দুই যুবক যুবতী অগস্ত্য এবং ইরতেনসেনু নিজেদের অজান্তেই প্রবেশ করে রহস্যের চক্রব্যূহে। দিগন্তে যে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে তার ছায়া কি পড়ে না অগস্ত্যের উপরেও? কে সে? কোন গোপনীয়তাকে বুকে বয়ে নিয়ে বেড়ায় অগস্ত্য? ইরতেনসেনুই বা কতটুকু চেনে নিজেকে? তাদের অভিযানে কি তারা পাবে সত্যকে খুঁজে নিতে? পারবে সর্বনাশকে আটকাতে? নাকি অসত্যের জয়ই অবশ্যম্ভাবী?
ধর্ম-বিজ্ঞান, ঈশ্বর-শয়তান, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের এই আবর্তে কি আলোর সন্ধান মিলবে আদৌ? এই উপন্যাসে এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়েছে দুই দেশ, ভারতবর্ষ এবং মিশর।
এই কাহিনি আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগের। মিশরের সিংহাসনে তখন রানি হাতসেপসুত। মহাসমুদ্রের ওপারে ভারতে তখন গড়ে উঠছে ছোটো ও বড়ো নানা রাজ্য। বিস্মৃতির ধুলোর তলায় লুকিয়ে পড়া সভ্যতার জন্য হাহাকারের পাশাপাশি নতুন জ্ঞান, বিশেষত প্রযুক্তিরও বিকাশ ঘটছে সেখানে। এই দুই দেশ তথা সভ্যতার মধ্যে সংযোজক হয়ে উঠল বিজ্ঞানের সাধক এক দুঃসাহসী যুবক। ঋগ্বেদ থেকে পুরাণ তাকে ঋষি নামে চিনলেও এই কাহিনিতে তার আরাধ্য হল বিজ্ঞান, আর তপস্যা হল মানবকল্যাণ। তার নাম অগস্ত্য! নতুন বিদ্যার অন্বেষণে মিশরে গিয়ে সে জড়িয়ে পড়েছিল এক রোমহর্ষক ঘটনার সঙ্গে। তার মাধ্যমেই সে পেয়েছিল নিজের জীবনসঙ্গিনী— মেধা ও প্রজ্ঞায় অতুলনীয়া ইরতেনসেনু-কে। তাকে নিয়ে দেশে ফিরেছিল সে। কিন্তু... মিশরের আকাশে ঘনাল মহা সংকটের মেঘ। নিছক রানি বা রাজার প্রতিনিধি নন, সাক্ষাৎ ফারাও হাতসেপসুত সাহায্য চাইলেন তাঁদের। সাগরপাড়ি দিল অগস্ত্য, ইরতেনসেনু, আর অগস্ত্যের সবচেয়ে বড়ো ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু তথা অসামান্য নাবিক উপল। তারপর কী হল? হাতসেপসুত তথা মিশর কি রক্ষা পেল সংকট থেকে? কোন রহস্য লুকিয়ে আছে অগস্ত্যের অতীতে, যা সে কোনোমতেই প্রকাশ করতে চায় না? নীলনদের সঙ্গে কি কোনো এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে জড়িয়ে গেছে ভারতের এক হারিয়ে যাওয়া নদী? এই নিয়েই লেখা হয়েছে আলোচ্য উপন্যাসটি। এর ভালো দিক কী-কী? প্রথমত, লেখনী অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ ও নির্ভার। 'সম্ভ্রান্তশালী' টাইপের এক-আধটা বেয়াড়া শব্দ, বাক্যগুলোকে 'যে-সে' দিয়ে লেখার সামান্য প্রবণতা বাদ দিলে এমন আধুনিক ও সাবলীল লেখা পড়েও আরাম। দ্বিতীয়ত, গল্প একেবারে শ্বাসরোধী। মোট সাতাশটি অধ্যায়ের প্রতিটিই এমন যে একটি শেষ হওয়ামাত্র অন্যটি শুরু করতে হয়। ছেড়ে রাখলে রীতিমতো বদহজম-জনিত বুকজ্বালা হতে থাকে। একেবারে শেষ করে মনে হয়, শান্তি হল! তৃতীয়ত, পুরাণের বিনির্মাণ বা ইতিহাসের নব ব্যাখ্যার বাইরেও এই লেখাতে সত্যিকারের ইতিহাস আছে। কিন্তু তার উপস্থিতি এমনভাবে দেখা দিয়েছে যা মনকে ক্লান্ত করে না; বরং অধিকতর পাঠে উৎসাহী করে তোলে। সত্যিকারের ভালো ফিকশন কিন্তু ঠিক এভাবেই পাঠকের মনে পরশমণি ছুঁইয়ে যায়। চতুর্থত, পাঠককে রোমাঞ্চিত বা ভীত করার পরিবর্তে এই লেখা একটি জীবনবোধের সন্ধান দেয়। তা সত্য, অসত্য এবং অর্ধসত্যের চিরন্তন দ্বন্দ্বের কথা বলে— যার আগুনে দগ্ধ হয় মানুষের বিবেক এবং চেতনা। তা বিজ্ঞানের সম্ভাবনা ও সম্ভাব্যতার কথা বলে। ইতিহাসের অনেক নীরস তথ্যকে "যদি এমন হত..."