রিয়ন্তির সঙ্গে ঘুরে আসুন ওদের অতীতে। বন্ধুত্ব, বিচ্ছেদ, সমাজের বাঁধা-ধরা নিয়মগুলোর আড়ালে গড়ে ওঠা এক গল্পের মাঝে হারিয়ে যান নিজের অজান্তেই। সেই গল্প প্রণয় নাকি বিচ্ছেদের? উত্তর রয়ে গেলো বইয়ের পাতায়...
প্রকাশনী কর্তৃক বইটিকে রোমান্টিক জনরাতে ফেলা হয়েছে, আমি রোমান্টিক জনরা খুব একটা পছন্দ করি না। এই জনরার নাম শুনলেই সবার আগে লুতুপুতু টাইপ প্রেমের গল্পের কথা মাথায় আসে। কিন্তু, এরপরও বইটি কিনেছিলাম মূলত মুর্তজা সাদের লেখা কেমন তা জানার আগ্রহের কারণে। আমার এক পরিচিতজন উনার তুমুল প্রশংসা করেছিলেন এককালে।
মঞ্জু আর প্রিয়ন্তি বাস টার্মিনালে আটকা পড়ে যায় পরিবহন ধর্মঘটের কারণে। প্রায় বাইশ বছর পর ওদের দেখা হওয়াতে মঞ্জু স্মৃতির অতলে ডুব দেয়৷ ভেসে বেড়ায় ওর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দিনগুলোয়। গল্পটা কি শুধু মঞ্জু আর প্রিয়ন্তির? আর ওদের ব্যর্থ প্রেমের? না, আসলে এটাকে সামাজিক উপন্যাসের কাতারে ফেললেই ভালো হয়৷ এ উপন্যাস মঞ্জু, বাবলু, আনিস, রুবি আর প্রিয়ন্তি….এই পাঁচজন যুবক-যুবতীকে নিয়ে৷ মঞ্জু আর প্রিয়ন্তির মধ্যকার রসায়নকে গৌণ অংশ বলার সুযোগ নেই, কিন্তু কোনোভাবেই সেটাকে উপন্যাসের প্রধান বিষয়বস্তুও বলা যাবে না। বরং, এ উপন্যাসে আনিস আর মিলির মধ্যকার প্রেম যতোটুকু অংশ জুড়ে ছিল….মঞ্জু আর প্রিয়ন্তিও ঠিক ততোটুকুই জুড়ে ছিল৷ পুরো উপন্যাসে এ দুজনের মধ্যে সংলাপও আছে বা কতোগুলো? বেশি না, একদম কম। তাই এটাকে কেউই লুতুপুতু মার্কা প্রেমের উপন্যাসের কাতারে ফেলতে পারবেন না। কোনো ন্যাকাবোকা সংলাপ নেই, আবেগের অতিশয্য নেই...কিছুই নেই।
গল্পটা আহামরি তেমন কিছু না। অন্য দশটা গল্পের মতোই বন্ধুত্বের গল্প, প্রেমের গল্প। হালকা একটা আলাদা দিক তুলতে গেলে বলতে হয়, প্রিয়ন্তি মঞ্জুর থেকে দুই বছরের সিনিওর ছিল। এবং, এর কারণেই ওরা কখনো কাছে আসতে পারে নি৷ মঞ্জুর প্রেমে পড়েছে না, মঞ্জুর প্রতি স্নেহসুলভ একটা আকর্ষণ বোধ করছে…সেটা বুঝতেই প্রিয়ন্তির অনেকখানি সময় লেগে যায়। আর মঞ্জু সবসময় নিজেকে দূরে রেখেছে এই অসম প্রেমের পরিণতি কি তা জানতো বলে। এই কনফিউশন উপন্যাসের একটা সুন্দর দিক।
বাকি সব কৃতিত্বই লেখকের লেখনীর। মঞ্চনাটক, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ছাত্রদের নানা সমস্যা, ছাত্র রাজনৈতিকদের ভালো মন্দ, রুবির বিয়ের অনুষ্ঠান, সবকিছু দারুণ দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তোলেছেন। মুর্তজা সাদের আগের কোনো বই পড়া না থাকায় উনার উন্নতি যাচাই করা আমার পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু এ বইয়ে উনি দারুণ কাজ করেছেন। বর্ণনাভঙ্গি অসাধারণ বললেও কম হয়ে যায়। উপন্যাসের প্রথম অধ্যায় পড়েই উনার গদ্যে মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম, এতো ডিটেইলস বর্ণনা করেছেন যে সবকিছুই ভিজুয়ালাইজ করা যাচ্ছিল, সিনেমার মতো। পরবর্তীতে এই গদ্য উপন্যাসের কিছু জায়গায় হালকা দুর্বল হয়ে গেছে, কিছু জায়গায় আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে। সামগ্রিক বিবেচনায়, বেশ ভালো। লেখক সংলাপে আরেকটু জোর দিতে পারেন সামনের লেখাগুলোয়। সজীবতা আছে সংলাপে, কিন্তু উন্নতিরও জায়গা আছে যথেষ্ট। আর আরেকটা ভালো দিক হচ্ছে, সাদ ভাই গল্পের খেই হারান নি। দারুণ শুরু করে মাঝখানে গিয়ে আটকে যান নি উনি, পুরো উপন্যাসই সাবলীলতার সাথে লিখে গেছেন।
আমি এই বই থেকে অনেক কিছু পেলাম, নিজে মঞ্জু হয়ে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়িয়েছি। সাথে ছিল গায়ক বাবলু, প্রেমিক আনিস, ডানপিটে রুবি আর সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রেমী প্রিয়ন্তি।এতো কিছু বিশ্লেষণ করেও লাভ নেই। উপন্যাসটা যে আমার দারুণ লেগেছে আর মঞ্জুদের ভুলে যেতে আমার বেশ সময় লাগবে….এই দুটো জিনিসই যথেষ্ট পাঠ-প্রতিক্রিয়া হিসেবে৷
আর মুর্তজা সাদ ভাইও কিছু অবশ্যই পাবেন এ বই থেকে, এ বই যে পড়বে সে এখানাকে আর যাই হোক অন্তত খারাপ বলতে পারবে না...উনার লেখনীর দিকেও সহজে আঙুল তোলা যাবে না। যে পরিমাণ যত্ন সহকারে এ বই তিনি লিখেছেন, তাতে এ জিনিস উনার প্রাপ্যই ছিল।
সাদ ভাই, শুভ কামনা রইলো আপনার প্রতি। পরবর্তী উপন্যাসের জন্য অপেক্ষায় থাকলাম! নতুন লেখকরা আমাকে মুগ্ধ করে না তেমনটা, অপরিপক্কতা খুব বেশি চোখে পড়ে। কিন্তু আপনি অবাক করে ছেড়েছেন। এটাও বা কম কিসে! শুধুমাত্র এ জিনিসের জন্য রেটিং দেয়ার সুযোগ থাকলে আমি দশ তারা দিতেও কার্পণ্য করতাম না।
হাইলি রেকমেন্ডেড! বিশেষত যারা পুচুপুচু বাবু মার্কার বাইরে রোমান্টিক জন্রা খুঁজছে তাদের জন্য। ক্যাম্পাস লাইফের নস্টালজিয়ার সাথে ক্যাম্পাস লাইফে ফেলে আসা প্রেম। এতো ভালো বই অনেক দিন পড়িনি!
লেখকের লেখার ভঙ্গিতে ধ্রুপদী ছন্দ আছে, শব্দের কারুকার্য আছে কিন্তু জড়তা নাই। ‘প্রিয়ন্তি’ নামটা বাদে আমার পুরো বইটাই পছন্দ। প্রিয়ন্তি নামটা খুব ক্লিশে লাগছিল, এতো সুন্দর লেখা আর গল্পের সাথে যেন যাচ্ছিল না।
টাকা, এনার্জি, সময় সবই নষ্ট । দুই তিনটা সিক্যয়েন্স যদিও ভালো লেগেছে। একটা কাহিনীর আগানোর সময় এতো লম্বা করা হয়েছে মানে চুইংগামও এতো লম্বা হবে না। চটপটি চামচ দিয়ে খাচ্ছে বোধহয় ৫ ৬ বার, রিকশা আড়াল হবার কথা ৪ ৫ বার আর একটা সিকোয়েন্স আগানোর সময় হুট করে নিজের দর্শন কপচানো। লুতুপুতু মার্কার প্রেম না হলেও অতিরিক্ত বর্ণনা করা হয়েছে বইটা। মঞ্জু আর ওর বাবার সিকোয়েন্স আর নাটকের সিকোয়েন্সটাই ভালো আর আনিসের পরিণতি যদিও নিব্বি একটার সাথে প্রেমে ছিলো। বইটাকে ক্লাসিক ধরা হচ্ছে। বোধহয় আমারই দোষ ক্লাসিক চিনতে পারলাম না।
প্রচ্ছদ আর নাম দেখে যা মনে হয় গল্পটা ঠিক তাই। বাইশ বছর পর হঠাৎ করেই দেখা হয় মঞ্জু আর প্রিয়ন্তির। এরপর বাকি সময়টা তাদের কাটে নিজেদের মনের মধ্যে পুরনো স্মৃতি মনে করে।
সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে, প্রথমবারের মত নিজেদের বাড়ির নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে একসাথে জীবনকে চিনতে শুরু করে মঞ্জু, আনিস, বাবলু আর রুবি। সেই জীবনে পড়ার চাপ, অভাব অনটন, টিকে থাকার যুদ্ধ, খুনসুটি, প্রেম, বিয়ে, হাসি-কান্না সব আছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রায় প্রতিটা দিক সুন্দর করে অল্প কথায় বলা। সংস্কৃতির চর্চা থেকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কিছুই বাদ নেই। স্কুল কলেজের ছোট ছোট ছেলে মেয়েগুলোর নিজে থেকে বড় হয়ে যাওয়ার, পারিবারিক দায়িত্ব আর সামাজিক চাপকে মেনে নিয়ে আগানোর গল্প। সেই গল্পে সমাজকে খুশি করতে গিয়েই অনেকে ভিলেন হয়ে যায় সমাজের আর কাছের মানুষদের চোখে। অনেক কুখ্যাত ভিলেন আবার চোখের সামনে নিজের মনুষ্যত্বের পরিচয় দিয়ে নীরবে আমাদের ধারণা ভুল প্রমাণ করে।
লেখাটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবরণে মনে হচ্ছিল নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছি। যদিও অঞ্চলগুলো বোধহয় অস্পষ্ট রাখা হয়েছে ইচ্ছা করেই। লেখায় অদ্ভুত একটা ব���যাপার ছিল, যখন যে অংশটুকু পড়ছিলাম শুধু সেটুকুর মধ্যেই ডুবে ছিলাম। একবারো মনে হয়নি যে - একবার স্মৃতি, একবার বর্তমানে যাচ্ছি - ব্যাপারটা খাপছাড়া হয়ে যাচ্ছে। লেখার মধ্যে আবেগ অনুভূতি শুধু গল্পে না, প্রতিটা বাক্যেই ছিল। লেখার মধ্যে লেখকের সাহিত্যিক প্রতিভার যথেষ্ট পরিচয় আছে। প্রথমদিকে অনেক স্লো মনে হচ্ছিল। আবার কিছু অংশ মনে হয়েছে আরো বড় হলে ভালো লাগতো- পহেলা বৈশাখ, রুবির না বলা কথা, আনিসের বাসা, মিতুর হলে আসা... আর শেষটায় বাস ছেড়ে দিবে এজন্যই কী এত জলদি সব শেষ? তবে শেষ দশ মিনিট ভিন্ন কিছু হলে বেশি ভালো লাগতো।
খুবই গুরুত্বপূর্ণ দুইটা কথা। ১. আমার রোমান্টিক / ট্র্যাজেডি গল্প পছন্দ না। ২. নিজে কাঠখোট্টা স্বভাবের হওয়ার কারণেই বোধহয় গল্প পড়তে গিয়ে যদি কাহিনী বা তথ্যের চেয়ে বেশি আবেগ, অনুভূতি, সাহিত্যগুণ প্রকাশ পায় তাহলে আগ্রহ হারিয়ে ফেলি।
এই দুইটা কারণে বোধ হয় ঠিকমতো কিছু প্রকাশ করতে পারলাম না। এখানে শুধু বাক্যের আবেগ না, গল্পের আবেগ বেশি ছিল। সেকারণে শেষ পর্যন্ত ভালো লেগেছে বইটা। কিংবা হয়তো অনেক কিছু নিজের জীবনের সাথে অনেক কিছু মেলাতে পেরেছি বলে ভালো লেগেছে। শুধু ঠিকমতো বলতে পারলাম না।
গল্পটা, পরিবহন ধর্মঘটের কারণে বাস টার্মিনালে আটকে পড়া মন্জু আর প্রিয়ন্তির। প্রায় বাইশ বছর পর যাদের দেখা হয়। মনে পড়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দিনগুলোর কথা। মনে পড়ে আনিস, বাবলু, রুবির কথা। বন্ধুত্ব, বিচ্ছেদ, সমাজের বাঁধা-ধরা নিয়মের আড়ালে গড়ে ওঠা কিছু জীবনের গল্প।
** নিজস্ব অভিমত: -------------------------- লেখক এত সুন্দর করে জীবন্ত একটা চিত্র চোখের সামনে তুলে ধরেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের চিত্র, টং দোকানের আড্ডা, মন্চ নাটক, ছাত্র রাজনীতি, সবাই মিলে বন্ধুর বিয়েতে যাওয়া, বন্ধুর অসুস্থ হওয়া, চিকিৎসা, সব কিছু মিলে এমন একটা পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিলমনে হচ্ছিল আমি ওদের সাথেই আছি, ওদের ক্যাম্পাসে আছি, ওদের পাশে। প্রতিটা ঘটনা যেন নিজের চোখের সামনে ঘটতেছিল, উপন্যাসটা শেষ হওয়া পর্যন্ত কেন একটা ঘোরের মদ্ধ্যে চলে গিয়েছিলাম।
অসংখ্য ধন্যবাদ লেখক #মুর্তজা_সাদ, সত্যি অসাধারণ লেগেছে উপন্যাস টি। মজার কিছু খাওয়ার পর যেমন ঔজিনিসের মজা অনেক দিন মুখে লেগে থাকে, ঠিক তেমনি আপনার লেখা মনে থাকবে আমার। ভবিষ্যতে আরো লেখা পাওয়ার অপেক্ষায় রইলাম।
বইয়ের নামঃ বাইশ বছর পরে লেখকঃ মুর্তজা সাদ প্রকাশনীঃ সতীর্থ প্রকাশনা মুদ্রিত মূল্যঃ ৩১০ টাকা ধরনঃ রোমান্টিক উপন্যাস রেটিংঃ ৪.৪/৫
"এই বাইশ বছরে কত কী পরিবর্তন হলো। জীবনের মোড়ে মোড়ে কত গল্প লেখা হলো,অথচ পেছনে ফিরে তাকানো হলো না। অথচ আজ এই মুহূর্তে, শহরের এক কোণে আলিসান এক টুকরো ঘরে অতীত নতুন হয়ে ফিরপ এসেছে বর্তমানে। স্মৃতির প্রদীপখানা নিভু নিভু জ্বলছে। খুলে গিয়েছে স্মৃতির পুরোনে দরজা। সেই দরজা গলে ঢুকে পড়তে ইচ্ছা করছে মঞ্জুর। অথচ ও তো....." — বাইশ বছর পরে, মুর্তজা সাদ
সারসংক্ষেপঃ ———————— বর্তমান সময়কার কম বেশি সব গল্প শুরু-শেষ হয় ডিজিটাল মাধ্যমে বলতে গেলে। খুব কম ই পাওয়া যায় সেকাল ভাব গুলো। কিন্তুু আমরা মানুষ জাতি এতো এতো সুযোগ সুবিধা আর সহজ যোগাযোগ মাধ্যমের মধ্যে ও মনের কোন এক কোণে সেকাল এর অনুভব ঠিক ই পেতে চাই৷ তাদের জন্য এই উপন্যাস পড়া বাধ্যতামূলক বলে মনে করি।
উপন্যাস টিতে আছে মঞ্জু। ভার্সিটি প্রথম বর্ষে পড়া ছাত্র। অতি মাত্রায় ঘরকুনো, নিজের মধ্যে বসবাস করা ছেলে মঞ্জু। আরও আছে প্রিয়ন্তী। থিয়েটারের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা, আবৃত্তি করা, মিশুক স্বভাবের মেয়ে প্রিয়ন্তুী। এছাড়াও আছে আনিস,বাবলু,রুবি।
গল্পটি শুরু হয় বাস ধর্মঘটের মাঝে আটকে পড়া মঞ্জু কে দিয়ে। যার হুট করে এই ব্যস্তশহরের ছোট্ট একটি এয়ার কন্ডিশনের রুমে দেখা হয় এক টুকরো অতীতের সাথে। যে অতীত তার বর্তমান জীবনের কোথাও না কোথা হয়তো এখন ও বিরাজ করে। ঐ এক টুকরো অতীত আর কেউ নয় প্রিয়ন্তী। প্রিয়ন্তী কে দেখার সাথে সাথে মঞ্জু মনের কোনো কণে লুকিয়ে থাকা স্মৃতি গুলো আবার বের হওয়ার জন্য জেদ ধরে। আর মঞ্জু সেই ছোট কামড়ায় বসে থেকে পাড়ি বাইশ বছর আগের ক্যাম্পাসের দিনগুলো তে। যে দিন গুলোতে হাসি, কান্না,বিষন্নতা, একাকীত্ব, বন্ধুত্ব, ভালো লাগা, ভালোবাসা, ছুটে চলা ইত্যাদি মিশ্র অনেক অনুভূতি বিরাজ করত। মঞ্জু ছুটে গেল আবার তার বাবলু, আনিস, রুবিদের কাছে। ছুটে গেল সে নব্বই দশকের প্রথম দিকে। আচ্ছা, মঞ্জু কি তার স্মতির পাতায় রয়ে যাওয়া সবকিছু বাইশ বছর পরে ও মনে রাখতে পেরেছে? কি হবে সামনে আবার সেই অতীত কে সামনে দেখে? মঞ্জু আর প্রিয়ন্তী কি অতীত কে আঁকড়ে ধরে বাকি জীবন পার করবে নাকি অজানা ভবিষ্যতে যে যার মতো যাত্রা দিবে? এসব কিছু জানার জন্য অবশ্যই বইটা পড়তে হবে।
পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ ————————— "নব্বই দশক " ব্যাপার টা আমাদের জেনারেশনের জন্য অনেক বেশি এস্থেটিক। নব্বই দশকের ছোট থেকে ছোট বিষয় আমাদের কাছে অনেক বেশি এস্থেটিক বলে মনে হয়৷ হোক তা পুরাতন একটি পৃষ্ঠা, হোক তা নষ্ট টেলিফোন। সে ক্ষেত্রে নব্বই দশকের অনুভব দেওয়া আস্ত একটা বই পড়তে সবার ভালো লাগবে আশা করি।
যাই হোক, বইয়ের কথা কি বলব। আমার মিশ্র অনুভতি। বইটা পড়ার সময় আমার বার বার মনে হচ্ছিল এই উপন্যাস টা মুভি বা নাটক হিসেবে দেখতে পারলে অনেক ভালো হতো। আমার কাছে মনে হতো রোমান্টিক ধাচের উপন্যাস গুলো ফিল করার জিনিস এগুলো পর্দায় দেখলে আমি বিরক্ত হবো। কিন্তু এই উপন্যাস টা আমার পর্দায় দেখার ইচ্ছা । বর্তমান যুগের মাখামাখি রোমান্টিক তা এর মধ্যে মোটেও নেই। কিন্তু অনুভব করার মতো বিষয় আছে। প্রকাশকের মতে এটা ক্লাসিক উপন্যাসের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এবং আমি ও একমত। ক্লাসিক উপন্যাসগুলোর অন্তর্ভুক্ত করা যায়। ঠিক সেরকম ভাবে। অনেক বিবরণ দিয়ে উপন্যাস টা লেখার চেষ্টা চালিয়েছেন লেখক। এবং সফল ও হয়েছেন। প্রতিটা দৃশ্যপট আর অনুভূতির বর্ণনা দেওয়া চেষ্টা পড়ার সময় চোখে পড়েছে আমার। এবং চেষ্টা সফল ও হয়েছে বলে মনে করি। কারণ আমি দৃশ্যপট গুলো কল্পনা করতে পেরেছি।
আমার কাছে ক্লাসিক উপন্যাস গুলো অনেক স্লো মনে হয়। যাতে ছোট থেকে ছোট বিষয়ের বর্ণনা দেওয়া থাকে। "বাইশ বছর পরে" ঠিক তেমন। যার কারণে আমার বিভিন্ন সময় পড়ার অনেক স্লো লেগেছে উপন্যাস টি।
উপন্যাসটিতে লেখক অনেক সুন্দর করে সে সময় কার ক্যাম্পাস রাজনীতি তুলে ধরেছেন। এবং নারীদের প্রতি দৃষ্টি ভঙ্গি,সব বাধ উপেক্ষা করে নারীরা কমবেশি কলেজ ভার্সিটি পড়া সব ই তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে।
