অনুবাদসাহিত্য - সাহিত্যের এই বিশেষ ঘরানাটিতে আমার আগ্রহ মূলত দুটি কারণে, ১) এমন ভাষার অনুবাদ যা আমি মূলে পড়তে পারব না। রাশিয়ান বা স্প্যানিশ অনুবাদ দেখলে যেজন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে তুলে নিই, কন্নড় বা মালয়ালম গল্পের অনুবাদ দেখলে বেহদ্দ খুশি হই। ২) এমন লেখক, এমন বিষয়ের খোঁজ পাওয়া যা আমি, একজন সাধারণ নন-অ্যাকাডেমিক পাঠক চট করে জানার স্কোপ পাই না।
এই বইটি পড়তে শুরু করেছিলুম এই দ্বিতীয় পয়েন্টের জায়গা থেকে। সবিনয়ে জানাই, বিদেশী সাহিত্যে আমি খুব একটা পোক্ত নই,পড়া দূরে থাক এম আর জেমস-এর নাম অবধি আমি শুনিনি এর আগে। রাজর্ষিকেও তখন চিনতুম না। ফলে বই নিয়ে আগে থেকে কোনও নির্দিষ্ট আশা যেমন ছিল না, তেমনই আগে থেকে থাকা ভালো লাগা বা পছন্দেরও কোনও জায়গা ছিল না অনুবাদকের জন্য।
হয়তো সেজন্যই বইটা পড়ি-পড়ি করেও পড়া হয়নি বেশ অনেকদিন। পড়ে ছিল আরও অনেক বইয়ের মধ্যে। গত তিনদিন হাতে একটু সময় পাওয়ায় একটানে পড়ে শেষ করে ফেললুম।
পাঁচটি গল্প আছে বইটিতে- ১) হৃদয়হারা – মূল গল্প ‘লস্ট হার্টস’। ২) কাউন্ট ম্যাগনাস ৩) স্কুলের গল্প – মূল গল্প ‘আ স্কুল স্টোরি’। ৪) র্যুনের মন্ত্র – মূল গল্প ‘কাস্টিং দ্য র্যুনস’। ৫) কৌতূহলী, সাবধান – মূল গল্প ‘আ ওয়ার্নিং টু দ্য কিউরিয়াস’।
আমার মতে রহস্য অলৌকিক ভয়ের গল্পের ক্ষেত্রে গল্পে কী হয়েছে তা আদৌ পাঠ-আলোচনায় বলা উচিত নয় - কারণ সেটি খুব পাকা হাতে করতে না পারলে যাঁরা এখনও পড়েননি তাঁদের পড়ার আনন্দ মাটি হবার ষোলো আনা সম্ভাবনা থাকে। দুঃখের বিষয় ওই পাকা হাতে ব্যাপারটা কোটিতে গুটিক পারেন, তাই সাধারণ পাঠকের সে চেষ্টাই করা উচিত নয়। এ তো আর পরীক্ষার খাতা নয় যে সারসংক্ষেপ লিখে প্রমাণ দিতে হবে সত্যিই পড়েছি! বরং পড়ে কী মনে হয়েছে সেটুকুর আন্তরিক বিবরণটুকুই ধরে রাখতে চেষ্টা করি।
রাজর্ষির অনুবাদের ধরণ হল যথাসম্ভব মূলানুগ থাকা। তাঁর শব্দ ব্যবহার, বাক্যের চলন, কথোপকথন সবেতেই এই বিশ্বাস পরিস্ফূট হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত স্তরে এই প্রসঙ্গে দীর্ঘ আলোচনাসূত্রে জানি, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁর অনুবাদ করার এটাই লক্ষ্য – পাঠক যেন মূল লেখার রস হুবহু অনুভব করতে পারেন। অনুবাদক শুধু একটা গল্পই শোনাচ্ছেন না, তিনি এক লেখককে সর্বাংশে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন বৃহত্তর পাঠকদের সঙ্গে।
এই উদ্দেশ্যে রাজর্ষি এই বইটিতে পূর্ণমাত্রায় সফল।