— জাতীয় প্রশ্নের আকার দেয় এটি। সর্বোপরি এই লেখা বলে, প্রতিটি কুসুমেই কীটের সম্ভাবনা থেকে যায়; আবার গরলের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অমৃতের ইশারা। এর খারাপ দিক কী-কী? এটি এমনিতে ইতিহাস-নির্ভর, বিজ্ঞান-আধারিত আখ্যান। কিন্তু এতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দু'টি ঘটনার সম্পূর্ণ অলৌকিক ব্যাখ্যা তথা বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। ওটুকুই দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা টুকরোর মতো অস্বস্তি তৈরি করল। সামগ্রিকভাবে বলব, এটি নিঃসন্দেহে পড়ার মতো, উপভোগ করার মতো এবং ভাববার মতো একটি লেখা। ভরসা রাখি যে মিশর এবং ভারতের এমন আরও সম্ভাব্য সংযোগ ধরা পড়বে লেখকের হাতে। তাঁর সেই লেখারা হয়তো নতুন করে আমাদের ভাবাবে, নতুন চোখে ইতিহাসকে দেখাবে। তাঁর উদ্দেশে শুভেচ্ছা রইল।
প্রাচীন ভারতে হিন্দু মেয়েদের শিক্ষা বিষয়ক আলোচনা হলে প্রথমেই যার কথা মনে আসে তিনি হলেন লোপামুদ্রা। এছাড়া অগস্ত মুনির নানা চমৎকার কীর্তির কথা হিন্দু ধর্মীয় প্রায় সকল গ্রন্থেই ছড়িয়ে আছে। পুরাণের গল্পগুলো সম্পূর্ণ বর্তমানের জ্ঞান অনুসারে দেখলে অসম্ভব কল্পনা বলেই মনে হয়। কিন্তু পুরোটাই কল্পনা বলে হতে পারে না, হয়ত সত্যের উপর প্রশংসার পর্দা পড়ে পড়ে সেটা অলৌকিক হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিককালে কিছু লেখক নিজেদের কল্পনা দিয়ে এসব কল্পনার পর্দাকে সরিয়ে পৌরোনিক অলৌকিকতাকে সরিয়ে তাদের লৌকিকত্ব দান করছেন(কাটা দিয়ে কাটা তোলা :D )। ভারতের অমীশ ত্রিপাটির শিব ত্রিলোজি , মাহবুব লেনিনের অভাজনের ভারত এ ঘরানার বিখ্যাত বই, আর আমার সর্বশেষ পড়া অনির্বান ঘোষের "হারানো সূর্যের খোজে"- সবগুলোতেই লৌকিকতার চশমায় পুরানপকে দেখার চেষ্টা হয়েছে। তাদের এ প্রচেষ্টাকে আমি শ্রদ্ধা জানায়।
এই বইটিতে ভারত আর মিশরের ইতিহাসকে এক্সুত্রে গাথা হয়েছে চমৎকারভাবে। এর আগে লেখকের হায়রোগ্লিফের দেশে পড়েছিলাম। প্রচ্ছদ আর নাম দেখে ভেবেছিলাম এটাও হয়ত মিশরীয় সভ্যতাকে নিয়ে লেখা কোন উপন্যাস হবে।
কিন্তু ভারত ও মিশরের ইতিহাস আর পুরান সমভাবে এই উপন্যাসকে সমৃদ্ধ করে গেছে।ভারতের সূর্যদেব আর মিশরের আমুন রা দুজনেরই আশীর্বাদ ও আলো বর্ষিত হয়েছে অগস্ত, উপল আর ইরতেনসেনুর উপর। যেন এক টাইম মেশিনে করে ঘুরে আসা হল প্রাচীন ভারত, নীলনদ, মিশর , সিন্ধু সভ্যতা। লেখকের কাছে আশা রাখি তিনি ভবিষ্যতেও এমন দারুন সব ইতিহাস আশ্রিত বই উপহার দিয়ে যাবেন পাথকদের। আমাদের পুরানের গল্পগুলোকে , আমাদের ইতিহাসকে দেখার ও বোঝার জন্য এইরকম বই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিবে।
অগস্ত্য যাত্রা কথাটা শুনেছেন নিশ্চিত? এই বাগধারাটি যাকে নিয়ে সেই অগস্ত্য মুনি ছিলেন প্রাচীন ভারতের একজন বিজ্ঞানী। প্রথম ব্যাটারির ব্যবহারের কৃতিত্বটা তাকেই দেওয়া হয়। কথিত আছে অগস্ত্য মুনি সৃষ্টি ক��েছিলেন তার স্ত্রী পরমাসুন্দরী ও বিদূষী লোপামুদ্রাকে। এক বিজ্ঞানীর সাথে এমন অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল সত্যিই? নাকি লোপামুদ্রা ছিলেন এমন কেউ যার ���রিচয় সহজে মেনে নিতে পারত না ভারতীয়রা? আর তাই লোপামুদ্রার মিশরীয় নাম ইরতেনসেনু লুকিয়ে বুদ্ধিমান অগস্ত্য তৈরি করেছিলেন এমন এক গল্প! কারন এ সেই যুগ যখন বিজ্ঞানের চাইতে বিশ্বাস ছিল বেশি গ্রহনযোগ্য।
বলছি তখনকার কথা যখন মিশরের ফারাও হাতসেপসুত। তাকেও হয়তো আপনারা জানেন। ফারাওদের মধ্যে যে সাতজন মাত্র নারীর নাম পাওয়া যায় তাদের মধ্যে একজন ইনি। পুরুষদের টপকে কোনো নারী ফারাও হবেন সেটা সহজ ছিল না মিশরে। হাতসেপসুতকেও মিশরীয়দের মন জয় করতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল এক অলৌকিক ঘটনার, যার পেছনে ছিল অগস্ত্যর বৈজ্ঞানিক বুদ্ধি। ফারাও সেকারণেই আস্থা রাখতেন এই বিজ্ঞানী দম্পতির উপরে। তাই সাম্রাজ্যে যখন ঘনিয়ে এলো ভয়ংকর বিপদ, হাতসেপসুত শরণাপন্ন হলেন ইরতেনসেনু ও অগস্ত্যর।