আমার উপন্যাসের সবচেয়ে পছন্দের দিক হলো আনিস,বাবলু,মঞ্জুর বন্ধুত্ব। সে সময়কার ক্যাম্পাস জীবনের অকৃত্রিম বন্ধুত্ব পড়তে আমার অন্য রকম ভালো লাগে। লেখক বইটিতে সে রকম বন্ধুত্ব তু���ে ধরেছেন। এবং মেয়ে চরিত্র গুলো কে যথাসম্ভব আত্মবিশ্বাসী, চঞ্চল, অনেকটা সাবলম্বী ভাবে তুলে ধরেছেন।
এবার আসি, উপন্যাসের চরিত্র গুলোর দিকে। উপন্যাসটিতে মেইন চরিত্র মঞ্জু। ঘরকুনো, বই পড়ুয়া স্বভাবের। মঞ্জু র চরিত্রের সাথে আমি অনেক রিলেট করতে পারি।। তাই এই চরিত্র টা বেশি ভালো লেগেছে। প্রিয়ন্তীর চরিত্র টাকে আমি কেন জানো ঐভাবে ফিল করতে পারি নি। বাকি সবার চরিত্রের খুটিনাটি বইয়ে কমবেশি ব্যাখা করা ছিল। প্রিয়ন্তীর চরিত্র টা ঐভাবে ব্যাখ্যা হয় নি বলে মনে হলো। নাকি আমার চোখে পড়ে নি জানি না।।
বইটার খারাপ দিক বলার মতো যোগ্য ���মি নিজেকে মনে করি না। কারণ বর্তমান সময় এ অবস্থান করে ৯০ দশকের কিছু এতো বিবরণে লিখতে পারাটা আমার জন্য অনেক বড় কিছু মনে হয়। প্রথমে হয়েছিল "বেলা বোস রিটার্ন " ভার্সন। কিন্তু পুরোটা পড়ার তা বুঝলাম অনেক ভিন্ন। অতীতকে আকড়ে ধরে বসে থাকার চেয়ে অতীত কে মনে জায়গা দিয়ে নিজ পথে হেঁটে চলা জরুরি বইটা তে অনেকটা ফোকাস হয়েছে বলে মনে করি।। এরকম খুঁটিনাটি শিখার অনেক কিছু আছে বই টিতে। মাখামাখি ছাড়া ও রোমান্টিক উপন্যাস হয়, তার প্রমাণ। কিন্তু আমি আবার বলবো এই উপন্যাস টা পড়ার থেকে পর্দায় দেখতে আমি বেশি পছন্দ করব। লেখকে শুভকামনা।
পরিশেষে, বর্তমান সময়ে যারা সেকালের অনুভূতি পাবার মতো বই পড়তে চান। তাদের জন্য এই বইটি মাস্ট রিড।
পছন্দের লাইনঃ ————————— ★হঠাৎ করেই বড় হয়ে যাওয়া,জীবন যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করবার মতো মানসিকতা হয়তো ওদের কারোরই ছিল না। কলেজ পাশ করবার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করলেই একজন কিশোর কে সভ্য সমাজ যুবক হিসেবে ধরে নেয়। কিন্তু সদ্য মায়ের আঁচলের তল ছেড়ে বেরিয়ে আসা ছেলেটা রূপে যুবক হলে ও অনেক ক্ষেত্রেই কৈশোরকে ঠিক ঠিক বিদায় জানাতে পারে না,কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হয়৷
★বিষাদের একটা ধর্ম আছে। সে আপনা আপনি ই মিলিয়ে যায়। বিষাদ বুকে যে ক্ষত রেখে যায় তা মানুষকে শক্ত করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। কেউ তাতে মলম লাগাতে গেলেই যন্ত্রণা টের পাওয়া যায়।
★সময় বড় খারাপ জিনিস। কখন যে সময়ের স্রোতপ মানুষ নিজেকে ভেতর থেকে পরিবর্তন করে ফেলে তা সে নিজেও জানে না। টের পায় অনেক অনেক বছর পরে। যখন কালের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পুরেনো নিজেকে টিপে টিপে দেখে, তখন অবাক হয়ে নিজেকেই যেনো অচেনা লাগে। নিজেকেই প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়,"এই কে তুমি?"
★ঝিনুকের খোলসে প্রকৃতির আঁকা আলপনা দেখতে যতই ভালো লাগুক, ঝিনুকের নরম ল্যাতলেতে শরীরটা দেখে সেই ভালো লাগাটা সেভাবে কাজ করে না। এই সমাজের পরিবর্তন টা ঝিনুকের খোলসের মতোই। উপরে দেখতে ভালো লাগে,জীবন্ত রূপটা দেখলে আর মনে ধরে না।
★আমাকে দিয়ে ওসব হবে না। ইচ্ছা থাকলেও ভেজালে যাবার মতো সাহস আমার নেই। আমি বরং একজন বর্মণের সাহেবের জন্যে বসে আছি,যিনি আমার জন্য অপেক্ষায় আছেন— বিয়ের মঞ্চেও আমার আসার পথ চেয়ে বসে থাকবেন _ বাসর ঘরে গিয়ে তাকে বলবো,'আ্যই আ্যই, তোমাকে কোথায় যেনো দেখেছি?'
★আক্রোশ নাকি অভিমান? যাকে ভালোবাসা যায় তার উপর রাগ ফুটিয়ে তোলা যায়? আক্রোশে ফেটে পড়া যায়? না৷ তার জন্য শুধু অভিমান জন্মে।
★অপেক্ষা কখনো কখনো ভালো কিছু বয়ে আনে,কখনো কখনো খুব খারাপ।
★এ জীবনে অসংখ্য মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হলেও মঞ্জু অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো,যাদের প্রতি সত্যিকার অর্থে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত তাদের কাউকেই কখনো ওর কৃতজ্ঞতা জানানো হয়নি।
★আমাদের সব থেকে বড় ভুল হলো,আমরা নিজেদের ইচ্ছা, ভালো থাকা কিংবা ভালেবাসার থেকেও বেশি গুরুত্ব দেই আমাদের আশেপাশের মানুষ গুলোর ভালো থাকাকে। আমরা ভালো থাকার মুখোশ পড়ে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে চাই। নিজের ভালো থাকার চেয়ে সমাজের কাছে ভালো সাজা আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা, ভাবি নি সম্ভব হবে কোনোদিন। আগে ওকে বারবার দেখেছি লালরঙের শাড়িতে দালিম ফুলের মতো রাঙা; আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড়, আঁচল তুলেছে মাথায় দোলনচাঁপার মতো চিকনগৌর মুখখানি ঘিরে। মঞ্জুর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অব্যক্ত প্রেম সিনিয়র আপা প্রিয়ন্তি। পরিবহন ধর্মঘটের ফ্যাসাদে পরে বাস কাউন্টারে আটকা পড়েছে মঞ্জু। হঠাৎ চোখ পড়ল এক মহিলার দিকে। আর তাতেই হিম হয়ে গেল মঞ্জুর শরীর। কারণ সে আর কেউ নয়, ক্যাম্পাস জীবনের ভালোবাসা প্রিয়ন্তি। দুজনেই বেশ অবাক হয়ে গেলো। ঠিক বাইশটা বছর পর পরিবহন ধর্মঘটের সুবাদে দেখা ওদের। প্রায় দুই যুগ পর দেখা হওয়ায় মঞ্জু বারবার ফিরে গেলো ফেলে আসা সেই অতীতে, যা এত বছরে তার মনে পড়েনি। মূহুর্তেই যেন ফ্ল্যাশব্যাক আসতে শুরু করলো বাইশ বছর আগের ক্যাম্পাস জীবনের প্রথম দিন। গণরুমে ওঠা, আনিস নামের প্রথম বন্ধু, সিনিয়রদের অত্যাচার, সেমিস্টার পেরিয়ে দুই বন্ধু থেকে চার বন্ধুর দলে পরিণত হওয়া সব যেন চোখের সামনে ভেসে উঠছে মঞ্জুর। মঞ্জু-আনিস-বাবলু-রুবি হয়ে গেলো একটা গ্রুপ। পরম বন্ধু। সেই নব্বইয়ের দশকে ছেলেমেয়ের অবাধে চলাফেরা ছিল একরকম চোখ বড়ো করে দেখার মতো বিষয়। সেই সময়ে এক অসাধারণ বন্ধুত্ব গড়ে তোলে এরা। বাবলু গান ভালো গায়, আনিস টিউশনি করে আর মিতু নামক ক্লাস সেভেনে পড়া ছাত্রীর সাথে প্রেম করে, মঞ্জু লেখাপড়া নিয়ে থাকে। এই তাদের জীবন। এক বৃষ্টির দিনে মঞ্জুর হৃদয় ভাসিয়ে দেয় নীল শাড়ি পরা বৃষ্টিভেজা এক তরুণী। নাম প্রিয়ন্তি। ক্যাম্পাসের দুই বছর সিনিয়র। লুকিয়ে চুকিয়ে প্রিয়ন্তিকে দেখতে থাকে মঞ্জু আর এগিয়ে যেতে থাকে সময়। একদিন কথাও হয় তার সাথে। গাঢ় হতে থাকে চার বন্ধুর সম্পর্ক। আর মনে মনে মঞ্জু ধারণ করে বেড়ায় প্রিয়ন্তিকে। প্রিয়ন্তিও কি তাই? রুবির বিয়ে হয়ে যায়। কোথাও ঢিলে হয়ে যায় তাদের সাথে বাঁধন। শুধু ঠিক থাকে ক্লাসের শক্ত শিডিউল, পরীক্ষা আর ল্যাবগুলো। মাঝে দুঃসংবাদ বয়ে নিয়ে আসে আনিসের অসুস্থতা। মঞ্জু-বাবলু প্রাণপণ চেষ্টা করে আনিসের জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত? সময় চলে সময়ের গতিতে। অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে মঞ্জু ফিরে আসে বর্তমানের ধর্মঘটে। অপেক্ষা করে আর ভাবে এইতো ধর্মঘট শেষেই বাস ছেড়ে দিবে আর যে যার গন্তব্যে। আবারো হারিয়ে যাবে প্রিয়ন্তি। আর হয়তো দেখা হবে না। কিন্তু বিধাতা