তাঁর নিবিষ্ট তদনুসারী অনুবাদে গল্পের গতি কখনও কখনও সামান্য ধীর, বা বর্ণনা গাম্ভীর্যে কঠিন হয়ে ওঠাটা এই গল্পগুলির অন্তর্লীন মেজাজের সঙ্গে ওতপ্রোত হয়ে মিলে গেছে। বৈঠকি চালে কথা কইতে কইতে গল্পগুলি সাধারণ পদক্ষেপে এগোয়, ঘটে চলা ঘটনাও বিবৃত হয় খুব সাদামাটা বিশেষণের বাহুল্যহীন বয়ানে আর তার মধ্যে থেকেই পরিবেশে ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসে অশুভ, অজানা আতঙ্ক। হুট করে সব অন্যরকম হয়ে যায়, বিপদ ঝেঁপে আসে চরিত্রদের উপর, কিন্তু গল্পের গতি বাড়ে না, চলন পালটায় না, মুহুর্মুহু শিরদাঁড়া দিয়ে যাকে বলে বরফের স্রোত বয়ে যায় না শুধু একটু একটু করে সে অশুভ হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য – আর তাতেই যেন আরও রুদ্ধশ্বাস হয়ে ওঠে পাতা উলটোনোর তাগিদ।
এ বইয়ের এক বিশাল সম্পদ হল প্রতিটি গল্পের শেষে দেওয়া টীকাগুলি। গল্পে ব্যবহৃত প্রতিটি অপরিচিত/স্বল্পপরিচিত শব্দ, প্রতিটি ঐতিহাসিক বা মিথিক্যাল উল্লেখ, বিশেষ প্রবচন, এমনকী যেখানে প্রয়োজ্জন মনে করেছেন সেখানে নিজস্ব ব্যাখ্যা ও তুলনামূলক আলোচনা নিয়ে টীকা লিখেছেন রাজর্ষি গল্পের শেষে। পড়ে মনে হয় শুধুই একজন গল্পটা বাংলায় আমাদের শোনালেন তাই নয়, এক অধ্যাপক অসীম যত্নে গল্পটি আমাদের পড়িয়ে দিলেন, তা নিয়ে বহু জ্ঞাতব্য বিষয়ও আমাদের একই সঙ্গে জানিয়ে দিলেন। পাঠকের কাছে এ এক অতুলনীয় প্রাপ্তি।
“গল্প শুরু আগে” নামে জেমসের লেখার ঘরানা, ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে রাজর্ষির গভীর ও অত্যন্ত সুপাঠ্য বিশ্লেষণটিও অবশ্যই পড়বেন।
বইটির ছাপা, বাঁধাই ও প্রচ্ছদ খুব সুন্দর। একটি মনোজ্ঞ ভূমিকা লিখেছেন প্রসাদরঞ্জন রায়।
যাদবপুরে প্রথম বছর। দে'জ-এর কাউন্টার থেকে গুটিকয়েক নারায়ণী রত্ন জোগাড় করে দোতলায় চক্রবর্তী-চ্যাটার্জিতে হানা দিলাম। সেই প্রাক-স্টারমার্ক যুগে কলকাতায় ওটিই ছিল জনপ্রিয় ও প্রচলিত ইংরেজি বইপত্র নেড়েচেড়ে দেখার সেরা জায়গা। সেখানেই হেনরি জেমস্-এর 'কালেক্টেড গোস্ট স্টোরিজ'-এর পাশে একটি শীর্ণকায় বই দেখলাম। এরও নাম একই। ওয়ার্ডসওয়ার্থ এডিশনে দুটো বইয়ের মলাটে পার্থক্য শুধু শেডে। এটি গাঢ়তর ফ্রেমে মুদ্রিত— ওল্ড মাস্টারের ছবির চারধারে সেই ফ্রেমটাই বলে দিচ্ছিল, এই গল্পগুলো অন্যরকম। লেখকের নাম এম.আর জেমস্। আগে কখনও শুনিনি এঁর নাম। অবশ্য সাহিত্য নিয়ে আমার জ্ঞান বড়োই কম— তখনও এবং এখনও। দাম কম বলে কিনে ফেললাম বইটা। তারপর পড়লাম গল্পগুলো। সেই ইমপ্যাক্ট লিখে বোঝানো সম্ভব নয়! বাংলা আর ইংরেজিতে ভয়ের আর ভূতের গল্প ততদিনে নেহাত কম পড়িনি। কিন্তু সেই গল্পগুলো...! প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, ডিটেইলস-এর প্রতি লেখকের অখণ্ড মনোযোগ। তারপর ভালো লেগেছিল চরিত্রদের ব্যাকস্টোরি আর আবেগের গুষ্টির পিন্ডি না চটকে স্রেফ গল্প বলার আয়োজনটি। তারপর দেখেছিলাম গল্পের উপাদানগুলোকে। পুরোনো বই, ধুলো, আলো-আঁধারির খেলা, আর কয়েকটি চরিত্রের একটু বেশি কৌতূহল— ব্যস! শুধু এই দিয়ে, কোনোরকম নীতি বা তত্ত্বের কচকচানি না আউড়ে পাঠককে ভয় পাওয়াতে চেয়েছেন লেখক! এইরকম ডি-লা-গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস স্তরের বই নিয়ে কেউ হইচই করে না কেন? ঢং করে একটা ঘণ্টা বাজার কথা কল্পনা করুন। সেই ফাঁকে পেরিয়ে গেছে ছা...