অনুবাদসাহিত্য - সাহিত্যের এই বিশেষ ঘরানাটিতে আমার আগ্রহ মূলত দুটি কারণে, ১) এমন ভাষার অনুবাদ যা আমি মূলে পড়তে পারব না। রাশিয়ান বা স্প্যানিশ অনুবাদ দেখলে যেজন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে তুলে নিই, কন্নড় বা মালয়ালম গল্পের অনুবাদ দেখলে বেহদ্দ খুশি হই। ২) এমন লেখক, এমন বিষয়ের খোঁজ পাওয়া যা আমি, একজন সাধারণ নন-অ্যাকাডেমিক পাঠক চট করে জানার স্কোপ পাই না।
এই বইটি পড়তে শুরু করেছিলুম এই দ্বিতীয় পয়েন্টের জায়গা থেকে। সবিনয়ে জানাই, বিদেশী সাহিত্যে আমি খুব একটা পোক্ত নই,পড়া দূরে থাক এম আর জেমস-এর নাম অবধি আমি শুনিনি এর আগে। রাজর্ষিকেও তখন চিনতুম না। ফলে বই নিয়ে আগে থেকে কোনও নির্দিষ্ট আশা যেমন ছিল না, তেমনই আগে থেকে থাকা ভালো লাগা বা পছন্দেরও কোনও জায়গা ছিল না অনুবাদকের জন্য।
হয়তো সেজন্যই বইটা পড়ি-পড়ি করেও পড়া হয়নি বেশ অনেকদিন। পড়ে ছিল আরও অনেক বইয়ের মধ্যে। গত তিনদিন হাতে একটু সময় পাওয়ায় একটানে পড়ে শেষ করে ফেললুম।
পাঁচটি গল্প আছে বইটিতে- ১) হৃদয়হারা – মূল গল্প ‘লস্ট হার্টস’। ২) কাউন্ট ম্যাগনাস ৩) স্কুলের গল্প – মূল গল্প ‘আ স্কুল স্টোরি’। ৪) র্যুনের মন্ত্র – মূল গল্প ‘কাস্টিং দ্য র্যুনস’। ৫) কৌতূহলী, সাবধান – মূল গল্প ‘আ ওয়ার্নিং টু দ্য কিউরিয়াস’।
আমার মতে রহস্য অলৌকিক ভয়ের গল্পের ক্ষেত্রে গল্পে কী হয়েছে তা আদৌ পাঠ-আলোচনায় বলা উচিত নয় - কারণ সেটি খুব পাকা হাতে করতে না পারলে যাঁরা এখনও পড়েননি তাঁদের পড়ার আনন্দ মাটি হবার ষোলো আনা সম্ভাবনা থাকে। দুঃখের বিষয় ওই পাকা হাতে ব্যাপারটা কোটিতে গুটিক পারেন, তাই সাধারণ পাঠকের সে চেষ্টাই করা উচিত নয়। এ তো আর পরীক্ষার খাতা নয় যে সারসংক্ষেপ লিখে প্রমাণ দিতে হবে সত্যিই পড়েছি! বরং পড়ে কী মনে হয়েছে সেটুকুর আন্তরিক বিবরণটুকুই ধরে রাখতে চেষ্টা করি।
রাজর্ষির অনুবাদের ধরণ হল যথাসম্ভব মূলানুগ থাকা। তাঁর শব্দ ব্যবহার, বাক্যের চলন, কথোপকথন সবেতেই এই বিশ্বাস পরিস্ফূট হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত স্তরে এই প্রসঙ্গে দীর্ঘ আলোচনাসূত্রে জানি, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁর অনুবাদ করার এটাই লক্ষ্য – পাঠক যেন মূল লেখার রস হুবহু অনুভব করতে পারেন। অনুবাদক শুধু একটা গল্পই শোনাচ্ছেন না, তিনি এক লেখককে সর্বাংশে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন বৃহত্তর পাঠকদের সঙ্গে।
এই উদ্দেশ্যে রাজর্ষি এই বইটিতে পূর্ণমাত্রায় সফল।
তাঁর নিবিষ্ট তদনুসারী অনুবাদে গল্পের গতি কখনও কখনও সামান্য ধীর, বা বর্ণনা গাম্ভীর্যে কঠিন হয়ে ওঠাটা এই গল্পগুলির অন্তর্লীন মেজাজের সঙ্গে ওতপ্রোত হয়ে মিলে গেছে। বৈঠকি চালে কথা কইতে কইতে গল্পগুলি সাধারণ পদক্ষেপে এগোয়, ঘটে চলা ঘটনাও বিবৃত হয় খুব সাদামাটা বিশেষণের বাহুল্যহীন বয়ানে আর তার মধ্যে থেকেই পরিবেশে ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসে অশুভ, অজানা আতঙ্ক। হুট করে সব অন্যরকম হয়ে যায়, বিপদ ঝেঁপে আসে চরিত্রদের উপর, কিন্তু গল্পের গতি বাড়ে না, চলন পালটায় না, মুহুর্মুহু শিরদাঁড়া দিয়ে যাকে বলে বরফের স্রোত বয়ে যায় না শুধু একটু একটু করে সে অশুভ হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য – আর তাতেই যেন আরও রুদ্ধশ্বাস হয়ে ওঠে পাতা উলটোনোর তাগিদ।
এ বইয়ের এক বিশাল সম্পদ হল প্রতিটি গল্পের শেষে দেওয়া টীকাগুলি। গল্পে ব্যবহৃত প্রতিটি অপরিচিত/স্বল্পপরিচিত শব্দ, প্রতিটি ঐতিহাসিক বা মিথিক্যাল উল্লেখ, বিশেষ প্রবচন, এমনকী যেখানে প্রয়োজ্জন মনে করেছেন সেখানে নিজস্ব ব্যাখ্যা ও তুলনামূলক আলোচনা নিয়ে টীকা লিখেছেন রাজর্ষি গল্পের শেষে। পড়ে মনে হয় শুধুই একজন গল্পটা বাংলায় আমাদের শোনালেন তাই নয়, এক অধ্যাপক অসীম যত্নে গল্পটি আমাদের পড়িয়ে দিলেন, তা নিয়ে বহু জ্ঞাতব্য বিষয়ও আমাদের একই সঙ্গে জানিয়ে দিলেন। পাঠকের কাছে এ এক অতুলনীয় প্রাপ্তি।
“গল্প শুরু আগে” নামে জেমসের লেখার ঘরানা, ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে রাজর্ষির গভীর ও অত্যন্ত সুপাঠ্য বিশ্লেষণটিও অবশ্যই পড়বেন।
বইটির ছাপা, বাঁধাই ও প্রচ্ছদ খুব সুন্দর। একটি মনোজ্ঞ ভূমিকা লিখেছেন প্রসাদরঞ্জন রায়।