সেই বিপদ থেকে মিশরকে রক্ষার জন্য ইরতেনসেনু ও অগস্ত্য রওনা হয়েছিলেন নীলনদ পেরিয়ে দূর্গম অঞ্চলে অভিযানে। ধর্ম আর বিজ্ঞানের সূক্ষ সুতোয় এক বন্ধনে জড়িয়েছিল পৃথিবীর প্রাচীনতম দুটি সভ্যতা।
মিশরকে নিয়ে উপন্যাস মানেই আমার প্রিয়। তাই ব্লক কাটিয়ে পড়ে ফেললাম 'হায়রোগ্লিফের দেশে' খ্যাত অনির্বাণ ঘোষ রচিত হারানো সূর্যের খোঁজে। উপন্যাসটিতে প্রাচীন আবহ ধরে রাখায় লেখক সচেতন ছিলেন। তাই একটু ' ভারিক্কি ' ভাষার বর্ণনা করেছেন, বিষয়বস্তু অনুযায়ী সেটার প্রয়োজন ছিল। মিশরীয় সমাজে ব্যবহার করা নামগুলো ঠিকঠাক রেখেছেন। পিরামিডের বদলে বলা হয়েছে ' মের '। পুরাণের সূত্রগুলো ধরে নতুন প্লট তৈরির সাথে সাথে সত্য ইতিহাসকেও লেখক এড়িয়ে যাননি। ভারতবর্ষের সভ্যতার সাথে মিশরীয়দের জ্ঞানের মেলবন্ধনটা যুক্তিযুক্তভাবে পরিবেশন করেছেন। এ ধরণের ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস রচনায় গল্পের গরু গাছে উঠে যায় অনেক ক্ষেত্রে। লেখক এমন কিছু ঘটাননি ভাগ্যিস। ইতিহাস থেকে নেওয়া চরিত্র ও তথ্যের মান রেখেছেন। আঘাত করেননি কোনো ধর্মবিশ্বাসকে। দূষিত বায়ুরোধী মাস্ক, বালিতে লেখা, উড়ুক্কু যান, বৈদ্যুতিক বাল্ব আর সাথে ধর্মবিশ্বাসের বর্ণনায় লেখক মিশরীয়দের বিজ্ঞানমনস্ক ধর্মভিত্তিক সভ্যতার চিত্রটা যথাযথ ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ায় লেখক অনেক কলকব্জার কাজ বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন, সেগুলোতে হোঁচট খেয়েছি। সব ভালো শুধু শেষটায় সব পাত্রপাত্রীর পরিণতি ঠিক গোছানো হয়নি মনে হলো। তাই এটুকু অপ্রাপ্তির দুঃখ রয়ে গেছে।
হুট করেই বইটা হাতে এসেছে। না জেনে শুনে নতুন লেখকের লেখা পড়তে বসলাম গতকালকে। মিশর নিয়ে একটা ধুকপুকানি আজীবনই সঙ্গী হয়ে আছে। কদিন আগে আবার এক বন্ধু পিরামিডের দেশে ঘুরে এসেছে। ফেসবুকে তার ছবির দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে ছিলাম বেশ অনেকক্ষণ। তাই বুঝি নাম আর প্রচ্ছদ দেখেই হাতে তুলে নিয়েছিলাম এই বইখানা। তা এমন লেখা এর আগে উইল্বার স্মিথ ছাড়া আর কারো পড়িনি তেমন। মানে তুলনাটা জমলোনা ঠিক। যা বুঝাতে চাচ্ছি তাও ঠিকমতো বুঝাতে পারছি কই। তবে গল্পের গরু গাছে না তুলে লোকগল্প, ধর্ম, কল্পনা আর বিজ্ঞান এর য সালাদ হয়েছে তা চাখতে বেশ ভাল লাগে।
এ গল্পের মূল নায়ক নায়িকাকে আপনারা চেনেন বোধয়। ঋষি অগ্যস্ত আর তার স্ত্রী লোপামুদ্রাকে তো হিন্দু পূরাণ থেকেই চিনবার কথা। এটুকু পড়ে ভাবছেন যাচ্ছিলাম মিশর আর থামলাম এসে ভারতবর্ষে? এখানেই তো কারসাজি। তা এ গল্পে বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার আছে, দুর্গম পথে যাত্রা আছে, বিশ্বাসঘাতকতা, হত্যা, রহস্য, ফারাও, নীলনদ সব আছে আর আছে এক্টুখানি ভারতের ইতিহাসের ছোঁয়া। মন্দ নয়।
আমার আসল রেটিং ৩.৮ । এই দুষ্টু গুডরিডস তো সেই ভাঙ্গা তারা দেবার যো রাখলোনা।
রম্য কাহিনী বললে যা বোঝায়, এ তাই। বেশ ঝরঝরে ও সুখপাঠ্য লেখা অনির্বানদার। হ্যাঁ দাদাই বলছি, যদিও পার্সোনালি চিনি না কিন্তু ওনার হায়রোগ্লিফিকের দেশে বইটা পড়ে মনে হয়েছিলো বছর চারেকের বড় কোনোও দাদা বুঝি বিকেলের আড্ডায় গল্প বলছে, যাই হোক হায়রোগ্লিফিকের দেশে বইটিতেই ইনি মন জয় করে নিয়েছিলেন আর এই বইয়টিও সেই ভালোবাসায় ইন্ধন জোগাল। এখানে গল্পের প্রবাহ একটি নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুর ওপর। এখানে আছে ইতিহাসের কিছু বিবরণ এবং