ব্বি...শটি বছর! হঠাৎ ফেসবুকে দেখলাম, ঋত প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে এম.আর জেমস্-এর পাঁচটি গল্পের সটীক অনুবাদ। পুলকিত হয়েছিলাম বললে কমই বলা হবে। অনুবাদককে আমি তখনও চিনতাম না। তবে অনুষ্ঠানে কিংবদন্তি প্রাবন্ধিক প্রসাদরঞ্জন রায়ের উপস্থিতির কথা দেখে মনে হয়েছিল, এ কোনো 'ধর তক্তা মার পেরেক' ব্যাপার নয়। তারপর বইটা পড়লাম। এবং আবার, নতুন করে, মুগ্ধ হলাম জেমস্-এর সৃষ্ট প্লিজিং টেররে। কেন জানেন? কারণ উষ্ণ ও নিরাপদ আবহে মোমবাতির আলোয় ভয়ের গল্প শুনে গায়ে কাঁটা দেওয়ার সেই অনুভূতি ফিরে এল এই সটীক অনুবাদ পড়ে। ঠিক কী-কী আছে এই বইয়ে? * প্রসাদরঞ্জন রায়ের 'অদ্ভুতুড়ে দু-চারটি কথা' দিয়ে বই শুরু হয়েছে। এই নিবন্ধটি শুধু মন্টেগু রোডস জেমস্ বা তাঁর রচনার প্রসঙ্গে নয়, বরং অলৌকিক সাহিত্যের ক্ষেত্রেই অত্যন্ত মূল্যবান সংযোজন। * এসেছে 'প্রকাশকের তরফে' শীর্ষক ছোট্ট নিবেদন। * রয়েছে 'গল্প শুরুর আগে' শীর্ষক একটি প্রবন্ধ। এতে রাজর্ষি সংক্ষেপে অনেক কিছু বলেছেন। জেমস্, তাঁর সাহিত্য ও সময়, অলৌকিক সাহিত্যের কালগত বৈশিষ্ট্য, সর্বোপরি আজকের এই আলোজ্বলা কিন্তু ভেতরে-ভেতরে অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে এই গল্পগুলোর প্রাসঙ্গিকতা— এ-সবই তিনি তুলে ধরেছেন অত্যন্ত সূচিমুখ আকারে। * তারপর এসেছে পাঁচটি গল্প~ ১. হৃদয়হারা ��. কাউন্ট ম্যাগনাস ৩. স্কুলের গল্প ৪. র্যুনের মন্ত্র ৫. কৌতূহলী, সাবধান মূল গল্পগুলোর নামের পর্যাপ্ত আভাস দিয়েই রেখেছেন রাজর্ষি। তাই সেগুলোর পুনরাবৃত্তি করলাম না। অনুবাদ অনেকেই করেন। কিন্তু শতাব্দীর ওপার থেকে যে কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, তাকে প্যালিমপেস্ট হিসেবে ধরে একটির পর একটি স্তরের অর্থ সযত্নে তুলে ধরতে সবাই পারেন না। টীকা এজন্যই জরুরি, যাতে কাহিনিতে বর্ণিত স্থান ও কাল— দুই-ই ফুটে ওঠে স্পষ্ট হয়ে৷ একমাত্র তখনই গল্পের চরিত্রদের সঙ্গে যথার্থভাবে একাত্ম হওয়া সম্ভব। একমাত্র তখনই বোঝা যায়, বন্ধ ঘরে একলা বসে বই পড়ার সময় অন্যমনস্ক হয়ে জলের গ্লাসের দিকে হাত বাড়িয়ে একটা রোমশ মাথায় হাত ঠেকলে কেমন লাগে! এই বইটি শুধু বাংলা অনুবাদ-সাহিত্যের বা অলৌকিক সাহিত্যের সম্পদ নয়। একজন লেখক ও তাঁর সময়ের প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বস্ত থেকেও যে তাঁকে কতখানি আত্তীকরণ করা যায়, কীভাবে সেই শতাব্দীপ্রাচীন লেখনীর স্পর্শে পুনরুজ্জীবিত করা যায় গড্ডলিকা প্রবাহে ক্লান্ত একটি ঘরানাকে— তারই নজির এটি। ঋত প্রকাশন এই সম্পূর্ণ কাজটিকে অত্যন্ত রুচিশীল প্রচ্ছদ ও মুদ্রণের সঙ্গে আমাদের কাছে পেশ করে অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞতা অর্জন করলেন। আশা রাখি যে আগামী দিনে আমরা তাঁদের কাছ থেকে আরও বহু বই পাব। ইতিমধ্যে, যদি সাহিত্যানুরাগী হন, তাহলে এই বই আপনার জন্য। অলমিতি।