যাদবপুরে প্রথম বছর। দে'জ-এর কাউন্টার থেকে গুটিকয়েক নারায়ণী রত্ন জোগাড় করে দোতলায় চক্রবর্তী-চ্যাটার্জিতে হানা দিলাম। সেই প্রাক-স্টারমার্ক যুগে কলকাতায় ওটিই ছিল জনপ্রিয় ও প্রচলিত ইংরেজি বইপত্র নেড়েচেড়ে দেখার সেরা জায়গা। সেখানেই হেনরি জেমস্-এর 'কালেক্টেড গোস্ট স্টোরিজ'-এর পাশে একটি শীর্ণকায় বই দেখলাম। এরও নাম একই। ওয়ার্ডসওয়ার্থ এডিশনে দুটো বইয়ের মলাটে পার্থক্য শুধু শেডে। এটি গাঢ়তর ফ্রেমে মুদ্রিত— ওল্ড মাস্টারের ছবির চারধারে সেই ফ্রেমটাই বলে দিচ্ছিল, এই গল্পগুলো অন্যরকম। লেখকের নাম এম.আর জেমস্। আগে কখনও শুনিনি এঁর নাম। অবশ্য সাহিত্য নিয়ে আমার জ্ঞান বড়োই কম— তখনও এবং এখনও। দাম কম বলে কিনে ফেললাম বইটা। তারপর পড়লাম গল্পগুলো। সেই ইমপ্যাক্ট লিখে বোঝানো সম্ভব নয়! বাংলা আর ইংরেজিতে ভয়ের আর ভূতের গল্প ততদিনে নেহাত কম পড়িনি। কিন্তু সেই গল্পগুলো...! প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, ডিটেইলস-এর প্রতি লেখকের অখণ্ড মনোযোগ। তারপর ভালো লেগেছিল চরিত্রদের ব্যাকস্টোরি আর আবেগের গুষ্টির পিন্ডি না চটকে স্রেফ গল্প বলার আয়োজনটি। তারপর দেখেছিলাম গল্পের উপাদানগুলোকে। পুরোনো বই, ধুলো, আলো-আঁধারির খেলা, আর কয়েকটি চরিত্রের একটু বেশি কৌতূহল— ব্যস! শুধু এই দিয়ে, কোনোরকম নীতি বা তত্ত্বের কচকচানি না আউড়ে পাঠককে ভয় পাওয়াতে চেয়েছেন লেখক! এইরকম ডি-লা-গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস স্তরের বই নিয়ে কেউ হইচই করে না কেন? ঢং করে একটা ঘণ্টা বাজার কথা কল্পনা করুন। সেই ফাঁকে পেরিয়ে গেছে ছা...ব্বি...শটি বছর! হঠাৎ ফেসবুকে দেখলাম, ঋত প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে এম.আর জেমস্-এর পাঁচটি গল্পের সটীক অনুবাদ। পুলকিত হয়েছিলাম বললে কমই বলা হবে। অনুবাদককে আমি তখনও চিনতাম না। তবে অনুষ্ঠানে কিংবদন্তি প্রাবন্ধিক প্রসাদরঞ্জন রায়ের উপস্থিতির কথা দেখে মনে হয়েছিল, এ কোনো 'ধর তক্তা মার পেরেক' ব্যাপার নয়। তারপর বইটা পড়লাম। এবং আবার, নতুন করে, মুগ্ধ হলাম জেমস্-এর সৃষ্ট প্লিজিং টেররে। কেন জানেন? কারণ উষ্ণ ও নিরাপদ আবহে মোমবাতির আলোয় ভয়ের গল্প শুনে গায়ে কাঁটা দেওয়ার সেই অনুভূতি ফিরে এল এই সটীক অনুবাদ পড়ে। ঠিক কী-কী আছে এই বইয়ে? * প্রসাদরঞ্জন রায়ের 'অদ্ভুতুড়ে দু-চারটি কথা' দিয়ে বই শুরু হয়েছে। এই নিবন্ধটি শুধু মন্টেগু রোডস জেমস্ বা তাঁর রচনার প্রসঙ্গে নয়, বরং অলৌকিক সাহিত্যের ক্ষেত্রেই অত্যন্ত মূল্যবান সংযোজন। * এসেছে 'প্রকাশকের তরফে' শীর্ষক ছোট্ট নিবেদন। * রয়েছে 'গল্প শুরুর আগে' শীর্ষক একটি প্রবন্ধ। এতে রাজর্ষি সংক্ষেপে অনেক কিছু বলেছেন। জেমস্, তাঁর সাহিত্য ও সময়, অলৌকিক সাহিত্যের কালগত বৈশিষ্ট্য, সর্বোপরি আজকের এই আলোজ্বলা কিন্তু ভেতরে-ভেতরে অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে এই গল্পগুলোর প্রাসঙ্গিকতা— এ-সবই তিনি তুলে ধরেছেন অত্যন্ত সূচিমুখ আকারে। * তারপর এসেছে পাঁচটি গল্প~ ১. হৃদয়হারা ২. কাউন্ট ম্যাগন��স ৩. স্কুলের গল্প ৪. র্যুনের মন্ত্র ৫. কৌতূহলী, সাবধান মূল গল্পগুলোর নামের পর্যাপ্ত আভাস দিয়েই রেখেছেন রাজর্ষি। তাই সেগুলোর পুনরা���ৃত্তি করলাম না। অনুবাদ অনেকেই করেন। কিন্তু শতাব্দীর ওপার থেকে যে কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, তাকে প্যালিমপেস্ট হিসেবে ধরে একটির পর একটি স্তরের অর্থ সযত্নে তুলে ধরতে সবাই পারেন না। টীকা এজন্যই জরুরি, যাতে কাহিনিতে বর্ণিত স্থান ও কাল— দুই-ই ফুটে ওঠে স্পষ্ট হয়ে৷ একমাত্র তখনই গল্পের চরিত্রদের সঙ্গে যথার্থভাবে একাত্ম হওয়া সম্ভব। একমাত্র তখনই বোঝা যায়, বন্ধ ঘরে একলা বসে বই পড়ার সময় অন্যমনস্ক হয়ে জলের গ্লাসের দিকে হাত বাড়িয়ে একটা রোমশ মাথায় হাত ঠেকলে কেমন লাগে! এই বইটি শুধু বাংলা অনুবাদ-সাহিত্যের বা অলৌকিক সাহিত্যের সম্পদ নয়। একজন লেখক ও তাঁর সময়ের প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বস্ত থেকেও যে তাঁকে কতখানি আত্তীকরণ করা যায়, কীভাবে সেই শতাব্দীপ্রাচীন লেখনীর স্পর্শে পুনরুজ্জীবিত করা যায় গড্ডলিকা প্রবাহে ক্লান্ত একটি ঘরানাকে— তারই নজির এটি। ঋত প্রকাশন এই সম্পূর্ণ কাজটিকে অত্যন্ত রুচিশীল প্রচ্ছদ ও মুদ্রণের সঙ্গে আমাদের কাছে পেশ করে অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞতা অর্জন করলেন। আশা রাখি যে আগামী দিনে আমরা তাঁদের কাছ থেকে আরও বহু বই পাব। ইতিমধ্যে, যদি সাহিত্যানুরাগী হন, তাহলে এই বই আপনার জন্য। অলমিতি।