লেখকের কল্পনার অসাধারণ মিশ্রণ। ভীষণ নিপুন হস্তে মিশর ও ভারতবর্ষকে এক সুতোয় বেঁধে দিয়ছেন, নিজের চোখে আঁকা কিছু চিত্রকে বাস্তবায়ন করেছেন শব্দের মাধ্যমে। সেক্ষেত্রে কল্পনার জল অনেক দূর পর্যন্ত গড়িয়েছে, যেমন মিশরের কোনও দেবতার সাথে হিন্দুদের গরুড়ের মিল খোঁজা বলুন অথবা মকর দেবতার সাম্য নির্নয় মিশরীয় দেবতার সাথে। সর্বসাকুল্যে ঘটনার প্রবাহ এবং উত্তেজনা দুইই উপভোগ্য ছিলো আমার জন্য। বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ার সুবাদে অনেক কিছুই ডিটেইলসে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন এবং সফলও হয়েছেন। তবে আমি কিছু কিছু জায়গায় আটকে গেছি, যেমন বায়ুযানের কার্যকলাপ সম্বন্ধে বিস্তারিত বলছেন যখন তখন, এবং বায়ুযানের দিগ্নির্নয়, ইত্যাদি বিষয়গুলো আমি বুঝতে পারিনি (হয়তো বিজ্ঞানের ছাত্র না হওয়ায়) সেক্ষেত্রে আমার কল্পনাশক্তি আমাকে ডাঁহা ফেল করিয়েছে। আরও একটা জিনিস যেটা ভালো লেগেছে সেটা হলো বিজ্ঞানসত্তার সাতে ঈশ্বরীয় বিশ্বাসে আঘাত না দেওয়াটা, কিছু স্থানে বিজ্ঞানের সাথে সরাসরি ঈশ্বরের সাক্ষাৎ সংঘাতরে উপক্রম হলেও ভীষণ দক্ষতার সাথে দু-পক্ষকেই সমর্থন করেছেন লেখক। আর একটা বিষয় না বললেই নয়, তা হলো লেখার শেষে লেখকের কৈফিয়ত, এটার খুব দরকার ছিলো এটার জন্য অনির্বান দাকে ধন্যবাদ। (আপনার আনারি-মাইন্ডস এর শেষ লেখাটা পড়েছিলা ক্লিটোরিস নিয়ে দারুন লেগেছিল, জানিনা আপনি এটা পড়বেন কিনা, যদি পড়েন, সেই ভেবে জানিয়ে রাখলাম।)
লেখকের প্রথম বই "হায়ারোগ্লিফের দেশে" কেনা হয়ে থাকলেও পড়া হয়নি। তাই এই বইটাই আমার পড়া তার প্রথম বই।
সমগ্র উপন্যাসটি বিস্তৃত হয়েছে ভারত ও মিশরের অগস্ত্য ও ইরতেনসেনুকে নিয়ে। তাদের বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে দেখা হওয়া এবং শেষে একটি জটিল রহস্যময় পরিস্থিতিতে আটকে পড়া। কিভাবে তারা সেই পরিস্থিতির মধ্যে থেকে বিজ্ঞানের সাহায্যে বেরিয়ে আসে এবং এক সুতোয় বাঁধা পড়ে ভারত ও মিশর সেটাই মূল উপাদেয় এই উপন্যাসের।
লেখকের জ্ঞানের তুলনা না করে পারছি না, কিভাবে তিনি ভারত ও মিশরের পুরাণ, ভৌগোলিক বিবরণ এবং বিভিন্ন সংস্কৃতি নিয়ে চর্চা করেছেন তা এই বই পড়লে অনায়াসে বোঝা যায়। কিন্তু পুরাণ, ফ্যান্টাসি, ইতিহাস, মিশর, ভারত, রহস্য, বিজ্ঞান, প্রেম সমস্তকিছু মিলেমিশে থাকলেও এই উপন্যাস কোথাও গিয়ে কিশোরদের জন্য লেখা হয়েছে বলে মনে হয়। বেশ কিছু জায়গায় বর্ণনার সাথে কল্পনা করেও মেলানো যায় না। আবার বর্ণনাগুলো কোথাও কোথাও বেশিই বড় হতে থাকে। বৃহৎ সুন্দর একটা পটভূমি থাকলেও আদতে বইটা তেমন কোনো ছাপ ফেলে না মনে। আবার কোনো নির্দিষ্ট কনক্লুশনও দেয় না। বিদর্ভর রাজা বসুমান ও তাঁর পত্নী এত ভালো করে অগস্ত্য ও ইরতেনসেনুকে আপন করে নেওয়ার পরেও তাদেরকে বোকা বানিয়ে রাজ্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পুরো ঘটনাটাই ভীষণ নিন্দনীয় বলে মনে হয়েছে আমার। কোথাও গিয়ে বইটা কিছু চরিত্রকে অতিরিক্ত স্থাপন করে আর কিছু চরিত্রকে স্থাপন করতেই চায় না।
তাই, আমার মতে এই উপন্যাস যে কোনো কিশোর কিশোরীর খুব পছন্দ হবে। নিতান্তই ব্যক্তিগত মতামত। আপনার ভালো লাগতেই পারে।
The story was rich in information, and the connection between India and Egypt was established seamlessly. However, the main plot, particularly the conclusion, felt weak and predictable. While the author demonstrates strong expertise in historical and informative writing, thriller and adventure may not yet be their strongest suit.