কী চায়? সময়ের স্রোতে মঞ্জু-আনিস-বাবলু-রুবি-প্রিয়ন্তি-মিতুদের কী ঘটেছিল? বর্তমানে সবাই কি সুখী নিজস্ব ভুবনে? অসম বয়সী ভালোবাসা কি কখনোই পরিণতি পায় না? পাঠ প্রতিক্রিয়া: গল্পটা সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া মঞ্জুর, গল্পটা আনিসের, বাবলুর, শেষ বর্ষে থাকা প্রিয়ন্তির, রুবির আবার মিতুরও। উপন্যাসের শুরুতেই ধর্মঘটের কারণে বাস চলাচল বন্ধ হওয়ায় আটকে যাওয়া মঞ্জুকে দেখা যায়। যার সাথে বাইশ বছর পর দেখা হয় ক্যাম্পাসের সিনিয়র প্রিয়ন্তির সাথে। এরই মাঝে বাইশ বছর আগের খন্ড খন্ড ঘটনা আর বর্তমানের দোলাচলে এগোতে থাকে। সমকালীন বই পড়তে পছন্দ করি কিন্তু প্রেমের বই আমি খুব বেশি ক্ষেত্রেই এড়িয়ে যাই। কারণ হিসেবে এখনের প্রেমের মধ্যে ❝বাবু খাইসো, রগরগে বর্ণনা, লুতুপুতু জাতীয় কথাবার্তা❞ এর আধিক্য প্রধান। এই বইটা শুরু করার আগে ভাবছিলাম রোমান্টিক জনরা যেহেতু এইসবের ছিটেফোঁটা হলেও থাকবে। বইটা উপহার দিয়েছিল একজন বড়লোক বইক্রেতা। তার ব্যক্তিগত বিশেষ পছন্দের বই এটি তাই। উপহার দিয়ে কয়েকদিন পরপরই টোকা মারতো বইটা পড়বেন কবে? আমি যথারীতি উত্তর দিতাম, ❝বাইশ বছর পরে❞। বাইশ বছর পার না হলেও ২০২২ সালেই পড়ে নিলাম। যা বলছিলাম, রোমান্টিক হলেও বইতে লুতুপুতু জাতীয় বর্ণনা একেবারেই ছিল না। মানব-মানবীর প্রেমের পবিত্র অংশেই লেখক বেশি ফোকাস করেছেন। আমার সবথেকে ভালো লেগেছে যে ব্যাপারটা সেটা হলো অতীতের ক্যাম্পাস জীবনের বর্ণনা। আমাকে বারবার আমার ফেলে আসা ক্যাম্পাস জীবনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। একবিংশ শতাব্দির মতো ছেলে-মেয়ে অবাধে চলাফেরা ছিল না নব্বইয়ের দশকে। বিশবিদ্যালয় পর্যন্ত একজন মেয়ের পড়াই ��িল বিশাল একটা ব্যাপার। সেখানে রুবির সাথে মঞ্জু-আনিস-বাবলুর বন্ধুত্বটা আমার খুবই ভালো লেগেছে। বর্তমান যুগের ফ্রেন্ডস উইথ বেনিফিট জাতীয় সম্পর্ক না। দারুণ বোঝাপোড়ার একটা সম্পর্ক, লোকদেখানো নয়। সে সময় থেকেই ক্যাম্পাসে সিনিয়রদের র্যাগ দেয়ার ব্যাপার, রাজনৈতিক ক্ষমতা খাটিয়ে সুবিধা নেয়া, মারামারির কারণে ক্লাস বন্ধ সবকিছুই সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। দুঃখের বর্ণনাগুলো পড়তে আসলেই খুব খারাপ লেগেছে। বিশেষ করে আনিসের পরিণতি। প্রিয়ন্তি-মঞ্জুর না বলা ভালোবাসা, বিয়ের পর রুবির ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন আসা সবকিছুই একদম চিরাচরিত ঘটনা। আমাদের আশেপাশেই ঘটে যাচ্ছে এরকম কত কিছু। শেষের দিকের বিস্বাদ লাগা একটা অবস্থা আর ধর্মঘট শেষ হয়ে বাইশ বছর পরের অনাকাঙ্ক্ষিত সেই মোলাকাতের ইতি টেনে লেখকও বইয়ের সমাপ্তি করেছেন আর পাঠকদের রেখেছেন আপনি ভেবে নিন শেষটা কী চান। বইতে কিছু সুন্দর উক্তি দিয়েছেন লেখক সেগুলো পড়তে খুব ভালো লেগেছে। গল্প প্লট, বর্ণনাভঙ্গি সবকিছু ভালো থাকার পরেও কিছু অসংগতি আমার কাছে লেগেছে। সেগুলো তুলে ধরছি, প্রিয়ন্তি-মঞ্জু চটপটি খেতে গেছে তখন চটপটি খাবার বর্ণনা লেখক দিয়েছেন এভাবে, ❝প্রিয়ন্তি চামচ দিয়ে চটপটি খাওয়া শুরু করলো❞, বইতে যে কয়বার এই চটপটি খাবার কথা এসেছে প্রতিবারেই চামচ দিয়ে খাওয়ার কথাটা বলা হয়েছে। আমার জানামতে চটপটি আমরা চামচ দিয়েই খাই, ছুরি দিয়ে না! প্রতিবার এই একই কথা পড়তে আমার ভালো লাগেনি। রিকশা থেকে নেমে আরেকজনের যাওয়া দেখতে থাকা যতক্ষণ সে মিলিয়ে না যায় এই একই কথাও বার কয়েক উল্লেখ ছিল। আর স্বাভাবিকভাবেই পড়তে আরাম লাগেনি। বর্তমানে বাবলুকে একেবারেই না আনায় বা তার কথা বর্তমানে উল্লেখ না করায় আমার কাছে পুরো বইটা পূর্ণতা পায়নি। স্মৃতিরোমন্থন যেহেতু করা হয়েছে সেটা ষোলো আনা আনলেই বেশি ভালো লাগতো। প্রেমের লুতুপুতু না থাকলেও আবেগ ছিল শতভাগ আর আবেগী কম হওয়ায় বেশিরভাগ আবেগী লাইন পড়তে আমার স্বাচ্ছন্দ কম লেগেছে। এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত হিসেবেই বলছি লেখকের লেখার কমতি হিসেবে বলিনি। সব মিলিয়ে একবার পড়েই ফেলা যায় বইটি।
সময় অপচয় করতে চাইলে পড়তে পারেন। নাম আর প্রচ্ছদের ফাদে পড়ে বই না কিনতেই সাজেস্ট করব। দেখে প্রে কাহিনি লাগলেও বিরক্তিকর ব্যাখায় শুধুমাত্র সাধারন ভার্সিটি লাইফের বিভিন্ন মজার ঘটনা উঠে এসেছে। খুব আহামরি কিছুনা।
বই : বাইশ বছর পরে লেখক : মুর্তজা সাদ প্রচ্ছদ : মুর্তজা সাদ, তাহমিদ রহমান ধরন : রোমান্টিক উপন্যাস প্রকাশনী : সতীর্থ পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১৭৬ মলাট মূল্য : ৩১০ টাকা প্রকাশকাল : ডিসেম্বর, ২০২০
মঞ্জু আড় চোখে প্রিয়ন্তিকে দেখে। প্রিয়ন্তি কাঁদছে। ঠোঁট দুটো চেপে কান্নার শব্দ আঁটকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। "আপনি কাঁদছেন?" কান্নায় প্রিয়ন্তির কণ্ঠ ভিজে গিয়েছে। ভেজা কণ্ঠেই ধমকে ওঠে, "চুপ! একদম চুপ!" মঞ্জু চুপ বনে গেলো। কিছুটা সময় রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর কি মনে করে আবার ফিরে তাকালো প্রিয়ন্তির দিকে। একটু সময় নিয়ে বাড়িয়ে দিলো ডান হাত। মুছে দিলো প্রিয়ন্তির গালে জমে থাকা নোনা জল। ছুঁয়ে দিলো প্রথমবারের মতো। থমকে গেলো প্রিয়ন্তি। কান্না বন্ধ করে মঞ্জুর দিকে তাকিয়ে রইলো অবাক দৃষ্টিতে। মঞ্জুর শক্ত হাতের ধাক্কায় খোঁপা খুলে গেলো। বেরিয়ে এলো এক গোছা চুল। সেই চুল উড়তে থাকলো বাতাসে। রিকশা চলতে থাকলো আপন গতিতে। জীবন চলতে থাকলো জীবনের মতো। সেই চক্রের মাঝে ভালোবাসা এলো, সেই ভালোবাসা টের পেল দুজনে, অথচ অদৃশ্য দেয়াল বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো ওদের মাঝে। বয়সের ব্যবধান ওদের মস্তিস্ক কুটে কুটে খেল, সমাজের ভয় দেখালো। সেই ভয়েই কিনা হাত সরিয়ে নিলো মঞ্জু। আবার স্বাভাবিক নিয়মে চলতে লাগলো সবকিছু, যেনো কিছুই হয়নি ওদের মাঝে, কিছুই হবার ছিল না!
রোমান্টিক জনরার গল্প বা উপন্যাসকে আমি আবার দু'ভাগে ভাগ করি। এক. লুতুপুতু রোমান্টিক এবং দুই. ম্যাচিউর রোমান্টিক। "বাইশ বছর পরে" এখানের দ্বিতীয়ভাগে পড়ে। অর্থাৎ এটা কোন ডিজিটাল প্রেমের উপন্যাস নয়। প্রকাশকের মতো করে আমিও এটিকে ক্লাসিক উপন্যাসের কাতারেই ফেলবো।
"বাইশ বছর পরে" লেখক মুর্তজা সাদ'র তৃতীয় বই এবং দ্বিতীয় উপন্যাস। রোমান্টিক জনরার উপন্যাসটি মূলত তারই লেখা একটি ছোট গল্পের বিস্তারিত ভার্সন। নবীন লেখক হিসেবে বলতে হবে খুবই ভালো লিখেছেন। পাবলিক ভার্সিটি লাইফ কেমন হয় সে সম্পর্কে কিছুটা ধারণা থাকলেও নিজে কখনো পাইনি। কিন্তু বইটা পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিলো গল্পের ক্যাম্পাস লাইফটা আমারই; গল্পের নায়কটা বুঝি আমিই। ঘটনাগুলো সব যেনো চোখের সামনেই ঘটছিলো।
মাঝারী সাইজের বইটার শুরু প্রসেনজিৎ রায়'র চমৎকার কবিতা দিয়ে। কবিতায় রয়েছে এই গল্পের সারমর্ম। রয়েছে জীবনপথে থমকে যাওয়া কিছু চরিত্রের না বলা কিছু কথা, কিছু প্রশ্ন, কিছু আহ্বান অথবা কিছু অভিমান!