ছায়া কায়া ভয়: ভাষার কাঁপুনি, ভূতের ছায়া, অনুবাদের আলো-আঁধারি
১) “When the Dark Whispers Begin”: একটি অলৌকিক ওডেসি শুরু হোক
রাত দশটার পর যে বই পড়া উচিত নয়—এ কথা আমি প্রথম শুনেছিলাম কাঞ্চনদার মুখে। সে সময়ে পাড়ার অলিগলি গিলে খায় নিজের ছায়া, বাতাসে হঠাৎ টান পড়ে, আর ন্যাড়া পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বটগাছ হঠাৎ যেন কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে—“ফিরে যা...”। তখনই তো হয় ঘটনা। যখন শব্দেরা নড়ে বসে, অক্ষর থেকে আলগা হয় অদৃশ্য হাত। তখনই—যখন গল্পের পাতা থেকে কারও হাত বাড়ায়, এবং আপনি তাকান না, তবুও টের পান… ঠিক তখনই উপস্থিত হন এম আর জেমস।
❝Oh, Whistle, and I’ll Come to You, My Lad.❞ — M. R. James, 1904 (এই এক লাইনেই জেমস নির্মাণ করে দেন এক আত্মা-স্বর, এক অদৃশ্য আহ্বান। একটি সিটি—শুধু একটি শব্দ-নাদেই খুলে যায় অন্য জগতের দরজা। ভয় এখানে বিকট নয়, সূক্ষ্ম, হেমন্তের পাতাঝরার মত নিঃশব্দ।)
ঋত প্রকাশন থেকে প্রকাশিত, রাজর্ষি গুপ্ত অনূদিত ছায়া কায়া ভয়—একটি বাংলা অলৌকিক প্রতিধ্বনি, যেখানে জেমসের নিঃশব্দ ‘terror’ ভাষার হাড়গোড় ছুঁয়ে বয়ে যায়। বইটির পাঁচটি গল্প একেকটা ছায়াপথ, যেখানে আলো এলেও—ছায়া গাঢ় হয়। অনুবাদকের দক্ষতা শুধু গদ্য-ভাষান্তরে নয়, তিনি একাধারে অনুবাদ করেছেন এক ভূগোল (rural Edwardian England), এক ইতিহাস (19th-century occultism), এবং এক মনস্তত্ত্ব—ভয়ের যা আসল উপাদান।
এই অনুবাদ নিছক অনুবাদ নয়। এ যেন অনুবাদক তাঁর টেবিলের সামনে বসে, M.R. James-এর টুপি আর চশমা পরে গল্প লিখছেন বাংলায়, তাঁরই ভাষায়। এবং তাতে রয়েছে জেমসের প্রিয় অনুষঙ্গ—"sequestered places", "forgotten manuscripts", এবং a terror that doesn’t scream, but hums, low and deep.
❝I think that the ghost should be malevolent or odious: amiable and helpful apparitions are all very well in fairy tales... but I have no use for them in a fictitious ghost story.❞ — M. R. James, Preface to Collected Ghost Stories, 1931 (জেমস-এর কাছে ভূত যেন ভয়ের এক প্রকৃতি, যে আসে আপনাকে শাস্তি দিতে, বা অন্তত চেতনাকে নাড়িয়ে দিতে। রাজর্ষি সেই নীতিকে অক্ষরে অক্ষরে রক্ষা করেছেন—তিনি ভূতকে ভালোমানুষ বানাননি, হেল্পফুল তো নয়ই; বরং অনুবাদে তাদের বুনেছেন কৌতূহলের পাশে এক বিপজ্জনক ছায়া হিসেবে।)
রাজর্ষি এই গ্রন্থে শুধু জেমসের গদ্যকে অনুবাদ করেননি, তিনি অনুবাদ করেছেন—
ক) এক সময়বিশেষ, যেখানে আতঙ্ক ছিল ব্যক্তিগত, ধীর ও বুদ্ধিদীপ্ত; খ) এক পাঠবিশেষ, যেখানে গল্প শেষ হওয়ার পরও পাঠক আলো জ্বালায়; গ) এবং এক সংস্কৃতিভাষ্য, যেখানে ব্রিটিশ কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গে বাংলা পাঠককেও ভীত ও বিনোদিত করে তোলা যায়।
গল্পগুলোর শেষে তাঁর সংযুক্ত টীকাগুলি, মুখবন্ধের অন্তর্দৃষ্টি, ও নিরবধি সংলাপের আঙ্গিকে তিনি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছেন, যেখানে পাঠক জেমসের ছায়ার নিচে, রাজর্ষির ভাষার মধ্যে শ্বাস নেয়।
❝The oldest and strongest emotion of mankind is fear, and the oldest and strongest kind of fear is fear of the unknown.❞ — H. P. Lovecraft, "Supernatural Horror in Literature", 1927 (এই কথা যেন জেমস ও রাজর্ষির যৌথ ঘরানার ভিত্তি। ভয়ের মূল উপাদান হল অজানা, এবং এই অনুবাদ প্রতিটি শব্দে সেই অজানার একটা ছায়া রাখে। গল্প পড়ে শেষ করার পরও, মনে হয় কিছু একটা এখনও রয়ে গেছে... কোনও এক পুরাতন বইয়ের শেষ পাতায়, যা আমরা উল্টাতে ভুলে গেছি।)
সুতরাং, আপনি যদি এই বই হাতে নেন রাত দশটার পর—আমার দোষ নেই।
জানালাটা কিন্তু বন্ধ রাখবেন, আর পর্দাটা নাড়ানো দেখলেও... তাকাবেন না।
২) “Words Have Shadows”: ভাষা—অতিসাধারণ লৌকিকের ভেতরে অসাধারণ অতিলৌকিক। “ভাষা না থাকলে ভূতও নেই।”
— বলল আমার ভিতরে থাকা এক সন্দেহবাদী পাঠক, নাম দিয়েছি তাকে টমাস হ্যাকার, কেমব্রিজের ছাত্রী, যার প্রিয় বিষয় ভৌতিক গল্প নয়, বরং ভাষাতাত্ত্বিক নাচন। তার মতে, ভয় শব্দে জন্ম নেয়, ভাষায় শ্বাস নেয়, এবং ছায়ার মতো গলে পড়ে পাঠকের অনুভবে।