লেখক অনির্বাণ ঘোষের সাথে আমার মতো অনেকেরই পরিচিতি "হায়রোগ্লিফের দেশে" বইটার মাধ্যমে। বহুল তথ্য সম্বলিত গল্প সহজ-সরল ভাষায় বলতে পারার সুবাদেই বইটির সুখ্যাতি এবং লেখকের মুন্সিয়ানার প্রকাশ। সেই রেশ অনির্বাণবাবু তার নতুন বই "হারানো সূর্যের খোঁজে"-তেও ধরে রেখেছেন দিব্যি। বইয়ের দাম নিয়ে দ্বিধাটুকু জয় করতে পারলে এই বই কালেকশনে থাকার জন্য ভালোরকমের উপযুক্ত।
-----------------
লেখক আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় বারবার জানিয়েছেন যে এই বইয়ের সাথে "হায়রোগ্লিফের দেশে"- র গল্পের কোনপ্রকার যোগ নেই। "হারানো সূর্যের খোঁজে" গল্পের সময়কাল মিশরের রাণী হাতসেপসুটের সমসাময়িক। তৎকালীন মিশরের কতিপয় বৈজ্ঞানিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডের শাখাপ্রশাখায় লেখক এরপর জুড়ে দিয়েছেন ভারতের বিদর্ভপ্রদেশকে। ভারতের অগস্ত্য ও মিশরের ইরতেনসেনুর যুগলবন্দীতে দুই দেশে বিজ্ঞানের প্রয়োগের গল্প শুরুতে বলেছেন লেখক। অতঃপর শুরু হয়েছে দুর্গম নীলনদের উৎসে অবস্থিত এক শহরে অবস্থিত বিশেষ গাছের খোঁজে অভিযান। অন্যান্য গল্পের মতোই এখানেও অভিযানের শেষে রয়েছে "ট্যুইস্ট"। এর বেশি কিছু লিখলে বাজেরকমের স্পয়লার হয়ে যাবে।
-----------------------
গল্পে ভালো লাগার উপাদান মাপা এবং খাপে খাপে সাজানো। অতি বাড়াবাড়ির চোটে বিরক্তির জায়গা একেবারেই নেই। পরিমিত কল্পবিজ্ঞান (ফ্যান্টাসি ঠিক বলা যাবে বলে মনে হয় না), মিশরীয় মাইথোলজির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নির্যাস এবং ইতিহাস ও বর্তমানের মধ্যে সাম্য বজায় রেখে সময়োপযোগী সমাজদর্শন মেনে কিশোরপাঠ্য অথচ সব বয়সের পাঠকের ভালো লাগবে এমন অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী লেখার কৃতিত্ব অনির্বাণবাবুর প্রাপ্য।
----------------
গল্পের সাবলীল গতি অনুযায়ী গল্পের শেষে বিদর্ভরাজ বা মিশরীয় সাম্রাজ্ঞীর একটা ছোট্ট উপস্থিতি উপযুক্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারতো গল্পটিকে (কিংবা আভাস দিয়ে যেতে পারতো কোন সিক্যোয়েলের)। ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক চরিত্র নিয়ে নাড়া-ঘাঁটা করলে সাধারণ একটা "কৈফিয়ত"-এর প্রয়োজন পড়ে। লেখক সেটাও সংক্ষেপে মিটিয়েছেন গল্পের শেষে। সব মিলিয়ে গোগ্রাসে পড়ার মতো গল্প। বাজারে এখন এই জঁরের গল্প প্রচুর, তবুও এই বই ধারে ও ভারে আলাদা ছাপ রেখে যাওয়ার উপযুক্ত।
-----------------------
সুবিনয় দাসের আঁকা প্রচ্ছদটি দারুণ হয়েছে। বইয়ের মধ্যে ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের আরো কিছু ইলাস্ট্রেশন পেলে মন্দ হত না। বইয়ের বাঁধাই, পৃষ্ঠার মান, ছাপার কালি এক্কেবারে ঠিকঠাক। বানান ভুল হার্ডলি একটা বা দুটো ("উদ্দেশ্যে" আর "উদ্দেশে" বানানের ভালো ব্যবহারও দেখলাম)। কিন্তু খচখচানির একমাত্র জায়গা হল দাম। লেখক ও প্রকাশকের প্রতি সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখেও মনে হয়েছে ২৭২ পৃষ্ঠার প্রথম এডিশনের বইটার দাম ৪২৫ এর বদলে ৩৫০ এর আশেপাশে হলে অধিকাংশ পাঠক আরেকটু তৃপ্ত হতেন। দাম বেশি মনে হলেও লেখকের লেখনীগুণে ক্ষণিকের দৈন্য ভুলে যাওয়া যায়।
সময়ের গর্ভে ঘুমিয়ে থাকা সাড়ে তিন হাজার বছরের পুরোনো এক বিচিত্র পৃথিবীকে কেন্দ্র করে রচিত এই উপন্যাস। রানি হাতসেপসুতের মিশর তখন উজ্জ্বল, অথচ অনিশ্চয়তার দীর্ঘ ছায়ায় আবৃত; আর দূর ভারতবর্ষে জেগে উঠছে নতুন রাজ্য ও নবজাগরণের প্রথম আভাস। বিস্মৃত সভ্যতার ধ্বংসাবশেষে যখন ইতিহাস নিজের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি খুঁজে ফেরে, তখনই দুই দেশের মধ্যে সেতুবন্ধনের দায় কাঁধে তুলে নেন এক তরুণ অনুসন্ধিৎসু—অগস্ত্য।