মূলত নব্বইয়ের দশককে কেন্দ্র করে লেখক গল্প সাজিয়েছেন দারুণভাবে; যার মধ্যে কিছুটা বর্তমানের অস্তিত্বও রয়েছে। লেখকের মাত্র দ্বিতীয় উপন্যাস। কিন্তু লিখনীতে যথেষ্ট অভিজ্ঞতার ছাপ রেখেছেন।
গল্পটা কিছুটা এমন- পরিবহন ধর্মঘটে শহরে আটকা পড়ে মঞ্জু। এয়ার কন্ডিশন বাস কাউন্টারে কাকতালীয়ভাবে দেখা হয়ে গেলো প্রিয়ন্তির সাথে। গল্পে গল্পে ওরা ফিরে যায় ঠিক বাইশটি বছর পেছনে। ওদের অতীত জীবনে। ওদের চিরচেনা সেই ভার্সিটির ক্যাম্পাস জীবনে। সেখানে মঞ্জু-প্রিয়ন্তির সঙ্গে আরও ছিল আনিস-বাবলু আর রুবি। রুবি! আর ডি বর্মণ'র রুবি রায় নয়। শুধু রুবি, ওদের রুবি!
চলতে থাকে স্মৃতিচারণ। অতীত জীবনের সেই দুষ্টুমি, খুনসুটি, ভালো লাগা, ভালোবাসা, মান, অভিমানগুলো সব ছবি হয়ে চোখের সামনে আসতে থাকে একে একে। ওদের চিরচেনা সেই নদীর পাড়, সেই কুকুরটা, মন্টুর দোকানের চা, থিয়েটারে অভিনয়, ছাত্রীর সাথে আনিসের প্রেম সব কিছু। আর প্রিয়ন্তি! সে রয়েছে মঞ্জুর ভাবনাতে; বটতলার কবিতা আবৃত্তিতে, বৃষ্টিতে, পহেলা বৈশাখের পান্তা-ইলিশে!
এভাবেই চলতে থাকে মঞ্জু-প্রিয়ন্তির গল্প। এখানে ওঠা-নামা আছে, ভাঙা-গড়া আছে, হাসি-কান্না আছে, প্রেম আছে, বয়সের ব্যবধান আছে, সমাজের কটুকথা আছে! পাঠকরা পড়ার সময় কিছু জায়গায় খুব মজা পাবেন, হাসবেন। আবার কিছু জায়গায় খুব মন খারাপ হবে। গল্প নিয়ে হতাশ বা ক্লান্ত হওয়ার কোন সুযোগ লেখক দেননি। অল্প কয়েকটা চরিত্র নিয়ে গল্প ফুটিয়ে তুলেছেন বেশ। বক্তব্য উপস্থাপনও করেছেন খুব সুন্দরভাবে। সবমিলে উপন্যাসটা এক কথায় দারুণ।
গল্পের কিছু চুম্বক লাইন- ==> বিষাদের একটা ধর্ম আছে। সে আপনা আপনিই মিলিয়ে যায়। বিষাদ বুকে যে ক্ষত রেখে যায় তা মানুষকে করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। কেউ তাতে মলম লাগাতে গেলেই যন্ত্রণা টের পাওয়া যায়। সেই যন্ত্রণা মানুষকে দুর্বল করে ধীরে ধীরে। ==> মন অনেক কিছুই চায়, কিন্তু বাস্তবে চলার পথে সেই চাওয়া পূরণের ঝুঁকি নেওয়া যায় না। ঝুঁকি নিলেই হোঁচট খাবার সম্ভবনা থাকে। সেই হোঁচটে মনে ক্ষত ধরে, সেই ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকতে হয় চিরজীবন। তবুও মানুষ মনের কথা শোনে, ভুল করে। ভুল করে ভোগে সারাজীবন। ==> অভ্যস্ততা মানুষকে খাপ খাইয়ে নেয়ার এক আশ্চর্য ক্ষমতা দেয়, আর অনভ্যস্ততা প্রতি মুহূর্তে তাকে একটু একটু করে মারে। ==> মানুষ যেখানে সম্মান পায়, যেখানে নিজের মতো পাখা মেলতে পারে সেখানেই নিজেকে দেখতে পছন্দ করে। ==> বয়সের পাল্লায় ভালোবাসা মাপা যায় না এটা ব্যক্তি ধারণা হলেও সমাজের চোখে বয়স একটা বিরাট চিন্তার বিষয়। ==> কোনো মানুষই খারাপ হতে চায় না। পরিস্থিতি তাকে খারাপ করে তোলে, আবার পরিস্থিতিই তাকে ভালো হওয়ার পথ দেখায়। ==> এই শহরে আসলে কেউ ভালো নেই। সবাই শুধু ভালো থাকার নাটক করে। সেই নাটক চলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। মৃত্যুর সাথে সাথে শেষ হয় নাটকের, শেষ হয় বিষাদের। ==> আমাদের সব থেকে বড় ভুল হলো, আমরা নিজেদের ইচ্ছা, ভালো লাগা কিংবা ভালোবাসার থেকেও বেশি গুরুত্ব দেই আমাদের আশেপাশের মানুষগুলোর ভালো থাকাকে। আমরা ভালো থাকার মুখোশ পরে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে চাই। নিজের ভালো থাকার চেয়ে সমাজের কাছে ভালো সাজা আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই ভণিতা আজীবন চলছে, চলবে।
প্রচ্ছদ! বইয়ের লেখক ও প্রকাশক মিলে চমৎকার একটা প্রচ্ছদ বানিয়েছেন। চোখ জুড়ানোর মতো। প্রিয় মানুষটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার মতো। এর জন্য বাহবা দিতেই হচ্ছে। তবে এখানে প্রিয়ন্তির কপালে লাল টিপের পরিবর্তে কালো টিপ দিলে ভালো হতো। কারণ গল্পে মঞ্জু যখন প্রথম প্রিয়ন্তিকে দেখে তখন সে নীল শাড়িতে ছিল, আর কপালে ছিল কালো টিপ।
এই এতোসব মিলেই "বাইশ বছর পরে"। আর এতোসব মিলেই বইটা চমৎকার। ব্যক্তিগত পছন্দের বইয়ের তালিকায় তালিকাভুক্ত করে নিয়েছি "বাইশ বছর পরে"। বইটা সবাইকে পড়ার আহ্বান জানাবো।
আরেকটা মজার বিষয়, লেখকের উৎসর্গপত্র। সাধারণত দেখি লেখকরা বই উৎসর্গ করে মা-বাবা, ভাই-বোন বা পরিচিত শুভাকাঙ্ক্ষীদের। কিন্তু মুর্তজা সাদ ভাই বইটা উৎসর্গ করেছেন তার কল্পনার সঙ্গিনীকে। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ সঙ্গিনীকে। ব্যাপারটা মজার লেগেছে। লেখকের পরবর্তী বই এবং উৎসর্গপত্রের কল্পনার সেই সঙ্গিনীর জন্য শুভকামনা।
#হ্যাপি_রিডিং
This entire review has been hidden because of spoilers.
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ শুরুর দিকে গল্পটা কেমন যেনো ধীর মনে হচ্ছিলো, ক্যারেক্টার বিল্ডিং এ বেশ সময় নিয়েছিল, পড়তে পড়তে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিলাম, তবে একটা সময় ইন্টারেস্টিং লাগা শুরু করল, ভার্সিটির বন্ধুত্ব গুলো খুব ভালোভাবে পরিবেশন করেছে লেখক৷ বন্ধুদের মাঝের খুঁনসুটি, রসিকতা, অভিমান সবই অনেক জীবন্ত ছিল। পাশাপাশি ভার্সিটির এক্টিভিটিজ গুলোও ফুটে উঠেছে। তবে চরিত্র গুলোর ডিটেইল পাচ্ছিলাম না বলে কেমন যেন লাগছিল, শেষের দিকে আস্তে আস্তে রুবি থেকে শুরু করে সবার ই পরিবার পরিজনের কথা উঠে এসেছে দেখে মনে প্রশান্তি পেয়েছি। প্রিয়ন্তী চরিত্রের স্টোরি টাইম কম লেগেছে আমার কাছে, ক্যারেক্টার টা আরো ডিটেইল হতে পারত হয়ত। গল্পে ওদের ভার্সিটি সহ বিভিন্ন জায়গায় যেসব বর্ণনা দেয়া হয়েছিল, ওগুলোর নির্দিষ্ট কোনো জায়গার নাম পেলাম না,নাকি আমি অমনোযোগী ছিলাম বুঝতে পারছি না। মঞ্জু চরিত্র টা ই গল্পের মেইন ক্যারেক্টার আর সেই ক্যারেক্টার যথাযথ ব্যাবহার করতে পেরেছেন লেখক। তার সাথে বাবলু ও আনিসের অবস্থান ও প্রশংসনীয়। কোনো মানুষ ই খারাপ হতে চায় না, পরিস্থিতি তাকে খারাপ করে তোলে, আবার পরিস্থিতি ই তাকে ভালো হতে পথ দেখায়, হানিফ চরিত্রের মত এমনই একটা চরিত্র আমি স্বচোক্ষে দেখেছি। গল্পের শেষের দিকে অনেক ট্রাজেডি, যেগুলো ভেতরে নাড়া দিয়ে গেছে বলা যায়। গল্পটার সমাপ্তি ও ছিলো বেশ পার্ফেক্ট। অতিরঞ্জিত রোমান্টিসিজম ছিল না, কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না, প্রয়োজনমত ব্যাখ্যা ছিল সব জায়গায়। সর্বোপরি তৃপ্তিদায়ক ছিল বইটা,অসাধারণ স্টোরিটেলিং।
ব্যাক্তিগত রেটিংঃ ৪/৫
কবরের মাটি অনেকটাই কমে এসেছে, মিশে গিয়েছে সমতলে। ঢিবির উচ্চতা কমার সঙ্গে সঙ্গে শোক কমে। এই ছোট্ট লাইনটা তে অনেক বড় উপলব্ধি, সত্য লুকায়িত।
বাইশ বছর পর হঠাৎ দেখা হয় মঞ্জু প্রিয়ন্তির। পরিবহন ধর্মঘটের কারণে ওরা আটকা পড়ে বাস কাউন্টারে। প্রিয়ন্তিকে দেখেই মঞ্জু ডুব দেয় সেই বাইশ বছর আগে, তার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে। জীবনে প্রথম নিজের পরিবার ছেড়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ওঠা, গণরুম, নতুন বন্ধুত্ব হওয়া, সিনিয়রদের কাছে র্যাগ খাওয়া, টং এর দোকান, বন্ধুরা মিলে দাপিয়ে বেড়ানো, পুরাতন বইয়ের দোকান ঘেটে বই কেনা, টিউশনি, এক বৃষ্টির দিনে প্রথম কাউকে ভাল লাগা- সবকিছুর সমন্বয় নিয়ে এই বইটি।
এই গল্পটা শুধু মঞ্জু আর প্রিয়ন্তির নয়, গল্পটা বন্ধুত্বেরও। এটাকে রমরমা প্রেমের উপন্যাস বলা যাবে না মোটেও। মঞ্জু, বাবলু, আনিস আর রুবি-মূলত এই চার জন বন্ধুর জীবন নিয়েই কাহিনী এগিয়েছে। প্রিয়ন্তি ছিল ওদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বছরের সিনিয়র। মঞ্জু আর প্রিয়ন্তির প্রণয়ের কথা বরং অনেক কমই আছে বইতে, আর সময়টা ছিল '৯০ দশক। জীবন ছিল সবকিছুতেই সীমিত, আর বয়সের অসমতা সহজ ছিল না। তাই দূর থেকেই প্রিয়ন্তিকে ভালবেসে গিয়েছে মঞ্জু, বাইশ বছর পরেও মঞ্জু বুঝতে পারে সেই অনুভূতিটা এখনো ঠিক আগের মতই আছে।
পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ
বরাবরই আমি '৯০ দশক নিয়ে লেখা বই পড়তে অনেক পছন্দ করি। এই দশকের ছোট ছোট বিষয়গুলো আমার কাছে বড় ভাল লাগে।
বইটা পড়তে গিয়ে যদিও মাঝে মাঝে মনে হয়েছিল অনেক ধীর গতির, তবুও শেষ পর্যন্ত বইটা আমার ভাল লেগেছে। লেখক এত সুন্দর করে সবকিছু বর্ণনা করেছেন যে মনে হয়েছে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি বিষয়গুলো। নিজেকে মনে হচ্ছিল মঞ্জুর বন্ধুদের দলেরই কেউ হয়ত।
বইয়ের নামঃ বাইশ বছর পরে লেখকঃ মুর্তজা সাদ প্রচ্ছদশিল্পীঃ মুর্তজা সাদ ও তাহমিদ রহমান জনরাঃ ক্লাসিক রোমান্টিক প্রকাশনীঃ সতীর্থ প্রকাশনী প্রথম প্রকাশঃ ডিসেম্বর -২০২০ পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ১৭৬ মুদ্রিত মূল্যঃ ১৬৫ টাকা
আজ থেকে বাইশ বছর পরে যদি হঠাৎ দেখা হয়ে যায়, কী নামে সম্বোধন হবে আমাদের ? কে আগে ডাকবে ?তুমি, নাকি আমি ?