আর এই টমাসকে চুপ করিয়ে দেয় রাজর্ষি গুপ্তের অনুবাদ—যে অনুবাদ শুধু জেমসের ইংরেজি নয়, তার অন্তর্লীন সুরটিকেও শোনায় নতুন এক ভাষায়। ছায়া কায়া ভয়-এর গদ্যে তিনি এক বৈঠকি বাংলার পরত বসিয়েছেন, কিন্তু সেটা যেন কোনও মধ্যবিত্ত ঠাকুরদার গল্পকথা নয়—বরং জেমসের ‘ghost’ শব্দটির গভীরতম অনুরণনকে বাঙালিয়ানায় ফিরিয়ে আনার এক ঋদ্ধ, বৈদগ্ধ্যপূর্ণ কুশলতা।
❝The world is full of ghostly people — those who have died and have not yet been buried.❞ — Henri-Frédéric Amiel, Journal Intime, 1854 (যেমন অনুবাদেও থেকে যায় এমন অনেক মৃত শব্দ, যাদের প্রাণ নেই—কিন্তু রাজর্ষির অনুবাদ সেই ‘ভাষার প্রেত’ নয়। বরং ভাষাকে আবার জীবন্ত করে তোলার এক রিচুয়াল—যা জেমসের লাতিনঘেঁষা, শাস্ত্রজ্ঞানে ভরা ইংরেজিকে রূপান্তর করে সাবলীল অথচ রুদ্ধশ্বাস এক বাঙালি বাক্যভবনে।)
“রুনের মন্ত্র” বা “কৌতূহলী, সাবধান”—এই দুই গল্পের অনুবাদে গদ্যের প্রতিটি বাক্য যেন একেকটা তাবিজ হয়ে ওঠে। কোথাও কোথাও গদ্য থেমে থাকে এক চুমুকের মতো, আবার কোথাও চলে যায় ধমকের মতো ঝাঁকুনিতে। রাজর্ষি এমন সব শব্দ বেছে নিয়েছেন, এমন ছন্দ তৈরি করেছেন, যা অনুবাদ নয়, পুনর্জন্ম।
এক কথায়, “translated, yet reborn”—এই দ্বৈততা তিনি রক্ষা করেছেন অসামান্য দক্ষতায়।
❝Language is the blood of the soul into which thoughts run and out of which they grow.❞ — Oliver Wendell Holmes (ভূতের গল্প, তার প্রাকৃত সত্তা নিয়ে, ভাষার উপর নির্ভর করেই তৈরি হয়। রাজর্ষির বাংলা অনুবাদ এমনই এক রক্তস্রোত যেখানে জেমসের ভয়ের ধুকপুক ধ্বনি এসে পৌঁছয় নতুন আত্মায়—যার নাম বাংলা।)
অনুবাদ শুধু শব্দ-প্রতিস্থাপন নয়—তা এক সাংস্কৃতিক সম্মিলন। এখানে অনুবাদক অনুবাদ করেননি “Count Magnus” বা “Lost Hearts”-এর ইংরেজি কেবল; তিনি অনুবাদ করেছেন সেই দুনিয়াটাকেই—যেখানে প্রত্নতত্ত্বের খণ্ডহস্ত প্রতিমা, পরিত্যক্ত চ্যাপেল, এবং পাণ্ডুলিপির ধুলোয় লুকিয়ে আছে প্রাচীন উন্মাদনা। এবং বাংলা ভাষায় এই “জ্ঞানময় ভয়ের ভাষা”-র প্রতিরূপ নির্মাণ করেছেন তিনি।
❝Words are, of course, the most powerful drug used by mankind.❞ — Rudyard Kipling (ভয় কেবল বায়োলজিকাল নয়, সে লিঙ্গুইস্টিক। রাজর্ষির অনুবাদে এই ভয় কখনও নিঃশব্দে হাসে, কখনও টোকা দেয় কাঁধে। পাঠকের ত্বকের নিচে নেমে যায়, কারণ তিনি জানেন—কোন শব্দে আছে ভূতের শ্বাস, আর কোন বাক্যে আছে তার ফিসফাস।)
জেমস নিজে এক লাতিনপটু, শাস্ত্রপড়ুয়া, কিংস কলেজ লাইব্রেরির পাণ্ডিত্যের পুজারি। তাঁর ভাষা কখনও সরল, কখনও খতিয়ান-সদৃশ, আবার কখনও হঠাৎ করেই অতল। রাজর্ষি তাঁর বাংলা অনুবাদে সেই স্তরগুলো ���ুঁড়ে বের করেছেন, যেন বাংলাভাষী পাঠকের জন্যও সেই গহ্বরটিকে করে তোলেন accessible, but not tamed.
এবং এখানেই উঠে আসে অনুবাদ-বিষয়ক সেই চিরন্তন দ্বিধা:
“আপনি কি ভূতের ছায়াকে অনুবাদ করতে পারেন?” — টমাস হ্যাকার আবার প্রশ্ন তোলে।
আমার উত্তর—হ্যাঁ, যদি আপনি রাজর্ষি হন।
৩) ভূত—সেই অদৃশ্য কিন্তু হাড়-কাঁপানো উপাদান: “একটা ধুলো উড়লো, অথচ জানালাগুলো সব বন্ধ ছিল…”
আমরা যারা ভূতের গল্পে মেলোড্রামা খুঁজি—দেহভাঙ্গা করাতের আওয়াজ, রক্তমাখা ললনামূর্তি, বা কারুর কণ্ঠে “কে রয়েছো”—তাদের জন্য এম. আর. জেমস হলেন একধরনের বিপরীতমুখী ধাক্কা, ধুতি পরে আসা এক ঠান্ডা শক।
জেমসের ভূত চিৎকার করে না। তারা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। হেঁটে আসে না—চুইয়ে পড়ে। নিঃশব্দে, ধৈর্য ধরে, পাঠকের চেতনায় সরে আসে যেন শীতল বাষ্প।
❝I am not so much afraid of ghosts as I am of the spaces they make in the air.❞ — Jeanette Winterson, The Powerbook (জেমসের ভূতেরাও এমনই—তারা তাদের উপস্থিতির চেয়ে অনুপস্থিতিতেই ভয়ংকর। ভয়টা তৈরি হয় presence of absence-এ।)
এই বইয়ের পাঁচটি গল্পে ভূত তৎক্ষণাৎ সামনে আসে না। “Lost Hearts”-এ তারা আসে শিশুদের স্বপ্নে, অথবা আদিম বৃত্তির মধ্যে। “Casting the Runes”-এ তারা আসে পাণ্ডুলিপির ভাঁজে ভাঁজে। তাদের বসত পুরনো গির্জার অন্ধকার খোপে, অদ্ভুত লাতিন খোদাইয়ে, অথবা একেবারে মিসিং ফ্রেমে।