নতুন বিদ্যার সন্ধানে মিশরে গিয়ে তিনি জড়িয়ে পড়েন রহস্যময় এক ঘূর্ণাবর্তে। সেই ঘূর্ণির মাঝেই আবির্ভূত হন ইরতেনসেনু—তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, গভীর প্রজ্ঞা ও অপূর্ব আভায় মণ্ডিত এক নারী, যিনি ক্রমে হয়ে ওঠেন অগস্ত্যের হৃদয়ের নক্ষত্র। তাঁকে নিয়ে অগস্ত্য ফিরে আসেন নিজের মাতৃভূমিতে। কিন্তু ইতিহাসের স্রোতে শান্তি কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মিশরের আকাশে পুনরায় জমতে থাকে সংকটের কালো মেঘ, আর সাহায্যের আহ্বান জানান স্বয়ং হাতসেপসুত। তারপর? অগস্ত্য ও ইরতেনসেনু কি ফিরেছিল? মিশর কি সত্যিই ছিঁড়ে বেরোতে পারল সেই ভয়ানক অন্ধকারের শিকল থেকে? এইরকম বেশ কিছু প্রশ্নের বুননে তৈরি হয়েছে উপন্যাসটির অনন্য সুর।
লেখকের ভাষা নদীর মতো—কখনো শান্ত, কখনো স্রোতস্বিনী। ইতিহাসের কণিকা, পুরাণের আভাস ও বিজ্ঞানের আলোকরেখা মিশিয়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন এক মায়াবী রসায়ন। গল্পটি ভীতির নয়, শুধু উত্তেজনারও নয়; এটি হচ্ছে বিবেকের জাগরণ যা সত্য ও অসত্যের চিরন্তন দ্বন্দ্বকে নতুন আলোতে দেখার সুযোগ করে দেয়।
তবে বিস্ময়কর এই নির্মাণের মাঝেও দু’টি অলৌকিক ব্যাখ্যা কিছুটা বেসুরো লাগে—যেন শান্ত আকাশে হঠাৎ অমিল রঙের দাগ ছড়িয়ে পড়ে।
তবুও সব মিলিয়ে, উপন্যাসটি এক অনন্য পাঠ-অভিজ্ঞতা দেয়—যেন অতীতের অচেনা এক দরজা খুলে যায়, আর ইতিহাসের ভীষণ রূপের ভেতরে দেখা মেলে অন্য সম্ভাবনার, অন্য আলো-ছায়ার।
বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের কাছে চিরকালই সমাদর পেয়েছে ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস। ইতিহাস মানেই রহস্যে ও রোমাঞ্চে ভরা এক অদেখা জগতের হাতছানি। আর সেই ইতিহাস যদি হয় মিশর ও ভারতবর্ষের, তাহলে যে রোমাঞ্চের মাত্রা কিঞ্চিৎ বাড়বে যে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। লেখক অনির্বাণ ঘোষ তাঁর এই 'হারানো সূর্যের খোঁজে' উপন্যাসটিতে আশ্চর্যভাবে মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন ভারতবর্ষ ও মিশরের ইতিহাসের বেশ কিছু ঘটনাপ্রবাহকে। দুই নদীমাতৃক দেশ, তাদের মানুষজন - সংস্কৃতি - ভাষা সবকিছুর মধ্যেই সাদৃশ্যের সন্ধান পেয়ে তা পাঠকের সামনে উপন্যাসের আকারে তুলে ধরেছেন লেখক। কাহিনী এগিয়ে চলার পথে বইয়ের পাতায় পাতায় শুধু রোমাঞ্চ নয়; হাজির হয়েছে বেশ কিছু চরিত্রও। অগস্ত্য, উপল, ইরতেনসেনু ও রানী হাতসেপসুতের পাশাপাশি স্থান পেয়েছে বাকারি, ঋষভ ও সেনেনমুতের মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। যারা ঘটনাপ্রবাহকে আরও জোরদার ও ইতিহাসনির্ভর করে তুলতে সাহায্য করেছে। লেখকের এই উপন্যাস শুধুমাত্র একটি কল্পকাহিনী নয়, মিশর ও ভারতবর্ষের ইতিহাস নিয়ে এক গবেষণাও বটে। তাই যে সমস্ত পাঠক ইতিহাস অনুরাগী বা ইতিহাস আশ্রিত সাহিত্যের অনুরাগী, এই উপন্যাস ত���দের কখনওই নিরাশ করবে না।
বই - হারানো সূর্যের খোঁজে লেখক - অনির্বাণ ঘোষ পৃষ্ঠা - ২৭২ পাতা মূল্য - ৪২৫ টাকা প্রকাশনা - পত্রভারতী
"ধর্ম বিজ্ঞান ঈশ্বর শয়তান বিশ্বাস অবিশ্বাসের এই আবর্তে কি আলোর সন্ধান মিলবে আদৌ? এই উপন্যাসে এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়েছে দুই দেশ, ভারতবর্ষ এবং মিশর... " প্রথমেই বলে রাখা ভালো লেখকের পূর্ব প্রকাশিত বই "হায়রোগ্লিফের দেশে" বইটির সঙ্গে বর্তমান বইটির কোনো মিল নেই... এটি মৌলিক রচনা। হারানো সূর্যের খোঁজে গল্পের সময়কাল রাণী হাতশেপসুতের রাজত্বকালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে... মিশরের তৎকালীন রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক তরজাকে অত্যন্ত সুনিপূণতার সঙ্গে লেখক তৎকালীন ভারতবর্ষের বিদর্ভ প্রদেশের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন। গল্পের মূল চরিত্র মিশরীয় কন্যা ইরতেনসেনু এবং বিদর্ভ পুত্র অগস্ত্যের যুগলবন্দীতে দুরুহ নীলনদের উৎস অভিমুখে খুঁজে পাওয়া এক লুকোনো শহরের বিশেষ গাছ খোঁজার অভিযান নিয়ে গল্পের শুরু... মাঝে রয়েছে অজস্র চমক... সব মিলিয়ে গোগ্ৰাসে পড়ার মতো একটি সুখপাঠ্য বলা যেতে পারে... অবশ্য পড়ুন এবং মুগ্ধ হন ❤
This Story is mostly plot driven. The Author does a very good job with the World creation part.