🔹নামকরণঃ এ গল্পের নামকরণ যৌক্তিক। বাইশ বছর আগের কাহিনী এখানে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু এখানে মূল সময় বাইশ বছর পরে। তাই নামটি সার্থক।
🔹চরিত্র বিশ্লেষণঃ এ গল্পে অনেকগুলো চরিত্রের দেখা মেলে। তার মধ্যে না বললেই নয় এমন কিছু চরিত্রগুলো হলোঃ মঞ্জু, আনিস বাবলু,প্রিয়ন্তী,রুবি,বাদল, মন্টু,মোহন, মোজাম্মেল, আহনাফ হাসানসহ আরো অনেকে।
i) মঞ্জুঃ এ গল্পের নায়ক। ভার্সিটির পড়াশোনা শেষ করে এখন খুলনায় চাকরি করছে। মা তার শৈশবে মারা গেছে। একেবারে ঘরকুনো।
ii)প্রিয়ন্তীঃ এ গল্পের নায়িকা। ভার্সিটির পড়াশোনা শেষ করে কানাডায় কিছুদিন অবস্থান করেছিল। এখন বাংলাদেশে ফিরেছে। ভার্সিটির সময় মঞ্জুর অন্য বিভাগে ছিল। মঞ্জুর থেকে বয়সে ২ বছরের বড়।
iii)আনিসঃ মঞ্জুর রুমমেট। একেবারে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ৷ এক ছাত্রীর সাথে প্রেম করেছিল। যার ফল হিসেবে পেয়েছিল বন্ধুদের কাছ থেকে সেই মার। পরে রক্তের ক্যান্সার হয়ে মারা যায়।
xi) মমতাজ বেগমঃ বাবলুর মা। গৃহিণী। সংসারকর্মে অতি অভিজ্ঞ।
🔹গল্প সংক্ষেপঃ পরিবহন ধর্মঘটে শহরে আটকা পড়ে এ গল্পের নায়ক মঞ্জু।এয়ার কন্পিশন্ড বাস কাউন্টারে দেখা হয়ে যায় প্রিয়ন্তীর সাথে। সাথে সাথেই তাদের মনে পড়ে গেল বাইশ বছর পেছনের গল্প। বন্ধুত্ব,বিচ্ছেদ, সমাজের বাধা ধরা নিয়মগুলো আড়ালে গড়ে ওঠা এ গল্পের হারিয়ে যেতে চাইছেন? তাহলে পড়া শুরু করে দিন বইটি।
🔹পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ বইটি এককথায় অসাধারণ বই। বইটির প্রথম দিকে বন্ধুত্ব ও নানা ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। পরবর্তীতে মঞ্জু ও প্রিয়ন্তীর মধ্যে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে, যা খুবই সুন্দর ভাবে লেখা হয়েছে। লেখকের লেখনশৈলী অনেক সুন্দর হয়েছে। তবে শেষ সিনটাতে মনে অনেক দুঃখ পেয়েছি। কেন মঞ্জু সময় থাকতেই প্রিয়ন্তীকে মনের কথা বললনা। এরকম অনেক প্রশ্ন জেগেছিল মনে।
🔹প্রিয় লাইনঃ বইটি পড়ে আমার একটি লাইন খুবই পছন্দ হয়েছে। " আপনজন ছাড়া বেঁচে থাকা কষ্টকর। " বাক্যটি আসলেই সঠিক। আমরা কেউই আপনজন ছাড়া ভালো থাকিনা।
🔹সম্পাদনাঃ বইয়ে কিছু বানান ভুল পেয়েছি। আশা করি আগামী সংস্করণগুলোতে তা সংশোধন করা হবে। ভুল বানান- সঠিক বানান পৃষ্ঠাঃ ২৩ "দাঁড়িয়ে আসে"-"দাঁড়িয়ে আছে"হবে। পৃষ্ঠাঃ ৩০ "আনিস কেনে"-"মঞ্জু কেনে"হবে। পৃষ্ঠাঃ ৩৬ "মন্টুদের হল"-"মঞ্জুদের হল" হবে। পৃষ্ঠাঃ ৪৭ "আনিস মোটামুটি"-"বাবলু মোটামুটি"। পৃষ্ঠাঃ ৮৫ "সিনেমা হলো"-"সিনেমা হল"। পৃষ্ঠাঃ১২৯ "মতামতো"-"মতামত"। পৃষ্ঠাঃ১৫০ "আনিসের বাদক দল"-"বাবলুর বাদক দল"।
🔹প্রোডাকশনঃ প্রচ্ছদটি ভালোই হয়েছে। এ প্রচ্ছদটি পাঠকদের কিছুটা আকর্ষণ করবে। বাইন্ডিং মোটামুটি ভালোই ছিল। তবে এটি হার্ডকাভার করলে আরো ভালো হতো বলে আমি মনে করি। পেজ কোয়ালিটি ভালোই ছিল। এককথায় টপ নচ প্রোডাকশন।
প্রচ্ছদ আর নাম দেখে যা মনে হয় গল্পটা ঠিক তাই। বাইশ বছর পর হঠাৎ করেই দেখা হয় মঞ্জু আর প্রিয়ন্তির। এরপর বাকি সময়টা তাদের কাটে নিজেদের মনের মধ্যে পুরনো স্মৃতি মনে করে।
সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে, প্রথমবারের মত নিজেদের বাড়ির নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে একসাথে জীবনকে চিনতে শুরু করে মঞ্জু, আনিস, বাবলু আর রুবি। সেই জীবনে পড়ার চাপ, অভাব অনটন, টিকে থাকার যুদ্ধ, খুনসুটি, প্রেম, বিয়ে, হাসি-কান্না সব আছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রায় প্রতিটা দিক সুন্দর করে অল্প কথায় বলা। সংস্কৃতির চর্চা থেকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কিছুই বাদ নেই। স্কুল কলেজের ছোট ছোট ছেলে মেয়েগুলোর নিজে থেকে বড় হয়ে যাওয়ার, পারিবারিক দায়িত্ব আর সামাজিক চাপকে মেনে নিয়ে আগানোর গল্প। সেই গল্পে সমাজকে খুশি করতে গিয়েই অনেকে ভিলেন হয়ে যায় সমাজের আর কাছের মানুষদের চোখে। অনেক কুখ্যাত ভিলেন আবার চোখের সামনে নিজের মনুষ্যত্বের পরিচয় দিয়ে নীরবে আমাদের ধারণা ভুল প্রমাণ করে।
লেখাটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবরণে মনে হচ্ছিল নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছি। যদিও অঞ্চলগুলো বোধহয় অস্পষ্ট রাখা হয়েছে ইচ্ছা করেই। লেখায় অদ্ভুত একটা ব্যাপার ছিল, যখন যে অংশটুকু পড়ছিলাম শুধু সেটুকুর মধ্যেই ডুবে ছিলাম। একবারো মনে হয়নি যে - একবার স্মৃতি, একবার বর্তমানে যাচ্ছি - ব্যাপারটা খাপছাড়া হয়ে যাচ্ছে। লেখার মধ্যে আবেগ অনুভূতি শুধু গল্পে না, প্রতিটা বাক্যেই ছিল। লেখার মধ্যে লেখকের সাহিত্যিক প্রতিভার যথেষ্ট পরিচয় আছে। প্রথমদিকে অনেক স্লো মনে হচ্ছিল। আবার কিছু অংশ মনে হয়েছে আরো বড় হলে ভালো লাগতো- পহেলা বৈশাখ, রুবির না বলা কথা, আনিসের বাসা, মিতুর হলে আসা... আর শেষটায় বাস ছেড়ে দিবে এজন্যই কী এত জলদি সব শেষ? তবে শেষ দশ মিনিট ভিন্ন কিছু হলে বেশি ভালো লাগতো।
খুবই গুরুত্বপূর্ণ দুইটা কথা। ১. আমার রোমান্টিক / ট্র্যাজেডি গল্প পছন্দ না। ২. নিজে কাঠখোট্টা স্বভাবের হওয়ার কারণেই বোধহয় গল্প পড়তে গিয়ে যদি কাহিনী বা তথ্যের চেয়ে বেশি আবেগ, অনুভূতি, সাহিত্যগুণ প্রকাশ পায় তাহলে আগ্রহ হারিয়ে ফেলি।
এই দুইটা কারণে বোধ হয় ঠিকমতো কিছু প্রকাশ করতে পারলাম না। এখানে শুধু বাক্যের আবেগ না, গল্পের আবেগ বেশি ছিল। সেকারণে শেষ পর্যন্ত ভালো লেগেছে বইটা। কিংবা হয়তো অনেক কিছু নিজের জীবনের সাথে অনেক কিছু মেলাতে পেরেছি বলে ভালো লেগেছে। শুধু ঠিকমতো বলতে পারলাম না।
প্রচ্ছদ আর নাম দেখে যা মনে হয় গল্পটা ঠিক তাই। বাইশ বছর পর হঠাৎ করেই দেখা হয় মঞ্জু আর প্রিয়ন্তির। এরপর বাকি সময়টা তাদের কাটে নিজেদের মনের মধ্যে পুরনো স্মৃতি মনে করে।
সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে, প্রথমবারের মত নিজেদের বাড়ির নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে একসাথে জীবনকে চিনতে শুরু করে মঞ্জু, আনিস, বাবলু আর রুবি। সেই জীবনে পড়ার চাপ, অভাব অনটন, টিকে থাকার যুদ্ধ, খুনসুটি, প্রেম, বিয়ে, হাসি-কান্না সব আছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রায় প্রতিটা দিক সুন্দর করে অল্প কথায় বলা। সংস্কৃতির চর্চা থেকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কিছুই বাদ নেই। স্কুল কলেজের ছোট ছোট ছেলে মেয়েগুলোর নিজে থেকে বড় হয়ে যাওয়ার, পারিবারিক দায়িত্ব আর সামাজিক চাপকে মেনে নিয়ে আগানোর গল্প। সেই গল্পে সমাজকে খুশি করতে গিয়েই অনেকে ভিলেন হয়ে যায় সমাজের আর কাছের মানুষদের চোখে। অনেক কুখ্যাত ভিলেন আবার চোখের সামনে নিজের মনুষ্যত্বের পরিচয় দিয়ে নীরবে আমাদের ধারণা ভুল প্রমাণ করে।
লেখাটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবরণে মনে হচ্ছিল নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছি। যদিও অঞ্চলগুলো বোধহয় অস্পষ্ট রাখা হয়েছে ইচ্ছা করেই। লেখায় অদ্ভুত একটা ব্যাপার ছিল, যখন যে অংশটুকু পড়ছিলাম শুধু সেটুকুর মধ্যেই ডুবে ছিলাম। একবারো মনে হয়নি যে - একবার স্মৃতি, একবার বর্তমানে যাচ্ছি - ব্যাপারটা খাপছাড়া হয়ে যাচ্ছে। লেখার মধ্যে আবেগ অনুভূতি শুধু গল্পে না, প্রতিটা বাক্যেই ছিল। লেখার মধ্যে লেখকের সাহিত্যিক প্রতিভার যথেষ্ট পরিচয় আছে। প্রথমদিকে অনেক স্লো মনে হচ্ছিল। আবার কিছু অংশ মনে হয়েছে আরো বড় হলে ভালো লাগতো- পহেলা বৈশাখ, রুবির না বলা কথা, আনিসের বাসা, মিতুর হলে আসা... আর শেষটায় বাস ছেড়ে দিবে এজন্যই কী এত জলদি সব শেষ? তবে শেষ দশ মিনিট ভিন্ন কিছু হলে বেশি ভালো লাগতো।
খুবই গুরুত্বপূর্ণ দুইটা কথা। ১. আমার রোমান্টিক / ট্র্যাজেডি গল্প পছন্দ না। ২. নিজে কাঠখোট্টা স্বভাবের হওয়ার কারণেই বোধহয় গল্প পড়তে গিয়ে যদি কাহিনী বা তথ্যের চেয়ে বেশি আবেগ, অনুভূতি, সাহিত্যগুণ প্রকাশ পায় তাহলে আগ্রহ হারিয়ে ফেলি।
এই দুইটা কারণে বোধ হয় ঠিকমতো কিছু প্রকাশ করতে পারলাম না। এখানে শুধু বাক্যের আবেগ না, গল্পের আবেগ বেশি ছিল। সেকারণে শেষ পর্যন্ত ভালো লেগেছে বইটা। কিংবা হয়তো অনেক কিছু নিজের জীবনের সাথে অনেক কিছু মেলাতে পেরেছি বলে ভালো লেগেছে। শুধু ঠিকমতো বলতে পারলাম না।
This is a book i thought i wouldn’t like, but loved it! Whenever i want to read a romance book, i pick up something from English literature. At first, i wanted to get this book asap. But,as i saw this everywhere on facebook,i kind of thought it was over-hyped. Meanwhile, i did read another book by this author, and it didn’t help the case.
যা হোক, বইয়ে আসি। বাংলা রোমান্টিক জনরার উপন্যাস আমি খুবই কম পড়েছি। হুমায়ূন স্যারের বই বাদ দিলে ও সংখ্যা বেশিদূর যায় না। আবার পুরোনো লেখকদের কথা না বলি। আটপৌরে ভালোবাসার গল্পগুলো অন্য বাক্সে রেখে দিই আজ। এখনের লেখকদের এই জননার উপন্যাস পড়লে আমার হাসি আসে৷ হয় বেশি আবেগে ভর্তি,কিংবা জোর করে ভালোবাসাটা মহান করতে চাচ্ছে,এমন অবস্থা। সেই থেকে এটা আলাদা। এই বই আমাকে "যেখানে রোদেরা ঘুমায়" বইটার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলো। কাহিনীতে মিল আছে বা এমন কিছুনা। রোমান্টিক জনরার বই হিসেবে শেষ ওই বইটাই ভালো লেগেছিলো বলে। আর এটাও হলো নব্বই দশকের। এটুকুন ছাড়া এই দুই বইতে কোনো মিল নেই।
আমার জীবনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অংশ নেই।অথচ এই বই পড়ে মনে হচ্ছিলো আমি যেনো ওসব পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম। হল, ক্লাস, বন্ধুত্ব,রাজনীতি, মিল -অমিল, সিনিয়র -জুনিয়র --সব কিছুই চমৎকার ভাবে উঠে এসেছে। এ যে অসাধারণ কোনো গল্প,তা-ও না। চেনা গন্ধ আছে বলেই বোধহয় এতোটা ভালো লেগেছে।
আবার বেশ কিছু কথা তুলে এনেছেন লেখক বইয়ে। পুরুষত্বের সংজ্ঞা,ফেমিনিজম,সমাজের দৃষ্টিতে নারী-সীমাবদ্ধতা,গুরুজনদের জোর করে সম্মান আদায় করতে চাওয়া, গ্রাম্য রাজনীতি সহ আরো অনেক ছোটছোট দিক উঠে এসেছে। এসব বিষয়ে নিজের কথাগুলো মার্জিনে লেখা আছে৷ সেগুলো সময় করে বলবো একদিন। । "পরিবহন ধর্মঘটে শহরে আটকা পড়লো মঞ্জু। এয়ার কন্ডিশন্ড ওই বাস কাউন্টারে কাকতালীয়ভাবে দেখা হয়ে গেলো প্রিয়ন্তির সঙ্গে। গল্পে গল্পে ওরা ফিরে গেলো ঠিক বাইশটি বছর পেছনে।" ।
মঞ্জু আর প্রিয়ন্তির হঠাৎ করে দেখা হওয়া থেকে উপন্যাসটার শুরু হয়। মঞ্জু নিজের অতীত টাকে অনেকটাই ভুলে গিয়েছিলো, কিন্তু ২২ বছর পরে প্রিয়ন্তির সঙ্গে দেখা হয়ে সে যেন নিজের অতীতে ফিরে যায়। না ২২ বছর আগের কোনো ঘটনাই সে ভুলে নি, মনের মধ্যে সব সুস্পষ্ট গেঁথে রয়েছে। প্রিয়ন্তির সঙ্গে দেখা হবার পর সব কিছু তার চোখের সামনে ভাসতে থাকে, আস্তে আস্তে লেখক মুর্তজা সাদ মঞ্জুর স্মৃতিচারণের মধ্যে দিয়ে তাদের অতীত তুলে ধরতে থাকেন, ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে উপন্যাস।
মঞ্জুর স্মৃতিচারণে প্রথমেই উঠে আসে তার ক্যাম্পাস জীবনের সূত্রপাত। ক্যাম্পাসে তার বন্ধু- বান্ধবীদের কথা ধীরে ধীরে উঠে আসে। মঞ্জু,বাবলু,আনিস আর রুবির বন্ধুত্বের সম্পর্ক প্রতিফলিত হয়। তাদের এই বন্ধুত্বের সম্পর্কটাকে কেন্দ্র করে তাদের প্রত্যেকের জীবনের ঘটনাগুলি মৃদু স্রোতের মতো প্রবাহিত হতে থাকে। অল্পকিছু চরিত্রের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অনেককিছুই সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হতে থাকে। জীবনের ধারাবাহিকতায় মঞ্জুর জীবনে আগমন ঘটে প্রিয়ন্তির। মঞ্জুর সাথে প্রিয়ন্তির সম্পর্ক কেমন ছিল? ২২ বছর যোগাযোগই বা হয়নি কেন? এইসকল প্রশ্নের সুন্দর উত্তর এই উপন্যাস " বাইশ বছর পরে " ।
~কিছু কথা:
আপাতদৃষ্টিতে ফ্লাপ পড়ে এই উপন্যাসটাকে রোমান্টিক প্রেম বা বিরহের বলে মনে হলেও আমার কাছে এটা সুন্দর সামাজিক উপন্যাস বলে মনে হয়েছে। এটাকে ঠিক রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাস বলতে আমি নারাজ।
বইয়ের মূল দুটি চরিত্র মঞ্জু আর প্রিয়ন্তি কিন্তু এখানে মঞ্জুকে কেন্দ্র করেই বেশিরভাগ প্লট গড়ে উঠেছে। মূল চরিত্র হিসেবে আমি প্রিয়ন্তির সম্পর্কে আরো বেশি ঘটনা আশা করেছিলাম।
বই: বাইশ বছর পরে লেখক: মুর্তজা সাদ প্রকাশনী: সতীর্থ প্রকাশনা মুদ্রিত মূল্য : ১৬৫ টাকা মাত্রা নিজস্ব রেটিং : ৭.৫/১০
স্যাঁতসেঁতে বৃষ্টির দিনে পরিবহন ধর্মঘটের কবলে আটকা পড়েছে গোটা শহর। গন্তব্যে পৌঁছানোর যান চলাচল বন্ধ। এমন দিনে কাউন্টারে বসে কাঙ্ক্ষিত বাসের অপেক্ষা করছিল মঞ্জু। অপেক্ষার প্রহর গুণতে গুণতেই দেখা হয়ে গেল প্রিয়ন্তির সাথে। কে প্রিয়ন্তি?