ভয় পেতে আমরা সবাই কম বেশি ভালোবাসি, সে বয়স যাই হোক না কেন। সেই ভয় যদি গল্পের বইয়ের আকারে হাতের মুঠোয় এসে হাজির হয়, তবে তার অনুভূতিই আলাদা। সাহিত্যিক এম.আর.জেমসের লেখা এমনই পাঁচটি অতিলৌকিক গল্পের অনুবাদ নিয়ে হাজির হয়েছে এই বই। ঋত প্রকাশন থেকে প্রকাশিত এবং রাজর্ষি গুপ্ত অনুদিত "ছায়া কায়া ভয়" নিঃসন্দেহে একটি দারুণ সৃষ্টি।মৃণাল শীলের অসামান্য প্রচ্ছদ, ঋত প্রকাশনের সুন্দর উপস্থাপনা আর সাহিত্যিক এম.আর.জেমসের সৃষ্টির সাথে রাজর্ষি গুপ্তের অনুবাদের মেলবন্ধন এক অনন্য নজির গড়েছে। অতিলৌকিক গল্পের জগতে এম.আর.জেমসের অবদান অবিস্মরণীয়। তাঁর লেখা আলাদা স্বাদের ভয়ের গল্প 'লস্ট হার্টস', 'কাউন্ট ম্যাগনাস, 'আ স্কুল স্টোরি', 'কাস্টিং র্্যুনস' এবং 'আ ওয়ার্নিং টু দ্য কিউরিয়াস' দিয়ে সাজানো এই সংকলন। এই গল্পগুলিকে পাঠকের মনের মাঝে স্থান দিতে মূল ভূমিকা নিয়েছে রাজর্ষি গুপ্তের অসাধারণ অনুবাদ। এত সহজ ভাষায় সটীক অনুবাদ করে গল্পগুলোর গ্রহণযোগ্যতা তিনি আরও বাড়িয়ে তুলেছেন। মূল গল্পের ভয়ের আবহ অনুবাদেও তিনি সাবলীল ভাবেই তুলে আনতে পেরেছেন। পাঠকের মনেও সেই ভয় দারুণভাবে সঞ্চারিত হতে পেরেছে। তাই পাঠক যদি একটু ভিন্ন স্বাদের ভয় চেখে দেখতে চান তাহলে বইটি একবার হাতে তুলে দেখতে পারেন।
এম আর জেমসের লেখনীর গুণগতমান নিয়ে সমালোচনা করবো এমন স্পর্ধা আমার নেই। যে ব্যক্তির নাম অনুসারে ইংরেজি অলৌকিক সাহিত্যজগতে একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধারা তৈরি হয়েছে, তাঁকে নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার মত নেই, তাঁর উদ্দেশ্যে থাক আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম। বরং রাজর্ষিবাবুর অনুবাদ নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। এককথায় বলতে গেলে, অনবদ্য অনুবাদ। সত্যি, এমন অসাধারণ মানের বাংলা অনুবাদ জীবনে খুব কমই পড়েছি। শুধুমাত্র গল্পের ভাষা পরিবর্তন নয়, বাক্যগঠন বা শব্দচয়ন এতটাই সাবলীল যে পড়তে পড়তে মনেই হয় না যে মূল গল্পটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভাষায় লেখা হয়েছে। এখানেই সম্ভবত একজন অনুবাদকের শ্রেষ্ঠত্ব। তাছাড়া প্রতিটি গল্পের শেষে প্রয়োজনীয় টিকা এবং বিশ্লেষণ গল্পের অনেক এমন বিষয়বস্তুকে বুঝতে সাহায্য করে যা জানা না থাকলে হয়তো ভয়াল রসের আস্বাদন কিছুটা অসম্পূর্ণই রয়ে যেত। আশা করবো রাজর্ষিবাবু আরো এমন অনেক তুলনাহীন অনুবাদ আগামী দিনে আমাদের উপহার দেবেন।