One thing I wanna point out about this read is that for some reason I didn't feel connected enough with the characters. Instead of the characters driving the plot, the plot kept tossing the characters around. One character faces some challenge, that instantly gets solved magically without them facing some more problems. And the twist at the end is quite predictable.
লেখকের কথায় ইতিহাস সুরভিত কল্পকাহিনী। লেখা এবং কাহিনী গতিশীল। গল্প নিয়ে কিছু বলার নেই। পুরাণ আর ইতিহাসের অকল্পনীয় মিল ঘটিয়েছেন, কিন্তু আমার মতে জমলো না। আমার মতে এই বইটি সংগ্রহে রাখতেই হবে সেরকম নয়।
অনির্বাণ ঘোষের হারানো সূর্যের খোঁজে পড়তে গিয়ে প্রথমেই যে অনুভূতিটা আসে, তা হল―বাংলা সাহিত্যে মিশর ও ভারতকে একই অদৃশ্য সূতোয় বেঁধে ফেলার এক অভিনব প্রচেষ্টা। ইতিহাস, পুরাণ, ভূগোল, মিথলজি আর বিজ্ঞানের মিশ্রণ বাংলা উপন্যাসে নতুন কিছু নয়, কিন্তু এভাবে মিশরীয় সভ্যতা ও ভারতীয় পৌরাণিক চরিত্রকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে গল্প বলা নিঃসন্দেহে দুঃসাহসী কাজ। লেখক চিকিৎসক, তাই বিজ্ঞানের দিক থেকে ব্যাখ্যাগুলো কোথাও কোথাও বেশ দৃঢ় ও স্বচ্ছ। আবার, গল্পের গতি বজায় রাখতেও তিনি যথেষ্ট সচেষ্ট।
অগস্ত্য ও ইরতেনসেনুর অভিযাত্রা যেমন পাঠককে নীলনদের পাড়ে নিয়ে যায়, তেমনি বিদর্ভরাজ্যের প্রাচীন রাজপ্রাসাদেও ঘোরাফেরা করায়। এই দ্বৈত মেলবন্ধন অনেকটা ড্যান ব্রাউনের The Da Vinci Code–এর মতো, যেখানে ইতিহাস, ধর্ম ও বিজ্ঞানের সংঘাতে গল্প এগোয়। তবে ব্রাউনের মতো খোলামেলা থ্রিলারের তীব্রতা এখানে নেই; বরং আছে এক ধীরস্থির পৌরাণিক আবহ, যার ছায়া মেলে সমরেশ মজুমদারের অর্জুন সিরিজে, কিংবা বিদেশি সাহিত্যে অমিতাভ ঘোষের In an Antique Land–এ।
একদিকে যেমন তথ্যসমৃদ্ধতা, মিশরীয় মিথলজি ও ভারতীয় পুরাণের মেলবন্ধন—সেখানে রোমা রোলানের Jean-Christophe বা স্যামুয়েল রিচার্ডসনের Pamela–র মতো এক দীর্ঘস্থায়ী বর্ণনামূলক আবহ তৈরি হয়, যেখানে চরিত্র ও সংস্কৃতির সংঘাত আস্তে আস্তে পাঠককে জড়িয়ে ফেলে। আবার রহস্যের দিক থেকে কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া যায় মিখাইল বুলগাকভের The Master and Margarita–র সাথে, যেখানে শয়তান, ধর্ম ও মানুষী দ্বন্দ্ব একই টেবিলে বসে যায়।
অন্যদিকে, নীলনদের রহস্যময় অরণ্যপথ ও গোপন অভিযাত্রা মনে করিয়ে দেয় এইচ. রাইডার হ্যাগার্ডের She কিংবা King Solomon’s Mines–এর মতো অ্যাডভেঞ্চার সাহিত্যের ঐতিহ্যকে। ইতিহাসের সঙ্গে কল্পনার এই নিরবচ্ছিন্ন লেনদেন আবার অনেকটা উমবের্তো একোর Foucault’s Pendulum–এর দার্শনিক রহস্যের মতো, যেখানে প্রতিটি প্রতীকই যেন আরও গভীর কোনো সংকেতের দিকে ঠেলে দেয়।
তবে অনির্বাণ ঘোষের ভঙ্গি এসবের মতো আড়ষ্ট ও ভারী নয়; বরং কিশোরমনা পাঠকের কল্পনাকেও সহজে ডেকে আনে, যেমন টলকিয়েনের The Hobbit বা লয়েড আলেকজান্ডারের The Chronicles of Prydain–এর অভিযাত্রী সুর। পাঠক সহজেই অনুভব করেন—এই উপন্যাস একদিকে ইতিহাসের অঙ্গনে দাঁড়িয়ে, অন্যদিকে পৌরাণিক ফ্যান্টাসির জগতে ঢুকে যায়।
বইয়ের যে দিকগুলো সবচেয়ে শক্তিশালী, তার মধ্যে অন্যতম হল লেখকের তথ্যসমৃদ্ধ দৃষ্টি। ভারত ও মিশরের পৌরাণিক মিল—গরুড়, মকর, দেবতা–দেবীর প্রতীকী সাদৃশ্য—এসব জায়গায় লেখক রীতিমতো গবেষকসুলভ। পাঠকের মনে হয় তিনি যেন এক হাতে স্ক্যালপেল, আরেক হাতে কলম নিয়ে একইসঙ্গে অস্ত্রোপচার করছেন ও উপন্যাস লিখছেন। ফলত পাঠক কখনও শিহরিত হন, কখনও আবার ভাবেন—এতখানি তথ্য কি কিশোরপাঠ্য উপন্যাসে মানায়?