প্রিয়ন্তিকে ঠিকঠাক জানতে হলে ফিরে যেতে হবে ঠিক বাইশ বছর আগে। সময়টা নব্বই দশক। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া আজকের মঞ্জু তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তারুণ্যের সেই দিনগুলোতে মঞ্জুর সবসময়ের সঙ্গী হত তিন জন - আনিস, বাবলু আর রুবি।
পড়তে পড়তেই রুবির বিয়ে হয়ে যায়। আনিসের দিন কাটত টিউশনি করে। বাবলু মেতে থাকত গানবাজনা নিয়ে। আর মঞ্জু? মঞ্জু ছিল বইপড়ুয়া। রাজ্যের সব গল্প-উপন্যাসের বই কিনে আনত সে! তবে - মাঝেমধ্যেই কবিতার আসরে হাজির হয়ে যেত মঞ্জু। সেখানে দেখা পাওয়া যেত প্রিয়ন্তির। ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র, প্রিয়ন্তি খুব ভালো কবিতা আবৃত্তি করতে পারত...এই তো! সবমিলিয়ে বেশ ভালোই দিন কেটে যাচ্ছিল মঞ্জুদের।
এরমধ্যেই একদিন প্রিয়ন্তির বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হতে চলল। মঞ্জুও কেমন যেন নিভে গেল! অসম বয়সের এই কাহিনীটা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু শেষ হয়েও শেষ হয় না এই আখ্যান। অপেক্ষা করতে হয়। সুদীর্ঘ বাইশ বছরের অপেক্ষা।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের হরেক রকমের অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু হয়েছে সমসাময়িক উপন্যাস, ʼʼবাইশ বছর পরেʼʼ। বন্ধুত্ব কিংবা প্রেমের গল্পকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে উপন্যাসের পুরো কাহিনী। কাহিনীর প্লট ছিমছাম।
কিন্তু হ্যাঁ; সাধারণ প্লটের এই কাহিনীটাই আবার দারুণ সুখপাঠ্য হয়ে ওঠে মূলত লেখকের বর্ণনাশৈলীর গুণে। শব্দচয়নে মাধুর্যতা ছিল। নব্বই দশকের সময়টাকে বইয়ের পাতায় ফুটিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা ছিল।
ভালো লেগেছে শুরুর দিকের টুকরো টুকরো গল্পগুলো। মঞ্জুর নতুন নতুন ক্যাম্পাস জীবনে আগমন, তারপর ক্যাম্পাস জীবনের কত শত কথা - সবটাই চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। উপভোগ করতে পারছিলাম।
চরিত্রায়ণের প্রসঙ্গে কিছু বলি। পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে; মঞ্জুর সাথে তার বাবার বেশ ভালো একটা বিরোধ ছিল। কিন্তু বিরোধের প্রকৃত কারণটা ঠিকঠাক বোঝা যায় না।
তাছাড়া বন্ধুত্ব কিংবা প্রেমের গল্পকে ছাপিয়ে সেসময়ের কিছু রূঢ় বাস্তবতাও চমৎকারভাবে চিত্রিত হয়েছে এই উপন্যাসে। পড়লেই বুঝতে পারবেন। শুরুতে কাহিনী বর্ণনার গতিটা একটু ধীর মনে হলেও হতে পারে। তবে সময়ের সাথে সাথে উপন্যাসের কাহিনীতে প্রকাশ পায় গতিময়তা।
আনিসের অসুখের পর উপন্যাসের কাহিনীটা একটু দ্রুত এগিয়েছে। এক্ষেত্রে সমাপ্তিটা আরেকটু বিস্তৃত হলে কাহিনীটা ভালোভাবে জমত বোধ হয়। তবে - সবমিলিয়ে খারাপ না। ক্লাসিক ক্লাসিক একটা ব্যাপার আছে পুরো বই জুড়ে। চাইলে পড়ে দেখতে পারেন।
বই: বাইশ বছর পরে লেখক : মূর্তজা সাদ প্রকাশনী: Satirtho Prokashona ব্যক্তিগত রেটিং: ৪.৫
বাইশ বছর পর যদি হঠাৎ দেখা হয়ে যায় কি নামে সম্বোধন করবে তুমি আমায় নাকি নিশ্চুপ থেকে যাবে সবটা সময়? নাকি অভিমানের এক পাহাড় জমিয়ে রেখে দিবে আমার জন্যে?
বাইশ বছর পর উপন্যাসটি মূলত নব্বই এর দশকের সময়কার প্রেক্ষাপটে লেখা। উপন্যাসের মূল চরিত্র মঞ্জু তার গন্তব্যস্থলে যাত্রার উদ্দেশ্যে বাস কাউন্টারে যেয়ে দেখে বাস ধর্মঘট। অগত্যা কোনো উপায় না পেয়ে সে বসে থাকে কাউন্টারে। তখন তার সাথে দেখা হয় প্রিয়ন্তির। এই সেই প্রিয়ন্তি যাকে সে প্রথম দেখায় মুগ্ধ হয়েছিলো যাকে নিয়ে সে স্বপ্ন বুনেছিলো। কিন্তু বয়সের ব্যবধান আর সমাজের ধরা-বাধা নিয়মে হেরে যায় সে। তার রঙিন স্মৃতি জাগ্রত হতে থাকে একে একে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকে কিভাবে বন্ধুত্ব হয় আনিস, বাবলু, রুবীর সাথে। সব গল্পের শেষ হয়েও শেষ হয় না আসলে। কি হয়েছিলো জানতে পড়তে হবে বইটি। এসব রিভিউ লিখবার ক্ষেত্রে আমি বেশ বাজে। গুছিয়ে লিখতে গিয়ে গুলিয়ে ফেলি। ধীরে ধীরে হয়তো শিখে যাবো।😅
গল্পটা প্রায় সবারই জানা। কিন্তু সেই জানা গল্পকেও সুপাঠ্য করে তোলাটাই ছিলো লেখকের মুন্সিয়ানার পরিচয়। মঞ্জু আর প্রিয়ন্তির হাত ধরে ঘুরে এলাম ক্যাম্পাস জীবনে। প্রথমে একটু ধীর গতির হলেও কিছুদূর এগিয়ে লেখক দারুণ ছন্দ ধরে নিয়েছেন। সবথেকে ভালো লেগেছে পারস্পরিক কথোপকথন। মঞ্জুর সাথে গল্পের বাকি চরিত্রগুলোর সম্পর্ক খুব সুন্দর ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। লেখকের তীব্র অনুভূতি শক্তির পরিচয় মেলে এই বইয়ে। প্রেমের উপন্যাস হলেও এতোটুকু বিরক্তি কোথাও বোধ হয় নি। তবে মঞ্জু-প্রিয়ন্তির প্রেম আরেকটু আশা করেছিলাম। সব মিলিয়ে দারুণ সুস্বাদু একটি বই। তৃপ্তির ঢেকুরটা অনুভব করা যায় শেষ করার পরে।
৪/৫⭐ শুরুতে অতিরিক্ত বেশি ব্যাখ্যা করা হয়েছে প্রত্যেকটা ব্যাপারে তাই ৫০ পেইজ পড়েই ভাবছিলাম ছেড়ে দিবো (DNF) বাট যেহেতু কিনেছি বইটা তাই পড়ে শেষ করেই উঠি। গল্পটা মাঝপথে গিয়ে ভালো লাগতে থাকে, তখন মনে হয় একটানা শেষ না করে উঠাই যায় না। কাহিনী ভালো লেগেছে। নব্বই দশক শুনলেই একটা অন্যরকম শিহরণ জাগে। তবে আমার মতে বইটা ১২০-১৩০ পৃষ্ঠায় শেষ করলে বেশি ভালো লাগতো । অযথা শব্দ ব্যবহার করে টেনে টেনে বইয়ের পৃষ্ঠা বাড়ানো আমার মোটেও পছন্দ না। ১২০-১৩০ পৃষ্ঠায় হলে ৫/৫ ই দিতাম আমি। যাই হোক, ভালো ছিলো।
যদিও আমি রোমান্টিক বইয়ের তেমন একটা ফ্যান না কিন্তু এই বইটা বেশ ভালো লেগেছে। লেখকের লেখনী কেনো জানি তেমন একটা ভালো লাগে নি কিন্তু প্লট টা সুন্দর। এটা হয়তো রোমান্টিক উপন্যাস কিন্তু আমার ভালো লেগেছে মঞ্জু,রুবি,আনিস আর বাবলুর বন্ধুত্ব টা।
আমি তপু পড়ার পর কোনো বই পড়েই কান্না জিনিস টা আসে নি।কিন্তু এই বইটা পড়ে আনিসের জন্য খুব কান্না পেয়েছে।
পরিবার ছেড়ে আরেক শহরে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে মঞ্জু। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে প্রথম দেখা আনিসের সাথে। সেই থেকে একসাথে সময় কাটানো,র্যাগিং এর শিকার, খাবার ও থাকার সংকট সব মিলিয়ে তাদের জীবন চলছিল। সাথে যোগ হলো বাবলু ও তাদের ক্লাসের একমাত্র মেয়ে মিতু। ক্যাম্পাস জীবন তাদের নানা উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে ভালো মন্দ দুটোই যাচ্ছিল। হঠাৎ একদিন বৃষ্টিস্নাত ক্যাম্পাসে মঞ্জুর একজনের উপর চোখ আটকে যায়, তারপর পিছু নেওয়া। খোঁজ নিয়ে জানা গেল মেয়ের নাম প্রিয়ন্তি। প্রিয়ন্তির সাথে মঞ্জু জোর করে কখনো সখ্যতা গড়ে তোলার চেষ্টা করেনি , না তাদের মধ্যে ছিল কোনো প্রণয়ের সম্পর্ক। তবুও এক অদৃশ্য অনুভূতি তাদের দুজনের মাঝেই ছিল যা হয়তো তথাকথিত সমাজের চাপে কখনো প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
তার ঠিক দুই যুগ পার করে আসার পর হঠাৎ প্রিয়ন্তির সাথে মঞ্জুর দেখা। দু'জনের পথই এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রিয়ন্তিকে দেখে মঞ্জুর হঠাৎ নব্বই দশকের প্রথম দিকের সে সোনালি দিনগুলোর স্মৃতি মনে পড়ে যায়। প্রিয়ন্তির সুবাদে সে আবারো ফিরে গেল তার অতীতে।
বইটা খুবই সাধারণ, বাংলা সিনেমার মতো কোনো নাটকীয়তা নেই। লেখকের লেখনশৈলী খুব সুন্দর ও গোছানো। পছন্দের তালিকায় থাকলো বইটি।