“Count Magnus”-এ সেই তিনটি তালা খোলার দৃশ্য মনে আছে? শব্দহীন, অথচ প্রতিটি খোলা তালা যেন একেকটা প্রেতাত্মার নিঃশ্বাস। ভয় এখানে কোনও ঘটনার শব্দ নয়, বরং ঘন হয়ে ওঠা ছায়া। সেই সময় আমি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাইনি—তবে ঠিক টের পেয়েছিলাম, আমার হাতের উপর আলোটা ক্রমশ ফুরিয়ে আসছিল। ভয় তখন ঢোকেনি—কিন্তু ঢোকার উপায় খুঁজছিল।
❝The oldest and strongest emotion of mankind is fear, and the oldest and strongest kind of fear is fear of the unknown.❞ — H. P. Lovecraft, Supernatural Horror in Literature (Lovecraft যেমন বলেন, জেমসের গল্পগুলোর ভূত আমাদের চেনা নিয়ম ভেঙে দেয় না—বরং তারা আমাদের চেনা জগতে অচেনার সূক্ষ্ম ছায়া ফেলে। এবং এই ‘অজানার ভয়’ হল জেমসের ভয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।)
এই ভূতেরা কল্পিত না—তারা ঐতিহাসিক, এবং প্রায়শই শিক্ষিত. এরা গড়পড়তা শ্রাবণ-ভূত নয়, এরা পাণ্ডিত্যের, পুরাতত্ত্বের, শাস্ত্রীয় জ্ঞানের অন্ধকার গুহা থেকে উঠে আসা সত্তা। “A Warning to the Curious”-এর ভূতের ভয় যেন একটি ঐতিহাসিক অন্যায়র প্রতিশোধ, সময়ের জঞ্জাল থেকে উঠে আসা এক অব্যক্ত হাহাকার।
এখানে ভূত কেবল এক ‘তৃতীয় পক্ষ’ নয়—ভূত আমাদের নায়কের ‘পরিণতি’র সম্ভাবনা। একজন অধ্যাপক, পুরাতত্ত্ববিদ, কৌতূহলী পাঠক—এদের মধ্যেই জেমস তৈরি করেন ভূতের ছায়া, এক ধরনের ভবিষ্যত আত্মজ।
❝Ghosts are memory made manifest.❞ — Stephen King (জেমসের ভূতেরাও তেমন—তারা আসলে কোনও না কোনও প্রতীকী স্মৃতি, যা কাগজের, পুরাকথার, শিলালিপির আড়াল থেকে উঠে আসে।)
জেমসের ভূতের গল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক এটাই—সে পাঠকের নিরাপত্তাবোধকে সরিয়ে দেয়।
শুরুটা হয় খুব স্বাভাবিকভাবে—একজন মানুষ, একটা সফর, একটা বই অথবা পুরনো কাগজ। তারপর ধীরে ধীরে এসে পড়ে সেই অদৃশ্য উপাদানটি, যা একটা ঘরকে ঘর রাখে না, একটা আলোকে আলো রাখে না, এবং একটা গায়ে দেওয়া কাঁথাকেও রাখে না উষ্ণ।
শেষে একটা কথাই বলা যায়: জেমসের ভূতের ভয় যেন শীতের সকালে আয়নায় জমা জলবাষ্প—স্পষ্ট নয়, কিন্তু টের পাওয়া যায়। এবং তার ছোঁয়াতে আপনার ঘাড়ের নিচে, নিঃশ্বাসের পাশে, গায়ে হিম জমে ওঠে।
৪) ভয়—প্লিজিং টেরর, না ক্রিপিং রিয়েলিটি?
ভয়ের একটা নিজস্ব স্বর থাকে—শব্দ নয়, স্বর। ঠিক যেমন প্রতিটা লেখকের হাতের লেখা আলাদা, তেমনই তাঁদের ভয়ও আলাদা ছাপে ছাপা। লাভক্র্যাফটের ভয় বিশাল, কসমিক, আছড়ে পড়া ঢেউয়ের মতো—সে আমাদের শূন্যতার দিকে তাকাতে বাধ্য করে। আর এম. আর. জেমস?
জেমসের ভয় নিঃশব্দে হাঁটে।
তার ভয় চুপচাপ একটা ঘরে ঢোকে, মেঝেতে বসে পড়ে, আলো নিভিয়ে দেয় না—আলোর পাশে বসে কাঁধ ছুঁয়ে দেয়।
❝Monsters are real, and ghosts are real too. They live inside us, and sometimes, they win.❞ — Stephen King (জেমসের গল্পে ভূত শুধু বাইরের নয়—তারা ভিতরেরও। আর ভয়? সেটা আত্মার অভ্যন্তরে বসে গলা নামিয়ে কথা বলে।)
“স্কুলের গল্প” তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কোনও লাফ-দেওয়া ভূত নেই, নেই কাটা গলা কিংবা রক্তস্নাত রাস্তাঘাট। ভয়টা আসে— বুকের ভেতরে।
এক ছাত্র, এক নিস্তরঙ্গ বন্ধুত্ব, তার মধ্যেই ঢুকে পড়ে এমন এক অতীত, যা আজও ক্লাসরুমের করিডরে ছায়া ফেলে। শেষটা যেন এক ফিকশনাল শাটডাউন—হ্যাং হয়ে যাওয়া বাস্তবতা। ভয় এখানে শব্দে নয়—পেজের ফাঁকফোকরে।
রাজর্ষির অনুবাদ এই ভয়কে আরও সূক্ষ্ম, আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে। তিনি শব্দ অনুবাদ করেননি—ভয়ের অভিজ্ঞতা অনুবাদ করেছেন।
প্রতিটি গল্পের শেষে তাঁর সংক্ষিপ্ত টীকা, ব্যাখ্যা বা কালচারাল টানাপোড়েনের অনুবাদ, এগুলো পাঠককে বইয়ের পেছনের দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকতে দেয়।
তবে দরজাটা পুরো খোলা নয়—আলোও পুরো নেই। আর এটাই সেই ভয়, যা পাঠকের অনুভবকেই তার ভয়ের যন্ত্র বানিয়ে তোলে।
❝The ghost story is a pleasing terror. Not destructive dread, but aesthetic horror.❞ — M.R. James, Introduction to More Ghost Stories (জেমসের কাছে ভূতের গল্পের ‘ট্রু এইম’—পাঠককে এমন ভয় দেখানো যা আনন্দ দেয়, আতঙ্ক নয়—প্লিজিং টেরর।)
এখানে রাজর্ষি নিজের অনুবাদক-সত্তাকে একজন মাঝখানের ভূতের মতো ব্যবহার করেন—তিনি পাঠকের সামনে বসে বলেন না, “এই দেখো, এখানে ভূত!”