কাহিনির গতি পাঠককে টেনে নিয়ে যায়, কিন্তু একইসঙ্গে কিছু চরিত্রের অপ্রয়োজনীয় অবস্থান চোখে লাগে। বিশেষত বিদর্ভর রাজা বসুমান ও তাঁর পত্নীর আতিথেয়তার পর হঠাৎ প্রতারণার দৃশ্য কিছুটা বেমানান মনে হয়। এতে পাঠকের সহমর্মিতা ভেঙে যায়। এখানেই উপন্যাসটি অনেকটা ডেভিড মিচেলের Cloud Atlas–এর মতো হয়ে দাঁড়ায়—অসাধারণ মঞ্চসজ্জা, কিন্তু সব কাহিনি একই মানে পৌঁছতে পারে না।
সত্যি বলতে, হারানো সূর্যের খোঁজে এমন এক বই যা Harry Potter–এর মতো কিশোরপাঠকও উপভোগ করতে পারে, আবার Umberto Eco–র Foucault’s Pendulum–পড়ুয়া প্রাপ্তবয়স্করাও আলোচনায় টেনে আনতে পারেন।
সবচেয়ে প্রশংসনীয় হল বইয়ের কল্পনা শক্তি। 'কামারু', 'পুন্ত নগরী', 'সিন্ধুদেবীর মূর্তি'—এসব বর্ণনা এত জীবন্ত যে পাঠকের মনে যেন ওয়েব সিরিজের দৃশ্য ভেসে ওঠে। এই ভিজ্যুয়াল স্পষ্টতা মনে করিয়ে দেয় সালমান রুশদির The Enchantress of Florence–এর রঙিন ইতিহাসকল্প, আবার কোথাও বা পাউলো কোয়েলহোর The Alchemist–এর মরুভূমি ভ্রমণের মায়া। এখানেই অনির্বাণ ঘোষের লেখকসত্তা কল্পবিজ্ঞানী ও দৃশ্য নির্মাতার মতো হয়ে দাঁড়ায়, যেন তিনি প্রাচীন সভ্যতার ওপরে ড্রোন ক্যামেরা নামিয়ে পাঠককে টুকরো টুকরো চিত্রমালা দেখাচ্ছেন।
কিন্তু একইসঙ্গে এটাও সত্যি, তিনি শেষ অব্দি কোনো নির্দিষ্ট কনক্লুশনে গল্পকে পৌঁছে দেননি। এই ঢিলে সমাপ্তি অনেকটা মনে করিয়ে দেয় হারমান হেসের The Glass Bead Game–এর অস্পষ্ট পরিসমাপ্তি কিংবা ইতালো ক্যালভিনোর Invisible Cities–এর ভাসমান শহরগুলোর মতো গন্তব্যহীন সৌন্দর্য। কাহিনির "কৈফিয়ত" অংশটা অনেক পাঠকের কাছে জরুরি হলেও, সাহিত্যিক দিক থেকে সেটি খানিকটা পালাবদলের মতো মনে হয়—যেন নাটকের মঞ্চে হঠাৎ পর্দা টেনে দেওয়া হলো, অথচ অভিনেতাদের সংলাপ এখনো শেষ হয়নি।
অবশ্যই উল্লেখ করতে হয় বইয়ের সৌন্দর্যকে—সুবিনয় দাসের প্রচ্ছদ ও ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের ইলাস্ট্রেশনগুলো বইটিকে দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে। প্রচ্ছদের রহস্যময় রঙচঙে আভা অনেকটা মনে করায় টলকিয়েনের The Lord of the Rings–এর প্রথম দিককার সংস্করণগুলোর নান্দনিক কভার আর মুরাকামির Kafka on the Shore–এর সুররিয়াল প্রচ্ছদের আবেশকে। ভেতরের অলংকরণগুলো আবার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাকাবাবু সিরিজে সমরেশ দত্তর আঁকার মতো—গল্পকে শুধু শব্দে নয়, ছবিতেও জ্যান্ত করে তোলে।
দাম নিয়ে পাঠকের অসন্তোষ থাকলেও, সাহিত্যিক আঙ্গিকে এটি বাংলা সাহিত্যে এক ব্যতিক্রমী সংযোজন। ঠিক যেমন অমিতাভ ঘোষের Sea of Poppies–এর প্রথম প্রকাশের সময় দাম নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল, অথচ সময়ের সাথে তার সাহিত্যমানই জয়ী হয়েছে, তেমনি অনির্বাণ ঘোষের এই বইও মূলত তার বিষয়বস্তুর অভিনবত্বের কারণে�� টিকে থাকবে।
সব মিলিয়ে হারানো সূর্যের খোঁজে মনে করিয়ে দেয় যে সাহিত্যে কল্পনা আর ইতিহাস আলাদা হয়ে থাকে না, বরং একে অপরকে বারবার অতিক্রম করে। এই বই পড়তে গিয়ে হয়তো পাঠক মনে করবেন—ড্যান ব্রাউনের ধাঁচে লিখিত এক ফ্যান্টাসি থ্রিলার, আবার কোথাও পাবেন অমিতাভ ঘোষের ঐতিহাসিক কল্পনার আবহ, আবার কোথাও সমরেশ বসুর অভিযাত্রী গল্পের ছোঁয়া। এই মিশ্রণের মধ্যেই বইটির সার্থকতা। হয়তো একে "সবার জন্য, কিন্তু সবার মতো নয়"–এই কথাতেই সবচেয়ে ভালোভাবে বর্ণনা করা যায়।