তিনি শুধু আলতো করে কাঁধে হাত রাখেন, আর বলেন, “দ্যাখো না একবার, ওখানে আলো একটু কম।” আর আপনি দেখেন, সেই আলোতে কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে।
এই ভয় বর্ণনামূলক নয়, এটা অভিজ্ঞতালব্ধ—এই ভয় পাঠককে ভাঙে না, বরং ভিতর থেকে গিলে নেয়।
এই ভয় হল সেই মুহূর্ত, যখন আপনি ফোনের টর্চ জ্বালান, আর আলোটা যা দেখাতে চায়, তার চেয়ে বেশি কিছু হয়ে ওঠে সে নিজেই।
৫) অনুবাদ—এক ভাষা থেকে অন্য ভাষার বুকে পা ফেলা
❝Without translation, we would be living in provinces bordering on silence.❞ — George Steiner, After Babel (অনুবাদ মানেই শুধুমাত্র শব্দ বদল নয়—এটা হল নীরবতা থেকে উচ্চারণে পা ফেলা। আর ভূতের গল্পে? আরও গভীর। সেখানে প্রতিটি শব্দই দরজা, প্রতিটি বাক্যই কোনও এক মুখ বুজে থাকা অতীতের নিশ্বাস।)
“অনুবাদ কি প্রতারণা?”—আমি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিই অন্ধকারের দিকে।
আমার কাল্পনিক সংলাপক, যার নাম এই পর্বে লুনা ভার্মিলিয়ন (সে নাকি এক হেলসিং হাউসের লাইব্রেরিয়ান), হেসে বলে— “প্রতারণা? না, অনুবাদ হল এক পরকীয়া প্রেম—যেখানে দুটি ভাষা লুকিয়ে লুকিয়ে একে অপরকে ছুঁতে চায়।”
এই বইয়ের অনুবাদকে বাংলা ভূতের সাহিত্যে নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বলা যায়।
রাজর্ষি গুপ্ত এখানে অনুবাদ করেননি শুধু, করেছেন এক সাহিত্যিক পুনর্নির্মাণ।
“হৃদয়হারা” গল্পে স্টিফেনের অভিজ্ঞতা, তার আশ্রয় পাওয়া, তার দুশ্চিন্তা, মূল ইংরেজি গল্পে এগোচ্ছে ধীর অথচ ধাপে ধাপে।
বাংলা অনুবাদে সেই গতি অক্ষুণ্ণ থেকেও যেন নতুন এক ছন্দ পেয়েছে—একটা গা-জ্বলা ছায়াসংগীত, যার ভিতর দিয়ে শব্দরা হেঁটে যায়।
এই অনুবাদ শুধু শব্দের পুনর্গঠন নয়—এটি ভয়ের আবহের ভাষাগত পুনঃপ্রতিষ্ঠা। অনুবাদক জেমসের পৃথিবীটাকে শুধু বাংলায় অনুবাদ করেননি—তাঁর ভূতদের বাংলা বানিয়ে ফেলেছেন।
এমনকি ভূতের অভিব্যক্তি—তা সে "low, rustling noise" হোক, বা "the faint sigh behind the door"—সব কিছু যেন বাংলার নিজস্ব শ্রুতির ভেতরে এসে পড়ে, একটা “চুপচাপ কী সব” হয়ে ওঠে।
❝Translation is not a matter of words only: it is a matter of making intelligible a whole culture.❞ — Anthony Burgess (রাজর্ষি সেটাই করেছেন—জেমসের সংস্কৃতি, তার প্রেক্ষিত, তাঁর ইংরেজি কুসংস্কার, তাঁর উইথচ্যাপেল মিথ—এসব বাংলায় রূপান্তর না করে, ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “এই গল্পটা ইং��্যান্ডের”—কিন্তু আমি তোমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি তার প্রতিটি ল্যাটিন শব্দ, প্রতিটি আনইংলিশ বুনিয়াদ।)
আর এই ব্যাখ্যা গল্পের গায়ে জোড়াতালি নয়, বরং সে হল যেন সেই আলোটা, যা মোমবাতির মতো ঝিমিয়ে উঠতে উঠতে কোন হঠাৎ আঁধার-কোণটা দেখতে দেয়।
আরও যা উজ্জ্বল করে তুলেছে অনুবাদটিকে, তা হল রাজর্ষির সাহস— তিনি বাংলাকে “সহজপাঠের বাংলা” করেননি, বরং তার মধ্যে ঢুকিয়েছেন এমন কিছু শব্দ, ব্যাকরণ, গঠন— যাতে ভয়ের ধ্বনি আরও গভীরে পৌঁছায়।
গল্প পড়তে পড়তে আমার একটা জায়গায় মনে হয়েছিল— “বাংলা যে এতটা তীক্ষ্ণ, ঘন, এবং প্রাচীনধর্মী হতে পারে, তা আমরা কত সহজে ভুলে যাই…”
এই অনুবাদ সেই ভুলটা শুধরে দেয়।
❝Translation is a kind of transubstantiation. A spirit enters a new body.❞ — Umberto Eco (জেমসের প্রতিটি গল্প যেন বাংলায় এসে নতুন শরীর পেয়েছে—তবে আত্মা সেই পুরনো, যার মুখ দেখা যায় না, কিন্তু ঘাড়ের উপর তার ছায়া অনুভব করা যায়।)
৬) সংস্কৃতির ছায়াপথ : এক ‘অন্য ইংল্যান্ড’ অভিজ্ঞতা
❝Ghosts are always about the return of the repressed.❞ — Jacques Derrida, “Specters of Marx” (ভূত আসলে নিছক অতীত নয়, তা ইতিহাসের এমন এক রূপ যা চাপা পড়েও ফিরে আসে, অচেনা ছদ্মবেশে। আর এম. আর. জেমসের ভূতেরাও ঠিক সেরকম—প্রাচীন কালের ভুলে-যাওয়া অনুষঙ্গের প্রতিশোধ-স্বরূপ।)
এম. আর. জেমস ছিলেন এক ব্রিটিশ antiquarian—ধর্মতাত্ত্বিক, ইতিহাসের পাঠক, এবং এক নিঃশব্দ লৌকিকতন্ত্রের আর্কাইভার। তিনি ভূতকে বানালেন সংস্কৃতির ফল।
নরকের কুয়ো নয়—একটা dusty library’র গোপন খোপ, কিংবা একটা ল্যাটিন গ্রন্থের অন্ধকার পাতাই এনে দিল যমদূত।
তার ভূতেরা ভয় দেখায় না প্রথমেই।
তারা আসে ধীরে—পাণ্ডুলিপির নিচে থেকে, খ্রিস্টীয় ধ্বংসাবশেষের গা থেকে, কিংবা রোমান সেল্টিক শিলালিপির ধূলো ঝেড়ে।
আর এই সবই বাংলা অনুবাদে রাজর্ষি গুপ্ত ধরে এনেছেন এমনভাবে, যেন ইংল্যান্ডটাকে বাংলা বানাননি, কিন্তু বাংলার পাঠকদের জন্য এক মানচিত্র এঁকেছেন— যার পরতে পরতে আছে সেই ইংল্যান্ডের পরিসর, তার বিশ্বাস, তার লোকবিশ্বাস।
❝Every culture invents the ghosts it deserves.❞ — David Punter, The Literature of Terror (ভূতের গল্প মানেই শুধু ছায়া নয়, তা একেকটা সমাজের নিজেরই ইতিহাসের মুখোমুখি হওয়া। রাজর্ষির অনুবাদেও সেটা পরিষ্কার—জেমসের প্রতিটি ভূত আসলে একেকটা সামাজিক গভীরতা।)
এই অনুবাদে রাজর্ষি করেননি cultural erasure— তিনি ইংরেজিকে বাংলা বানানোর চেষ্টা করেননি।
তাঁর অনুবাদ হল bilingual consciousness-এর অনন্য নিদর্শন। তাঁর প্রতিটি গল্প শেষে থাকা annotation বা টীকা— এটা গল্পের পরে বসানো একটা academic চশমা নয়, বরং পাঠকের ভয়-অনুভূতিকে বৌদ্ধিক আলোয় দেখতে শেখায়।
যেমন “কাউন্ট ম্যাগনাস”-এ যে জায়গার নাম, যে তিনটে তালা, কিংবা যে অ্যাবি’র ইতিহাস— সব কিছুকে রাজর্ষি পাঠকের কাছে ভাঙিয়ে দিয়েছেন প্রাসঙ্গিক তথ্যের মাধ্যমে। তিনি বুঝিয়েছেন—এই ভূত একপাশে সাহিত্যের, আরেকপাশে ইতিহাসের। তার কালচারে ভয়—তবে সেই ভয় হল এক ঐতিহাসিক রিপ্রেশন।
একজন পাঠক মন্তব্য করেছিলেন, “গল্পে কালচারাল গ্যাপ থাকলেও, রাজর্ষির টীকা সেই গ্যাপ পেরিয়ে দেয়।”
আমি বলি, টীকা এখানে সেতুবন্ধন নয়, বরং আয়না।
একটা আয়না, যেখানে পাঠক দেখতে পায় তাঁর নিজের ভয়—কিন্তু অন্যের মুখে।
এই cultural oscillation— এই দ্বৈত ভাষা ও অভিজ্ঞতার দোলাচল— তাই "ছায়া কায়া ভয়"-কে একটা ভূতের বই নয় শুধু, একটা ঐতিহাসিক ভূতের ভূগোল করে তোলে।
৭) সপ্তম সুর : পলিফোনি—পাঠক, পর্যালোচক ও প্রতিধ্বনি
❝True terror is to wake up one morning and discover that your high school class is running the country.❞ — Kurt Vonnegut (হাস্যরসের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ভয়ই হয়তো সবচেয়ে গভীর। জেমসের গল্পগুলোতেও এমনি এক বিস্মৃত-ভয়—যেটা পাঠককে জোর করে না, বরং পাশ ফিরে শুয়ে থাকে, ঠিক আপনার বিছানার পাশে।)
এই বইটা পড়ার সময় আমি একা ছিলাম না।
আমার সঙ্গে ছিল মৌষুমী। মেঘলা দিনে ভূতের গল্প পড়ার দোসর।
সে বলল—
“আমার মনে হচ্ছে ‘কাস্টিং দ্য রুনস’ গল্পটা প্রায় এক টুকরো হারানো কবিতা।”
“ভয় এখানে কোনও শব্দ নয়, এটা এক ধরনের স্পন্দন।”
আমার ছাত্র সায়ন—সেই যে অর্ধেকটা হেডফোনে আর অর্ধেকটা কফির কাপে থাকে— সে পড়ার পর মুখ তুলল—
“আমি ভেবেছিলাম ভয়ের গল্প মানেই রক্ত, জবরদস্তি, আর হইচই। এই গল্পগুলো পড়ে বুঝলাম ভয়ের গভীরতা শব্দে নয়, ছায়ায়।”
“এখানে ভূত বলে কিছু নেই—তবু আছে...”
❝The oldest and strongest emotion of mankind is fear, and the oldest and strongest kind of fear is fear of the unknown.❞ — H. P. Lovecraft, Supernatural Horror in Literature (জেমস ঠিক এই জায়গাটায় খেলেন। তিনি "অজানার ভয়" সৃষ্টি করেন, কোনও নির্দিষ্ট মুখ বা হাত বা রক্ত দিয়ে নয়, বরং অনিশ্চয়তার ধোঁয়ায়। আর পাঠক? সে এই অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজেই ভয় তৈরি করে।)
এই সংকলনের বড় গুণ হল, গল্পগুলো পাঠককে ভয় দেখায় না—তারা পাঠককে ভয়-এর মধ্যে বসিয়ে দেয়।
আর রাজর্ষি এই সংলাপ তৈরি করেছেন অনুবাদের আড়ালে নয়, বরং তার আলোয়।
আমি একদিন কল্পনায় এক অদ্ভুত সংলাপ কল্পনা করেছিলাম:
আমি (রিভিউকার): “জেমস তো ভয় না দেখিয়ে ভয় শেখান!”
পাঠক ১ (চায়ের দোকানে): “এই ভয়টা... ওই ‘ওপাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে’—এইরকম।”
পাঠক ২ (পিএইচডি স্কলার, হাসেন না): “এটি ল্যাটেন্ট ট্রমার একটি ভাষাগত ছায়াবিন্দু। ধ্বনি-প্রতিধ্বনির ভয়।”
আমি: “বাহ, টোস্ট খাবেন?”
পাঠক ২: “না, আমি শুধু ধোঁয়া নিই।”
এই বই সেই ভয়কে জন্ম দেয়, যেখানে গল্প আর পাঠকের মধ্যে রয়ে যায় এক অসমাপ্ততা— এক টান—যা ভাষার ভেতরেও নেই, কিন্তু পাঠকের অভিজ্ঞতায় পাথরের মতো ভারী।
❝A ghost is never simply a presence, it is always a haunted absence.❞ — Mark Fisher, The Weird and the Eerie
আর এই ‘haunted absence’ জেমসের ভূতের গল্পে, রাজর্ষির অনুবাদে, আর পাঠকের মনে—সবখানেই ছায়ার মতো ঘোরাফেরা করে।
এই পলিফোনি তাই শুধু পাঠকের নয়, এটা এক ভূতের ‘আলাপন’—যেখানে কেউ নেই, তবুও কথা হচ্ছে।
৮) অষ্টম অধ্যায় : নির্মাণ ও মুখবন্ধ—ভবিষ্যতের দরজায় ঠকঠকানি
❝Ghost stories are a way of looking backwards and forwards at once, through the same half-closed eye.❞ — Sarah Waters
"গল্প শুরুর আগে"—শুধু এক ভূমিকা নয়, বরং এক অন্তর্জগৎ।
রাজর্ষি এখানে কেবল এম আর জেমসকে নয়, একটুখানি নিজেকেও উন্মোচন করেছেন। ভয়ের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, ghost-story genre সম্পর্কে তাঁর একাডেমিক ও হৃদয়গ্রাহী বিশ্লেষণ—সব মিলিয়ে এই মুখবন্ধটি নিজেই এক ghost-map—যেখানে প্রতিটি শব্দ পাঠককে নিয়ে চলে অদেখা কোনো ঘরের দিকে, যার দরজা ঠিক বন্ধ নয়, আবার পুরো খোলাও নয়।
জেমস লিখেছিলেন, "A good ghost story, to be effective, should be written with reticence, and quietly let the horror grow."
এই reticence বা সংযম রাজর্ষির প্রবন্ধে আছে, এবং তার কারণেই পাঠক ভয় পায়—না উচ্চারণে, বরং ইঙ্গিতে।
প্রসাদরঞ্জন রায়ের ভূমিকাও তেমনই নিপুণ। সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর, পাঠকের মনে বইটির তাৎপর্য বিষয়ে একটি বোধ গেঁথে দেন, যেন কোনও পুরনো চার্চের দরজার গায়ে কুড়ানো খোদাই—কম, কিন্তু অনুপস্থিতি দিয়ে পরিপূর্ণ।
এবার আসা যাক বইয়ের নির্মাণ ও চেহারায়।
ঋত প্রকাশন যেন সাহিত্যের ভূতের ঘরকে তুলে এনেছে এক আধুনিক মণ্ডপে। প্রিন্ট কোয়ালিটি, পাতার গন্ধ, বাঁধাই—সব একান্ত মনোযোগে করা।
মৃণাল শীল যে প্রচ্ছদ এঁকেছেন, সেটি যেন light and shadow-এর প্রেমে গড়া এক মুখ। "ছায়া কায়া ভয়" শুধু নামে নয়, দৃষ্টিতেও যেন বিভ্রম তৈরি করে।
বইটির ঘ্রাণও এক ধরনের আখ্যান। সে বলে,
“আসুন, আজ রাতে আলো নেভান, আর প্রথম পাতাটি উল্টে দিন— কিন্তু মনে রাখবেন, একবার শুরু করলে, হয়তো আপনাকে ফিরতে হবে পিছনের দরজা দিয়ে।”
উপসংহার: ছায়া কায়া ভয় নিছক পাঁচটি ভূতের গল্পের অনুবাদ নয়—এটি এক অলৌকিক চাবিকাঠি, যা শব্দে নয়, সুরে বাজে। রাজর্ষি গুপ্ত এখানে কেবল এম আর জেমসকে বাংলায় আনেননি, গড়ে তুলেছেন এক শিহরিত পাঠসংস্কৃতি—ছায়ার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে, আতঙ্কের অলিন্দ জুড়ে।
আমরাও জানি—ভয় সবসময় দরজার কড়া নড়ে না, কখনও সে কেবল ফিসফিসিয়ে ডাকে— “আসুন, ভয়ের রাজ্যে পদার্পণ করতে আজ্ঞা হোক…”
ভয় পেতে আমরা সবাই কম বেশি ভালোবাসি, সে বয়স যাই হোক না কেন। সেই ভয় যদি গল্পের বইয়ের আকারে হাতের মুঠোয় এসে হাজির হয়, তবে তার অনুভূতিই আলাদা। সাহিত্যিক এম.আর.জেমসের লেখা এমনই পাঁচটি অতিলৌকিক গল্পের অনুবাদ নিয়ে হাজির হয়েছে এই বই। ঋত প্রকাশন থেকে প্রকাশিত এবং রাজর্ষি গুপ্ত অনুদিত "ছায়া কায়া ভয়" নিঃসন্দেহে একটি দারুণ সৃষ্টি।মৃণাল শীলের অসামান্য প্রচ্ছদ, ঋত প্রকাশনের সুন্দর উপস্থাপনা আর সাহিত্যিক এম.আর.জেমসের সৃষ্টির সাথে রাজর্ষি গুপ্তের অনুবাদের মেলবন্ধন এক অনন্য নজির গড়েছে। অতিলৌকিক গল্পের জগতে এম.আর.জেমসের অবদান অবিস্মরণীয়। তাঁর লেখা আলাদা স্বাদের ভয়ের গল্প 'লস্ট হার্টস', 'কাউন্ট ম্যাগনাস, 'আ স্কুল স্টোরি', 'কাস্টিং র্্যুনস' এবং 'আ ওয়ার্নিং টু দ্য কিউরিয়াস' দিয়ে সাজানো এই সংকলন। এই গল্পগুলিকে পাঠকের মনের মাঝে স্থান দিতে মূল ভূমিকা নিয়েছে রাজর্ষি গুপ্তের অসাধারণ অনুবাদ। এত সহজ ভাষায় সটীক অনুবাদ করে গল্পগুলোর গ্রহণযোগ্যতা তিনি আরও বাড়িয়ে তুলেছেন। মূল গল্পের ভয়ের আবহ অনুবাদেও তিনি সাবলীল ভাবেই তুলে আনতে পেরেছেন। পাঠকের মনেও সেই ভয় দারুণভাবে সঞ্চারিত হতে পেরেছে। তাই পাঠক যদি একটু ভিন্ন স্বাদের ভয় চেখে দেখতে চান তাহলে বইটি একবার হাতে তুলে দেখতে পারেন।
এম আর জেমসের লেখনীর গুণগতমান নিয়ে সমালোচনা করবো এমন স্পর্ধা আমার নেই। যে ব্যক্তির নাম অনুসারে ইংরেজি অলৌকিক সাহিত্যজগতে একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধারা তৈরি হয়েছে, তাঁকে নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার মত নেই, তাঁর উদ্দেশ্যে থাক আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম। বরং রাজর্ষিবাবুর অনুবাদ নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। এককথায় বলতে গেলে, অনবদ্য অনুবাদ। সত্যি, এমন অসাধারণ মানের বাংলা অনুবাদ জীবনে খুব কমই পড়েছি। শুধুমাত্র গল্পের ভাষা পরিবর্তন নয়, বাক্যগঠন বা শব্দচয়ন এতটাই সাবলীল যে পড়তে পড়তে মনেই হয় না যে মূল গল্পটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভাষায় লেখা হয়েছে। এখানেই সম্ভবত একজন অনুবাদকের শ্রেষ্ঠত্ব। তাছাড়া প্রতিটি গল্পের শেষে প্রয়োজনীয় টিকা এবং বিশ্লেষণ গল্পের অনেক এমন বিষয়বস্তুকে বুঝতে সাহায্য করে যা জানা না থাকলে হয়তো ভয়াল রসের আস্বাদন কিছুটা অসম্পূর্ণই রয়ে যেত। আশা করবো রাজর্ষিবাবু আরো এমন অনেক তুলনাহীন অনুবাদ আগামী দিনে আমাদের উপহার দেবেন।